📄 কর্ডোভা বিদ্রোহ
স্পেনের উমাইয়া আমীর প্রথম হাকাম (৭৯০-৮২২ খ্রীঃ) ফোকাহাগণের নিকট প্রিয়ভাজন ছিলেন না। তাহারা ৮০৫ খ্রীঃ হাকামের ভ্রাতা ইবনে শাম্মাসকে সিংহাসনে বসাইবার ব্যর্থ চেষ্টা করেন। আমীর কাহাকেও বিশ্বাস করিতেন না। মুসলমান ও খ্রীস্টান ক্রীতদাসদের সমন্বয়ে গঠিত তাঁহার দেহরক্ষী সেনার সংখ্যা তিনি প্রায় ৬০০০ (ছয় হাজার)-এ উন্নীত করেন। এই দেহরক্ষীদল আরবী জানিত না বলিয়া তাহাদিগকে বোবা বলা হইত। এই বিশেষ বাহিনীর পিছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করিবার ফলে আমীরকে নগরশুল্ক ও বর্ধিত কর আরোপ করিতে হয়। ফলে কর্ডোভাবাসীগণ আমীরের বিরুদ্ধে বিক্ষুদ্ধ হইয়া ওঠে। নিগ্রো ক্রীতদাস সৈনিকগণ অধিকাংশ সময় আইন শৃঙ্খলা ভঙ্গ করিত। ইহার ফলে কর্ডোভাবাসীদের মধ্যে অসন্তুষ্টি দেখা দেয়। ৮০৭ খ্রীস্টাব্দে টলেডোর অভিজাত সম্প্রদায়ের উপর নির্মম ও নির্বিচার হত্যাকাণ্ড চালাইবার পর টলেডো ও কার্ডোভায় সাত বৎসর শান্তি বিরাজ করে। রাজধানীর দক্ষিণাংশে অবস্থিত সেকুন্দার আররা বেল দেল সুরের মহল্লায় ছাত্র ও ফোকাহাদের মধ্যে দ্রুত অসন্তুষ্টি ছড়াইয়া পড়ে এবং ৮১৪ খ্রীস্টাব্দে মারাত্মক বিদ্রোহ দেখা দেয়। নিয়ম মাফিক মসজিদে নামাজ আদায়ের জন্য গমন কালে পথিমধ্যে, একদিন এক সাধারণ লোক আমীরকে অপমান করে। ইহাতে জনগণ খুবই আনন্দিত হয়। এই অপমানে ক্রোধান্বিত হইয়া আমীর দশ ব্যক্তিকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করেন। ইহাতে কর্ডোভাবাসীগণ অতিশয় বিক্ষুদ্ধ হইয়া ওঠেন। ইয়াহিয়া আন্দোলন পরিচালনা করেন কিন্তু আমীরের বিরুদ্ধে জনগণকে উত্তেজিত করিবার কার্যে যিনি ইন্ধন জোগান তিনি ছিলেন তালুত। ১
রমজান ১৯৮ হিঃ/ মে ৮১৪ খ্রীঃ একদিন আমীরের ক্রীতদাস দেহরক্ষী দলের জনৈক সদস্য এক অস্ত্র প্রস্তুতকারককে তাহার তরবারি পালিশ করিয়া দিতে বলে। অস্ত্র প্রস্তুতকারক ইহাতে একটু দেরী করিলে দেহরক্ষী উত্তেজিত হইয়া তাহাকে হত্যা করে। বিরাট সংখ্যক সমরাস্ত্রোধারী কর্ডোভাবাসী হাকামের প্রাসাদ সম্মুখে তাঁহাকে হত্যা করিবার উদ্দেশ্যে সমবেত হয়। আমীর তাহাদিগকে ছত্রভঙ্গ করিবার উদ্দেশ্যে সৈন্যদল প্রেরণ করেন কিন্তু তাহারা পরাজয় বরণ করে। কর্ডোভার বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে হাকাম প্রাসাদের বাহিরে আগমন করেন এবং সমসাময়িক কালের দুঃসাহসী যোদ্ধা, তাহার পিতৃব্য পুত্র ওবায়দুল্লাহকে শ্রেষ্ঠ অশ্বারোহী বাহিনী সহযোগে বিদ্রোহীদের মধ্য দিয়া রাস্তা করিয়া অগ্রসর হইতে এবং আররাবাল (রাবাদ) দেল সুরে ফোকাহাদের মহল্লায় অগ্নি সংযোগের আদেশ করেন।
