📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 নব মুসলিমগণ

📄 নব মুসলিমগণ


চতুর্থ এবং শেষদল যাহারা গৃহযুদ্ধের সহিত জড়িত ছিল তাহারা হইল নব মুসলীমগণ (মুয়াল্লাদুন) তাহারা ছিল স্পেনে সংখ্যাগরিষ্ঠ । তাহারা অধিকাংশই ছিল দেশের অভ্যন্তরের কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, কারিকর ও শ্রমজীবী । বিজয়ীরা সাধারণত স্পেনীয়দের ধর্মান্তরে উৎসাহিত করিতেন না । কারণ ইহাতে কোষাগার ক্ষতিগ্রস্ত হইত । নব মুসলমানগণ আরব ও বার্বারদের ঘৃণা করিত । প্রথম দলকে তাহাদের অহঙ্কারের জন্য, আর শেষোক্ত দলকে তাহাদের অসভ্য ও কঠোর কর্কশ ব্যবহারের জন্য । দেশের প্রধান শহরের ধর্মান্তরিত মুসলমানগণ ছিলেন ধনী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের । ৭৫০ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত একজন অনারব ছিল অপর একজন আরবের আশ্রিত । বৃত্তিভোগের ব্যাপারে মুসলিম রাষ্ট্রে একজন আশ্রিত ব্যক্তি একজন আরবের তুলনায় কম বৃত্তি পাইত । এই ব্যবস্থা মুসলমানদের মধ্যে বিশেষ করিয়া স্পেনীয় মুসলমানদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে । গোঁড়া খ্রীস্টানগণ স্পেনীয় মুসলমানদের ঘৃণা করিত এবং স্বধর্মত্যাগী বলিয়া সম্বোধন করিত । খ্রীস্টান এবং দেশীয় মুসলমানদের সহিত বিবাহ প্রচলিত ছিল । নব মুসলমানের কোন শিশু জন্মগ্রহণ করলে সে মুয়াল্লাদ বলিয়া পরিচিত হইত । পার্সীয়ানদের ন্যায় নব মুসলমানগণকেও আরব এবং বার্বারগণ ঘৃণা করিত এবং তাহাদিগকে দাসপুত্র বলিয়া ডাকিত । তাহাদিগকে সব সময় গুরুত্বপূর্ণ সরকারী চাকুরী প্রদান করা হইত না ফলে তাহারা আরব শাসনের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে ও পরবর্তীকালে আরব শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হইয়া ওঠে এবং অধিক স্বায়ত্তশাসনের দাবী উত্থাপন করে । আরব প্রাধান্যকে খর্ব করিবার জন্য তাহারা বিভিন্ন দলে যোগদান করিতে শুরু করে । ইহার ফলে স্পেনে মতবিরোধের আর একটি সূত্রপাত ঘটে । বিভিন্ন দলকে একত্র করা এবং দেশের মধ্যে শান্তি স্থাপন করা সত্যই দুরূহ ব্যাপার ছিল । দামেস্কের উমাইয়া খলিফা শান্তি প্রতিষ্ঠা করিতে ব্যর্থ হন । সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন (৭৩২-৭৫৫ খ্রীঃ) চলাকালীন প্রায় পঞ্চাশ জন গভর্নর একের পর এক স্পেনের শাসন কার্যে নিযুক্ত হন । এই দ্রুত আগমন ও নির্গমনে তাহারা অতি সামান্য সময়ই দেশের বিশৃঙ্খল অবস্থার উন্নতি বিধানে ব্যয় করিতে সমর্থ হন । গৃহবিবাদ এবং আস্তুরিয়ার প্রথম আল ফন্সোর চাপে উত্তর-পশ্চিম উপদ্বীপের প্রায় এক চতুর্থাংশ স্থান মুসলমানদের হস্তচ্যুত হয় ।

📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 ফ্রান্স হইতে মুসলমান উৎখাত

