📄 মদীনাবাসী ও সিরীয়বাসীদের যুদ্ধ
স্পেন ত্যাগের প্রশ্নে কাইসী সম্প্রদায়ভুক্ত সিরীয়দের সম্মুখে সমস্যা দেখা দেয় । কালবী সম্প্রদায়ভুক্ত গভর্নর আবদুল মালিক তাহাদের যাতায়াতের সুব্যবস্থা না করিয়াই তাহাদিগকে সিউটাতে নির্বাসন দিতে ইচ্ছা করেন । কাইসী ও কালবী সম্প্রদায় আধুনিক রাজনৈতিক দলের ন্যায় কার্য পরিচালনা করিত । সিরীয়রা সীমাহীন অধিকার ও ক্ষমতা ভোগ করিত এবং তাহারা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী । আবদুল মালিকের আদেশ অমান্য করিয়া তাহারা কর্ডোভা অভিমুখে অগ্রসর হয় এবং আবদুল মালিককে সিংহাসনচ্যুত করিয়া তাহারা বালজ ইবনে বিশরকে ৭৪১ খ্রীস্টাব্দের ২০শে ডিসেম্বর স্পেনের গভর্নর বলিয়া ঘোষণা করে । সিরীয় জামিনদের মুক্তি দেওয়া হয় এবং আবদুল মালিককে কর্ডোভার আবি আইউব প্রসাদের বাহিরে আনিয়া হত্যা করা হয় । মদীনাবাসী ও সিরীয়বাসীদের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয় । মদীনাবাসীদের নেতৃত্ব প্রদান করেন আবদুল মালিকের পুত্র উমাইয়া ও কুতন এবং তাহাদের সাহায্য করে লাখখী সম্প্রদায়ভুক্ত আবদুর রহমান বিন হাবিব আল ফিহরী । মদীনাবাসীদের সৈন্য সংখ্যা ছিল ৪০,০০০ ভিন্নমতে ১,০০০০০ লক্ষ । ১৫ অপরদিকে সিরীয়গণ ১২,০০০ হাজারের অধিক সৈন্য সংগ্রহ করিতে ব্যর্থ হয় । নারবোনে নিযুক্ত কমান্ডার্স নারবোন ত্যাগ করিয়া আবদুল মালিক ও তাঁর পুত্রদের পক্ষে গভর্নর আবদুর রহমান আলকাসাহর নেতৃত্বে গৃহযুদ্ধে যোগদানের জন্য আগমন করে । ৭৪২ খ্রীস্টাব্দে আগস্ট মাসে কর্ডোভার নিকট ডালবাহতে যুদ্ধ সংঘটিত হয় । এই যুদ্ধে মদীনাবাসী পরাজয় বরণ করে এবং ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় । মদীনাবাসীদের পক্ষে ১০,০০০ হাজার সৈন্য নিহত হয় । অপরপক্ষে সিরীয় সৈন্য নিহত হয় ১,০০০ হাজার এবং তাহারা কর্ডোভা পুনর্দখল করে । ১৬ গুরুতর আহত বালজের মৃত্যুর কিছুদিন পর থালাবাহ বিন ছালমাহ আল-আমিলী নামক জনৈক সিরীয়কে স্পেনের গভর্নর বলিয়া ঘোষণা করা হয় । মুজারীদের প্রতি থালাবা বিন ছালমার পক্ষপাতিত্বের দরুন ইয়ারুন বাজেরু বিদ্রোহী হইয়া ওঠে এবং তাহারা বার্বার ও নওমুসলিমদের সহিত যোগদান করে ।
থালাবা বিন ছালামাহ ঈদের দিন মদীনাবাসী ও বার্বারদের মেরিদাতে আক্রমণ করিয়া পরাজিত করেন । নেতাদের সহ নারী ও শিশুদের প্রায় ১০,০০০ হাজার জনকে ক্রীতদাস হিসাবে বিক্রি করা হয় । ৭৪৩ খ্রীস্টাব্দের মে মাসের এক শুক্রবারে তাহাদিগকে নামমাত্র মূল্যে বিক্রয় করা হয় । শত্রু নিশ্চিহ্ন হইলেও তাহার শাসন মেরিদা এবং কর্ডোভার বাহিরে প্রসার লাভ করিতে পারে নাই । গৃহযুদ্ধ চলিতে থাকে এবং প্রশাসন যন্ত্র প্রায় ভাঙ্গিয়া পড়ে ।
