📄 সংস্কৃতির অবক্ষয়
আমাদের সংস্কৃতিতে রুচির যত প্রসার ঘটছে, সেই রুচির স্থূলীকরণ ও কদর্যকরণও যেন ঘটছে একই তালে। এক হিসেবে বলা যায়- এই রুচির স্থূলীকরণ আমাদের ক্রমবর্ধমান সামাজিক সংকটের নমুনা। গত পঞ্চাশ কী ষাট বছরে আমাদের সমাজে বিপুল পরিবর্তন এসেছে- যা নজর এড়ানোর নয়। সামাজিক মানুষের মধ্যে নানা রকম সমৃদ্ধির সম্প্রসারণ ঘটেছে, নগরায়ণ হয়েছে, শিল্পায়ন হয়েছে। সুউচ্চ সৌধশ্রেণি, সুসজ্জিত বিপনী নগরীর চেহারাই পালটে দিয়েছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় যেমন বেড়েছে, তেমনি সেখানে ছাত্রছাত্রীদের সরব উপস্থিতিও দেখার মতো, বিশেষ করে নারী শিক্ষার অগ্রগতি একালের একটা উল্লেখযোগ্য দিক। দৈনিক ও সাময়িকপত্রের সংখ্যা যেমন ক্রমবর্ধমান, তেমনি পুস্তক প্রকাশনা ও পাঠকের সংখ্যাও একইভাবে বেড়ে চলেছে। চিত্র প্রদর্শনী, সাহিত্য সভা, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম, সিনেমা, নাটক,নৃত্যানুষ্ঠানও পরিমাণগতভাবে অতীতের তুলনায় অনেক বেশি দৃষ্টিগোচর।
আমাদের সামাজিক সাংস্কৃতিক চলমানতার এ হচ্ছে বাইরের ছবি। কিন্তু এই চলমানতা যতখানি পরিমাণগত, ঠিক ততখানি গুণগত নয়। এই শ্রীবৃদ্ধি উৎকর্ষতার দিক দিয়ে, মননগত বিচারে কতটুকু জনকল্যাণমুখী- তাও প্রশ্নসাপেক্ষ। আমাদের সংস্কৃতি জগতের এখনকার একটা দুর্লক্ষণ হচ্ছে- সেসব গ্রন্থ, সাময়িকী, নাটক কিংবা সিনেমা প্রচুর পারিমাণে জনপ্রিয়তা অর্জন করছে- যা কিনা তুলনামূলকভাবে তরল রসের পরিবেশন করছে। রুচির স্থুলীকরণ সম্ভব হয়েছে বলেই দর্শকসমাজে ও পাঠকসমাজে এই তরল রসের পরিবেশকেরই গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। কয়েক দশক আগেও প্রকাশিত পুস্তক-পুস্তিকার সাথে তুলনা করলে বোঝা যায়, এখনকার প্রকাশনাগুলোতে মননশীলতা ও গভীর জীবনবোধের অভাব কতখানি ব্যাপক ও সুস্পষ্ট। দেখে-শুনে মনে হচ্ছে, সিনেমা ব্যবসায়ী ও পুস্তক প্রকাশকরা আমাদের জনমানসের এই প্রবণতাগুলো সম্বন্ধে সচেতন এবং এই পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করতে তারা এতটুকু কার্পণ্য করেন না। সচেতনভাবেই যেন তারা রুচির স্থুলীকরণের জন্য উঠে-পড়ে লেগেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই অবস্থার জন্য দায়ী শিল্প-সাহিত্যের ব্যবসায়ীকরণ এবং পুস্তক প্রকাশক ও সিনেমা ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্য শিল্প সংস্কৃতির সেবা নয়; বরং মুনাফা ও দ্রুত অর্থোপার্জন। দ্রুত মুনাফা অর্জনের নেশায় তারা এতটাই মরিয়া হয়ে উঠেছেন যে, শিল্প-সংস্কৃতির কোনো মূল্যবোধ তারা মানতে রাজি নন। মননশীল ও গভীর জীবনবোধ আশ্রয়ী পুস্তক-সাময়িকী প্রকাশে তাদের অনীহা সুস্পষ্ট। অথচ সেসব প্রকাশনায় তারা বিনিয়োগ করতে উৎসুক- যা সমাজের জন্য আশু ক্ষতিকর ও উত্তেজক, অথচ বিনিয়োগের অর্থ দ্রুত উঠে আসার সম্ভাবনায় নিশ্চিন্ত।
সংস্কৃতির জগতের আরেকটা সংকট একই সাথে ঘনীভূত হয়ে উঠেছে তা হলো- সত্যিকার সৃষ্টিশীল প্রতিভার সংখ্যা দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। সংস্কৃতির জগৎ এখন ভারী করে রেখেছে সৃষ্টিহীন, প্রতিভাহীন কতকগুলো বর্ণচোরা লোক, যারা রাজনৈতিক সুবিধাবাদীদের মতো এই জগৎকেও দলাদলি ও কাদা ছুড়াছুড়ির একটি উন্মুক্ত প্রান্তরে পরিণত করেছে। প্রতিভার কাজ হচ্ছে- সৃষ্টিশীল মতবাদ, গভীর জীবনজিজ্ঞাসা ও সূক্ষ্ম মননশীলতার পরিচয় দেওয়া- যা কিনা জাতির ভাবাদর্শের নেতৃত্ব দেবে এবং সংকটে জাতিকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করবে। আমাদের দুর্ভাগ্য- এই রকম প্রতিশ্রুতি নিয়ে কোনো নতুন প্রতিভার আবির্ভাব তেমন একটা হচ্ছে না। তাই আমাদের সংস্কৃতি-রুচির স্থুলীকরণও আজ একপক্ষীয় ব্যাপার নয়। প্রতিভার সংকট হেতু মেধাহীন লোকেরা সংস্কৃতির জগৎ দখল করে যেমন একদিকে তরল ও উত্তেজক প্রমোদরসের জোগান দিচ্ছে, তেমনি পুস্তক ও সিনেমা ব্যবসায়ীরাও পূর্ণ উদ্যমের সাথে সেই প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এইভাবে একটি আরেকটি উজ্জীবিত করছে এবং এ দুইটি এখন আমাদের সমাজের বাস্তব ছবি হয়ে উঠেছে।
সংস্কৃতির জগতের এই গভীর সংকটের কারণ হয়তো বহুবিধ, তবে সাম্প্রতিক দুয়েকটি সামাজিক লক্ষণ এর সাথে গভীরভাবে জড়িত বলে মনে হয়। গত কয়েক দশক ধরে আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নানা রকম টানাহ্যাঁচড়ার মধ্যে চলা সত্ত্বেও সমাজের ভেতর একধরনের পরার্থপরতা ও মানবিকতার মূল্যবোধ সচল ছিল বলা যায়। এই মূল্যবোধ আমরা পেয়েছি ইসলাম থেকে এবং এটিকেই যুগ যুগ ধরে আমরা লালন করে এসেছি। কিন্তু বিশ্বজুড়ে সমাজতন্ত্রের পরাজয়, পুঁজিবাদের জয়জয়কার এবং বিশ্বায়নের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির উত্থানের ফলে একটি নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে এবং পুঁজিবাদের আবশ্যিক সঙ্গী শোষণ, পীড়ন, বৈষম্য, দুর্নীতি এখন আমাদের দুয়ারে অব্যাহতভাবে হানা দিতে শুরু করেছে। একই সাথে আমাদের নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছে সমানতালে। অতীতের তুলনায় আমাদের জীবনযাত্রায় কিছুটা সমৃদ্ধি এসেছে ঠিক, কিন্তু সেই সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য আমরা এখন সব রকমের নৈতিকতা, শোভনতা ও মূল্যবোধকেও পদদলিত করতে রাজি। যেকোনো মূল্যে বিত্তশালী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ও মনোবৃত্তি যেকোনো ধরনের নৈতিকতাবিরোধী কাজকর্ম করতেও আমাদের ঠেকিয়ে রাখতে পারছে না। চোরাচালানী, কালোবাজারী, উৎকোচের মতো পদ্ধতিগুলো এখন গা সওয়া হয়ে গেছে। আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধের কারণে এসব আগে সমাজে ঘৃণিত হতো। ঘুষখোর কিংবা মদখোরকে গ্রামের লোক মিলে বিচ্ছিন্ন বা একঘরে করে রাখতেও দেখা গেছে। তার মানে এগুলোর পেছনে সমাজের কোনো অনুমোদন ছিল না এবং এসব প্রবণতার বিরুদ্ধে সমাজই একটি প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করত। নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সমাজের এই প্রাকৃত বন্ধনগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে এই ঘৃণিত পদ্ধতিগুলো আর অবাঞ্ছিত ঠেকছে না এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এগুলো আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গে পরিণত হয়েছে; বরং এই ঘৃণিত পদ্ধতিগুলো গ্রহণ করে কেউ যদি বৈষয়িকভাবে সফল হয়, তবে তাকে আর এখন ঘৃণা করা হচ্ছে না। তাকে বলা হচ্ছে বুদ্ধিমান। অন্যদিকে নৈতিক অনুশাসন মেনে চলে কেউ যদি যথেষ্ট লেখাপড়া করেও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়, তবে তাকে বলা হচ্ছে বোকা। নৈতিকভাবে সবল হলেও সামাজিকভাবে সে হয়ে যায় উপেক্ষণীয়, অনাদর ও অবহেলার শিকার। বৈবাহিক সম্বন্ধের বেলায় আগে যেখানে পাত্রের উঁচু নৈতিক চরিত্রকে একটা বড়ো গুণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো, এখন সেখানে গুণ হিসেবে দেখা হচ্ছে পাত্রের বৈষয়িক সফলতা কতটুকু। পয়সাওয়ালা না হলে শ্বশুরবাড়িতে জামাইয়ের খাতির নেই। তার মানে- আমাদের বর্তমান সামাজিক অবস্থা আকারে-ইঙ্গিতে যেন এটাই বলে দিতে চাইছে- যদি সমাজে মর্যাদাবান হতে চাও, তাহলে পয়সাওয়ালা হও। পয়সা অর্জনের পদ্ধতি এখন দেখার বিষয় নয়; বিষয় হচ্ছে তুমি পয়সার মালিক কিনা।
এই যে নীতিহীন বিত্তপূজা এখন আমাদের সমাজে কায়েম হয়েছে, এর ফলে গুণীর কদর কমে যাচ্ছে। গুণী ব্যক্তির অভাবে সমাজের চিরকালীন মূল্যবোধগুলো একপ্রকার ভেঙেচুরে নাস্তানাবুদ হয়ে যায়। কারণ, তারাই এসব মূল্যবোধগুলো টিকিয়ে রাখতে ও যুগপৎ চর্চা করতে প্রধান ভূমিকা রাখেন। কিন্তু আজকাল যেহেতু বিত্তের মানদণ্ডে সমাজের প্রশংসা ও শ্রদ্ধা নিবেদিত হয়, তাই নৈতিক মানদণ্ড সংকুচিত হয়ে পড়েছে এবং চতুর্দিকে এক নীতিহীনতার মচ্ছব শুরু হয়েছে। এই নীতিহীনতার সংক্রমণ প্রথম সমাজের উঁচুতলায় ধাক্কা দিয়েছে। সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরাই প্রথম নৈতিকতাকে ছুড়ে ফেলেছেন এবং যেকোনো প্রকারেই হোক সমাজের কর্তৃত্বকে আঁকড়ে রাখতে চেয়েছেন। এর প্রভাব সমাজের সব শ্রেণিতে আছড়ে পড়েছে। সমাজের যারা নীচু স্তরে পড়ে আছে, তারা ভাবছে- সমাজের কর্তাব্যক্তিদেরই যখন নীতি-নৈতিকতার বালাই নেই, তখন আমরা খামাখা নৈতিকতার পিছনে দৌড়াতে গিয়ে জীবন সংগ্রামে ব্যর্থতা বরণ করব কোন দুঃখে। এখন নির্মম হলেও সত্য, সামর্থ্য থাকুক আর না থাকুক- জীবনযাত্রার একটা নির্দিষ্ট মানে পৌঁছানোর জন্য আমরা একটা ঘোড়দৌড়ের প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে গেছি। যেকোনো মূল্যে হোক, তা সে যত ঘৃণিত পদ্ধতি হোক, বৈষয়িক সমৃদ্ধি অর্জনই হচ্ছে এখন আমাদের মোক্ষ। বৈষয়িক সমৃদ্ধি অর্জন কোনো অন্যায় ব্যাপার নয়। কিন্তু সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য নৈতিক অর্থে আগে যে ধর্ম ও অধর্মের বিভাজনটা ছিল- এখন তা প্রায় অবলুপ্ত হতে চলেছে। তাই কালোবাজারী, ফটকাবাজি, ঘুষ গ্রহণের মতো পদ্ধতি অবলম্বন করেও একালে আমাদের 'ভদ্র' ও 'কালচার্ড' হতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।
