📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 ঐতিহাসিক উপাদানসমূহ

📄 ঐতিহাসিক উপাদানসমূহ


স্পেনীয় আরবরা ইতিহাস, ভূগোল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর মূল্যবান গ্রন্থ রচনার জন্য বিশেষ খ্যাতি অর্জন করিয়াছিলেন । মুসলিম শাসকদের অনেকে বিখ্যাত ও দুর্লভ রচনাবলী সংগ্রহের জন্য পণ্ডিত ব্যক্তিদিগকে বিশেষ ভাবে উৎসাহিত এবং বিদ্যোৎসাহী পণ্ডিতদিগকে পৃষ্ঠপোষকতা করিতেন । স্বাধীন নর-নারী, ও ক্রীতদাস সকলেরই জ্ঞান সাধনার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান ছিল । গ্রন্থাবলী সংগ্রহ করিয়া নিজস্ব গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার প্রতি স্পেনীয় মুসলমানদের আগ্রহ ছিল অপরিসীম । কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, তাহাদের সংগৃহীত অধিকাংশ মূল্যবান গ্রন্থই কালের করাল গ্রাসে বিলীন হইয়া গিয়াছে । গ্রানাডা পতনের মাত্র সাত বৎসর পর ১৪৯৯ খ্রীস্টাব্দে কার্ডিনাল জিমেনেজ প্রায় আট হাজার আরবী গ্রন্থের পাণ্ডুলিপির ধ্বংস সাধন করে । ফলে স্পেনের মুসলিম মনীষীদের লিখিত গ্রন্থের দুষ্প্রাপ্যতা একান্ত প্রকট হইয়া ওঠে । প্রফেসর নিকলসন মন্তব্য করেন যে, কার্ডিনাল জিমেনেজ মাত্র একদিনে সাত/আট শত বৎসরে গড়িয়া ওঠা মুসলিম সংস্কৃতিকে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করিবার জন্য ইচ্ছা পোষণ করিয়াছিলেন । ধ্বংসপ্রাপ্ত মূল্যবান গ্রন্থগুলির মধ্যে আল-রাজী ও ইবনে হাইয়ানের গ্রন্থগুলিও অন্তর্ভুক্ত ছিল । খ্রীস্টীয় দশম শতাব্দীতে কার্ডোভার অধিবাসী আহমদ বিন মুহম্মদ আল-রাজী 'আখবারুল মুলুকুল উন্দুলুস' নামে স্পেনে মুসলিম শাসনের উপরখানি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন । গ্রন্থখানি পরবর্তীকালের ইতিহাসবেত্তাদের জন্য গবেষণার উৎস হিসাবে ব্যবহৃত হইয়া আসিতেছিল । অল্প সংখ্যক আরবী গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি যাহা এই ধ্বংসলীলার কবল হইতে রক্ষা পায় তাহা হয় পাদ্রীদের অধিকারে যায় অথবা কোন গ্রন্থাগারে অরক্ষিত অবস্থায় থাকে । এই সমস্ত আরবী গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি পরবর্তীকালে রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ (১৫৫৬-৯৮ খ্রীঃ) ও তৃতীয় ফিলিপ সংগ্রহ করিয়া মাদ্রিদের সন্নিকটে এস্কোরিয়ালের রাজকীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষণ করেন । সপ্তদশ শতাব্দীর তৃতীয়াংশ পর্যন্ত এই গ্রন্থগুলি অযত্নে ও অবহেলিত অবস্থায় থাকে । ১৬৭১ খ্রীস্টাব্দে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এস্কোরিয়াল গ্রন্থাগারে রক্ষিত মূল্যবান পাণ্ডুলিপিগুলির তিন চতুর্থাংশ ভস্মীভূত হয় । এই অপূরণীয় ক্ষতির ফলে স্পেন সরকার মহা মূল্যবান গ্রন্থ সম্পদের গুরুত্ব মর্মে মর্মে অনুধাবন করেন । ফলে সরকার দেশবাসীকে আরবী সাহিত্য ও বিজ্ঞান-চর্চায় বিশেষভাবে উৎসাহিত করেন । ধ্বংসের হাত হইতে রক্ষাপ্রাপ্ত ১৮৫০ খানা পাণ্ডুলিপির একটা বর্ণনামূলক ক্যাটালগ (বিবলিওথিকা এরাবিকো হিস্পানা এস্কোরিয়া লেনসিস) কাসিরী প্রণয়ন করেন । ফরাসী ভাষায় ইহার বিশেষ বিশেষ অংশের অনুবাদ ১৭৬০-৭০ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয় । অনেক আরবী গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি মাদ্রিদের জাতীয় গ্রন্থাগারে, রাজকীয় একাডেমীর ইতিহাস গ্রন্থাগারে, মাদ্রিদ ও গ্রানাডার আরবী প্রতিষ্ঠান সমূহের গ্রন্থাগারে এবং জেনারেল ফ্রাঙ্ক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত তিতুয়ানের (মরক্কো) গ্রন্থাগারে রক্ষিত আছে । এই সমস্ত গ্রন্থাগারে রক্ষিত বহু পাণ্ডুলিপি গ্রন্থাকারে প্রকাশের ব্যবস্থা গৃহীত হয় । কিন্তু ধর্ম সংক্রান্ত আরবী পাণ্ডুলিপিগুলি গ্রন্থাকারে প্রকাশের কোন ব্যবস্থাই করা হয় নাই ।

আরবদের লিখিত গ্রন্থসমূহে প্রচুর ঐতিহাসিক বিবরণী বিদ্যমান । কিন্তু সমসাময়িক কালে ইউরোপীয় ভাষায় রচিত গ্রন্থে স্পেনে মুসলিম শাসন আমলে যে সমস্ত ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক পুনর্গঠন সাধিত হইয়াছিল তাহার কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না । পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি লইয়া লিখিত ইউরোপীয় গ্রন্থকারদের রচনায় মুসলিম মনীষীদের মূল্যবান সাহিত্য অবদান সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায় না । সেই সময়কার স্পেনীয় লেখকদের মধ্যে—ইসিডোরাস-প্যাসেন্সিস, মুংক সেবাস্তিয়ান, মুংক ভিজিলা ও স্যাম্পিরোর নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য ।

