📄 তুরস অথবা পইটিয়ার্সের যুদ্ধ
আবদুর রহমান অতঃপর উত্তর-ফ্রান্স অভিমুখে অগ্রসর হন । অসহায় ইউডেস তাহার পুরাতন শত্রু ফ্রান্সের রাজা চার্লসের সহিত মতবিরোধ দূর করিয়া তাঁহার সাহায্য প্রার্থনা করেন । চার্লস তাঁহার আহবানে সাড়া দিয়া বিরাট সৈন্যবাহিনীসহ দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হন । চার্লস এবং ইউডেস সম্পাদিত সন্ধি সম্পর্কে মুসলিম গোয়েন্দাদের ব্যর্থতায় আবদুর রহমান বিস্মিত হন । নদী এবং পাহাড়ের গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে সৈন্য মোতায়েন করিবার ফলে সামান্য সংখ্যক সৈন্য অবশিষ্ট থাকে । শৃঙ্খলা বোধহীন বার্বার সৈনিকগণ কঠোর নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও লুণ্ঠন ও বর্বরোচিত কার্যে লিপ্ত হয় । গানিমতের মালের লোভে তাহাদের কর্তব্যবোধ এবং শৃঙ্খলার কথা ভুলিয়া যায় । ইহা ব্যতীত মুসলমানদের মধ্যে গোত্রীয় কোন্দল আবার মাথাচাড়া দিয়া ওঠে । এইরূপ বিশৃঙ্খল সেনাবাহিনী লইয়া খ্রীস্টানদের সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ । রমজান ১১৪ হিঃ/৭৩২ খ্রীঃ অক্টোবর মাসে লোয়াইর নদীর তীরে সাড়ে বার মাইল উত্তর-পূর্বে অবস্থিত পইটিয়ার্সে ও তুরসের মধ্যবর্তী সমতল ভূমিতে উভয় পক্ষের সেনাদল মিলিত হয় । খণ্ডযুদ্ধে প্রায় এক সপ্তাহ অতিবাহিত হয় । ৯
এই খণ্ড যুদ্ধ চলাকালে কোন পক্ষই অপর পক্ষকে প্রকাশ্যে আক্রমণ করিতে সাহস পায়না । এই খণ্ড যুদ্ধ মুসলমানদের অনুকূলে থাকে এবং অবশেষে সাধারণ যুদ্ধ সংঘটিত হয় । যখন ফ্রান্সের পরাজয় অত্যাসন্ন সেই মুহূর্তে গানিমত সংগ্রহের জন্য মুসলিম সেনাবাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় । আবদুর রহমান শৃঙ্খলা ফিরাইয়া আনিতে চেষ্টা করিয়া ব্যর্থ হন । দশম দিবস সন্ধ্যা বেলায় যুদ্ধপরিচালনা করিবার সময় তিনি নিহত হন । ১০ নেতার মৃত্যুতে মুসলিম সেনাদের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয় । ১১ প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে তাঁহার সহযোগীদের মধ্যে সাংঘাতিক মতবিরোধ দেখা দেয় । সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হইয়া রাতের অন্ধকারে তাহারা যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে ।
পশ্চাৎ অপসারণকারী মুসলিম সেনাদের পশ্চাদ্ধাবনে ফ্রাঙ্ক সেনাবাহিনী অতিরিক্ত পরিশ্রান্ত হইয়া পড়িয়াছিল । অস্ত্রশস্ত্রসহ সম্পূর্ণ মুসলিম শিবির খ্রীস্টানদের হস্তগত হয় । চার্লস আহত মুসলমানদের হত্যা করিয়া "মারটেল হন্তা" উপাধি লাভ করেন । তিনি পুনরায় উত্তর দিকে অগ্রসর হন । কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিকের মতে, তুরসের যুদ্ধ একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা । কারণ তাহাদের মতে, ঐ যুদ্ধের ফলেই খ্রীস্টান-ইউরোপে মুসলমানদের অনুপ্রবেশ চিরতরে বন্ধ হইয়া যায় ।
