📄 আধুনিক উপাদান
জে. এ. কোন্দে রচিত 'হিস্তোরীয়া দে-লস দোমিনাসীয়ন দে-লস এরাবেস এন এস্পানীয়' গ্রন্থখানি ১৩৪৪ খ্রীস্টাব্দে তিন খণ্ডে প্রকাশিত হইলে তখন ইহা উচ্চমানের গ্রন্থ বলিয়া পরিগণিত হয় । এই বিষয়ে পথিকৃৎ হওয়ার দরুন কোন্দে তাঁহার গ্রন্থে অসংখ্য ভুল তথ্য পরিবেশন করেন । রেইনহার্ট ডজির শিক্ষক প্রফেসর ওয়েজার্স গ্রন্থখানির প্রতি ডজির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন । গ্রন্থখানির ভুলভ্রান্তি ডজিকে হতাশ করিলেও ইহা তাঁহাকে স্পেনের মুসলমানদের সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণার কাজ করে । তিনি আরবী গ্রন্থগুলির সমালোচনামূলক সংস্করণ ও মুসলিম স্পেনের রাজনীতি ও সাহিত্যের ইতিহাস ফরাসী ভাষায় অনুবাদ করার ব্যাপক প্রস্তুতি নেন । তেলেমসেনের বনু সাইয়ান, সেভিলের আব্বাদী এবং ইবনে আবদুনের কবিতার উপর গ্রন্থ রচনা ছাড়াও ডজি ১৮৪৭ খ্রীস্টাব্দে আবদুল ওয়াহিদ আল-মারাকুশী রচিত আলমুয়াহেদুন (মুয়াহহেদদের ইতিহাস) এবং ১৮৪৮ হইতে ১৮৫১ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে ইবনুল ইজারী রচিত 'আলবায়ানুল মাগরিব ফি আখবারিল মাগরিব' গ্রন্থ দুইটি সম্পাদনা করেন । ডজি ক্যাম্ব্রিজের উইলিয়াম রাইট, ফ্রান্সের গুস্তাভে ডুগাত ও জার্মানের লুডলফ ক্রেলের সহযোগিতায় ১৮৬১ খ্রীস্টাব্দে আল-মাক্কারীর সুবিখ্যাত গ্রন্থ 'নাফহুত্তিব' সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন । ডজির সুনাম সাধারণতঃ চার খণ্ডে প্রকাশিত তাঁহার রচিত গ্রন্থ 'হিস্তোয়ের দেস মুসলমানস্ দে এস্পান্ন'র উপর নির্ভর করে । ১৮৬১ খ্রীস্টাব্দে প্রকাশিত এই গ্রন্থটি আলমুরাবিও অভিযান হইতে শুরু করিয়া সেভিলের আব্বাসী শাসক মুতামিদের (১০৯৫ খ্রীঃ) শাসন কাল পর্যন্ত ঐতিহাসিক বর্ণনায় পরিপূর্ণ । ডজির লেখায় গভীর পাণ্ডিত্য এবং ঘটনা বিশ্লেষণে ভাষার সাবলীলতা খুবই হৃদয়গ্রাহী । ইহা এই বিষয়ের উপর একখানি উত্তম গ্রন্থ হিসাবে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা লাভ করিয়াছে । ফ্রান্সিস গ্রীফিন স্টকস গ্রন্থখানি 'স্পেনিস ইসলাম' নামে ইংরেজী ভাষায় অনুবাদ করেন এবং ইহা ১৯১৩ খ্রীস্টাব্দে লণ্ডনে প্রকাশিত হয় । ইহা উর্দুতে অনুবাদ করেন মৌঃ জাকাউল্লার পুত্র মুহম্মদ ইনায়েত উল্লাহ । 'ইব্বত নামায়ে আন্দালুস' নামে গ্রন্থখানি ১৯৩৯ খ্রীস্টাব্দে দিল্লীতে প্রকাশিত হয় ।
