📄 পঞ্চম মুহাম্মদের পুনরায় ক্ষমতা গ্রহণ
পঞ্চম মুহাম্মদ আল-গনি বিল্লাহ জনগণের আনন্দ উৎসবের মধ্যে দ্বিতীয়বার সিংহাসনে আরোহণ করেন । মাঝে মাঝে পারিবারিক গৃহবিবাদ ব্যতীত তাঁহার দ্বিতীয় বারের শাসনকাল শান্তিপূর্ণ ভাবে অতিবাহিত হয় । তিনি ক্যাস্টিলের নিষ্ঠুর পেড্রোর সহিত সদ্ভাব বজায় রাখেন এবং নাজেরা ও মন্টিলের যুদ্ধে তাহাকে সাহায্য করেন । তিনি আলজেসিরা দখল করেন কিন্তু ইহা দীর্ঘদিন অধিকারে রাখিতে ব্যর্থ হন । মুহাম্মদ ছিলেন একজন সুশাসক । তিনি শিক্ষাদীক্ষা প্রসারে পৃষ্ঠপোষকতা করেন । 'লিসানুদ্দীন' উপাধি প্রাপ্ত বিখ্যাত ঐতিহাসিক এবনুল খাতিব ছিলেন তাঁহার প্রধানমন্ত্রী । ১ তাঁহার সময়ে ব্যবসা বাণিজ্যে ও শিল্পক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয় । উন্নত সেচ ব্যবস্থার দরুন কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায় । ১৩৯১ খ্রীঃ তিনি পরলোক গমন করেন ।
টিকাঃ
১. পঞ্চম মুহাম্মদের শাসনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে ইবনে আলখাতিব মরক্কোতে পলায়ন করেন এবং সেখানে তিনি আততায়ীর হাতে নিহত হন এবং এখানেই ইবনে খাতিব এবং ইবনে খালদুন নাসিরীয় বংশের পরিসমাপ্তি ঘটায়। আল-মাক্কারীর 'নাফলুল-তিব' এবং মূলার কর্তৃক প্রকাশিত নাম বিহীন ঘটনা পুঞ্জের (১৮৬৩ খ্রীঃ) কিছু পৃষ্ঠায় পরবর্তী শাসকদের ইতিহাসের উপাদান পাওয়া যায়।
📄 দ্বিতীয় পর্যায় নাসরী রাজবংশের পতনের যুগ
পঞ্চম মুহাম্মদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে গ্রানাডার উজ্জ্বলতা নিষ্প্রোভ হইয়া পড়ে । মুহাম্মদের মৃত্যুর পর তাঁহার পুত্র আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ সিংহাসনে আরোহণ করেন । তিনি ক্যাস্টিলের শাসকের সহিত সম্ভাব বজায় রাখেন । আল কানতারার ভাগ্য বিধাতা ডন মার্টিন ইয়ানেজ দে বারবুডো ক্যাস্টিলের শাসকের ঘোরতর শত্রু ছিলেন । তিনি ১৮০০ সৈন্য লইয়া গ্রানাডার বিরুদ্ধে ব্যর্থ অভিযান পরিচালনা করেন । ফেজের রাজার নিকট হইতে যৌতুক হিসাবে প্রাপ্ত বিষাক্ত কম্বল ব্যবহারের দরুন ১৩৯২ খ্রীঃ দ্বিতীয় ইউসুফের আকস্মিক মৃত্যু ঘটে ।
📄 সপ্তম মুহাম্মদ
ইউসুফের মৃত্যুর পর তাঁহার দ্বিতীয় পুত্র মুহাম্মদ সিংহাসনে আরোহণ করেন । তিনি তাঁহার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ইউসুফকে সালোব্রেনা দুর্গে কারারুদ্ধ করেন । গ্রানাডা শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটানোর জন্য তৃতীয় হেনরী যুদ্ধের পরিকল্পনা গ্রহণের উদ্দেশ্যে পরামর্শ পরিষদ আহ্বান করেন । কিন্তু পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পূর্বেই তাঁহার মৃত্যু ঘটে । ১৪০৬ খ্রীঃ ক্যাস্টিলীয়গণ গ্রানাডা আক্রমণ করে এবং এক বৎসর পর বর্তমানে কাদিজ প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত জাহরা দুর্গ অধিকার করে ।
