📄 আবদুর রহমান আল গাফিকী
খলিফা হিশাম বিন আবদুল মালিক স্বয়ং স্পেনের প্রশাসনিক ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং আবদুর রহমান বিন আবদুল্লাহ আল-গাফিকীকে স্পেনের গভর্নর নিযুক্ত করেন ।
আল গাফিকী ছিলেন সুদক্ষ প্রশাসক ও মহান সেনাপতি । দক্ষিণ আরব ও উত্তর আরবের হিমাইয়ার এবং মুদার নামক পরস্পর বিরোধী উভয় গোত্রের নিকটেই তিনি ছিলেন প্রিয় । তিনি রাজ্যের এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্তে ভ্রমণ করিয়া দেশের ভগ্ন প্রশাসন যন্ত্র ও বিচার ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করেন । তিনি জনগণের অভিযোগের সুবিচার করেন । ইউরোপে তারিক এবং মুসার সাহসিকতাপূর্ণ কার্যকে পুনরায় আরম্ভ করিয়ার উদ্দেশ্যে তিনি সীমান্তকে সুরক্ষিত করেন । আল গাফিকী ইটালী, জার্মানী ও গ্রীক সাম্রাজ্যকে ইউরোপের মুসলিম দখলকৃত বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সহিত একত্রিত করিবার অসম্পূর্ণ কার্যকে সম্পূর্ণ করিবার উপযুক্ত ব্যক্তি বলিয়া নিজেকে মনে করিতেন । তিনি দক্ষিণ ফ্রান্সের উসমান বিন আবু নিসা নামক বার্বার নেতাকে শায়েস্তা করেন । উসমান বিন আবু নিসা আর্কিটেনের ডিউক ইউডেস-এর সহিত পারস্পরিক স্বার্থে একত্রিত হইয়া ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন । আল গাফিকী গিরি পীরেনীজের পশ্চিমে অবস্থিত অপর একটি গমনাগমনের পথ আবিষ্কার করেন এবং ৭৩২ খ্রীঃ বসন্তকালে ১,০০০০০ লক্ষ সৈন্য লইয়া এই পথে পাম্পলোনা অতিক্রম করিয়া রোনসেসভালেস গিরিপথের মধ্য দিয়া ফ্রান্সে প্রবেশ করেন । তবে এক লক্ষ সৈন্যের সংখ্যা অতিরঞ্জিত বলিয়া মনে হয় । তিনি রোন নদীর তীরে অবস্থিত আর্লেস আক্রমণ করিয়া তুমুল যুদ্ধের পর অধিকার করেন ।
📄 তুরস অথবা পইটিয়ার্সের যুদ্ধ
আবদুর রহমান অতঃপর উত্তর-ফ্রান্স অভিমুখে অগ্রসর হন । অসহায় ইউডেস তাহার পুরাতন শত্রু ফ্রান্সের রাজা চার্লসের সহিত মতবিরোধ দূর করিয়া তাঁহার সাহায্য প্রার্থনা করেন । চার্লস তাঁহার আহবানে সাড়া দিয়া বিরাট সৈন্যবাহিনীসহ দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হন । চার্লস এবং ইউডেস সম্পাদিত সন্ধি সম্পর্কে মুসলিম গোয়েন্দাদের ব্যর্থতায় আবদুর রহমান বিস্মিত হন । নদী এবং পাহাড়ের গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে সৈন্য মোতায়েন করিবার ফলে সামান্য সংখ্যক সৈন্য অবশিষ্ট থাকে । শৃঙ্খলা বোধহীন বার্বার সৈনিকগণ কঠোর নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও লুণ্ঠন ও বর্বরোচিত কার্যে লিপ্ত হয় । গানিমতের মালের লোভে তাহাদের কর্তব্যবোধ এবং শৃঙ্খলার কথা ভুলিয়া যায় । ইহা ব্যতীত মুসলমানদের মধ্যে গোত্রীয় কোন্দল আবার মাথাচাড়া দিয়া ওঠে । এইরূপ বিশৃঙ্খল সেনাবাহিনী লইয়া খ্রীস্টানদের সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ । রমজান ১১৪ হিঃ/৭৩২ খ্রীঃ অক্টোবর মাসে লোয়াইর নদীর তীরে সাড়ে বার মাইল উত্তর-পূর্বে অবস্থিত পইটিয়ার্সে ও তুরসের মধ্যবর্তী সমতল ভূমিতে উভয় পক্ষের সেনাদল মিলিত হয় । খণ্ডযুদ্ধে প্রায় এক সপ্তাহ অতিবাহিত হয় । ৯
