📄 রাজনৈতিক অবস্থা
স্পেনে বসবাসরত পশ্চিমী রোমানদের উত্তরাধিকারী ভিজিগথ শাসকদের মধ্যে উয়াম্বা এবং উইতিজা সুশাসন ও জনহিতকর কার্যের জন্য সুবিখ্যাত ও জনপ্রিয় ছিলেন । উয়াম্বার শাসনকালে স্পেন শান্তি শৃঙ্খলা ও সমৃদ্ধি লাভ করিলেও পরবর্তীকালে উয়াম্বা উচ্চাভিলাষী হইয়া উঠিলে অভিজাত সম্প্রদায় ও যাজকদের ষড়যন্ত্রের শিকারে পরিণত হয় । ফলে স্পেনে অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় । মুসা ইবনে নুসাইর ১৬ যখন তিউনিসিয়ার ভাইসরয় ছিলেন সেই সময়ে বায়েটিকার ডিউক ৮২ বৎসর বয়স্ক রডারিক (লুজরিক) রাজা উইতিজাকে ১৭ হত্যা করিয়া আইবেরিয়ার সিংহাসন অধিকার করেন । উইতিজা ৭০২ খ্রীস্টাব্দে তাঁহার পিতা এজিকার উত্তরাধিকারী নির্বাচিত হন এবং তিনি তাঁহার পুত্র আচিলাকে (আখিলা) ৪১৪ খ্রীস্টাব্দের প্রারম্ভে ভিজিগথগণ কর্তৃক দখলকৃত উত্তর-পূর্ব স্পেনের রোমান প্রদেশ তারাকোনেন্সিস-এ গভর্নর নিযুক্ত করেন । আচিলা রডারিক কর্তৃক সিংহাসনচ্যুত হইয়া গ্যালিসিয়ায় পলায়ন করেন ।
রাজতন্ত্র তাহার পূর্ব জৌলুস হারাইয়া ফেলে । সেনাবাহিনীর মধ্যে অসন্তুষ্টির ফলে উত্তরাধিকারীদের জীবনের নিরাপত্তা বিপন্ন হয় । শাসকগণ বিশপদের দ্বারা নির্বাচিত হইতেন । সমাজে বিশপদের প্রভাব ছিল অপরিসীম । কোন কোন রাজা স্বীয় উত্তরাধিকারীর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য বিশপদেরকে রাষ্ট্র পরিচালনায় তাহাদের সহিত অংশীদার রাখিতেন । ইহাতে বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় অসন্তুষ্ট হইয়া ওঠেন, কেন না উত্তরাধিকারী নির্বাচনে তাহারাও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইতেন । ৬৮০ খ্রীস্টাব্দে উয়াম্বাকে সিংহাসনচ্যুত করিবার পর স্পেনে ভিজিগথ শাসনের শেষ একত্রিশ বৎসর দারুণ বিশৃঙ্খলার মধ্যে অতিবাহিত হয় । অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে টলেডোর সিংহাসন অধিকারের প্রতিযোগিতা দেখা দেয় । ইহার ফলে দূরবর্তী প্রদেশের গভর্নর ও বিদ্রোহী নেতাগণ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ লাভ করে । কেন্দ্রীয় শাসনের দুর্বলতা ও সৈনিকদের নিয়মিত মাহিনা প্রদান করিতে না পারার দরুন বিদ্রোহ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ব্যর্থ হয় । সেনাবাহিনীর মধ্যে অসন্তোষের কারণে রাজার প্রয়োজনীয় সংখ্যক সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী সেনাবাহিনী ছিল না । রাজার আদেশে সকল সক্ষম ব্যক্তি সেনাবাহিনীতে যোগদান করিলেও মনে মনে অসন্তুষ্ট থাকিত । পরবর্তীকালে পশ্চিম ইউরোপের জায়গীর প্রথার ন্যায় তাহাদের মধ্যে জায়গীর প্রথার প্রচলন করা হয় ।