ডজির রচনার ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও ইহার অসম্পূর্ণতা দৃষ্টিগোচর হয় । ১১১০ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত স্পেনের মুসলিম শাসনের ইতিহাস পর্যালোচনা করা হইলেও বার্বার, আল মুরাবিতুন, আল মুয়াহিদুন ও বনু নাসর শাসনের পরবর্তী চার শতাব্দীর ইতিহাস ইহাতে বর্ণিত হয় নাই । স্পেনের মুসলিম শাসনের ইহা একটি অসম্পূর্ণ ইতিহাস । ডজি এই গ্রন্থে সমকালীন সাংস্কৃতিক ও তথ্যবহুল সাহিত্য কর্মকে অবহেলা করিয়া শুধু ঐ সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাসের বর্ণনা প্রদান করিয়াছেন । ডজি ১৮৮১ খ্রীস্টাব্দে তাঁহার শব্দকোষ 'সাপ্লিমেন্ট আত ডিকশনারীস আরাবেস' নামে দুইটি বিরাট খণ্ডে প্রকাশ করেন । শব্দকোষ প্রকাশের দুই বৎসর পর তিনি পরলোক গমন করেন । মজার ব্যাপার এই যে, তিনি তাঁহার সাহিত্যিক জীবন শুরু করিয়াছিলেন, 'এ ডিকশনারী অব আরাবিক কস্টিউম' সম্পাদনার মাধ্যমে এবং তাঁহার জীবনের পরিসমাপ্তিও ঘটে উক্ত কর্মের পরিপূরক শব্দকোষ প্রকাশনার মধ্য 'দিয়া । এই শব্দকোষই ডজিকে ভাষাতত্ত্ববিদ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত করে ।
এই মূল্যবান গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে ডজি তাঁহার পূর্ববর্তী লেখকদের অতিক্রম করিয়া ইতিহাস রচনার এক অনির্ধারিত পদ্ধতির প্রবর্তন করেন । এভারেস্ট লেভি প্রভেঙ্কাল তাঁহার পথ অনুসরণ করিয়াছেন । লেভি প্রভেঙ্কালও ডজির ন্যায় বহু লেখার মাধ্যমে মূল আরবী গ্রন্থের উৎসকে সহজলভ্য করিয়াছেন । ১৯৩২ খ্রীস্টাব্দে তিনি ডজির 'হিস্তোয়ের মুসলমানস দে এস্পাগ্ন' (৭১১-১১১০খ্রীঃ) গ্রন্থটির সংশোধিত সংখ্যা প্রকাশ করেন । এই গ্রন্থে সন্তুষ্ট না হইয়া তিনি স্পেনের মুসলিম ইতিহাসকে নতুন ভাবে লিপিবদ্ধ করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন । তাঁহার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলির মধ্যে 'ইন্সক্রীপশন এরাবেস দে এস্পান্ন' দুই খণ্ডে ১৯২১ খ্রীস্টাব্দে প্রকাশিত হয় । ১৯৫০-৫৩ খ্রীস্টাব্দে প্যারিসে 'লে এস্পাগ্ন মুসলমানস আত জেমে সিয়েক্লী ইনস্টিটিউশন এট ভিয়ে সোসিয়াল' তিন খণ্ডে প্রকাশিত হয় । এই গ্রন্থগুলিতে তিনি ১০৩৯ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত মুসলিম শাসনের পূর্ণ ইতিহাস পর্যালোচনা করিয়াছেন । এই গ্রন্থগুলি ঐতিহাসিক ডজির রচনাকে সম্পূর্ণরূপে অতিক্রম করিয়াছে । দুঃখের বিষয়, এই ঐতিহাসিক পণ্ডিত তাঁহার পরিকল্পিত চতুর্থ খণ্ড স্পেনের বার্বার শাসনের উপর লিখিত গ্রন্থ 'বার্বার এম্পায়ার্স আলমুরাবিত ও আল মুয়াহিদ' প্রকাশের পূর্বেই ইহলোক ত্যাগ করেন । তাঁহার মৃত্যু আধুনিক ইতিহাস গবেষণার ক্ষেত্রে ১০৩১ খ্রীস্টাব্দের পর এক বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি করে । ডজির ন্যায় ইতিহাস বিশ্লেষণে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী না হইলেও লেভি প্রভেঙ্কাল ছিলেন তাহার যোগ্য উত্তরাধিকারী । এমিলিও গার্সিয়া গোমেজ স্পেনীয় ভাষায় লেভি প্রভেঙ্কালের 'হিস্তোয়ের' গ্রন্থটি 'হিস্তোরিয়া দে এস্পানীয়া' (৪র্থ খণ্ড) নামে অনুবাদ করেন এবং ১৯৫৬ খ্রীস্টাব্দে ইহা মাদ্রিদে প্রকাশিত হয় ।