টিকাঃ
১৫। ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ১৪৪।
১৬। ইবন ইজারী, বেয়ান, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৩৩-৩৪, ৪৮-৪৯ দেখুন।
📄 আবুল খাত্তার
আন্দালুসীয়ার জনগণ অত্যাচার ও গৃহযুদ্ধের দরুন হাঁফাইয়া ওঠে । তাহাদের অনুরোধে আবুল খাত্তার নামে পরিচিত কালবী গোত্রের হুসাম বিন দিরার (৭৪৩-৪৫ খ্রীঃ) স্পেনের গভর্নর নিযুক্ত হন । আফ্রিকার ভাইসরয় হানজালাহ বিন সাফওয়ান কালবী রজব ১২৫ হিঃ/ ৭৪৩ খ্রীঃ কুতন ও উমাইয়াসহ ১০,০০০ হাজার আরব যুদ্ধবন্দীকে মুক্তি দেন । তিনি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী সিরীয়দের রাজধানী হইতে বিতাড়িত করেন । থালাবাহসহ এক ডজন দাঙ্গাবাজ গোত্রীয় নেতাকে আফ্রিকায় নির্বাসিত করা হয় । সিরীয়দের মধ্যে জায়গীর হিসাবে সরকারী জমি প্রদত্ত হয় । কিন্তু জমিতে তাহাদের কোন স্বত্ব দেওয়া হয় না । ১৭ বিরোধী দলগুলিকে দেশের বিভিন্ন অংশে বিচ্ছিন্ন করিয়া দিয়া আবুল খাত্তার দেশের অভ্যন্তরে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন, যদিও ইহা ছিল খুবই সাময়িক ব্যাপার । ইয়ামানী শিয়াদের প্রতি তাহার পক্ষপাতিত্ব সুন্নী মুজারীদিগকে বিদ্বেষ ভাবাপন্ন করিয়া তোলে, ফলে এক নতুন বিদ্রোহ দেখা দেয় ।
টিকাঃ
১৭। ইবনুল আছির, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ২৮৬-৮৭; আখবার মাজমুয়া, পৃঃ ৫৭।
📄 ইয়ামানী শিয়া এবং সিরীয় সুন্নীদের মধ্যে যুদ্ধ
স্পেনের গভর্নরদের ন্যায় উমাইয়া খলিফারা স্বৈরাচারী ছিলেন না । তারা শাসন কার্যে স্থানীয় আরবদের মতামতের গুরুত্ব প্রদান করিতেন । পরিণামে যখন খলিফারা দুর্বল হইয়া পড়ে প্রভাবশালী আরব নেতারা শাসন পরিচালনায় তাহাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিযোগিতা শুরু করে । ইহার ফলে পুরাতন গোত্রীয় বিদ্বেষ মাথা চাড়া দিয়া ওঠে । সুমাইল বিন হাতিম ছিল কাইসী গোত্রের প্রধান । আবুল খাত্তারের বিরুদ্ধে সে ব্যক্তিগত ঘৃণা পোষণ করিত । সুমাইল জুজামী এবং লাক্ষ্মী নামে দুই ইয়ামানী উপজাতীয় দলকে গভর্নরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে উত্তেজিত করে । তাহাদের সম্মিলিত বাহিনী জুজামী নেতা ও ছালাবাহ বিন ছালামাহর নেতৃত্বে রাজকীয় বাহিনীকে গোয়াদালেট নদীর তীরে পরাজিত করিয়া গভর্নর আবুল খাত্তারকে বন্দী করে । কালবী নেতা আবদুর রহমান ইবনে নুয়াইম তাহাকে মুক্তি প্রদান করেন । আবুল খাত্তার পুনরায় তাঁহার লোকদের একত্রিত করিতে চেষ্টা