📄 ফ্রান্স হইতে মুসলমান উৎখাত


ইউসুফ যখন অভ্যন্তরীণ শত্রু দমনে ব্যস্ত ছিলেন, সেই সময় চার্লস মার্টেলের উত্তরাধিকারী এবং পুত্র পেপিন ৭৫৫ খ্রীস্টাব্দে ফ্রান্সের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় প্রবেশ করে । ফরাসীগণ মুসলিম নগরী আগদে, বেজিয়ার্স, লডেভ এবং অন্যান্য শহর ধ্বংস করে এবং মুসলিম আবাল বৃদ্ধ বণিতা এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মুসলমানকে হত্যা করে । তাহারা হাসপাতাল, স্কুল এবং মসজিদে অগ্নি সংযোগ করে । কয়েক বৎসর গোলযোগপূর্ণ সময়ে উত্তর স্পেনের পর্বতসঙ্কুল এলাকা হইতে মুসলমানদিগকে প্রত্যাহার করা হয় । এই দুর্গম এলাকায় খ্রীস্টানগণ নিজেদের দৃঢ়ভাবে সুরক্ষিত করিয়াছিল এবং সেখান হইতে মুসলিম স্পেনে পরবর্তীকালে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে । মুসলমানরা যখন গৃহযুদ্ধে ব্যাপৃত সেই সময় পিলাইও আস্তুরিয়া সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং চালর্স মার্টেল ও তাহার উত্তরাধিকারিগণ ফ্রান্সের মুসলমানদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে ।

📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 ফ্রান্স হইতে মুসলমানদের উৎখাতের কারণসমূহ

📄 ফ্রান্স হইতে মুসলমানদের উৎখাতের কারণসমূহ


১ । আবদুর রহমান আল-গাফিকীর পর অন্য কোন যোগ্য গভর্নর তাহার স্থলাভিষিক্ত না হওয়ার দরুন আরব এবং বার্বারদের মধ্যে গোত্রীয় বিদ্বেষ দেখা দেয়, ফলে উভয় সম্প্রদায়ই হিংস্র হইয়া ওঠে ।

২ । উমাইয়া খিলাফতের সময় কেন্দ্রীয় প্রশাসন-যন্ত্রের দুর্বলতা, আফ্রিকার ভাইসরয় কর্তৃক পুনঃ পুনঃ গভর্নর পরিবর্তন এবং গভর্নররা খলিফা কর্তৃক প্রত্যক্ষ নির্বাচিত না হওয়ায় খলিফার প্রতি গভর্নরগণ সামান্যই শ্রদ্ধাশীল ছিল ।

৩ । আরব, বার্বার, সিরীয়, এবং নব মুসলিমদের মধ্যে অনৈক্য ও শৃঙ্খলাবোধ হীনতা, অসন্তোষ ও বিদ্বেষ গৃহযুদ্ধের জন্ম দেয় । অধিকাংশ সময় এই বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত থাকায় তাঁরা রাজ্য বিস্তার ও দেশের প্রশাসন কাজে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিতে পারেন নাই ।

৪ । দক্ষিণ ফ্রান্সে নিয়োজিত জেনারেলদের কর্তব্যে অবহেলা, যেমন-স্পেনের গৃহযুদ্ধে অংশ গ্রহণের পরিবর্তে নারবোনের কমান্ডার স্থান পরিত্যাগ করেন ।

৫ । দুর্গম পার্বত্য এলাকা, যেমন- স্পেন হইতে ফ্রান্সকে পৃথককারী গিরিমালাসমূহ । ইহা দুই দেশের মধ্যে প্রাকৃতিক সীমা হিসাবে কাজ করে । সামান্য কয়টি গিরিপথ ব্যতীত এইগুলি বৎসরের অধিকাংশ সময়ই বরফাবৃত থাকিত । মেসেতার উচ্চ মালভূমি সহজে সৈন্য পরিচালনা এবং সড়ক পথে যোগাযোগের জন্য ছিল বিরাট বাধা । সর্বোপরি মধ্যফ্রান্সের আবহাওয়া, ভূমধ্যসাগরীয় আবহাওয়ায় অভ্যস্ত বার্বার এবং সিরীয়দের জন্য ছিল সম্পূর্ণ অসহ্য ।

