📄 সংস্কৃতির সমস্যা
সংস্কৃতির সাথে রাজনীতির সম্পর্ক গভীর, যেন একটি আরেকটির ওপর পিঠ। কখনও সংস্কৃতি রাজনীতিকে তাতায়, আবার কখনও রাজনীতি সংস্কৃতির লক্ষ্য ঠিক করে। আমাদের উপমহাদেশে এর উদাহরণ প্রচুর। উনিশ শতকে নবগোপাল মিত্র নামে একজন হিন্দুমেলার প্রবর্তন করেন। এ মেলার উদ্দেশ্য ছিল- প্রাচীন হিন্দু ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন ঘটিয়ে হিন্দুর আত্মসম্মানবোধ ফিরিয়ে আনা। বেদের যুগকে, রামায়ণের যুগকে সাংস্কৃতিকভাবে ফিরিয়ে আনার এই চেষ্টায় সেকালের অনেক হিন্দু মনীষীই প্রচুর সময় দিয়েছিলেন। এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথ একজন।
এই যে অতীতের সাথে বোঝাপড়া, এর মাধ্যমে হিন্দুরা একধরনের রিভাইভালিজমের স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই হিন্দুমেলা থেকে আসে স্বদেশী আন্দোলন। এ আন্দোলনের একটা রাজনৈতিক রূপও ছিল, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত শক্তি ছিল প্রাচীন হিন্দু ঐতিহ্যের প্রতি সম্ভ্রমবোধ। স্বদেশী আন্দোলনের প্রাণ ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র, পরে শ্রী অরবিন্দ। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ ছিল সেকালে হিন্দু রিভাইভালিস্টদের বাইবেল। স্বদেশী আন্দোলনের একটা প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। যেমন ধ্বনির হয় প্রতিধ্বনি। ভারতবর্ষ কখনোই এক জাতি-ধর্মের দেশ ছিল না। ছিল মিশ্র জাতি-ধর্মের দেশ। এক জাতি-ধর্মের দেশ হলে হিন্দু রিভাইভাল এক পথে এগোতো। মিশ্র ধর্মের হওয়ায় এখানে হিন্দু রিভাইভাল মুসলমানদের শঙ্কিত করে তুলল। হিন্দুর সাজ সাজ রব মুসলমানকে করে তুলল স্বাতন্ত্র্যকামী। সেখান থেকে এলো মুসলিম রিভাইভালের চিন্তা। তাই পরে যখন কংগ্রেসের কোনো কোনো সেক্যুলার নেতা হিন্দু-মুসলমান মিলনের কথা বললেন, তখন তা কাজে লাগল না। কারণ, রাজনৈতিক মিলনের আগেই সাংস্কৃতিক বিভাজন পুরো হয়ে গেছে।
দেখা গেল- যে আন্দোলন সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে শুরু হলো, শেষ পর্যন্ত তা ঠেকল গিয়ে রাজনৈতিক আন্দোলনে। হিন্দু রিভাইভালের বিপরীতে দাঁড়াল মুসলিম রিভাইভাল। এরপরে হিন্দুর রাজনীতি ও সংস্কৃতি বনাম মুসলিম রাজনীতি ও সংস্কৃতি। সেখান থেকে কংগ্রেস বনাম মুসলিম লীগ। একসময় ভারত ভাগ দিয়ে তার পরিণতি। ভাগ হয়েও কি সবকিছুর শেষ হয়েছে। স্বাধীন হওয়ার সময় কংগ্রেসের নেতারা বলেছিলেন, ভারত যাবে সেক্যুলারিজমের পথে। রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মের, সম্প্রদায়গত কোনো সংস্কৃতির প্রাধান্য থাকবে না। মানবিকতা, মানবকল্যাণ হবে নতুন রাষ্ট্রের মূলকথা। কিন্তু কংগ্রেসের সেই নেতারাই যারা সেক্যুলারিজমের কথা বললেন, তারাই সবাই মিলে ভারতের অন্যতম রাষ্ট্রীয় সংগীত করলেন বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দে মাতরমকে। হিন্দু রিভাইভালিজমের সেই প্রতীক এলো সেক্যুলার ভারতের পরিচয় দিতে। এইভাবে বর্তমানের ভারত হাত মিলালো তার অতীতের সাথে। সেক্যুলার ভারত সখ্যতা গড়ল তার মৌলবাদী সত্তার সাথে। এ অনেকটা আজকালকার পশ্চিম বাংলার কমিউনিজমের মতো। একই সাথে কমিউনিজম চলছে, আবার দুর্গাপূজা, কালীপূজাও চলছে। সংস্কৃতি, জাতীয়তাবাদ কখন কীভাবে আত্মপ্রকাশ করবে তা বলা কঠিন। এখানে যারা পাকিস্তান আন্দোলনকে, দ্বিজাতিতত্ত্বের চেতনাকে অহর্নিশ মধ্যযুগীয় ও অন্ধকারাচ্ছন্ন মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তিরস্কার করেন, তারা এ ঘটনাগুলোকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন তা জানি না।
উনিশ শতকের হিন্দু মেলার সাথে অনেকখানি তুলনা চলে আমাদের ঢাকায় ষাটের দশক থেকে চালু হওয়া বৈশাখী মেলার। এর উদ্যোক্তারা ঠিক হিন্দু মেলাকে সামনে রেখে এ মেলার শুরু করেছিলেন কিনা তা বলতে পারি না। তবে হিন্দু মেলার অনেক চরিত্র বৈশিষ্ট্যই বৈশাখী মেলা আত্মস্থ করেছে। হিন্দু মেলার অভিমুখ ছিল রাজনীতি ও হিন্দু ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন। বৈশাখী মেলার অভিমুখও হলো রাজনীতি ও বাঙালিত্বের জাগরণ। মজার ব্যাপার হলো- বাঙালি বলতে ধর্ম নির্বিশেষে সকল বাংলা ভাষাভাষীকে বোঝালেও বাঙালির ঐতিহ্য হিসেবে মেলার উদ্যোক্তারা শুধু প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্য, বৌদ্ধ যুগের ঐতিহ্য, হিন্দু যুগের ঐতিহ্যকে টেনে নিয়ে আসেন। বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যাই বেশি; অথচ তাদের ঐতিহ্যগুলোই থাকে এখানে অনুপস্থিত। পহেলা বৈশাখের উদ্যোক্তাদের এ ফাঁকির দিকটি না ধরতে পারলে তাদের গোপন অভিসন্ধি বোঝা যাবে না।