ইহা সত্য যে কিছু সংখ্যক পশ্চাৎ অপসারণকারী মুসলিম পলাইয়া যায় এবং পুনরায় এই পথে ফ্রান্সে অনুপ্রবেশের চেষ্টা পরিত্যাগ করে । ওয়াদী লাক্কোর ন্যায় সমস্ত সেনাকে যুদ্ধক্ষেত্রে আনয়ন করিয়া সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করা হয় । এই যুদ্ধে চার্লস মার্টেল পরাজিত হইলে সম্পূর্ণ পশ্চিম ইউরোপের ভাগ্যবিপর্যয় ঘটিত । কারণ মুসলমানদের সম্ভাব্য আক্রমণকে প্রতিহত করিবার মত শক্তিশালী সেনা তাহাদের ছিলনা । এই যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয় ইউরোপে তাহাদের সাম্রাজ্য বিস্তারে ততটা অন্তরায় ছিল না, যতটা ছিল মুসলিম নেতাদের মধ্যে অনৈক্য, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আত্মকলহ সৃষ্টির কারণ । আরব এবং বার্বারদের জাতিগত উদাসীনতা এবং নব মুসলমানের আত্মতৃপ্তিহীনতা স্পেনের মুসলিম সমাজকে করে কলঙ্কিত । যোদ্ধা বলিয়া খ্যাত বার্বাররা অভিযোগ করে যে, তাহাদের দেওয়া হইয়াছে অনুর্বর মেসেতা এবং আরবরা ভোগ করিতেছে পূর্ব-দক্ষিণে স্পেনের উর্বর অঞ্চলসমূহ । দামেস্কের খলিফার দুর্বলতার সুযোগ লইয়া মুসলমানগণ স্পেনে সীমাহীন ক্ষমতা লাভ করে ও চরিত্রের গুণাবলী হারাইয়া ফেলে । তদুপরি মধ্যফ্রান্সের আবহাওয়া তাহাদের প্রকৃতির উপযোগী ছিল না । কারণ তাহারা আসে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল হইতে । পূর্ববিজিত এলাকায় বাকী সৈন্য মোতায়েন রাখিবার ফলে স্বল্প সংখ্যক সৈন্য দ্বারা মধ্যফ্রান্স দখলে রাখা অসম্ভব হইয়া পড়ে । ইহার পর আর আরবরা অভিযান পরিচালনা করিয়াছে বলিয়া প্রমাণ পাওয়া যায়না । মুসলমানগণ ৭৩৪ খ্রীস্টাব্দে এভিগনন অবরোধ করে এবং নয় বৎসর ধরিয়া লিওনসে লুণ্ঠন করে । ৭৫৯ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত তাহারা যুদ্ধ পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান নারবোন তাহাদের অধিকারে রাখে । চার্লস মারটেল ও তাহার উত্তরাধিকারীদের নেতৃত্বাধীনে পরিচালিত ফ্রাঙ্কদের অভিযান প্রতিহত করিবার জন্য আরবরা দক্ষিণাঞ্চলের উপজাতীয়দের সাহায্য কামনা করে ।
টিকাঃ
৯। হিট্টি, হিস্ট্রি অব দ্যা আরবস, লন্ডন ১৯৫১, পৃঃ ৫০১ ও টীকা-৩।
১০। পারেজা, ফিলিক্স এম. ইসলামোলোজিয়া, তমো-প্রথম, মাদ্রিদ, ১৯৫২-১৯৫৪, পৃঃ ১৬৩ দ্রষ্টব্য।
১১। রিয়াসত আলী, দ্যা তারিখ-ই আন্দালুস ১ম খণ্ড পৃঃ ১৮১।
📄 গৃহযুদ্ধ ও আরব গোত্রসমূহ