নিম্নে ধ্বংসের কবল হইতে রক্ষাপ্রাপ্ত মূল্যবান আরবী গ্রন্থসমূহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হইল : 'তারিখ-ই-ফতেতাহুল আন্দালুস'-ইবনুল কুতীয়া (মৃঃ ৩৬৭/৯৭৭) নামক স্পেনের একজন নওমুসলিম পণ্ডিত কর্তৃক গ্রন্থখানি রচিত । তিনি খ্রীস্টীয় দশম শতাব্দীতে কর্ডোভাতে বসবাস করিতেন এবং সেখানেই জ্ঞান সাধনায় নিয়োজিত থাকেন । এই গ্রন্থে তৃতীয় আবদুর রহমানের শাসনামলের প্রথম ভাগ পর্যন্ত স্পেনে মুসলিম শাসনের ইতিহাস আলোচিত হইয়াছে । ১৯২৬ খ্রীষ্টাব্দে মাদ্রিদে 'হিস্টরীয়া দে-লা কংকয়েস্তা দে- এস্পানীয়া' নামে ডন জুলিয়ান রিবেরা গ্রন্থখানিকে সম্পাদনা ও স্পেনীয় ভাষায় অনুবাদ করেন । গ্রন্থকার তাঁহার রচনায় আগাগোড়াই নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দান করিয়াছেন । মধ্য যুগের স্পেনের মুসলমান ও খ্রীস্টান লেখকদের মধ্যে তিনিই সর্বাপেক্ষা নির্ভরযোগ্য । তিনি পিতার দিক দিয়া আরব ও মাতার দিক দিয়া ছিলেন গথ । ফলে তিনি সব সময়েই উভয় সম্প্রদায়ের মতবাদের সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করিয়াছেন । তাঁহার পিতা ইসা বিন মুজাহিম ছিলেন খলিফা আবদুল আজিজ কর্তৃক মুক্ত উমাইয়া বংশের একজন স্বাধীন মানুষ । তাঁহার মাতা সাবাহ ছিলেন গথরাজ উইতিজার পৌত্রী ।

ইবন্ আবদুল হাকাম বিরচিত 'তারিখ ফাতহুল মিসর' গ্রন্থের পঞ্চম অধ্যায়ের সমাপ্তি পর্বে স্পেন বিজয়ের বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে । ১৮৫৮ খ্রীস্টাব্দে ডঃ জন হারেস জন্ গোটিনজেনে ইংরেজী অনুবাদসহ গ্রন্থখানি প্রকাশ করেন । ১৯২৩ খ্রীস্টাব্দে ভারতের হায়দারাবাদে জামিলুর রহমান কর্তৃক এই আরবী গ্রন্থখানির উর্দু অনুবাদ 'যিকরে ফাতহে উন্দুলুস' নামে প্রকাশিত হয় ।

ইবনুল আহমার (মৃঃ ৩৫৮/৯৬০ খৃঃ) তাঁহার রচিত 'উনাক্রন্দিকা এ্যাননিমা দে আবদুর রহমান (তৃতীয়) আল নাসির' গ্রন্থে খলীফা নাসিরের জীবনী এবং তাঁহার অবদান ও কৃতিত্ব সম্পর্কে আলোচনা করিয়াছেন । ইহা লেভি প্রভেঙ্কাল ও ই. গার্সিয়া গোমেজ কর্তৃক সম্পাদিত ও স্পেনীয় ভাষায় অনূদিত হইয়া ১৯৫০ খ্রীঃ মাদ্রিদ-গ্রানাডা হইতে প্রকাশিত হয় ।

নাম পরিচয়হীন লেখক কর্তৃক রচিত 'আখবার মাজমুয়া' গ্রন্থখানি ই-লা ফুরেন্তা ই-আলকান্তারার সম্পাদনায় স্পেনীয় ভাষায় অনূদিত হইয়া ১৮৬৭ খ্রীঃ মাদ্রিদে প্রকাশিত হয় । মধ্যযুগের উপকথার প্রভাব মুক্ত এই গ্রন্থখানিতে তৃতীয় আবদুর রহমানের রাজত্বকাল পর্যন্ত স্পেনে মুসলিম শাসনের বাস্তব বর্ণনা বিস্তারিত ভাবে প্রদত্ত হইয়াছে ।

প্রখ্যাত স্পেনীয় ঐতিহাসিক আবু মারওয়ান হাইয়ান ইবনে খালাফ ইবনে হাইয়ান (৯৮৮-১০৭৬ খ্রীঃ) 'আল মুকতাবিস ফি তারিখে রিজালুল আন্দালুস' নামক বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেন । তাঁহার রচিত প্রায় পঞ্চাশখানি মূল্যবান গ্রন্থের অতি অল্পসংখ্যক গ্রন্থই সংরক্ষিত হইয়াছে এবং উল্লিখিত ঐতিহাসিক গ্রন্থখানিরও অতি সামান্য অংশই আমাদের গোচরীভূত হইয়াছে । দশ খণ্ডে সমাপ্ত এই বিরাট গ্রন্থখানির তৃতীয় খণ্ডে আমীর আবদুল্লাহ বিন মুহম্মদের শাসনকাল আলোচিত হইয়াছে । ইহা বিখ্যাত বডলিয়ান গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত রহিয়াছে । ১৯৩২-৩৭ খ্রীস্টাব্দে প্যারিসে ম্যালচিওর এম. আন্তনা 'টেক্সটেজ এরাবেস রিলেটিক্স আল হিস্তোয়ায়ের ডেল অক্সিডেন্ট' নামে ইহার সম্পাদনা করেন । কনস্টান্টিনোপলে প্রাপ্ত ইহার অপর এক খণ্ডে দ্বিতীয় আল হাকামের শাসনকালের আংশিক আলোচনা রহিয়াছে । মাদ্রিদের রয়েল একাডেমী গ্রন্থাগারে এই উভয় খণ্ডেরই পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের ব্যবস্থা গৃহীত হইয়াছে । মুহম্মদ ইবনে আবি নাসরে ফতুহ 'যাজুয়াতুল মুকতাবিস' নামে আল মুকতাবিস গ্রন্থের সংক্ষিপ্তসার রচনা করেন । উহা বডলিয়ান গ্রন্থাগারে (পাণ্ডুলিপি নং হান্ট ৪৬৪) সংরক্ষিত রহিয়াছে । দশ খণ্ডে বিভক্ত এই গ্রন্থে স্পেনের বিখ্যাত মুসলিম মনীষীদের জীবনী সম্পর্কে আলোচনা করা হইয়াছে ।

১২২৪ খ্রীস্টাব্দে আবদুল ওয়াহাব ইবনে আলী আল-তামিমী আল-মারাকুশী মুযাহিদ শাসনের উপর একখানি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন । গ্রন্থখানির নাম 'আল মুজিব ফি তালখিসে আখবার আল মাগরিব' । ই. ফাগ্লান ফরাসী ভাষায় 'হিস্তোয়ায়ের দেস আল মুহাদেস' (আলজিয়ার্স ১৮৯৩) নামে গ্রন্থখানি অনুবাদ করেন এবং আর. ডজি ইহা সম্পাদনা করেন । ১৮৪৭ খ্রীস্টাব্দে আবদুল ওয়াহিদ আল মারাকুশী 'হিস্টরী অব আলমোহেদস' নামে লন্ডন হইতে ইহার ইংরেজী অনুবাদ প্রকাশ করেন । ইহাতে মুসলমানদের স্পেন বিজয়ের সময় হইতে মুরাবিতিন শাসক ইউসুফ ইবনে তাশুফিনের শাসনকাল পর্যন্ত স্পেনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বর্ণিত হইয়াছে । ১৯২২ খ্রীস্টাব্দে মুহম্মদ নইমুর রহমান মাদ্রাজ হইতে ইহার উর্দু অনুবাদ প্রকাশ করেন ।

