📄 মুসলমানদের আগমনের পূর্বে স্পেন
হিজরী প্রথম শতাব্দীর মধ্যে মুসলিম সাম্রাজ্য পূর্বে হিন্দুকুশ হইতে পশ্চিমে আটলান্টিকের উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে । স্থায়ীভাবে বসবাসরত ও যাযাবর জাতীয় বার্বারদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগ লইয়া মুসলমানগণ শেষ পর্যন্ত তিউনিসিয়াতে নিজদিগকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন । ৬৯৮ খ্রীস্টাব্দে বাইজান্টাইনের অধিবাসীগণ তাহাদের উত্তর আফ্রিকার রাজধানী কার্থেজ হইতে বিতাড়িত হয় । অষ্টম শতাব্দীর প্রথম হইতেই মুসলমানগণ আলজিরিয়ার মধ্য দিয়া মরক্কোতে প্রবেশ করিতে শুরু করে । এই এলাকায় স্থায়ী বসবাসকারী বার্বারগণ মুসলমানদের অগ্রাভিযানে বাধা প্রদান করিলে তিউনিসিয়ার নবনিযুক্ত গভর্নর মুসা বিন নুসাইর তাহাদিগকে সমূলে ধ্বংস করেন । মুসা বিন নুসাইর উমাইয়া খলিফাদের অধীন ছিলেন । পূর্বে তিনি মিসরের গভর্নরের অধীনে কায়রোওয়ানের শাসনকর্তা হিসাবে কার্য পরিচালনা করেন । পরবর্তীকালে ৬৭০ খ্রীস্টাব্দে কায়রোওয়ানে উত্তর আফ্রিকার মুসলিম রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হয় । আমীর আলী বলেন, "ইফ্রিকিয়া যখন মুসলিম শাসনাধীনে সহিষ্ণুতা ও সুবিচারের আশীর্বাদপুষ্ট হইয়া পার্থিব উন্নতির চরম শিখরে উন্নীত তখন আইবেরিয়ান উপদ্বীপ ভিজিগথ শাসনের কঠোর ও কঠিন যাতাকলে নিষ্পেষিত হইতেছিল ।" ৩
ভিজিগথ শাসকগণ তাহাদের পূর্ববর্তী সুয়েভী ও ভ্যান্ডাল শাসকদের অপেক্ষা নিজদিগকে উত্তম বলিয়া প্রমাণ করিতে ব্যর্থ হন । স্পেন প্রায় তিনশত বৎসর (৪০৯-৭১২ খ্রীঃ) ভিজিগথ শাসনাধীনে ছিল । ৪ এই দীর্ঘ সময়ে তাঁহারা পূর্ববর্তী শাসক সিজারদের (কায়সার) দুঃশাসন ও অন্যায় অত্যাচারের কালিমা দূরীভূত করিতে ব্যর্থ হন । বরং তাঁহাদের দুঃশাসনে জনগণের দুঃখকষ্ট আরও বৃদ্ধি পায় । ৫ গথিক শাসন “ধ্বংসলীলা, গণহত্যা ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্দয়ভাবে দমন এবং আক্রমণকারী বার্বারদের (অসভ্য জাতি) অভ্যন্তরীণ কোন্দলে পরিপূর্ণ ।" উত্তরাধিকারী নির্বাচনে বুদ্ধিজীবীদের গণতান্ত্রিক প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় । সংক্ষেপে বলা যায় যে, ভিজিগথ রাজতন্ত্র রোমান ইতিহাসের ব্যর্থতার প্রতীক । উঁচু নীচুর ব্যবধান; উত্তরাধিকারী নির্বাচনে সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর প্রতি নিম্নশ্রেণীর অসন্তুষ্টি সেনাদের মধ্যে আস্থাহীনতা, অর্থনৈতিক দূরবস্থা ও ইহুদীদের দুর্ভোগের ইতিহাস ভিজিগথ শাসনের ব্যর্থতার স্বাক্ষর বহন করে । ৬
টিকাঃ
৩. ক) আমীর আলী, হিস্ট্রি অব দ্যা স্যারাসিন্স, লন্ডন, ১৯৫১, পৃঃ ১০৬। খ) ইমামউদ্দিন, সোশিও-ইকোনোমিক এ্যান্ড কালচারাল হিস্ট্রি অব মুসলিম স্পেন, লেডেন, ১৯৬৫, পৃঃ ১৫ গ) জার্নাল অব পাকিস্তান হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি, করাচি, ১৯৫৮, পৃঃ ১১৭
৪. ক) ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, লন্ডন, ১৯১৩. পৃঃ ২১৫। খ) উইলকিনসন, লিটেরেরি হিস্ট্রি অব দ্যা আরবস, পৃঃ ৪৩৫।
