📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 মুসারাহর যুদ্ধ

📄 মুসারাহর যুদ্ধ


টলেডো এবং মুরসিয়া প্রদেশের দুর্ধর্ষ সৈন্য সংগ্রহ করিয়া ইউসুফ যুবরাজের গতিকে প্রতিহত করিবার জন্য গোয়াদালকুইভির নদীর ডান পাশ দিয়া কর্ডোভা হইতে সেভিলের দিকে অগ্রসর হন কিন্তু যুবরাজ ইতিমধ্যে উক্ত স্থান ত্যাগ করিয়া একই নদীর বাম পাশ দিয়া কর্ডোভা অভিমুখে যাত্রা করেন । ছয় বৎসর যাবত দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত কর্ডোভা লুণ্ঠন করিবার জন্য আবদুর রহমান হুমকি দিলেন ।

আবদুর রহমানের সেনাবাহিনী ইউসুফের সেনাবাহিনীর ন্যায় প্রয়োজনীয় রসদের স্বল্পতায় ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় । কর্ডোভা অবরোধের খবর পাইয়া ইউসুফ বিচলিত হইয়া পড়েন এবং তিনি সেভিল হইতে বিরাট সেনাবাহিনী লইয়া রাজধানীর দিকে দ্রুত অগ্রসর হন । আবদুর রহমান তাঁহার কিছু সংখ্যক সহচরকে কর্ডোভা অবরোধের জন্য রাখিয়া নিজে ১০,০০০ হাজার সৈন্যকে সঙ্গে লইয়া শত্রুর মোকাবিলা করিবার জন্য মুসারাহতে রওয়ানা হন । ১৩ গোয়াদালকুইভির নদী মুসারাহ ও পশ্চিমে কর্ডোভার মধ্য দিয়া প্রবাহিত । গোয়াদালকুইভির নদী তুসিনার নিকট দিয়া পারাপার হইবার জন্য পায়ে হাঁটা রাস্তা ছিল । কিন্তু পানি ছিল অধিক । ইউসুফের পূর্বে প্রেরিত শান্তি প্রস্তাব গ্রহণের ভান করিয়া আবদুর রহমান মুসারাহর নিকট নদী অতিক্রম করিতে সমর্থ হন এবং ১৩৮ হিঃ জিলহজ্জ শুক্রবার ৭৫৬ খ্রীস্টাব্দের ১৪ই মে ইউসুফের সেনাবাহিনীকে আক্রমণ করেন । এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয় । আবদুর রহমানের অশ্বারোহী সেনাবাহিনীর তীব্র আক্রমণে ইউসুফের সেনাবাহিনী ছত্রভঙ্গ হইয়া পলায়ন করে । ইউসুফের অশ্বারোহী সৈন্য দ্বারা তাহার স্বীয় পলায়নপর বিশৃঙ্খল সেনাদল পদদলিত হয় । এই ছিল মুসারাহর যুদ্ধ, যাহা পরবর্তী বহু বছরের জন্য স্পেনের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে ।

ইউসুফ টলেডোতে পলাইয়া যান এবং সুমায়েল আশ্রয় গ্রহণ করে জায়েনে । ১৪ ইউসুফের পুত্র আবদুল্লাহ এবং সুমায়েলের পুত্র জাওশান যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হয় । প্রথম আবদুর রহমান বহু সৈন্যকে বন্দী করেন । তিনি পরের দিন ১০ই জিলহজ্জ (১৩৮ হিঃ) কর্ডোভা দখল করেন এবং নিজে জুমার নামাজে ইমামতি করেন । ১৫ যাহারা আত্মসমর্পণ করিয়াছিল তাহাদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন করা হয় । পরাজিত গভর্নরের হেরেমকে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় । ইউসুফের কন্যা আবদুর রহমানকে হুলাল অথবা হোরা নামে তাহার এক যুবতী দাসীকে উপহার হিসাবে প্রদান করেন । এই দাসী-হোরার গর্ভেই পরবর্তীকালে হিশামের জন্ম হয় । যদিও আব্বাসীয় খলিফা আল মনসুরের নামে খুতবা পাঠ করা হইত তথাপি আবদুর রহমান নিজেকে স্পেনের আইনসম্মত শাসক বলিয়া নিজেকে দাবী করিতেন ।

টিকাঃ
১৩। ইবনুল আছির, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ৩৮১; আল-রিয়াসত আলী, ১ম খণ্ড, পৃঃ ২৬০।
১৪। ইবনুল আছির, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ৩৭৮।
১৫। মাজমুয়া আখবার, পৃঃ ৭৬, ৯৪-৯৫।

📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 ইউসুফ ও সুমায়েলের বিদ্রোহ