খ্রীস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক মারাকুশের ইবনে ইজারী তাঁহার বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-বায়ানুল মাগরিব ফি আখবারিল আন্দালুস ওয়াল মাগরিব' রচনা করেন । গ্রন্থকার ঘটনাবলীর বিস্তারিত পর্যালোচনা না করিয়া জায়গা বিশেষে অর্থনৈতিক অবস্থার বিশ্লেষণ করিতে যাইয়া অতিশয়োক্তির অবতারণা করিয়াছেন । এই গ্রন্থের তিন খণ্ড সংরক্ষিত আছে বলিয়া জানা যায় । ইহার দুই খণ্ডে স্পেনের মুসলমানদের ইতিহাস বর্ণিত হইয়াছে । প্রথম খণ্ডে স্পেনের মুসলিম বিজয়ের পর হইতে হাজিব আল-মনসুরের রাজত্বকাল এবং দ্বিতীয় খণ্ডে উমাইয়া শাসকদের পতন এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শাসকদের ইতিহাস আলোচিত হইয়াছে । ১৮৪৮ খ্রীস্টাব্দ হইতে ১৮৫১ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে লিডেন 'হিস্তোয়ের দেল-আফরিক এট দেল এস্পাগ্ন ইনটিটুলি আল বায়ানুল মাগরিব' প্রথম নামে ডজি প্রথম খণ্ডের সম্পাদনা করেন । এবং ১৯৩০ খ্রীস্টাব্দে প্যারিসে 'টেক্সটেস এরাবেস রিলেটিকস আল হিস্তোয়ের দেল-অক্সিডেন্ট মুসলমান' দ্বিতীয় নামে ই লেভি প্রভেঙ্কাল ইহার দ্বিতীয় খণ্ডের সম্পাদনা করেন ।

খ্রীস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রগতিশীল লেখক ইবনে সাহেব আল সালাত মুরাবিতিন ও মুয়াহিদিন শাসনের উপর অপর একখানি গ্রন্থ রচনা করেন । ইহার দ্বিতীয় খণ্ডে ৫৫৪-৫৬৮ হিঃ/১১৫৯-৭৩ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে স্পেনে সংঘটিত ঘটনাবলীর বিস্তারিত আলোচনা রহিয়াছে । ইহা বডলিয়ান গ্রন্থাগারে (পাণ্ডুলিপি নং মার্স ৪৩৩) রক্ষিত আছে । গ্রন্থটির অন্যান্য খণ্ডের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হইয়াছে ।

মুয়াহিদুন (মাহদী-খলিফা আবদুল মুমিন) আন্দোলনের উপর রচিত তিন খণ্ডে বিভক্ত গ্রন্থখানি কাসিরি তালিকাভুক্ত করেন নাই । 'ডকুমেন্টস ইন এডিটস্ দ্য হিস্তোয়ের আলমুহেদ' নামে প্যারিসে ১৯২৮ খ্রীস্টাব্দে লেভি প্রভেঙ্কালের সম্পাদনায় ইহার ফরাসি অনুবাদ প্রকাশিত হয় । ইহা সমসাময়িক কালের একখানি তথ্যপূর্ণ গ্রন্থ । ইহার তৃতীয় খণ্ডে খলিফা আবদুল মুমিনের শাসনামলের পর হইতে মুয়াহিদিন রাজত্বকালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বর্ণিত হইয়াছে । গ্রন্থকার ব্যতীত অন্য কেহ ইহার সমাপ্তিপর্ব রচনা করেন ।

১৩১৩-১৩৭৪ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক আবু আবদুল্লাহ মুহম্মদ ইবনে সাইদ আল-সালমানী "লিসানুদ্দীন ইবনুল খাতিব" এই ছদ্ম নামে গ্রানাডার প্রখ্যাত মনীষীদের জীবন কথা এবং গ্রানাডার শাসকদের বিস্তারিত ইতিহাস সম্বলিত গ্রন্থ 'আল ইহাতা ফি তারিখে গারনাতা' রচনা করেন । নাসরীয় শাসক ইউসুফ আল হাজ্জাজ ও পঞ্চম মুহম্মদের শাসনকালে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন । তাঁহার সংরক্ষিত বিশটি গ্রন্থের মধ্যে ইহা অন্যতম । এই গ্রন্থের একটি দুষ্পাপ্য ও মূল্যবান অংশ 'মারকাজুল ইহাতা বি-উদাবা গারনাতা' নামে প্যারিসের জাতীয় গ্রন্থাগারে (পা: নং ৮৬৭) সংরক্ষিত রহিয়াছে । ১৩১৯ হিঃ/১৯০১ খ্রীস্টাব্দে কায়রোতে ইহার দুইটি খণ্ড প্রকাশিত হয় ।

তিউনিসিয়ার সুবিখ্যাত ঐতিহাসিক ও রাষ্ট্র নীতিবিদ-আবদুর রহমান ইবনে খালদুন (১৩৩২-১৪০৬ খ্রী)ঃ 'কিতাবুল ইবার ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদা ওয়াল খাবার ফি আইয়ামিল আরব ওয়াল আজম ওয়াল বারবারা' গ্রন্থটি রচনা করেন । স্পেন এবং উত্তর আফ্রিকার ইতিহাসে তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং গ্রানাডার নাসরীয় শাসক ষষ্ঠ মুহম্মদের অধীনে দুই বৎসর চাকুরী করেন । একটি মুখবন্ধসহ গ্রন্থখানি তিনটি অংশে বিভক্ত । ১২৮৪ খ্রীস্টাব্দে কায়রোতে ইহা সাত খণ্ডে প্রকাশিত হয় । এই মূল্যবান গ্রন্থের চল্লিশ পৃষ্ঠা ব্যাপী স্পেনে মুসলিম শাসনের ইতিহাস বর্ণিত হইয়াছে । ইবনুল খাতিব ও ইবনে খালদুন রচিত দুইখানি গ্রন্থই নাসরীয় শাসন কালের ইতিহাস । নাসরীয় শাসনের শেষ শতাব্দীর কোন ইতিহাস পাওয়া যায় না । ইবনুল আছির ও আল-নুয়াইরীর মত ঐতিহাসিক ও বিশ্বকোষ রচয়িতারা তাঁহাদের রচিত গ্রন্থ 'আল কামিল' ও 'নিহায়েতুল আরবে' স্পেনের প্রাচীন ইতিহাসের প্রতি আলোকপাত করিতে প্রয়াস পাইয়াছেন ।

