📄 সামাজিক পরিবেশ
মুসলিম শাসনাধীনে আসিবার পূর্বে স্পেনের অধিবাসীগণ রাজা, ক্ষুদ্ররাজ্যের শাসক, অমাত্যবর্গ, যাজক, সামন্তরাজ, অভিজাত শ্রেণী, বর্গাদার, ভূমিদাস (সার্ফ) ও ক্রীতদাস ইত্যাদি শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল । ৭ ইহাদিগকে মোটামুটিভাবে শাসক ও শাসিত এই দুই শ্রেণীতে ভাগ করা যাইতে পারে । শাসক শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন রাজা, ধর্মযাজক ও অভিজাত শ্রেণী । অপরদিকে বর্গাদার, ভূমিদাস (সার্ফ), ক্রীতদাস ও ইহুদীগণ ছিল শাসিত শ্রেণীভুক্ত ।
অষ্টম শতাব্দীর প্রারম্ভে স্পেনীয় রোমান ও ভিজিগথ অভিজাত সম্প্রদায় সুবিধা-ভোগী শ্রেণী হিসাবে পরিচিত ছিলেন । প্রশাসনে ইহাদের বিশেষ প্রভাব ছিল । বিশপ ও রাজার মধ্যে গভীর সান্নিধ্যের কারণে বহু প্রশাসনিক বিষয় চার্চপরিষদ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হইত । জনসাধারণের সহিত বিশপদের সরাসরি যোগাযোগ থাকার দরুন তাঁহারা রাজা উয়াম্বা ও উইতিজার বিরুদ্ধে জনগণকে বিদ্রোহ করিতে অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করেন । বিশপগণ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য রাজাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও অবজ্ঞা প্রকাশ করিতেন । যাজকগণ বিভিন্ন দলে বিভক্ত হইয়া পড়েন । তাঁহারা অগাধ ধনসম্পদের অধিকারী ছিলেন । তাঁহারাই যাজকদের পরিষদ পরিচালনা করিতেন । যাজক পরিষদের সীমাহীন প্রভাব ছিল জনসাধারণের উপর । যাজকদের কুকর্ম ও অপকর্মের অন্ত ছিল না । তাঁহারা নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী রাজা নির্বাচন করিতেন এবং প্রশাসনের মর্যাদাপূর্ণ পদগুলি তাঁহাদের অধিকারে ছিল । চার্চের অধীনস্থ কর্মচারীগণ যাজকের পরিবর্তে কার্য সম্পাদন করিতেন ।
যুবরাজ ও সামন্ত প্রভুদের সমন্বয়ে স্পেনের অভিজাত শ্রেণী গড়িয়া ওঠে । ৮ জুয়া, মদ, ঘোড়দৌড়, বনভোজন ও বিলাসিতার মধ্যে নিমজ্জিত থাকিয়া তাহারা দিনাতিপাত করিতেন । তাঁহারা বাস করিতেন সুরম্য ও সুশোভিত রাজপ্রাসাদে । প্রজাকুলের কল্যাণের প্রতি তাঁহাদের কোন দৃষ্টি ছিলনা । শাসকগণ ভুলিয়া গিয়াছিলেন যে, প্রজাদের আনুগত্য, সহযোগিতা ও সমর্থনের উপরই তাহাদের অস্তিত্ব নির্ভর করে ।
প্রজাগণকেও আবার দুই শ্রেণীতে ভাগ করা যাইতে পারে । ৯ পৌরকার্যক্রম পরিচালনায় নিযুক্ত যাজক ও বর্গাদার সমন্বয়ে গঠিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী । এ মধ্যবিত্ত শ্রেণী অনধিক পঁচিশ একর ভূমির মালিক ছিলেন । এই ভূমি হস্তান্তরের অধিকার তাহাদের ছিল না । তাহারা এই জমিগুলি ফসল উৎপাদনের জন্য চাষীদিগকে বর্গা দিতেন । অনাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির ফলে ফসল উৎপন্ন না হইলে বর্গাদারদের নিজের পকেট হইতে জমিদারের খাজনা পরিশোধ করিতে হইত । ইহার ফলে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী তাহাদের ভূসম্পত্তি ত্যাগ করিয়া হয় সেনাবাহিনীর চাকুরী গ্রহণ করিতেন অথবা জীবন ধারণের জন্য নীচু পেশা গ্রহণ করিতেন ।