এই অধপতিত ও কলুষিত মূল্যবোধ থেকে এখন আমাদের সাহিত্য ও শিল্পের জগতের মানুষগুলোও আত্মরক্ষা করতে পারছেন না। যে জগতের মানুষগুলোকে আমরা সাধারণত মননশীল ও সৃজনশীল বলে মনে করে থাকি, যাদের সম্বন্ধে মনে করা হয় বৈষয়িক ব্যাপারে অনেকটা উদাসীন বা নিরপেক্ষ এবং যাদেরকে নিয়ে সমাজের মননচর্চার কথা ভাবা হয়, তারাই আজ যেন বিকৃত চিন্তা-ভাবনার উপাসক হয়ে উঠেছেন। যেকোনো উপায়ে পয়সাওয়ালা হওয়া ও আখের গোছানোর চেষ্টা করা এবং সেই আকাঙ্ক্ষায় নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন, আদর্শ পরিবর্তন, পরস্পরের স্বার্থে পরস্পরকে পৃষ্ঠপোষণ, অন্ধ দলবাজি এখন কোনো দুর্লভ ব্যাপার নয়। এই কারণেই শিল্প-সাহিত্যের জগতে মৌলিক ও শিল্প মানসমৃদ্ধ কোনো লেখার বা সৃষ্টির দর্শন মিলছে না। উত্তম ও মৌলিক কিছু নির্মাণ বা সৃষ্টি করতে হলে যে সাধনা ও একাগ্রতা দরকার, যে ব্যাপক পঠন-পাঠনের প্রস্তুতি থাকা দরকার, তা হারিয়ে যেতে বসেছে। অন্যদিকে মননধর্মী লেখার জন্য যে ধরনের পরিশ্রম দরকার, সেই পরিশ্রমের যথাযথ ফল ও স্বীকৃতি লেখক যদি না পান, তাহলে তিনি নিরুৎসাহিত হবেন। তিনি যদি দেখেন, মাত্র কয়েকদিনের হালকা পরিশ্রম করে যে অর্থাগম হয় বা স্বীকৃতি মেলে আর বহুদিন অধ্যবসায়ের ফলে লিখিত কোনো মননধর্মী ও জীবনধর্মী লেখার ক্ষেত্রে একই রকম অর্থাগম হয় বা স্বীকৃতি মেলে বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেটুকুও প্রাপ্তির নিশ্চয়তা থাকে না, তাহলে কে আর মননধর্মী লেখা লিখতে উৎসাহী হবে! আগেই বলেছি, প্রকাশকরাও মননধর্মী লেখা প্রকাশে আদৌ উৎসাহিত নন। যে সমাজে শ্রম ও সাধনার মূল্য নেই, সেখানে সাধকরাও দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যান কিংবা ধীরে ধীরে তাদের প্রতিভাকেও ব্যবহার করেন স্থূল জৈবিক চাহিদা মেটানোর সহায়ক শক্তি হিসেবে।
আমাদের সমাজে এখন যে নীতি-নৈতিকতাহীন ও রুচিহীন বিত্ত পদ্ধতির প্রসার ঘটেছে, তার ফল হয়তো কেউ কেউ ভোগ করছেন। কিন্তু একটা জিনিস বোঝা দরকার- এই ফল তারা ভোগ করছেন অন্য কাউকে ফল বঞ্চিত করে। সমাজে যদি এই নীতি প্রতিষ্ঠিত হয় যে, ওপরে উঠার জন্য বা বিত্তশালী হওয়ার জন্য যেকোনো পদ্ধতি সিদ্ধ- তাতে একজনকে বঞ্চিত করেই অন্যজনের পথ সুগম হবে। মূল্যবোধ ও নৈতিকতাকে পায়ে দলে যে সমৃদ্ধি আসে, তাতে যে জটিল চক্রের সৃষ্টি হয় সেই চক্রে পড়ে মানুষের নিগ্রহ ও নিষ্পেষণই বাড়ে। এক নীতিহীনতা আরেক নীতিহীনতার পথ উসকে দেয়। যিনি আজ নীতিহীনতার পথে সমৃদ্ধি অর্জন করেছেন, তিনি যদি নিজেকে মনে করেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী তবে এর চেয়ে বড়ো বিভ্রম আর নেই। কারণ, কোনো সমাজই প্রতিদ্বন্দ্বী বিরহিত নয়। অন্য একটা নীতিহীনতার ঝড়ে তার অবলীলায় ভেসে যাওয়া বিচিত্র কিছু নয়। 'খুনি খুনির হাতেই শেষ হয়ে যায়'- এ ধরনের প্রবচন আমাদের সমাজের দীর্ঘ ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ফল থেকেই উৎপন্ন হয়েছে। অন্যদিকে আমাদের সমাজের বর্তমান অর্থনৈতিক নীতিহীনতা, রাজনৈতিক গোলযোগ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা, যৌনবিলাস, সাংস্কৃতিক অধোগতি ও অন্যান্য দুর্লক্ষণগুলো দীর্ঘদিনের ব্যক্তিক ও সামাজিক নৈতিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত পরিণতি। ফলস্বরূপ যুগ-যুগান্তরের সামাজিক কাঠামোটিই ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে এবং সমাজ থেকে ইনসাফ প্রায় উঠে গেছে। এরই ফলে তৈরি হয়েছে সমাজের শ্রেণিতে-শ্রেণিতে বৈষম্য। একজনের হাতে সমৃদ্ধি উপচে পড়ছে, আরেকজন সেই সমৃদ্ধির ছিটেফোটা পাওয়ার জন্য রক্ত পানি করে ফেলছে। আজকে দেশজোড়া যে উগ্রবাদী সন্ত্রাস চলছে, তার উৎস এই বৈষম্যের জমিনেই খুঁজতে হবে। কারণ, বৈষম্যের জমিনই সন্ত্রাসের উর্বরা ক্ষেত্র।
নীতিহীনতা আজ সমৃদ্ধশালী ও সমৃদ্ধিহীন উভয়ের ধর্মে পরিণত হয়েছে। সমাজে যখন বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে, তখন তার হাত থেকে ধনী-দরিদ্র, শোষক-শোষিত কেউ-ই রেহাই পায় না। আমাদের নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের সময় থাকতে হুঁশ হওয়া দরকার। সমাজে এখন জরুরি ভিত্তিতে ইনসাফ ফিরিয়ে আনা দরকার। বৈষম্যহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি করাও প্রয়োজন। নিজেদের আত্মস্বার্থপর চিন্তা-ভাবনা ও সংকীর্ণ দলাদলি ত্যাগ করে যদি তারা এদিকে মনোযোগ না দেন, তাহলে কেউ-ই এই বিশৃংখলার আগুন থেকে রেহাই পাবে না।
📄 সংস্কৃতির সংকট
এক.
বহুকাল ধরে মুসলমান সমাজকে এক হীনম্মন্যতার রাহু কুরে কুরে খাচ্ছে। মুসলমান সমাজের মধ্যে এই যে এভাবে একটা সংকীর্ণতার ভাব আর নানামুখী দারিদ্রের লক্ষণ উঁকি দিচ্ছে তা যেমন একদিকে করুণ, অন্যদিকে আমাদের পরাজয়ী মনোভাবের ইঙ্গিতবহ। বেশ কিছু সময় ধরে মুসলমানরা জ্ঞান-বিজ্ঞান আর টেকনোলজির জগৎ থেকে পিছিয়ে পড়েছে, তাদের মধ্যে সৃষ্টিশীলতা ও কর্মশীলতার উত্তাপ নিভে গেছে বললেই চলে। এ কালে মুসলমানরা জগৎসভায় খুব বড়ো কিছু Contribute করতে পারছে বলে মনে হয় না। এ বাস্তবতা আমাদের জন্য মেনে নেওয়া কঠিন হলেও সেটি অত্যন্ত তীব্রভাবে সত্য।
অথচ বহুদিন পর্যন্ত মুসলমানরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা দিকে অগ্রসর ছিলেন এবং আমাদের এই উপমহাদেশেই ইংরেজ, ফরাসি, পর্তুগীজ যেসব পরিব্রাজক সে সময় এসেছে, তারা মুসলমানদের অর্জন দেখে রীতিমতো অবাক হয়েছে। এটা তো স্বতঃসিদ্ধ কথা- যে সমাজ নতুন কোনো চিন্তাধারা উপস্থিত করতে পারে না, সময়ের হিসাবে সেটা Backward হয়ে যায়। এই Backwardness বা পশ্চাৎবর্তিতা ঠেকাতে তাই প্রয়োজন নতুন নতুন চিন্তাধারা নিয়ে আসা, নতুন নতুন কর্মপদ্ধতি ও কৌশল গ্রহণ করে সময়ের চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করা। গত প্রায় ৩-৪শ বছর ধরে মুসলমান সমাজে এই সৃষ্টিশীলতার প্রবাহ আটকে গেছে। বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানদের ওপর প্রকৃত দুর্যোগ নেমে আসে ১৭৫৭ সালের পলাশীর বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে। এই বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে যেমন এখানে কলোনির শাসন শুরু হয় এবং কলোনির সুবাদেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তার এ দেশীয় বরকন্দাজরা বাঙালি মুসলমান সমাজকে পুরোপুরি ভেঙে-চুরে ওলট-পালট করে দেয়। এর ফলে বাঙালি মুসলমানের ভেতর শিক্ষিত শ্রেণি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়।
আবার এর পাশাপাশি রাষ্ট্রিক বিরূপতার কারণে বাঙালি মুসলমান ব্যবসায়ী, জমিদার ও ধনিকশ্রেণির অস্তিত্বও বিপন্ন হয়ে ওঠে। ফল হয় পরবর্তী প্রায় দু'শ বছর ধরে বাঙালি মুসলমানের সামনে আদর্শ সমাজ বলে কিছুই থাকে না। এরকম একটা পরিস্থিতি হীনম্মন্যতার জন্ম দেবে এটাই স্বাভাবিক। বাঙালি মুসলমান চোখ মেলে দেখতে পেল এমন কিছু নেই, যা দিয়ে তারা নিজেরা গর্ব করতে পারে। কারণ তার চারিদিকে তাকিয়ে সে দেখতে পায়, অন্য সমাজের লোক- তারাই শিক্ষিত, জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রসর, ধনে ও প্রাচুর্যে প্রতাপশীল। আর এভাবেই তাদের মধ্য শুরু হয় অনুকরণশীলতা। উনবিংশ শতাব্দীতে প্রতিবেশী হিন্দু সমাজ ইংরেজের পৃষ্ঠপোষণায় জেগে উঠল। বিশেষ করে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে এবং ইংরেজের আমলাতন্ত্রে চাকরি নিয়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে তারা প্রতিষ্ঠা পেল। তখনকার বাঙালি মুসলমান সমাজ তাই দেখে মনে করল- এই ভাবে এই পথ ধরে অগ্রসর হতে পারলে আমাদের ভাগ্য পরিবর্তন হতে পারে। ওরা যে আদর্শ মেনে নিয়েছে, সেইটা মেনে নেওয়াই এখন আমাদের বড়ো কর্তব্য। গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়- এই হীনম্মন্যতা ও অনুকারিতার পথ ধরে সেদিন বাঙালি মুসলমান সমাজে, উনবিংশ শতাব্দীর কলকাতায় যে বাবু সংস্কৃতির চর্চা চলত, যা তখনকার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির কারণে বাঙালি সংস্কৃতি হিসেবে পরিচিত পেয়েছিল, তা অবলীলায় ঢুকে পড়ল। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই বাঙালি সংস্কৃতির ভূত আজও আমাদের ছাড়েনি। শুধু বাঙালি মুসলমান নয়; লক্ষ করলে বোঝা যায়- এই হীনম্মন্যতা আজ পুরো মুসলিম দুনিয়াকেই ছেয়ে ফেলেছে। মুসলমানদের একাংশের মধ্যে এরকম একটা চৈতন্য কাজ করছে একালে পাশ্চাত্য দুনিয়া যেহেতু জ্ঞান-বিজ্ঞান ও টেকনোলজিতে বহু দূর এগিয়ে গেছে, সুতরাং তাদের আদর্শ ও চিন্তা-ভাবনা অনুকরণ করাই শ্রেয়। কিন্তু ভাবনার বিষয় হলো- কেন মুসলমানের মধ্যে এ ধরনের বিচ্যুতি ও বিকৃতি এলো?