এই খণ্ড যুদ্ধ চলাকালে কোন পক্ষই অপর পক্ষকে প্রকাশ্যে আক্রমণ করিতে সাহস পায়না । এই খণ্ড যুদ্ধ মুসলমানদের অনুকূলে থাকে এবং অবশেষে সাধারণ যুদ্ধ সংঘটিত হয় । যখন ফ্রান্সের পরাজয় অত্যাসন্ন সেই মুহূর্তে গানিমত সংগ্রহের জন্য মুসলিম সেনাবাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় । আবদুর রহমান শৃঙ্খলা ফিরাইয়া আনিতে চেষ্টা করিয়া ব্যর্থ হন । দশম দিবস সন্ধ্যা বেলায় যুদ্ধপরিচালনা করিবার সময় তিনি নিহত হন । ১০ নেতার মৃত্যুতে মুসলিম সেনাদের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয় । ১১ প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে তাঁহার সহযোগীদের মধ্যে সাংঘাতিক মতবিরোধ দেখা দেয় । সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হইয়া রাতের অন্ধকারে তাহারা যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে ।
পশ্চাৎ অপসারণকারী মুসলিম সেনাদের পশ্চাদ্ধাবনে ফ্রাঙ্ক সেনাবাহিনী অতিরিক্ত পরিশ্রান্ত হইয়া পড়িয়াছিল । অস্ত্রশস্ত্রসহ সম্পূর্ণ মুসলিম শিবির খ্রীস্টানদের হস্তগত হয় । চার্লস আহত মুসলমানদের হত্যা করিয়া "মারটেল হন্তা" উপাধি লাভ করেন । তিনি পুনরায় উত্তর দিকে অগ্রসর হন । কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিকের মতে, তুরসের যুদ্ধ একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা । কারণ তাহাদের মতে, ঐ যুদ্ধের ফলেই খ্রীস্টান-ইউরোপে মুসলমানদের অনুপ্রবেশ চিরতরে বন্ধ হইয়া যায় ।
ইহা সত্য যে কিছু সংখ্যক পশ্চাৎ অপসারণকারী মুসলিম পলাইয়া যায় এবং পুনরায় এই পথে ফ্রান্সে অনুপ্রবেশের চেষ্টা পরিত্যাগ করে । ওয়াদী লাক্কোর ন্যায় সমস্ত সেনাকে যুদ্ধক্ষেত্রে আনয়ন করিয়া সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করা হয় । এই যুদ্ধে চার্লস মার্টেল পরাজিত হইলে সম্পূর্ণ পশ্চিম ইউরোপের ভাগ্যবিপর্যয় ঘটিত । কারণ মুসলমানদের সম্ভাব্য আক্রমণকে প্রতিহত করিবার মত শক্তিশালী সেনা তাহাদের ছিলনা । এই যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয় ইউরোপে তাহাদের সাম্রাজ্য বিস্তারে ততটা অন্তরায় ছিল না, যতটা ছিল মুসলিম নেতাদের মধ্যে অনৈক্য, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আত্মকলহ সৃষ্টির কারণ । আরব এবং বার্বারদের জাতিগত উদাসীনতা এবং নব মুসলমানের আত্মতৃপ্তিহীনতা স্পেনের মুসলিম সমাজকে করে কলঙ্কিত । যোদ্ধা বলিয়া খ্যাত বার্বাররা অভিযোগ করে যে, তাহাদের দেওয়া হইয়াছে অনুর্বর মেসেতা এবং আরবরা ভোগ করিতেছে পূর্ব-দক্ষিণে স্পেনের উর্বর অঞ্চলসমূহ । দামেস্কের খলিফার দুর্বলতার সুযোগ লইয়া মুসলমানগণ স্পেনে সীমাহীন ক্ষমতা লাভ করে ও চরিত্রের গুণাবলী হারাইয়া ফেলে । তদুপরি মধ্যফ্রান্সের আবহাওয়া তাহাদের প্রকৃতির উপযোগী ছিল না । কারণ তাহারা আসে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল হইতে । পূর্ববিজিত এলাকায় বাকী সৈন্য মোতায়েন রাখিবার ফলে স্বল্প সংখ্যক সৈন্য দ্বারা মধ্যফ্রান্স দখলে রাখা অসম্ভব হইয়া পড়ে । ইহার পর আর আরবরা অভিযান পরিচালনা করিয়াছে বলিয়া প্রমাণ পাওয়া যায়না । মুসলমানগণ ৭৩৪ খ্রীস্টাব্দে এভিগনন অবরোধ করে এবং নয় বৎসর ধরিয়া লিওনসে লুণ্ঠন করে । ৭৫৯ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত তাহারা যুদ্ধ পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান নারবোন তাহাদের অধিকারে রাখে । চার্লস মারটেল ও তাহার উত্তরাধিকারীদের নেতৃত্বাধীনে পরিচালিত ফ্রাঙ্কদের অভিযান প্রতিহত করিবার জন্য আরবরা দক্ষিণাঞ্চলের উপজাতীয়দের সাহায্য কামনা করে ।