৫. ক) লুইস বারট্রান্ড, দ্যা হিস্ট্রি অব স্পেন, লন্ডন, ১৯৫৬, পৃঃ ১৮। খ) জার্নাল অব পাকিস্তান হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি, ১৯৫৮, পৃঃ ১১৭।
৬. লুইস, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯; এম. এম. ইমামউদ্দিন, আল-আন্দালুস, মাদ্রিদ, গ্রানাডা, পৃঃ ২১০-১১।
📄 সামাজিক পরিবেশ
মুসলিম শাসনাধীনে আসিবার পূর্বে স্পেনের অধিবাসীগণ রাজা, ক্ষুদ্ররাজ্যের শাসক, অমাত্যবর্গ, যাজক, সামন্তরাজ, অভিজাত শ্রেণী, বর্গাদার, ভূমিদাস (সার্ফ) ও ক্রীতদাস ইত্যাদি শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল । ৭ ইহাদিগকে মোটামুটিভাবে শাসক ও শাসিত এই দুই শ্রেণীতে ভাগ করা যাইতে পারে । শাসক শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন রাজা, ধর্মযাজক ও অভিজাত শ্রেণী । অপরদিকে বর্গাদার, ভূমিদাস (সার্ফ), ক্রীতদাস ও ইহুদীগণ ছিল শাসিত শ্রেণীভুক্ত ।
অষ্টম শতাব্দীর প্রারম্ভে স্পেনীয় রোমান ও ভিজিগথ অভিজাত সম্প্রদায় সুবিধা-ভোগী শ্রেণী হিসাবে পরিচিত ছিলেন । প্রশাসনে ইহাদের বিশেষ প্রভাব ছিল । বিশপ ও রাজার মধ্যে গভীর সান্নিধ্যের কারণে বহু প্রশাসনিক বিষয় চার্চপরিষদ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হইত । জনসাধারণের সহিত বিশপদের সরাসরি যোগাযোগ থাকার দরুন তাঁহারা রাজা উয়াম্বা ও উইতিজার বিরুদ্ধে জনগণকে বিদ্রোহ করিতে অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করেন । বিশপগণ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য রাজাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও অবজ্ঞা প্রকাশ করিতেন । যাজকগণ বিভিন্ন দলে বিভক্ত হইয়া পড়েন । তাঁহারা অগাধ ধনসম্পদের অধিকারী ছিলেন । তাঁহারাই যাজকদের পরিষদ পরিচালনা করিতেন । যাজক পরিষদের সীমাহীন প্রভাব ছিল জনসাধারণের উপর । যাজকদের কুকর্ম ও অপকর্মের অন্ত ছিল না । তাঁহারা নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী রাজা নির্বাচন করিতেন এবং প্রশাসনের মর্যাদাপূর্ণ পদগুলি তাঁহাদের অধিকারে ছিল । চার্চের অধীনস্থ কর্মচারীগণ যাজকের পরিবর্তে কার্য সম্পাদন করিতেন ।
যুবরাজ ও সামন্ত প্রভুদের সমন্বয়ে স্পেনের অভিজাত শ্রেণী গড়িয়া ওঠে । ৮ জুয়া, মদ, ঘোড়দৌড়, বনভোজন ও বিলাসিতার মধ্যে নিমজ্জিত থাকিয়া তাহারা দিনাতিপাত করিতেন । তাঁহারা বাস করিতেন সুরম্য ও সুশোভিত রাজপ্রাসাদে । প্রজাকুলের কল্যাণের প্রতি তাঁহাদের কোন দৃষ্টি ছিলনা । শাসকগণ ভুলিয়া গিয়াছিলেন যে, প্রজাদের আনুগত্য, সহযোগিতা ও সমর্থনের উপরই তাহাদের অস্তিত্ব নির্ভর করে ।
প্রজাগণকেও আবার দুই শ্রেণীতে ভাগ করা যাইতে পারে । ৯ পৌরকার্যক্রম পরিচালনায় নিযুক্ত যাজক ও বর্গাদার সমন্বয়ে গঠিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী । এ মধ্যবিত্ত শ্রেণী অনধিক পঁচিশ একর ভূমির মালিক ছিলেন । এই ভূমি হস্তান্তরের অধিকার তাহাদের ছিল না । তাহারা এই জমিগুলি ফসল উৎপাদনের জন্য চাষীদিগকে বর্গা দিতেন । অনাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির ফলে ফসল উৎপন্ন না হইলে বর্গাদারদের নিজের পকেট হইতে জমিদারের খাজনা পরিশোধ করিতে হইত । ইহার ফলে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী তাহাদের ভূসম্পত্তি ত্যাগ করিয়া হয় সেনাবাহিনীর চাকুরী গ্রহণ করিতেন অথবা জীবন ধারণের জন্য নীচু পেশা গ্রহণ করিতেন ।