📄 ইউসুফ ও সুমায়েলের বিদ্রোহ


আবদুর রহমানের সম্মুখে বিরাট সমস্যা ছিল, খ্রীস্টান সম্ভ্রান্ত শ্রেণীর বিদ্রোহ ও বিপ্লবের প্রয়াস । দেশকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত করার আরব অভিজাত সম্প্রদায়ের পরিকল্পনা এবং অত্যাচারে জর্জরিত জনসাধারণের গভীর আর্তনাদ তাঁহাকে আরো বিপর্যস্ত করিয়া তোলে । আবদুর রহমানের অবস্থা তখন পর্যন্ত নিরাপদ ছিল না । ইউসুফ জায়েনে সুমায়েলের সহিত মিলিত হইয়া ও তাহার বিক্ষিপ্ত সেনাদল সংগ্রহ করিয়া এলভিরার পার্শ্ববর্তী এলাকায় গোলযোগ সৃষ্টি করিতে আরম্ভ করে । আবদুর রহমান তাহার প্রধান সমর্থক আবু ওসমানকে কর্ডোভার গভর্নর নিযুক্ত করেন । ইহার পর তিনি শত্রুদমনে অগ্রসর হন । ইউসুফ ইতিমধ্যে কর্ডোভা দখল করিয়া লইয়াছিল । আবু ওসমান প্রধান মসজিদের চূড়ায় আত্মগোপন করেন । আবদুর রহমানের অগ্রাভিযানের মুখে ইউসুফ ও সুমায়েল তাহাদের বাধা দান ব্যর্থ হইবে ভাবিয়া আত্মসমর্পণ করেন । ইহা সফর ১৩৯ হিঃ/৭৫৬ খ্রীঃ জুলাই মাসে ঘটে । আবু জাইদ আবদুর রহমান ও আবুল আসওয়াদ মুহাম্মদ জামিন হিসাবে থাকে এবং তাহাদের পিতা ইউসুফ ও সুমায়েল নির্বিঘ্নে তাহাদের সম্পত্তি ভোগ দখলে রাখেন । ১৬ আবদুর রহমান এবং ইউসুফের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি দুই বৎসরের অধিক কাল স্থায়ী হয় না । প্রাচ্য হইতে আগত আবদুল মালিক বিন ওমর বিন মারওয়ান ও খাইরী বিন আবদুল আজিজ বিন মারওয়ানের মত নিজ বংশীয় লোকদের মধ্যে আমীর ভূমি বণ্টন করেন । আবদুর রহমান এবং ইউসুফের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয় । ইউসুফ মেরিদাতে পলাইয়া যান । সেখানে (২০,০০০) বিশ হাজার লোক তাঁহার সহিত যোগদান করে । ১৭ সুমায়েল এবং ইউসুফের দুই পুত্র কারারুদ্ধ হয় । ১৮ কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয় । শেষ যুদ্ধ হয় ১৪১ হিঃ/৭৫৮ খ্রীস্টাব্দে লুকসা যুদ্ধক্ষেত্রে । ১৯ ইউসুফ সেভিলের গভর্নর আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের নিকট পরাজয় বরণ করেন । তাহার বহু সমর্থক নিহত হয় এবং সে মারাত্মক ভাবে জখম হইয়া আত্মরক্ষা করিতে সমর্থ হয় । পরের বৎসর রজব মাসে তাহার পুরাতন শত্রু আবদুল্লাহ বিন আমর আল আনসারীর হাতে তিনি টলেডোর নিকট এক গ্রামে নিহত হন । সুমায়েল কারারুদ্ধ হন এবং পরে বিষ প্রয়োগের কারণে মারা যান । আবু জাইদ নিহত হন এবং আবুল আসওয়াদ বহু বৎসর কারাবাসের পর অন্ধ মানুষের ছদ্মবেশে কারাগার হইতে পলাইয়া যান ।

নারবোনে অবরুদ্ধ সেনাবাহিনীকে সাহায্যের জন্য সুলাইমানের সেনাপতিত্বে রাজকীয় সেনাবাহিনীর একদল সৈন্য প্রেরিত হয় । কিন্তু ৭৫৯ খ্রীঃ গিরিসংকটে পতিত হইয়া সেনাদল বিভক্ত হইয়া যায় । ২০ খ্রীস্টানগণ পেপিনের সেনাবাহিনীর আগমনের জন্য নারবোনে শহরের প্রবেশ পথ উন্মুক্ত করিয়া দেন । নগরের পতন ঘটে এবং মুসলমানরা বিতাড়িত হয় ।

টিকাঃ
১৬। ইবনুল আছির, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ৩৮১; নাফলুল-তিব, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৬৬।
১৭। ইবনুল আছির, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ৩৮১, রিয়াসত আলী কর্তৃক উল্লেখিত, ১ম খণ্ড, পৃঃ ২৬০।
১৮। এইচ. কে. শেরওয়ানী, মুসলিম কলোনিস, পৃঃ ৮১-৮২ দেখুন।
১৯। ইবনুল আছির, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ৩৯০।
২০। রিয়াসত আলী, ১ম খণ্ড, পৃঃ ২৮৮; ই. জি. গমেজ, ইস্পানা মুসলমানস (হিস্টোরটা ডি ইস্পানা) ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ৬৯।

📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 দক্ষিণাংশে ইয়ামানীদের বিদ্রোহ

📄 দক্ষিণাংশে ইয়ামানীদের বিদ্রোহ


ইউসুফ পরাজিত ও নিহত হওয়ার পরেও আবদুর রহমানের বিপদ বিদূরিত না হওয়ায় তাহাকে অন্যান্য বিদ্রোহী নেতাদের মোকাবিলা করিতে হয় । ইয়ামানী ও বার্বারগণ তাহার পুরুষানুক্রমিক শাসনকে পছন্দ করিতেছিল না । ফলে একাধিক বিদ্রোহ দেখা দেয় । আবদুর রহমান তাহার ক্ষমতাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার পর কর্ডোভার আশেপাশে বিদ্রোহকে দমন করিবার জন্য অগ্রসর হন । ৭৬০ খ্রীস্টাব্দে আরজাক বিন নোমান গাসসানী আলজিরিয়াতে বিদ্রোহ ঘোষণা করিয়া মদীনা সিদোনীয়া এবং সেভিল দখল করেন । ২১

ইয়ামানী নেতা আবুল সাববাহ সেভিলের গভর্নর, মুসারাহর যুদ্ধের পর আবদুর রহমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল । আবুল সাববাহ ৭৬৬ খ্রীষ্টাব্দে ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হন । ইহাতে অন্যান্য ইয়ামানী নেতাগণ বিরূপ হইয়া ওঠেন । আবুল সাববাহর ক্ষুব্ধ আত্মীয়-স্বজন যেমন আবদুল গাফফার বিন হামিদ, আমির বিন তালুত, আবু কুলসুম বিন ইয়াসুব এবং হায়াত বিন মুলামিস ২২ বিদ্রোহী হইয়া ওঠেন এবং বহু মুজারীকে নিহত করেন । আমীর আবদুর রহমান দ্রুত উত্তর সীমান্ত হইতে কর্ডোভাতে ফিরিয়া আসেন এবং দক্ষিণাংশে বিদ্রোহ দমনের জন্য অগ্রসর হন । কর্ডোভা প্রদেশে বেমবেজার নামে পরিচিত মাইসার নদীর তীরে ৭৭৪ খ্রীষ্টাব্দে ইয়ামানীদের সহিত তিনি যুদ্ধে লিপ্ত হন । আমীরের বার্বার অনুচরদের দ্বারা প্ররোচিত হইয়া বহু সংখ্যক বার্বার যাহারা বিদ্রোহে যোগদান করিয়াছিল দলত্যাগ করে । ইয়ামানীরা পরাজিত হয়, তাহাদের ২০,০০০ হাজার সৈন্য নিহত হয় এবং তাহাদের ক্ষমতা বিলুপ্ত হয় । নিয়েবলার ইয়ামানী বিদ্রোহী নেতা মাতারী পরাজিত ও নিহত হন ।

টিকাঃ
২১। ঐ, পৃঃ ২৭৩; ঐ, পৃঃ ৭১-৭২।
২২। মাজমুয়া আখবার, আন্দালুস, পৃঃ ১০১।

📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 টলেডোতে বিদ্রোহ

📄 টলেডোতে বিদ্রোহ


টলেডোর প্রাক্তন গভর্নর হিশাম বিন উরওয়াহ ২৩ ৭৬১ খ্রীস্টাব্দে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন । শহর অবরুদ্ধ হইলে বিদ্রোহী নেতা আত্মসমর্পণ করিতে বাধ্য হন এবং তাহার পুত্রকে জামিন হিসাবে প্রেরণ করেন । কিন্তু তিনি পুনরায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং আমীরকে অবরোধ প্রত্যাহারে বাধ্য করেন । ২৪ শহরে প্রত্যাবর্তন করিয়া আমীর হিশামের পুত্র যিনি জামিন ছিলেন তাহাকে হত্যা করেন । ২৫ চারি বৎসর পর ৭৬৪ খ্রীস্টাব্দে টলেডো আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় । বদর বিদ্রোহী নেতাকে কর্ডোভাতে আনিয়া ফাঁসি দেন । তামামা বিন আলকামা টলেডোর গভর্নর নিযুক্ত হন ।

টিকাঃ
২৩। ঐ, পৃঃ ১০১, ১০৪।
২৪। ইবনুল কুতাইবার মতে, আলা আল-মুগীত বেজার প্রধান ছিলেন। এবং আব্বাসীয়দের সমর্থনে ক্ষমতাসীন হয়েছিলেন।
২৫। ইবনুল আছির, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ৪৪০; ইবনে খালদুন, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ৪২৩; আল-মাক্কারী, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৬৭।

ফন্ট সাইজ
15px
17px