স্পেনের সর্বনিম্ন শ্রেণী গড়িয়া উঠিয়াছিল ভূমিদাস (সার্ফ) ও ক্রীতদাসদের সমন্বয়ে । ১০ এইসব হিস্পানীয়-রোমান ভূমিদাসগণ ছিল স্বাধীনচেতা ও রোমান উপনিবেশের উত্তরাধিকারী । বর্গাদার ও ভূমিদাসদের মধ্যবর্তীস্থানে ছিল ইহাদের অবস্থান । কৃষি-শ্রমিক ও সেনা বিভাগের লোক সরবরাহের কঠিন দায়িত্ব অর্পিত ছিল তাঁহাদের উপর । ক্রীতদাসদের ভাগ্য বিজড়িত ছিল ভূমির সহিত । জমি বিক্রি বলিতে জমির সহিত সংশ্লিষ্ট ক্রীতদাসকেও বুঝাইত । ভূমিরাজস্ব ব্যতীত তাহাদিগকে ব্যক্তিগত করও প্রদান করিতে হইত । সামান্য ভুল-ত্রুটির জন্য তাহাদের উপর অমানুষিক দৈহিক নির্যাতন চলিত । রোমান শাসনের শেষ অধ্যায়ে তাহাদের অবস্থা প্রায় ক্রীতদাসদের সমপর্যায়ে ছিল । ভিজিগথ শাসনকালে ক্রীতদাস ও ভূমিদাসদের মানবীয় অধিকার সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করা হয় । ব্যক্তিস্বাধীনতা বলিতে কোন কিছু ছিল না । দূর-দূরান্ত হইতে পানি বহন ও জঙ্গল হইতে কাষ্ঠ সংগ্রহ করাই ছিল তাহাদের একমাত্র কাজ । ভূমিদাস ও ক্রীতদাস তাহাদের প্রভুর বিনা অনুমতিতে বিবাহ করতে পারিত না । প্রভুর পূর্ব অনুমতি ব্যতীত বিবাহ করিলে উহা বাতিল বলিয়া গণ্য হইত এবং স্বামী-স্ত্রী বিচ্ছিন্ন অবস্থায় জীবন-যাপন করিতে বাধ্য হইত । প্রতিবেশী দুই জমিদারের ক্রীতদাসদের মধ্যে বিবাহ-শাদী হইলে উভয় জমিদারই তাহাদের সন্তান-সন্ততি ভাগ বাটোয়ারা করিয়া লইত । পণ্যসামগ্রীর ন্যায় ক্রীতদাস সর্বদা বাজারে ক্রয়-বিক্রয় হইত । সমাজে ক্রীতদাস প্রথা ব্যাপক ভাবে প্রচলিত ছিল । ৪০০০ হইতে ৮০০০ ক্রীতদাস এক এক ব্যক্তির অধীনে থাকিত । ভিজিগথ শাসকগণ ক্রীতদাসদের কয়েকটি শ্রেণীতে বিভক্ত করিয়াছিলেন । কৃষিজীবী, মেষপালক, মৎস্যজীবী ও কর্মচারী ইত্যাদি । সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হইয়া মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণী কোন কোন সময় বনে জঙ্গলে আত্মগোপন করিত এবং দস্যু ও লুন্ঠনকারীতে পরিণত হইত । রোমান শাসনকাল হইতে ভিজিগথ শাসন পর্যন্ত নাগরিক সুযোগ সুবিধা হইতে বঞ্চিত শহরগুলি তাহারা সময় সময় লুণ্ঠন করিত । নির্মম অত্যাচারের শিকার এই সব জনগণের চারিত্রিক অবনতির সাথে সাথে তাহাদের অর্থনৈতিক দুর্দশাও চরমে পৌছে ।
টিকাঃ
৭। ক) ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ২১৬। খ) ইবনে খালিক্যান (অনুবাদ দ্য স্লেভ), ১১, পৃঃ ১৪, ৫৫৮।
৮। ডজি, প্রাগুক্ত, পৃঃ ২২৯।
৯। ঐ পৃ. ২১৭-২১৮।
১০। আমীর আলী, হিস্ট্রি অব দ্যা স্যারাসিন্স, পৃঃ ১০৭; ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ২২৮।
📄 অর্থনৈতিক অবস্থা
