📄 আস্তুরিয়া কর্তৃক নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা
আমীর আনসারের সাথে যুদ্ধে পিলাইও শোচনীয় পরাজয় বরণ করেন । তিনি ৭৩৭ খ্রীঃ অনতিকালে মৃত্যু বরণ করিলে তাহার পুত্র ফাবিলা আস্তুরীয়াদের নেতা নির্বাচিত হন এবং শিকার কালে তাঁহার মৃত্যু ঘটে । তাহার পুত্র অপ্রাপ্ত বয়স্ক বলিয়া পিলাইওর জামাতা আলকানসা ৭৩৯ খ্রীস্টাব্দে খ্রীস্টানদের নেতা নির্বাচিত হন । উকবাহ বিন হাজ্জাজের আফ্রিকায় প্রত্যাবর্তনের ফলে স্পেনে বিদ্বেষ ও মতবিরোধ বিস্তার লাভ করে । এই সুযোগে আলকানসা গ্যালিসিয়া এবং বর্তমান পর্তুগালের কিছু অংশ দখল করিয়া নিজেকে গ্যালিসিয়া এবং আস্তুরিয়ার রাজা বলিয়া ঘোষণা করেন । এই সুযোগে তিনি উত্তর-পশ্চিমে নিরাপদে থাকিয়া স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন ।
📄 বার্বার বিদ্বেষ ও বিদ্রোহ
বার্বারদের আদি বাসস্থান ছিল আফ্রিকায় । রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দিক হইতে তাহাদের আদি দেশের সহিত গভীর সম্পর্ক বজায় ছিল । উত্তর-আফ্রিকায় কোন বার্বার অসন্তুষ্টি দেখা দিলে স্পেনের বার্বারগণ আমীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করিত । বার্বাররা স্পেনে বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করিয়াছিল । তাঁহাকে রাষ্ট্র পরিচালনায় যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া হয় নাই । মুসার অনুগত আরবরা দক্ষিণ স্পেনের সমতল উর্বরভূমি ভোগ করিত । তারিকের অনুগত বার্বারদের দেওয়া হইয়াছিল উত্তরের পাহাড়িয়া অঞ্চল এবং লা মাঞ্চা ও এস্টেরে-মাদুরার অনুর্বর ভূমি । বার্বাররা কৃষিকার্য ও মেষ পালন করিতেন । জীবন ধারণের জন্য তাহাদের একদিকে কঠিন পরিশ্রম করিতে হইত অন্যদিকে জীবন ও ইজ্জতের জন্য খ্রীস্টানদের বিরুদ্ধে সর্বদা যুদ্ধ করিতে হইত । আরবরা তাহাদের গানিমত ছিনাইয়া লইয়া, নেতাকে জেলে পুড়িয়া অপমান করিয়াছিল । ইহাতে তাহাদের মধ্যে বিদ্রোহ দেখা দেয় । এই বিদ্রোহ স্পেনের সামান্য অংশে দেখা দেওয়ায় দ্রুত দমন করা সম্ভব হয় । উসমান বিন আবু নিসাহ যাহাকে খ্রীস্টানরা মুনুসা অথবা মনুজা বলিয়া ডাকিতেন তিনি ছিলেন স্পেনে তারিকের সহিত চারজন আগমনকারীর অন্যতম । আর্কিটনের ডিউক ইউডেসের কন্যা অপরূপ সুন্দরী লামপেজিয়েকে তিনি বিবাহ করেন । গিরিমালার অপর পার্শ্বে পুইসেরদার নিকটে সেরডাগ্নেতে তিনি নিজেকে স্বাধীন বলিয়া ঘোষণা করেন । তাহার ছিল স্বল্পসংখ্যক বার্বার সমর্থক । ৭৩০ খ্রীস্টাব্দে স্পেনের গভর্নর আবদুর রহমান তাঁহার বিদ্রোহকে অতি সহজেই দমন করেন । তিনি গ্যালিসিয়ায় পলাইয়া যান কিন্তু পশ্চাদ্ধাবন করিয়া তাহাকে হত্যা করা হয় । তাহার স্ত্রী ও অন্যান্য বন্দীরা আবদুর রহমানের সমর্থকদের হাতে ধরা পড়েন । তিনি তাহাকে দামেস্কে প্রেরণ করেন । খলিফা হিশামের পুত্রের সহিত তিনি পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন ।