৬ । গৃহযুদ্ধ নৌবাহিনীর উন্নয়ন সাধন এবং ফ্রান্সের নতুন ভূমি দখলে বাধার সৃষ্টি করে । ফলে ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্বে নারবোনের মুসলিম সেনাঘাটি প্রাচ্যের অনুরূপ বসরা, কুফা এবং ফুসতাতের ন্যায় শক্তিশালী হইতে পারে নাই ।

৭ । কর্ডোভা এবং কায়রোওয়ানই একমাত্র জায়গা যেখান হইতে যুদ্ধের সময়ে ফ্রান্সে অবস্থিত সৈন্যগণ অতিরিক্ত সৈন্য ও রসদ পাইতে পারিত-কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্র হইতে উহা ছিল বহুদূরে অবস্থিত । ফলে অতিরিক্ত সৈন্য ও রসদ সরবরাহে নিরাশ হইয়া ফ্রান্সের যুদ্ধে মুসলিম সেনাগণ পরাজয়ের সম্মুখীন হয় । শত্রু সৈন্যদের প্রদত্ত সুযোগে মুসলিম সেনাবাহিনী পশ্চাদপসারণের সুযোগ লাভ করে । অন্যথায় অগণিত সৈন্য নৃশংসভাবে নিহত হইত । এই সমস্ত অসুবিধা, নিজেদের আত্মকলহ ও বিদ্বেষ এবং শৃঙ্খলা বোধহীনতার কারণে মুসলমানরা বহুবার ফ্রান্সে তাহাদের অধিকার ত্যাগ করিতে বাধ্য হন । তাহারা একমাত্র নারবোনকে ২২ অধিকারে রাখিতে পারিত কিন্তু তাহাও প্রথম আবদুর রহমানের সময়ে ফরাসীগণ দখল করিয়া নেয় ।

টিকাঃ
২২। শেরওয়ানী হারুন খান, মুসলিম কলোনিজ ইন ফ্রান্স, নর্দান ইটালী এ্যান্ড সুইজারল্যান্ড, লাহোর, ১৯৬৪ পৃঃ ১২৯-১৭৯।

📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 দামেস্ক-খিলাফতের অধীনস্থ আমীর শাসন আমলের পর্যালোচনা

📄 দামেস্ক-খিলাফতের অধীনস্থ আমীর শাসন আমলের পর্যালোচনা


এই অধ্যায়ের প্রারম্ভে স্পেনের আমীরদের ক্ষমতা সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হইয়াছে । এখানে অধীনস্থ আমীর শাসন আমলের চারিটি প্রধান বিষয়ে পর্যালোচনা করা হইল: (১) স্বজাতীয়তা বোধ (আসাবিয়াহ) (২) গণ-প্রশাসন (৩) সামরিক ব্যবস্থা বিভাগ এবং (৪) স্পেনীয় সমাজ ব্যবস্থা