স্পেনে মুসলিম শাসনের সম্পূর্ণ ইতিহাস সম্বলিত গ্রন্থ 'নাফহুত্তিব মিন গুসনুল আন্দালুস আল-রাতিব ওয়া যিকর ওয়াজির লিসানুদ্দীন ইবনুস খাতিবের' ইতিহাস সংকলক, সপ্তদশ শতাব্দীর প্রখ্যাত লেখক তিলিসমানের (আলজিয়ার্স) অধিবাসী আহমদ ইবনে মুহম্মদ আল মাক্কারী আলমাগরিবী 'আজহারুর রিয়াদ ফি আখবারে জিয়াদ' গ্রন্থখানি রচনা করেন । মাক্কারী কর্তৃক ১৬২৮-১৬৩০ খ্রীঃ মধ্যে দামেস্কে 'নাফহুত্তিব' গ্রন্থটি সংকলিত হয় । ইহাতে সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক বিষয়সমূহের বিস্তারিত বর্ণনা রহিয়াছে । মাক্কারী তাঁহার রচনায় বিজ্ঞান ভিত্তিক ইতিহাস রচনা অপেক্ষা সাহিত্যককুশলতার অধিক পরিচয় প্রদান করিয়াছেন । তিনি তাঁহার রচনায় আপন অভিমত ব্যক্ত না করিয়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁহার পূর্বসূরিদের রচনার উদ্ধৃতি দান করিয়াছেন । এই সমস্ত দীর্ঘ ও অপ্রয়োজনীয় উদ্ধৃতি ও কবিতার ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে রচনার মূল বিষয়বস্তুকে দুর্বোধ্য করিয়া তুলিয়াছে । কোন কোন ক্ষেত্রে ভুল উদ্ধৃতি এবং মূল গ্রন্থে যাহা নাই তাহারও উল্লেখ করিয়াছেন । ইহার কারণ হয়ত এই যে, তিনি তিলিসমানে বসিয়া মূল গ্রন্থখানি পাঠ করিয়াছিলেন এবং সিরিয়ায় যখন প্রবাস জীবন যাপন করেন সেই সময় তিনি ইহা সংকলন করেন । অথবা তিলিসমানে গ্রন্থটির জন্য তিনি যে সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করেন সিরিয়ায় যাইবার সময় তাহা তিনি সঙ্গে লইতে পারেন নাই । এইসব ত্রুটি বিচ্যুতি সত্ত্বেও গ্রন্থখানির বিশেষ গুরুত্ব রহিয়াছে । ইহাতে স্পেনের মুসলিম শাসনের রাজনৈতিক ইতিহাস ও প্রশাসনিক পদ্ধতির পরিপূর্ণ চিত্র রহিয়াছে এবং এমন সমস্ত মূল্যবান ও দুর্লভ গ্রন্থ হইতে উদ্ধৃতি রহিয়াছে বর্তমানে যাহার সন্ধান পাওয়া যায় না । গ্রন্থটির কোন কোন অধ্যায়ে স্পেনের প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক বিবরণ এমনভাবে প্রদান করা হইয়াছে যাহা হইতে মধ্যযুগের স্পেনের অর্থনৈতিক অবস্থার নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় । ইহা ব্যতীত গ্রন্থটির কোন কোন অধ্যায়ে স্পেনের মুসলিম শাসনের যে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায় তাহা অন্য কোন মৌলিক গ্রন্থে পাওয়া যায় না ।

১৮৪০ হইতে ১৮৪৩ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে লন্ডনে ডন পাস্কল ও গাইয়ানগস ইহা ইংরাজী ভাষায় অনুবাদ করেন । অনূদিত গ্রন্থটির নামকরণ করা হয় 'দি হিস্ট্রি অব দি মোহামেডান ডাইনাস্টিস ইন স্পেন ।' ইহাতে যে ভূমিকা ও টীকা-টিপ্পনী দেওয়া হইয়াছে তাহা খুবই মূল্যবান । উইলিয়াম রাইট গাইয়ানগসের ইংরেজী অনুবাদের তীব্র সমালোচনা করেন এবং নিজে ১৮৫৫ হইতে ১৮৬১ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে ডজি ও গুস্তাভে ডুকাটের সহযোগিতায় লেডেনে 'এনালেকটেস সুর লা ছিস্তোয়ের এট-লা-লিটারেচার দেস এরাবেস দ্য এস্পাগ্ন' নামে 'নাফহুত্তিবের' মূল আরবী গ্রন্থটি সম্পাদনা করেন । ১২৭৯ হিজরীতে বুলাকে (কায়রো) সপ্ত খণ্ডে ইহা প্রকাশিত হয় । ডজি এবং উইলিয়াম রাইট ইহার ত্রুটিবিচ্যুতির কঠোর সমালোচনা করেন কিন্তু লেনপুল তাঁহাকে জোর সমর্থন জানান । কারণ তিনি ছিলেন এ বিষয়ের পথিকৃৎ এবং এই বিরাট গ্রন্থ অনুবাদের একমাত্র দাবীদার । একথা সত্য যে, ইংরেজী অনুবাদটি সর্বক্ষেত্রেই নির্ভুল ও ত্রুটিমুক্ত হয় নাই এবং কোন কোন বিষয় অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আকারে বর্ণিত হইয়াছে । তথাপি তিনি তথ্যাদির যে বিবরণ দান করিয়াছেন আরবী ভাষায় অনভিজ্ঞ পাঠকের জন্য তাহা খুবই সহায়ক হইয়াছে । 'কিতাব নাফহুত্তিব' নামে খলিলুর রহমান ইহার উর্দু অনুবাদ করিয়াছেন ।

ইতিহাস ও অন্যান্য গ্রন্থ ছাড়াও সমসাময়িক কালের আত্মচরিত পাঠেও স্পেনের মুসলিম শাসনের ইতিহাস সম্পর্কে অনেক তথ্য জানা যায় । আবি আব্দুল্লাহ মুহম্মদ ইবনে হারিসুল-খুশানী (মৃঃ ৩৬১ হিঃ/৯৭১ খ্রীঃ) রচিত 'কিতাবুল কুযাত বি-কুরতুবাহ' এই পর্যায়ের অপর একখানি গ্রন্থ । ইহা ব্যতীত এই প্রসঙ্গে আরও যে সমস্ত গ্রন্থের নাম করা যায় তাহা হইল আবি আল হাসান আলী বিন বাসাম (মৃঃ ৫৪২ হিঃ/১১৪৭-৮ খ্রীঃ) রচিত 'আলজাখিরা ফি মাহাসিনিল জাহিরা', ইবনুল ফারাজী নামে পরিচিত আবি আল ওয়ালিদ আব্দুল্লাহ ইবনে মুহম্মদ বিন ইউসুফ আল আজদি (মৃঃ ১০১৩ খ্রীঃ) রচিত 'তারিখ উলামাইল আন্দালুস,' আবিল কাসিম খালাফ বিন আবদুল মালিক বিন বাসকুয়াল (মৃঃ ৫৭৮হিঃ/১১৮৩ খ্রীঃ) রচিত 'কিতাবুস্ সিলাহ ফি তারিখে আইমনাতিল আন্দালুস', আবু জাফর আহমদ বিন ইয়াহিয়া আল জাব্বী (মৃঃ ১২০৩ খ্রীঃ) রচিত 'বুগিয়াতুল মুলতামিস ফি তারিখে রিজাল-আহলুল আন্দালুস' এবং ইবনুল আকবর (মৃঃ ১২৬০ খ্রীঃ) বলিয়া পরিচিত আবু আব্দুল্লাহ মুহম্মদ ইবনে আবি বকর আল কুজা রচিত 'তাকমিলাহ লি কিতাবুস সিলা' ।

📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 ইউরোপীয় উৎস

📄 ইউরোপীয় উৎস


ইউরোপীয় ভাষায় রচিত সমসাময়িক কালের যে সমস্ত গ্রন্থ পাওয়া যায়, তাহাতে মুসলিম শাসনকালে স্পেনের যে, ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক পুনর্গঠন হইয়াছিল তাহার কোন তথ্যই পাওয়া যায় না । 'স্পেনের ঘটনাপঞ্জী' লেখকদের মধ্যে যাঁহাদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়, তাঁহারা হইতেছেন—ইসিডোরাস প্যাচেন্সিস, মুংক সেবাসতিয়ান, মুংক ভিজিলা, সাম্পিরো, পিলাগিয়স । টলেডোর আর্চবিশপ ডন রুই জেমেনেজ কর্তৃক ল্যাটিন ভাষায় রচিত গ্রন্থ 'আরব জাতির ইতিহাস' সমসাময়িককালের সর্বপ্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ । প্রচুর আরবীগ্রন্থ ও ঘটনাপঞ্জী আলোচনা করার পর তিনি এই গ্রন্থখানি রচনা করেন । ভুল তথ্য সম্বলিত এই গ্রন্থখানিতে ১১৪০ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত ঘটনাপঞ্জীর আলোচনা করা হইয়াছে । দশম আলফন্সোর আদেশে ইহুদী ও মুসলমান লেখকগণ ক্যাস্টিলিয়ান ভাষায় স্পেনের সাধারণ ইতিহাস রচনা করেন । ইহাকে স্পেনীয় খ্রীস্টানদের সামাজিক ইতিহাস না বলিয়া সাহিত্য বলা যাইতে পারে । ফলে জাতীয়তা ও ধর্মীয় গোড়ামীর প্রভাবে প্রভাবিত হইয়া পরবর্তীকালের ইতিহাস বেত্তাগণ মুসলিম কীর্তিকলাপকে সম্পূর্ণ অবহেলা ও অগ্রাহ্য করিয়াছেন । আরবী ও হিব্রু ভাষায় রচিত গ্রন্থ 'লজ লস মোসারাবেস দে-টলেডো অন লস সিগলোস' (১২-১৩ শতাব্দী) মোজারেবদের (যে সমস্ত স্পেনীয় খ্রীস্টান মুসলমানদের সামাজিক নিয়ম কানুন মানিয়া চলিত) সম্পর্কে একটি মূল্যবান সংগ্রহ । মাদ্রিদের জাতীয় মহাফেজ খানা, টলেডোর বিভিন্ন উপাসনালয় ও অপরাপর গীর্জায় ইহা সংরক্ষিত হয় । এঞ্জেল গঞ্জালেস প্যালেন্সিয়া চারি খণ্ডে ইহার সম্পাদনা করেন । ১৯২৬-৩০ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে ইহা মাদ্রিদে প্রকাশিত হয় ।

১০৮৩ হইতে ১২৯৯ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ের ঘটনাবলীর বিস্তারিত ও সুষ্ঠু ইতিহাস রহিয়াছে । কিন্তু সমগ্র চতুর্দশ শতাব্দীর ঘটনাবলীর বিক্ষিপ্ত ও অসম্পূর্ণ বর্ণনা বহুল কিছু কিছু রচনা পাওয়া যায় । মুসলিম রাজত্বকালে মুজারেবদের অবস্থার কথা পরিষ্কার ভাবে বর্ণনা করা হইয়াছে এই সমস্ত গ্রন্থে । অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ফ্লোরেজ কর্তৃক একান্ন খণ্ডে বিরচিত 'এস্পানীয়া সাগারদা' গ্রন্থে স্পেনে মুসলিম শাসনামলের ইতিহাস সম্পর্কে কিছু কিছু আলোচনা বিক্ষিপ্ত অবস্থায় দেখিতে পাওয়া যায় । সাগারদা একখানি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ । সমসাময়িক কালের এবং তৎপূর্ববর্তী সময়ের ঘটনাপঞ্জির কিছু কিছু অংশ এই গ্রন্থে আলোচিত হইয়াছে । মাদ্রিদের রয়েল একাডেমী অব হিস্ট্রি 'কালেকশন দে ডকুমেন্টস ইন এডিতোস প্যারা লা হিস্তোরিয়া দে এস্পানিয়া' নামে ঐতিহাসিক তথ্য সমৃদ্ধ একখানি মূল্যবান গ্রন্থ প্রকাশ করে ।

📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 আধুনিক উপাদান

📄 আধুনিক উপাদান


জে. এ. কোন্দে রচিত 'হিস্তোরীয়া দে-লস দোমিনাসীয়ন দে-লস এরাবেস এন এস্পানীয়' গ্রন্থখানি ১৩৪৪ খ্রীস্টাব্দে তিন খণ্ডে প্রকাশিত হইলে তখন ইহা উচ্চমানের গ্রন্থ বলিয়া পরিগণিত হয় । এই বিষয়ে পথিকৃৎ হওয়ার দরুন কোন্দে তাঁহার গ্রন্থে অসংখ্য ভুল তথ্য পরিবেশন করেন । রেইনহার্ট ডজির শিক্ষক প্রফেসর ওয়েজার্স গ্রন্থখানির প্রতি ডজির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন । গ্রন্থখানির ভুলভ্রান্তি ডজিকে হতাশ করিলেও ইহা তাঁহাকে স্পেনের মুসলমানদের সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণার কাজ করে । তিনি আরবী গ্রন্থগুলির সমালোচনামূলক সংস্করণ ও মুসলিম স্পেনের রাজনীতি ও সাহিত্যের ইতিহাস ফরাসী ভাষায় অনুবাদ করার ব্যাপক প্রস্তুতি নেন । তেলেমসেনের বনু সাইয়ান, সেভিলের আব্বাদী এবং ইবনে আবদুনের কবিতার উপর গ্রন্থ রচনা ছাড়াও ডজি ১৮৪৭ খ্রীস্টাব্দে আবদুল ওয়াহিদ আল-মারাকুশী রচিত আলমুয়াহেদুন (মুয়াহহেদদের ইতিহাস) এবং ১৮৪৮ হইতে ১৮৫১ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে ইবনুল ইজারী রচিত 'আলবায়ানুল মাগরিব ফি আখবারিল মাগরিব' গ্রন্থ দুইটি সম্পাদনা করেন । ডজি ক্যাম্ব্রিজের উইলিয়াম রাইট, ফ্রান্সের গুস্তাভে ডুগাত ও জার্মানের লুডলফ ক্রেলের সহযোগিতায় ১৮৬১ খ্রীস্টাব্দে আল-মাক্কারীর সুবিখ্যাত গ্রন্থ 'নাফহুত্তিব' সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন । ডজির সুনাম সাধারণতঃ চার খণ্ডে প্রকাশিত তাঁহার রচিত গ্রন্থ 'হিস্তোয়ের দেস মুসলমানস্ দে এস্পান্ন'র উপর নির্ভর করে । ১৮৬১ খ্রীস্টাব্দে প্রকাশিত এই গ্রন্থটি আলমুরাবিও অভিযান হইতে শুরু করিয়া সেভিলের আব্বাসী শাসক মুতামিদের (১০৯৫ খ্রীঃ) শাসন কাল পর্যন্ত ঐতিহাসিক বর্ণনায় পরিপূর্ণ । ডজির লেখায় গভীর পাণ্ডিত্য এবং ঘটনা বিশ্লেষণে ভাষার সাবলীলতা খুবই হৃদয়গ্রাহী । ইহা এই বিষয়ের উপর একখানি উত্তম গ্রন্থ হিসাবে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা লাভ করিয়াছে । ফ্রান্সিস গ্রীফিন স্টকস গ্রন্থখানি 'স্পেনিস ইসলাম' নামে ইংরেজী ভাষায় অনুবাদ করেন এবং ইহা ১৯১৩ খ্রীস্টাব্দে লণ্ডনে প্রকাশিত হয় । ইহা উর্দুতে অনুবাদ করেন মৌঃ জাকাউল্লার পুত্র মুহম্মদ ইনায়েত উল্লাহ । 'ইব্বত নামায়ে আন্দালুস' নামে গ্রন্থখানি ১৯৩৯ খ্রীস্টাব্দে দিল্লীতে প্রকাশিত হয় ।

