📄 কোরাইশ ও সিরীয়দের যুদ্ধ
সুমাইলের আধিপত্য হইতে মুক্তি লাভের উদ্দেশ্যে ৭৫০ খ্রীস্টাব্দে ইউসুফ তাহাকে সারাগোসার গভর্নর নিযুক্ত করেন । সারাগোসার অধিকাংশ বাসিন্দা ছিল রসুলের সাহাবী মুসয়ার বিন উমাইয়েরের বংশধর । কর্ডোভার আমীর আবদারী এবং সারাগোসার ইয়ামানী নেতা হুবাব জাহরী, কুরাইশ নেতা সুমাইল, ইউসুফের বিরুদ্ধে আব্বাসীদের পক্ষ অবলম্বন করেন । বার্বার এবং ইয়ামানী সৈন্যদের এক বিরাট বাহিনী সংগ্রহ করিয়া তাহারা সুমাইলের প্রেরিত সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে এবং ৭৫৩/৪ খ্রীঃ সারাগোসা অবরোধ করে । সুমাইলকে সাহায্য করিতে ইউসুফ ব্যর্থ হন । জনৈক কালবী সর্দার উবাইয়েদ ১৯ তিনশত ষাটজন অশ্বারোহী সৈন্য সংগ্রহ করেন এবং বানুকাব নেতা ইবনে শিহাব ২০ সমভিব্যাহারে সুলায়মানের সাহায্যে অগ্রসর হন । যাত্রা পথে চারশত মুজার তাহাদের সহিত যোগদান করে । নতুন সৈন্যের আগমনে আমীর এবং হুবাব অবরোধ প্রত্যাহার করিয়া ৭৫৫ খ্রীস্টাব্দের ২১ প্রথম দিকে পলায়ন করেন ।
টিকাঃ
১৯। ডজি, প্রাগুক্ত, পৃঃ ৪১০।
২০। রিয়াসত আলী, প্রাগুক্ত, পৃঃ ২১১।
২১। ডজি, প্রাগুক্ত, পৃঃ ১৫৮-৬০।
📄 নব মুসলিমগণ
চতুর্থ এবং শেষদল যাহারা গৃহযুদ্ধের সহিত জড়িত ছিল তাহারা হইল নব মুসলীমগণ (মুয়াল্লাদুন) তাহারা ছিল স্পেনে সংখ্যাগরিষ্ঠ । তাহারা অধিকাংশই ছিল দেশের অভ্যন্তরের কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, কারিকর ও শ্রমজীবী । বিজয়ীরা সাধারণত স্পেনীয়দের ধর্মান্তরে উৎসাহিত করিতেন না । কারণ ইহাতে কোষাগার ক্ষতিগ্রস্ত হইত । নব মুসলমানগণ আরব ও বার্বারদের ঘৃণা করিত । প্রথম দলকে তাহাদের অহঙ্কারের জন্য, আর শেষোক্ত দলকে তাহাদের অসভ্য ও কঠোর কর্কশ ব্যবহারের জন্য । দেশের প্রধান শহরের ধর্মান্তরিত মুসলমানগণ ছিলেন ধনী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের । ৭৫০ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত একজন অনারব ছিল অপর একজন আরবের আশ্রিত । বৃত্তিভোগের ব্যাপারে মুসলিম রাষ্ট্রে একজন আশ্রিত ব্যক্তি একজন আরবের তুলনায় কম বৃত্তি পাইত । এই ব্যবস্থা মুসলমানদের মধ্যে বিশেষ করিয়া স্পেনীয় মুসলমানদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে । গোঁড়া খ্রীস্টানগণ স্পেনীয় মুসলমানদের ঘৃণা করিত এবং স্বধর্মত্যাগী বলিয়া সম্বোধন করিত । খ্রীস্টান এবং দেশীয় মুসলমানদের সহিত বিবাহ প্রচলিত ছিল । নব মুসলমানের কোন শিশু জন্মগ্রহণ করলে সে মুয়াল্লাদ বলিয়া পরিচিত হইত । পার্সীয়ানদের ন্যায় নব মুসলমানগণকেও আরব এবং