করিয়া অকৃতকার্য হন । মুজারীগণ ছালাবাহ বিন ছালামাহকে স্পেনের গভর্নর নির্বাচিত করেন । সুমাইলের হাতের পুতুল হিসাবে তিনি শুধু ছয়মাস গভর্নর হিসাবে স্পেনের শাসনকার্য পরিচালনা করেন । তাহার মৃত্যুর পর (শাবান ১২৯ হিঃ/ ৭৪৭ খ্রীঃ) সুমাইল গভর্নর না হইয়া এইপদ নারবোন ও বার্সিলোনার সেনাপতি ইউসুফ বিন আবদুর রহমান আল ফিহরীকে প্রদান করেন ৭৪৭ খ্রীস্টাব্দে । আল কায়রোওয়ানের প্রতিষ্ঠাতা উকবা ইবনে নাফির বংশধর ছিলেন ইউসুফ । গোত্রীয় প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার জন্য গৃহযুদ্ধ চলার সময়ে এবং পরবর্তীকালে সুমাইল তাঁহার ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ করেন এবং শান্তিপ্রিয় ইউসুফ দেশের শান্তি ও নিরাপত্তার খাতিরে গভর্নরের পদ গ্রহণ করতে রাজী হন ।
📄 সেকুন্দার যুদ্ধ
ছালাবাহ বিন ছালামাহর পুত্র নিগ্রো আমর সুমাইল অসন্তুষ্ট হইয়া আবুল খাত্তার এবং ইয়াহিয়া বিন হুরাইছ আল জুজামীর সহিত যোগদান করেন । যেহেতু শেষোক্ত গোত্রীয় আবুল খাত্তারের গোত্র হইতে সংখ্যায় বেশি ছিলেন সেইহেতু ইবনে হুরাইছ সম্মিলিত সেনাবাহিনীর নেতা নির্বাচিত হন । গোয়াদালকুইভিরের বাম তীরে দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয় । মুজারী এবং ইয়ামানী দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দল শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে প্রতি এক বছর পর পালাক্রমে এক একজন গোত্রীয় নেতা দেশ শাসন করিবে । ১৮ ৭৪৭ খ্রীস্টাব্দে প্রথম বৎসরে ইউসুফ দেশ শাসনের জন্য নির্বাচিত হন । এক বৎসর অতিবাহিত হইবার পর সুমাইল ইয়ামানী এবং ইউসুফের নিজের প্রতিবাদ সত্ত্বেও ইয়ামানী প্রতিনিধিকে ইউসুফের স্থলাভিষিক্ত করিতে ব্যর্থ হন । পুনরায় দুই পক্ষের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয় । এক সপ্তাহ স্থায়ী এই যুদ্ধ কর্ডোভার বিপরীত দিকে শাকুন্দাহর (সেকুন্দা) নিকট গোয়াদালকুইভিরে সংঘটিত হয় । সুমাইলের অনুরোধে ইউসুফ কর্ডোভার সাধারণ দোকানদারকে পর্যন্ত এই যুদ্ধে অংশ গ্রহণের আহবান জানান । ইউসুফ এবং সুমাইল বিজয় লাভ করেন এবং শত্রুরা চিরতরে নির্মূল ও ছিন্নভিন্ন হইয়া যায় । আবুল খাত্তার এবং ইবনে হুরাইস ধৃত ও নিহত হন । ইয়ামানীদের বিদ্রোহ দমন করা হয় । ৭৪৯ খ্রীস্টাব্দে স্পেনে তীব্র খাদ্যাভাব দেখা দেয় ফলে প্রথম আলফন্সোর রাজ্যবিস্তার বাধাপ্রাপ্ত হয় । মুসলমানরা গৃহযুদ্ধে লিপ্ত থাকায় তিনি লিওন, ক্যাস্টাইল এবং অন্যান্য জায়গা দখল করেন ।
টিকাঃ
১৮। রিয়াসত আলী, দ্যা তারিখ-ই-আন্দালুস, ১ম খণ্ড, পৃঃ ২১১।