জনগণ অগ্নিনির্বাপণ ও তাহাদের পরিবার পরিজনসহ সম্পত্তি রক্ষা করিবার জন্য প্রাসাদ ত্যাগ করিলে হাকাম ও ওবায়দুল্লাহ উভয়দিক হইতে প্রচণ্ডবেগে বিদ্রোহীদের উপর হামলা করিলে বিদ্রোহীগণ প্রাণভয়ে বিশৃংখলভাবে পলাইতে শুরু করে। নিগ্রো দেহরক্ষী বাহিনী তাহাদিগকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। দুর্ঘটনার দিনই কতিপয় ধর্মীয়নেতা কর্ডোভাবাসীদের তরফ হইতে ক্ষমা ভিক্ষার জন্য আমীরের প্রাসাদে আগমন করেন কিন্তু তাহাদিগকে অদুইরা-র কারাগারে বন্দী করা হয় এবং প্রহরী জুদাইর তাহাদিগকে হত্যা করিবার নির্দেশ লাভ করে। ২ জুদাইর এই আদেশ পালন করিতে বিলম্ব করিলে তাহার স্থলে ইবনে নাদিরকে প্রেরণ করা হয়। কর্ডোভার তিনশত বিদ্রোহী সর্দারকে মাথা নীচের দিকে ঝুলাইয়া হত্যা করা হয়।
টিকাঃ
১। ইবনুল খাতিব, দ্যা খেলাফত-ই মুয়াহিদীন, পৃঃ ১৬।
২। বর্তমান ক্যাম্পু ডি ক্যালাটারাভা।
📄 স্পেন হইতে বিদ্রোহীদের নির্বাসন
হত্যালীলার কবল হইতে যাহারা প্রাণে রক্ষা পায় তাহাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে হাকাম উজিরদের সহিত পরামর্শ করেন। হাকাম বিদ্রোহীদের সবাইকে হত্যার পরামর্শ বাতিল করেন এবং নির্বাসনের প্রস্তাব গ্রহণ করেন। ৩ ফোকাহাদের অনুসারী নব মুসলিমদের মজবুত ঘাঁটি গোয়াদালকুইভিরের দক্ষিণে সেকুন্দার আররাবেল দেল সুরকে ধূলিস্মাৎ করিয়া বিদ্রোহীদিগকে তিনদিনের মধ্যে স্পেন ত্যাগ অন্যথায় মৃত্যু বরণ করিবার আদেশ জারি করেন। ৪ ইয়াহিয়া তালুত ও অন্যান্য বিখ্যাত ধর্মীয় নেতাগণ মুক্তি লাভ করেন। বিদ্রোহীরা দেশ ত্যাগের অনুমতি না থাকায় তাহারা স্ত্রী, পুত্র ও ছোট ছোট বহনযোগ্য গাটরিসহ স্পেন ত্যাগ করে। ৫ যাত্রাপথে দস্যুদল ও চরিত্রহীন সেনাবাহিনীর লোকেরা ঝোপ জঙ্গলে আত্মগোপন করিয়া থাকিত তাহাদের যথাসর্বস্ব লুণ্ঠন করিবার উদ্দেশ্যে। যাহারা ধনসম্পত্তি রক্ষা করিবার চেষ্টা করে তাহারা নিহত হয়। গন্তব্যস্থল উপকূলে পৌছিবার পূর্বেই তাহাদের অনেকে লুণ্ঠিত ও নিহত হয়। উপকূলে পৌছিবার পর তাহারা দুই দলে বিভক্ত হইয়া একদল উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকা ও অপর দল মিশর গমন করে।
টিকাঃ