লোকজ উৎসব হিসেবে পহেলা বৈশাখের গুরুত্ব আমাদের সমাজে সব সময় ছিল। আমাদের গ্রামের প্রধান জনসমাজের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ এখনও কৃষিভিত্তিক। এই দিকটি বিচার করেই বাংলা সনের গণনার সিলসিলা আরম্ভ হয় বাদশাহ আকবরের কাল থেকে। নতুন বছরকে গ্রহণ করার জন্য কৃষিভিত্তিক এই সমাজে তাই তখন থেকেই একধরনের সামাজিক প্রস্তুতিও তৈরি হয়েছিল। নববর্ষের দিনে গ্রামে-গঞ্জে মেলা হতো। সেসব মেলায় বারোয়ারি, লোকগীতি, যাত্রা, কবিগান, পালাগান এসব চলত। কোথাও কোথাও মৃৎশিল্পীরা তাদের তৈরি করা জিনিস মেলায় নিয়ে আসতেন। আর এসব মেলায় বিক্রি হতো নানান রকম মিষ্টি। সেসব মিষ্টির নামও ছিল হরেক রকমের। কোথাও কোথাও ঘোড়দৌড়ও হতো। এই উৎসব একান্তই আমাদের গ্রামীণ কৃষিসমাজের সার্বজনীন আনন্দোৎসব।
গ্রামীণ জীবনের সাথে মিশে যাওয়া এই লোকজ উৎসবের সাথে কিন্তু হাল আমলে চালু হওয়া নাগরিক পহেলা বৈশাখের কোনো সম্পর্ক নেই। এর উদ্যোক্তারা পহেলা বৈশাখের লোকজ চরিত্রকে সামনে রেখে এটির মধ্যে কৌশলে একটি নাগরিক চরিত্র দেওয়ার চেষ্টা করছেন এবং একশ্রেণির শহুরে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সেক্যুলার ব্যক্তি এই উৎসবের ভেতর দিয়ে গত কয়েক দশক ধরে তারা তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ করছেন। এরা বলছেন- পহেলা বৈশাখ হচ্ছে সকল বাংলাভাষীর ধর্ম নির্বিশেষে এক সার্বজনীন উৎসব। আদতে এটির মধ্যে বৃহত্তর মুসলমান জনগোষ্ঠীর কোনো ঐতিহ্যের ছাপ না থাকায় এটি হয়ে উঠেছে একটি সাম্প্রদায়িক উৎসব। কিন্তু পহেলা বৈশাখের লোকজ চরিত্র দিয়ে আড়াল করে রাখায় তাদের উদ্দেশ্যমূলক কার্যক্রম সকলের কাছে স্পষ্ট নয়। উনিশ শতকের হিন্দু মেলার পথ ধরে তৈরি হয়েছিল হিন্দু জাতীয়তাবাদ। আজকালকার পহেলা বৈশাখের পথ ধরে বিকাশ হচ্ছে বাঙালি জাতীয়তাবাদ। অথচ আমাদের যে লোকজ পহেলা বৈশাখ, তা বৃহত্তর অর্থে গ্রামসমাজে আজও এক আনন্দোৎসব। রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা তার কাম্য নয়।
হিন্দু মেলার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার- বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ। নাগরিক পহেলা বৈশাখ ও তার পৃষ্ঠপোষকদের জন্য রবীন্দ্রনাথ হচ্ছে এক অনন্ত প্রেরণা। তারা মনে করেন, রবীন্দ্রনাথই বাঙালি জাতিসত্তার প্রধান প্রতীক। যদিও লোকজ পহেলা বৈশাখে রবীন্দ্রনাথের স্থান একেবারেই নেই। উনিশ শতকের হিন্দু জাতীয়তাবাদ মুসলিম স্বার্থের বৈরী হয়ে উঠেছিল। এই জাতীয়তাবাদ সেদিন মুসলিম জাতীয়তাবাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দাঁড়িয়েছিল। বৈশাখী মেলার বাঙালি জাতীয়তাবাদও একইভাবে এখানকার মুসলিম মানস, চৈতন্য ও জাতীয়তাবোধকে চায় খর্ব করে দিতে। এই খর্বকারীরা কলকাতার হিন্দু সংস্কৃতি ও পশ্চিমের সেক্যুলার মূল্যবোধের মিল-মিশাল দিয়ে নিজেদের জন্য একটি সংস্কৃতি তৈরি করে নিয়েছেন এবং সংস্কৃতির দিক দিয়ে তারা ইসলামকে পুরোপুরি ত্যাগ করেছেন। হাল আমলের এই নাগরিক বৈশাখী উৎসবে তাই যোগ হয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রা, উলুধ্বনি, শঙ্খরব, উলকি, রাখিবন্ধন প্রভৃতি হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতি- যাকে ঘটা করে বলা হচ্ছে বাঙালি সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতিকে এখন দাঁড়ানো হয়েছে এ অঞ্চলের মুসলিম জাতিসত্তার বিরুদ্ধে। এমনিভাবে এই মেলা উনিশ শতকের হিন্দুমেলার ঐতিহ্যকে পুরোপুরি গিলে ফেলে এখানকার মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত নড়বড়ে করে দিতে চাইছে।
এখানকার সেক্যুলারিস্টরা তাদের প্রাক-ইসলামি অতীত নিয়ে এখন যথেষ্ট গৌরব বোধ করছেন। তারা শ্লাঘা বোধ করতে আরম্ভ করেছেন প্রাক-ইসলামি হিন্দু ঐতিহ্য, বৌদ্ধ ঐতিহ্য প্রভৃতি নিয়ে। পাল যুগের ঐতিহ্য, সেন যুগের ঐতিহ্য এখন তাদের কাছে দূরবর্তী কিছু নয়। মুসলমানের ঘরে জন্ম নেওয়া অনেক খাঁটি বাঙালি এখন এমন কথাও বলছেন, মুসলমানরা এ দেশে না এলেই ভালো করত। তাহলে এ দেশের অসাম্প্রদায়িক সমন্বয়ী সংস্কৃতির পূর্ণ বিকাশ হতে পারত। বঙ্কিমচন্দ্রের মতো এরাও এখন বখতিয়ার খিলজিকে স্রেফ আক্রমণকারী হিসেবেই দেখছেন। মুসলিম সংস্কৃতি ও বিশ্বাসকে এখন বলা হচ্ছে অন্ধত্ব ও মৌলবাদ। ঔদার্যের নামে প্রকৃতপক্ষে চলছে দ্বীন-ই-ইলাহি মার্কা সংস্কৃতি বিকাশের চেষ্টা। কোনো কোনো বাঙালি মুসলমানের ইসলামপূর্ব ঐতিহ্যের