📄 আবদুল আজিজ
মুসা ইবনে নুসাইয়েরের পুত্র আবদুল আজিজ ছিলেন স্পেনের প্রথম আমীর । তিনি সেভিলে রাজধানী প্রতিষ্ঠা করিয়া শাসন কার্য পরিচালনা করেন । সুদক্ষ প্রশাসক হিসাবে পরিচিত আবদুল আজিজ প্রশাসন কার্যের সুবিধার্থে বিজিত অঞ্চলকে কয়েকটি প্রদেশে বিভক্ত করেন । শান্তির খাতিরে তিনি থিওডোমিরের সহিত তারিকের সম্পাদিত চুক্তি বহাল রাখেন । প্রজাহিতৈষী এই আমীর জনগণের কর্মসংস্থানের জন্য মিল কারখানা স্থাপন করেন এবং কৃষি উৎপাদনে সহায়ক সেচকার্যের জন্য গথ-প্রণালী খনন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন কল্পে দীর্ঘ সড়ক ও সেতু নির্মাণ করেন । ব্যবসা বাণিজ্যে নিযুক্ত বণিক ও পথিকদের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের জন্য সড়ক পথে সশস্ত্র প্রহরী নিয়োগ করেন । সমৃদ্ধি ও শান্তি রক্ষার উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে সেনানিবাস প্রতিষ্ঠা করেন । ১ ফলে দেশের সর্বত্র শান্তি ও শৃঙ্খলা বিরাজ করে ।
মুঘল সম্রাট আকবরের ন্যায় তিনি অসবর্ণ বিবাহকে উৎসাহিত করেন এবং স্বয়ং রডারিকের বিধবা পত্নী এগিলোনাকে (উম্মে আসিম) বিবাহ করেন । মুসলমান ও স্থানীয় জনগণের এই অসর্বণ বিবাহের মাধ্যমে তিনি স্পেনে মুসলিম শাসনের ভিত্তি মজুত করিতে চাহিয়াছিলেন । এগিলোনার উৎসাহে তিনি ভিজিগথদের ন্যায় বহুমূল্যবান মণিমুক্তা খঁচিত মুকুট পরিধান করিতেন এবং দর্শন প্রার্থীদের কক্ষের প্রবেশদ্বার এমনভাবে নির্মাণ করিতেন যে মাথানত না করিয়া কেহ প্রবেশ করিতে পারিত না । ২ ইহাতে খলিফা সুলায়মান মর্মাহত হন । স্পেনবিজয়ী বীর মুসা বিন নুসাইয়েরের পুত্র ও স্পেনবাসীর প্রাণপ্রিয় শাসক আবদুল আজিজকে খলিফা মোটেই বরদাস্ত করিতে পারিতেছিলেন না । খ্রীস্টান রাজা রডারিকের বিধবা পত্নীকে বিবাহ করিয়া আবদুল আজিজ খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণ করিলে ইসলামের মর্যাদাহানী হইতে পারে সন্দেহে খলীফা তাঁহার বিরুদ্ধে মুসলমানদিগকে ক্ষিপ্ত করিয়া তোলেন । তাঁহাকে হত্যা করিবার জন্য খলিফা পাঁচজন আরব নেতাকে নিয়োগ করেন । হাবিব বিন আবি উবায়দা আল-ফিহরী ও যাইয়াদ বিন নালিগবাহ আল তামিমী এই ষড়যন্ত্রে অংশ গ্রহণ করেন । রজব ৯৭ হিঃ/ ৯ই মার্চ ৭১৬ খ্রীঃ খলিফার নির্দেশে আবদুল আজিজকে ফজরের নামাজ আদায়রত অবস্থায় নিষ্ঠুর ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় । খলিফার ইচ্ছানুসারে নিহত আবদুল আজিজের ছিন্ন মস্তক দামেস্কে প্রেরিত হয় । খলিফা নিহত পুত্রের ছিন্ন মস্তক ভাগ্যাহত পিতা মুসাকে দেখান । মুসা বিন নুসাইর এই দৃশ্য দেখিয়া অতি দুঃখে ও ক্ষোভে খলিফার প্রতি অভিশম্পাত করিতে করিতে দরবারকক্ষ ত্যাগ করিয়া মক্কা অভিমুখে যাত্রা করেন । অসহায় ও অজ্ঞাত অবস্থায় দীনহীন বেশে ওয়াদী-উল-কোরা নামক স্থানে স্পেনবিজয়ী বীর মুসা বিন নুসাইর মৃত্যুমুখে পতিত হন । স্পেনের প্রথম আমীর সুযোগ্য শাসক আবদুল আজিজকে হত্যা করিয়া খলিফা সুলায়মান স্পেনের ইতিহাসের জঘন্যতম অধ্যায়ের সূচনা করেন ।
