📘 মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান 📄 সংস্কৃতির রূপান্তর

📄 সংস্কৃতির রূপান্তর


সংস্কৃতি বলতে আগে মানুষ ধর্মভিত্তিক সংস্কৃতিকেই বোঝাত। ধর্মের কাছ থেকে প্রেরণা পেয়ে মানুষ দেশে দেশে শিল্প সংস্কৃতির এক-একটা সাগর সঙ্গম সৃষ্টি করেছে। তাজমহল, মাইলো দ্বীপের ভেনাস, অজন্তার গুহা চিত্র, তানসেনের ধ্রুপদ সংগীত- এসব কিন্তু সবই ধর্মের প্রেরণাজাত। আর্টের জগতে যারা বাস করেন, তাদের চাই একধরনের অন্তরের প্রেরণা। সেই প্রেরণাও কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে আসত ধর্ম থেকে।

প্রাচীনকালে মানুষ গুহাচিত্র আঁকত। দেখা গেছে- সেই সব গুহাচিত্রের মধ্যেও মানুষের বিচিত্র সব বিশ্বাসের ছাপ পড়ে আছে। মানুষ তার ধর্মবোধটাই গুহাচিত্রের বিচিত্র ভঙ্গিমার মধ্যে প্রকাশ করেছে।

পণ্ডিতেরা সভ্যতাকে শ্রেণিবিভাগ করেছেন বিভিন্নভাবে। তাদের মতে প্রাচীনতম হচ্ছে সুমেরীয় সভ্যতা। তারপর ইজিপ্টের সভ্যতা। সিন্ধু সভ্যতা হচ্ছে বিশ্বের তৃতীয় সভ্যতা। তারপরে চীন। এসব সভ্যতা নানা দিক থেকে সমৃদ্ধি অর্জন করেছিল। তারা গড়ে তুলেছিল স্থাপত্য, দুর্গ, পয়ঃপ্রণালী। এসব সভ্যতার লোকজন সংস্কৃতিমনস্কও ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা সংগীতচর্চা, চিত্রচর্চা, নৃত্যচর্চা, নাট্যচর্চা, ভাস্কর্যচর্চাও করত। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো- নানা রকম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে এটা স্পষ্ট হয়েছে, এসব সভ্যতার লোকজন কিন্তু ধর্মীয় চিন্তা-ভাবনাও করত। মানুষের যুগান্তরের যেসব প্রশ্ন- যার উত্তর মানুষ চিরকালই খুঁজেছে, তার উত্তর এসব সভ্যতার লোকজন ধর্মের ভেতর দিয়ে খোঁজার চেষ্টা করত। স্বর্গ-নরক, পাপ-পূণ্য, ঈশ্বর, পরলোক, অমরত্ব, নির্বাণ, স্যালভেশন, আত্মা-পরমাত্মা- এসব প্রশ্ন তাদেরও আচ্ছন্ন করেছিল। এসব সভ্যতার লোকজন কিন্তু মোটেই ধর্মহীন ছিল না; বরং বিচিত্র সব ধর্মবিশ্বাস তারা আঁকড়ে ধরেছিল।

এসব সভ্যতার ঘরে আলো জ্বালেন নবি, রসুল, মহাপুরুষগণ। এদের অনেকেই ছিলেন প্রত্যাদিষ্ট। এরা যেমন মানুষের আধ্যাত্মিক চাহিদা মেটান, তেমনি তাদের জাগতিক সমস্যা সমাধানের পথও বাতলে দেন। হযরত ঈসা জন্মান ইহুদিদের ঘরে, কিন্তু তিনি সমস্ত মানুষকে আলো দিয়ে যান। তাঁর অনুসারীরাই গড়ে তোলে হলি রোমান এম্পায়ার। খ্রিষ্টধর্ম বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এশিয়া, ইউরোপের সংস্কৃতিরও অভূতপূর্ব বিস্তার ঘটে। স্থাপত্য হিসেবে গথিক ক্যাথেড্রালগুলো আজও অনন্য। দান্তে, বোকাচিও, মোজার্ট, বেঠোভেন, গ্যয়টে, চসার, মিল্টন, শেক্সপিয়র, এলিয়ট প্রমুখ একদিক দিয়ে চিন্তা করলে খ্রিষ্টধর্মের প্রেরণারই ফল।

হযরত ঈসার আগে শাক্য উপজাতির ঘরে জন্মান সিদ্ধার্থ। সিদ্ধার্থের সদ্ধর্ম তক্ষশীলা থেকে বিস্তৃত হয়ে যায় মধ্য এশিয়ায় এবং সেই পথ দিয়ে চীন, মঙ্গোলিয়া, কোরিয়া, জাপানে। ধ্যানী বৌদ্ধ সাধকরা শুধু অহিংসার বাণী প্রচারই করেন না; তাদের মঠ ও বিহারগুলো ছিল শিল্প, সংস্কৃতি, জ্ঞানচর্চার পীঠস্থান। নালন্দার কথাতো অনেকেই জানেন।

এরপরে মরুচারী আরবদের ঘরে জন্মান রসুল মোহাম্মদ সা.। তখনকার দিনে সভ্য জাতি হিসেবে আরবদের কোনো খ্যাতি ছিল না। কিন্তু রসুলের শিক্ষার ফলে মাত্র একশ বছরের মধ্যে আরব বিশ্ব সভ্যতার চালকের আসনে আসীন হয়। দামেশক, বাগদাদ, ইস্পাহান, ইস্তাম্বুল, কর্ডোভা, কায়রো, দিল্লি, আগ্রা শুধু মুসলিম রাজ-রাজড়াদের নগর ও রাজধানী হিসেবে সমাদৃত হয়নি; জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সংস্কৃতি, ললিত কলা বিকাশের তীর্থস্থানে পরিণত হয়। ধর্মের প্রেরণা না থাকলে তাজমহল, আলহামরা, মস্ক অফ কর্ডোভার মতো শিল্প সৃষ্টি হতে পারত না।

সব ধর্মের গোড়ার কথা হচ্ছে এক- Core of Morality। খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, ইসলাম- প্রত্যেকেই চায় মরালিটির শাসন, মরালিটির নিয়ন্ত্রণ। ধর্মের এই সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় এক বড়ো রকমের ছেদ পড়ে ইউরোপীয় রেনেসাঁর কালে। রেনেসাঁর মূল কথা হচ্ছে- মানুষও ইচ্ছা করলে সর্বশক্তিমান হতে পারে। তার মধ্যে আছে সর্বগুণের সম্ভাব্যতা। এর গুণে মানুষও পারে সর্বশক্তিমানের মতো নতুন এক জগৎ সৃষ্টি করতে। রেনেসাঁর এই দর্শনের নাম- হিউম্যানিজম, যেখানে মানুষকে অপরিমেয় ভাবা হয়।

মনে রাখা দরকার- হিউম্যানিজম ও হিউম্যানিটি কিন্তু এককথা নয়। হিউম্যানিজম চায় মুক্তি। পারলৌকিকতা থেকে মুক্তি, পুরোহিতের হাত থেকে মুক্তি, রাজতন্ত্র থেকে মুক্তি, সামন্ততন্ত্র থেকে মুক্তি, ক্রীতদাসের মালিকের অধীনতা থেকে মুক্তি, কলামাত্রের কৃত্রিম বিধিনিষেধ থেকে মুক্তি। এমনকি মরালিটি থেকেও মুক্তি। এককথায় সর্ববন্ধন মুক্তি। লিবার্টি। হিউম্যানিজম আরও চায় ইকুয়ালিটি। শ্রেণি নির্বিশেষে সাম্য। আর চায় মৈত্রী। ফ্রাটারনিটি। রেনেসাঁ এই ট্রিনিটির সাধনাই করেছে। সেই সাধনার চর্চা থেকেই আসে ফরাসি বিপ্লব।

