📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 একাদশ মুহাম্মদ

📄 একাদশ মুহাম্মদ


মুহাম্মদ আবু আব্দুল্লাহ (স্পেন: বো আবদিল) তাঁহার মাতার প্ররোচনায় পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হন । শহর রক্ষীদের সাহায্যে তিনি ১৪৮২ খ্রীস্টাব্দে আলহামরা অবরোধ করেন এবং গ্রানাডা তাঁহার অধিকারে আসে । তিনি তাঁহার পিতাকে মালাগায় আশ্রয় লইতে বাধ্য করেন । ১৪৮৩ খ্রীস্টাব্দের মার্চ মাসে আল-জাগাল ও তাঁহার সহকারী রেজওয়ান ক্যাস্টিলীয়দের মালাগা আক্রমণ প্রতিহত করেন । এই বৎসর আবু আব্দুল্লাহ খ্রীস্টান শহর লুছেনা আক্রমণ করিয়া পরাজিত ও বন্দী হন । এইরূপে আবুল হাসান গ্রানাডার শূন্য সিংহাসন পুনরায় দখল করেন । কিন্তু পরে তাঁহার সুযোগ্য ভ্রাতা মুহাম্মদ আল জাগালের পক্ষে সিংহাসন ত্যাগ করেন । আবুল হাসান ইল্লোরা এবং সেখান হইতে আল মুনেকার-এ গমন করেন এবং সেখানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ।

📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 দ্বাদশ মুহাম্মদ

📄 দ্বাদশ মুহাম্মদ


ফার্ডিনান্ড গ্রানাডাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করিবার জন্য আবু আব্দুল্লাহকে (বোআবদিল) পুতুল হিসাবে ব্যবহার করিয়া বিরাট সৈন্য বাহিনীসহ তাঁহার চাচা আল-জাগালের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। আল-জাগাল তাহার নিজের জন্য একটি শিবির তৈয়ার করেন। ইহা পরবর্তীকালে গ্রানাডার দক্ষিণে শান্তা ফে (পবিত্র বিশ্বাস) শহরে পরিণত হয়। তখন হইতে মুসলমানগণ তাহাদের শেষ সম্বল লইয়া অবরোধ প্রতিহত করে। এই অবরোধ দশ বৎসর স্থায়ী হইয়াছিল। আবু আবব্দুল্লাহ খ্রীস্টানদের চক্রান্ত বুঝিতে না পারিয়া ফার্ডিনান্ড ও ইসাবেলার দাবার ঘুঁটি হিসাবে ব্যবহৃত হয়। তিনি পুরাতন গ্রানাডার অংশ আল-বায়েছিন ১৪৮৬ খ্রীস্টাব্দে অধিকার করেন। আল-জাগাল সম্মিলিত ভাবে ক্যাস্টিলীয়দের বাধা প্রদানের প্রস্তাব করেন কিন্তু তাঁহার ভ্রাতুষ্পুত্র আবু আব্দুল্লাহ ইহাতে সম্মত হন না। উপরন্তু গ্রানাডা রাজ্যের পতন ঘটানোর জন্য আবু আব্দুল্লাহ ক্যাস্টিলীয়দের ও আরাগোনদের সাহায্য করেন। আবু আবদুল্লাহ তাঁহার চাচার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়া গ্রানাডায় পুনর্বাসিত তাঁহার দক্ষিণ হস্ত দেশ প্রেমিক আফ্রিকার বানু সাররাজকে সমূলে ধ্বংস করেন। গৃহযুদ্ধের সুযোগ গ্রহণ করিয়া ক্যাস্টিলীয়গণ আলোরা, কাসর বনিলা, রোন্ডা ও অন্যান্য শহরগুলি একের পর এক অধিকার করেন। ১৪৮৬ খ্রীস্টাব্দে লোজা এবং পরবর্তী বৎসর আলমেরিয়া ও মালাগা পদানত হয়। শহরসমূহের অধিবাসীদের উপর অত্যাচার করা হইবেনা এই শর্তে শহরগুলি আত্মসমর্পণ করে। ফার্ডিনান্ড ও ইসাবেলা চুক্তি ভঙ্গ করিয়া মুসলমানদিগকে ক্রীতদাস হিসাবে বিক্রি করে অথবা নগর হইতোদিগকে তাড়াইয়া দেয়। আল-জাগাল ক্যাস্টিলীয়দের বাধাপ্রদান করিয়া ব্যর্থ হন। ফার্ডিনান্ড সমস্ত শক্তি লইয়া বায়েজা আক্রমণ করেন। নিরাশ হইয়া আল-জাগাল রাজধানী রক্ষা করিবার জন্য আফ্রিকায় বসবাসরত তাঁহার স্বজাতীয়দের সাহায্য প্রার্থনা করেন। কিন্তু তাহাকে হতাশ হইতে হয়। কারণ তাহারাই তখন আফ্রিকার গৃহযুদ্ধে লিপ্ত। খাদ্য সামগ্রীর অভাবে নগরবাসী শর্তসাপেক্ষে আত্মসমর্পণ করে। আল-জাগাল ১৪৮৭ খ্রীস্টাব্দে আত্মসমর্পণ করিতে বাধ্য হন। তিনি মরক্কোর তিলিমসানে গমন করেন এবং সেখানেই অবশিষ্ট জীবন দুঃখ-কষ্টের মধ্যে দিয়া অতিবাহিত করেন।

📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 দ্বাদশ মুহাম্মদের দ্বিতীয় দফা রাজ্য শাসন

📄 দ্বাদশ মুহাম্মদের দ্বিতীয় দফা রাজ্য শাসন


এবারের পালা আবু আব্দুল্লার। ১৪৯০ খ্রীস্টাব্দে তাঁহার মিত্র ফার্ডিনান্ড কর্তৃক গ্রানাডা সমর্পণে আদিষ্ট হন। ইহাতে অস্বীকৃতি জানাইলে চল্লিশ হাজার পদাতিক ও দশ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য ১৪৯১ খ্রীস্টাব্দের বসন্তকালে গ্রানাডা শহর ও গ্রানাডার শস্য-শ্যামল ভূমিকে ধ্বংস স্তূপে পরিণত করে। প্রধান সেনাপতি মুসা বিন গাজানের নেতৃত্বে মুসলিম অশ্বারোহী বাহিনী প্রচণ্ড আক্রমণে প্রথমে বহু সংখ্যক অবরোধকারীকে হত্যা করে। ফার্ডিনান্ড অবরোধকারীদের শক্তি বৃদ্ধি করিলে জনগণ আত্মসমর্পণ করিতে বাধ্য হয়। ভেগার ধ্বংসলীলা অবলোকন করিয়া এবং মুসলিম দেশগুলি হইতে সাহায্য না পাইয়া (৮৯৭ হিজরী ২রা রবিউল আওয়াল/১৪৯২ খ্রীঃ ২রা জুন) বোআবদিল আত্মসমর্পণ করেন।

সন্ধির শর্তসমূহ: সুদীর্ঘ দুই মাস সমুদ্র অথবা স্থল পথে কোনরূপ সাহায্য না পাইয়া পঞ্চাশটি শর্তে মুসলমানগণ স্পেনে তাহাদের শেষ শক্তিশালী দুর্গ হস্তান্তর করিতে সম্মত হয়। নিম্নে উহার কয়েকটি উল্লেখ করা হইল:
(১) আবু আব্দুল্লাহ বোআবদিল, তাঁহার অফিসার এবং নাগরিকবৃন্দ ফার্ডিনান্ড ও ইসাবেলার আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করিবেন।
(২) আবু আব্দুল্লাহ আল বুশারাতে (আল পুজার) একটি জাইগীর পাইবেন।
(৩) মুসলমানগণ তাহাদের জানমালের নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করিবে।
(৪) তাহাদের পুরা আচার অনুষ্ঠান, রীতিনীতি, ভাষা ও পোশাক বহাল থাকবে।
(৫) মুসলমান ও খ্রীস্টানদের মধ্যকার বিরোধ উভয় পক্ষের লোকদের লইয়া গঠিত ট্রাইবুনাল মীমাংসা করিবে।
(৬) মুসলমানগণ মুসলিম শাসকদের আমলে যে সমস্ত কর প্রদান করিত উহাই প্রদান করিবে।
(৭) সমস্ত বন্দী মুসলিম মুক্তি পাইবে।
(৮) স্বর্ণ ও হাতিয়ারসহ সঙ্গে বহনযোগ্য মালামাল লইয়া মুসলমানগণ স্বাধীনভাবে স্পেন ত্যাগ করিতে পারিবে। ইচ্ছা করিলে তিন বৎসর সময়সীমার মধ্যে তাহারা স্পেনে ফিরিয়া আসিতে পারিবে। তিন বৎসর পর ফিরিয়া আসিলে তাহাদের সম্পদের এক দশমাংশ প্রত্যার্পণ করিতে হইবে।
(৯) নব মুসলিমদিগকে তাহাদের পূর্ব ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হইবে না এবং খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণে আগ্রহী মুসলমানদিগকে তাহাদের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে চিন্তা করিবার সুযোগ দিতে হইবে। এবং তাহাদের শেষ সিদ্ধান্তকে একজন মুসলমান ও খ্রীস্টান বিচারকের সম্মুখে ঘোষণা করিতে হইবে।
(১০) মুসলিম ব্যবসায়ীদিগকে স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগ দিতে হইবে এবং খ্রীস্টানদের ন্যায় শুল্ক প্রদান করিয়া মুসলমানরাও দেশের ভিতরে ও বাহিরে ব্যবসা করিতে পারিবে।
(১১) চুক্তির শর্তসমূহ অক্ষরে অক্ষরে পালনের জন্য দায়িত্বশীল গভর্নর ও পরিচালক নিয়োগ করিতে হইবে।