কাছে আশ্রয় নেওয়ার এই লক্ষণকে বদরুদ্দীন উমর বলেছেন বাঙালি মুসলমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। আসল কথা হচ্ছে- এ একধরনের স্বদেশ ত্যাগ। এক ধরনের কালচারাল মাইগ্রেশন। বৃক্ষের পক্ষে মূল অস্বীকার করা আর বাঙালি মুসলমানের পক্ষে ইসলাম উপেক্ষা করা একই কথা। ইসলামই হচ্ছে বাঙালি মুসলমানের প্রকৃত স্বদেশ, প্রকৃত কালচারাল হোমল্যাণ্ড। মজার ব্যাপার হলো- নিজের অতীতকে, নিজের ধর্মকে, নিজের ঐতিহ্যকে বাদ দিয়ে যখন অন্যের কাছে এমনি করে হাত পাতা হয়, তখন তাকে আত্মহনন ছাড়া কীই-বা বলা যায়। এর মস্ত উদাহরণ হচ্ছে- আজকের আরবরা। পশ্চিমের প্ররোচনায় একসময় তারা আরব জাতীয়তাবাদের দিকে ঝুঁকেছিল এবং বিশ্ব মুসলিম ঐক্যের প্রতীক তুর্কি খিলাফতকে ধ্বংস করতে পশ্চিমি সাম্রাজ্যবাদকে পূর্ণ সহায়তা দিয়েছিল। সেসময় মুসলমানের বিরুদ্ধে হাতিয়ার তুলতে তাদের বিবেক বাধেনি। আমাদের সেক্যুলারিস্টদের মতো আরব সেক্যুলারিস্টরাও এখন তাদের প্রাক-ইসলামি অতীত নিয়ে করে একধরনের গৌরববোধ। প্রাক-ইসলামি কবি ইমরুল কায়েস, তারাফা, যুহাইর, আনতারা প্রমুখকে নিয়ে তাদের শ্লাঘার শেষ নেই। ইসলামপূর্ব যুগকেও তারা আগের মতো আইয়ামে জাহেলিয়া বা অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ হিসেবে মনে করে না। এমন কথাও তারা বলছেন- প্রাক-ইসলামি পৌত্তলিক কবিরা যদি আরবি ভাষার সত্যিকার বিকাশ না ঘটাতেন, তবে কুরআনের মত মহাগ্রন্থ আরবিতে রচিত হতে পারত না। কুযুক্তি বোধ হয় একেই বলে।
এই আরব ন্যাশনালিস্ট ও সেক্যুলারিস্টরা পাশ্চাত্যের ধামা ধরে বহুরকম আরব ঐক্যের কথা আমাদের শুনিয়েছেন। ইসলাম বাদ দিয়ে অন্য কোনো চেতনা বা মূল্যবোধ- তা সোশালিজম বা ন্যাশনালিজম যা-ই হোক, কোনোটিই তাদের ঐক্যের ভিতকে মজবুত করতে পারেনি। সাম্রাজ্যবাদের পা ধরে তারা যে আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন তাও শেষ হয়ে গেছে সাম্রাজ্যবাদীদের বিশ্বাসঘাতকতায়। প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর তুর্কি খিলাফতের পতনের পর আরবদের ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র তৈরির পরিকল্পনা ভেস্তে যায় পাশ্চাত্যের মদদে ইজরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে। এই ক্ষুদ্র ইজরাইলের উৎপাতে আজ আরবরা অসহায়। সেক্যুলারিজম, সোশ্যালিজম, ন্যাশনালিজম সর্বোপরি সাম্রাজ্যবাদের হাতের পুতুল হয়ে থাকা- কোনো কিছুই তাদের স্বপ্নভঙ্গ ঠেকাতে পারেনি। এই অসহায় আরবদের দেখে আমাদের এখানকার সেক্যুলারিস্টরা কিছুটা হলেও শিক্ষা নিতে পারেন।
টিকাঃ
১. বদরুদ্দীন উমর, সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা। ঢাকা: গ্রন্থনা, ১৯৬৯।
📄 বিশ্বায়নের প্রেক্ষিতে জাতীয় সংস্কৃতির ভূমিকা
এক.
পুঁজিবাদের দর্শন হচ্ছে মুনাফা, প্রবৃদ্ধি ও ভোগ। লাভ আর ভোগ- এই হচ্ছে ধনবাদী দর্শনের প্রত্যয় এবং এই প্রত্যয় দিয়েই তারা পৃথিবীর যাবতীয় সবকিছুর মূল্য নির্ধারণ করে থাকে। পুঁজিবাদ ইনসাফ চেয়েছে, সাম্য চেয়েছে, দারিদ্র দূরীকরণ করতে চেয়েছে- এ কথা কেউ জোর গলায় বলতে পারবে না। তাই গত কয়েকশ বছর ধরে ধনবাদী দর্শন পৃথিবীকে নানারকমভাবে নিয়ন্ত্রণ করলেও সকলের আরাধ্য সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচারের ধারণা ও মূল্যবোধ কিন্তু আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
ইউরোপে রেনেসাঁর পথ ধরে ধনতন্ত্রের জয়জয়কার শুরু হয়। সেই ধনতন্ত্র আবার এগিয়ে চলে সাম্রাজ্যবাদের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে। অনেক তাত্ত্বিকের মতে- কলোনিগুলো ছিল ধনবাদী দর্শনের বিশেষ একটি রূপ। ইউরোপের বণিকশ্রেণি কলোনির ধনসম্পদ লুটে নেওয়ার জন্য তৈরি করেছিল সাম্রাজ্যবাদী একটি ছক। সেই ছক ধরেই কীভাবে কলোনির সংস্কৃতি, রাজনীতি ও মূল্যবোধকে নিয়ন্ত্রণ ও কালে পরিবর্তিত করে দেওয়া যায়, তার সব চেষ্টাই হয়েছিল। চরিত্রের দিক দিয়ে সেদিনের ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ ও আজকের পাশ্চাত্য উদ্ভূত বিশ্বায়নের ধারণার মধ্যে তেমন কোনো তফাৎ নেই। কমিউনিজমের পতন, ঠান্ডা যুদ্ধের পরিসমাপ্তি প্রভৃতি ঘটনা পশ্চিমের দেশগুলোকে নতুন করে উজ্জীবিত করেছে। এ প্রেক্ষিতেই পশ্চিমের পণ্ডিতেরা নিয়ে এসেছেন ইতিহাস শেষ হয়ে যাওয়ার তত্ত্ব। এক্ষণে ধনবাদী রাষ্ট্রগুলোর সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় তারা বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের নতুন মওকা খুঁজে পেয়েছে। এই প্রক্রিয়ার নাম হচ্ছে বিশ্বায়ন।