বার্বারগণ ঘৃণা করিত এবং তাহাদিগকে দাসপুত্র বলিয়া ডাকিত । তাহাদিগকে সব সময় গুরুত্বপূর্ণ সরকারী চাকুরী প্রদান করা হইত না ফলে তাহারা আরব শাসনের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে ও পরবর্তীকালে আরব শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হইয়া ওঠে এবং অধিক স্বায়ত্তশাসনের দাবী উত্থাপন করে । আরব প্রাধান্যকে খর্ব করিবার জন্য তাহারা বিভিন্ন দলে যোগদান করিতে শুরু করে । ইহার ফলে স্পেনে মতবিরোধের আর একটি সূত্রপাত ঘটে । বিভিন্ন দলকে একত্র করা এবং দেশের মধ্যে শান্তি স্থাপন করা সত্যই দুরূহ ব্যাপার ছিল । দামেস্কের উমাইয়া খলিফা শান্তি প্রতিষ্ঠা করিতে ব্যর্থ হন । সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন (৭৩২-৭৫৫ খ্রীঃ) চলাকালীন প্রায় পঞ্চাশ জন গভর্নর একের পর এক স্পেনের শাসন কার্যে নিযুক্ত হন । এই দ্রুত আগমন ও নির্গমনে তাহারা অতি সামান্য সময়ই দেশের বিশৃঙ্খল অবস্থার উন্নতি বিধানে ব্যয় করিতে সমর্থ হন । গৃহবিবাদ এবং আস্তুরিয়ার প্রথম আল ফন্সোর চাপে উত্তর-পশ্চিম উপদ্বীপের প্রায় এক চতুর্থাংশ স্থান মুসলমানদের হস্তচ্যুত হয় ।
📄 ফ্রান্স হইতে মুসলমান উৎখাত
ইউসুফ যখন অভ্যন্তরীণ শত্রু দমনে ব্যস্ত ছিলেন, সেই সময় চার্লস মার্টেলের উত্তরাধিকারী এবং পুত্র পেপিন ৭৫৫ খ্রীস্টাব্দে ফ্রান্সের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় প্রবেশ করে । ফরাসীগণ মুসলিম নগরী আগদে, বেজিয়ার্স, লডেভ এবং অন্যান্য শহর ধ্বংস করে এবং মুসলিম আবাল বৃদ্ধ বণিতা এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মুসলমানকে হত্যা করে । তাহারা হাসপাতাল, স্কুল এবং মসজিদে অগ্নি সংযোগ করে । কয়েক বৎসর গোলযোগপূর্ণ সময়ে উত্তর স্পেনের পর্বতসঙ্কুল এলাকা হইতে মুসলমানদিগকে প্রত্যাহার করা হয় । এই দুর্গম এলাকায় খ্রীস্টানগণ নিজেদের দৃঢ়ভাবে সুরক্ষিত করিয়াছিল এবং সেখান হইতে মুসলিম স্পেনে পরবর্তীকালে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে । মুসলমানরা যখন গৃহযুদ্ধে ব্যাপৃত সেই সময় পিলাইও আস্তুরিয়া সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং চালর্স মার্টেল ও তাহার উত্তরাধিকারিগণ ফ্রান্সের মুসলমানদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে ।
📄 ফ্রান্স হইতে মুসলমানদের উৎখাতের কারণসমূহ
১ । আবদুর রহমান আল-গাফিকীর পর অন্য কোন যোগ্য গভর্নর তাহার স্থলাভিষিক্ত না হওয়ার দরুন আরব এবং বার্বারদের মধ্যে গোত্রীয় বিদ্বেষ দেখা দেয়, ফলে উভয় সম্প্রদায়ই হিংস্র হইয়া ওঠে ।