মুসলিম সেনাপতি মুসা ইহুদীদের ভাগ্যের অনিশ্চয়তার প্রসঙ্গ উল্লেখ করিয়া শর্তসাপেক্ষে আত্মসমর্পণে চুক্তির বিরোধিতা করেন। ফার্ডিনান্ড ও ইসাবেলার অঙ্গীকারে তাঁহার বিশ্বাস ছিল না। মুসলমানদের তরফ হইতে কোন প্রকার সমর্থন না পাইয়া, তিনি চিরদিনের জন্য নগরের এলভিরা গেটের বাহিরে চলিয়া যান। দুইমাস অতিবাহিত হইবার পরও মিশরের সুলতান, তুরস্ক ও অপরাপর মুসলিমদেশসমূহ গ্রানাডার মুসলমানদের সাহায্যে সৈন্য প্রেরণ না করার দরুন ক্যাস্টিলীয়গণ শহর অধিকার করে। আবু আব্দুল্লাহ আন্দ্রাক্সে গমন করেন। এবং সেখান হইতে ফেজে নির্বাসিত হন। ১৫৩৮ খ্রীস্টাব্দে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানে তিনি অতি দুঃখ-কষ্টে জীবন যাপন করেন। টেন্ডিল্লার কাউন্ট আল হামরার গভর্নর এবং গ্রানাডা রাজ্যের ক্যাপ্টেন জেনারেল নিযুক্ত হন। কূটিল রাজনীতি ও অস্ত্রবলে স্পেন পুনরায় খ্রীস্টান শক্তির হস্তগত হয়। লুই বাট্র্যান্ড বলেন, "স্পেনীয়রা মনে করেন এই চুক্তির ফলে মুসলমান যুবরাজদের কঠিন শাসন হইতে তুলনামূলকভাবে কম অত্যাচারী শাসনাধীনে গমন করেন। লেখক আরও বলেন, আমরা (ফার্ডিনান্ড ও ইসাবেলা) আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও রাজ বাক্যের মাধ্যমে নিশ্চয়তা দিতেছি, অঙ্গীকার ও শপথ করিতেছি যে এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত সমস্ত বিষয় এবং প্রত্যেকটি অংশ এখন ও ইহার পরবর্তীকালে এবং এখন হইতে চিরদিনের জন্য আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করিব এবং পালন করিতে বাধ্য করিব"। ৩ অস্থায়ীভাবে খ্রীস্টান শাসকগণ সামন্তরাজদের সুযোগ সুবিধা দান করেন। দেশে পরিপূর্ণরূপে অধিকার প্রতিষ্ঠা ওাদিগকে সম্পূর্ণভাবে উৎখাত করিবার উদ্দেশ্যে এই ব্যবস্থা গৃহীত হয়। সহঅবস্থান ও বিভিন্ন জাতির মধ্যে বিবাহের ফলে দীর্ঘ আটশত বৎসরে বহু মুসলমান ক্যাস্টিলীয়তে ও বহু খ্রীস্টান আরবে পরিণত হওয়া সত্ত্বেও ধর্মের গণ্ডিতে মুসলমানদিগকে একত্রিত করা সম্ভব হয় নাই। সর্বোপরি খ্রীস্টান প্রভু চাহিতেন যে, কৃষিকার্যে অভিজ্ঞ মূরগণ কৃষিকার্যে নিয়োজিত থাকুক। ফলে ক্যাস্টিলীয় শাসকদের পক্ষোদিগকে বিতাড়িত করা সমস্যা হইয়া দাঁড়ায়।

পুনর্বিজয়ের উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রথম যুগের (১১৪০) সিদ-এর কাব্যে আলোচিত হয়। নিদর্শন স্বরূপ উহার কয়েকটি পংক্তি উল্লেখিত হইল।
শোন, আলবার্ট ফানেজ ও নাইটগণ! আমরা এই দুর্গে মহামূল্যবান সম্পদ বন্দী করিয়াছি; এই দুর্গের মূরগণ এখন জীবন্ত-মৃত। মূর নারী ও পুরুষকে আমরা বিক্রয় করিতে পারি না, তাহাদের হত্যা করিয়াও আমাদের কোন লাভ হইবে না;াদিগকে অন্দর মহলে থাকিতে দিন, আমরা এখন সম্মানিত! আমরা তাহাদের বাড়িগুলিতে বাস করিব এবং তাহাদেরকে ব্যবহার করিব (৬১৬-৬২২)৪।

টিকাঃ
৩. দ্যা হিস্ট্রি অব স্পেন, প্রথম খণ্ড, লন্ডন, ১৯৫৬, পৃঃ ১৫০, ১৫২।
৪. ক্যাস্ট্রো কর্তৃক উদ্ধৃত, পৃঃ ৪৩।

ফন্ট সাইজ
15px
17px