ডজির রচনার ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও ইহার অসম্পূর্ণতা দৃষ্টিগোচর হয় । ১১১০ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত স্পেনের মুসলিম শাসনের ইতিহাস পর্যালোচনা করা হইলেও বার্বার, আল মুরাবিতুন, আল মুয়াহিদুন ও বনু নাসর শাসনের পরবর্তী চার শতাব্দীর ইতিহাস ইহাতে বর্ণিত হয় নাই । স্পেনের মুসলিম শাসনের ইহা একটি অসম্পূর্ণ ইতিহাস । ডজি এই গ্রন্থে সমকালীন সাংস্কৃতিক ও তথ্যবহুল সাহিত্য কর্মকে অবহেলা করিয়া শুধু ঐ সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাসের বর্ণনা প্রদান করিয়াছেন । ডজি ১৮৮১ খ্রীস্টাব্দে তাঁহার শব্দকোষ 'সাপ্লিমেন্ট আত ডিকশনারীস আরাবেস' নামে দুইটি বিরাট খণ্ডে প্রকাশ করেন । শব্দকোষ প্রকাশের দুই বৎসর পর তিনি পরলোক গমন করেন । মজার ব্যাপার এই যে, তিনি তাঁহার সাহিত্যিক জীবন শুরু করিয়াছিলেন, 'এ ডিকশনারী অব আরাবিক কস্টিউম' সম্পাদনার মাধ্যমে এবং তাঁহার জীবনের পরিসমাপ্তিও ঘটে উক্ত কর্মের পরিপূরক শব্দকোষ প্রকাশনার মধ্য 'দিয়া । এই শব্দকোষই ডজিকে ভাষাতত্ত্ববিদ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত করে ।

এই মূল্যবান গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে ডজি তাঁহার পূর্ববর্তী লেখকদের অতিক্রম করিয়া ইতিহাস রচনার এক অনির্ধারিত পদ্ধতির প্রবর্তন করেন । এভারেস্ট লেভি প্রভেঙ্কাল তাঁহার পথ অনুসরণ করিয়াছেন । লেভি প্রভেঙ্কালও ডজির ন্যায় বহু লেখার মাধ্যমে মূল আরবী গ্রন্থের উৎসকে সহজলভ্য করিয়াছেন । ১৯৩২ খ্রীস্টাব্দে তিনি ডজির 'হিস্তোয়ের মুসলমানস দে এস্পাগ্ন' (৭১১-১১১০খ্রীঃ) গ্রন্থটির সংশোধিত সংখ্যা প্রকাশ করেন । এই গ্রন্থে সন্তুষ্ট না হইয়া তিনি স্পেনের মুসলিম ইতিহাসকে নতুন ভাবে লিপিবদ্ধ করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন । তাঁহার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলির মধ্যে 'ইন্সক্রীপশন এরাবেস দে এস্পান্ন' দুই খণ্ডে ১৯২১ খ্রীস্টাব্দে প্রকাশিত হয় । ১৯৫০-৫৩ খ্রীস্টাব্দে প্যারিসে 'লে এস্পাগ্ন মুসলমানস আত জেমে সিয়েক্লী ইনস্টিটিউশন এট ভিয়ে সোসিয়াল' তিন খণ্ডে প্রকাশিত হয় । এই গ্রন্থগুলিতে তিনি ১০৩৯ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত মুসলিম শাসনের পূর্ণ ইতিহাস পর্যালোচনা করিয়াছেন । এই গ্রন্থগুলি ঐতিহাসিক ডজির রচনাকে সম্পূর্ণরূপে অতিক্রম করিয়াছে । দুঃখের বিষয়, এই ঐতিহাসিক পণ্ডিত তাঁহার পরিকল্পিত চতুর্থ খণ্ড স্পেনের বার্বার শাসনের উপর লিখিত গ্রন্থ 'বার্বার এম্পায়ার্স আলমুরাবিত ও আল মুয়াহিদ' প্রকাশের পূর্বেই ইহলোক ত্যাগ করেন । তাঁহার মৃত্যু আধুনিক ইতিহাস গবেষণার ক্ষেত্রে ১০৩১ খ্রীস্টাব্দের পর এক বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি করে । ডজির ন্যায় ইতিহাস বিশ্লেষণে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী না হইলেও লেভি প্রভেঙ্কাল ছিলেন তাহার যোগ্য উত্তরাধিকারী । এমিলিও গার্সিয়া গোমেজ স্পেনীয় ভাষায় লেভি প্রভেঙ্কালের 'হিস্তোয়ের' গ্রন্থটি 'হিস্তোরিয়া দে এস্পানীয়া' (৪র্থ খণ্ড) নামে অনুবাদ করেন এবং ১৯৫৬ খ্রীস্টাব্দে ইহা মাদ্রিদে প্রকাশিত হয় ।