বিশ্বায়ন নামের মধ্যে একটা চমক আছে। মনে হতে পারে, এটি বোধ হয় জগ্দব্যাপী একটা প্রক্রিয়া- যার মধ্যে পুরো মানবপ্রজাতি নানাভাবে জড়িয়ে আছে এবং এর মধ্যে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ মঙ্গল ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের ইঙ্গিত রয়েছে। মূলত এটি হচ্ছে পশ্চিমের নয়া সাম্রাজ্যবাদী একটা কৌশল, যার লক্ষ্য হচ্ছে- একটি বিন্দু থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমের ধনবাদী রাষ্ট্রগুলো এই পৃথিবীর সব রকমের ব্যাবসা-বাণিজ্য, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে নিয়ন্ত্রণ করবে। এর মূলে আছে ধনবাদী দর্শনের ভোগাকাঙ্ক্ষা। সব নীতি, মূল্যবোধ এখানে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে অধিক মুনাফা আর অধিক ভোগের আশায়। এমন একটা বিশ্বাস ও প্রত্যয় অহর্নিশ সৃষ্টি করা হচ্ছে, যেন লাভ ও ভোগ ছাড়া সভ্যতার কোনো অর্থ নেই। জীবন মানেই আরও আরও ভোগ। সাম্রাজ্যবাদের যুগে ঔপনিবেশিক শক্তি গায়ের জোরে পুরো দেশটা দখল করে নিত, পরে সেখানে মতাদর্শগত আধিপত্য বিস্তার করে পুরো সমাজ থেকে নিজেদের শাসন ও কর্তৃত্বের সমর্থনে একটা বৈধতা জোগাড় করার চেষ্টা করত। এই বৈধতা দিতেন ঔপনিবেশিক শক্তির পেটোয়া সমাজনেতা ও বুদ্ধিজীবীরা। মনে পড়বে আমাদের এখানে ব্রিটিশ কলোনির সমর্থনে রাজা রামমোহন রায়, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ নানারকম লেখালিখি ও বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছেন। বিশ্বায়নের যুগে এসে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির এই কৌশল পরিবর্তিত হয়েছে; কিন্তু লক্ষ্য রয়েছে অবিচল।
প্রথম প্রথম মনে হয়, বিশ্বায়ন একটি নিষ্কলুষ ব্যাপার। উন্নত ও অনুন্নত দেশের মধ্যে পারস্পরিক পুঁজি ও বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহ, অভিগমন (Immigration) ও নির্গমন (Migration), প্রযুক্তির আদান-প্রদান, তথ্যের অবাধ বিনিময় প্রভৃতির মাধ্যমে পুরো পৃথিবীটাই যেন একটা global village বা বিশ্বগ্রামে পরিণত হতে চলেছে। প্রকৃতপক্ষে ধনবাদী রাষ্ট্রসমূহ বিশ্বায়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে এমন আধিপত্য বিস্তার করে আছে যে, অনুন্নত দেশগুলোর নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার প্রায় লুপ্ত হতে চলেছে এবং তাদের স্বার্থরক্ষার কোনো উপায় আর থাকছে না। ধনবাদী দেশগুলোই আজ নির্ধারণ করে দিচ্ছে, দরিদ্র দেশগুলোর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোটি। স্বাধীন দেশ বলে আর কিছু থাকছে না। বিশ্বায়ন পালটে দিচ্ছে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, দেশপ্রেমের সেই পুরোনো ছককাটা ধারণা।
একালের ইনফরমেশন টেকনোলজি এমন একটা গতিময়তা সৃষ্টি করেছে যে, Nation State Boundary'র ব্যবধান ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। ভৌগোলিক ব্যবধান দিয়ে এখন আর আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসন ঠেকানো যাচ্ছে না। একালে ইন্টারনেট, ওয়েবসাইট প্রভৃতি দেশের ধারণাকেই রীতিমতো মুছে দিচ্ছে। উন্নত তথ্য ও বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির জোরে সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহ অনুন্নত বিশ্বকে আজ নিজের নজরদারির মধ্যে নিয়ে এসেছে। তাদের ইশারায় দুর্বল দেশগুলো স্বাধীনতা একরকম বিসর্জন দিতে চলেছে। এ কাজে সাম্রাজ্যবাদের সহযোগী হচ্ছে জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা। এ সমস্ত সংস্থাকে এখন সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রসমূহ রীতিমতো রাবার স্ট্যাম্প প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে ছেড়েছে। বিশ্বায়ন তাই ধনবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দর্শনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চমৎকার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। শুধু পুঁজির আধিপত্য নয়; বিশ্বায়ন চাইছে পৃথিবী জুড় এক ভোগবাদী পণ্য সংস্কৃতিকে ছড়িয়ে দিতে। সাম্রাজ্যবাদের নীতি-নির্ধারকরা বিলক্ষণ জানে এই ভোগ্যপণ্যবাদ, এই সুপারমার্কেটজাত কালচার যদি ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে অনুন্নত ও গরিব দেশের জনসাধারণের নিজস্ব ঐতিহ্যজারিত যে প্রতিরোধ ক্ষমতা তা অচিরেই নিঃশেষ হয়ে যাবে। আর এই নিঃশেষিত অনুন্নত শ্রেণিকে স্থায়ীভাবে দাবিয়ে রাখা তখন অবশ্যই সহজতর হবে।
দুই.
সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে রাজনীতি, কতক ক্ষেত্রে অর্থনীতি। সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতি ও অর্থনীতি এখন অনুন্নত দুনিয়ায় বিশেষ করে ইসলামপ্রধান দেশগুলোর সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে দুমড়ে-মুচড়ে দেওয়ার জন্য মুখিয়ে উঠেছে। সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির দিকটি প্রথমে উলটে-পালটে দেখা যাক। কমিউনিজমের পতনের পর সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো এক কল্পিত শত্রুর খোঁজে দুনিয়া জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এবং ইসলামকে এখন তাদের মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। এরই আধুনিক পরিণতি হিসেবে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের নামে ইসলামপ্রধান দেশগুলোকে নিষ্ঠুর রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে। উন্নত তথ্যপ্রযুক্তির জোরে সাম্রাজ্যবাদ বিরামহীনভাবে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রচার-প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছে। কাউকে আঘাত করতে হলে আগে তার চরিত্র হনন করা চাই। ইসলাম মানেই বর্বরদের ধর্ম। সাম্রাজ্যবাদের এই নিষ্ঠুর প্রচারণা আজ এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে, এভাবে ইসলামকে আঘাত হানার পক্ষে তারা একটা পূর্বপরিকল্পিত বৈধতাও অর্জন করতে শুরু করেছে।
ইসলামপ্রধান দেশগুলোতে সাম্রাজ্যবাদ তার সব রকমের অন্যায় কাণ্ডের বিরোধীতাকারীদের নাম দিয়ে দিচ্ছে মৌলবাদী- আর মৌলবাদী মানেই সন্ত্রাসী। মৌলবাদী বলা হচ্ছে তাদেরকেই, যারা নাকি ইসলামের ন্যায়নীতি, আদর্শ ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে নিজেদের ব্যক্তিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রিক সংহতি ধরে রাখতে চায়। সুতরাং ইসলামপন্থিরাই আজ পাশ্চাত্যের যত ক্ষোভ ও বিষোদ্গার। কারণ, তারা ভালোভাবেই জানে, এই ইসলামপন্থিরাই পাশ্চাত্যের ধনবাদী ও ভোগবাদী দর্শন কায়েমের পথে বড়ো বাধা। সাম্রাজ্যবাদ ইসলামপ্রধান দেশগুলোতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের বিরুদ্ধে উচ্চবাচ্য করে না। কারণ, এরা তাদের সহযোগী শক্তি। দুয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া আজকে মুসলিম বিশ্বের সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিকরাই সাম্রাজ্যবাদের বশংবদ। এই বশংবদ লোকজনকে দিয়েই আজ পাশ্চাত্য মুসলিম দেশগুলোতে একটা স্থিতিহীন পরিবেশ জিইয়ে রেখেছে- যাতে মুসলিম উম্মাহ কার্যকর অর্থে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।
তিন.
সাম্রাজ্যবাদের রাজনৈতিক নীতি ও কার্যক্রম যতখানি স্থূল, অর্থনৈতিক নীতি ঠিক সেরকম নয়। সহজে এর অকল্যাণকর দিক প্রতিভাত হয় না। ধনবাদী অর্থনীতি নীরবে একটি ভোগবাদপ্রবণ পণ্য সংস্কৃতি গড়ে তোলে। এটি থেকে তৈরি হয় Commodity Fetishism বা পণ্যের আরাধনা। তথ্যপ্রযুক্তির জোরে এই পণ্য সংস্কৃতি আজ শহর ছেড়ে গ্রামেও হানা দিচ্ছে। পরিণতিতে মানুষের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে আত্মসর্বস্বতা, আত্মকেন্দ্রিকতা ও জনবিচ্ছিন্নতা। এর বিপজ্জনক প্রভাব গিয়ে পড়ছে আমাদের মূল্যবোধের ওপর। মূল্যবোধের অবক্ষয় আজ সমাজের স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে।
এতকাল সাম্রাজ্যবাদ Multi culturalism-সাংস্কৃতিক বহুত্বের তত্ত্ব ফেরি করে বেড়িয়েছে। যদিও সে প্রথমাবধি এই বহুত্বের চিন্তা-ভাবনা কাজে-কর্মে কখনও প্রতিষ্ঠিত করেনি। কলোনির মানুষের ওপর, অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড-ত্রিনিদাদ প্রভৃতি স্থানের আদিবাসীদের ওপর সাম্রাজ্যবাদ যে ব্যবহার করেছে, তা সাংস্কৃতিক বহুত্বের ধারণাকে নাকচ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এখন বিশ্বায়নের যুগে সাম্রাজ্যবাদ স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। তারা এখন বিভিন্ন মানুষ ও সমাজের পৃথক আত্মপ্রকাশ ও সৃজনশীলতায় আদৌ বিশ্বাসী নয়। বিশ্বায়ন সংস্কৃতির Homogenization -সমরূপকরণে বিশ্বাসী। বিশ্বায়ন সংস্কৃতিকে ছাঁচে ঢেলে নিজের মতো করে ভাঙতে চায়, গড়তে চায়। সংস্কৃতির স্বাধীন অস্তিত্বে সে বিশ্বাস করে না। এই Monolithic-একমার্গী চিন্তা নিষ্ঠুর স্বৈরাচারকেও হার মানায়।
বিশ্বায়ন রাতদিন প্রচার করে যাচ্ছে, ভোগ আর ভোগের উপকরণের কথা, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর তৈরি পণ্য-সামগ্রীর কথা, তাদের বাজার সৃষ্টির কথা। ভোগের উপকরণসহ আমরা রাতদিন ভোগবাদের জয়গান শুনে চলেছি- রেডিওতে, টিভিতে, বসার ঘরে, শোয়ার ঘরে। তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে এভাবে আমরা নিজের অজান্তেই এই ভোগবাদের, এই পণ্য সংস্কৃতির সমর্থক হয়ে উঠছি। আমাদের মন-মগজ ধোলাই হয়ে যাচ্ছে। আমাদের ভেতরের যে জান্তব সত্তা, যে ভোগবাদী বৈশিষ্ট্য- যা চাপা পড়ে থাকে, এখন অনুকূল পরিবেশে মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। আমাদের মানবিক সত্তা চাপা পড়ে যাচ্ছে। আমরা স্বার্থান্ধ হয়ে পড়ছি, পশুত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
বিশ্বায়ন মুক্তবাজার, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও উন্নয়নের আদর্শের ধারণা প্রচার করেছে। এই সাথে খবর ও চিন্তার মুক্তপ্রবাহের কথা বলছে। আপাতদৃষ্টিতে এসব কথার মধ্যে খারাপ কিছু নেই। কিন্তু পুরো ব্যাপারটাই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে। ভোগ্যপণ্যের প্রচারের জন্য মুক্ত সংবাদ প্রবাহ দরকার। এভাবেই পুরো পৃথিবী জুড়ে তারা বাজার তৈরির জন্য নিজেদের মতাদর্শ প্রচার করে এবং তাদের পক্ষে প্রস্তুত করে এক মানসভূমি। এই পথেই মিডিয়া আধিপত্য আজ মুসলিম দেশগুলোকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। একালে আমাদের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে রক মিউজিক, কম্পিউটার গেমসের ছড়াছড়ি। ধীরে ধীরে এটি নগর ছেড়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিস্তারিত হচ্ছে। মূলত মার্কিন বিনোদনশিল্প অসামান্য দক্ষতায় এটির বাজার সৃষ্টি করেছে, আর আমাদের তরুণরা কোনো ভূত-ভবিষ্যৎ চিন্তা না করে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে এর ওপর।
এই রক মিউজিক, কম্পিউটার গেমসের পরিণতি কী হচ্ছে? আমাদের শিশুরা এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কম্পিউটার নিয়ে পড়ে থাকছে, কার্টুনের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে। এভাবেই তার থেকে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে সব রকমের সৃজনশীলতা, বিকাশশীলতা, স্বতঃস্ফূর্ততা, ঐতিহ্যবোধ। তার ভেতর ঢুকে পড়ছে অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা। এই শিশু যখন বড়ো হবে তখন সে হয়ে উঠবে একটা বিষাদগ্রস্ত পুরুষ অথবা নারী। জাতিকে তার দেওয়ার বড়ো একটা কিছু থাকবে না। পশ্চিমের রক মিউজিকের মতো করে আমাদের দেশেও কিছু সংগীতগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। এই সব মিউজিকের সাথে আছে ড্রাগের সম্পর্ক। পাড়ায় পাড়ায় গজিয়ে উঠা এইসব উচ্চগ্রামের রক মিউজিকের দল কি প্রমোদ বিতরণ করছে, না আমাদের তরুণদের মাদকাসক্ত বানিয়ে ছাড়ছে?