স্বজাতীয়তা বোধ (আসাবিয়াহ): বার্বার গোত্রগুলি অপেক্ষা আরব গোত্রগুলির মধ্যে এই অনুভূতি অধিক প্রবল ছিল । বার্বাররা আরবদের অপেক্ষা অনেকাংশে ঐক্যবদ্ধ ছিল । আরবগণের বিরোধীতা করিবার জন্য বাধ্য হইয়া তাহারা ঐক্যবদ্ধ হইয়াছিল । আরবরা ইসলামের পূর্বে কখনও রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ ছিল না । অন্যদিকে ইসলামের পূর্বেই বার্বাররা গ্রীক এবং রোমানদের অধীনে ঐক্যবদ্ধ জীবন যাপনে অভ্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিল । তদুপরি উমাইয়াগণ তাহাদের জাতীয়তা বোধ বিভেদ ও বিদ্বেষ সৃষ্টির মাধ্যমে শাসন করিবার নীতি গ্রহণ করিয়াছিলেন । কারবালা এবং হাররার হৃদয় বিদারক ঘটনার স্মৃতি আরবদের মধ্যে পুনরায় গোত্রীয় চেতনা জাগাইয়া দেয় । স্পেনে আগমনের পর আরবগণ কাইজী, কালবী, ইয়ামানী, মুজারী, ওসাদী নাবাসী অথবা হিজাজী এবং সিরীয় প্রভৃতি দলে বিভক্ত হইয়া পড়ে । গোত্রীয় অনুভূতিই গভর্নর নিয়োগ ও অপসারণের পিছনে কাজ করে । ফলে আমীরগণ খুব কম সময়ই দেশের উন্নয়নমূলক কার্যে আত্মনিয়োগ করিবার সুযোগ লাভ করে । পরিণামে আন্তগোত্রীয় যুদ্ধ-বিগ্রহ শুরু হয় এবং অসংখ্য লোক নিহত হয় । আসকীর ইউসুফ বিন আবদুর রহমান তাঁহার দেহরক্ষী হিসাবে নিযুক্ত করিবার জন্য সামান্য পঞ্চাশ জন সৈন্য সংগ্রহ করিতে ব্যর্থ হন । দেশের উত্তর অঞ্চলে বসবাসকারী খ্রীস্টানগণ ইহার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে এবং আসুরিয়া সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতার বংশধর প্রথম আল্ল্ফন্সো স্পেনের এক চতুর্থাংশ দখল করে । ইহার ফলে স্পেন মুসলিম ও খ্রীস্টান এই দুই এলাকায় বিভক্ত হইয়া পড়ে । কয়েক শতাব্দী ধরিয়া একে অপরের অংশ দখল করিবার চেষ্টায় রত থাকে । শেষ পর্যন্ত উত্তরের খ্রীস্টান দক্ষিণ অঞ্চলের মুসলিম এলাকা জবর দখল করে ।

গণ-প্রশাসন: উমাইয়া সাম্রাজ্যের অন্যান্য প্রদেশের মত স্পেনের আমীরও ছিলেন সরকারের সামরিক ও বেসামরিক প্রধান । কর আদায় ও শান্তি রক্ষার জন্য দেশকে বিভিন্ন প্রশাসনিক বিভাগে ভাগ করা হয় । এবং প্রশাসনের দায়িত্ব অর্পিত ছিল গভর্নরদের উপর । প্রয়োজনের সময় তাহাদিগকে (কেন্দ্র) কর্ডোভা হইতে সৈন্য সরবরাহ করা হইত । স্থানীয় জনসাধারণের মধ্য হইতে কর আদায়কারী নিযুক্ত হইত । তাহারা কমিশনার বলিয়া পরিচিত ছিল । পুলিশ শহরের শান্তি রক্ষা করিত এবং পৌর প্রশাসনের প্রতিও লক্ষ্য রাখিত । বড় শহরে অবস্থিত বিচারালয় ফৌজদারী ও সাধারণ মামলার রায় প্রদান করিত । বড় বড় শহরে খ্রীস্টানদের জন্য নিজস্ব বিচারালয় ছিল । যেখানে তাহাদের নিজস্ব বিচারালয় থাকিত না সেখানে মুসলমান বিচারপতিগণ খ্রীস্টান পাদ্রীদের সহযোগিতায় তাহাদের মামলার ফয়সালা করিতেন । আমীরগণ নিজেরাই বিচার কার্য পরিচালনা করিতেন কিন্তু আপিল আদালত অবস্থিত ছিল কায়রোওয়ানে ।