রেনেসাঁর মূলমন্ত্র হচ্ছে এই ট্রিনিটি। সেখান থেকে বাদ যায় মরালিটি। হিউম্যানিটি কিন্তু এই মরালিটি চর্চার ওপর জোর দেয়। ধর্মের ইচ্ছাও তাই। রেনেসাঁর জোর ট্রিনিটির ওপর, ধর্মের জোর মরালিটির ওপর। মরালিটি ছাড়া ট্রিনিটির বুনিয়াদ মজবুত হয় না। তার নজির আমরা ইতিহাসে পেয়েছি। ফরাসি বিপ্লব সম্ভব হয়েছে, কিন্তু বিপ্লবের আদর্শ ধরে রাখা যায়নি। বাস্তবে এ পৃথিবী থেকে আজও যুদ্ধ, বিদ্রোহ, সহিংসতা কোনোটাই নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। একজন মুসলিম সুফির কথা মনে পড়ছে, তিনি বলছেন: বুদ্ধি বলতে থাকে- নিজেকে বাড়াও, প্রেম বলতে থাকে- তুমি নিজ স্বার্থ ত্যাগ করো (ফরিদউদ্দিন আত্তার)।

ফরাসি বিপ্লবের পর হিউম্যানিজমের বিচিত্র শাখা-প্রশাখা পল্লবিত হয়। রোমানটিসিজম, আইডিয়ালিজম, ন্যাচারালিজম, রিয়েলিজম, ইমপ্রেসনিজম, এক্সপ্রেসিনজম, সুররিয়ালিজম- সবই মানুষকে নিয়ে, প্রকৃতিকে নিয়ে। কোনোটিই ইন্দ্রিয়াতীতকে নিয়ে নয়। মানুষ ভাবতে থাকে- নিজেকে বাড়াতে বাড়াতে সে অতিমানবে পরিণত হবে। সে অতিমানবের অসাধ্য কিছু থাকবে না। নিটশের ভাষায় সুপারম্যান। সুপারম্যানের আয়ত্তে এসেছে অনেক কিছু। আয়ত্তাতীত রয়ে গেছে প্রেম, মরালিটি- যা ছাড়া প্রলয়কে, প্রতিহিংসাকে জয় করা যায় না। ইউরোপীয় রেনেসাঁ জগৎ সম্বন্ধে মানুষের অনেক ধারণা পালটে দিয়েছে। মানুষ জগৎ সম্বন্ধে যে জ্ঞান অর্জন করেছে, তাকে নানা রকমভাবে ভাঙিয়ে নিয়েছে সে। মানুষকে করেছে শক্তিমান।

কিন্তু রেনেসাঁ মানুষের চরিত্র পালটাতে পারেনি। চোর-ডাকাতের হাতে বিদ্যুৎ, উড়োজাহাজ, পরমাণু বোমা গেলে তার পরিণতি বিপজ্জনক হবেই। মানবপ্রকৃতিকে সংশোধন না করে, বিশুদ্ধ না করে তার হাতে ক্ষমতা দিলে দানবিক কাণ্ড তো ঘটবেই। নিজাম ডাকাত দরবেশে পরিণত হন, বাল্মীকি ঋষি হন ধর্মের প্রভাবেই। রেনেসাঁ কাউকে ঋষি করেছে, দরবেশ করেছে— এমন কথা শোনা যায়নি। উলটো রেনেসাঁর সন্তানদের হাতেই দু-দুটো মহাযুদ্ধের দানবিকতা আমরা দেখেছি। এখনও তাদের হাতে দেশে দেশে চলছে নরমেধযজ্ঞ, রক্তপাত, সহিংসতা। বোঝাই যাচ্ছে রেনেসাঁর মূল্য জ্ঞান যথেষ্ট নয়। নবি-রসুলদের জ্ঞানও অতি আবশ্যক। তাঁরাই সত্যিকারের প্রেমশীলতা, সত্যানুবর্তিতা ও অহিংসার আলো জ্বেলেছেন। তারাই এগুলোর আবাদ করে সোনা ফলিয়েছেন। ধর্মের কাছ থেকে প্রেরণা পাওয়া মানে মধ্যযুগীয় হওয়া নয়, প্রিমিটিভ হওয়াও নয়। মরালিটির জগতে প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগ বলে কিছু নেই। মরালিটির মাত্রা স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে সমান। আর মধ্যযুগ, প্রাচীন যুগ মানেই সর্বনাশা কিছু নয়। হোমার, বাল্মীকি, কালিদাস, দান্তে, রুমি, ওমর খৈয়াম, শেক্সপিয়র কি এ যুগের মানুষ? প্রাচীন যুগের, মধ্যযুগের হয়েও এরা আধুনিককে ছাড়িয়ে গেছেন। এরা আধুনিকেরও আধুনিক, সর্বাধুনিক। এদের মতো প্রতিভা এ যুগে কয়টা জন্মেছে?

মুশকিল হচ্ছে বিজ্ঞানের কল্যাণে, আধুনিকের কল্যাণে এ যুগে আরেকটা তাজমহল হচ্ছে না। অজন্তা, আলটামিরার মতো গুহাচিত্র, প্রাচীন গ্রিসের নাটকের তুল্য কোনো কিছুই তৈরি হচ্ছে না। তাহলে আধুনিককালই কি চূড়ান্ত? প্রাচীন যুগ থেকে মধ্যযুগ থেকে আমরা কি কোনো প্রেরণা গ্রহণ করব না? একালের আন্তর্জাতিক সংঘাত, মহাযুদ্ধ, নাৎসি-ফাসিস্ট- জায়োনিস্ট-ইম্পেরিয়ালিস্ট প্রতিক্রিয়াশীলতা এসব তো প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগের চেয়েও অন্ধকারাচ্ছন্ন কাণ্ড-কারখানা। একালের অন্ধকারকে ঢেকে রাখতেই কি আমরা আমাদের অতীতকে অস্বীকার করি? আমাদের প্রয়োজন মডার্ন সভ্যতাকে মরাল সভ্যতা হিসেবে তৈরি করে নেওয়া। না হলে মডার্নের অপঘাতে সবকিছুর সমাপ্তি ঘটবে। মডার্ন হওয়া আমাদের একান্ত প্রয়োজন। কারণ, আমাদের বাস্তব জ্ঞান দরকার, প্রকৃতির ওপর প্রভাবকে বিস্তৃত করা দরকার। একই সাথে আমাদের মরাল হওয়াও দরকার। কারণ, মহাশক্তিমান হয়ে ইউরোপের মতো মানব-বিপর্যয়ের কারণ আমরা হতে চাই না। আমরা এমন একটা সম্পূর্ণতার, সৃষ্টিশীলতার স্বপ্ন দেখব- যেখানে আমরা পেছনে ফিরে যাব না ঠিক, কিন্তু পেছনকেও একেবারে অস্বীকার করব না। পেছনের প্রেরণাই আমাদের সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে। পুরোপুরি আধুনিকতার হিংসা ও চোরাবালির ওপর আমাদের স্বপ্নসৌধ গড়ে তুলতে দিতে পারি না। আমাদের ভবিষ্যতের সংস্কৃতি হবে একই সাথে মডার্ন ও মরাল। এককথায় মরালিটি হবে মডার্নিটির চালক।

একদিকে আমরা পেছনের সংস্কার-আবর্জনা সাফ করব, অন্যদিকে আমরা শক্তিমানদের চিত্তশুদ্ধি ঘটাব। যারা মনে করে ব্যক্তিজীবনের বাইরে ধর্মের ও নৈতিকতার কোনো স্থান নেই, তারা কিন্তু সভ্যতার জন্য আরেকটা অপঘাত ডেকে আনার চেষ্টা করছেন। ব্যক্তির মতো সামাজিক জীবনেও একধরনের মরালিটি দরকার। না হলে সমাজের স্থিতিশীলতা বিপন্ন হয়। তাই সামাজিক জীবনেও নীতিবোধ, ধর্মবোধ প্রতিষ্ঠা আজ জরুরি। তাহলেই আমাদের ভাবী সংস্কৃতি দুঃস্থতা কাটিয়ে পূর্ণাঙ্গ হয়ে উঠবে।

📘 মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান 📄 সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য

📄 সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য


অনেকে বলেন, এ যুগ হচ্ছে জাতীয়তাবাদের যুগ, জাতিরাষ্ট্রের যুগ। এর মোদ্দা কথা হচ্ছে- একটি নির্দিষ্ট ভাষাভাষী লোকজন কিংবা একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ ধর্ম-নির্বিশেষে একই সংস্কৃতির সাধনা করবে এবং তারই ভিত্তিতে একটি জাতিত্বের ধারণা গড়ে তুলবে। রাষ্ট্র ব্যাপারে কিংবা রাজনীতি ব্যাপারে ধর্মকে জড়িয়ে ফেলা সংগত হবে না। রাষ্ট্রের নাগরিক পরিচিত হবে রাষ্ট্র পরিচয়ে; ধর্ম পরিচয়ে নয়। রাষ্ট্রের কাজ হবে ধর্ম-নির্বিশেষে নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা-কল্যাণের দিকে দৃষ্টি রাখা; ধর্মের বিভূতি বর্ধন করা নয়।

কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে- ধর্মের থেকে রাজনীতিকে পৃথক করা শক্ত, আর সংস্কৃতির সাথে ধর্মের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। দেখা গেছে, ধর্ম কখনও কখনও ব্যক্তিমানস ও সমাজের খুব গভীরে পৌঁছে যায়, দেশে দেশে ধর্মই পুরো একটা সংস্কৃতির গতিপথ নির্মাণ করে এবং সেই সংস্কৃতিকে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য দেয়। আমাদের এই উপমহাদেশের ইতিহাস এর বড়ো প্রমাণ। বহু ধর্মমত এ মাটিতে বিকশিত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সংখ্যার দিক দিয়ে ইসলাম ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাই ভারতের মাটিতে প্রভাব বিস্তার করে এবং ধর্মকে ভিত্তি করে একালে হিন্দু ও মুসলিম জাতীয়তাবাদীদের উত্থান ঘটে। এই জাতীয়তাবাদের চাপে একসময় ভারতই ভাগ হয়ে যায়। যারা একালে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের বাড়-বাড়ন্তকে বক্র দৃষ্টিতে দেখেন, তারা ভারতীয় উপমহাদেশের দুই সম্প্রদায় হিন্দু ও মুসলমানের এই ঐতিহাসিক স্বাতন্ত্র্য চেতনাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? হিন্দু ও মুসলমানের বিরোধ তো একদিনের ঘটনা নয়; এমনকি ব্রিটিশ ও জিন্নাহ সাহেবের রাজনীতির ফলাফলও নয়। হিন্দু ও মুসলমানের বিরোধ শুধু রাজনীতিঘটিত নয়; সংস্কৃতিঘটিতও বটে। ব্রিটিশ আমলে কংগ্রেসের নেতারা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের নামে ওপরে ওপরে একধরনের হিন্দু-মুসলমানের মিলিত যৌথ জাতীয়তাবাদের কথা বলতেন। কিন্তু আদতে কংগ্রেসের হিন্দু নেতাদের কাজকর্মে দেখা গেল, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ভারতীয় মুসলমানদের ওপর এক সংস্কৃতিবাদ তথা হিন্দুত্ব চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। সেই চেষ্টার প্রতিক্রিয়ায় মুসলিম লীগের তরফ থেকে এলো স্বতন্ত্র আবাসভূমির দাবি।

ভারতের ইতিহাসে ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ কখনোই ঘটেনি। ন্যাশনালিজম যে তত্ত্বটা, তা কোনোকালেই কোনো সম্প্রদায় গ্রহণ করেনি- না হিন্দু আমলে, না বৌদ্ধ আমলে, আর না মুসলিম আমলে। ন্যাশনালিজম বলতে এখানে বারবরই বুঝিয়েছে- হিন্দু ন্যাশনালিজম বা মুসলিম ন্যাশনালিজম। তার মানে- ধর্ম অনুসারে ন্যাশনালিটির চরিত্র নির্ধারিত হয়েছে। আমাদের এখানকার কোনো কোনো পণ্ডিত ভারতের ইতিহাস ঘেঁটে একটি যৌগিক সংস্কৃতি ও সমন্বয় পন্থা আবিষ্কার করার চেষ্টা করেন বটে, কিন্তু তার বাস্তব কার্যকারিতা নেই বললেই চলে। আবার অনেকে আছেন ধর্মের বাইরে গিয়ে লোক সংস্কৃতিকে ভিত্তি করতে চান। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো- লোক সংস্কৃতিকে ভিত্তি করে একটা জাতীয়তাবাদ গড়ে ওঠে না। তাহলে তো লালন ফকিরের খোল-করতালেই আমাদের জাতীয়তাবাদঘটিত সমস্যার সমাধান ঘটত।

যে ইউরোপ থেকে আমরা সাংস্কৃতিক বহুত্ব (Cultural Pluralism) ও ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা পেয়েছি, সেখানে কিন্তু বহুত্ববাদী চিন্তা-ভাবনা আজ ব্যর্থ হতে চলেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভাষাগত পার্থক্য থাকলেও ধর্ম এক হওয়ার কারণে এক খ্রিষ্টীয় সংস্কৃতি পুরো ইউরোপকে একধরনের সমজাতীয়তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এতকাল ইউরোপে অন্য ধর্মাবলম্বী বিশেষ করে মুসলমানদের সংখ্যা কম ছিল। এখন সেখানে মুসলমানদের সংখ্যা বাড়ছে এবং একটি মুসলিম সমাজ গড়ে উঠছে। এই ক্রমবর্ধমান মুসলিম সমাজের সাথে সেখানকার খ্রিষ্টানদের এখন ঠোকাঠুকি শুরু হয়েছে। যে সমাজে খ্রিষ্টানরা একচ্ছত্র, সেখানে মুসলমানরা তাদের আত্মপরিচয় বিকশিত করতে চাওয়ার কারণেই এই বিরোধের সূত্রপাত। সাম্প্রতিককালে ফ্রান্সে মুসলিম মেয়েদের হিজাব পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা সেখানকার খ্রিষ্টানদের অসহিষ্ণুতার নমুনা এবং বহুদিনের ইসলাম-বিদ্বেষের ফল বলে মনে হয়।

এতকাল বলা হয়েছে, ধর্মের ভিত্তিতে কোনো নাগরিকের ওপর বৈষম্য সৃষ্টি করা ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাংস্কৃতিক বহুত্বের ধারণার পরিপন্থি। অথচ সেই কাজটিই এখন করা হচ্ছে ফ্রান্সে, যেটি নাকি ধর্মনিরপেক্ষতার সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত। এর থেকে স্পষ্ট হয়, শুধু ঘোষণা দিলেই একটা রাষ্ট্র সেক্যুলার হয়ে যায় না। অন্যদিকে ধর্মীয় আইডেন্টিটি যে সেক্যুলারিজমকে ছাড়িয়ে যায়, ফ্রান্সের খ্রিষ্টান-মুসলমান বর্তমান সম্পর্ক তা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট।

বাংলাদেশের মতো দেশে সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ কাজ করেনি। এর একটা কারণ হচ্ছে, হিন্দু-মুসলমানের মিলিত বাঙালি জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের সন্দেহ ও তাদের স্বাতন্ত্র্য চেতনা। বাঙালি সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদে হিন্দু-মুসলমানের সমতা ও সমন্বয়ের কথা বলা হলেও ঐতিহাসিক কার্যকারণ ও ঘটনা পরম্পরায় এই সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদ অনেকখানি হিন্দুত্বনির্ভর হয়ে উঠেছে। ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালি সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদের নেতৃত্ব দিয়েছে হিন্দু সমাজপতি ও বুদ্ধিজীবীরা। ফলে এই সংস্কৃতির যে পাটাতনটি তৈরি হয়েছে, তাতে হিন্দুত্বের প্রবণতাসমূহ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এখনও বাঙালি সংস্কৃতি বলতে এখানকার বাঙালিয়ানায় মুগ্ধ বুদ্ধিজীবীরা সেই উনিশ শতকীয় কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু মধ্যবিত্তীয় প্রেক্ষিতটি আবিষ্কার করার চেষ্টা করেন। বাঙালি সংস্কৃতির এই অসংগত হিন্দুত্বমুখীনতার কারণেই এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সম্প্রদায় এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং হাল আমলে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মধ্যে তাদের স্বাতন্ত্র্য আবিষ্কারের চেষ্টা করছে। একটা জিনিস বোঝা দরকার, মুসলমানদের জাতীয়তাবাদ কখনোই ইসলামকে অতিক্রম করে নয়। এই কারণেই কোনো মুসলিম রাষ্ট্রে সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ আজতক শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি। ৫০ ও ৬০-এর দশকে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে আরব জাতীয়তাবাদের ঢেউ লেগেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, নেতৃত্বের বাগাড়ম্বর ও দুর্নীতি ছাড়া সেক্যুলারিস্টরা কিছুই দিতে পারেনি। ফলে সেখানে তারা আজ পিছু হটতে শুরু করেছে এবং সেই শূন্যস্থান ভরে ফেলেছে ইসলামপন্থিরা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মনে হয়েছিল তুরস্কের কামালিজম বোধ হয় সেখানে ইসলামের শেষ চিহ্ন রাখবে না। যাবতীয় নিষ্ঠুরতা, সহিংসতা ও রক্তপাতের ভেতর দিয়ে কামালও চেষ্টা করেছিলেন ইসলামপন্থিদের উত্থান চিরতরে ঠেকিয়ে রাখতে। কিন্তু শতাব্দী শেষে দেখা গেল, কামালের হিসাব-কিতাব ভুল প্রমাণিত হয়েছে। প্রচণ্ড বৈরিতার মধ্যেও তুরস্কে আজ ইসলাম মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।