স্পেনের সর্বনিম্ন শ্রেণী গড়িয়া উঠিয়াছিল ভূমিদাস (সার্ফ) ও ক্রীতদাসদের সমন্বয়ে । ১০ এইসব হিস্পানীয়-রোমান ভূমিদাসগণ ছিল স্বাধীনচেতা ও রোমান উপনিবেশের উত্তরাধিকারী । বর্গাদার ও ভূমিদাসদের মধ্যবর্তীস্থানে ছিল ইহাদের অবস্থান । কৃষি-শ্রমিক ও সেনা বিভাগের লোক সরবরাহের কঠিন দায়িত্ব অর্পিত ছিল তাঁহাদের উপর । ক্রীতদাসদের ভাগ্য বিজড়িত ছিল ভূমির সহিত । জমি বিক্রি বলিতে জমির সহিত সংশ্লিষ্ট ক্রীতদাসকেও বুঝাইত । ভূমিরাজস্ব ব্যতীত তাহাদিগকে ব্যক্তিগত করও প্রদান করিতে হইত । সামান্য ভুল-ত্রুটির জন্য তাহাদের উপর অমানুষিক দৈহিক নির্যাতন চলিত । রোমান শাসনের শেষ অধ্যায়ে তাহাদের অবস্থা প্রায় ক্রীতদাসদের সমপর্যায়ে ছিল । ভিজিগথ শাসনকালে ক্রীতদাস ও ভূমিদাসদের মানবীয় অধিকার সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করা হয় । ব্যক্তিস্বাধীনতা বলিতে কোন কিছু ছিল না । দূর-দূরান্ত হইতে পানি বহন ও জঙ্গল হইতে কাষ্ঠ সংগ্রহ করাই ছিল তাহাদের একমাত্র কাজ । ভূমিদাস ও ক্রীতদাস তাহাদের প্রভুর বিনা অনুমতিতে বিবাহ করতে পারিত না । প্রভুর পূর্ব অনুমতি ব্যতীত বিবাহ করিলে উহা বাতিল বলিয়া গণ্য হইত এবং স্বামী-স্ত্রী বিচ্ছিন্ন অবস্থায় জীবন-যাপন করিতে বাধ্য হইত । প্রতিবেশী দুই জমিদারের ক্রীতদাসদের মধ্যে বিবাহ-শাদী হইলে উভয় জমিদারই তাহাদের সন্তান-সন্ততি ভাগ বাটোয়ারা করিয়া লইত । পণ্যসামগ্রীর ন্যায় ক্রীতদাস সর্বদা বাজারে ক্রয়-বিক্রয় হইত । সমাজে ক্রীতদাস প্রথা ব্যাপক ভাবে প্রচলিত ছিল । ৪০০০ হইতে ৮০০০ ক্রীতদাস এক এক ব্যক্তির অধীনে থাকিত । ভিজিগথ শাসকগণ ক্রীতদাসদের কয়েকটি শ্রেণীতে বিভক্ত করিয়াছিলেন । কৃষিজীবী, মেষপালক, মৎস্যজীবী ও কর্মচারী ইত্যাদি । সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হইয়া মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণী কোন কোন সময় বনে জঙ্গলে আত্মগোপন করিত এবং দস্যু ও লুন্ঠনকারীতে পরিণত হইত । রোমান শাসনকাল হইতে ভিজিগথ শাসন পর্যন্ত নাগরিক সুযোগ সুবিধা হইতে বঞ্চিত শহরগুলি তাহারা সময় সময় লুণ্ঠন করিত । নির্মম অত্যাচারের শিকার এই সব জনগণের চারিত্রিক অবনতির সাথে সাথে তাহাদের অর্থনৈতিক দুর্দশাও চরমে পৌছে ।
টিকাঃ
৭। ক) ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ২১৬। খ) ইবনে খালিক্যান (অনুবাদ দ্য স্লেভ), ১১, পৃঃ ১৪, ৫৫৮।
৮। ডজি, প্রাগুক্ত, পৃঃ ২২৯।
৯। ঐ পৃ. ২১৭-২১৮।
১০। আমীর আলী, হিস্ট্রি অব দ্যা স্যারাসিন্স, পৃঃ ১০৭; ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ২২৮।
📄 অর্থনৈতিক অবস্থা