অধিকাংশ বার্বার ছিলেন খারিজী মতাবলম্বী । তাহারা উমাইয়া এবং আলীয়দের বিরুদ্ধাচারণ করিত । স্পেন ও আফ্রিকার ইতিহাসে এক চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী বলিয়া তাহারা পরিচিত । ওমর ইবনে আবদুল আজিজের করপ্রথা যে সমস্ত আমলারা পরিবর্তন করিয়াছিল, বার্বাররা তাহাদের ঘৃণা করিত । বৈষম্যমূলক আচরণের তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পায় । বার্বারগণ ছিল স্বাধীনতাপ্রিয় জাতি । তাহাদের বিরোধিতা পরবর্তীকালে ধর্মীয়রূপ পরিগ্রহ করে । খারিজী মতে বিশ্বাসী বার্বারগণ আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ন্যায়সঙ্গত বলিয়া বিশ্বাস করিত । নয় বৎসর ব্যাপী (৭০৪-৪২ খ্রীঃ) এই বিদ্রোহ ইফ্রিকীয়ায় শান্তি বিনষ্ট করে এবং আফ্রিকার পশ্চিমে মরক্কো হইতে কায়রোওয়ান পর্যন্ত এলাকার শান্তি ও প্রগতির পক্ষে হুমকি হইয়া দাঁড়ায় । এখন ইহা স্পেনেও বিস্তার লাভ করে । এইবার তাহারা একজন ধর্মীয় (ইমাম) নেতার অধীনে আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ সারাগোসা ব্যতীত অন্যান্য শহরে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করে । তাহারা তাহাদের সেনাবাহিনীকে তিন দলে বিভক্ত করে । প্রথম দল টলেডো অবরোধ করে, দ্বিতীয় দল অগ্রসর হয় কর্ডোভা আক্রমণের উদ্দেশ্যে এবং আল-জেসিরাস ও সিউটাকে অধিকার করিবার জন্য তৃতীয় দল নিয়োজিত হয় । আবদুল মালিক তাহাদের বিরুদ্ধে কয়েকবার অভিযান পরিচালনা করেন কিন্তু উহা প্রতিহত করা হয় । ৭৫০ খ্রীস্টাব্দে স্পেনে ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় । ফলে অসন্তুষ্ট বার্বারগণ স্পেন হইতে আফ্রিকায় আগমন করে ।
📄 স্পেনে সিরীয়বাসী
মুসার সহিত আগমনকারী আরবদের প্রথম দলটি বালাকিউন নামে পরিচিত । পরবর্তী আগমনকারীগণ সিরীয় (সামিউন) নামে খ্যাত । সিরীয়বাসীগণ আফ্রিকার মধ্য দিয়া তাহাদের নেতা বালজ ইবনে বিশর আলকুশাইরীর সহিত স্পেনে আগমন করে । খলিফা হিশাম আফ্রিকায় বার্বারদের বিদ্রোহকে দমন করিবার জন্য ৭৪১ খ্রীস্টাব্দের গ্রীষ্মকালে কুলসুম বিন আইয়াদের নেতৃত্বে ২৭,০০০ সিরীয় সৈন্য প্রেরণ করেন । ১৩ গোত্রীয় বিদ্বেষ এবং হেজাজ ও মদীনাবাসীদের প্রতি সিরীয়বাসীদের ঘৃণার কারণে সিরীয়গণ সেবু নদীর তীরে বাকদুরার যুদ্ধে পরাজিত হয় । বালজ ইবনে বিশরের নেতৃত্বে ৭০০০ সৈন্যের একটি দল মূল সেনাদল হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া সিউটাতে আশ্রয় গ্রহণ করে । তাহারা পাঁচ ছয়বার বার্বারদের আক্রমণকে সাফল্যের সহিত প্রতিহত করে । বার্বারগণ শহরের সরবরাহকে বিচ্ছিন্ন করিয়া রাখে । সিরীয়গণ স্পেনে গমনের চেষ্টা করে । ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়ার নেতৃত্বে সিরীয়বাসীদের হাতে হেজাজের আল-হাররাতে মদীনাবাসীদের শোচনীয় পরাজয় এবং নৃশংস হত্যাকান্ডের ঘটনা স্মরণ করিয়া স্পেনের গভর্নর আবদুল মালেক প্রথমে সিরীয়দের স্পেনে প্রবেশের বিরোধীতা করেন । পরবর্তীকালে বার্বারদের মারাত্মক বিদ্রোহে তাঁহার অস্তিত্ব বিপন্ন হইলে আবদুল মালেক এক জাহাজ বোঝাই ১৪ খাদ্য ও বস্ত্র সিরীয়দের সাহায্যে প্রেরণ করেন এবং শর্তাধীনে তাহাদিগকে সিউটা হইতে স্পেনে আসিবার অনুমতি প্রদান করেন । প্রতিদলের দশজন নেতাকে আবদুল মালেকের হস্তে জামিন হিসাবে অর্পণ করিয়া এবং বার্বার বিদ্রোহকে দমন করবার পর বার্বার আধিপত্য হইতে মুক্ত আফ্রিকার নিরাপদ অঞ্চলে প্রত্যাবর্তন করিবার শর্তে তাহারা স্পেনে প্রবেশ করে । তাহাদের আগমনে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে । কতিপয় স্পেনীয় আরবের সাহায্যে সিদনীয়া, কর্ডোভা ও টলেডোর বার্বারদিগকে পরাজিত এবং তাহাদের ধন সম্পদের বিপুল ক্ষতিসাধন করে ।