মুসলমানের একটা নিজস্ব সংস্কৃতি আছে, আছে নিজস্ব ইতিহাস ও ট্রাডিশন, আছে নিজস্ব ধর্মবোধ। এসব কিছুই একদিন শুরু হয়েছিল মদিনা থেকে। তারপর এ সংস্কৃতি ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁক ঘুরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিকশিত হয়েছে। তা দামেশক, বাগদাদ হোক অথবা স্পেন, তুরস্ক, মিশর, সুদান, মধ্য এশিয়া, উপমহাদেশ বা সুদূর ইন্দোনেশিয়া হোক- সেটা মুসলমানের নিজস্ব কালচার। মুসলিম ঐক্য বা সংহতির মূলে আছে এই বৈশ্বিক মুসলিম কালচার সম্বন্ধে একটা গর্ববোধ। এই বোধটা এ কালের মুসলমানের মধ্যে একেবারে অনুপস্থিত বলা যায়। নিজের তাহজিব-তমুদ্দুন নিয়ে এই গর্ববোধ নেই বলে, নিজের Tradition থেকে একটা বড়ো রকমের ছেদ তৈরি হয়ে যাওয়ার ফলে মুসলমানের মধ্যে সৃষ্টিশীলতার সেই তুফান বন্ধ হয়ে গেছে বলা চলে। মূলধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে গেলে কোনো সমাজের পক্ষেই নতুনতর কোনো কিছু দেওয়া সম্ভব হয় না।
সেই মূলধারাটা কী? আমাদের যে ক্লাসিকাল ঐতিহ্য, আমাদের যে ক্লাসিকাল ভাষা-সাহিত্য, তার সাথে আমরা একেবারেই যোগ হারিয়ে ফেলেছি। বিশেষ করে এ কথাটা বাঙালি মুসলমানদের জন্য সর্বতোভাবে সত্য। আমাদের আদর্শের ভিত প্রস্তুত হয়েছে সেই মদিনায়। কুরআন- হাদিস হচ্ছে আমাদের আকরগ্রন্থ। এ হচ্ছে আমাদের বিশ্বাস, কনস্টিটিউশন আর ম্যাগনাকার্টা। এগুলোকে বাদ দিয়ে মুসলমান সমাজের অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না। মুসলমানের এসব বাণী ও আদর্শের বার্তা এসেছে আরবি ভাষার মাধ্যমে, কতকটা ফারসি ও উর্দুর পথ ধরে। বলা চলে- এসবের সাথে আমরা এখন সম্পূর্ণরূপে বিচ্যুত হয়ে গেছি। এসব ভাষার সাথে আমাদের যোগও ছিন্ন হয়ে গেছে। এভাবে এ কালের জেনারেশন বড়ো হয়ে উঠছে নিজের ঐতিহ্যকে না জেনেই। অনেক শিক্ষিত ছেলে আছে, যারা আধুনিক নানা বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জন করেছে কিংবা কারিগরী জ্ঞান লাভ করেছে, কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে- ইসলামের মৌলিক অনেক বিষয় সম্বন্ধেই তারা অনবহিত রয়ে গেছে। কুরআন-হাদিসের প্রাথমিক জ্ঞানটুকুও তাদের নেই। এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার, পুরো একটা জেনারেশন একটা Tradition gap-এর মধ্যে পড়ে গেছে এবং এই Tradition-টাকে এখানে এখন অনেকে বলছে- একটা বিদেশি জিনিস। সেই কারণেই এখানে এখন অনেকেই সংশয়ের মধ্যে পড়ে গেছে, তাহলে আমরা কে ও আমাদের Tradition বলে কি কিছুই নেই? এরকম একটা দিক-বিদেশহীন অবস্থায় আমাদের হাত পাততে হচ্ছে, সেই উনিশ শতকের মতো কখনও কলকাতার বাবু সংস্কৃতির কাছে, কখনও পশ্চিমের ধ্যানধারণার দিকে। আমাদের ফিরে যেতে হচ্ছে বঙ্কিমের আদর্শে, শুনতে হচ্ছে রবি ঠাকুর আমাদের আদর্শ। রবি বাবুই আমাদের সবেধন নীলমণি, এর বাইরে আমাদের আর কিছু নেই। মুসলমানের মধ্যে এরকম একটা Tradition gap তৈরি হোক, সেরকম চেষ্টা ঔপনিবেশিক শক্তি সেকালেই করেছিল, একালেও তার ধারাবাহিকতা প্রায় অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।
রকরম ট্রাডিশন-বিচ্যুত একটা সমাজকে ইচ্ছামতো ব্যবহার করা যায় এবং এখানকার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বাতন্ত্র্যলুপ্তি তাতে সহজসাধ্য হয়ে উঠবে। সে কারণেই এখানকার Education policy-কে বিভিন্ন সময় এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে, যাতে সেখানে ইসলামি আদর্শের কোনো ছাপ একেবারেই না থাকতে পারে। ভাবটা এমন- মুসলমান শিক্ষিত হোক অসুবিধা নেই, কিন্তু ইসলাম যেন তার বোধে ও মননে আদৌ কাজ করতে না পারে। ঔপনিবেশিক আমলে তো বটেই; উত্তর ঔপনিবেশিক সময়ে এসেও এখানকার Education policy-কে সর্বতোভাবে ইসলামমুক্ত করার জন্য হাতিয়ার উচিয়ে রাখা হয়েছে। ইসলামি শিক্ষা ও কার্যক্রমের বিরুদ্ধে নানামুখী ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা তো আছেই। এদেশে স্কুল পর্যায়ে আরবি ভাষা বাধ্যতামূলক করার সরকারি প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে নানা রকম যুক্তি দেওয়া হয়েছে। লক্ষ করুন যুক্তিগুলো কত অদ্ভূত ও অবৈজ্ঞানিক- আরবি একটি বিদেশি ভাষা, এটা শিশুর ওপর চাপিয়ে দিলে শিশুর মনোবিকাশকে ব্যাহত করবে। অথবা বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আরবি শিক্ষার চেষ্টাকে বলা হয়েছে এতগুলো ভাষা যদি শিশুর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে নাকি শিশুর মনোবৈকল্য ঘটবে।
দুনিয়ার সব ভাষাতাত্ত্বিকরা স্বীকার করেছেন অনেকগুলো ভাষা একযোগে শিখতে কোনোই অসুবিধা নেই এবং ভাষা আয়ত্ত করবার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হচ্ছে শৈশবকাল। একই কথার প্রধিতধ্বনি করেছেন একালের আমেরিকার রেডিক্যাল বুদ্ধিজীবী ও ভাষাতাত্ত্বিক প্রথিতযশা নোয়াম চমস্কিও। অবাক করার বিষয় হচ্ছে- যেসব যুক্তি আরবি ভাষার বিরুদ্ধে দেয়া হয়েছে, সেসব কথা কিন্তু ইংরেজি ভাষা সম্পর্কে বলা হয়েছে, কখনও শুনিনি। প্রকৃতপক্ষে বাঙালি মুসলমানের ভাষা ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে সেই ফোর্ট উইলিয়ামের কাল থেকে। বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যকে ফোর্ট উইলিয়ামের পণ্ডিত ও পাদরিরা ছিনতাই করে নিতে চেয়েছিল। উত্তর ঔপনিবেশিককালে এসে বাঙালি মুসলমান জড়িয়ে পড়েছে ভাষার রাজনীতির এক চক্রে। রাজনীতির এই চক্র বাঙালি মুসলমানকে তার ঐতিহ্যের বিরাট বিশ্ব থেকে মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে। ভাষার রাজনীতি যেমন একদিকে বাঙালি মুসলমানকে তার ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে, তেমনি বাকি বিশ্বের সাথে জানাজানির পথকেও করে তুলেছে ক্রমহ্রাসমান। ফলে বাঙালি মুসলমান হয়ে উঠেছে সাংস্কৃতিকভাবে এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা। এই বিচ্ছিন্নতা তার জন্য নিয়ে এসেছে এক নিরালম্ব হতাশার কাল; যে হতাশা তার কর্মশীলতা ও সৃষ্টিশীলতা উভয়ই কেড়ে নিয়েছে।