আন্দালুসের কর ব্যবস্থাপনা দামেস্কের কর ব্যবস্থার অনুরূপ ছিল । নিম্ন বর্ণিত উৎস হইতে কর সংগ্রহ হইত: জমির খাজনা (খারাজ), জিজিয়া, বাজেয়াপ্তকৃত সম্পত্তির ফাই, জাকাত, উশর (জমিতে উৎপন্ন দ্রব্যের এক দশমাংশ) উত্তর ব্যবসায় সম্পদের দশমাংশ, বন্দর শুল্ক, চার্চে রক্ষিত সম্পদের উপর নির্ধারিত কর । সার্ফদের ভূমিতে মালিকানা স্বত্ব প্রদত্ত হইয়াছিল । তাহাদের ভূমি চাষাবাদের অনুমতি দেওয়া হইয়াছিল । জমির প্রকারভেদে এক ষষ্ঠাংশ হইতে অর্ধেক পর্যন্ত সরকারি কর বাবদ রাষ্ট্র এবং জায়গীরদারকে দিতে হইত । সামাহ বিন মালিক আল খাওলানীর সহিত যেসব আরব এবং বালজ ইবনে বিশরের সহিত যে সমস্ত সিরীয় স্পেনে আগমন করিয়াছিল তাহাদিগকে দেশের উত্তরাংশে বসতি স্থাপনের জন্য জমি প্রদান করা হইয়াছিল । বাগানে উৎপন্ন দ্রব্যকে কর হইতে রেহাই দেওয়া হইয়াছিল । ধর্মান্তরিত নব মুসলিমদিগকে জিজিয়া প্রদান হইতে অব্যাহতি দান করা হইয়াছিল । কিন্তু তাহাদিগকে জমির খাজনা দিতে হইত । তাহাদিগকে উশর এলাকাভুক্ত জমির উৎপন্ন দ্রব্যের এক দশমাংশ কর দিতে হইত । নারী, শিশু, যাজক এবং অক্ষম ব্যক্তিকে জিজিয়া হইতে মুক্তি দেওয়া হইয়াছিল । ইহুদীরা কর প্রদান করিত । কর রূপে প্রাপ্তসম্পদ কর্ডোভায় বায়তুলমালে জমা হইত । আমীরের কর আদায় করার ক্ষমতা ছিল এবং তাঁরা আদায়কৃত কর সেনা সংগঠন ও রাস্তাঘাট নির্মাণে ব্যয় করিতেন । আমীরের অনুমোদন ব্যতীত কোন নতুন খাতে বড় অঙ্কের টাকা ডেপুটি গভর্নরগণ ব্যয় করিতে পারিতেন না । মুসা বিন নুসাইর মোটা টাকা স্পেন হইতে দামেস্কে আনেন । কিন্তু তাঁহার পরে আর কেহই কায়রোওয়ানে নিয়মিত কর প্রেরণ করেন নাই । খালিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজের আদেশ পাইয়া আমীর সামহ বিন মালিক আল-খাওলানী ইসলামী আদর্শ মোতাবেক কর প্রথা পুনর্বিন্যাস সাধন করেন এবং আদায়কৃত করের কিছু অংশ দামেস্কে প্রেরণ করার জন্য তিনি পৃথক করিয়া রাখিতেন । খলিফার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর উহা উন্নয়নমূলক কর্মে ব্যয় করেন । দামেস্কে এবং কায়রোওয়ানে উদ্বৃত্ত কর পাঠাইবার নিয়মিত কোন ব্যবস্থা ছিল না । কৃষি ব্যবস্থার উন্নতি সাধনের ব্যবস্থা করা হইয়াছিল । অনাবৃষ্টি এবং দুর্ভিক্ষের বৎসর ভূমির খাজনা আদায় করা হইত না এবং কৃষকদিগকে নগদ ও তাকাভী ঋণ প্রদান করা হইত । নগর ও বন্দরে ব্যবসায়ীদের থাকার জন্য ও বাণিজ্য সামগ্রী বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে অসংখ্য সরাইখানা নির্মিত হইয়াছিল । গথিক শাসন আমলে যে সমস্ত শিল্প কারখানা বন্ধ হইয়া গিয়াছিল ইহুদীগণ পুনরায় সেগুলি চালু করে । উদ্বৃত্ত শিল্পসম্ভার ও কৃষিদ্রব্য রফতানী করা হইত । তৎকালীন স্পেনের বিখ্যাত বন্দর ছিল আলজাসিরা । অভ্যন্তরীণ ব্যবসা বাণিজ্য সাধারণত আফ্রিকার বন্দর তাঞ্জিয়ারের মাধ্যমে সম্পন্ন হইত ।