দ্বাদশ শতাব্দীর শেষাংশ ও আলমুহাদ যুগের ইতিহাস জানিতে হইলে আমাদিগকে ডজি লিখিত ইতিহাসের সংশোধিত সংখ্যা ও আস্ত্রাসীয় হুইসী মিরান্দা লিখিত 'হিস্তোরীয়া পলিটিকা দেল এস্পোরীয় আলমুহেদ' নামক গ্রন্থটির উপর নির্ভর করিতে হয় । গ্রন্থটি ১৯৫৬-৫৭ খ্রীস্টাব্দে তিতুয়ানে প্রকাশিত হয় । মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের উপরে লিখিত এস. পি. স্কটের 'হিস্ট্রি অব দি মূরিশ এম্পায়ার' নামক গ্রন্থটি তিন খণ্ডে সমাপ্ত । ইহা ১৯০৪ খ্রীষ্টাব্দে ফিলাডেলফিয়াতে প্রকাশিত হয় । ইহা ঐতিহাসিক তথ্যে সমৃদ্ধ । কিন্তু লেখক তাঁহার এই গ্রন্থে মুসলিম রাজত্বকালে স্পেনের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন পদ্ধতি সম্পর্কে বিশেষ আলোকপাত করেন নাই । তিনি কদাচিৎ তাহার মূল গ্রন্থে বা পাদটীকায় তাঁহার বক্তব্যের সমর্থনে প্রামাণিক সূত্রের উল্লেখ করিয়াছেন । এই গ্রন্থে কিছু কিছু গরমিল পরিলক্ষিত হয় ।
স্টেনলী লেনপুল লিখিত 'হিস্ট্রি অব দি মূরস ইন স্পেন' গ্রন্থটি ১৮৮৮ খ্রীস্টাব্দে লণ্ডনে প্রকাশিত হয় । এই ক্ষুদ্র গ্রন্থে লেখক স্পেনের মুসলিম শাসনের পূর্ণ ইতিহাস আলোচনা করিয়া আরব সংস্কৃতির ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছেন । ১৮৩২ খ্রীস্টাব্দে ওয়াশিংটন আরভিং কর্তৃক প্রকাশিত 'টেলস অব দি আলহামরা'র অনুকরণে লিখিত লেনপুলের গ্রন্থ সম্পর্কে মন্টোগোমারী বলেন যে, "স্টেনলী লেনপুল আরবদের প্রশংসা করিয়াছেন অপরদিকে সমকালীন স্পেনীয়দের পছন্দ করেন নাই । তাঁহার ধারণা আরবদের জন্যই স্পেনের সুনাম ও প্রাধান্য ছিল । আরবদের বিতাড়িত করার ফলেই স্পেনের অধঃপতন হয় ।" আরব দর্শন স্পেনের এবং মধ্যযুগীয় ইউরোপের অপরাপরংশে যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল ১৯২৯ খ্রীস্টাব্দে লন্ডনে প্রকাশিত 'ইসলাম ইন স্পেন' গ্রন্থে লেখক ক্যানন শেল সে সম্পর্কে কম গুরুত্ব প্রদান করিতে চেষ্টা করিয়াছেন । ১৯৩৪ খ্রীস্টাব্দে প্রকাশিত 'হিস্তোয়ের দ্য এস্পান্ন' নামক গ্রন্থে লেখক লুই বাট্র্যান্ড স্পেনের বার্বার ও আরব সংস্কৃতি এবং সভ্যতার গুরুত্বকে খাটো করিয়া দেখাইতে চেষ্টা করিয়াছেন এবং ইউরোপীয় ঐতিহাসিকদের মতবাদকে সমর্থন করিয়া বলিয়াছেন যে, স্পেনীয় সভ্যতায় মুসলমানদের দান খুবই সামান্য ।
১৯৩৫ খ্রীস্টাব্দে লণ্ডনে প্রকাশিত 'দি এস্পেন্ডার অব মূরিশ স্পেন' গ্রন্থে গ্রন্থকার জসেফ ম্যাক্কার দৃঢ়তার সহিত কতিপয় ইউরোপীয় লেখকের যথা-চার্লস প্লেটরিক ও লুইস বাট্র্যান্ডের পক্ষপাতিত্ব মূলক মতামতকে খণ্ডন করিয়াছেন । ব্যাপক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে লিখিত এই গ্রন্থটিতে তিনি বলিয়াছেন যে, আরবরা শুধু প্রাচীন ও আধুনিক সভ্যতার মধ্যে যোগসূত্রই রচনা করেন নাই বরং এক নতুন সংস্কৃতির সৃষ্টি করিয়া উহা ইউরোপকে উপহার দিয়াছেন ।