সার্বক্ষণিক ও নিয়মিত কোন সেনাবাহিনী ছিল না । ভূমিদাস ও ক্রীতদাসকে বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে যোগদান করিতে হইত । কিন্তু তাহারা নিয়মিত বেতন পাইত না । এইরূপ অনিয়মিত ও প্রশিক্ষণ বিহীন সেনাবাহিনী গড়িয়া ওঠায় সপ্তম শতাব্দীর শেষাংশে গথিক শাসকগণ প্রয়োজনীয় সেনা সংগ্রহে অসুবিধার সম্মুখীন হন । জার্মান দলপতি-শাসন পদ্ধতির সংগে তৎকালীন ভিজিগথ শাসকগণ স্পেনের পারিপার্শ্বিকতার কারণে খাপ খাওয়াইতে ব্যর্থ হন ।
মুসলিম আক্রমণের সাথে সাথে অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে উত্তরাধিকার প্রশ্নে মতবিরোধ দেখা দেয় । ৬৮৭ খ্রীস্টাব্দে পিতা এবং পুত্র মিলিতভাবে রাজ্য শাসন করেন । উইতিজার প্রতি দেশের জনগণের সীমাহীন ভক্তি শ্রদ্ধা ছিল । উইতিজা ইহুদীদের পৃষ্ঠপোষকতা করিতেন । তিনি আশা করিয়াছিলেন, তাঁহার পুত্র উত্তরাধিকারী নির্বাচিত হইবে । পুত্রকে উত্তর-পূর্ব তারাকোনেন্সিস প্রদেশের গভর্নর নিযুক্ত করিয়া প্রশাসন কার্য পরিচালনায় দক্ষতা অর্জনের জন্য নিজের পাশে পাশে রাখিবেন । অভিজাত শ্রেণীর এক অংশ উইতিজার শাসনের বিরোধিতা করেন এবং শেষ পর্যন্ত রডারিককে রাজা নির্বাচন করেন । আচিলা নিজ শাসনাধীন প্রদেশ স্বাধীন বলিয়া ঘোষণা করেন এবং স্বীয় নামে মুদ্রার প্রচলন করেন । সিউটার গভর্নর ও উইতিজার জামাতা কাউন্ট জুলিয়ান (ইলিয়ান) তৎকালীন প্রথানুযায়ী স্বীয় কন্যা ফ্লোরিন্ডাকে ১৮ রাজকীয় আদবকায়দা ও শিষ্টাচার রপ্ত করিবার জন্য রডারিকের রাজপ্রাসাদে প্রেরণ করেন । ফ্লোরিন্ডা রডারিক কর্তৃক প্রলুব্ধ হইয়া বিপথগামিনী হন । রডারিকের আচরণে জুলিয়ান গভীরভাবে মর্মাহত হন । জুলিয়ান অপমানের প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে ও আফ্রিকায় বসবাসরত দেশত্যাগীদের অনুরোধে দেশকে বে-আইনী দখল হইতে মুক্ত করিবার জন্য সংকল্প করেন এবং স্পেনের অবস্থা সম্পর্কে মুসাকে গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান গোপন তথ্য সরবরাহ করেন ।
হিট্টি ১৯ এবং হোলের ২০ ন্যায় বিখ্যাত পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকগণ এই ঘটনার প্রতি অতি সামান্য গুরুত্ব প্রদান করিয়াছেন । যে জুলিয়ান দীর্ঘদিন মুসলিম অধিকার হইতে সিউটাকে রক্ষা করেন পরবর্তীকালে সেই জুলিয়ানই সিউটাকে শুধু মুসলমানদের নিকট হস্তান্তরই করেন নাই উপরন্তু স্পেন অধিকার করিতে তারিক ও মুসাকে সর্বপ্রকার সাহায্য ও সহযোগিতা সক্রিয় ভাবে দান করেন । ইহারও কোন ব্যাখ্যা ঐতিহাসিকগণ দেন নাই । কিন্তু জুলিয়ানের ব্যবহার এই ইঙ্গিতই প্রদান করে