মুসলমানদের আগমনের পূর্বে স্পেনের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল বিপর্যস্ত । ১১ স্পেনের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে ইহুদীদের প্রভাব ছিল সীমাহীন । তাহারা ছিল স্পেনের জাতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড । কিন্তু ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার দরুন তাহারা মিল কারখানা, দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ করিয়া দেশত্যাগ করে । ফলে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অচল অবস্থার সৃষ্টি হয় । একদিকে বিত্তবানদের কর হইতে অব্যাহতি প্রদান অপরদিকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উপর সীমাহীন করধার্য করার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে নামিয়া আসে আর্থিক বিপর্যয় ও দুর্ভোগ । আমীর আলী বলেন, "শিল্প কারখানাগুলিতে অতিরিক্ত কর আরোপের ফলে সারাদেশ অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত্বের কবলে পতিত হয় ।" ভূমিদাস ও ক্রীতদাসগণ জমির মালিক ছিলনা । জমিদার ও সরকারের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হইলে তাহাদের উপর নামিয়া আসিত কঠোর অত্যাচার ও নির্যাতন । এই নির্মম অত্যাচার হইতে বাঁচিবার জন্য তাহারা বনে জঙ্গলে পলাইয়া যাইত ও দস্যুদের দলে যোগদান করিত । ফলে মিল কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হইত ও সেচকার্যের অভাবে জমি অনাবাদী অবস্থায় পড়িয়া থাকিত । অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার দরুন সমগ্র রাজ্য দস্যুদের লীলাক্ষেত্রে পরিণত হয় । ফলে যাতায়াত ও ব্যবসা বাণিজ্যে অচল অবস্থা দেখা দেয় । ধ্বংসপ্রাপ্ত এই অর্থনীতি অষ্টম শতাব্দীতে মুসলমানদের প্রচেষ্টায় পুনর্জীবন লাভ করে ।
টিকাঃ
১১। আমীর আলী, হিস্ট্রি অব দ্যা স্যারাসিন্স, পৃঃ ১০৬।
📄 ধর্মীয় অবস্থা
স্পেনে ধর্মীয় সহনশীলতা ছিল অনুপস্থিত । ১২ ভিজিগথগণ নিজদিগকে আর্য খ্রীস্টান সম্প্রদায়ভুক্ত বলিয়া দাবী করিত । ৫৮৭ খ্রীস্টাব্দে তাহাদের রাজা রিকার্ড (৫৮৬-৬০১ খ্রীঃ) ক্যাথলিক ধর্মমত গ্রহণ করেন এবং ইহা রোমানগণ পছন্দ করিত না । ১৩ ক্যাথলিক ধর্মমতকে রাষ্ট্রীয়ধর্ম হিসাবে প্রতিষ্ঠা করিয়া স্পেনের ইতিহাসে তিনি সুখ্যাতি ও সুনাম অর্জন করেন । এই সময় হইতেই স্পেন গোঁড়া ধর্মমতে বিশ্বাসী হয় এবং অন্য ধর্মের প্রতি অসহিষ্ণু বলিয়া খ্যাতি লাভ করে । ইহুদীগণ খ্রীস্টানদের কোপানলে পতিত হয় । নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখিবার জন্য সংঘবদ্ধ হইবার চেষ্টা করিলেও বিশপের অকথ্য নির্যাতন ভোগ করিতে হইত । তাহাদিগকে খ্রীস্টান ধর্মে 'ধর্মান্তরিত' করিবার বিরামহীন প্রচেষ্টা চলিত । ৬১১ খ্রীস্টাব্দে গথিকরাজ সিসেবুত, খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলে ইহুদীদের ধনসম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও তাহাদেরকে নির্বাসনে পাঠাইবার অধিকার আইনসিদ্ধ করেন । ফলে বেশ কিছু সংখ্যক ইহুদী নামমাত্র খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণ করে । ইহুদীদের উপর অত্যাচার ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের আইন পাশ করিবার জন্য তৎকালীন স্পেনের রাজধানী টলেডোতে সময় সময় গথিকরাজের পরামর্শ পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হইত । ৬১২ খ্রীস্টাব্দ হইতে ৬২০ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ে ৯০,০০০ ইহুদীকে জোরপূর্বক খ্রীস্টান ধর্মে দীক্ষিত করা হয় । এডউইন হোলের মতে, "ফুয়েরো খুজগো, ইহুদীদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান, বার্ষিক উৎসব ও বিবাহ অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ ঘোষণা করে । ১৪ কোন ইহুদী তাহার সন্তানকে খ্রীস্টধর্মে দীক্ষিত করিতে অসম্মতি জানাইলে শাস্তিস্বরূপ তাহাকে একশত বেত্রাঘাত, ধনসম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও মস্তকমণ্ডন প্রভৃতি শাস্তি ভোগ করিতে হইত । ৬৮১ খ্রীস্টাব্দে দ্বাদশতম অধিবেশনে গথিকরাজের পরামর্শ পরিষদ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে হয় ইহুদীগণ খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণ করিবে অন্যথায় তাহাদিগকে দেশত্যাগ করিতে হইবে । ৬৯৩ খ্রীঃ অনুষ্ঠিত পরামর্শ পরিষদের এক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাহাদিগকে ব্যবসা-বাণিজ্য হইতে বঞ্চিত করা হয় । অতঃপর উত্তর আফ্রিকার ইহুদীদের সহিত একত্রিত হইয়া স্পেনের ইহুদীগণ ভিজিগথ শাসনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় । ৬৯৪ খ্রীস্টাব্দে উপদেষ্টা পরিষদ ইহুদীদিগকে তাহাদের সাত বৎসরের পুত্র-কন্যাসহ ক্রীতদাসরূপে বিক্রয় এবং খ্রীস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করিবার ফরমান জারী করে । ১৫ অত্যাচারে জর্জরিত, মর্মাহত ও বিক্ষুদ্ধ ইহুদীগণ জিব্রাল্টার প্রণালীর অপর পারে উত্তর-আফ্রিকায় বসবাসরত সমগোত্রীয় ও সমধর্মীয় বার্বারদের সহযোগিতায় গথিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে । এই পরিকল্পনা ফাঁস হইয়া যাইবার ফলে তাহাদিগকে কঠোর শাস্তি ভোগ করিতে হয় । তাহাদের স্থাবর অস্থাবর যাবতীয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ঘোষিত হয় । এই অত্যাচার হইতে রক্ষাপ্রাপ্ত ইহুদী যুবা, বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ নির্বিশেষে ক্রীতদাস হিসাবে খ্রীস্টানদের হস্তে সমর্পিত হয় । বৃদ্ধগণ যদিও তাহাদের পূর্বধর্মে থাকিবার অনুমতি লাভ করে কিন্তু যুব সম্প্রদায় খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণ করিতে বাধ্য হয় । ইহুদীদের সহিত ইহুদীদের বিবাহ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় এবং খ্রীস্টান ক্রীতদাসদের সহিত ইহুদীদের বিবাহের রেওয়াজ প্রচলিত হয় । এই রূপে গথিক শাসকগণ একটি উন্নত মানব সমাজকে মানবীয় অধিকার হইতে বঞ্চিত করেন । ইহুদীগণ স্বাধীন ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় প্রতীক্ষা করিতে থাকে ।