১৯১০ খ্রীস্টাব্দে লন্ডনে প্রকাশিত 'দি হিস্ট্রি অব ইন্টেলেকচিউয়্যাল ডেভেলপমেন্ট অব মুসলিম স্পেন' গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডের এক শত পৃষ্ঠায় লেখক জন উইলিয়াম ড্রাম্পার তাঁহার নিরপেক্ষ লেখনীর মাধ্যমে মুসলমানদের নিকট ইউরোপবাসীদের ঋণ সম্পর্কে আলোচনা করিয়াছেন ।
১৯৪৫ খ্রীস্টাব্দে বার্সিলোনায় প্রকাশিত এ গঞ্জালেজ প্যালেন্সিয়া কর্তৃক লিখিত 'হিস্তোরিয়া দেলা এস্পানীয়া মুসালমানা' একখানি জনপ্রিয় সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ । হেনরী তেরেসা লিখিত ও ১৯৫৮ খ্রীস্টাব্দে প্যারিসে প্রকাশিত 'ইসলাম দ্য এস্পাগ্নে উনে রিকন্ত্রে দেল ওরিয়েন্ট এট' দে-লা অক্সিডেন্ট' গ্রন্থটিতে সাধারণতঃ প্রত্নতত্ত্ব ও শিল্পকলার ইতিহাস বিবৃত হইয়াছে । আমেরিকো ক্যাস্ট্রো লিখিত 'স্ট্রাকচার অব স্পেনীশ হিস্ট্রি' গ্রন্থে ইসলামিক স্পেন সম্পর্কে লেখক যে মতামত প্রকাশ করিয়াছেন হেনরী তেরেসা উহাকে সমর্থন জানান । গ্রন্থটি ১৯৫৪ খ্রীস্টাব্দে প্রিন্সটনে ই. এল. কিং অনুবাদ করেন । সি. সাঞ্চেজ আল বার্নোজের লেখা 'এস্পানীয়া এন সু হিস্তোরীয়া, ক্রিস্টিয়ানোস, মূরোস ই খুদিওস' ১৯৪৮ খ্রীস্টাব্দে বুয়েনেস আয়ারসে আমেরিকো ক্যাস্ট্রো কর্তৃক সংশোধিত ও প্রকাশিত । উল্লিখিত গ্রন্থে ক্যাথলিক মতের বিরুদ্ধে ভিজিগথ যুগ হইতে আধুনিক যুগ পর্যন্ত ক্রিশ্চিয়ান স্পেনের মধ্যে ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রয়াস পাইয়াছেন । লেখক মতামত প্রকাশ করেন যে, পরবর্তীকালের ক্রিশ্চিয়ান স্পেনের ধারাবাহিকতা ভিজিগথ স্পেনের সহিত স্থাপিত হয় অষ্টম শতাব্দীর মুসলিম শাসনের ফলে । আরবদের নিকট হইতে ব্যাপক ভাবে গৃহীত মিশ্র সংস্কৃতি এই শূন্যতা পূরণ করে ।
১৯৫১ খ্রীস্টাব্দে লণ্ডনে প্রকাশিত 'হিস্ট্রি অব দি আরবস' গ্রন্থে গ্রন্থকার ফিলিপ কে. হিট্টি ইহার চতুর্থ খণ্ডের ১০০ পৃষ্ঠা ব্যাপী লেখায় স্পেনীয় আরব বুদ্ধিজীবীদের অবদান সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য পরিবেশন করিয়াছেন । স্পেনের মুসলমান শাসনের একখানি পূর্ণ ইতিহাস গ্রন্থ উর্দু ভাষায় রচনার জন্য পাটনার মৌলানা সাইয়েদ রিয়াসত আলী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন । 'তারিখে উন্দুলুস' নামে ইহার প্রথম খন্ড ১৯৫০ খ্রীস্টাব্দে আজমগড়ে প্রকাশিত হয় । ইহাতে দ্বিতীয় আবদুর রহমানের (৮৫২ খ্রীঃ) রাজত্বকাল পর্যন্ত স্পেনের ইতিহাস আলোচিত হইয়াছে । উর্দু ভাষায় রচিত ইতিহাস গ্রন্থের মধ্যে ইহা একটি তথ্যপূর্ণ গ্রন্থ । ১৯৬৭ খ্রীস্টাব্দে এডেনবার্গে প্রকাশিত 'এ হিস্ট্রি অব ইসলামিক স্পেন' গ্রন্থে ডব্লিউ মন্টগোমারী অতি সংক্ষেপে মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস এক নতুন প্রেক্ষাপটে রচনা করেন । এই গ্রন্থে মুসলিম স্পেনের স্থাপত্য ও প্রশাসন সম্পর্কিত ইতিহাস খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে লিপিবদ্ধ হইয়াছে ।