৭৫৬ খ্রীস্টাব্দ হইতে স্পেনের স্বাধীন ইমারত প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত মুসলমানদের মধ্যে গৃহযুদ্ধের ফল হিসাবে তাহাদের এই পরাজয়বরণ করিতে হয় । আরব, বার্বার, সিরীয়, এবং নব মুসলিমগণ পরস্পর সংঘাতে লিপ্ত ছিল । প্রথম তিন দল ছিল বিজয়ী এবং শেষোক্ত দল ছিল বিজিত । আরবরা তাহাদের পূর্বপুরুষের গোত্রীয় আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ধারাকে ত্যাগ করিতে শুরু করে । তাহারা সিরীয় ও বার্বারদের উপেক্ষা করিত এবং নওমুসলিমদের করিত ঘৃণা ।
আরব গোত্রসমূহের মধ্যে বানু আদনান, বানু হাশিম, বানু উমাইয়া, বানু মাখজুম, বানু ফিহর এবং অন্যান্য গোত্র জীবিকার উজ্জ্বল সম্ভাবনায় আন্দালুসে বসতি স্থাপন করেন । কিন্তু তাহারা এই নতুন দেশে লইয়া আসিয়াছিল তাহাদের পুরাতন কেন্দ্রীয় বিদ্বেষ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা । তাহারা মুজারী, হিমাইয়ারী (অথবা ইয়ামানী) দুই পুরাতন গোষ্ঠীর অধীনে সংগঠিত ছিল । শেষোক্ত দল ছিল শিয়া আদর্শে বিশ্বাসী এবং প্রথম দল ছিল গোঁড়া সুন্নী দলভুক্ত ।
কালবী (ইয়ামনী) এবং কাইসী (উত্তর-আরব) গোত্রদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল পুরাতন শত্রুতা । ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (মৃত ৭১৯ খ্রীঃ) এবং পরবর্তী উমাইয়া খলিফাগণ এই গোত্রীয় বিদ্বেষকে দূরিভূত করিবার জন্য কোন প্রচেষ্টাই চালান নাই । ফলে এই বিদ্বেষ দূরবর্তী প্রদেশগুলিতেও বিস্তার লাভ করে । খলিফা ইয়াজিদ বিন আবদুল মালিক, কালবী গোত্রের বিশর বিন সাফওয়ান নামে জনৈক জেনারেলকে আফ্রিকার গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত করেন । পরবর্তীকালে কালবী নেতা আনবাসাহ বিন সাহিমকে কাইসী নেতা আবদুর রহমান বিন আবদুল্লাহ আলগাফির স্থলে স্পেনের গভর্নর নিযুক্ত করেন । গাফিকীকে নিযুক্ত করেন পূর্ব-স্পেনের ডিপুটি গভর্নর । এই গোত্রীয় বিদ্বেষ ও বিরোধের ফলে স্পেনে গৃহযুদ্ধের সূচনা হয় ।
📄 আবদুল মালিক
(৭০২-০৪ খ্রীঃ) আবদুর রহমানের পর মদীনার জনৈক নেতা আবদুল মালিক স্পেনের গভর্নর নিযুক্ত হন । ৭০২ খ্রীস্টাব্দের অক্টোবর মাসে তুরসের যুদ্ধে আবদুর রহমান নিহত হন । আবদুল মালিক মুসলমান সেনাদের হৃত গৌরবকে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করিতে সক্ষম হন এবং আরবগণ নাভাররের খ্রীস্টানগণকে পরাজিত করেন । বর্ষাকালে গিরিমালা অতিক্রম করিয়া তিনি এভিগনন ও সেন্টরেমী অধিকার করেন । এই যুদ্ধের সময় জনগণের সহিত তিনি যে নিষ্ঠুর এবং নির্দয় ব্যবহার করেন তাহাতে পুরাতন বিদ্বেষ এবং বিরোধিতা আবার মাথা চাড়া দিয়া ওঠে । সেনাবাহিনীর মধ্যে এই বিদ্বেষ ও বিরোধীতা পূর্ব হইতেই বিদ্যমান ছিল । ইহারই প্রতিক্রিয়া হিসাবে ৭০৪ খ্রীস্টাব্দে তিনি পদচ্যুত হন ।