সেনাবাহিনী সংগঠন: আমীরী শাসন আমলে সাধারণত স্পেনে সেনাবাহিনীর চাহিদা ও প্রয়োজনের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া হইত । সেনাবাহিনী গঠিত হইত গোত্রীয় ভিত্তিতে । অশ্বারোহী ও পদাতিক এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল সেনাবাহিনী । আরব, বার্বার এবং পরবর্তীকালে নও-মুসলিমদের সমন্বয়ে এই সেনাবাহিনী গঠিত হইয়াছিল । সেনাবিভাগে তিন জন সেনাপ্রধান থাকিত । পদাতিক বাহিনী প্রধান (সাহিবুর রেজাল), অশ্বারোহী সেনাপ্রধান (সাহিবুল খারেল) ও পতাকাবাহী (আলম বরদার) সেনাপ্রধান । ইহাদের মধ্যে একজন প্রধান সেনাপতি (সিপাহসালার) ছিলেন, যিনি গোত্রীয় প্রধান অথবা জায়গীরদার অথবা তাহার মনোনীত ব্যক্তি হইতেন । সম্মিলিত বাহিনীপ্রধান নির্বাচিত হইতেন আমীর স্বয়ং অথবা তাহার মনোনীত ব্যক্তি । সেনাবাহিনীর ছাওনী ও ক্যাম্পে শান্তি রক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি সর্বদা আরব ও বার্বারদের বংশ গৌরবের প্রতি দৃষ্টি রাখিতেন । জেহাদের আদর্শের প্রতি উপেক্ষা এবং গানিমতের প্রতি অত্যধিক লোভ যুদ্ধের ময়দানে মুসলমানদের জন্য সময় সময় ক্ষতিকর প্রমাণিত হইয়াছে এবং বিপর্যয় ডাকিয়া আনিয়াছে । বিশেষ করিয়া ফ্রান্সের যুদ্ধের সময় ইহাতে খুবই ক্ষতি সাধিত হয় । কর্ডোভাতে নিয়মিত বেতনভোগী সার্বক্ষণিক সেনাবাহিনী ছিল খুব সামান্য । অনিয়মিত সেনা সেই সময় শুধু গানিমত ও রেশন পাইত । যুদ্ধে সৈন্যদের মৃত্যু হইলে তাহাদের উপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করিতেন মৃতসেনা যে উপজাতির অন্তর্ভুক্ত ছিল, সেই উপজাতির প্রধান । সীমান্ত প্রদেশের গভর্নরদের সেনাবাহিনী পরিচালনার বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হইত । দূরবর্তী ফাঁড়ি ও দুর্গে নিয়মিত সেনাদের শৃঙ্খলাবোধ ও যথাযোগ্য সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হইত ।