২ । উমাইয়া খিলাফতের সময় কেন্দ্রীয় প্রশাসন-যন্ত্রের দুর্বলতা, আফ্রিকার ভাইসরয় কর্তৃক পুনঃ পুনঃ গভর্নর পরিবর্তন এবং গভর্নররা খলিফা কর্তৃক প্রত্যক্ষ নির্বাচিত না হওয়ায় খলিফার প্রতি গভর্নরগণ সামান্যই শ্রদ্ধাশীল ছিল ।
৩ । আরব, বার্বার, সিরীয়, এবং নব মুসলিমদের মধ্যে অনৈক্য ও শৃঙ্খলাবোধ হীনতা, অসন্তোষ ও বিদ্বেষ গৃহযুদ্ধের জন্ম দেয় । অধিকাংশ সময় এই বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত থাকায় তাঁরা রাজ্য বিস্তার ও দেশের প্রশাসন কাজে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিতে পারেন নাই ।
৪ । দক্ষিণ ফ্রান্সে নিয়োজিত জেনারেলদের কর্তব্যে অবহেলা, যেমন-স্পেনের গৃহযুদ্ধে অংশ গ্রহণের পরিবর্তে নারবোনের কমান্ডার স্থান পরিত্যাগ করেন ।
৫ । দুর্গম পার্বত্য এলাকা, যেমন- স্পেন হইতে ফ্রান্সকে পৃথককারী গিরিমালাসমূহ । ইহা দুই দেশের মধ্যে প্রাকৃতিক সীমা হিসাবে কাজ করে । সামান্য কয়টি গিরিপথ ব্যতীত এইগুলি বৎসরের অধিকাংশ সময়ই বরফাবৃত থাকিত । মেসেতার উচ্চ মালভূমি সহজে সৈন্য পরিচালনা এবং সড়ক পথে যোগাযোগের জন্য ছিল বিরাট বাধা । সর্বোপরি মধ্যফ্রান্সের আবহাওয়া, ভূমধ্যসাগরীয় আবহাওয়ায় অভ্যস্ত বার্বার এবং সিরীয়দের জন্য ছিল সম্পূর্ণ অসহ্য ।
৬ । গৃহযুদ্ধ নৌবাহিনীর উন্নয়ন সাধন এবং ফ্রান্সের নতুন ভূমি দখলে বাধার সৃষ্টি করে । ফলে ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্বে নারবোনের মুসলিম সেনাঘাটি প্রাচ্যের অনুরূপ বসরা, কুফা এবং ফুসতাতের ন্যায় শক্তিশালী হইতে পারে নাই ।
৭ । কর্ডোভা এবং কায়রোওয়ানই একমাত্র জায়গা যেখান হইতে যুদ্ধের সময়ে ফ্রান্সে অবস্থিত সৈন্যগণ অতিরিক্ত সৈন্য ও রসদ পাইতে পারিত-কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্র হইতে উহা ছিল বহুদূরে অবস্থিত । ফলে অতিরিক্ত সৈন্য ও রসদ সরবরাহে নিরাশ হইয়া ফ্রান্সের যুদ্ধে মুসলিম সেনাগণ পরাজয়ের সম্মুখীন হয় । শত্রু সৈন্যদের প্রদত্ত সুযোগে মুসলিম সেনাবাহিনী পশ্চাদপসারণের সুযোগ লাভ করে । অন্যথায় অগণিত সৈন্য নৃশংসভাবে নিহত হইত । এই সমস্ত অসুবিধা, নিজেদের আত্মকলহ ও বিদ্বেষ এবং শৃঙ্খলা বোধহীনতার কারণে মুসলমানরা বহুবার ফ্রান্সে তাহাদের অধিকার ত্যাগ করিতে বাধ্য হন । তাহারা একমাত্র নারবোনকে ২২ অধিকারে রাখিতে পারিত কিন্তু তাহাও প্রথম আবদুর রহমানের সময়ে ফরাসীগণ দখল করিয়া নেয় ।
টিকাঃ
২২। শেরওয়ানী হারুন খান, মুসলিম কলোনিজ ইন ফ্রান্স, নর্দান ইটালী এ্যান্ড সুইজারল্যান্ড, লাহোর, ১৯৬৪ পৃঃ ১২৯-১৭৯।