প্রকৃতপক্ষে এই মাদকাসক্তি সমাজের গভীর পর্যন্ত বিস্তারিত হয়েছে। এখন গ্রামে-গঞ্জেও ভিডিও, ভিসিডি ডালভাত। বিশ্বায়িত সংস্কৃতির আওতায় এইসব ভিডিও-ভিসিডির মাধ্যমে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ব্যাবসা রমরমা। তেমনি রমরমা নীল ছবি সহ নানা ধরনের যৌন উত্তেজক ছবির ব্যাবসা। এখন আবার শুরু হয়েছে নিয়ন্ত্রহীন সাইবার ক্যাফের কালচার। অবাধ তথ্যপ্রযুক্তির সুযোগে পশ্চিমের যত রকমের পাপ আমাদের মধ্যে ঢুকছে, ওরা ব্যবসা করছে। মোটকথা মাদকাসক্তি, নীল ছবি প্রভৃতি তরুণদের নৈতিক শক্তিকে ভেঙে দিয়েছে। তারা আজ দিশেহারা। তাদের সামনে কোনো আদর্শ নেই, মডেল নেই। ফলে সমাজে সৃষ্টি হচ্ছে ভয়ানক এক অরাজক পরিস্থিতি। সন্ত্রাস, খুন ধর্ষণ, ছিনতাই আমাদের সমাজের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। পশ্চিমের মুক্ত যৌনতার (Free sex) ধারণা আমাদের সমাজে ভালোরকম প্রবেশ করেছে। নরনারীর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকছে না। এখন আমাদের তরুণদের মধ্যে প্রেম নেই; আছে ভোগেচ্ছা বা যৌনলিপ্সা। মানবিক মূল্যবোধ গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। সেখানে জায়গা নিচ্ছে একধরনের কৃত্রিমতা। প্রবৃত্তি আর যন্ত্রের কাছে হেরে যাচ্ছে মানুষ। এই ভোগ্যপণ্যবাদ যতবেশি করে আমাদের দেশে ঢুকছে, ততই আমরা হয়ে উঠছি উন্মুল, স্বার্থপর।
এখন পণ্য উৎপাদনে যত বেশি খরচ হয়, তার চেয়ে বেশি অর্থ ঢালা হচ্ছে পণ্যের বিজ্ঞাপনে। পণ্যের গুণাগুণ নয়; পণ্যের প্রচারণাই মূখ্য। সেই প্রচারণার সামনে পরাভূত হচ্ছে মানুষ। লক্ষ করুন- নিয়ন্ত্রণহীন ভারতীয় স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো আমাদের দেশের জীবনযাত্রা পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করছে। আমরা কী পরব, কী খাব, পোশাকের ফ্যাশন কী হবে- সবই ঠিক করে দিচ্ছে এইসব চ্যানেলগুলো। এই কাজে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ব্যবহার করছে চিত্রতারকাদের, ক্রিকেট স্টারদের। আজকাল আমরা নিত্য প্রয়োজনীয় সবকিছু ব্যবহার করি স্টারদের কথামতো। এমনকি নারীর বক্ষ সৌষ্ঠব কেমন হবে তাও নির্ধারণ করে দিচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তি। টুইগি, নওমি ক্যামবেল, পামেলা এন্ডারসনদের মডেল বানিয়ে ঠিক করে দেওয়া হচ্ছে- নারীর ফিগার কেমন হবে, ফ্যাশন কেমন হবে, তাদের বুকের আকৃতি কেমন হবে। এই অ্যাড কালচার এখন আমাদের দেশেও বেশ রমরমা।
যেভাবে পণ্যের বিজ্ঞাপন করা হচ্ছে- তাতে বিভ্রম হয়, আমরা ঢাকা আছি না নিউইয়র্কে! আমাদের দেশেও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এখানকার কারও কারও সহযোগিতায় চালু করেছে ফটোসুন্দরী প্রতিযোগিতা, সুন্দরী প্রতিযোগিতা। এদেরকেই বেছে বেছে পরে অ্যাডের কাজে ব্যবহার করা হয়। পণ্যের বিজ্ঞাপনে এইসব মডেল হওয়া নারী কোনো দেশীয় কিংবা ধর্মীয় মূল্যবোধ মানছে না। চতুর্দিকে তারা পণ্যের প্রসারের পাশাপাশি কাম-হুতাশন জ্বালিয়ে দিতে ব্যস্ত। এদের অন্দরমহল অন্ধকারাচ্ছন্ন। টিভি পর্দায় এদের ঝলমলে ছবি দেখা গেলেও দুয়েকটি ঘটনা যখন বিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশ পায়, তাতেই পূতি-দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। বৈশ্বিকভাবে যে সুন্দরী প্রতিযোগিতা হয়, তার উদ্দেশ্যও মোটামুটি একই। এখন তো আবার বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর উদ্যোগে তৃতীয় বিশ্বের সুন্দরীদের বেছে বেছে বিশ্ব সুন্দরীর কাতারে নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এরাই পরে বিজ্ঞাপনের মডেল হবে আর তৃতীয় বিশ্বে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ভাগ্য খুলবে।