মুসলমানদের আগমনের পূর্বে স্পেনের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল বিপর্যস্ত । ১১ স্পেনের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে ইহুদীদের প্রভাব ছিল সীমাহীন । তাহারা ছিল স্পেনের জাতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড । কিন্তু ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার দরুন তাহারা মিল কারখানা, দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ করিয়া দেশত্যাগ করে । ফলে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অচল অবস্থার সৃষ্টি হয় । একদিকে বিত্তবানদের কর হইতে অব্যাহতি প্রদান অপরদিকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উপর সীমাহীন করধার্য করার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে নামিয়া আসে আর্থিক বিপর্যয় ও দুর্ভোগ । আমীর আলী বলেন, "শিল্প কারখানাগুলিতে অতিরিক্ত কর আরোপের ফলে সারাদেশ অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত্বের কবলে পতিত হয় ।" ভূমিদাস ও ক্রীতদাসগণ জমির মালিক ছিলনা । জমিদার ও সরকারের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হইলে তাহাদের উপর নামিয়া আসিত কঠোর অত্যাচার ও নির্যাতন । এই নির্মম অত্যাচার হইতে বাঁচিবার জন্য তাহারা বনে জঙ্গলে পলাইয়া যাইত ও দস্যুদের দলে যোগদান করিত । ফলে মিল কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হইত ও সেচকার্যের অভাবে জমি অনাবাদী অবস্থায় পড়িয়া থাকিত । অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার দরুন সমগ্র রাজ্য দস্যুদের লীলাক্ষেত্রে পরিণত হয় । ফলে যাতায়াত ও ব্যবসা বাণিজ্যে অচল অবস্থা দেখা দেয় । ধ্বংসপ্রাপ্ত এই অর্থনীতি অষ্টম শতাব্দীতে মুসলমানদের প্রচেষ্টায় পুনর্জীবন লাভ করে ।
টিকাঃ
১১। আমীর আলী, হিস্ট্রি অব দ্যা স্যারাসিন্স, পৃঃ ১০৬।
📄 ধর্মীয় অবস্থা
স্পেনে ধর্মীয় সহনশীলতা ছিল অনুপস্থিত । ১২ ভিজিগথগণ নিজদিগকে আর্য খ্রীস্টান সম্প্রদায়ভুক্ত বলিয়া দাবী করিত । ৫৮৭ খ্রীস্টাব্দে তাহাদের রাজা রিকার্ড (৫৮৬-৬০১ খ্রীঃ) ক্যাথলিক ধর্মমত গ্রহণ করেন এবং ইহা রোমানগণ পছন্দ করিত না । ১৩ ক্যাথলিক ধর্মমতকে রাষ্ট্রীয়ধর্ম হিসাবে প্রতিষ্ঠা করিয়া স্পেনের ইতিহাসে তিনি সুখ্যাতি ও সুনাম অর্জন করেন । এই সময় হইতেই স্পেন গোঁড়া ধর্মমতে বিশ্বাসী হয় এবং অন্য ধর্মের প্রতি অসহিষ্ণু বলিয়া খ্যাতি লাভ করে । ইহুদীগণ খ্রীস্টানদের কোপানলে পতিত হয় । নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখিবার জন্য সংঘবদ্ধ হইবার চেষ্টা করিলেও বিশপের অকথ্য নির্যাতন ভোগ করিতে হইত । তাহাদিগকে খ্রীস্টান ধর্মে 'ধর্মান্তরিত' করিবার বিরামহীন প্রচেষ্টা চলিত । ৬১১ খ্রীস্টাব্দে গথিকরাজ সিসেবুত, খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলে ইহুদীদের ধনসম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও তাহাদেরকে নির্বাসনে পাঠাইবার অধিকার আইনসিদ্ধ করেন । ফলে বেশ কিছু সংখ্যক ইহুদী নামমাত্র খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণ করে । ইহুদীদের উপর অত্যাচার ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের আইন পাশ করিবার জন্য তৎকালীন স্পেনের রাজধানী টলেডোতে সময় সময় গথিকরাজের পরামর্শ পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হইত । ৬১২ খ্রীস্টাব্দ হইতে ৬২০ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ে ৯০,০০০ ইহুদীকে জোরপূর্বক খ্রীস্টান ধর্মে দীক্ষিত করা হয় । এডউইন হোলের মতে, "ফুয়েরো খুজগো, ইহুদীদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান, বার্ষিক উৎসব ও বিবাহ অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ ঘোষণা করে । ১৪ কোন ইহুদী তাহার সন্তানকে খ্রীস্টধর্মে দীক্ষিত করিতে অসম্মতি জানাইলে শাস্তিস্বরূপ তাহাকে একশত বেত্রাঘাত, ধনসম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও মস্তকমণ্ডন প্রভৃতি শাস্তি ভোগ করিতে হইত । ৬৮১ খ্রীস্টাব্দে দ্বাদশতম অধিবেশনে গথিকরাজের পরামর্শ পরিষদ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে হয় ইহুদীগণ খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণ করিবে অন্যথায় তাহাদিগকে দেশত্যাগ করিতে হইবে । ৬৯৩ খ্রীঃ অনুষ্ঠিত পরামর্শ পরিষদের এক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাহাদিগকে ব্যবসা-বাণিজ্য হইতে বঞ্চিত করা হয় । অতঃপর উত্তর আফ্রিকার ইহুদীদের সহিত একত্রিত হইয়া স্পেনের ইহুদীগণ ভিজিগথ শাসনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় । ৬৯৪ খ্রীস্টাব্দে উপদেষ্টা পরিষদ ইহুদীদিগকে তাহাদের সাত বৎসরের পুত্র-কন্যাসহ ক্রীতদাসরূপে বিক্রয় এবং খ্রীস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করিবার ফরমান জারী করে । ১৫ অত্যাচারে জর্জরিত, মর্মাহত ও বিক্ষুদ্ধ ইহুদীগণ জিব্রাল্টার প্রণালীর অপর পারে উত্তর-আফ্রিকায় বসবাসরত সমগোত্রীয় ও সমধর্মীয় বার্বারদের সহযোগিতায় গথিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে । এই পরিকল্পনা ফাঁস হইয়া যাইবার ফলে তাহাদিগকে কঠোর শাস্তি ভোগ করিতে হয় । তাহাদের স্থাবর অস্থাবর যাবতীয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ঘোষিত হয় । এই অত্যাচার হইতে রক্ষাপ্রাপ্ত ইহুদী যুবা, বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ নির্বিশেষে ক্রীতদাস হিসাবে খ্রীস্টানদের হস্তে সমর্পিত হয় । বৃদ্ধগণ যদিও তাহাদের পূর্বধর্মে থাকিবার অনুমতি লাভ করে কিন্তু যুব সম্প্রদায় খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণ করিতে বাধ্য হয় । ইহুদীদের সহিত ইহুদীদের বিবাহ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় এবং খ্রীস্টান ক্রীতদাসদের সহিত ইহুদীদের বিবাহের রেওয়াজ প্রচলিত হয় । এই রূপে গথিক শাসকগণ একটি উন্নত মানব সমাজকে মানবীয় অধিকার হইতে বঞ্চিত করেন । ইহুদীগণ স্বাধীন ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় প্রতীক্ষা করিতে থাকে ।
টিকাঃ
১২। দ্রষ্টব্য: এমিলিও গার্সিয়া গমেজ, হিস্টোরিয়া ডি ইস্পানা, ভল্যুম ৪, মাদ্রিদ, ১৯৫০, পৃঃ ৪-৫।
১৩। ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ২২৩ ও টীকা ২; দ্রষ্টব্য দ্যা স্ট্রাকচার অব স্পেনিশ হিস্ট্রি, ১৯৫৪, পৃঃ ৬৩।
১৪। আন্দালুস, স্পেন আন্ডার দ্যা মুসলিমস, লন্ডন, ১৯৫৮, পৃ. ৫, ১০।
১৫। আমীর আলী, হিস্ট্রি অব দ্যা স্যারাসিনস্, পৃঃ ১০৭।