মুসলমানগণ বেদার আক্রমণ করেন এবং বিশ হাজার সৈন্য লইয়া খ্রীস্টান কর্তৃক সুদৃঢ়ভাবে রক্ষিত আলকাদেত অবরোধ করেন । যুদ্ধে উভয় পক্ষই সমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় । ইতিমধ্যে সপ্তম মুহাম্মদ গুরুতর রূপে অসুস্থ হইয়া পড়েন । তাঁহার চিকিৎসক অবধারিত মৃত্যুর কথা তাঁহাকে জানান । অতঃপর পুত্রের সিংহাসন নিরাপদ করিবার উদ্দেশ্যে তিনি তাঁহার জ্যেষ্ঠভ্রাতা ইউসুফকে হত্যার আদেশ জারি করেন । আদেশ কার্যকরী হইবার পূর্বেই ১৪০৮ খ্রীস্টাব্দে তাঁহার মৃত্যু ঘটে । জনগণ আবু আব্দুল্লাহ তৃতীয় ইউসুফকে সিংহাসনে বসান ।
📄 তৃতীয় ইউসুফ
তৃতীয় ইউসুফ দুই বৎসরের জন্য ক্যাস্টিলীয়দের সহিত একটি চুক্তি সম্পাদন করেন । ১৪১০ খ্রীস্টাব্দে এই চুক্তির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয় । তিনি ইহার মেয়াদ বৃদ্ধি করিতে চাহিলে ক্যাস্টিলীয়গণ অস্বীকৃতি জানায় । ক্যাস্টিলের যুবক রাজার অভিভাবক ও চাচা ফার্ডিনান্ড মুসলমানদের নিকট হইতে আন্তেকুয়েরা জবর দখল করে । সমস্ত খ্রীস্টানদের মুক্তির শর্তে তাহাদের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয় ।
জিব্রাল্টারের মুসলমানগণ গভর্নরদের অত্যাচারে জর্জরিত হইয়া আফ্রিকানদিগকে জিব্রাল্টার আক্রমণে আহবান জানান । জিব্রাল্টার অধিকারের জন্য ফেজের সুলতান ফায়েজ তাঁহার ভ্রাতা আবু সাঈদকে প্রেরণ করেন । কিন্তু আমীর তৃতীয় ইউসুফের পুত্র আহম্মদ অধিক সংখ্যক সেনাবাহিনী লইয়া আফ্রিকানদের পরাজিত ও আবু সাঈদকে বন্দী করেন । ভাইয়ের নিকট হইতে সিংহাসন নিরাপদে রাখিবার উদ্দেশ্যে ফেজের সুলতান তাঁহার ভ্রাতার সহিত যথেচ্ছা ব্যবহার করিবার জন্য ইউসুফকে আহ্বান জানান । কিন্তু গ্রানাডার রাজা সাঈদকে মুক্তি দিয়া সেনাবাহিনীসহ সুলতানকে যথাযোগ্য শিক্ষা প্রদানের জন্য প্রেরণ করেন । সুলতান শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন এবং সাঈদ সিংহাসন দখল করেন । গ্রানাডা ও ফেজের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় ।
তৃতীয় ইউসুফ অবশিষ্ট জীবন শান্তিতে অতিবাহিত করেন । এবং প্রশাসন ব্যবস্থার উন্নতি সাধনে আত্মনিয়োগ করেন । সুবিচার, দানশীলতা ও অন্যান্য সৎ কাজের জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন । বিরোধ মীমাংসার জন্য বহু খ্রীস্টান গ্রানাডায় ইউসুফের নিকট আগমন করে । ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তিনি সৈনিকদের খেলা ধুলায় উৎসাহিত করিতেন । সীমান্ত প্রদেশসমূহে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় । তিনি যুদ্ধকালীন সময়েও খ্রীস্টানদের মুক্তি দান করেন । কিন্তু খ্রীস্টানগণ উহার বিপরীত করিত । শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় দেশের অর্থ প্রাচুর্য ফিরিয়া আসে । জনসাধারণের মধ্যে আমোদ-আহ্লাদ ও বিলাসী জীবন যাপনের প্রবণতা বৃদ্ধি পায় । প্রজাকুলকে শোক সাগরে ভাসাইয়া ১৪১৭ খ্রীস্টাব্দে ইউসুফ ইহলোক ত্যাগ করেন ।