টিকাঃ
১৩। ইবন ইজারী, বেয়ান, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৯। তিনি ছিলেন বার্সিলানোর নিয়মিত ডেপুটি গভর্নর এবং তিনি ন্যারভোনের যুদ্ধে স্বীয় যোগ্যতা প্রমাণ করতে পেরেছিলেন।
১৪। ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ১৪৩; রিয়াসত আলী, তারিখ-ই-আন্দালুস, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৮১।
📄 মদীনাবাসী ও সিরীয়বাসীদের যুদ্ধ
স্পেন ত্যাগের প্রশ্নে কাইসী সম্প্রদায়ভুক্ত সিরীয়দের সম্মুখে সমস্যা দেখা দেয় । কালবী সম্প্রদায়ভুক্ত গভর্নর আবদুল মালিক তাহাদের যাতায়াতের সুব্যবস্থা না করিয়াই তাহাদিগকে সিউটাতে নির্বাসন দিতে ইচ্ছা করেন । কাইসী ও কালবী সম্প্রদায় আধুনিক রাজনৈতিক দলের ন্যায় কার্য পরিচালনা করিত । সিরীয়রা সীমাহীন অধিকার ও ক্ষমতা ভোগ করিত এবং তাহারা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী । আবদুল মালিকের আদেশ অমান্য করিয়া তাহারা কর্ডোভা অভিমুখে অগ্রসর হয় এবং আবদুল মালিককে সিংহাসনচ্যুত করিয়া তাহারা বালজ ইবনে বিশরকে ৭৪১ খ্রীস্টাব্দের ২০শে ডিসেম্বর স্পেনের গভর্নর বলিয়া ঘোষণা করে । সিরীয় জামিনদের মুক্তি দেওয়া হয় এবং আবদুল মালিককে কর্ডোভার আবি আইউব প্রসাদের বাহিরে আনিয়া হত্যা করা হয় । মদীনাবাসী ও সিরীয়বাসীদের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয় । মদীনাবাসীদের নেতৃত্ব প্রদান করেন আবদুল মালিকের পুত্র উমাইয়া ও কুতন এবং তাহাদের সাহায্য করে লাখখী সম্প্রদায়ভুক্ত আবদুর রহমান বিন হাবিব আল ফিহরী । মদীনাবাসীদের সৈন্য সংখ্যা ছিল ৪০,০০০ ভিন্নমতে ১,০০০০০ লক্ষ । ১৫ অপরদিকে সিরীয়গণ ১২,০০০ হাজারের অধিক সৈন্য সংগ্রহ করিতে ব্যর্থ হয় । নারবোনে নিযুক্ত কমান্ডার্স নারবোন ত্যাগ করিয়া আবদুল মালিক ও তাঁর পুত্রদের পক্ষে গভর্নর আবদুর রহমান আলকাসাহর নেতৃত্বে গৃহযুদ্ধে যোগদানের জন্য আগমন করে । ৭৪২ খ্রীস্টাব্দে আগস্ট মাসে কর্ডোভার নিকট ডালবাহতে যুদ্ধ সংঘটিত হয় । এই যুদ্ধে মদীনাবাসী পরাজয় বরণ করে এবং ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় । মদীনাবাসীদের পক্ষে ১০,০০০ হাজার সৈন্য নিহত হয় । অপরপক্ষে সিরীয় সৈন্য নিহত হয় ১,০০০ হাজার এবং তাহারা কর্ডোভা পুনর্দখল করে । ১৬ গুরুতর আহত বালজের মৃত্যুর কিছুদিন পর থালাবাহ বিন ছালমাহ আল-আমিলী নামক জনৈক সিরীয়কে স্পেনের গভর্নর বলিয়া ঘোষণা করা হয় । মুজারীদের প্রতি থালাবা বিন ছালমার পক্ষপাতিত্বের দরুন ইয়ারুন বাজেরু বিদ্রোহী হইয়া ওঠে এবং তাহারা বার্বার ও নওমুসলিমদের সহিত যোগদান করে ।
থালাবা বিন ছালামাহ ঈদের দিন মদীনাবাসী ও বার্বারদের মেরিদাতে আক্রমণ করিয়া পরাজিত করেন । নেতাদের সহ নারী ও শিশুদের প্রায় ১০,০০০ হাজার জনকে ক্রীতদাস হিসাবে বিক্রি করা হয় । ৭৪৩ খ্রীস্টাব্দের মে মাসের এক শুক্রবারে তাহাদিগকে নামমাত্র মূল্যে বিক্রয় করা হয় । শত্রু নিশ্চিহ্ন হইলেও তাহার শাসন মেরিদা এবং কর্ডোভার বাহিরে প্রসার লাভ করিতে পারে নাই । গৃহযুদ্ধ চলিতে থাকে এবং প্রশাসন যন্ত্র প্রায় ভাঙ্গিয়া পড়ে ।
টিকাঃ
১৫। ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ১৪৪।
১৬। ইবন ইজারী, বেয়ান, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৩৩-৩৪, ৪৮-৪৯ দেখুন।