📄 মুসলমানদের আগমনের পূর্বে স্পেন
হিজরী প্রথম শতাব্দীর মধ্যে মুসলিম সাম্রাজ্য পূর্বে হিন্দুকুশ হইতে পশ্চিমে আটলান্টিকের উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে । স্থায়ীভাবে বসবাসরত ও যাযাবর জাতীয় বার্বারদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগ লইয়া মুসলমানগণ শেষ পর্যন্ত তিউনিসিয়াতে নিজদিগকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন । ৬৯৮ খ্রীস্টাব্দে বাইজান্টাইনের অধিবাসীগণ তাহাদের উত্তর আফ্রিকার রাজধানী কার্থেজ হইতে বিতাড়িত হয় । অষ্টম শতাব্দীর প্রথম হইতেই মুসলমানগণ আলজিরিয়ার মধ্য দিয়া মরক্কোতে প্রবেশ করিতে শুরু করে । এই এলাকায় স্থায়ী বসবাসকারী বার্বারগণ মুসলমানদের অগ্রাভিযানে বাধা প্রদান করিলে তিউনিসিয়ার নবনিযুক্ত গভর্নর মুসা বিন নুসাইর তাহাদিগকে সমূলে ধ্বংস করেন । মুসা বিন নুসাইর উমাইয়া খলিফাদের অধীন ছিলেন । পূর্বে তিনি মিসরের গভর্নরের অধীনে কায়রোওয়ানের শাসনকর্তা হিসাবে কার্য পরিচালনা করেন । পরবর্তীকালে ৬৭০ খ্রীস্টাব্দে কায়রোওয়ানে উত্তর আফ্রিকার মুসলিম রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হয় । আমীর আলী বলেন, "ইফ্রিকিয়া যখন মুসলিম শাসনাধীনে সহিষ্ণুতা ও সুবিচারের আশীর্বাদপুষ্ট হইয়া পার্থিব উন্নতির চরম শিখরে উন্নীত তখন আইবেরিয়ান উপদ্বীপ ভিজিগথ শাসনের কঠোর ও কঠিন যাতাকলে নিষ্পেষিত হইতেছিল ।" ৩
ভিজিগথ শাসকগণ তাহাদের পূর্ববর্তী সুয়েভী ও ভ্যান্ডাল শাসকদের অপেক্ষা নিজদিগকে উত্তম বলিয়া প্রমাণ করিতে ব্যর্থ হন । স্পেন প্রায় তিনশত বৎসর (৪০৯-৭১২ খ্রীঃ) ভিজিগথ শাসনাধীনে ছিল । ৪ এই দীর্ঘ সময়ে তাঁহারা পূর্ববর্তী শাসক সিজারদের (কায়সার) দুঃশাসন ও অন্যায় অত্যাচারের কালিমা দূরীভূত করিতে ব্যর্থ হন । বরং তাঁহাদের দুঃশাসনে জনগণের দুঃখকষ্ট আরও বৃদ্ধি পায় । ৫ গথিক শাসন “ধ্বংসলীলা, গণহত্যা ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্দয়ভাবে দমন এবং আক্রমণকারী বার্বারদের (অসভ্য জাতি) অভ্যন্তরীণ কোন্দলে পরিপূর্ণ ।" উত্তরাধিকারী নির্বাচনে বুদ্ধিজীবীদের গণতান্ত্রিক প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় । সংক্ষেপে বলা যায় যে, ভিজিগথ রাজতন্ত্র রোমান ইতিহাসের ব্যর্থতার প্রতীক । উঁচু নীচুর ব্যবধান; উত্তরাধিকারী নির্বাচনে সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর প্রতি নিম্নশ্রেণীর অসন্তুষ্টি সেনাদের মধ্যে আস্থাহীনতা, অর্থনৈতিক দূরবস্থা ও ইহুদীদের দুর্ভোগের ইতিহাস ভিজিগথ শাসনের ব্যর্থতার স্বাক্ষর বহন করে । ৬
টিকাঃ