টিকাঃ
৯। হিট্টি, হিস্ট্রি অব দ্যা আরবস, লন্ডন ১৯৫১, পৃঃ ৫০১ ও টীকা-৩।
১০। পারেজা, ফিলিক্স এম. ইসলামোলোজিয়া, তমো-প্রথম, মাদ্রিদ, ১৯৫২-১৯৫৪, পৃঃ ১৬৩ দ্রষ্টব্য।
১১। রিয়াসত আলী, দ্যা তারিখ-ই আন্দালুস ১ম খণ্ড পৃঃ ১৮১।
📄 গৃহযুদ্ধ ও আরব গোত্রসমূহ
৭৫৬ খ্রীস্টাব্দ হইতে স্পেনের স্বাধীন ইমারত প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত মুসলমানদের মধ্যে গৃহযুদ্ধের ফল হিসাবে তাহাদের এই পরাজয়বরণ করিতে হয় । আরব, বার্বার, সিরীয়, এবং নব মুসলিমগণ পরস্পর সংঘাতে লিপ্ত ছিল । প্রথম তিন দল ছিল বিজয়ী এবং শেষোক্ত দল ছিল বিজিত । আরবরা তাহাদের পূর্বপুরুষের গোত্রীয় আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ধারাকে ত্যাগ করিতে শুরু করে । তাহারা সিরীয় ও বার্বারদের উপেক্ষা করিত এবং নওমুসলিমদের করিত ঘৃণা ।
আরব গোত্রসমূহের মধ্যে বানু আদনান, বানু হাশিম, বানু উমাইয়া, বানু মাখজুম, বানু ফিহর এবং অন্যান্য গোত্র জীবিকার উজ্জ্বল সম্ভাবনায় আন্দালুসে বসতি স্থাপন করেন । কিন্তু তাহারা এই নতুন দেশে লইয়া আসিয়াছিল তাহাদের পুরাতন কেন্দ্রীয় বিদ্বেষ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা । তাহারা মুজারী, হিমাইয়ারী (অথবা ইয়ামানী) দুই পুরাতন গোষ্ঠীর অধীনে সংগঠিত ছিল । শেষোক্ত দল ছিল শিয়া আদর্শে বিশ্বাসী এবং প্রথম দল ছিল গোঁড়া সুন্নী দলভুক্ত ।
কালবী (ইয়ামনী) এবং কাইসী (উত্তর-আরব) গোত্রদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল পুরাতন শত্রুতা । ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (মৃত ৭১৯ খ্রীঃ) এবং পরবর্তী উমাইয়া খলিফাগণ এই গোত্রীয় বিদ্বেষকে দূরিভূত করিবার জন্য কোন প্রচেষ্টাই চালান নাই । ফলে এই বিদ্বেষ দূরবর্তী প্রদেশগুলিতেও বিস্তার লাভ করে । খলিফা ইয়াজিদ বিন আবদুল মালিক, কালবী গোত্রের বিশর বিন সাফওয়ান নামে জনৈক জেনারেলকে আফ্রিকার গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত করেন । পরবর্তীকালে কালবী নেতা আনবাসাহ বিন সাহিমকে কাইসী নেতা আবদুর রহমান বিন আবদুল্লাহ আলগাফির স্থলে স্পেনের গভর্নর নিযুক্ত করেন । গাফিকীকে নিযুক্ত করেন পূর্ব-স্পেনের ডিপুটি গভর্নর । এই গোত্রীয় বিদ্বেষ ও বিরোধের ফলে স্পেনে গৃহযুদ্ধের সূচনা হয় ।
📄 আবদুল মালিক
(৭০২-০৪ খ্রীঃ) আবদুর রহমানের পর মদীনার জনৈক নেতা আবদুল মালিক স্পেনের গভর্নর নিযুক্ত হন । ৭০২ খ্রীস্টাব্দের অক্টোবর মাসে তুরসের যুদ্ধে আবদুর রহমান নিহত হন । আবদুল মালিক মুসলমান সেনাদের হৃত গৌরবকে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করিতে সক্ষম হন এবং আরবগণ নাভাররের খ্রীস্টানগণকে পরাজিত করেন । বর্ষাকালে গিরিমালা অতিক্রম করিয়া তিনি এভিগনন ও সেন্টরেমী অধিকার করেন । এই যুদ্ধের সময় জনগণের সহিত তিনি যে নিষ্ঠুর এবং নির্দয় ব্যবহার করেন তাহাতে পুরাতন বিদ্বেষ এবং বিরোধিতা আবার মাথা চাড়া দিয়া ওঠে । সেনাবাহিনীর মধ্যে এই বিদ্বেষ ও বিরোধীতা পূর্ব হইতেই বিদ্যমান ছিল । ইহারই প্রতিক্রিয়া হিসাবে ৭০৪ খ্রীস্টাব্দে তিনি পদচ্যুত হন ।