দ্বাদশ শতাব্দীর শেষাংশ ও আলমুহাদ যুগের ইতিহাস জানিতে হইলে আমাদিগকে ডজি লিখিত ইতিহাসের সংশোধিত সংখ্যা ও আস্ত্রাসীয় হুইসী মিরান্দা লিখিত 'হিস্তোরীয়া পলিটিকা দেল এস্পোরীয় আলমুহেদ' নামক গ্রন্থটির উপর নির্ভর করিতে হয় । গ্রন্থটি ১৯৫৬-৫৭ খ্রীস্টাব্দে তিতুয়ানে প্রকাশিত হয় । মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের উপরে লিখিত এস. পি. স্কটের 'হিস্ট্রি অব দি মূরিশ এম্পায়ার' নামক গ্রন্থটি তিন খণ্ডে সমাপ্ত । ইহা ১৯০৪ খ্রীষ্টাব্দে ফিলাডেলফিয়াতে প্রকাশিত হয় । ইহা ঐতিহাসিক তথ্যে সমৃদ্ধ । কিন্তু লেখক তাঁহার এই গ্রন্থে মুসলিম রাজত্বকালে স্পেনের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন পদ্ধতি সম্পর্কে বিশেষ আলোকপাত করেন নাই । তিনি কদাচিৎ তাহার মূল গ্রন্থে বা পাদটীকায় তাঁহার বক্তব্যের সমর্থনে প্রামাণিক সূত্রের উল্লেখ করিয়াছেন । এই গ্রন্থে কিছু কিছু গরমিল পরিলক্ষিত হয় ।

স্টেনলী লেনপুল লিখিত 'হিস্ট্রি অব দি মূরস ইন স্পেন' গ্রন্থটি ১৮৮৮ খ্রীস্টাব্দে লণ্ডনে প্রকাশিত হয় । এই ক্ষুদ্র গ্রন্থে লেখক স্পেনের মুসলিম শাসনের পূর্ণ ইতিহাস আলোচনা করিয়া আরব সংস্কৃতির ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছেন । ১৮৩২ খ্রীস্টাব্দে ওয়াশিংটন আরভিং কর্তৃক প্রকাশিত 'টেলস অব দি আলহামরা'র অনুকরণে লিখিত লেনপুলের গ্রন্থ সম্পর্কে মন্টোগোমারী বলেন যে, "স্টেনলী লেনপুল আরবদের প্রশংসা করিয়াছেন অপরদিকে সমকালীন স্পেনীয়দের পছন্দ করেন নাই । তাঁহার ধারণা আরবদের জন্যই স্পেনের সুনাম ও প্রাধান্য ছিল । আরবদের বিতাড়িত করার ফলেই স্পেনের অধঃপতন হয় ।" আরব দর্শন স্পেনের এবং মধ্যযুগীয় ইউরোপের অপরাপরংশে যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল ১৯২৯ খ্রীস্টাব্দে লন্ডনে প্রকাশিত 'ইসলাম ইন স্পেন' গ্রন্থে লেখক ক্যানন শেল সে সম্পর্কে কম গুরুত্ব প্রদান করিতে চেষ্টা করিয়াছেন । ১৯৩৪ খ্রীস্টাব্দে প্রকাশিত 'হিস্তোয়ের দ্য এস্পান্ন' নামক গ্রন্থে লেখক লুই বাট্র্যান্ড স্পেনের বার্বার ও আরব সংস্কৃতি এবং সভ্যতার গুরুত্বকে খাটো করিয়া দেখাইতে চেষ্টা করিয়াছেন এবং ইউরোপীয় ঐতিহাসিকদের মতবাদকে সমর্থন করিয়া বলিয়াছেন যে, স্পেনীয় সভ্যতায় মুসলমানদের দান খুবই সামান্য ।

১৯৩৫ খ্রীস্টাব্দে লণ্ডনে প্রকাশিত 'দি এস্পেন্ডার অব মূরিশ স্পেন' গ্রন্থে গ্রন্থকার জসেফ ম্যাক্কার দৃঢ়তার সহিত কতিপয় ইউরোপীয় লেখকের যথা-চার্লস প্লেটরিক ও লুইস বাট্র্যান্ডের পক্ষপাতিত্ব মূলক মতামতকে খণ্ডন করিয়াছেন । ব্যাপক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে লিখিত এই গ্রন্থটিতে তিনি বলিয়াছেন যে, আরবরা শুধু প্রাচীন ও আধুনিক সভ্যতার মধ্যে যোগসূত্রই রচনা করেন নাই বরং এক নতুন সংস্কৃতির সৃষ্টি করিয়া উহা ইউরোপকে উপহার দিয়াছেন ।

১৯১০ খ্রীস্টাব্দে লন্ডনে প্রকাশিত 'দি হিস্ট্রি অব ইন্টেলেকচিউয়্যাল ডেভেলপমেন্ট অব মুসলিম স্পেন' গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডের এক শত পৃষ্ঠায় লেখক জন উইলিয়াম ড্রাম্পার তাঁহার নিরপেক্ষ লেখনীর মাধ্যমে মুসলমানদের নিকট ইউরোপবাসীদের ঋণ সম্পর্কে আলোচনা করিয়াছেন ।

১৯৪৫ খ্রীস্টাব্দে বার্সিলোনায় প্রকাশিত এ গঞ্জালেজ প্যালেন্সিয়া কর্তৃক লিখিত 'হিস্তোরিয়া দেলা এস্পানীয়া মুসালমানা' একখানি জনপ্রিয় সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ । হেনরী তেরেসা লিখিত ও ১৯৫৮ খ্রীস্টাব্দে প্যারিসে প্রকাশিত 'ইসলাম দ্য এস্পাগ্নে উনে রিকন্ত্রে দেল ওরিয়েন্ট এট' দে-লা অক্সিডেন্ট' গ্রন্থটিতে সাধারণতঃ প্রত্নতত্ত্ব ও শিল্পকলার ইতিহাস বিবৃত হইয়াছে । আমেরিকো ক্যাস্ট্রো লিখিত 'স্ট্রাকচার অব স্পেনীশ হিস্ট্রি' গ্রন্থে ইসলামিক স্পেন সম্পর্কে লেখক যে মতামত প্রকাশ করিয়াছেন হেনরী তেরেসা উহাকে সমর্থন জানান । গ্রন্থটি ১৯৫৪ খ্রীস্টাব্দে প্রিন্সটনে ই. এল. কিং অনুবাদ করেন । সি. সাঞ্চেজ আল বার্নোজের লেখা 'এস্পানীয়া এন সু হিস্তোরীয়া, ক্রিস্টিয়ানোস, মূরোস ই খুদিওস' ১৯৪৮ খ্রীস্টাব্দে বুয়েনেস আয়ারসে আমেরিকো ক্যাস্ট্রো কর্তৃক সংশোধিত ও প্রকাশিত । উল্লিখিত গ্রন্থে ক্যাথলিক মতের বিরুদ্ধে ভিজিগথ যুগ হইতে আধুনিক যুগ পর্যন্ত ক্রিশ্চিয়ান স্পেনের মধ্যে ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রয়াস পাইয়াছেন । লেখক মতামত প্রকাশ করেন যে, পরবর্তীকালের ক্রিশ্চিয়ান স্পেনের ধারাবাহিকতা ভিজিগথ স্পেনের সহিত স্থাপিত হয় অষ্টম শতাব্দীর মুসলিম শাসনের ফলে । আরবদের নিকট হইতে ব্যাপক ভাবে গৃহীত মিশ্র সংস্কৃতি এই শূন্যতা পূরণ করে ।