টিকাঃ
১। আল মাক্কারী, নাফলুল-তিব, ভল্যুম ১, পৃঃ ১৩২।
২। দ্যা তারিখ-ই-আন্দালুস ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৩৬-৩৭।
📄 আইউব ও আল-হুর
আবদুল আজিজের মৃত্যুর পর সেনাবাহিনী মুসার ভগ্নির পুত্র আইউব বিন হাবিবকে তাহাদের নেতা ও গভর্নর নির্বাচন করেন । ৪ তিনি সেভিল হইতে কর্ডোভাতে রাজধানী স্থানান্তর করেন এবং দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রয়াস চালান । তাঁহার নির্বাচনকে আফ্রিকার গভর্নর জেনারেল অনুমোদন না করায় ছয় মাসের মধ্যে আল-হুর ইবনে আবদুর রহমান আল-থাকাফী (৭১৬-৭১৮ খ্রীঃ) তাঁহার স্থলাভিষিক্ত হন । তিনি সেনাপতি মুসার আত্মীয় হওয়ায় গভর্নর জেনারেল ও খলিফার অনুমোদন লাভে বঞ্চিত হন ।
আল-হুর নবীন রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা আনয়নে নিজেকে সম্পূর্ণ রূপে ব্যর্থ বলিয়া প্রমাণ করেন । ৯৮ হিঃ/ ৭১৮ খ্রীঃ তাঁহার লেফটেনেন্ট গভর্নর আল কামাহ কোভাডোংগাতে পিলাইওর নিকট শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন । রডারিক সেনাবাহিনীর এই গথিক নেতা আসুরীয়ার কোভাডোংগাতে একটি খ্রীস্টান রাষ্ট্র ৫ প্রতিষ্ঠা করেন । আল-হুরের নির্যাতনমূলক শাসনে জনগণ অতিষ্ঠ হইয়া ওঠে । ৬ লোভী ও অত্যাচারী হুর অতি অল্পদিনে জনগণের বিরাগভাজন হন । তাঁহার কুশাসনের প্রতি জনগণ খলিফার দৃষ্টি আকর্ষণ করে । খলিফা আবদুল আজিজ আল-হুরের কার্য কলাপের বিরুদ্ধে জনগণের আবেদনে গুরুত্ব দেন এবং জনসাধারণের সার্বিক কল্যাণের প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া আল সামাহ ইবনে মালিক আল-খাওলানীকে (৭১৯-৭২১ খ্রীঃ) আল-হুরের স্থলে গভর্নর নিযুক্ত করেন ।
টিকাঃ
৪। রিয়াসত আলী, দ্যা তারিখ-ই-আন্দালুস, ১ম খণ্ড পৃঃ ১৫৬।
৫। রিয়াসত আলী, প্রাগুক্ত, পৃঃ ১৬৩।
৬। ইয়াহিয়া বিন আলকামাক কাল্লী সেথমাউন আবী নিসাব খাতমি, 'হুদায়ফা বিন আহওয়াজ কাইসি, হাইথাম বিন জিকাইদ কাতাকী এবং মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আসজিম'।
📄 সামাহ বিন মালিক আল-খাওলানী
খলিফা ওমর বিন আবদুল আজিজ, স্পেনের বিভিন্ন এলাকা কোন পরিস্থিতিতে ও পরিবেশে বিজিত হয়, তাহা জানাইতে সামাহকে নির্দেশ প্রদান করেন । সামাহ স্পেনে আসিয়াই সরেজমিনে তদন্ত করিয়া সমস্ত বিষয় সবিস্তারে খলিফাকে অবহিত করেন । সামাহ স্পেনে আগমন করেন ১০০ হিঃ/ রমজান মাসে (এপ্রিল ৭১৮ খ্রীঃ) । তিনি ইসলামী আদর্শ মোতাবেক আদায়কৃত করের এক পঞ্চমাংশ জাবির নামক জনৈক ব্যক্তির মাধ্যমে দামেস্কে প্রেরণ করেন । ইহার অল্পদিন পর ১০১ হিঃ/ ৭১৯ খ্রীস্টাব্দে ওমর বিন আবদুল আজিজের মৃত্যু ঘটে । তাঁহার স্থলাভিষিক্ত হন দুর্বল উমাইয়া খলিফা দ্বিতীয় ইয়াজিদ । ৭ সামাহ ইহার পর দামেস্কে কর প্রদান বন্ধ করিয়া দেন । এবং সংগৃহীত কর স্পেনের জনকল্যাণমূলক কার্যে ব্যয় করেন ।