সমাজ জীবন: মুসলিম-স্পেনের প্রজাকুল ছিলেন অমুসলিম, নব-মুসলিম ও মুসলমানদের সমন্বয়ে গঠিত । ইসলাম রাষ্ট্রীয় ধর্ম হওয়ায় মুসলমানরা বিশেষ সুবিধা ভোগ করিত । আরব ও বার্বার বিজয়ীরা স্পেনকে তাহাদের নিজস্ব দেশ হিসাবে গড়িয়া তোলে । তাহারা সেখানে বসতি স্থাপন করে, নিজস্ব গ্রাম ও শহরে হাট-বাজার প্রতিষ্ঠা করে, একই গোত্রীয় লোকদের দ্বারা এক একটি গ্রাম অথবা মহল্লা গড়িয়া ওঠে । তাহারা তাহাদের আরব ও সিরিয়ায় অবস্থিত পুরাতন বসতির সহিত মিল রাখিয়া নব প্রতিষ্ঠিত এলাকার নামকরণ করিত । প্রতিটি মসজিদের পার্শ্বে মাদ্রাসা গড়িয়া উঠিয়াছিল এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকেই সরকারি জমি প্রদান করা হইত । সামাহ বিন মালিক আল খাওলানী তাহার দরবারে উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তিদের (পণ্ডিতকে) আহবান জানান । ধর্মীয় শিক্ষা চালু ছিল । তথাপি মুসলিম সমাজ বার্বার ও আরবদের সাংস্কৃতিক ধারায় গড়িয়া উঠিয়াছিল । আরব ও বার্বারদের গোত্রীয় প্রীতি এত তীব্র ছিল যে ইসলামী আদর্শ ও শিক্ষার উপর ভিত্তি করিয়া গড়িয়া ওঠা সমাজ ব্যবস্থা পরিবর্তনের কথা কল্পনাই করা যাইত না । তাহাদের মধ্যে মতানৈক্য এমন প্রবল ছিল যে, আরব ও বার্বারদের জন্য পৃথক মসজিদ ও মাদ্রাসা ছিল ।

আরব ও বার্বারদের মধ্যে সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক বৈষম্য থাকা সত্ত্বেও তাহারা স্পেনের নব-মুসলমান ইহুদী ও খ্রীস্টানদের সহিত ব্যবহারে সহিষ্ণুতার পরিচয় দিত । স্পেন বিজয়ে মুসলমানদের সাহায্য ও সহযোগিতা করার প্রতিদান স্বরূপ ইহুদীগণ বিশেষ সুযোগ ও সুবিধা ভোগ করিত । তাহাদিগকে বিভিন্ন নগরে পুনর্বাসন করা হয় এবং অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয় । খ্রীস্টানদের মধ্য হইতে যাহারা মুসলিম অভিযানে বাধার সৃষ্টি করে, তাহারা যুদ্ধের সময় ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হয় । যাহারা যুদ্ধ চলার সময়ে আত্মসমর্পণ করিত, বিজয়ী মুসলমান ও তাহাদের মধ্যে সুবিধাজনক শর্তে চুক্তি সম্পাদিত হইত । চুক্তিরশর্ত পরবর্তীকালে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্র ব্যতীত অক্ষরে অক্ষরে পালিত হয় । নির্দিষ্ট ক্ষেত্র ব্যতীত খ্রীস্টানদের নাগরিক অধিকার দেওয়া হয় । তাহারা ধর্মীয় স্বাধীনতাসহ সম্মানের সহিত জীবন যাপন করিত । সাধারণ মুসলমান তাহাদের সহিত মিলিয়া মিশিয়া জীবন যাপন করিত এবং তাহাদের কন্যাদের সহিত বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হইত । যদিও মুসলমান কন্যাদের সহিত খ্রীস্টানদের বিবাহ হইত না । গীর্জাসমূহ পরিচালনার জন্য আইন কানুন রচনা করা হইয়াছিল । স্পেনে চার্চ পরিচালনা পরিষদের প্রধান ছিলেন টলেডোর প্রধান গীর্জার পোপ । গীর্জা পরিচালনা পরিষদকে সভা অনুষ্ঠানের অনুমতি দেওয়া হইত । যদিও ধর্ম প্রচারের সুযোগ হইতে তাহাদিগকে বঞ্চিত করা হইয়াছিল । মুসলমানদের সহিষ্ণুতার দরুন গৃহযুদ্ধের সময়ও খ্রীস্টানগণ নিরাপদে ছিল । কিন্তু খ্রীস্টানরা মুসলমানদের এই সহিষ্ণুতার সুযোগ গ্রহণ করিয়া সংঘবদ্ধ হয় এবং দেশের উত্তরাংশে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করিয়া ইহাকে উত্তর-পূর্বে মুসলিম বিজিত এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত করে ।