টিকাঃ
১২। দ্রষ্টব্য: এমিলিও গার্সিয়া গমেজ, হিস্টোরিয়া ডি ইস্পানা, ভল্যুম ৪, মাদ্রিদ, ১৯৫০, পৃঃ ৪-৫।
১৩। ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ২২৩ ও টীকা ২; দ্রষ্টব্য দ্যা স্ট্রাকচার অব স্পেনিশ হিস্ট্রি, ১৯৫৪, পৃঃ ৬৩।
১৪। আন্দালুস, স্পেন আন্ডার দ্যা মুসলিমস, লন্ডন, ১৯৫৮, পৃ. ৫, ১০।
১৫। আমীর আলী, হিস্ট্রি অব দ্যা স্যারাসিনস্, পৃঃ ১০৭।
📄 রাজনৈতিক অবস্থা
স্পেনে বসবাসরত পশ্চিমী রোমানদের উত্তরাধিকারী ভিজিগথ শাসকদের মধ্যে উয়াম্বা এবং উইতিজা সুশাসন ও জনহিতকর কার্যের জন্য সুবিখ্যাত ও জনপ্রিয় ছিলেন । উয়াম্বার শাসনকালে স্পেন শান্তি শৃঙ্খলা ও সমৃদ্ধি লাভ করিলেও পরবর্তীকালে উয়াম্বা উচ্চাভিলাষী হইয়া উঠিলে অভিজাত সম্প্রদায় ও যাজকদের ষড়যন্ত্রের শিকারে পরিণত হয় । ফলে স্পেনে অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় । মুসা ইবনে নুসাইর ১৬ যখন তিউনিসিয়ার ভাইসরয় ছিলেন সেই সময়ে বায়েটিকার ডিউক ৮২ বৎসর বয়স্ক রডারিক (লুজরিক) রাজা উইতিজাকে ১৭ হত্যা করিয়া আইবেরিয়ার সিংহাসন অধিকার করেন । উইতিজা ৭০২ খ্রীস্টাব্দে তাঁহার পিতা এজিকার উত্তরাধিকারী নির্বাচিত হন এবং তিনি তাঁহার পুত্র আচিলাকে (আখিলা) ৪১৪ খ্রীস্টাব্দের প্রারম্ভে ভিজিগথগণ কর্তৃক দখলকৃত উত্তর-পূর্ব স্পেনের রোমান প্রদেশ তারাকোনেন্সিস-এ গভর্নর নিযুক্ত করেন । আচিলা রডারিক কর্তৃক সিংহাসনচ্যুত হইয়া গ্যালিসিয়ায় পলায়ন করেন ।
রাজতন্ত্র তাহার পূর্ব জৌলুস হারাইয়া ফেলে । সেনাবাহিনীর মধ্যে অসন্তুষ্টির ফলে উত্তরাধিকারীদের জীবনের নিরাপত্তা বিপন্ন হয় । শাসকগণ বিশপদের দ্বারা নির্বাচিত হইতেন । সমাজে বিশপদের প্রভাব ছিল অপরিসীম । কোন কোন রাজা স্বীয় উত্তরাধিকারীর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য বিশপদেরকে রাষ্ট্র পরিচালনায় তাহাদের সহিত অংশীদার রাখিতেন । ইহাতে বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় অসন্তুষ্ট হইয়া ওঠেন, কেন না উত্তরাধিকারী নির্বাচনে তাহারাও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইতেন । ৬৮০ খ্রীস্টাব্দে উয়াম্বাকে সিংহাসনচ্যুত করিবার পর স্পেনে ভিজিগথ শাসনের শেষ একত্রিশ বৎসর দারুণ বিশৃঙ্খলার মধ্যে অতিবাহিত হয় । অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে টলেডোর সিংহাসন অধিকারের প্রতিযোগিতা দেখা দেয় । ইহার ফলে দূরবর্তী প্রদেশের গভর্নর ও বিদ্রোহী নেতাগণ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ লাভ করে । কেন্দ্রীয় শাসনের দুর্বলতা ও সৈনিকদের নিয়মিত