৩. ক) আমীর আলী, হিস্ট্রি অব দ্যা স্যারাসিন্স, লন্ডন, ১৯৫১, পৃঃ ১০৬। খ) ইমামউদ্দিন, সোশিও-ইকোনোমিক এ্যান্ড কালচারাল হিস্ট্রি অব মুসলিম স্পেন, লেডেন, ১৯৬৫, পৃঃ ১৫ গ) জার্নাল অব পাকিস্তান হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি, করাচি, ১৯৫৮, পৃঃ ১১৭
৪. ক) ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, লন্ডন, ১৯১৩. পৃঃ ২১৫। খ) উইলকিনসন, লিটেরেরি হিস্ট্রি অব দ্যা আরবস, পৃঃ ৪৩৫।
৫. ক) লুইস বারট্রান্ড, দ্যা হিস্ট্রি অব স্পেন, লন্ডন, ১৯৫৬, পৃঃ ১৮। খ) জার্নাল অব পাকিস্তান হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি, ১৯৫৮, পৃঃ ১১৭।
৬. লুইস, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯; এম. এম. ইমামউদ্দিন, আল-আন্দালুস, মাদ্রিদ, গ্রানাডা, পৃঃ ২১০-১১।
📄 সামাজিক পরিবেশ
মুসলিম শাসনাধীনে আসিবার পূর্বে স্পেনের অধিবাসীগণ রাজা, ক্ষুদ্ররাজ্যের শাসক, অমাত্যবর্গ, যাজক, সামন্তরাজ, অভিজাত শ্রেণী, বর্গাদার, ভূমিদাস (সার্ফ) ও ক্রীতদাস ইত্যাদি শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল । ৭ ইহাদিগকে মোটামুটিভাবে শাসক ও শাসিত এই দুই শ্রেণীতে ভাগ করা যাইতে পারে । শাসক শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন রাজা, ধর্মযাজক ও অভিজাত শ্রেণী । অপরদিকে বর্গাদার, ভূমিদাস (সার্ফ), ক্রীতদাস ও ইহুদীগণ ছিল শাসিত শ্রেণীভুক্ত ।
অষ্টম শতাব্দীর প্রারম্ভে স্পেনীয় রোমান ও ভিজিগথ অভিজাত সম্প্রদায় সুবিধা-ভোগী শ্রেণী হিসাবে পরিচিত ছিলেন । প্রশাসনে ইহাদের বিশেষ প্রভাব ছিল । বিশপ ও রাজার মধ্যে গভীর সান্নিধ্যের কারণে বহু প্রশাসনিক বিষয় চার্চপরিষদ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হইত । জনসাধারণের সহিত বিশপদের সরাসরি যোগাযোগ থাকার দরুন তাঁহারা রাজা উয়াম্বা ও উইতিজার বিরুদ্ধে জনগণকে বিদ্রোহ করিতে অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করেন । বিশপগণ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য রাজাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও অবজ্ঞা প্রকাশ করিতেন । যাজকগণ বিভিন্ন দলে বিভক্ত হইয়া পড়েন । তাঁহারা অগাধ ধনসম্পদের অধিকারী ছিলেন । তাঁহারাই যাজকদের পরিষদ পরিচালনা করিতেন । যাজক পরিষদের সীমাহীন প্রভাব ছিল জনসাধারণের উপর । যাজকদের কুকর্ম ও অপকর্মের অন্ত ছিল না । তাঁহারা নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী রাজা নির্বাচন করিতেন এবং প্রশাসনের মর্যাদাপূর্ণ পদগুলি তাঁহাদের অধিকারে ছিল । চার্চের অধীনস্থ কর্মচারীগণ যাজকের পরিবর্তে কার্য সম্পাদন করিতেন ।