বিশ্বায়ন শুধু নারীকে বিজ্ঞাপনের মডেল বানিয়ে সন্তুষ্ট নয়; তার দেহকেও ব্যবসার উপজীব্য বানিয়ে ছেড়েছে। পশ্চিমে Sex Industry একটা রমরমা ব্যবসা। এর অনুকরণে তৃতীয় বিশ্বের কোনো কোনো দেশে এই প্রমোদশিল্পকে রীতিমতো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হচ্ছে। যেমন- থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া। অনেকেরই নজরে আসার কথা, এইসব দেহব্যবসায়ী নারীদের আমাদের দেশেও একটা সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে- যাতে এই ব্যাবসাকে একটা স্বাভাবিক ও নিয়মিত ব্যবসা হিসেবে গণ্য করা হয়। এদেরকে আজকাল বলা হচ্ছে যৌনকর্মী। এদের পেশাকে সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য বহুজাতিক কোম্পানিগুলো দেদারসে টাকা ঢালছে। সভা করে, সেমিনার করে, লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবীদের নানা রকমভাবে ব্যবহার করে এদের পক্ষে একটা মতামত গড়ে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদের পদলেহী এখানকার এনজিওগুলো পয়সার বিনিময়ে এদের পেশাকে তুলে ধরার জন্য ইতোমধ্যে সভা- সমাবেশ পর্যন্ত করেছে। নৈতিক ও ধর্মীয় বিষয় তো পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে, কোথায় এইসব হতভাগ্য নারীদের পুনর্বাসনের চেষ্টা হবে, তা না করে বিশ্বায়ন আজ আমাদের মতো দেশগুলোতে এই অপরাধী পেশাধারীদের শিকড় বিস্তৃত করে দিচ্ছে।
বিশ্বায়ন নিয়ে সবচেয়ে ভয় হলো- এটি পরিবারব্যবস্থাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। পশ্চিমে পরিবার-সংসার বলে কিছু নেই। সেখানে মানুষ শুধু নিজের জন্য; মানুষের জন্য নয়। পরিবারব্যবস্থার মূল শক্তি হলো নর-নারীর পারস্পরিক বিশ্বাস। বিশ্বাসহীনতা আজ পশ্চিমি সভ্যতার গভীরে পৌঁছে গেছে। সেখানে স্বামী স্ত্রীকে বিশ্বাস করে না, স্ত্রী স্বামীকে করে না। তাহলে পরিবারব্যবস্থা টিকবে কী করে? এরই পরিণতি হিসেবে সন্তানরা হারায় পরিবারের নিশ্চিত আশ্রয়, তারা ভাসমান হয়ে যায়। বিশ্বায়ন তথ্যপ্রযুক্তির জোরে পরিবারগুলোতে ঢুকে যাচ্ছে। বিশ্বায়নের ভোগ্যপণ্যজাত সংস্কৃতি পরিবারের প্রেমময়, স্নেহময় পরিবেশকে তোয়াক্কা করে না। এর কাছে নর-নারীর পারস্পরিক যৌনতাই মূখ্য। তাই প্রথাগত বিয়ের বাইরে যৌনসঙ্গী হিসেবে নারী-পুরুষের সম্পর্ক বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বায়ন এইভাবে শুধু পরিবারকেই ভাঙছে না; মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাসকেও উচ্ছন্নে দিচ্ছে।
বিশ্বায়নের সুপারমার্কেটজাত কালচার ব্যক্তিকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। প্রযুক্তি আর বাজার দখল করে নেয় তার মানবিক সত্তা। বাজারী সংস্কৃতির প্রকোপে পড়ে সমাজ হয়ে যায় নীতিশূন্য, ভাবশূন্য। এই নীতিশূন্য সমাজই নিয়ন্ত্রণ করে ব্যক্তিকে। ব্যক্তির ভেতরে সৃষ্টি হয় এক বিচ্ছিন্নতাবোধ। তার সামাজিক বাঁধন আলগা হয়ে যায়। ফলে ব্যক্তি স্রোতে ভেসে যায়। এর সাথে তার মানবীয় সম্পদও ভেসে চলে যায়। ব্যক্তি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে সে হয়ে পড়ে আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর। মানুষ যে সম্পর্ক নিয়ে বাঁচে, জীবনকে মূল্যবান করে তোলে তা আর অবশিষ্ট থাকে না। বিশ্বায়ন মানুষের কাছ থেকে তার মনুষ্যত্ব কেড়ে নিচ্ছে। মানবিক হয়ে উঠার জন্য মানুষের যে লড়াই, বিশ্বায়ন আজ তার বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়েছে।
চার.