মাহিনা প্রদান করিতে না পারার দরুন বিদ্রোহ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ব্যর্থ হয় । সেনাবাহিনীর মধ্যে অসন্তোষের কারণে রাজার প্রয়োজনীয় সংখ্যক সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী সেনাবাহিনী ছিল না । রাজার আদেশে সকল সক্ষম ব্যক্তি সেনাবাহিনীতে যোগদান করিলেও মনে মনে অসন্তুষ্ট থাকিত । পরবর্তীকালে পশ্চিম ইউরোপের জায়গীর প্রথার ন্যায় তাহাদের মধ্যে জায়গীর প্রথার প্রচলন করা হয় ।
সার্বক্ষণিক ও নিয়মিত কোন সেনাবাহিনী ছিল না । ভূমিদাস ও ক্রীতদাসকে বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে যোগদান করিতে হইত । কিন্তু তাহারা নিয়মিত বেতন পাইত না । এইরূপ অনিয়মিত ও প্রশিক্ষণ বিহীন সেনাবাহিনী গড়িয়া ওঠায় সপ্তম শতাব্দীর শেষাংশে গথিক শাসকগণ প্রয়োজনীয় সেনা সংগ্রহে অসুবিধার সম্মুখীন হন । জার্মান দলপতি-শাসন পদ্ধতির সংগে তৎকালীন ভিজিগথ শাসকগণ স্পেনের পারিপার্শ্বিকতার কারণে খাপ খাওয়াইতে ব্যর্থ হন ।
মুসলিম আক্রমণের সাথে সাথে অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে উত্তরাধিকার প্রশ্নে মতবিরোধ দেখা দেয় । ৬৮৭ খ্রীস্টাব্দে পিতা এবং পুত্র মিলিতভাবে রাজ্য শাসন করেন । উইতিজার প্রতি দেশের জনগণের সীমাহীন ভক্তি শ্রদ্ধা ছিল । উইতিজা ইহুদীদের পৃষ্ঠপোষকতা করিতেন । তিনি আশা করিয়াছিলেন, তাঁহার পুত্র উত্তরাধিকারী নির্বাচিত হইবে । পুত্রকে উত্তর-পূর্ব তারাকোনেন্সিস প্রদেশের গভর্নর নিযুক্ত করিয়া প্রশাসন কার্য পরিচালনায় দক্ষতা অর্জনের জন্য নিজের পাশে পাশে রাখিবেন । অভিজাত শ্রেণীর এক অংশ উইতিজার শাসনের বিরোধিতা করেন এবং শেষ পর্যন্ত রডারিককে রাজা নির্বাচন করেন । আচিলা নিজ শাসনাধীন প্রদেশ স্বাধীন বলিয়া ঘোষণা করেন এবং স্বীয় নামে মুদ্রার প্রচলন করেন । সিউটার গভর্নর ও উইতিজার জামাতা কাউন্ট জুলিয়ান (ইলিয়ান) তৎকালীন প্রথানুযায়ী স্বীয় কন্যা ফ্লোরিন্ডাকে ১৮ রাজকীয় আদবকায়দা ও শিষ্টাচার রপ্ত করিবার জন্য রডারিকের রাজপ্রাসাদে প্রেরণ করেন । ফ্লোরিন্ডা রডারিক কর্তৃক প্রলুব্ধ হইয়া বিপথগামিনী হন । রডারিকের আচরণে জুলিয়ান গভীরভাবে মর্মাহত হন । জুলিয়ান অপমানের প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে ও আফ্রিকায় বসবাসরত দেশত্যাগীদের অনুরোধে দেশকে বে-আইনী দখল হইতে মুক্ত করিবার জন্য সংকল্প করেন এবং স্পেনের অবস্থা সম্পর্কে মুসাকে গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান গোপন তথ্য সরবরাহ করেন ।