মুসলিম দেশগুলোতে ধর্মনিরপেক্ষতার ইতিহাস খুব মধুর নয়। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই এটি মুসলিম জনসাধারণের মতামতের বিরুদ্ধে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সর্বত্রই একধরনের সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা সকলের সহাবস্থানের কথা বললেও এটি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে এর পৃষ্ঠপোষকরা সহাবস্থান ও সম্প্রীতির ধারণা ছুড়ে ফেলেছেন এবং সাংস্কৃতিক বহুত্বের স্থলে একরৈখিক, মনোলিথিক (Monolithic) চিন্তার প্রশ্রয় দিয়েছেন। এটি সহাবস্থানের বদলে সংঘাতের অবস্থা সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরেও এরকম একটা অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল এবং সকল ধরনের ইসলামভিত্তিক রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার- একদিকে আমরা বলছি গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতায় সকলের কথা বলার অধিকার থাকবে, অন্যদিকে আমরা অন্যের রাজনীতিচর্চার ওপর খড়গহস্ত হব! মুসলিম দেশগুলোতে সেক্যুলার জাতীয়তবাদের গোড়া শক্ত না হওয়ার কারণ এর অযৌক্তিক ও নিষ্ঠুর ধর্মবিরোধিতা। এ কারণেই মুসলমানরা সেক্যুলার জাতীয়তাবাদকে ধর্মহীনতার সাথে একার্থক হিসেবে দেখেছে এবং শেষমেষ প্রত্যাখ্যান করেছে। এই প্রত্যাখ্যানের আরেকটা কারণ হচ্ছে- ধর্মনিরপেক্ষতা সর্বত্রই মুসলমানের স্বাতন্ত্র্য চেতনাকে খর্ব করার চেষ্টা করেছে। ইসলামের মৌলিক প্রবণতাগুলোকে বাদ দিয়ে ইসলামপূর্ব স্থানিক সংস্কৃতির মধ্যে সেক্যুলারিস্টরা আত্মপরিচয় খোঁজায় বেশি আগ্রহী।

ইসলাম স্থানিক সংস্কৃতির সাথে একধরনের সহাবস্থানে বিশ্বাসী। প্রয়োজনে ইসলামের মৌলিক প্রবণতার বিপরীতার্থক না হলে এর সদর্থক উপাদানগুলো গ্রহণ করতে রাজি। কিন্তু ঢালাওভাবে ইসলামের সাথে সমন্বয়ের নামে জগাখিচুড়ি সংস্কৃতি চর্চার পক্ষপাতী নয়। এ ধরনের সমন্বয়বাদিতার কারণে ইসলামের মৌলিক প্রবণতাগুলো দুর্বল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেই সম্ভাবনাকে তাই ইসলাম তার গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশের অনুমতি দেয় না। আগেই বলেছি হিন্দুত্বনির্ভর বাঙালি সংস্কৃতি এখানকার বাংলাভাষী মুসলমানকে এক সংস্কৃতিহীনতার দিকে টানছে। এর সাথে তাই ইসলামের সমন্বয় সম্ভব নয়। বাঙালি সংস্কৃতি যদি হয় সকল বাংলাভাষাভাষীর সংস্কৃতি, তাহলে সেখানে বাঙালি মুসলমানের জীবন-ভাবনার প্রতিফলন অবশ্যই থাকতে হবে। কেননা, সংখ্যার দিক দিয়ে তারাই অগ্রগণ্য। বাঙালি সংস্কৃতিতে উনিবিংশ শতাব্দীর হিন্দু মধ্যবিত্তের প্রেক্ষিত ভেঙে ফেলে বাঙালি মুসলমানকে বাঙালিত্বের নতুন একটা প্রেক্ষিত তৈরি করতে হবে এবং তার ভিত্তিতে বাঙালিত্বের নতুন একটা সংজ্ঞা নির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি, ইসলাম হবে যার মেনস্ট্রিম ফিলসফি। ইতিহাস বাঙালি মুসলমানের ওপর বাঙালিত্বের নতুন সংজ্ঞা নির্মাণের দায়িত্ব তুলে দিয়েছে। আশা করা যায়, এই প্রস্তাবিত নতুন সংস্কৃতির পটভূমি ইসলামের বৈশ্বিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে সম্প্রসারিত হবে এবং উনিশ শতকীয় প্রেক্ষাপট ছুড়ে ফেলে নতুন যুগের মুখোমুখি হওয়ার সাধনা করবে।

📘 মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান 📄 সংস্কৃতির সীমানা

📄 সংস্কৃতির সীমানা


সংস্কৃতির জগতে নান্দনিকতা ও অশ্লীলতার সীমানা নিয়ে একটা বিতর্ক আছে। কাকে বলব নান্দনিকতা, আর কাকে বলব অশ্লীলতা এই বিতর্কের ফয়সালা আজও সাহিত্যরসিকরা পুরোপুরি করতে পারেননি। এর কারণ হচ্ছে- রসিকজনেরা এই মামলার মীমাংসা করতে চান তাদের নিজের নিজের চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান থেকে। যার ফলে কোনো ফয়সালাই শেষ পর্যন্ত মূল্যবোধ নিরপেক্ষ হতে পারেনি।

ব্রিটেনে একটা সময় ডি.এইচ. লরেন্সের 'লেডি চ্যাটারলিজ লাভার' বইটিকে অশ্লীল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। একটা পর্যায়ে বইটিকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এখন আর বইটি বেআইনি নয়। বইটি পেয়েছে প্রথম শ্রেণির উপন্যাসের স্বীকৃতি। নান্দনিকতা ও শ্লীলতা, সংস্কৃতি ও অপসংস্কৃতি- এর যে মানদণ্ড, এটি কিন্তু নির্ভর করে আমাদের মূল্যবোধ ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর।

সেভিয়েত রাশিয়ায় কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় আসার পর দস্তয়েভস্কির উপন্যাসকে বেআইনি ঘোষণা করেছিল। কমিউনিস্টরা যুক্তি দিয়েছিল তার উপন্যাস সমাজ-প্রগতির জন্য বড়ো রকমের বাধা। তেমনি করে বরিস পাস্তারনাক ও আলেক্সান্ডার সোলঝেনিৎসিনের উপন্যাসের ওপরও তারা অনেক কড়াকড়ি আরোপ করেছিল। কমিউনিস্টরা গোর্কি, মায়াকোভস্কি ও শলোকভের লেখালিখি যেমন করে বিশ্বব্যাপী প্রচার করেছে, টলস্টয় কিংবা তুর্গেনিভের লেখা নিয়ে তেমন কোনো উৎসাহ দেখায়নি। এই কমিউনিজমের যখন পতন ঘটল, তখন কিন্তু একই রাশিয়ায় শোনা গেল ভিন্ন কথা। রাশিয়ার লোকজন অন্য রকম এক মতামত প্রচার করতে শুরু করল। তারা বলতে লাগল, কমিউনিস্টরা রুশ শিল্প-সাহিত্যের যে অপূরণীয় ক্ষতি করে গেছে, তার তুলনা একেবারে নেই। তাদের সংস্কৃতি চেতনা ছিল অপসংস্কৃতির প্রকৃষ্ট নিদর্শন। কমিউনিস্টরা মানবমুক্তি ও বৈজ্ঞানিক চেতনা প্রতিষ্ঠা করার নামে যত অপকর্ম করেছে, তা আর কেউ করতে পারেনি। তারা শ্রেণি-সংগ্রামের কথা বলে একধরনের বিদ্বেষ প্রচার করেছে এবং একদেশদর্শী মতান্ধ মানসিকতার প্রকাশ ঘটিয়েছে।