৩। ইবন আল-কুতিয়া (জে রিবেরা) হিস্ট্রোরিয়া, মাদ্রিদ ১৯২৬, পৃঃ ৫৫-৫৭; অনুবাদ ৪৪-৪৬।
৪। ইবনে আব্বার, হুল্লাহ, পৃঃ ৩৮; ইবন আল-কুতিয়া, ইফতিতাহ আল-আন্দালুস, পৃঃ ৫০-৫১: মাজমুয়া আখবার আল-আন্দালুস, পৃঃ ১৩০, ১৩২, ১৫৯।
৫। হিস্ট্রি অব দ্যা মুরিশ ইম্পায়ার ইন ইউরোপ, ১ম খণ্ড ফিলাডেলফিয়া, ১৯০৪, পৃঃ ৪৬৭-৬৮।
📄 ফেজে পুনর্বাসিত কর্ডোভাবাসী
আট হাজার পরিবার মরক্কোতে আশ্রয় গ্রহণ করে। ৬ দ্বিতীয় ইদ্রিস, তাহার পিতা প্রথম ইদ্রিস কর্তৃক ৭৮৯ খ্রীঃ প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র ফাস-এ (ফেজ) তাহাদিগকে সাদরে গ্রহণ করেন। সেখানে পূর্বেই স্পেন হইতে উদ্বাস্তু আগমন করিয়াছিল। দ্বিতীয় ইদ্রিস কর্তৃক নবনির্মিত শহর, মাদিনাতুল আলীয়া অথবা আল কায়রোওয়ানের উপকণ্ঠে তাহারা বসতি স্থাপন করে। ৭ ৮ মাদিনাতুল আন্দালুস অথবা ইদওয়াতুল আন্দালুস (আন্দালুসীয় মহল্লা) নামে তাহারা পরিচিত হইয়া ওঠে। ৯ কায়রোওয়ান ও কর্ডোভার আরবগণ একে অপরকে ঘৃণা করিত। ১০ ফলে মহল্লার মধ্যবর্তী স্থানে প্রাচীর নির্মাণ করিয়া তাহাদিগকে পৃথক করিয়া রাখা হইত। কর্ডোভার পারদর্শী বাগান রচনাকারী, স্থপতি ও শিল্পী উদ্বাস্তুগণ ফেজের অমূল্য সম্পদে পরিণত হয়। তাহাদের অভিজ্ঞ হাত ও কৌশল ব্যবহারে শহর ও শহরতলী উন্নত এবং সৌন্দর্যমণ্ডিত হইয়া গড়িয়া ওঠে।
টিকাঃ
৬। গমেজ. ই. গার্সিয়া, হিস্ট্রোরিয়া ডি ইস্পানা, ৪র্থ খণ্ড, মাদ্রিদ ১৯৫০, পৃঃ ১১১।
৭। পি. কে. হিট্টি, হিস্ট্রি অব দ্যা আরবস, পৃঃ ৫১২, টীকা-২।
৮। ক্রেমার, ডিসক্রিপশান ডি এল আফ্রিকো, পৃঃ ৬৯।
৯। লেভি প্রভেঙ্কাল, লা ফনডেশন, ১৯৩৮, পৃঃ ২৩-৫৩।
১০। ডজি, হিস্ট্রোয়ার, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৩৫৫; আলবোরনোজ, লা ইস্পানা মুসলমানা, আর্জেন্টিনা, পৃঃ ১৩৬-৭।
📄 তাহাদের পুনর্বাসন ও আলেকজান্দ্রিয়ার শাসন
তাহারা ভূমধ্যসাগরের মধ্য দিয়া পূর্বদিকে যাত্রা শুরু করে এবং ১৯৯ হিঃ/ ৮১৪-৫১০ খ্রীঃ নাগাদ আলেকজান্দ্রিয়ার উপকূলে নঙ্গর করে। ১১ আলেকজান্দ্রিয়ার শহরতলীতে একত্রিত হইবার পূর্বে বিত্ত ও কপর্দকহীন অবস্থায় তাহারা বেলেয়ারিক দ্বীপপুঞ্জের অপর পাড়ে ও ইটালীতে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ঘুড়িয়া বেড়ায়। ১২ প্রথম হাকামের বিরুদ্ধে কর্ডোভাবাসীদের বিদ্রোহ ঘোষণার সমসাময়িক কালে বাগদাদে আব্বাসীয় খলিফা মামুনের বিরুদ্ধেও মিশরীয়গণ বিদ্রোহ করে। ১৩ ওবায়দুল্লাহ বিন আল-সারী