হিট্টি ১৯ এবং হোলের ২০ ন্যায় বিখ্যাত পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকগণ এই ঘটনার প্রতি অতি সামান্য গুরুত্ব প্রদান করিয়াছেন । যে জুলিয়ান দীর্ঘদিন মুসলিম অধিকার হইতে সিউটাকে রক্ষা করেন পরবর্তীকালে সেই জুলিয়ানই সিউটাকে শুধু মুসলমানদের নিকট হস্তান্তরই করেন নাই উপরন্তু স্পেন অধিকার করিতে তারিক ও মুসাকে সর্বপ্রকার সাহায্য ও সহযোগিতা সক্রিয় ভাবে দান করেন । ইহারও কোন ব্যাখ্যা ঐতিহাসিকগণ দেন নাই । কিন্তু জুলিয়ানের ব্যবহার এই ইঙ্গিতই প্রদান করে যে, রডারিক নিশ্চয়ই অশালীন এবং অন্যায় ব্যবহার করিয়াছিলেন । অপরদিকে সমকালীন আরব ও স্পেনীয় ঐতিহাসিকগণ এ ব্যাপারে ফ্লোরিন্ডার উপাখ্যান ব্যতীত অন্য কোন দুর্ঘটনার উল্লেখ করেন নাই । ফলে রডারিক মৃত রাজার পুত্র ও ভ্রাতাদের আত্মীয় স্বজনের নেতৃত্বে গঠিত এক শক্তিশালী সেনাবাহিনীর বিরোধিতার সম্মুখীন হন এবং অবিশ্বাসী সেনাবাহিনীর উপর নির্ভর করিতে বাধ্য হন । উইতিজার ভ্রাতাদের মধ্যে বিশপ অপ্পাস ও সিসবার্ট এবং পুত্রদের মধ্যে আচিলা ছিলেন বিশেষ প্রভাবশালী । ভিজিগথ অভিজাত সম্প্রদায় ও রাজপরিবারের সদস্যদের মধ্যে মতবিরোধের ফলে রাজ্যে বিবাদ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় ।
দারিদ্র্যক্লিষ্ট জনসাধারণ, দুঃখী ক্রীতদাস, দুর্ভাগা ভূমিদাস এবং উৎপীড়িত ইহুদীগণ সকলে সমবেতভাবে একজন ত্রাণকর্তার অপেক্ষা করিতেছিলেন । স্পেনের মোহাজেরগণ যেখানে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন শেষপর্যন্ত সেই মুসলিম আফ্রিকা হইতেই তাঁহার আগমন ঘটিল । সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ধনী জমিদারগণ রাষ্ট্রের শাসন কার্য পরিচালনা করিতেন । তাঁহারা বিলাসপ্রিয় হইয়া উঠিবার ফলে শৌর্যবীর্য ও কর্মক্ষমতা হারাইয়া ফেলেন । দুঃশাসন, যাজকদের অতিরিক্ত প্রভাব, অভ্যন্তরীণ অনৈক্য, শত্রুতা, ষড়যন্ত্র এবং প্রজাদের অসন্তুষ্টিই ভিজিগথ শাসন অবসানের প্রকৃত কারণ । খণ্ড বিখণ্ড ও ধ্বংসপ্রাপ্ত গথিক সাম্রাজ্য প্রতিরক্ষার দায়িত্ব অর্পিত ছিল অনিয়মিত বেতন প্রাপ্ত সেনাবাহিনীর উপর, যাহারা প্রভুর পক্ষে যুদ্ধ না করিয়া নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সুযোগ বুঝিয়া শত্রুপক্ষে যোগদান করিত । এই অসন্তোষ ভিজিগথ সেনাবাহিনীর মধ্যে ভীষণ বিশৃঙ্খলা ও দুর্বলতার সৃষ্টি করে এবং ১২,০০০ সৈনিকের এক ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনী ভিজিগথ শাসনকে প্রথম আঘাতেই সমূলে উৎখাত করে । ২১
টিকাঃ
১৬. মুসার পিতা নুসাইরকে বন্দি হিসেবে আইন তামার থেকে আনা হয়।
১৭. ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ২৩১; দ্রষ্টব্য, স্পেন আন্ডার দ্যা ভিজিগস্স, কেমব্রীজ মেডিয়াভ্যাল হিস্ট্রি, ২য় খণ্ড, ১৯১৩, পৃঃ ১৮২।
১৮. ইবনুল আছির, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ৪৪৩; স্পেন আন্ডার দ্যা ভিজিগথস্, কেমব্রীজ মেডিয়াভ্যাল হিস্ট্রি, ২য় খণ্ড, কেমব্রীজ, ১৯১৩, পৃঃ ৮৪।
১৯. পি. কে. হিট্টি, হিস্ট্রি অব দ্যা আরবস্, লন্ডন, ১৯৫১, পৃঃ ৪৯৪, টীকা-১।
২০. আন্দালুস, পৃঃ ২১।
২১. দ্রষ্টব্য: ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ২৩০।