এটা তো ইতিহাসের সত্য, মুসলমানরা বাংলাদেশে আসার পর এখানে তারা একটা উন্নত সভ্যতা ও সংস্কৃতির আদর্শ তৈরি করতে পেরেছিল। বিশেষ করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তারা যে একটা বড়ো রকমের অবদান রাখতে পেরেছিল তা বলাই বাহুল্য। এটা কী করে সম্ভব হয়েছিল? লক্ষ করলে দেখা যায়- সেকালেও মুসলমানদের মধ্যে সৈয়দ সুলতান বা আলাওলের মতো বড়ো মাপের প্রতিভাবান কবির জন্ম হয়েছিল। এরা বাংলা চর্চা করেছেন, বাংলা ভাষায় কবিতা লিখেছেন। কিন্তু মুসলমান সংস্কৃতি বলতে যা বুঝি- তার থেকে তারা কখনও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাননি কিংবা যে আরবি-ফারসির মাধ্যমে এ দেশে মুসলিম সংস্কৃতির মূল ধারাটা প্রবাহিত হয়ে এসেছে তার সাথে এরা খুব ভালোভাবে পরিচিত ছিলেন। এরা বাংলার সাথে সাথে আরবি-ফারসির চর্চাও করেছেন, ফলে এরা আমাদের যা দিতে পেরেছেন, তার মূল্য যথেষ্ট। এ ধারার শেষ উজ্জ্বল প্রতিনিধি হয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর পক্ষে বড়ো মাপের মৌলিক কাজকর্ম করা সম্ভব হয়েছিল এই কারণে যে, তিনি বাঙালি মুসলমানের এই Cultural Base-টা সম্বন্ধে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল ছিলেন। সংস্কৃতির জগতের পাশাপাশি সেকালের রাজনীতিবিদরাও মুসলমানের এই ঐতিহ্যের ধরনটা সম্বন্ধে অজ্ঞাত ছিলেন না। সেকারণেই আমরা এক সময় নওয়াব সলিমুল্লাহ, ফজলুল হক প্রমুখের মতো রাজনীতিবিদ পেয়েছি- যারা একসময় বাংলার গণজীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে সমর্থ হয়েছিলেন। এই ঐতিহ্যের যোগটা ছিন্ন হয়ে গেছে বলেই কী সংস্কৃতির জগতে, কী রাজনীতির জগতে- সবর্ত্রই একটা বন্ধ্যাত্ব ও ঊষরতার কাল শুরু হয়েছে।
ঐতিহ্যের এই ফলবতী চেহারাটা বুঝতে আমরা একটু ইউরোপের দিকে নজর দিতে পারি। আজকে যারা ইংল্যান্ডে-ফ্রান্সে-জার্মানিতে-ইতালিতে সাহিত্য চর্চা করেন বা এসব ভাষায় বড়ো বড়ো সাহিত্যিক হিসেবে সমাদৃত হয়েছেন, তাদের সবারই কমবেশি ইউরোপের ক্লাসিকাল সাহিত্য গ্রিক ও ল্যাটিনের সাথে যোগাযোগ রয়েছে। শেলি, কিটস, ব্রাউনিং থেকে শুরু করে ইংল্যান্ডের তাবত কবিরা তো বরাবরই গ্রিস আর ইতালিকে তাদের মনোরাজ্যে স্বপ্নের আর কিংবদন্তির দেশ বানিয়ে রেখেছেন। এখন পর্যন্ত ইংল্যান্ডের কালচার, ফ্রান্সের কালচার, ইতালির কালচার বুঝতে হলে গ্রিক-ল্যাটিন ভাষা ও সংস্কৃতির কাছে গিয়ে বুঝতে হবে। এই গ্রিক-ল্যাটিন কালচারের ধারাটা বুঝতে পারলেই একালের ইংল্যান্ড বা ইউরোপের অন্যান্য কালচারের স্বরূপ আমরা বুঝতে পারব। এখন হয়তো অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, ইউরোপের সবাই তো আর এই ভাষা জানেন না বা সরাসরি এসব ভাষা চর্চা করেন না। সেটা হয়তো এক অর্থে ঠিক, কিন্তু এই ঐতিহ্যের সাথে তারা সম্পর্কচ্যুত হয়ে যাননি। তরজমার মাধ্যমে এই গ্রিক বা হেলেনীয় কৃষ্টি, কালচার ও দর্শনকে তারা ঠিকই বুঝে নিচ্ছেন। এখনও হোমারের ইলিয়ড-ওডেসি, দান্তের ডিভাইন কমেডি, ভার্জিলের কবিতা কিংবা সফোক্লিসের নাটক যেভাবে ইউরোপের মনোজগতকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, তা দেখলে বিস্মিত হতে হয়। এমনকি শেক্সপিয়র বা গ্যাটের সাহিত্যও আজ ইংল্যান্ড বা জার্মানির ঐতিহ্য নয়; এটি পুরোপুরি ইউরোপের কমন কালচারের অংশ হয়ে উঠেছে। এই যে কমন ঐতিহ্যের ব্যাপারটা, তার থেকে আমরা সম্পূর্ণ বিচ্যুত হয়ে গেছি। কালচারের যে প্রবাহটা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমাদের মধ্যে চলে আসছিল, তার যেন হঠাৎ করেই ছেদ পড়ে গেছে। আগেই বলেছি, এখানে ভাষা আন্দোলন-কেন্দ্রিক সংস্কৃতি বা রাজনীতি এই মুসলিম সংস্কৃতির প্রবাহকে বেশখানি ক্ষুণ্ণ করেছে। এ ছাড়া মুসলিম দেশগুলোতে সেক্যুলার ন্যাশনালিজমের প্রাদুর্ভাবও এই কালচার দুর্বল হয়ে যাওয়ার পেছনে কতকটা দায়ী। আগে আমাদের এখানে বাংলার পাশাপাশি আরবি-ফার্সির চর্চা চলেছে। ধর্মের ভাষা হিসেবে আমরা আরবি পড়েছি। কুরআনের ভাষা হিসেবে এটির মর্ম আমরা বিশেষভাবে বুঝবার চেষ্টা করেছি। সাদি-জামি-রুমির সাহিত্য এ দেশের ঘরে ঘরে পঠিত হয়েছে এবং এর রস আস্বাদন করে বাঙালি মুসলমান আপ্লুত হয়েছে। ইকবাল, গালিবকে আমাদের কখনও পর মনে হয়নি। এইভাবে একই ব্যক্তির মধ্যে বহুভাষার সৃষ্টিশীলতার এক জঙ্গম তৈরি হয়েছে। বাঙালি মুসলমানও এর মধ্যে পেয়েছে আন্তর্জাতিকতার বোধ, এক বিশ্ব মুসলিম মনন ও চৈতন্য এর মধ্যে গড়ে উঠেছে।
এখন এমন অবস্থা এসে দাঁড়িয়েছে আরবি-ফারসির চর্চাটা যেন পুরোপুরি মাদরাসার দায়িত্ব হয়ে উঠেছে। আরও বিশেষভাবে বললে বলতে হয়, এসব মাদরাসায় যারা ছাত্র হিসেবে আসছে, তারা অনেকটা অর্থনৈতিকভাবে সমাজের নীচুতলার অংশ থেকেই আসছে। ফলে এসব ভাষা বা ঐতিহ্যের সাথে এদের কিছুটা পরিচয় হলেও পুরো সমাজটার ওপর তাদের প্রভাব বলয় সৃষ্টি হতে পারছে না। ফলে বর্তমান যুগের একটা ছেলে, যে কিনা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে এসেছে, তাদের মনে একটা দ্বন্দ্ব বা সংশয় জেগে ওঠাই স্বাভাবিক। কারণ, একদিকে তাদের আরবি-ফারসির সাথে কোনো সম্পর্ক নেই, ঐতিহ্য সম্বন্ধে তারা একবারেই অজ্ঞ। অন্যদিকে সে যখন নিজস্ব সামাজিক, পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশের দিকে তাকায়, তখন তার জীবনের অনেক ব্যাপারই তার নজরে আসে- যার কোনো সঠিক ব্যাখ্যা সে এই তথাকথিত বাঙালি কালচারের মধ্যে খুঁজে পায় না। এইভাবে সে নিজের মধ্যে ক্রমাগত এক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসবিদ টয়েনবি কালচার সম্বন্ধে একটা সুন্দর কথা বলেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, কালচারের একটা সার্কেল (Circle) বা চক্র থাকে। সেটা কী রকম? যেমন আজকের ইউরোপীয় কালচার হচ্ছে একটা পশ্চিম ইউরোপীয় কালচার। তার পেছনে রয়ে গেছে একটা খ্রিষ্টান কালচার, আর তার পেছনে রয়েছে গ্রিক ও রোমান কালচার বা হেলেনীয় কালচার। লক্ষ করুন, একটা হলো হেলেনীয় কালচার, তার মধ্যে রয়েছে খ্রিষ্টান কালচার, তার মধ্যে আবার আছে পশ্চিম ইউরোপীয় কালচার এবং সবশেষে যে কালচারটি রয়ে গেছে, সেটি হচ্ছে ব্রিটিশ কালচার বা ইউরোপের অন্যান্য কালচার। ইউরোপীয় কালচার আমরা কোনোদিনই বুঝতে পারব না; যদি না আমরা এই চক্রটার সামগ্রিক পরিচয় পাই। বাঙালি মুসলমানের কালচারটা বুঝতে গেলেও এরকম একটা চক্রের আশ্রয় আমাদের নিতে হবে। বাঙালি মুসলমানের কালচারের মধ্যে আছে বাংলাদেশের কালচার, তার মধ্যে আছে একটা মুসলমান কালচার, আবার তার মধ্যে আছে আরব-ইরানের কালচার, আরো বিশেষ করে বললে মদিনার কালচার। বাঙালি মুসলমানের কালচারের এই চক্রটা টুটে-ফেটে গিয়েছে কলোনির কালে। ফলে এখন তাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে এক ক্রান্তি ও সংকটের মুহূর্ত।
দুই.
বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতির মূল প্রবাহটা বিচ্যুত হয়ে পড়েছে- এ কথা আগে বলেছি। এই বিচ্যুতি থেকে উদ্ধার না পেলে আমরা মুসলমান হিসেবে টিকতে পারব না। সেজন্য চাই আমাদের আদর্শের পুনরাবিষ্কার। আমাদের আদর্শ কেমন, আমাদের মূল্যবোধের স্বরূপ, আমাদের জীবনের ধারণা, আমাদের Social structure এগুলো পুরোপুরি জানা চাই। সেটা করতে হলে আমাদের ইতিহাস জানতে হবে, ঐতিহ্য সম্বন্ধেও পুরোপুরি অবহিত হওয়া জরুরি। যিনি লেখাপড়া জানেন, যার মধ্যে জ্ঞান আছে, তিনি মোকাবিলা করতে পারবেন বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি ও পরিচয়ের বিরুদ্ধে যে ঝড় ধেয়ে আসছে তার। কিন্তু যিনি জানেন না, তিনি কী করে মোকাবিলা করবেন? প্রতিবাদই-বা করবেন কী করে? আসলে এটিই হচ্ছে আমাদের সমস্যা। এই না জানার সমস্যা এখন বাঙালি মুসলমানের কালান্তক রোগে পরিণত হয়েছে। এই অজ্ঞানতার সুযোগে আমাদের যা গিলিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাই আমরা অবলীলাক্রমে গলধকরণ করে ফেলছি। আমাদের স্কুল-কলেজের বইপত্র, টেক্সট বুক বলে যা চালানো হচ্ছে, তা আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে কতখানি তুলে ধরতে পেরেছে? এগুলো দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের মগজ ধোলাই শুরু হয়। তারপর আমাদের মিডিয়া- যার পুরোটাই এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করছে বাঙালি সংস্কৃতির বলয়ের লোকজন, তার প্রভাব তো আছেই। এর কোনো প্রতিবাদ হচ্ছে না এবং এভাবেই একটা জেনারেশন বেড়ে উঠছে যারা তাদের অতীত সম্বন্ধে কিছুই জানে না। অসংখ্য বই দিয়ে দেশটাকে ছেয়ে ফেলা হয়েছে। এর কিছু আসছে কলকাতা থেকে, কিছু এখানেই ছাপা হচ্ছে। এসব বইয়ের একটাই উদ্দেশ্য- কলকাতার বাবু সংস্কৃতিকে সর্বস্তরে পূজনীয় ও আদর্শ স্থানীয় করে তোলা। যেহেতু এর কোনো সবল প্রতিবাদ নেই, তাই এখনকার জেনারেশন ভাবছে- এটাই তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং একে সাথে নিয়ে চলায় সুবিধা বেশি। অথচ এরা জানেই না, এর সাথে আমাদের সত্যিকার কালচারের কোনো মিল নেই। আর এভাবেই আমাদের ছেলেরা রবীন্দ্রনাথকে অবধারিত করে নিচ্ছে, কুরআন বাদ দিয়ে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ট্রাডিশনাল আরবি নামগুলো বর্জন করে বাঙালিত্বের নামে হিন্দু নাম ধারণ করছে। এভাবে হিন্দুর সভ্যতা ও সংস্কৃতি আমাদের মধ্যে চলে আসছে।
আজকাল একটা অদ্ভুত জিনিস নজরে পড়ছে। এতকাল বিয়ের অনুষ্ঠানে নওশা সাধারণত আচকান-পায়জামা ও শেরওয়ানি পরে আসতেন। এখন একটা পরিবর্তন দেখছি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নওশা সুট-প্যান্ট পরতে শুরু করেছেন; অন্যদিকে শেরওয়ানি তারা বর্জন করছেন। এ পরিবর্তনটা অনেকের চোখে পড়তেও পারে, নাও পারে, কিন্তু এ পরিবর্তন এক সুদূর প্রসারী ইংগিত দেয়। বিয়ের অনুষ্ঠানে শেরওয়ানি পরা ছিল আমাদের এখানকার কালচার। সেই কালচারের ভিত নাড়িয়ে দিতে উদ্যত হয়েছে এখানকার বাঙালিবাদীরা। সেদিন হয়তো বেশি দূরে নয় আমাদের শুনতে হবে বিয়ের অনুষ্ঠানে শেরওয়ানি না পরাটাই আদর্শ, ওটাই বাঙালি কালচার। এই একটা জিনিস স্পষ্ট- আমরা এখন একটা উন্নত মতাদর্শ ও কালচার বাদ দিয়ে একটা নিকৃষ্ট জিনিসকে গ্রহণ করতে যাচ্ছি বাঙালি কালচার নামে। এর প্রতিবাদ জরুরি।
মুসলমানরা যখন এ দেশে আসে তখন তারা এক উন্নত সভ্যতা সাথে করে নিয়ে এসেছিল। এ কোনো আবেগাচ্ছন্ন উক্তি নয়; এটি সর্ববাদী সম্মত ঐতিহাসিক সত্য। আল-বেরুনির 'কিতাবুল হিন্দ' পড়লে দেখা যায়, মুসলমানরা আসার আগে এখানকার সংস্কৃতি কতদূর অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল। নরবলি, সতীদাহ, বর্ণপ্রথা- এগুলো আর যা-ই হোক সভ্যতার অংশ বলা চলে না। বাদশাহ বাবর তাঁর স্মৃতিকথায় একই রকম কথা বলেছেন। বাবরনামা থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি: এদেশের কৃষক ও নিম্নশ্রেণির লোকেরা প্রায় উলঙ্গ অবস্থাতেই চলাফেরা করে। অল্প এক টুকরা কাপড় কোনো রকমে মালকোছার মতো পরে তারা তাদের নগ্নতা ঢাকে। এটাকে তারা বলে লেঙ্গুটি। মেয়েদের কাপড়েরও একই অবস্থা। তবে তাদের কাপড় একটু বড়ো। তারা এ কাপড় কোমরেও বাঁধে, আবার একটা দিক মুড়িয়ে ঘোমটাও দেয়।¹
এরকম একটা সংকীর্ণতার জালে আবদ্ধ সমাজে ইসলাম এক পরিচ্ছন্ন ও উদার মানবতাবাদী সংস্কৃতির অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল, যার প্রভাব ভারতে বিশেষ করে বাংলার গণজীবনে সুদূরপ্রসারী হয়েছিল। এসব কথা শুধু মুসলমান নয়; হিন্দু ও ব্রিটিশ ইতিহাসবিদেরাও সংকীর্ণতা সত্ত্বেও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। একটা গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস হাতের কাছে থাকা সত্ত্বেও আমরা বেমালুম আত্মবিস্মৃত হয়ে গেছি, বাছবিচারের ক্ষমতা আমাদের অনেকখানি লুপ্ত হয়েছে এবং অন্যের নিকৃষ্ট মালকে আমরা সংস্কৃতির নামে রীতিমতো আত্মস্থ করে ফেলছি। আমরা যখন বলি, বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ আমাদের সংস্কৃতির অংশ, সূর্যসেন-ক্ষুদিরাম আমাদের জাতীয় বীর, তখন আমাদের ইতিহাস জ্ঞানের দারিদ্র্য ধরা পড়ে। আমাদের আদর্শবোধ ও ধর্মবোধের বেহাল অবস্থার কথা চোখে আঙুল দিয়ে স্পষ্ট করিয়ে দেয় আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি। বঙ্কিম-অরবিন্দ-রবীন্দ্রনাথ-সূর্যসেন প্রমুখ সবাই নানা রকম প্রতিভা ও বিদ্যাবুদ্ধির অধিকারী ছিলেন। তারা সবাই স্ব-সমাজের জন্য বড়ো রকমের অবদান রেখেছিলেন সন্দেহ নেই। একটা জিনিস লক্ষ করার মতো, ঔপনিবেশিক যুগে ইংরেজের সহযোগিতায় বাঙালি হিন্দুর মধ্যে যে জাগরণ এসেছিল এরা সবাই তাতে নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন। বিশেষ করে এরা ইউরোপের সংস্পর্শে এলেও সকলেই সেই পুরাতন হিন্দু কালচারকে নতুন ব্যাখ্যা দিয়ে তরুণ হিন্দু সমাজের কাছে তুলে ধরেছেন। রবীন্দ্রনাথের মতো কবি, যিনি 'মানুষের ধর্ম' নামে এক বই লিখেছিলেন এবং সেখানে উদারমানবতাবাদ চর্চার পক্ষে ওকালতি করেছিলেন, সেই তিনিও শান্তি নিকেতনে প্রাচীন ভারতের আদর্শে প্রাণিত হয়ে তপোবন ও ব্রহ্মচর্যাশ্রম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। শান্তি নিকেতন বা বিশ্বভারতীতে যেসব প্রথা ও পদ্ধতি চালু করা হয়, তা পুরোপুরি প্রাচীন ঔপনিষদিক রীতি অনুসারে করা হয়েছিল। এ জিনিসটাই লক্ষ করার মতো, এই যে এভাবে একজন নিজের কালচারের মধ্যে ফিরে আসছে। কিন্তু আমাদের বাঙালি মুসলমান সমাজের কারও কারও মধ্যে একটা মস্তিষ্ক বিকৃতি হয়। কাজী আব্দুল ওদুদ, আবুল হোসেন, হুমায়ুন কবীরের মতো সাহিত্যিকরা বললেন অন্য কথা। তাদের ধারণা ছিল- আমরা বাঙালি। আমরা যে ইসলাম অনুসারী, এই ধর্মটা আমরা গ্রহণ করেছি বাইরের প্রয়োজনে। এটা ছেড়ে দিলেই আমাদের মুক্তির লক্ষ্য অর্জিত হবে। ওদুদ সাহেব তার ‘শাশ্বত বঙ্গ’ বইতে এসব কথাই বলতে চেয়েছেন। বিশেষ করে তার প্রবন্ধের বাণীগুলো যদি কেউ গ্রহণ করে, তবে তার পক্ষে স্বাভাবিকভাবে মুসলমান হিসেবে গৌরব করার কিছু থাকে না। এই গৌরবহীনতা ও আত্মহীনতার পথে আজও কেউ কেউ এগুচ্ছেন- এ নিছক আত্মহনন ছাড়া কিছু নয়। আত্মহননের পথে কেউ কি কোনো বড়ো কিছু অর্জন করতে পারে? এরকম নজির পৃথিবীর কোথাও নেই। এর থেকে ফিরে আসা দরকার। এর জন্য চাই ইতিহাসের চর্চা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা। নতুন করে ইসলাম সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা প্রয়োজন। সেই পথেই আসতে পারে আমাদের জাতীয় মুক্তি; অন্য কোনোভাবে নয়।
টিকাঃ
১. জহীর-উদ্দীন মুহম্মদ বাবুর, বাবুরনামা (তরজমা: ইবরাহীম খাঁ)। ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৮৩।
📄 সংস্কৃতির ধারা
লোক সংস্কৃতি সব দেশে থাকে। একটি সমাজের বহু বছরের ভাঙা-গড়া আর বিবর্তনের মধ্যে লোক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে। মানুষের জীবনের অনেক স্থূল চাহিদা থাকে। লোক সংস্কৃতি তার অভাব পূরণ করে। কিন্তু একটা দেশের সংস্কৃতি বলতে কেবল সে দেশের লোক সংস্কৃতিকে বোঝায় না। তার চেয়েও উঁচু স্তরের একটা সংস্কৃতি থাকে। এই উঁচু স্তরের সংস্কৃতি ওই সমাজ বা জাতির সৃষ্টিশীলতা, মননশীলতা ও বৈদগ্ধের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। এই উঁচু স্তরের সংস্কৃতি ছাড়া একটা জাতির অগ্রসরমানতাকে চিহ্নিত করা যায় না।