যে, রডারিক নিশ্চয়ই অশালীন এবং অন্যায় ব্যবহার করিয়াছিলেন । অপরদিকে সমকালীন আরব ও স্পেনীয় ঐতিহাসিকগণ এ ব্যাপারে ফ্লোরিন্ডার উপাখ্যান ব্যতীত অন্য কোন দুর্ঘটনার উল্লেখ করেন নাই । ফলে রডারিক মৃত রাজার পুত্র ও ভ্রাতাদের আত্মীয় স্বজনের নেতৃত্বে গঠিত এক শক্তিশালী সেনাবাহিনীর বিরোধিতার সম্মুখীন হন এবং অবিশ্বাসী সেনাবাহিনীর উপর নির্ভর করিতে বাধ্য হন । উইতিজার ভ্রাতাদের মধ্যে বিশপ অপ্পাস ও সিসবার্ট এবং পুত্রদের মধ্যে আচিলা ছিলেন বিশেষ প্রভাবশালী । ভিজিগথ অভিজাত সম্প্রদায় ও রাজপরিবারের সদস্যদের মধ্যে মতবিরোধের ফলে রাজ্যে বিবাদ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় ।
দারিদ্র্যক্লিষ্ট জনসাধারণ, দুঃখী ক্রীতদাস, দুর্ভাগা ভূমিদাস এবং উৎপীড়িত ইহুদীগণ সকলে সমবেতভাবে একজন ত্রাণকর্তার অপেক্ষা করিতেছিলেন । স্পেনের মোহাজেরগণ যেখানে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন শেষপর্যন্ত সেই মুসলিম আফ্রিকা হইতেই তাঁহার আগমন ঘটিল । সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ধনী জমিদারগণ রাষ্ট্রের শাসন কার্য পরিচালনা করিতেন । তাঁহারা বিলাসপ্রিয় হইয়া উঠিবার ফলে শৌর্যবীর্য ও কর্মক্ষমতা হারাইয়া ফেলেন । দুঃশাসন, যাজকদের অতিরিক্ত প্রভাব, অভ্যন্তরীণ অনৈক্য, শত্রুতা, ষড়যন্ত্র এবং প্রজাদের অসন্তুষ্টিই ভিজিগথ শাসন অবসানের প্রকৃত কারণ । খণ্ড বিখণ্ড ও ধ্বংসপ্রাপ্ত গথিক সাম্রাজ্য প্রতিরক্ষার দায়িত্ব অর্পিত ছিল অনিয়মিত বেতন প্রাপ্ত সেনাবাহিনীর উপর, যাহারা প্রভুর পক্ষে যুদ্ধ না করিয়া নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সুযোগ বুঝিয়া শত্রুপক্ষে যোগদান করিত । এই অসন্তোষ ভিজিগথ সেনাবাহিনীর মধ্যে ভীষণ বিশৃঙ্খলা ও দুর্বলতার সৃষ্টি করে এবং ১২,০০০ সৈনিকের এক ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনী ভিজিগথ শাসনকে প্রথম আঘাতেই সমূলে উৎখাত করে । ২১
টিকাঃ
১৬. মুসার পিতা নুসাইরকে বন্দি হিসেবে আইন তামার থেকে আনা হয়।
১৭. ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ২৩১; দ্রষ্টব্য, স্পেন আন্ডার দ্যা ভিজিগস্স, কেমব্রীজ মেডিয়াভ্যাল হিস্ট্রি, ২য় খণ্ড, ১৯১৩, পৃঃ ১৮২।
১৮. ইবনুল আছির, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ৪৪৩; স্পেন আন্ডার দ্যা ভিজিগথস্, কেমব্রীজ মেডিয়াভ্যাল হিস্ট্রি, ২য় খণ্ড, কেমব্রীজ, ১৯১৩, পৃঃ ৮৪।
১৯. পি. কে. হিট্টি, হিস্ট্রি অব দ্যা আরবস্, লন্ডন, ১৯৫১, পৃঃ ৪৯৪, টীকা-১।
২০. আন্দালুস, পৃঃ ২১।
২১. দ্রষ্টব্য: ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ২৩০।