কমিউনিস্টরা যে মতান্ধ, তার কারণ হচ্ছে- তাদের গুরু মার্কসের ইতিহাসভাষ্য। ইতিহাসে কী ঘটেছে তার সত্যিকার যাচাই-বাছাই না করে শ্রেণি স্বার্থ ও অর্থনীতির ভাষ্য দিয়ে একটা পূর্ব নির্ধারিত ছকে তারা ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করেন। ৫০ ও ৬০-এর দশকে ঠান্ডা যুদ্ধের সময় সেভিয়েত রাশিয়ার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব পড়ে আমাদের দেশে এবং এখানকার কিছু বুদ্ধিমান তরুণ মার্কসবাদ দ্বারা প্রভাবিত হন। এই মতান্ধ মার্কসবাদীরা শ্রেণি-সংগ্রাম দিয়ে ইতিহাস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রচার করেন, ইসলাম হচ্ছে শোষক শ্রেণির ধর্ম এবং এই ধর্ম যাবতীয় সমাজ প্রগতির অন্তরায়।

কমিউনিস্টরা এ অঞ্চলের মুসলমানদের স্বাতন্ত্র্যমুখী আন্দোলন ও কার্যকলাপকেও সাম্প্রদায়িকতা হিসেবে চিহ্নিত করে; অথচ এরা কখনও হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলনকে একইভাবে আক্রমণ করে না। কমিউনিস্টদের এই দ্বিমুখী আচরণ কার্যত একধরনের ইসলামবিরোধী সাম্প্রদায়িক চেতনার ফল। কমিউনিজমের পতনের পরও বাংলাদেশের এই ক্ষুদ্র সমাজবাদী গোষ্ঠী চিন্তা-চেতনা লেখালিখিতে নিস্তেজ হয়ে যায়নি। এখনও তারা ইসলামবিদ্বেষ সমানে ছড়িয়ে চলেছে। ইসলামবিরোধী এইসব কমিউনিস্ট বুদ্ধিজীবীদের সাথে এখন যুক্ত হয়েছেন একদল সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী। এসব সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীরা প্রায় একচ্ছত্রভাবে বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকা, সাময়িকী ও মিডিয়ার জগৎ দখল করে বসে আছেন এবং অনবরত প্রচার করে চলেছেন ইসলাম আর সংস্কৃতি একসাথে চলতে পারে না। এদের আমূল ইসলামবিরোধিতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এরা প্রয়োজনে সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ রক্ষা করতে রাজি, কিন্তু ইসলামকে ঘায়েল করা চাই। তাদের এই অসংগত ইসলামবিরোধিতার মূলে আছে ইসলাম সম্পর্কে তাদের বিপুল অজ্ঞতা ও পাশ্চাত্যের বৈরী প্রচারণা।

ইসলামের মধ্যে সমাজ পরিবর্তনের শক্তি আগেও ছিল এবং এখনও আছে। এই শক্তি না থাকলে ইসলামে বিশ্বাসীরা মানুষের ইতিহাসে এত বড়ো সভ্যতা সৃষ্টি করতে পারত না। মুসলিম সভ্যতার গোড়ায় যে এক নতুন ধর্মবিশ্বাসের প্রেরণা কাজ করেছিল এসব কথা ঐতিহাসিকরা মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করেছেন। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের ইসলামবিরোধিতার সুরটা এসেছে ইউরোপের রেনেসাঁ উদ্ভূত চিন্তা-ভাবনা থেকে। কিন্তু একটা জিনিস বোঝা দরকার- ইউরোপের ইতিহাসে খ্রিষ্টান ধর্মের বিবর্তন যেভাবে হয়েছে, মুসলিম ভূখণ্ডগুলোতে ইসলামের বিবর্তন সেরকম হয়নি। ইসলামের ইতিহাসে রেনেসাঁর প্রয়োজন হয়নি। আবার রেনেসাঁর পেছনে যেরকম চার্চ ও পাদরিদের অত্যাচারের ইতিহাস আছে, ইনকুইজিসনের ঘটনা আছে, ডার্ক এজের কথা আছে- ইসলামের ইতিহাসে তার নজির নেই। তাই ইসলামকে বিবেচনা করতে হবে ইসলামের ধারায়। ইসলামকে ইউরোপীয় আয়নায় বিচার করতে গেলে ইসলাম বিশ্বাসীদের প্রতি একধরনের অবিচার করা হবে।

ইউরোপীয় সংস্কৃতির মূলকথা হচ্ছে- ইহজাগতিকতা। মানে এই সংস্কৃতির মূল পরিমণ্ডল হচ্ছে জাগতিক ক্রিয়াকাণ্ডের দ্বারা সীমাবদ্ধ। ইসলাম হচ্ছে দ্বীন ও দুনিয়ার সমন্বয়। মৃত্যুতেই জীবনের শেষ নয়; মৃত্যুর পরেও একটি জীবন আছে এবং সেই জীবনে জবাবদিহি করতে হবে। এই বিশিষ্ট চিন্তা ইসলাম বিশ্বাসীদের একটি নৈতিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে সাহায্য করে। তাই ইসলামি সংস্কৃতি হচ্ছে নৈতিকতাভিত্তিক এবং মানবতামুখী। তাই 'শিল্পের জন্য শিল্প' কথাটা ইউরোপীয় ইহজাগতিকতার ফ্রেমে বন্দি করা গেলেও ইসলামি নীতির আলোকে পুরোপুরি ব্যাখ্যাযোগ্য নয়। ইসলামের সাথে বরং 'মানুষের জন্য শিল্প' কথাটা বেশি মানানসই। প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী মারমাডিউক পিকথল ইসলামি সংস্কৃতির একটা জুতসই সংজ্ঞা দিয়েছেন: By Islamic culture, I mean not the culture, from whatever source derived, attained at any given moment by people who profess the religion of Islam, but the kind of culture prescribed by a religion of which human progress is the definite and avowed aim.¹

এর মানে হচ্ছে- শিল্প সংস্কৃতি, স্থাপত্য, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যত বড়ো অর্জনই আমরা করি না কেন, তা যদি ইসলামের মৌলিক লক্ষ্য অর্জনের পথে সহায়ক না হয়, তবে তাকে ইসলামি সংস্কৃতি বলা যাবে না। তাহলে একদিক থেকে বলা যায়- সমাজ থেকে যদি বেইনসাফি, অসহিষ্ণুতা, ভোগবাদী ক্ষয়িষ্ণুতা প্রভৃতি প্রবণতাগুলোকে হটানো না যায়, সমাজের ভেতর যদি তৌহিদের নীতিকে প্রতিষ্ঠা না করা যায়, তবে শুধু কলাচর্চা করে ইসলামের সংস্কৃতির নীতি বাস্তবায়ন করা যাবে না। এই নীতি কার্যকর করতে হলে চাই কুরআনের মৌলিক নিয়ম-কানুনকে বাস্তব অর্থে ব্যক্তি ও সমাজজীবনে আভাসিত করে তোলা। এই কার্যকর করার যাত্রাপথে সংস্কৃতি ও কলাচর্চা হচ্ছে একটা মাধ্যম। তাই ইসলামি নীতিতে মাধ্যম কখনও লক্ষ্যের স্থান দখল করে নিতে পারে না।