যুবরাজ ও সামন্ত প্রভুদের সমন্বয়ে স্পেনের অভিজাত শ্রেণী গড়িয়া ওঠে । ৮ জুয়া, মদ, ঘোড়দৌড়, বনভোজন ও বিলাসিতার মধ্যে নিমজ্জিত থাকিয়া তাহারা দিনাতিপাত করিতেন । তাঁহারা বাস করিতেন সুরম্য ও সুশোভিত রাজপ্রাসাদে । প্রজাকুলের কল্যাণের প্রতি তাঁহাদের কোন দৃষ্টি ছিলনা । শাসকগণ ভুলিয়া গিয়াছিলেন যে, প্রজাদের আনুগত্য, সহযোগিতা ও সমর্থনের উপরই তাহাদের অস্তিত্ব নির্ভর করে ।
প্রজাগণকেও আবার দুই শ্রেণীতে ভাগ করা যাইতে পারে । ৯ পৌরকার্যক্রম পরিচালনায় নিযুক্ত যাজক ও বর্গাদার সমন্বয়ে গঠিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী । এ মধ্যবিত্ত শ্রেণী অনধিক পঁচিশ একর ভূমির মালিক ছিলেন । এই ভূমি হস্তান্তরের অধিকার তাহাদের ছিল না । তাহারা এই জমিগুলি ফসল উৎপাদনের জন্য চাষীদিগকে বর্গা দিতেন । অনাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির ফলে ফসল উৎপন্ন না হইলে বর্গাদারদের নিজের পকেট হইতে জমিদারের খাজনা পরিশোধ করিতে হইত । ইহার ফলে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী তাহাদের ভূসম্পত্তি ত্যাগ করিয়া হয় সেনাবাহিনীর চাকুরী গ্রহণ করিতেন অথবা জীবন ধারণের জন্য নীচু পেশা গ্রহণ করিতেন ।
স্পেনের সর্বনিম্ন শ্রেণী গড়িয়া উঠিয়াছিল ভূমিদাস (সার্ফ) ও ক্রীতদাসদের সমন্বয়ে । ১০ এইসব হিস্পানীয়-রোমান ভূমিদাসগণ ছিল স্বাধীনচেতা ও রোমান উপনিবেশের উত্তরাধিকারী । বর্গাদার ও ভূমিদাসদের মধ্যবর্তীস্থানে ছিল ইহাদের অবস্থান । কৃষি-শ্রমিক ও সেনা বিভাগের লোক সরবরাহের কঠিন দায়িত্ব অর্পিত ছিল তাঁহাদের উপর । ক্রীতদাসদের ভাগ্য বিজড়িত ছিল ভূমির সহিত । জমি বিক্রি বলিতে জমির সহিত সংশ্লিষ্ট ক্রীতদাসকেও বুঝাইত । ভূমিরাজস্ব ব্যতীত তাহাদিগকে ব্যক্তিগত করও প্রদান করিতে হইত । সামান্য ভুল-ত্রুটির জন্য তাহাদের উপর অমানুষিক দৈহিক নির্যাতন চলিত । রোমান শাসনের শেষ অধ্যায়ে তাহাদের অবস্থা প্রায় ক্রীতদাসদের সমপর্যায়ে ছিল । ভিজিগথ শাসনকালে ক্রীতদাস ও ভূমিদাসদের মানবীয় অধিকার সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করা হয় । ব্যক্তিস্বাধীনতা বলিতে কোন কিছু ছিল না । দূর-দূরান্ত হইতে পানি বহন ও জঙ্গল হইতে কাষ্ঠ সংগ্রহ করাই ছিল তাহাদের একমাত্র কাজ । ভূমিদাস ও ক্রীতদাস তাহাদের প্রভুর বিনা অনুমতিতে বিবাহ করতে পারিত না । প্রভুর পূর্ব অনুমতি ব্যতীত বিবাহ করিলে উহা বাতিল বলিয়া গণ্য হইত এবং স্বামী-স্ত্রী বিচ্ছিন্ন অবস্থায় জীবন-যাপন করিতে বাধ্য হইত । প্রতিবেশী দুই জমিদারের ক্রীতদাসদের মধ্যে বিবাহ-শাদী হইলে উভয় জমিদারই তাহাদের সন্তান-সন্ততি ভাগ বাটোয়ারা করিয়া লইত । পণ্যসামগ্রীর ন্যায় ক্রীতদাস সর্বদা বাজারে ক্রয়-বিক্রয় হইত । সমাজে ক্রীতদাস প্রথা ব্যাপক ভাবে প্রচলিত ছিল । ৪০০০ হইতে ৮০০০ ক্রীতদাস এক এক ব্যক্তির অধীনে থাকিত । ভিজিগথ শাসকগণ ক্রীতদাসদের কয়েকটি শ্রেণীতে বিভক্ত করিয়াছিলেন । কৃষিজীবী, মেষপালক, মৎস্যজীবী