📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 সামাহ বিন মালিক আল-খাওলানী

📄 সামাহ বিন মালিক আল-খাওলানী


খলিফা ওমর বিন আবদুল আজিজ, স্পেনের বিভিন্ন এলাকা কোন পরিস্থিতিতে ও পরিবেশে বিজিত হয়, তাহা জানাইতে সামাহকে নির্দেশ প্রদান করেন । সামাহ স্পেনে আসিয়াই সরেজমিনে তদন্ত করিয়া সমস্ত বিষয় সবিস্তারে খলিফাকে অবহিত করেন । সামাহ স্পেনে আগমন করেন ১০০ হিঃ/ রমজান মাসে (এপ্রিল ৭১৮ খ্রীঃ) । তিনি ইসলামী আদর্শ মোতাবেক আদায়কৃত করের এক পঞ্চমাংশ জাবির নামক জনৈক ব্যক্তির মাধ্যমে দামেস্কে প্রেরণ করেন । ইহার অল্পদিন পর ১০১ হিঃ/ ৭১৯ খ্রীস্টাব্দে ওমর বিন আবদুল আজিজের মৃত্যু ঘটে । তাঁহার স্থলাভিষিক্ত হন দুর্বল উমাইয়া খলিফা দ্বিতীয় ইয়াজিদ । ৭ সামাহ ইহার পর দামেস্কে কর প্রদান বন্ধ করিয়া দেন । এবং সংগৃহীত কর স্পেনের জনকল্যাণমূলক কার্যে ব্যয় করেন ।

৭১৭ খ্রীস্টাব্দে আইউব-বিন হাবিব (সামাহ) শাসন কার্যের সুবিধার্থে সেভিল হইতে রাজধানী দেশের মধ্যস্থলে অবস্থিত কর্ডোভাতে স্থানান্তর করেন । কর্ডোভা স্পেনে মুসলিম শাসনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে । ৮ সামাহ সারাগোসায় একটি জামে মসজিদ নির্মাণ ও গোয়াদালকুইভির নদীর উপর রোমানদের নির্মিত পুরাতন পুলটি পুনর্নির্মাণ করেন । রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান কল্পে তিনি সারাদেশ ব্যাপী বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায়ের লোকের আদম শুমারী করেন এবং নতুন কর প্রথা চালু করিবার উদ্দেশ্যে ভূমি ও শহরগুলিকে নতুন করিয়া জরিপ করেন । দেশের বসতিহীন এলাকায় বার্বারদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন ।

টিকাঃ
৭। রিয়াসত আলী, প্রাগুক্ত, পৃঃ ১৬৩।
৮। দ্যা ইসলামিক রিভিউ, লন্ডন, জুন ১৯৫৮, পৃঃ ১৭-১৮।

📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 তুলুসের যুদ্ধ

📄 তুলুসের যুদ্ধ


সামাহ শুধু একজন উত্তম প্রশাসকই ছিলেন না, তিনি সুদক্ষ সেনাপতি হিসাবেও খ্যাতি অর্জন করেন । শাসনভার গ্রহণ করিবার পরই তিনি শুনিতে পাইলেন যে, সেপ্টিমানিয়ার খ্রীস্টানগণ বিদ্রোহ ঘোষণা করিয়াছে । পীরেনীজের অপর প্রান্তে অবস্থিত এই সেপ্টিমানিয়া সপ্তনগরী নামে খ্যাত । নারবোন, আগদে, বেজিয়ার, লোদেভ, কারকাস্সোন, নিমেস ও মাগলোন নামে, সাতটি শহর সমন্বয়ে সেপ্টিমানিয়া গঠিত । রাজধানী নারবোনে সমুদ্র হইতে অতি সহজে প্রবেশের পথ ছিল । ফলে ইহা মুসলিম সেনাদের সামরিক তৎপরতার লীলাক্ষেত্রে পরিণত হয় । তিনি অতঃপর আকিতেনের রাজধানী তুলুস অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন এবং ৭২১ খ্রীস্টাব্দের মে মাসে উহা অবরোধ করেন । আকিতেনের ডিউক ইউডেস শহর সেনাদলের সাহায্যার্থে বিরাট সেনাবাহিনী লইয়া আগমন করেন । সেনা সংখ্যার স্বল্পতা ও উভয় দিক হইতে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও সামাহ আরব সুলভ ক্ষিপ্রতার সহিত শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন । কিন্তু অপর্যাপ্ত সৈন্য সংখ্যার কারণে বীরত্ব নিষ্ফল পর্যবসিত হয় । প্রচণ্ড যুদ্ধের পর সামাহ নিহত হন । তাঁহার মৃত্যুতে সেনাদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হয় । আবদুর রহমান বিন আবদুল্লাহ আল গাফিকীর নেতৃত্বে সামাহর সেনাদল যুদ্ধক্ষেত্র প্রভেন্স হইতে প্রত্যাবর্তন করে ।

📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 আনবাসাহ

📄 আনবাসাহ


সামাহর মৃত্যুর পর আবদুর রহমান কয়েকমাস গভর্নর পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন । আফ্রিকার গভর্নর জেনারেল বিশর বিন সাফওয়ান আনবাসাহ বিন সাহিম আল কালবিকে স্পেনের গভর্নর নিযুক্ত করেন । নতুন গভর্নর আবদুর রহমানকে পূর্ব স্পেনের লেফটেনেন্ট গভর্নর পদে পুনর্বহাল করেন ।

তিনি ফ্রান্সের বিরুদ্ধে পূর্ণ শক্তি সহকারে অভিযান পরিচালনা করিয়া কারকাসসোন, নিমেস ও অন্যান্য স্থান পুনর্দখল করেন । মুসলিম সেনারা উত্তর দিকে রোন উপত্যকা অতিক্রম করিয়া আউতুনে উপস্থিত হয় । মুসলিম বাহিনী ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত বারগুইণ্ডি প্রদেশ এবং পূর্বে সাউনে অধিকার করে । আনবাসাহ কারকাসসোনের খ্রীস্টানদের মিত্রতা ও সহযোগিতায় আত্মরক্ষা মূলক ও আক্রমণাত্মক অভিযান পরিচালনা করেন । জামিন ও বন্দীদের প্রতি তাঁহার মহানুভবতা এবং বিচক্ষণতাপূর্ণ ব্যবহার দক্ষিণ ফ্রান্সে মুসলমানদের অবস্থানকে শক্তিশালী করিতে সাহায্য করে । ৭২৫ খ্রীস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে আউতুন হইতে গানিমত সহ ফিরিবার পথে বাস্ক বিদ্রোহীদের হস্তে তিনি নিহত হন ।

আনবাসাহর মৃত্যুর পর গভর্নর পদটি স্পেনে নতুন বসতি স্থাপনকারী বিভিন্ন আরব গোত্রের মধ্যে বিতর্কের বস্তুতে পরিণত হয় এবং পরবর্তী পাঁচ বৎসরে পরপর একাধিক গভর্নর নিযুক্ত হন । তাঁহার সময়ে দেশের শাসন ব্যবস্থায় কোন উন্নতি পরিলক্ষিত হয় নাই এবং কোন নতুন অভিযানও পরিচালিত হয় নাই । হিসাম বিন উবায়েদ কিলাবীর সময় (৭২৯-৭৩০) পীরেনীজের অপর পার্শ্বে অবস্থিত লিওন, মাসোন এবং অন্যান্য স্থান মুসলমানদের হস্তগত হয় । কিন্তু আরব এবং বার্বারদের কোন্দল ও আত্মকলহের ফলে এই সব অঞ্চল হাতছাড়া হইয়া যায় ।

📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 আবদুর রহমান আল গাফিকী

📄 আবদুর রহমান আল গাফিকী


খলিফা হিশাম বিন আবদুল মালিক স্বয়ং স্পেনের প্রশাসনিক ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং আবদুর রহমান বিন আবদুল্লাহ আল-গাফিকীকে স্পেনের গভর্নর নিযুক্ত করেন ।

আল গাফিকী ছিলেন সুদক্ষ প্রশাসক ও মহান সেনাপতি । দক্ষিণ আরব ও উত্তর আরবের হিমাইয়ার এবং মুদার নামক পরস্পর বিরোধী উভয় গোত্রের নিকটেই তিনি ছিলেন প্রিয় । তিনি রাজ্যের এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্তে ভ্রমণ করিয়া দেশের ভগ্ন প্রশাসন যন্ত্র ও বিচার ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করেন । তিনি জনগণের অভিযোগের সুবিচার করেন । ইউরোপে তারিক এবং মুসার সাহসিকতাপূর্ণ কার্যকে পুনরায় আরম্ভ করিয়ার উদ্দেশ্যে তিনি সীমান্তকে সুরক্ষিত করেন । আল গাফিকী ইটালী, জার্মানী ও গ্রীক সাম্রাজ্যকে ইউরোপের মুসলিম দখলকৃত বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সহিত একত্রিত করিবার অসম্পূর্ণ কার্যকে সম্পূর্ণ করিবার উপযুক্ত ব্যক্তি বলিয়া নিজেকে মনে করিতেন । তিনি দক্ষিণ ফ্রান্সের উসমান বিন আবু নিসা নামক বার্বার নেতাকে শায়েস্তা করেন । উসমান বিন আবু নিসা আর্কিটেনের ডিউক ইউডেস-এর সহিত পারস্পরিক স্বার্থে একত্রিত হইয়া ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন । আল গাফিকী গিরি পীরেনীজের পশ্চিমে অবস্থিত অপর একটি গমনাগমনের পথ আবিষ্কার করেন এবং ৭৩২ খ্রীঃ বসন্তকালে ১,০০০০০ লক্ষ সৈন্য লইয়া এই পথে পাম্পলোনা অতিক্রম করিয়া রোনসেসভালেস গিরিপথের মধ্য দিয়া ফ্রান্সে প্রবেশ করেন । তবে এক লক্ষ সৈন্যের সংখ্যা অতিরঞ্জিত বলিয়া মনে হয় । তিনি রোন নদীর তীরে অবস্থিত আর্লেস আক্রমণ করিয়া তুমুল যুদ্ধের পর অধিকার করেন ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px