মারমাডিউক পিকথল তাঁর বিখ্যাত Cultural Side of Islam গ্রন্থে পাশ্চাত্যের ইহজাগতিক সংস্কৃতির সাথে ইসলামি সংস্কৃতির পার্থক্য দেখাতে গিয়ে সেখানকার পত্র-পত্রিকায় বহুল প্রচারিত একটা বিতর্কের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। প্রশ্নটা হলো- একটি ঘরে তুলনাহীন ও অপরিবর্তনযোগ্য একটি প্রাচীন গ্রিক ভাস্কর্যের সাথে একটি মানবশিশু অবস্থান করছে এবং হঠাৎ করে ঘরটিতে আগুন ধরে গেছে। এ পরিস্থিতিতে কেবলমাত্র দুটির একটি রক্ষা করা সম্ভব, কোনটি রক্ষা করা উচিত? পিকথল লিখেছেন সেদিন পাশ্চ্যাত্যের বুদ্ধিজীবী ও বিজ্ঞজনেরা ভাস্কর্যটি রক্ষার জন্য জোর দেন। তাদের অদ্ভুত যুক্তি ছিল- এই পৃথিবীতে প্রতিদিন হাজার হাজার শিশু জন্মগ্রহণ করছে। কিন্তু প্রাচীন গ্রিক স্থাপত্য একবার হারিয়ে গেলে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। এই ধরনের চিন্তার কথা কোনো মুসলমানের মাথায় আসতেই পারে না। এটি হচ্ছে মূর্তিপূজার আধুনিক সংস্কৃত রূপ। একজন মুসলিম মানুষের সৃষ্ট কোনো কলাশৈলী- তা সে যতই নান্দনিক তাৎপর্যপূর্ণ হোক না কেন- তাতে সে কখনও দেবত্ব আরোপ করতে পারে না। এটি হচ্ছে আল্লাহর ইচ্ছা ও মানবজাতির প্রতি তার মহান উদ্দেশ্য অস্বীকৃতির নামান্তর। গ্রিক ভাস্কর্য রক্ষার ইচ্ছা একধরনের নৈরাশ্য লালন করার ফল। কিন্তু ইসলাম নৈরাশ্যের কথা বলে না; বলে প্রত্যয়ের কথা। এ কারণে ইসলামে পার্থিব ও অপার্থিব, সেক্যুলার ও ধর্মীয় বিষয়ের মধ্যে কোনো রকমের ভেদরেখা টানা হয়নি। ইসলাম মানুষকে একটি অবিভাজ্য সামগ্রিক সত্তা হিসেবে দেখে। এ কারণে ইসলামে একই সাথে কুরআন চর্চার কথা বলা হয়েছে। কুরআনে পার্থক্যটা করা হয়েছে ভালো ও মন্দের ধারণা থেকে। এই ভালো ও মন্দের মানদণ্ডটা নির্ধারণ করা হয়েছে মানুষের জন্য কোনটা কল্যাণকর আর কোনটা অকল্যাণকর সেই হিসেবে।

ইসলামের মধ্যে এসব প্রগতিশীল উপায়-উপকরণের ব্যবস্থা থাকলেও আমাদের আধুনিকতাবাদীদের কথা একটাই- ইসলাম এ যুগে অচল। কেননা, এটি মধ্যযুগীয় ধর্মচিন্তার ওপর প্রতিষ্ঠিত। বর্তমানকালের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সিভিল সোসাইটি, জেন্ডার ইস্যুর মতো ব্যাপারগুলো ঠিক ইসলামের সাথে খাপ খায় না। একালে ইসলামের প্রবক্তারা এসব কথার সাথে একমত হতে পারছেন না। যেমন, ইকবাল ইসলামকে বলেছেন Theocratic Democracy -ধর্মীয় গণতন্ত্র। এ গণতন্ত্র ঠিক দূরবর্তী কোনো ধর্মতন্ত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয় যে, শুধু প্রার্থনার সময় এর প্রয়োজন পড়বে এবং বাকি সময় এটি বিস্মৃত থাকলেই চলবে। পক্ষান্তরে এটি হচ্ছে একটি বাস্তবসম্মত, কার্যক্ষম ধর্মীয় ব্যবস্থাপনা ও গণতন্ত্র- যা সার্বক্ষণিকভাবে পালন করা চাই। জীবনে, সমাজে, রাষ্ট্রে সর্বত্র এর প্রতিফলন থাকতে হবে।

মনে রাখা দরকার, ইসলামকে অন্যান্য অনেক তামাদি হয়ে যাওয়া ধর্মের সাথে তুলনা করলে চলবে না। কারণ, ইসলামে সমাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতির একটা রূপরেখা আছে- যা অন্য ধর্মে নেই। এর ওপর ভিত্তি করে একালের ইসলামপন্থিরা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের একটা বিকল্প পথ আমাদের দেখাচ্ছেন। তারা এটাও বলতে চাইছেন, পশ্চিমি আধুনিকতার বাইরেও ইসলামের নিজের মতো করে আধুনিকতা রূপায়নের একটি বিকল্প শক্তি আছে। সুতরাং ইসলামি সমাজ কোনো বদ্ধজলা নয়। ধর্ম নিয়ে যে আধুনিকতার চর্চা করা যায়, তা একালের ইসলামপন্থিরা দেখিয়ে দিচ্ছেন। ইজতিহাদের প্রক্রিয়াগুলো আবার সচল হয়ে উঠেছে। ইজতিহাদ হলো সময়োপযোগী পরিবর্তনের জন্য যুক্তি ও বিচারবুদ্ধি ব্যবহারের নির্দেশ। আমাদের পাশ্চাত্য অনুগত আধুনিকতাবাদীরা ইসলামের ভেতরের এই পরিবর্তনগুলো গভীরভাবে বুঝে দেখলে তাদের অনেক ভ্রান্তির অবসান ঘটবে।

টিকাঃ
১. Muhammad Marmaduke Pickthall, The Cultural side of Islam. New Delhi: Kitav Bhavan, 1990.

📘 মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান 📄 সংস্কৃতির অবক্ষয়

📄 সংস্কৃতির অবক্ষয়


আমাদের সংস্কৃতিতে রুচির যত প্রসার ঘটছে, সেই রুচির স্থূলীকরণ ও কদর্যকরণও যেন ঘটছে একই তালে। এক হিসেবে বলা যায়- এই রুচির স্থূলীকরণ আমাদের ক্রমবর্ধমান সামাজিক সংকটের নমুনা। গত পঞ্চাশ কী ষাট বছরে আমাদের সমাজে বিপুল পরিবর্তন এসেছে- যা নজর এড়ানোর নয়। সামাজিক মানুষের মধ্যে নানা রকম সমৃদ্ধির সম্প্রসারণ ঘটেছে, নগরায়ণ হয়েছে, শিল্পায়ন হয়েছে। সুউচ্চ সৌধশ্রেণি, সুসজ্জিত বিপনী নগরীর চেহারাই পালটে দিয়েছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় যেমন বেড়েছে, তেমনি সেখানে ছাত্রছাত্রীদের সরব উপস্থিতিও দেখার মতো, বিশেষ করে নারী শিক্ষার অগ্রগতি একালের একটা উল্লেখযোগ্য দিক। দৈনিক ও সাময়িকপত্রের সংখ্যা যেমন ক্রমবর্ধমান, তেমনি পুস্তক প্রকাশনা ও পাঠকের সংখ্যাও একইভাবে বেড়ে চলেছে। চিত্র প্রদর্শনী, সাহিত্য সভা, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম, সিনেমা, নাটক,নৃত্যানুষ্ঠানও পরিমাণগতভাবে অতীতের তুলনায় অনেক বেশি দৃষ্টিগোচর।

আমাদের সামাজিক সাংস্কৃতিক চলমানতার এ হচ্ছে বাইরের ছবি। কিন্তু এই চলমানতা যতখানি পরিমাণগত, ঠিক ততখানি গুণগত নয়। এই শ্রীবৃদ্ধি উৎকর্ষতার দিক দিয়ে, মননগত বিচারে কতটুকু জনকল্যাণমুখী- তাও প্রশ্নসাপেক্ষ। আমাদের সংস্কৃতি জগতের এখনকার একটা দুর্লক্ষণ হচ্ছে- সেসব গ্রন্থ, সাময়িকী, নাটক কিংবা সিনেমা প্রচুর পারিমাণে জনপ্রিয়তা অর্জন করছে- যা কিনা তুলনামূলকভাবে তরল রসের পরিবেশন করছে। রুচির স্থুলীকরণ সম্ভব হয়েছে বলেই দর্শকসমাজে ও পাঠকসমাজে এই তরল রসের পরিবেশকেরই গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। কয়েক দশক আগেও প্রকাশিত পুস্তক-পুস্তিকার সাথে তুলনা করলে বোঝা যায়, এখনকার প্রকাশনাগুলোতে মননশীলতা ও গভীর জীবনবোধের অভাব কতখানি ব্যাপক ও সুস্পষ্ট। দেখে-শুনে মনে হচ্ছে, সিনেমা ব্যবসায়ী ও পুস্তক প্রকাশকরা আমাদের জনমানসের এই প্রবণতাগুলো সম্বন্ধে সচেতন এবং এই পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করতে তারা এতটুকু কার্পণ্য করেন না। সচেতনভাবেই যেন তারা রুচির স্থুলীকরণের জন্য উঠে-পড়ে লেগেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই অবস্থার জন্য দায়ী শিল্প-সাহিত্যের ব্যবসায়ীকরণ এবং পুস্তক প্রকাশক ও সিনেমা ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্য শিল্প সংস্কৃতির সেবা নয়; বরং মুনাফা ও দ্রুত অর্থোপার্জন। দ্রুত মুনাফা অর্জনের নেশায় তারা এতটাই মরিয়া হয়ে উঠেছেন যে, শিল্প-সংস্কৃতির কোনো মূল্যবোধ তারা মানতে রাজি নন। মননশীল ও গভীর জীবনবোধ আশ্রয়ী পুস্তক-সাময়িকী প্রকাশে তাদের অনীহা সুস্পষ্ট। অথচ সেসব প্রকাশনায় তারা বিনিয়োগ করতে উৎসুক- যা সমাজের জন্য আশু ক্ষতিকর ও উত্তেজক, অথচ বিনিয়োগের অর্থ দ্রুত উঠে আসার সম্ভাবনায় নিশ্চিন্ত।