আলেকজান্দ্রিয়াতে নিজেকে স্বাধীন শাসক বলিয়া ঘোষণা করেন। ১৪ এই বিশৃংখলাপূর্ণ অবস্থায় আলেকজান্দ্রিয়ার জনগণ তাহাদের নামমাত্র শাসক মামুনের অস্তিত্বকে বিপন্ন করিয়া তোলে। ফাহস আল বালুত উপত্যকার আবু হাফস উমর বিন-ইসা বিন-শোয়াইব আল বালুতী ১৫ এর নেতৃত্বে কর্ডোভার উদ্বাস্তুগণ আলেকজান্দ্রিয়াতে নিজেদিগকে প্রতিষ্ঠিত করিবার উদ্দেশ্যে বিদ্রোহের সুযোগ গ্রহণ করে। ১৬ তাহারা ২০০ হিঃ / ৮১৬ খ্রীঃ আলেকজান্দ্রিয়াতে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১৭ ১৮ কর্ডোভার মোহাজেরগণ আলেকজান্দ্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বন্দর তাহাদের অধিকারে রাখে এবং বার বৎসরের অধিককাল শাসন করে। ১৯ তাহারা আব্বাসীয় আক্রমণ প্রতিহত করে এবং ভূমধ্যসাগরীয় উপদ্বীপসমূহে আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করে। ২০ ক্রীট দ্বীপ সম্পূর্ণরূপে বিজীত হইবার বহু পূর্বে ইহার কিছু অংশ আবু হাফসের পুত্র শোয়ায়েব অধিকার করিয়াছিল। ২১
টিকাঃ
১১। স্টোরিয়া ডেল, মুসলমানি ডি সিসিলিয়া, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৬০; জি. উইট, এল ইজিপ্ট-ডি লা কনকুইটি আরব এ লা কনকুইটি অটোম্যান ইন দ্যা হিস্ট্রোয়ার ডেল নেশন ইজিপ্টাইন, জি. হাউটিয়াক্স, ৪র্থ খণ্ড, প্যারিস, ১৯৩৭, পৃঃ ৬৮-৬৯, ৭১-৭২।
১২। গাসপার ওয়াই রামীর, নাচিয়াত আল-আরব (ফ্রেন্স অনুবাদ) ২য় খণ্ড, পৃঃ ২৭৪; মাক্কারী, নাফলুল তিব, পৃঃ ২১৯; ইবনে আছির, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ২৭৯-৮১।
১৩। রিয়াসত আলী, দ্যা তারিখ-ই-আন্দালুস, ১ম খণ্ড, আজমগড়, ১৯৫০, পৃঃ ৩৮৫।
১৪। ই. গার্সিয়া গমেজ, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ১১১।
১৫। ঐ, পৃঃ ১১১; ইবনে খালদুন (ইবার ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ২১১) আল-জাব্বি, বাগেয়াত আল-মুলতামিস, মাদ্রিদ, ১৮৮৫, পৃঃ ৩৯৪।
১৬। কন্দে, হিস্টোরিয়া, ১ম খণ্ড, বার্সিলোনা, ১৮৪৪. পৃঃ ২৪৮-৫২।
১৭। ইবন আল খাতিব, দ্যা খেলাফত-ই মুয়াহিদ্দীন, পাণ্ডুলিপি নং ৩৭ (রয়্যাল একাডেমী অব হিস্ট্রি) মাদ্রিদ, পৃঃ ১৪৮। মারিয়ান, পৃঃ ২২৩।
১৮। বিশ বৎসরের অধিককাল।
১৯। মারিয়ান, হোমনেজ, পৃঃ ২২৩।
২০। আবদ-আল্লাহ আল-হুমাইদির হইতে কন্দে কর্তৃক উদ্ধৃত, ১ম খণ্ড, পৃঃ ২০৬।
২১। বাইজেন্স, ইট লাস আরবস, ১ম খণ্ড, ব্রুক্সেলেস, ১৯৩৫, পৃঃ ৫৪ টীকা-২।