আমাদের দেশেও লোক সংস্কৃতির একটা ধারা আছে। গানে, গাঁথায়, কাহিনিতে, কিংবদন্তিতে, ধাঁধাঁয়, প্রবচনে, যাত্রায়, বৈশাখী নবান্নের উৎসবে এই ধারা প্রবহমান। এই জনসংস্কৃতি লোক রঞ্জনের এক অপূর্ব উৎসব। এর কাজ সাধারণ মানুষকে আনন্দ দেওয়া। আনন্দ দেওয়ার বাইরেও সংস্কৃতির একটা কাজ আছে। অন্তহীন অন্বেষণ, গভীরতর অনুভূতি, নতুন সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা, জীবনের লক্ষ্য নির্দেশ- এসব কিন্তু লোক সংস্কৃতি দিয়ে চলবে না; তার জন্য চাই উচ্চতর সংস্কৃতি।
এ দেশে যখন ইসলাম আসে, তখন এখানকার লোক দলে দলে মুসলমান হয়ে যায়। ইসলাম এখানে খালি হাতে আসেনি। তার ভান্ডারে ছিল মহামূল্যবান ঐশ্বর্য। নতুন চিন্তা, নতুন সংস্কৃতি, নতুন বিশ্বাস, নতুন মূল্যবোধ। এখানে একটি নতুন মুসলমান সমাজ তৈরি হয়। তাদের ধর্ম হয় ইসলাম। নামকরণ হয় আরবিতে। কতকক্ষেত্রে পরিবর্তন হয় পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্যাভ্যাস, জীবনাচারে। এই যে নতুন সমাজ তৈরি হয়, সে সমাজ এখানকার আঞ্চলিক ইতিহাসের মধ্যে নিজের অতীতকে পুরোপুরি খুঁজে পায় না। পায় ইসলামের ইতিহাসে। তেমনি এর সংস্কৃতিও সম্বন্ধ খোঁজে ইসলামের সংস্কৃতির মধ্যে। এই নতুন বিশ্বাস ও মূল্যবোধের নাম প্যান ইসলাম। একই সাথে টেরিটোরিয়াল, আবার সুপরা-টেরিটোরিয়াল। কয়েকশ বছরের মুসলিম শাসনে এই সংস্কৃতি আরও সংহত হয়। হয় বহুপ্রসূ। এই সংস্কৃতি এখানকার উচ্চতর সংস্কৃতি হিসেবে জায়গা করে নেয়। এই সংস্কৃতিকে ভরিয়ে তোলেন রাজন্যবর্গ, কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীরা। এরই আলো ছড়িয়ে পড়ে আমজনতার মধ্যে।
এর মানে এই নয়, এই সংস্কৃতির চাপে লোক সংস্কৃতি হারিয়ে যায়। প্রত্যেকে যে যার জায়গায় অবস্থান করে। সংষর্ঘ যে হয় না এমন নয়। প্রাচীন বঙ্গের ঐতিহ্য, পালযুগের ঐতিহ্য, বৌদ্ধ যুগের ঐতিহ্যের সাথে ইসলামের জোড়া কীভাবে লাগবে! কিংবা লোক সংস্কৃতির যেসব উপাদান এই সব ঐতিহ্য থেকে পাওয়া, তার সাথেই-বা ইসলাম কী করে মিল-মিশাল করবে! ইসলাম সহাবস্থানে বিশ্বাসী, কিন্তু সমন্বয়ে নয়। ইসলাম তার মূল্যবোধের ব্যাপারে নিরপেক্ষ। এজন্য মঙ্গল প্রদীপ, সিঁদুর, উলু, অন্নপ্রাসন, লক্ষ্মীর সরা, রামায়ণের গান লোক সংস্কৃতির অংশ হয়েও ইসলামের নয়। ইসলাম লোক সংস্কৃতির ওইটুকু গ্রহণ করে, যেটুকু তার মূল্যবোধের সাথে সহনীয়। মুসলিম সংস্কৃতির এই গ্রহণ-বর্জনের মাত্রা নির্ধারণের দায়িত্ব এককভাবে ইসলামের হাতে।
ইসলামের ইতিহাস শুরু সেই খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে। কিন্তু ভারতের ইতিহাস, বাংলার ইতিহাস তার চেয়ে প্রাচীন। সেই ইতিহাসের সাথে ইসলাম তার নিজের ইতিহাসের সহাবস্থান করে নেয়। যেখানে সহাবস্থান সম্ভব হয় না সেখানে সংঘর্ষ হয়। এই সংঘর্ষ সংস্কৃতির সংঘর্ষ। ইসলাম এদেশে আসে তুর্ক, মোঘল, পাঠানদের হাত ধরে। এরা সবাই মুসলমান নামে পরিচিত হয়। এর আগে ভারতে এসেছিল শক-হুনরা। এরা কিন্তু হিন্দু বনে যায়। তাই তাদের সাথে কোনো সংঘর্ষ হয় না। হয় মুসলমানদের সাথে। কারণ, তারা তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতির ব্যাপারে ছাড় দিতে রাজি হয় না। এইভাবে ভারতের লোকসংখ্যার চারভাগের একভাগ এক সময় হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে। হিন্দু অতীতের সাথে যোগসূত্র ছিন্ন করে। তারা মুসলমান হয়ে যায়। এরই চূড়ান্ত পরিণতি এক সময় ভারত বিভাগ হয়ে যায় এবং পাকিস্তান নামক মুসলিম রাষ্ট্র ইসলামী জাহানের অন্তর্ভুক্ত হয়। পাকিস্তান দ্বিধা-বিভক্ত হলেও বাংলাদেশের মুসলিম মানস কিন্তু ইসলামি জাহানের সাথে জুড়ে আছে।
ইতিহাসের এই ধারাভঙ্গ হয় যখন ইউরোপীয়রা এদেশ দখল করে নেয়। তারা নিয়ে আসে নতুন মূল্যবোধ। সেই মূল্যবোধকে বলা হয় আধুনিকতা। সেই আধুনিকতাও অতীতের সাথে সম্বন্ধ একরকম ছিন্ন করতে চায়- বিশেষ করে ইসলামের সাথে। ইসলামের সংস্কৃতি ধর্মমূলক। আবার সংস্কৃতির সাথে ইসলামের সম্বন্ধ খুব গভীর। কিন্তু আধুনিকতা সংস্কৃতিকে ধর্মবর্জিত উপাদান দিয়ে গড়তে চায়। যদিও এ চিন্তা অনেকটা সোনার পাথরবাটির মতো। ধর্ম ছাড়া কোনো সমাজ, কোনো সংস্কৃতি চিন্তাই করা যায় না। এশিয়ায় না, আফ্রিকায় না, এমনকি ইউরোপেও না। পশ্চিমের রাষ্ট্রগুলো সেক্যুলার দাবি করে, কিন্তু তাদের সমাজ-সংস্কৃতি মোটেই সেক্যুলার নয়। পশ্চিমের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে কতকটা গ্রিক-রোমান ঐতিহ্য ও খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্যের মিল-মিশালে। সেখানকার বড়ো বড়ো ক্যাথেড্রাল, ইস্টার, গুড ফ্রাইডে, বড়ো দিন পশ্চিমের সমাজের সেক্যুলারইজেসনের কথা বলে না। ধর্মের প্রেরণা সংস্কৃতিকে অমরত্ব দিয়েছে। কোথাও কোথাও অমৃত। অজন্তা-ইলোরার শৈল ভাস্কর্য, তাজমহল, আলহামরা, মস্ক অফ কর্ডোভা, ইউরোপের বড়ো বড়ো গথিক ক্যাথেড্রালগুলো শিল্প হিসেবে তুলনাহীন। ডালি, পিকাসো, মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর শিল্পকর্মের চেয়ে এর গুরুত্ব কম নয়। ডালির শিল্প, পিকাসোর শিল্প শিল্পানুভূতি সৃষ্টি করে; ধর্মানুভূতি নয়। ওগুলো দুটিই করে।
আমাদের আধ্যাত্মিকতাও দরকার, আধুনিকতাও দরকার। দুটো মিলেই সংস্কৃতির ভান্ডার পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। অবশ্য আধুনিকতা বলতে আমি বিজ্ঞানকেই বোঝাই; আধ্যাত্মিকতাবর্জিত পশ্চিমের নীতি ও মূল্যবোধ নয়। ধর্মের সঙ্গে শিল্প ও বিজ্ঞানকে আমরা মিলিয়ে নিতে চাই। ইউরোপের রেনেসাঁ আধ্যাত্মিকতাকে অস্বীকার করতে চেয়েছিল। রেনেসাঁর নায়করা ঈশ্বরকে অভ্রান্ত মনে করেননি। ঈশ্বরকে বাদ দিয়ে তারা জগতের সব রহস্য ভেদ করতে চেয়েছিলেন। এই যে সীমাহীন স্বাধীনতা রেনেসাঁর লক্ষণ। মনে রাখা দরকার, সীমাহীন স্বাধীনতা একধরনের স্বেচ্ছাচারও বটে। রেনেসাঁ ইউরোপকে স্বেচ্ছাচারীও বানিয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদ রেনেসাঁর হাত ধরেই তৈরি হয়। পরস্বাপহরণ, পররাজ্য লুণ্ঠন, শিশু হত্যা, নারী হত্যা, যুদ্ধ-বিগ্রহ এসবই রেনেসাঁসের আরেক পিঠ; যেমন চাঁদের আরেক পিঠে কলঙ্ক।
ইউরোপীয়রাই এদেশে রেনেসাঁ-রিফরমেশন-এনলাইটেনমেন্টের খবর নিয়ে আসে। সেই চিন্তায় উজ্জীবিত হয় প্রথমদিকে হিন্দুরাই। কলকাতাকে কেন্দ্র করে একধরনের কলোনির রেনেসাঁ গড়ে ওঠে। ইউরোপের সঙ্গে পা মেলানোর জন্য কলকাতার হিন্দুরা উন্মুখ হয়ে ওঠে। হিন্দুদের দেখাদেখি একসময় মুসলমানরাও এগিয়ে আসে। তারাও ইংরেজি শিখতে শুরু করে। সেই সুবাদেই তারা ইউরোপের চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে পরিচিত হন। মুসলমান সমাজের একটা অংশ ধীরে ধীরে ইউরোপীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মেলবন্ধন করার জন্য উঠে-পড়ে লাগেন। তাদের মধ্যে রেনেসাঁর হাওয়া লাগে। সেক্যুলারিজমের চিন্তা-ভাবনাও পল্লবিত হয়। তাদের ভেতরকার মুসলিম সংস্কৃতির ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়। এরাই সংস্কৃতিকে ধর্মনিরপেক্ষ করার জন্য ওকালতি শুরু করেন। গত শতকের ত্রিশের দশকে ঢাকায় শিখা গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। এর কাণ্ডারী ছিলেন কাজী আব্দুল ওদুদ, আবুল হোসেন প্রমুখ। এদের কাজকর্ম অনেকটা উনিশ শতকের কলকাতার হিন্দু কলেজের ইয়ং বেঙ্গলের মতো ছিল। এরা চেয়েছিলেন ইয়ং বেঙ্গলের মতো বুদ্ধির মুক্তি। মানে শাস্ত্রের, ধর্মের প্রভাব থেকে মুক্তি। ইউরোপের রেনেসাঁ, সেক্যুলার হিউম্যানিজম এদের খুব টেনেছিল। মুসলিম সমাজের তারা পরিবর্তন চেয়েছিলেন এই আঙ্গিকে। কিন্তু মুসলিম সমাজ ইসলামকে বাদ দিয়ে কীভাবে তাদের সংস্কৃতির বিবর্তন ঘটাবে- এই গভীর প্রশ্নের উত্তর তারা দিতে পারেননি। এরা সবাই ধার্মিক মুসলমান পরিবারের সন্তান ছিলেন, কিন্তু সংস্কৃতির দিক দিয়ে ইসলামকে তারা ত্যাগ করেছিলেন। কিছুটা ইউরোপীয় আর কিছুটা কলকাতাকেন্দ্রিক উনিশ শতকীয় হিন্দু সংস্কৃতির মিল-মিশাল দিয়ে তারা তাদের কল্পস্বর্গ গড়ে তুলেছিলেন। এরা ছিলেন যত না মুসলমান, তার চেয়ে কট্টর বাঙালি।