১৯৫১ খ্রীস্টাব্দে লণ্ডনে প্রকাশিত 'হিস্ট্রি অব দি আরবস' গ্রন্থে গ্রন্থকার ফিলিপ কে. হিট্টি ইহার চতুর্থ খণ্ডের ১০০ পৃষ্ঠা ব্যাপী লেখায় স্পেনীয় আরব বুদ্ধিজীবীদের অবদান সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য পরিবেশন করিয়াছেন । স্পেনের মুসলমান শাসনের একখানি পূর্ণ ইতিহাস গ্রন্থ উর্দু ভাষায় রচনার জন্য পাটনার মৌলানা সাইয়েদ রিয়াসত আলী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন । 'তারিখে উন্দুলুস' নামে ইহার প্রথম খন্ড ১৯৫০ খ্রীস্টাব্দে আজমগড়ে প্রকাশিত হয় । ইহাতে দ্বিতীয় আবদুর রহমানের (৮৫২ খ্রীঃ) রাজত্বকাল পর্যন্ত স্পেনের ইতিহাস আলোচিত হইয়াছে । উর্দু ভাষায় রচিত ইতিহাস গ্রন্থের মধ্যে ইহা একটি তথ্যপূর্ণ গ্রন্থ । ১৯৬৭ খ্রীস্টাব্দে এডেনবার্গে প্রকাশিত 'এ হিস্ট্রি অব ইসলামিক স্পেন' গ্রন্থে ডব্লিউ মন্টগোমারী অতি সংক্ষেপে মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস এক নতুন প্রেক্ষাপটে রচনা করেন । এই গ্রন্থে মুসলিম স্পেনের স্থাপত্য ও প্রশাসন সম্পর্কিত ইতিহাস খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে লিপিবদ্ধ হইয়াছে ।

📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 মুসলমানদের আগমনের পূর্বে স্পেন

📄 মুসলমানদের আগমনের পূর্বে স্পেন


হিজরী প্রথম শতাব্দীর মধ্যে মুসলিম সাম্রাজ্য পূর্বে হিন্দুকুশ হইতে পশ্চিমে আটলান্টিকের উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে । স্থায়ীভাবে বসবাসরত ও যাযাবর জাতীয় বার্বারদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগ লইয়া মুসলমানগণ শেষ পর্যন্ত তিউনিসিয়াতে নিজদিগকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন । ৬৯৮ খ্রীস্টাব্দে বাইজান্টাইনের অধিবাসীগণ তাহাদের উত্তর আফ্রিকার রাজধানী কার্থেজ হইতে বিতাড়িত হয় । অষ্টম শতাব্দীর প্রথম হইতেই মুসলমানগণ আলজিরিয়ার মধ্য দিয়া মরক্কোতে প্রবেশ করিতে শুরু করে । এই এলাকায় স্থায়ী বসবাসকারী বার্বারগণ মুসলমানদের অগ্রাভিযানে বাধা প্রদান করিলে তিউনিসিয়ার নবনিযুক্ত গভর্নর মুসা বিন নুসাইর তাহাদিগকে সমূলে ধ্বংস করেন । মুসা বিন নুসাইর উমাইয়া খলিফাদের অধীন ছিলেন । পূর্বে তিনি মিসরের গভর্নরের অধীনে কায়রোওয়ানের শাসনকর্তা হিসাবে কার্য পরিচালনা করেন । পরবর্তীকালে ৬৭০ খ্রীস্টাব্দে কায়রোওয়ানে উত্তর আফ্রিকার মুসলিম রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হয় । আমীর আলী বলেন, "ইফ্রিকিয়া যখন মুসলিম শাসনাধীনে সহিষ্ণুতা ও সুবিচারের আশীর্বাদপুষ্ট হইয়া পার্থিব উন্নতির চরম শিখরে উন্নীত তখন আইবেরিয়ান উপদ্বীপ ভিজিগথ শাসনের কঠোর ও কঠিন যাতাকলে নিষ্পেষিত হইতেছিল ।" ৩

ভিজিগথ শাসকগণ তাহাদের পূর্ববর্তী সুয়েভী ও ভ্যান্ডাল শাসকদের অপেক্ষা নিজদিগকে উত্তম বলিয়া প্রমাণ করিতে ব্যর্থ হন । স্পেন প্রায় তিনশত বৎসর (৪০৯-৭১২ খ্রীঃ) ভিজিগথ শাসনাধীনে ছিল । ৪ এই দীর্ঘ সময়ে তাঁহারা পূর্ববর্তী শাসক সিজারদের (কায়সার) দুঃশাসন ও অন্যায় অত্যাচারের কালিমা দূরীভূত করিতে ব্যর্থ হন । বরং তাঁহাদের দুঃশাসনে জনগণের দুঃখকষ্ট আরও বৃদ্ধি পায় । ৫ গথিক শাসন “ধ্বংসলীলা, গণহত্যা ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্দয়ভাবে দমন এবং আক্রমণকারী বার্বারদের (অসভ্য জাতি) অভ্যন্তরীণ কোন্দলে পরিপূর্ণ ।" উত্তরাধিকারী নির্বাচনে বুদ্ধিজীবীদের গণতান্ত্রিক প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় । সংক্ষেপে বলা যায় যে, ভিজিগথ রাজতন্ত্র রোমান ইতিহাসের ব্যর্থতার প্রতীক । উঁচু নীচুর ব্যবধান; উত্তরাধিকারী নির্বাচনে সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর প্রতি নিম্নশ্রেণীর অসন্তুষ্টি সেনাদের মধ্যে আস্থাহীনতা, অর্থনৈতিক দূরবস্থা ও ইহুদীদের দুর্ভোগের ইতিহাস ভিজিগথ শাসনের ব্যর্থতার স্বাক্ষর বহন করে । ৬

টিকাঃ
৩. ক) আমীর আলী, হিস্ট্রি অব দ্যা স্যারাসিন্স, লন্ডন, ১৯৫১, পৃঃ ১০৬। খ) ইমামউদ্দিন, সোশিও-ইকোনোমিক এ্যান্ড কালচারাল হিস্ট্রি অব মুসলিম স্পেন, লেডেন, ১৯৬৫, পৃঃ ১৫ গ) জার্নাল অব পাকিস্তান হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি, করাচি, ১৯৫৮, পৃঃ ১১৭
৪. ক) ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, লন্ডন, ১৯১৩. পৃঃ ২১৫। খ) উইলকিনসন, লিটেরেরি হিস্ট্রি অব দ্যা আরবস, পৃঃ ৪৩৫।
৫. ক) লুইস বারট্রান্ড, দ্যা হিস্ট্রি অব স্পেন, লন্ডন, ১৯৫৬, পৃঃ ১৮। খ) জার্নাল অব পাকিস্তান হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি, ১৯৫৮, পৃঃ ১১৭।
৬. লুইস, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯; এম. এম. ইমামউদ্দিন, আল-আন্দালুস, মাদ্রিদ, গ্রানাডা, পৃঃ ২১০-১১।

ফন্ট সাইজ
15px
17px