বিশ্বায়নের এই রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক আগ্রাসন থেকে বাঁচার উপায় কী? পুরো মুসলিম উম্মাহ আজ বিশ্বায়নের ধাক্কায় বিপর্যস্ত ও অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে গা বাঁচানোর নীতি নিয়েছে। মুসলিম দুনিয়ার লেখক, শিল্পী, কবি, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মীরা এ বিষয়টাকে আজও যথাযথ গুরুত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতা দেননি। বিশেষ করে ফিল্ম, টেলিভিশন, অডিও, ভিডিও, সংগীত, নাটক, কলা, সংস্কৃতি বা সংবাদমাধ্যম জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করে। সেই সচেতনতা সৃষ্টির পক্ষে তাদের বর্তমান ভূমিকা যথেষ্ট নয়। পাশ্চাত্য আর ইসলাম প্রধান দেশগুলোর মধ্যে শুধু ভৌগোলিক পার্থক্য নেই; উভয়ের জীবনবোধ, দর্শন ও সংস্কৃতির মধ্যেও রয়েছে বিরাট দূরত্ব। পাশ্চাত্যের দর্শন ইহমুখী, ভোগবাদী। বাজারের নিয়ম অনুযায়ী এক ক্ষণস্থায়ী মূল্য দিয়েই সবকিছুর বিচার হয়। মানুষের শাশ্বত মূল্যকে যাচাই করা হয় না। ইসলাম একই সাথে ইহমুখী ও পরলোক চিন্তার সমন্বয়। বস্তু ও আত্মার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এর দর্শন। এই পৃথিবীর ক্ষণস্থায়িত্ব সম্পর্কে ইসলাম অনুসারীরা যথেষ্ট সচেতন। তাই নৈতিকতার মানদণ্ডে সবকিছুর মূল্য বিচার করতে হয় তাদের। এই নৈতিক শক্তি দিয়েই আজ ইসলাম অনুসারীদের বিশ্বায়নের ভোগবাদী সংস্কৃতির মোকাবিলায় বুক বেঁধে দাঁড়াতে হবে।
আজও কোনো মুসলিম রাষ্ট্র বিবিসি, সিএনএন প্রভৃতির সমকক্ষ ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া চালু করতে পারেনি। না আছে তাদের হাতে রয়টার, এএফপি'র মতো তথ্য মাধ্যম। তথ্য-প্রযুক্তির প্রায় পুরোটাই করায়ত্ব করে আছে পাশ্চাত্য এবং এর মোকাবিলায় মুসলমানদের প্রস্তুতি নিতান্তই সামান্য। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জগৎ-সংসারে তাদের দৃশ্যমান ভূমিকা নেই। মুসলিম জনসাধারণ আজ দরিদ্র, নেতৃত্বশূন্য ও অনৈক্যের শিকার। তারা নিজেদের সম্পর্কে সচেতনও নয়। সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে জীবনচর্চার একটা দিক নির্দেশিত হয়, মানুষ নিজের জীবনে যার ব্যবহারিক চর্চা করে থাকে। ইসলামের জীবনানুগ চর্চার মধ্য দিয়ে মুসলমানদের সেই সংস্কৃতির পুনরুভ্যুত্থান ঘটতে পারে। এই সংস্কৃতির চর্চা ছাড়া মুসলমানের মধ্যে সৃজনশীলতা আসবে না, বিকাশশীলতা তৈরি হবে না। মনে রাখা দরকার, সৃজনশীলতা দিয়েই সৃজনশীলতার মোকাবিলা সম্ভব। সেক্ষেত্রে মুসলিম দেশগুলোর লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতি কর্মীদের ভূমিকা অপরিসীম। তাদের নিজ নিজ জনগণকে সচেতন করে তুলতে হবে, শুধু তাই নয়- এই সচেতনতাকে যথেষ্ট রকম বাড়াতেও হবে। জনগণ সচেতন না হলে ঐক্যবদ্ধ হবে না। আর ঐক্য ছাড়া পাশ্চাত্যকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা নিষ্ফল হবে।
বহুকাল ধরে পাশ্চাত্য প্রচার-প্রোপাগান্ডা চালিয়ে ইসলামের একটি ভয়ানক ও কুৎসিত ইমেজ গড়ে তুলেছে। তার সংস্কৃতি সম্পর্কে ভুল ধারণা সৃষ্টি করেছে। আজকের সংস্কৃতিকর্মীদের ইসলাম সম্পর্কে এই ভুল ধারণা ভাঙতে হবে। এজন্য তাদেরকে আধুনিক গণমাধ্যমগুলোর সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবহার জানতে হবে এবং প্রয়োজনে এসব প্রতিষ্ঠান স্ব-উদ্যোগে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের সমস্যা হচ্ছে- আমাদের বুদ্ধিজীবিরা, সংস্কৃতিসেবীরা অনেকেই পশ্চিমি চিন্তা-ভাবনায় প্রভাবিত। মুসলমানদের নিজস্ব সমস্যাকেও তারা পশ্চিমের আয়নায় দেখতে পছন্দ করেন। এই অন্ধ অনুকারিতা ছেড়ে ইসলামি চিন্তা ও নৈতিকতার আলোয় যুগ সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে। অনুকরণ করে পৃথিবীতে কেউ মাথা জাগাতে পারে না। পশ্চিমের ইহবাদী ও ভোগবাদী দর্শনের বিপনী ইসলামি নৈতিকতা আজও একটি শক্ত ও দুর্ভেদ্য দুর্গের মতো। এইডস, সমকামিতা, ড্রাগ, বিবাহ বিচ্ছেদ, কুমারী মাতা, লিভিং টুগেদার, ফ্রি সেক্স প্রভৃতি অপসংস্কৃতি-কুসংস্কৃতি পশ্চিমের সম্পদ। মুসলমানরা যখন থেকে ইসলাম ছেড়েছে, তখন থেকেই এই রোগ তাদের সমাজে ধীরে ধীরে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। পশ্চিমের সামাজিক বন্ধন ও সংহতি বলে কিছু নেই। ওখানকার সংস্কৃতি গ্রহণ করতে গেলে আমাদের সামাজিক সংহতিও আলগা হয়ে যাবে। বিশ্বায়নের নামে অপসংস্কৃতির যে সয়লাব মুসলিম দেশগুলোতে ঢুকে পড়ছে, তার প্রতিরোধ একমাত্র ইসলামি নৈতিকতার অভ্যুত্থান ঘটিয়েই সম্ভব।
দীর্ঘদিন ধরে কলোনির আবহাওয়ায় থাকতে থাকতে আমরা পরাভূত মানুষ হিসেবে বিশ্বকে দেখতে শিখেছিলাম ইউরোপের চোখ দিয়ে। এমনকি ওই চোখ দিয়ে আমরা নিজেদের দেখতেও অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। ইউরোপীয় পণ্ডিত ও তাত্ত্বিকরা আধুনিকতা ও প্রগতির মডেল হিসেবে পাশ্চাত্যকেই তুলে ধরেছিলেন। বিশ্বকে দেখার ও বিবেচনা করার এই দৃষ্টিভঙ্গি কতটা ন্যায়সংগত- তা আজ পুনর্বিচার করে দেখা দরকার। পশ্চিমি সভ্যতার শক্তি কতটুকু, তার নৈতিক বল কী রকম, এই সভ্যতা বৃহত্তর অর্থে মানব প্রজাতির জন্য কতটুকু মঙ্গলজনক, তা আজ বিশ্লেষণের দাবি রাখে। পশ্চিমি সভ্যতা তার ইহবাদী ও ভোগবাদী দর্শন দিয়ে বিশ্ব জুড়ে যে নৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছে, বিশ্বায়ন তারই একটি প্রক্রিয়া; বলা চলে একটি প্রান্তিক অবস্থা। এই প্রান্তিক অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে একটি নৈতিক মডেলকে আমাদের আঁকড়ে ধরা প্রয়োজন। সেই বিকল্প হিসেবে ইসলামি নৈতিকতাকে আজ আমরা গ্রহণ করতে পারি।