এই শিখা গোষ্ঠীর একজন ছিলেন মোতাহের হোসেন চৌধুরী। তিনি একটা অদ্ভুত বই লিখেছিলেন, নাম 'সংস্কৃতি কথা'। তাতে তিনি বলেছিলেন- ধর্ম হচ্ছে অশিক্ষিত লোকের সংস্কৃতি, আর সংস্কৃতি হচ্ছে শিক্ষিত মানুষের ধর্ম। নিজের সংস্কৃতি সম্বন্ধে হীনমন্যতা কতদূর জন্মালে আর নিজের শিকড় থেকে কতদূর বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে এ ধরনের বালখিল্য উক্তি করা সম্ভব। চৌধুরী সাহেবের কথা মানতে হলে এ কথা আমাদের বিশ্বাস করতে হবে, শিক্ষিত লোক ধর্মানুসারী হতে পারে না। চৌধুরী সাহেবরা যাদের মস্তজ্ঞান করেছিলেন, সেই উনিশ শতকীয় বিবর্তনের পথিকৃৎ বঙ্কিমচন্দ্র, স্বামী বিবেকানন্দ, শ্রী অরবিন্দ প্রমুখ অনেকেই অধার্মিক ছিলেন না। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের কাজকর্ম রীতিমতো সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের পর্যায়ে পড়ে। নিজেদের যুক্তিতে তারা নিজেরাই হেরে যান। এসব করে তারা শুধু শুধু নিজেদেরই প্রতারিত করেছেন। চৌধুরী সাহেব কিংবা তার মতানুসারীদের একটা সমস্যা হলো- তারা প্রতিপক্ষ হিসেবে নিয়েছেন ইসলামকে। হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, খ্রিষ্টান ধর্ম- কোনো কিছুই তাদের ব্যাখ্যাত আধুকিতা ও প্রগতির প্রতিবন্ধক নয়; কেবল ইসলাম ছাড়া। এ চেতনা ও মনোভাবকে এক ধরনের সাম্প্রদায়িকতাই বলা যায়।
শিখাপন্থিদের চিন্তা-ভাবনা অনুসরণ করেছেন পরবর্তীকালে আরও কেউ কেউ। আব্দুল হক, আহমদ শরীফ, বদরুদ্দীন উমর প্রমুখ। এরা আরেক ধাপ এগিয়ে বললেন বাঙালিত্বের সাধনার কথা। এই সাধনার মানে কী? আমরা বাংলা ভূখণ্ডে বাস করি, বাংলা ভাষায় কথা বলি, আলু ভর্তা, বেগুন ভর্তা, শুটকি মাছ খাই- এটা কি বাঙালিত্ব প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়? না। তারা বললেন- হিন্দু ও মুসলমান সংস্কৃতির সমন্বয়ের কথা। মানে আরেকটা দ্বীন-ই-ইলাহি। হিন্দু মুসলমানের সংস্কৃতি থেকে কিছু কিছু গ্রহণ করবে। মুসলমানও নেবে হিন্দুর থেকে। এইভাবে পরস্পর পরস্পরের মধ্যে হারিয়ে যাবে। এই হারিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি আসলে একধরনের জগাখিচুড়ি সংস্কৃতি। এরকম চেষ্টা উপমহাদেশে যে হয়নি তা নয়, কিন্তু হালে পানি পায়নি। আকবর চেষ্টা করেছিলেন। দিল্লিশ্বর ও জগদীশ্বর হয়েও তিনি সফল হতে পারেননি। তার সেনাপতি মানসিংহই এর প্রতিবাদ করেছিলেন। আকবরের আরেক বংশধর দারা শিকোহর কাজকর্মও সুবিধা অর্জন করতে পারেনি। নানক, কবীর, সামাদ ও আমাদের দেশের বাউলপন্থি সন্যাসীদের লোকজ কাজকর্মও বৃহত্তর জনসমাজে সাড়া পায়নি। বৃহত্তর হিন্দু সমাজে বা মুসলমান সমাজে এ ধরনের জনসমর্থনহীন কার্যকলাপ কোনো আবেদন সৃষ্টি করতে পারেনি। যার জন-আবেদন নেই, তাকে প্রতিষ্ঠা করতে যাওয়া বৃথা। আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদী সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীরা সেই দুঃসাধ্য সাধনায় মেতে উঠেছেন।
এই সমস্ত বুদ্ধিজীবীরা আজকাল লোক সংস্কৃতির উজ্জীবনের কথা বলছেন। তারা যে সেক্যুলার ও সমন্বয়ী বাঙালি সংস্কৃতির কথা বলেন, তার জন্য এক ধরনের প্রতীক দরকার। সেই প্রতীক হিসেবে লোক সংস্কৃতির কথা এসেছে। ইসলামকে বাদ দিয়ে তারা যে সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চান, তারও প্রতীক এটা। আটশ বছর ধরে যে উচ্চতর সংস্কৃতি এখানকার জনগণের মনমানসিকতা ও কর্মধারাকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তার বিকল্প হিসেবে তারা লোক সংস্কৃতির বিকাশের ওপর জোর দিচ্ছেন। কিন্তু ওই উচ্চতর সংস্কৃতির বিকল্প লোক সংস্কৃতি হতে পারে না। যেমন- ইসলামের বিকল্প অন্য কিছু হতে পারে না। আটশ বছর যা সম্ভব হয়নি, তা হওয়ার সম্ভাবনা এখন একেবারেই নেই। লোক সংস্কৃতির জায়গায় লোক সংস্কৃতি থাকবে। ইসলামের জায়গায় ইসলাম থাকবে। যেমন- পহেলা বৈশাখের জায়গায় পহেলা বৈশাখ, ঈদ উৎসবের জায়গায় ঈদ উৎসব। যে যার জায়গায় থেকে ইতিহাস এগিয়ে যাবে। কখনোই একটির বিকল্প আরেকটি নয়। একটির বিকল্প হিসেবে আরেকটিকে দাঁড় করাতে গেলে তৈরি হবে সংকট। আমাদের ইতিহাসে এর নজির প্রচুর। সমন্বয় নয়; সহাবস্থানই আমাদের কাম্য।
টিকাঃ
১. মোতাহের হোসেন চৌধুরী, সংস্কৃতি কথা। ঢাকা: নওরোজ কিতাবিস্তান, ১৯৯৬।
📄 সংস্কৃতির সমস্যা
সংস্কৃতির সাথে রাজনীতির সম্পর্ক গভীর, যেন একটি আরেকটির ওপর পিঠ। কখনও সংস্কৃতি রাজনীতিকে তাতায়, আবার কখনও রাজনীতি সংস্কৃতির লক্ষ্য ঠিক করে। আমাদের উপমহাদেশে এর উদাহরণ প্রচুর। উনিশ শতকে নবগোপাল মিত্র নামে একজন হিন্দুমেলার প্রবর্তন করেন। এ মেলার উদ্দেশ্য ছিল- প্রাচীন হিন্দু ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন ঘটিয়ে হিন্দুর আত্মসম্মানবোধ ফিরিয়ে আনা। বেদের যুগকে, রামায়ণের যুগকে সাংস্কৃতিকভাবে ফিরিয়ে আনার এই চেষ্টায় সেকালের অনেক হিন্দু মনীষীই প্রচুর সময় দিয়েছিলেন। এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথ একজন।
এই যে অতীতের সাথে বোঝাপড়া, এর মাধ্যমে হিন্দুরা একধরনের রিভাইভালিজমের স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই হিন্দুমেলা থেকে আসে স্বদেশী আন্দোলন। এ আন্দোলনের একটা রাজনৈতিক রূপও ছিল, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত শক্তি ছিল প্রাচীন হিন্দু ঐতিহ্যের প্রতি সম্ভ্রমবোধ। স্বদেশী আন্দোলনের প্রাণ ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র, পরে শ্রী অরবিন্দ। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ ছিল সেকালে হিন্দু রিভাইভালিস্টদের বাইবেল। স্বদেশী আন্দোলনের একটা প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। যেমন ধ্বনির হয় প্রতিধ্বনি। ভারতবর্ষ কখনোই এক জাতি-ধর্মের দেশ ছিল না। ছিল মিশ্র জাতি-ধর্মের দেশ। এক জাতি-ধর্মের দেশ হলে হিন্দু রিভাইভাল এক পথে এগোতো। মিশ্র ধর্মের হওয়ায় এখানে হিন্দু রিভাইভাল মুসলমানদের শঙ্কিত করে তুলল। হিন্দুর সাজ সাজ রব মুসলমানকে করে তুলল স্বাতন্ত্র্যকামী। সেখান থেকে এলো মুসলিম রিভাইভালের চিন্তা। তাই পরে যখন কংগ্রেসের কোনো কোনো সেক্যুলার নেতা হিন্দু-মুসলমান মিলনের কথা বললেন, তখন তা কাজে লাগল না। কারণ, রাজনৈতিক মিলনের আগেই সাংস্কৃতিক বিভাজন পুরো হয়ে গেছে।
দেখা গেল- যে আন্দোলন সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে শুরু হলো, শেষ পর্যন্ত তা ঠেকল গিয়ে রাজনৈতিক আন্দোলনে। হিন্দু রিভাইভালের বিপরীতে দাঁড়াল মুসলিম রিভাইভাল। এরপরে হিন্দুর রাজনীতি ও সংস্কৃতি বনাম মুসলিম রাজনীতি ও সংস্কৃতি। সেখান থেকে কংগ্রেস বনাম মুসলিম লীগ। একসময় ভারত ভাগ দিয়ে তার পরিণতি। ভাগ হয়েও কি সবকিছুর শেষ হয়েছে। স্বাধীন হওয়ার সময় কংগ্রেসের নেতারা বলেছিলেন, ভারত যাবে সেক্যুলারিজমের পথে। রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মের, সম্প্রদায়গত কোনো সংস্কৃতির প্রাধান্য থাকবে না। মানবিকতা, মানবকল্যাণ হবে নতুন রাষ্ট্রের মূলকথা। কিন্তু কংগ্রেসের সেই নেতারাই যারা সেক্যুলারিজমের কথা বললেন, তারাই সবাই মিলে ভারতের অন্যতম রাষ্ট্রীয় সংগীত করলেন বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দে মাতরমকে। হিন্দু রিভাইভালিজমের সেই প্রতীক এলো সেক্যুলার ভারতের পরিচয় দিতে। এইভাবে বর্তমানের ভারত হাত মিলালো তার অতীতের সাথে। সেক্যুলার ভারত সখ্যতা গড়ল তার মৌলবাদী সত্তার সাথে। এ অনেকটা আজকালকার পশ্চিম বাংলার কমিউনিজমের মতো। একই সাথে কমিউনিজম চলছে, আবার দুর্গাপূজা, কালীপূজাও চলছে। সংস্কৃতি, জাতীয়তাবাদ কখন কীভাবে আত্মপ্রকাশ করবে তা বলা কঠিন। এখানে যারা পাকিস্তান আন্দোলনকে, দ্বিজাতিতত্ত্বের চেতনাকে অহর্নিশ মধ্যযুগীয় ও অন্ধকারাচ্ছন্ন মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তিরস্কার করেন, তারা এ ঘটনাগুলোকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন তা জানি না।