সংস্কৃতির জগতের আরেকটা সংকট একই সাথে ঘনীভূত হয়ে উঠেছে তা হলো- সত্যিকার সৃষ্টিশীল প্রতিভার সংখ্যা দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। সংস্কৃতির জগৎ এখন ভারী করে রেখেছে সৃষ্টিহীন, প্রতিভাহীন কতকগুলো বর্ণচোরা লোক, যারা রাজনৈতিক সুবিধাবাদীদের মতো এই জগৎকেও দলাদলি ও কাদা ছুড়াছুড়ির একটি উন্মুক্ত প্রান্তরে পরিণত করেছে। প্রতিভার কাজ হচ্ছে- সৃষ্টিশীল মতবাদ, গভীর জীবনজিজ্ঞাসা ও সূক্ষ্ম মননশীলতার পরিচয় দেওয়া- যা কিনা জাতির ভাবাদর্শের নেতৃত্ব দেবে এবং সংকটে জাতিকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করবে। আমাদের দুর্ভাগ্য- এই রকম প্রতিশ্রুতি নিয়ে কোনো নতুন প্রতিভার আবির্ভাব তেমন একটা হচ্ছে না। তাই আমাদের সংস্কৃতি-রুচির স্থুলীকরণও আজ একপক্ষীয় ব্যাপার নয়। প্রতিভার সংকট হেতু মেধাহীন লোকেরা সংস্কৃতির জগৎ দখল করে যেমন একদিকে তরল ও উত্তেজক প্রমোদরসের জোগান দিচ্ছে, তেমনি পুস্তক ও সিনেমা ব্যবসায়ীরাও পূর্ণ উদ্যমের সাথে সেই প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এইভাবে একটি আরেকটি উজ্জীবিত করছে এবং এ দুইটি এখন আমাদের সমাজের বাস্তব ছবি হয়ে উঠেছে।

সংস্কৃতির জগতের এই গভীর সংকটের কারণ হয়তো বহুবিধ, তবে সাম্প্রতিক দুয়েকটি সামাজিক লক্ষণ এর সাথে গভীরভাবে জড়িত বলে মনে হয়। গত কয়েক দশক ধরে আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নানা রকম টানাহ্যাঁচড়ার মধ্যে চলা সত্ত্বেও সমাজের ভেতর একধরনের পরার্থপরতা ও মানবিকতার মূল্যবোধ সচল ছিল বলা যায়। এই মূল্যবোধ আমরা পেয়েছি ইসলাম থেকে এবং এটিকেই যুগ যুগ ধরে আমরা লালন করে এসেছি। কিন্তু বিশ্বজুড়ে সমাজতন্ত্রের পরাজয়, পুঁজিবাদের জয়জয়কার এবং বিশ্বায়নের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির উত্থানের ফলে একটি নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে এবং পুঁজিবাদের আবশ্যিক সঙ্গী শোষণ, পীড়ন, বৈষম্য, দুর্নীতি এখন আমাদের দুয়ারে অব্যাহতভাবে হানা দিতে শুরু করেছে। একই সাথে আমাদের নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছে সমানতালে। অতীতের তুলনায় আমাদের জীবনযাত্রায় কিছুটা সমৃদ্ধি এসেছে ঠিক, কিন্তু সেই সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য আমরা এখন সব রকমের নৈতিকতা, শোভনতা ও মূল্যবোধকেও পদদলিত করতে রাজি। যেকোনো মূল্যে বিত্তশালী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ও মনোবৃত্তি যেকোনো ধরনের নৈতিকতাবিরোধী কাজকর্ম করতেও আমাদের ঠেকিয়ে রাখতে পারছে না। চোরাচালানী, কালোবাজারী, উৎকোচের মতো পদ্ধতিগুলো এখন গা সওয়া হয়ে গেছে। আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধের কারণে এসব আগে সমাজে ঘৃণিত হতো। ঘুষখোর কিংবা মদখোরকে গ্রামের লোক মিলে বিচ্ছিন্ন বা একঘরে করে রাখতেও দেখা গেছে। তার মানে এগুলোর পেছনে সমাজের কোনো অনুমোদন ছিল না এবং এসব প্রবণতার বিরুদ্ধে সমাজই একটি প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করত। নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সমাজের এই প্রাকৃত বন্ধনগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে এই ঘৃণিত পদ্ধতিগুলো আর অবাঞ্ছিত ঠেকছে না এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এগুলো আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গে পরিণত হয়েছে; বরং এই ঘৃণিত পদ্ধতিগুলো গ্রহণ করে কেউ যদি বৈষয়িকভাবে সফল হয়, তবে তাকে আর এখন ঘৃণা করা হচ্ছে না। তাকে বলা হচ্ছে বুদ্ধিমান। অন্যদিকে নৈতিক অনুশাসন মেনে চলে কেউ যদি যথেষ্ট লেখাপড়া করেও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়, তবে তাকে বলা হচ্ছে বোকা। নৈতিকভাবে সবল হলেও সামাজিকভাবে সে হয়ে যায় উপেক্ষণীয়, অনাদর ও অবহেলার শিকার। বৈবাহিক সম্বন্ধের বেলায় আগে যেখানে পাত্রের উঁচু নৈতিক চরিত্রকে একটা বড়ো গুণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো, এখন সেখানে গুণ হিসেবে দেখা হচ্ছে পাত্রের বৈষয়িক সফলতা কতটুকু। পয়সাওয়ালা না হলে শ্বশুরবাড়িতে জামাইয়ের খাতির নেই। তার মানে- আমাদের বর্তমান সামাজিক অবস্থা আকারে-ইঙ্গিতে যেন এটাই বলে দিতে চাইছে- যদি সমাজে মর্যাদাবান হতে চাও, তাহলে পয়সাওয়ালা হও। পয়সা অর্জনের পদ্ধতি এখন দেখার বিষয় নয়; বিষয় হচ্ছে তুমি পয়সার মালিক কিনা।