ও কর্মচারী ইত্যাদি । সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হইয়া মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণী কোন কোন সময় বনে জঙ্গলে আত্মগোপন করিত এবং দস্যু ও লুন্ঠনকারীতে পরিণত হইত । রোমান শাসনকাল হইতে ভিজিগথ শাসন পর্যন্ত নাগরিক সুযোগ সুবিধা হইতে বঞ্চিত শহরগুলি তাহারা সময় সময় লুণ্ঠন করিত । নির্মম অত্যাচারের শিকার এই সব জনগণের চারিত্রিক অবনতির সাথে সাথে তাহাদের অর্থনৈতিক দুর্দশাও চরমে পৌছে ।
টিকাঃ
৭। ক) ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ২১৬। খ) ইবনে খালিক্যান (অনুবাদ দ্য স্লেভ), ১১, পৃঃ ১৪, ৫৫৮।
৮। ডজি, প্রাগুক্ত, পৃঃ ২২৯।
৯। ঐ পৃ. ২১৭-২১৮।
১০। আমীর আলী, হিস্ট্রি অব দ্যা স্যারাসিন্স, পৃঃ ১০৭; ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ২২৮।
📄 অর্থনৈতিক অবস্থা
মুসলমানদের আগমনের পূর্বে স্পেনের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল বিপর্যস্ত । ১১ স্পেনের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে ইহুদীদের প্রভাব ছিল সীমাহীন । তাহারা ছিল স্পেনের জাতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড । কিন্তু ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার দরুন তাহারা মিল কারখানা, দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ করিয়া দেশত্যাগ করে । ফলে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অচল অবস্থার সৃষ্টি হয় । একদিকে বিত্তবানদের কর হইতে অব্যাহতি প্রদান অপরদিকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উপর সীমাহীন করধার্য করার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে নামিয়া আসে আর্থিক বিপর্যয় ও দুর্ভোগ । আমীর আলী বলেন, "শিল্প কারখানাগুলিতে অতিরিক্ত কর আরোপের ফলে সারাদেশ অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত্বের কবলে পতিত হয় ।" ভূমিদাস ও ক্রীতদাসগণ জমির মালিক ছিলনা । জমিদার ও সরকারের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হইলে তাহাদের উপর নামিয়া আসিত কঠোর অত্যাচার ও নির্যাতন । এই নির্মম অত্যাচার হইতে বাঁচিবার জন্য তাহারা বনে জঙ্গলে পলাইয়া যাইত ও দস্যুদের দলে যোগদান করিত । ফলে মিল কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হইত ও সেচকার্যের অভাবে জমি অনাবাদী অবস্থায় পড়িয়া থাকিত । অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার দরুন সমগ্র রাজ্য দস্যুদের লীলাক্ষেত্রে পরিণত হয় । ফলে যাতায়াত ও ব্যবসা বাণিজ্যে অচল অবস্থা দেখা দেয় । ধ্বংসপ্রাপ্ত এই অর্থনীতি অষ্টম শতাব্দীতে মুসলমানদের প্রচেষ্টায় পুনর্জীবন লাভ করে ।
টিকাঃ
১১। আমীর আলী, হিস্ট্রি অব দ্যা স্যারাসিন্স, পৃঃ ১০৬।