৭১৭ খ্রীস্টাব্দে আইউব-বিন হাবিব (সামাহ) শাসন কার্যের সুবিধার্থে সেভিল হইতে রাজধানী দেশের মধ্যস্থলে অবস্থিত কর্ডোভাতে স্থানান্তর করেন । কর্ডোভা স্পেনে মুসলিম শাসনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে । ৮ সামাহ সারাগোসায় একটি জামে মসজিদ নির্মাণ ও গোয়াদালকুইভির নদীর উপর রোমানদের নির্মিত পুরাতন পুলটি পুনর্নির্মাণ করেন । রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান কল্পে তিনি সারাদেশ ব্যাপী বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায়ের লোকের আদম শুমারী করেন এবং নতুন কর প্রথা চালু করিবার উদ্দেশ্যে ভূমি ও শহরগুলিকে নতুন করিয়া জরিপ করেন । দেশের বসতিহীন এলাকায় বার্বারদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন ।
টিকাঃ
৭। রিয়াসত আলী, প্রাগুক্ত, পৃঃ ১৬৩।
৮। দ্যা ইসলামিক রিভিউ, লন্ডন, জুন ১৯৫৮, পৃঃ ১৭-১৮।
📄 তুলুসের যুদ্ধ
সামাহ শুধু একজন উত্তম প্রশাসকই ছিলেন না, তিনি সুদক্ষ সেনাপতি হিসাবেও খ্যাতি অর্জন করেন । শাসনভার গ্রহণ করিবার পরই তিনি শুনিতে পাইলেন যে, সেপ্টিমানিয়ার খ্রীস্টানগণ বিদ্রোহ ঘোষণা করিয়াছে । পীরেনীজের অপর প্রান্তে অবস্থিত এই সেপ্টিমানিয়া সপ্তনগরী নামে খ্যাত । নারবোন, আগদে, বেজিয়ার, লোদেভ, কারকাস্সোন, নিমেস ও মাগলোন নামে, সাতটি শহর সমন্বয়ে সেপ্টিমানিয়া গঠিত । রাজধানী নারবোনে সমুদ্র হইতে অতি সহজে প্রবেশের পথ ছিল । ফলে ইহা মুসলিম সেনাদের সামরিক তৎপরতার লীলাক্ষেত্রে পরিণত হয় । তিনি অতঃপর আকিতেনের রাজধানী তুলুস অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন এবং ৭২১ খ্রীস্টাব্দের মে মাসে উহা অবরোধ করেন । আকিতেনের ডিউক ইউডেস শহর সেনাদলের সাহায্যার্থে বিরাট সেনাবাহিনী লইয়া আগমন করেন । সেনা সংখ্যার স্বল্পতা ও উভয় দিক হইতে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও সামাহ আরব সুলভ ক্ষিপ্রতার সহিত শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন । কিন্তু অপর্যাপ্ত সৈন্য সংখ্যার কারণে বীরত্ব নিষ্ফল পর্যবসিত হয় । প্রচণ্ড যুদ্ধের পর সামাহ নিহত হন । তাঁহার মৃত্যুতে সেনাদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হয় । আবদুর রহমান বিন আবদুল্লাহ আল গাফিকীর নেতৃত্বে সামাহর সেনাদল যুদ্ধক্ষেত্র প্রভেন্স হইতে প্রত্যাবর্তন করে ।