এই যে নীতিহীন বিত্তপূজা এখন আমাদের সমাজে কায়েম হয়েছে, এর ফলে গুণীর কদর কমে যাচ্ছে। গুণী ব্যক্তির অভাবে সমাজের চিরকালীন মূল্যবোধগুলো একপ্রকার ভেঙেচুরে নাস্তানাবুদ হয়ে যায়। কারণ, তারাই এসব মূল্যবোধগুলো টিকিয়ে রাখতে ও যুগপৎ চর্চা করতে প্রধান ভূমিকা রাখেন। কিন্তু আজকাল যেহেতু বিত্তের মানদণ্ডে সমাজের প্রশংসা ও শ্রদ্ধা নিবেদিত হয়, তাই নৈতিক মানদণ্ড সংকুচিত হয়ে পড়েছে এবং চতুর্দিকে এক নীতিহীনতার মচ্ছব শুরু হয়েছে। এই নীতিহীনতার সংক্রমণ প্রথম সমাজের উঁচুতলায় ধাক্কা দিয়েছে। সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরাই প্রথম নৈতিকতাকে ছুড়ে ফেলেছেন এবং যেকোনো প্রকারেই হোক সমাজের কর্তৃত্বকে আঁকড়ে রাখতে চেয়েছেন। এর প্রভাব সমাজের সব শ্রেণিতে আছড়ে পড়েছে। সমাজের যারা নীচু স্তরে পড়ে আছে, তারা ভাবছে- সমাজের কর্তাব্যক্তিদেরই যখন নীতি-নৈতিকতার বালাই নেই, তখন আমরা খামাখা নৈতিকতার পিছনে দৌড়াতে গিয়ে জীবন সংগ্রামে ব্যর্থতা বরণ করব কোন দুঃখে। এখন নির্মম হলেও সত্য, সামর্থ্য থাকুক আর না থাকুক- জীবনযাত্রার একটা নির্দিষ্ট মানে পৌঁছানোর জন্য আমরা একটা ঘোড়দৌড়ের প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে গেছি। যেকোনো মূল্যে হোক, তা সে যত ঘৃণিত পদ্ধতি হোক, বৈষয়িক সমৃদ্ধি অর্জনই হচ্ছে এখন আমাদের মোক্ষ। বৈষয়িক সমৃদ্ধি অর্জন কোনো অন্যায় ব্যাপার নয়। কিন্তু সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য নৈতিক অর্থে আগে যে ধর্ম ও অধর্মের বিভাজনটা ছিল- এখন তা প্রায় অবলুপ্ত হতে চলেছে। তাই কালোবাজারী, ফটকাবাজি, ঘুষ গ্রহণের মতো পদ্ধতি অবলম্বন করেও একালে আমাদের 'ভদ্র' ও 'কালচার্ড' হতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।

এই অধপতিত ও কলুষিত মূল্যবোধ থেকে এখন আমাদের সাহিত্য ও শিল্পের জগতের মানুষগুলোও আত্মরক্ষা করতে পারছেন না। যে জগতের মানুষগুলোকে আমরা সাধারণত মননশীল ও সৃজনশীল বলে মনে করে থাকি, যাদের সম্বন্ধে মনে করা হয় বৈষয়িক ব্যাপারে অনেকটা উদাসীন বা নিরপেক্ষ এবং যাদেরকে নিয়ে সমাজের মননচর্চার কথা ভাবা হয়, তারাই আজ যেন বিকৃত চিন্তা-ভাবনার উপাসক হয়ে উঠেছেন। যেকোনো উপায়ে পয়সাওয়ালা হওয়া ও আখের গোছানোর চেষ্টা করা এবং সেই আকাঙ্ক্ষায় নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন, আদর্শ পরিবর্তন, পরস্পরের স্বার্থে পরস্পরকে পৃষ্ঠপোষণ, অন্ধ দলবাজি এখন কোনো দুর্লভ ব্যাপার নয়। এই কারণেই শিল্প-সাহিত্যের জগতে মৌলিক ও শিল্প মানসমৃদ্ধ কোনো লেখার বা সৃষ্টির দর্শন মিলছে না। উত্তম ও মৌলিক কিছু নির্মাণ বা সৃষ্টি করতে হলে যে সাধনা ও একাগ্রতা দরকার, যে ব্যাপক পঠন-পাঠনের প্রস্তুতি থাকা দরকার, তা হারিয়ে যেতে বসেছে। অন্যদিকে মননধর্মী লেখার জন্য যে ধরনের পরিশ্রম দরকার, সেই পরিশ্রমের যথাযথ ফল ও স্বীকৃতি লেখক যদি না পান, তাহলে তিনি নিরুৎসাহিত হবেন। তিনি যদি দেখেন, মাত্র কয়েকদিনের হালকা পরিশ্রম করে যে অর্থাগম হয় বা স্বীকৃতি মেলে আর বহুদিন অধ্যবসায়ের ফলে লিখিত কোনো মননধর্মী ও জীবনধর্মী লেখার ক্ষেত্রে একই রকম অর্থাগম হয় বা স্বীকৃতি মেলে বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেটুকুও প্রাপ্তির নিশ্চয়তা থাকে না, তাহলে কে আর মননধর্মী লেখা লিখতে উৎসাহী হবে! আগেই বলেছি, প্রকাশকরাও মননধর্মী লেখা প্রকাশে আদৌ উৎসাহিত নন। যে সমাজে শ্রম ও সাধনার মূল্য নেই, সেখানে সাধকরাও দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যান কিংবা ধীরে ধীরে তাদের প্রতিভাকেও ব্যবহার করেন স্থূল জৈবিক চাহিদা মেটানোর সহায়ক শক্তি হিসেবে।

আমাদের সমাজে এখন যে নীতি-নৈতিকতাহীন ও রুচিহীন বিত্ত পদ্ধতির প্রসার ঘটেছে, তার ফল হয়তো কেউ কেউ ভোগ করছেন। কিন্তু একটা জিনিস বোঝা দরকার- এই ফল তারা ভোগ করছেন অন্য কাউকে ফল বঞ্চিত করে। সমাজে যদি এই নীতি প্রতিষ্ঠিত হয় যে, ওপরে উঠার জন্য বা বিত্তশালী হওয়ার জন্য যেকোনো পদ্ধতি সিদ্ধ- তাতে একজনকে বঞ্চিত করেই অন্যজনের পথ সুগম হবে। মূল্যবোধ ও নৈতিকতাকে পায়ে দলে যে সমৃদ্ধি আসে, তাতে যে জটিল চক্রের সৃষ্টি হয় সেই চক্রে পড়ে মানুষের নিগ্রহ ও নিষ্পেষণই বাড়ে। এক নীতিহীনতা আরেক নীতিহীনতার পথ উসকে দেয়। যিনি আজ নীতিহীনতার পথে সমৃদ্ধি অর্জন করেছেন, তিনি যদি নিজেকে মনে করেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী তবে এর চেয়ে বড়ো বিভ্রম আর নেই। কারণ, কোনো সমাজই প্রতিদ্বন্দ্বী বিরহিত নয়। অন্য একটা নীতিহীনতার ঝড়ে তার অবলীলায় ভেসে যাওয়া বিচিত্র কিছু নয়। 'খুনি খুনির হাতেই শেষ হয়ে যায়'- এ ধরনের প্রবচন আমাদের সমাজের দীর্ঘ ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ফল থেকেই উৎপন্ন হয়েছে। অন্যদিকে আমাদের সমাজের বর্তমান অর্থনৈতিক নীতিহীনতা, রাজনৈতিক গোলযোগ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা, যৌনবিলাস, সাংস্কৃতিক অধোগতি ও অন্যান্য দুর্লক্ষণগুলো দীর্ঘদিনের ব্যক্তিক ও সামাজিক নৈতিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত পরিণতি। ফলস্বরূপ যুগ-যুগান্তরের সামাজিক কাঠামোটিই ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে এবং সমাজ থেকে ইনসাফ প্রায় উঠে গেছে। এরই ফলে তৈরি হয়েছে সমাজের শ্রেণিতে-শ্রেণিতে বৈষম্য। একজনের হাতে সমৃদ্ধি উপচে পড়ছে, আরেকজন সেই সমৃদ্ধির ছিটেফোটা পাওয়ার জন্য রক্ত পানি করে ফেলছে। আজকে দেশজোড়া যে উগ্রবাদী সন্ত্রাস চলছে, তার উৎস এই বৈষম্যের জমিনেই খুঁজতে হবে। কারণ, বৈষম্যের জমিনই সন্ত্রাসের উর্বরা ক্ষেত্র।

নীতিহীনতা আজ সমৃদ্ধশালী ও সমৃদ্ধিহীন উভয়ের ধর্মে পরিণত হয়েছে। সমাজে যখন বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে, তখন তার হাত থেকে ধনী-দরিদ্র, শোষক-শোষিত কেউ-ই রেহাই পায় না। আমাদের নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের সময় থাকতে হুঁশ হওয়া দরকার। সমাজে এখন জরুরি ভিত্তিতে ইনসাফ ফিরিয়ে আনা দরকার। বৈষম্যহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি করাও প্রয়োজন। নিজেদের আত্মস্বার্থপর চিন্তা-ভাবনা ও সংকীর্ণ দলাদলি ত্যাগ করে যদি তারা এদিকে মনোযোগ না দেন, তাহলে কেউ-ই এই বিশৃংখলার আগুন থেকে রেহাই পাবে না।

ফন্ট সাইজ
15px
17px