ইসলামী রাষ্ট্রে নব মুসলিমগণ যে সমস্ত সুযোগ সুবিধা ভোগ করিবার আশা করিয়াছিল উহা হইতে তাহারা বঞ্চিত হয় । সামাজিক ন্যায় বিচার হইতে আরব ও বার্বারগণ তাহাদিগকে বঞ্চিত করে । ইসলামের প্রতি নব মুসলমানদের আনুগত্যকে সন্দেহের চোখে দেখা হইত । গথশাসন আমলে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ স্পেনীয়দের দাস ও দাসপুত্র বলিয়া ঘৃণা করা হইত । পরবর্তীকালে অন্যান্য নব মুসলমানদিগকেও এই নামে অভিহিত করা হয় । আরব ও বার্বারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মাধ্যমে তাহাদের এই অসন্তুষ্টির বহিঃপ্রকাশ ঘটে । নব মুসলিমগণ বিজয়ী মুসলমানগণের জাতীয়তা বোধ (আসাবিয়াহ) এবং ইসলামী আদর্শের ও শিক্ষার অভাবে গভর্নর শাসন আমলে ইসলামের আদর্শ প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক জীবনে উহা ব্যবহারের খুব কম সময় ও সুযোগ পায় । সরকার কর্তৃক অত্যাচারিত ও নির্যাতিত হওয়ার প্রমাণও পাওয়া যায় । সেভিল ও অন্যান্য শহরে সরকারী সাহায্যে তাহাদের জন্য মাদ্রাসা ও মসজিদ নির্মিত হয় । ব্যবসা, কৃষি ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাহাদের সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয় । তাহারা ক্ষেত খামারে কৃষক ও শিল্পকারখানায় শ্রমিকের ন্যায় কাজ করিত । কিন্তু তাহাদিগকে পদস্থ সরকারী পদে নিয়োগ করা হইত না । স্বৈরতন্ত্র ও স্বেচ্ছাচারের সেই যুগে ইহা কেহ আশাও করিতে পারেনা । বিশেষ করিয়া স্পেনের শাসন ব্যবস্থায় যখন সামরিক ও গোত্রীয় শক্তির প্রভাব ছিল প্রবল । এমন কি এই সময় স্পেন বিজয়ে আরবদের সহিত অংশ গ্রহণকারী বার্বারগণ পর্যন্ত আরবদের সমান অধিকার ভোগ করিতে পারিত না । তাহাদের সমধর্মাবলম্বী গথ শাসনামল অপেক্ষা ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর নিঃসন্দেহে তাহাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি সাধিত হয় । একের পর এক দুর্ভিক্ষ ও অনাবৃষ্টি, বিভিন্ন বিদ্রোহে ইন্ধন যোগায় এবং উপর্যুপরি খ্রীস্টান আক্রমণ পরিবর্তন আকাঙ্খী জনগণের মধ্যে অসন্তুষ্টির সৃষ্টি করে । বার্বার ও নবমুসলিমগণ আরব শাসনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হইয়া পুরাতন প্রভুর স্থলে নতুন প্রভুকে স্বাগতম জানায় । স্পেনের উমাইয়া মাওয়ালী ও স্বাধীনতাপ্রাপ্ত ক্রীতদাসগণ ছিল আবদুর রহমানের সমর্থক । সর্বপরি আবদুর রহমান নিজে ছিলেন একজন সুযোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি । তিনি জানিতেন কিরূপে সুযোগের সদ্ব্যবহার করিতে হয় । ইউসুফ স্পেনের শাসনকর্তা হইলেও প্রকৃতপক্ষে দেশ শাসন করিতেন সুমাইল । ৭৫৫ খ্রীস্টাব্দের শেষ পর্যায়ে দেশের উত্তরাঞ্চলের সহিত সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং এই সম্পর্ক এমন স্তরে পৌঁছে যে আফ্রিকা হইতে আবদুর রহমানকে আহবানের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে তিনি অবহিত থাকা সত্ত্বেও ইউসুফের নিকট উহা গোপন রাখেন । যাহার ফলে ইউসুফের পতন ঘটে ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px