📄 উকবাহ
আফ্রিকার গভর্নর জেনারেল উবায়দুল্লাহ কর্তৃক উকবাহ বিন হাজ্জাজ সালুবী (৭০৪-৭৪০ খ্রীঃ) আবদুল মালিকের স্থলে স্পেনের গভর্নর নিযুক্ত হন । নতুন গভর্নর উকবাহ ছিলেন দয়ালু ও সুবিচারক । সর্বপ্রথম তিনি জনশিক্ষা ও সুবিচারের প্রতি গুরুত্ব দেন এবং প্রশাসনযন্ত্রকে পুনর্বিন্যাস করেন । উকবাহ ছিল একজন সুদক্ষ সেনাপতি । তাঁহার অধীনে মুসলিম বাহিনী ফ্রান্সের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে । তিনি যুদ্ধ অভিযানের জন্য সুবিধাজনক স্থানসমূহ সুরক্ষিত করেন । তিনি পিয়েডমন্ট, টরোইস চাটেআউক্সে, সেন্টপল, ডনজেরে, ভ্যালেন্স ও বারগুণ্ডি অধিকার করেন এবং মধ্যফ্রান্স অধিকার করিবার হুমকি প্রদান করেন । তিনি গ্যালিয়ার ও আস্তুরিয়াসের বিদ্রোহীদের দমন করিয়া তথায় মুসলিম উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করেন ।
চার্লস মার্টেল মার্সেলেদের আক্রমণ করায় নারবোনের ডিউক গভর্নর ইউসুফ বিন আবদুর রহমানের সাহায্য প্রার্থনা করেন । তিনি মুসলিম আধিপত্য স্বীকার করিয়া নেন । ৭০৭ খ্রীস্টাব্দে চার্লস স্পেনের মুসলমানদের অধীন করদরাজ্য প্রভেন্সকে পুনরায় আক্রমণ করেন । ইউসুফ বিন আবদুর রহমান চার্লসের খ্রীস্টান বাহিনীর মোকাবেলা করিয়া পরাজিত হন এবং প্রভেন্স হাত ছাড়া হইয়া যায় । চার্লস মার্টেল লোমবার্ডসের রাজা লিউপ্রান্ডের সাহায্য প্রার্থনা করেন । এবং বাস্কগণকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করেন । এইরূপে উকবাহকে অপ্রত্যাশিত ভাবে সুসংগঠিত বাহিনীর সম্মুখীন হইতে হয় । পোড়ামাটি নীতি গ্রহণ করিয়া ফ্রাঙ্কস লোয়ারের দক্ষিণে দেশের এক বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেন । উত্তর-আফ্রিকার বার্বার রাণী কাহিনা যেমন মুসলিম অগ্রাভিযানকে প্রতিহত করিবার উদ্দেশ্যে করিয়াছিলেন । ১২ বেজিয়ের, আগদে নিমেস এবং মাগুলোনের ন্যায় প্রসিদ্ধ শহরসমূহ সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হয় । নারবোন ও অন্যান্য কয়টি শহর মুসলমানদের অধিকারে থাকে । ৭০৯ খ্রীস্টাব্দে আফ্রিকায় রক্তক্ষয়ী বার্বার বিদ্রোহ দেখা দিলে আফ্রিকার গভর্নর জেনারেল উবায়দুল্লাহ উকবাহকে ডাকিয়া পাঠান । জানুয়ারী ৭৪১ খ্রীঃ/ হিজরী ১২৩ সফর মাসে উকবাহ দেহ ত্যাগ করেন । বার্বার এবং হেজাজী সৈনিকগণ আবদুল মালিককে পুনরায় স্পেনের গভর্নর নির্বাচিত করেন ।
টিকাঃ
১২। আমীর আলী, এ শর্ট-হিস্ট্রি অব দ্যা স্যারাসিন্স, পৃঃ ৯৮-৯৯ দ্রষ্টব্য।