উনিশ শতকের হিন্দু মেলার সাথে অনেকখানি তুলনা চলে আমাদের ঢাকায় ষাটের দশক থেকে চালু হওয়া বৈশাখী মেলার। এর উদ্যোক্তারা ঠিক হিন্দু মেলাকে সামনে রেখে এ মেলার শুরু করেছিলেন কিনা তা বলতে পারি না। তবে হিন্দু মেলার অনেক চরিত্র বৈশিষ্ট্যই বৈশাখী মেলা আত্মস্থ করেছে। হিন্দু মেলার অভিমুখ ছিল রাজনীতি ও হিন্দু ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন। বৈশাখী মেলার অভিমুখও হলো রাজনীতি ও বাঙালিত্বের জাগরণ। মজার ব্যাপার হলো- বাঙালি বলতে ধর্ম নির্বিশেষে সকল বাংলা ভাষাভাষীকে বোঝালেও বাঙালির ঐতিহ্য হিসেবে মেলার উদ্যোক্তারা শুধু প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্য, বৌদ্ধ যুগের ঐতিহ্য, হিন্দু যুগের ঐতিহ্যকে টেনে নিয়ে আসেন। বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যাই বেশি; অথচ তাদের ঐতিহ্যগুলোই থাকে এখানে অনুপস্থিত। পহেলা বৈশাখের উদ্যোক্তাদের এ ফাঁকির দিকটি না ধরতে পারলে তাদের গোপন অভিসন্ধি বোঝা যাবে না।
লোকজ উৎসব হিসেবে পহেলা বৈশাখের গুরুত্ব আমাদের সমাজে সব সময় ছিল। আমাদের গ্রামের প্রধান জনসমাজের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ এখনও কৃষিভিত্তিক। এই দিকটি বিচার করেই বাংলা সনের গণনার সিলসিলা আরম্ভ হয় বাদশাহ আকবরের কাল থেকে। নতুন বছরকে গ্রহণ করার জন্য কৃষিভিত্তিক এই সমাজে তাই তখন থেকেই একধরনের সামাজিক প্রস্তুতিও তৈরি হয়েছিল। নববর্ষের দিনে গ্রামে-গঞ্জে মেলা হতো। সেসব মেলায় বারোয়ারি, লোকগীতি, যাত্রা, কবিগান, পালাগান এসব চলত। কোথাও কোথাও মৃৎশিল্পীরা তাদের তৈরি করা জিনিস মেলায় নিয়ে আসতেন। আর এসব মেলায় বিক্রি হতো নানান রকম মিষ্টি। সেসব মিষ্টির নামও ছিল হরেক রকমের। কোথাও কোথাও ঘোড়দৌড়ও হতো। এই উৎসব একান্তই আমাদের গ্রামীণ কৃষিসমাজের সার্বজনীন আনন্দোৎসব।
গ্রামীণ জীবনের সাথে মিশে যাওয়া এই লোকজ উৎসবের সাথে কিন্তু হাল আমলে চালু হওয়া নাগরিক পহেলা বৈশাখের কোনো সম্পর্ক নেই। এর উদ্যোক্তারা পহেলা বৈশাখের লোকজ চরিত্রকে সামনে রেখে এটির মধ্যে কৌশলে একটি নাগরিক চরিত্র দেওয়ার চেষ্টা করছেন এবং একশ্রেণির শহুরে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সেক্যুলার ব্যক্তি এই উৎসবের ভেতর দিয়ে গত কয়েক দশক ধরে তারা তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ করছেন। এরা বলছেন- পহেলা বৈশাখ হচ্ছে সকল বাংলাভাষীর ধর্ম নির্বিশেষে এক সার্বজনীন উৎসব। আদতে এটির মধ্যে বৃহত্তর মুসলমান জনগোষ্ঠীর কোনো ঐতিহ্যের ছাপ না থাকায় এটি হয়ে উঠেছে একটি সাম্প্রদায়িক উৎসব। কিন্তু পহেলা বৈশাখের লোকজ চরিত্র দিয়ে আড়াল করে রাখায় তাদের উদ্দেশ্যমূলক কার্যক্রম সকলের কাছে স্পষ্ট নয়। উনিশ শতকের হিন্দু মেলার পথ ধরে তৈরি হয়েছিল হিন্দু জাতীয়তাবাদ। আজকালকার পহেলা বৈশাখের পথ ধরে বিকাশ হচ্ছে বাঙালি জাতীয়তাবাদ। অথচ আমাদের যে লোকজ পহেলা বৈশাখ, তা বৃহত্তর অর্থে গ্রামসমাজে আজও এক আনন্দোৎসব। রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা তার কাম্য নয়।
হিন্দু মেলার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার- বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ। নাগরিক পহেলা বৈশাখ ও তার পৃষ্ঠপোষকদের জন্য রবীন্দ্রনাথ হচ্ছে এক অনন্ত প্রেরণা। তারা মনে করেন, রবীন্দ্রনাথই বাঙালি জাতিসত্তার প্রধান প্রতীক। যদিও লোকজ পহেলা বৈশাখে রবীন্দ্রনাথের স্থান একেবারেই নেই। উনিশ শতকের হিন্দু জাতীয়তাবাদ মুসলিম স্বার্থের বৈরী হয়ে উঠেছিল। এই জাতীয়তাবাদ সেদিন মুসলিম জাতীয়তাবাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দাঁড়িয়েছিল। বৈশাখী মেলার বাঙালি জাতীয়তাবাদও একইভাবে এখানকার মুসলিম মানস, চৈতন্য ও জাতীয়তাবোধকে চায় খর্ব করে দিতে। এই খর্বকারীরা কলকাতার হিন্দু সংস্কৃতি ও পশ্চিমের সেক্যুলার মূল্যবোধের মিল-মিশাল দিয়ে নিজেদের জন্য একটি সংস্কৃতি তৈরি করে নিয়েছেন এবং সংস্কৃতির দিক দিয়ে তারা ইসলামকে পুরোপুরি ত্যাগ করেছেন। হাল আমলের এই নাগরিক বৈশাখী উৎসবে তাই যোগ হয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রা, উলুধ্বনি, শঙ্খরব, উলকি, রাখিবন্ধন প্রভৃতি হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতি- যাকে ঘটা করে বলা হচ্ছে বাঙালি সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতিকে এখন দাঁড়ানো হয়েছে এ অঞ্চলের মুসলিম জাতিসত্তার বিরুদ্ধে। এমনিভাবে এই মেলা উনিশ শতকের হিন্দুমেলার ঐতিহ্যকে পুরোপুরি গিলে ফেলে এখানকার মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত নড়বড়ে করে দিতে চাইছে।
এখানকার সেক্যুলারিস্টরা তাদের প্রাক-ইসলামি অতীত নিয়ে এখন যথেষ্ট গৌরব বোধ করছেন। তারা শ্লাঘা বোধ করতে আরম্ভ করেছেন প্রাক-ইসলামি হিন্দু ঐতিহ্য, বৌদ্ধ ঐতিহ্য প্রভৃতি নিয়ে। পাল যুগের ঐতিহ্য, সেন যুগের ঐতিহ্য এখন তাদের কাছে দূরবর্তী কিছু নয়। মুসলমানের ঘরে জন্ম নেওয়া অনেক খাঁটি বাঙালি এখন এমন কথাও বলছেন, মুসলমানরা এ দেশে না এলেই ভালো করত। তাহলে এ দেশের অসাম্প্রদায়িক সমন্বয়ী সংস্কৃতির পূর্ণ বিকাশ হতে পারত। বঙ্কিমচন্দ্রের মতো এরাও এখন বখতিয়ার খিলজিকে স্রেফ আক্রমণকারী হিসেবেই দেখছেন। মুসলিম সংস্কৃতি ও বিশ্বাসকে এখন বলা হচ্ছে অন্ধত্ব ও মৌলবাদ। ঔদার্যের নামে প্রকৃতপক্ষে চলছে দ্বীন-ই-ইলাহি মার্কা সংস্কৃতি বিকাশের চেষ্টা। কোনো কোনো বাঙালি মুসলমানের ইসলামপূর্ব ঐতিহ্যের কাছে আশ্রয় নেওয়ার এই লক্ষণকে বদরুদ্দীন উমর বলেছেন বাঙালি মুসলমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। আসল কথা হচ্ছে- এ একধরনের স্বদেশ ত্যাগ। এক ধরনের কালচারাল মাইগ্রেশন। বৃক্ষের পক্ষে মূল অস্বীকার করা আর বাঙালি মুসলমানের পক্ষে ইসলাম উপেক্ষা করা একই কথা। ইসলামই হচ্ছে বাঙালি মুসলমানের প্রকৃত স্বদেশ, প্রকৃত কালচারাল হোমল্যাণ্ড। মজার ব্যাপার হলো- নিজের অতীতকে, নিজের ধর্মকে, নিজের ঐতিহ্যকে বাদ দিয়ে যখন অন্যের কাছে এমনি করে হাত পাতা হয়, তখন তাকে আত্মহনন ছাড়া কীই-বা বলা যায়। এর মস্ত উদাহরণ হচ্ছে- আজকের আরবরা। পশ্চিমের প্ররোচনায় একসময় তারা আরব জাতীয়তাবাদের দিকে ঝুঁকেছিল এবং বিশ্ব মুসলিম ঐক্যের প্রতীক তুর্কি খিলাফতকে ধ্বংস করতে পশ্চিমি সাম্রাজ্যবাদকে পূর্ণ সহায়তা দিয়েছিল। সেসময় মুসলমানের বিরুদ্ধে হাতিয়ার তুলতে তাদের বিবেক বাধেনি। আমাদের সেক্যুলারিস্টদের মতো আরব সেক্যুলারিস্টরাও এখন তাদের প্রাক-ইসলামি অতীত নিয়ে করে একধরনের গৌরববোধ। প্রাক-ইসলামি কবি ইমরুল কায়েস, তারাফা, যুহাইর, আনতারা প্রমুখকে নিয়ে তাদের শ্লাঘার শেষ নেই। ইসলামপূর্ব যুগকেও তারা আগের মতো আইয়ামে জাহেলিয়া বা অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ হিসেবে মনে করে না। এমন কথাও তারা বলছেন- প্রাক-ইসলামি পৌত্তলিক কবিরা যদি আরবি ভাষার সত্যিকার বিকাশ না ঘটাতেন, তবে কুরআনের মত মহাগ্রন্থ আরবিতে রচিত হতে পারত না। কুযুক্তি বোধ হয় একেই বলে।
এই আরব ন্যাশনালিস্ট ও সেক্যুলারিস্টরা পাশ্চাত্যের ধামা ধরে বহুরকম আরব ঐক্যের কথা আমাদের শুনিয়েছেন। ইসলাম বাদ দিয়ে অন্য কোনো চেতনা বা মূল্যবোধ- তা সোশালিজম বা ন্যাশনালিজম যা-ই হোক, কোনোটিই তাদের ঐক্যের ভিতকে মজবুত করতে পারেনি। সাম্রাজ্যবাদের পা ধরে তারা যে আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন তাও শেষ হয়ে গেছে সাম্রাজ্যবাদীদের বিশ্বাসঘাতকতায়। প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর তুর্কি খিলাফতের পতনের পর আরবদের ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র তৈরির পরিকল্পনা ভেস্তে যায় পাশ্চাত্যের মদদে ইজরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে। এই ক্ষুদ্র ইজরাইলের উৎপাতে আজ আরবরা অসহায়। সেক্যুলারিজম, সোশ্যালিজম, ন্যাশনালিজম সর্বোপরি সাম্রাজ্যবাদের হাতের পুতুল হয়ে থাকা- কোনো কিছুই তাদের স্বপ্নভঙ্গ ঠেকাতে পারেনি। এই অসহায় আরবদের দেখে আমাদের এখানকার সেক্যুলারিস্টরা কিছুটা হলেও শিক্ষা নিতে পারেন।
টিকাঃ
১. বদরুদ্দীন উমর, সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা। ঢাকা: গ্রন্থনা, ১৯৬৯।