📘 মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান 📄 সাংস্কৃতিক বহুত্ব

📄 সাংস্কৃতিক বহুত্ব


এক.
সাংস্কৃতিক বহুত্ব (Cultural Pluralism) শব্দটা পশ্চিমি গণমাধ্যমের জোরে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে এবং হালে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এ নিয়ে একটা সংবেদনা সৃষ্টি হয়েছে। পুরালিজম, সেক্যুলারিজম, ন্যাশনালিজম প্রভৃতি ধারণা আমরা পেয়েছি পশ্চিমের সূত্রে। মজার কথা হলো, এসব ধারণা এখন আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজজীবনের গভীরে ঢুকে পড়লেও আদপে এসব মর্মবস্তু পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদ ও আধুনিকতার দ্বারা আরোপিত এবং আমাদের দেশের ক্ষেত্রে তা কতখানি প্রাসঙ্গিক- সেটাও ভাববার বিষয়। যে বিতর্ক ইউরোপ-আমেরিকায় প্রাসঙ্গিক হতে পারে, তা আমাদের মতো পশ্চাৎপদ পুঁজি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার দেশে এবং ভিন্ন চরিত্রসম্পন্ন সাংস্কৃতিক আবহাওয়ায় চলতে পারে কিনা- তাও বিবেচনা করা যেতে পারে।

আবার উলটো চিত্রও দেখি। গত একশ কী দু'শ বছরে সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের ফলে এসব চিন্তাধারার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব আমাদের বুদ্ধিজীবীদের একাংশের মধ্যে পড়েছে এবং এসব চিন্তা-ভাবনা চর্চায় তাদের উৎসাহও কম নয়। এই যে বিতর্কের একটি পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে- আমাদের মতো একদা সাম্রাজ্যবাদ শাসনাধীন দেশগুলোর ক্ষেত্রে তা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। পাশ্চাত্যকে গ্রহণ করব কি করব না, আধুনিকতাকে নেব কি নেব না এই দ্বিধার জন্ম সাম্রাজ্যবাদের শাসন-শোষণের ফলে। কারণ, সাম্রাজ্যবাদ আমাদের সমাজব্যবস্থাকে এতখানি বিকৃত ও বিপর্যস্ত করে গেছে যে, এর স্বাভাবিক চলমানতা অনেকখানি আটকে গেছে। এ কারণেই আমাদের অনেক বুদ্ধিজীবী আজও মনে করেন সাম্রাজ্যবাদের অনুপস্থিতিতে আমাদের সমাজ যদি নিজের শক্তিতেই বিবর্তিত হতো তবে এরকম সংশয় ও মূঢ়তার অবস্থা তৈরি হতো না। তাই আজও দেখা যায়- আমাদের এখানে আধুনিকীকরণ (Modernisation) ও আধুনিকতার (Modernity) ধারণার মধ্যে একটা ভেদরেখা তৈরির চেষ্টা। কারণ, আধুনিকতার ব্যবহারিক যৌক্তিক ভাষ্যের সঙ্গে এর নান্দনিক সাংস্কৃতিক ভাষ্যের প্রভেদটা অত্যন্ত মোটা দাগে চিহ্নিত করা সম্ভব। যেমন ফরাসি বিপ্লবের স্লোগান সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার কথা। আসলে এই স্লোগান যতই শ্রুতিমধুকর হোক না কেন, পাশ্চাত্যের ধনতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কারণে এই সাম্যের ধারণা স্রেফ নামকাওয়াস্তা সাম্যে পরিণত হয়েছে এবং অবস্থান ও দেশভেদে এই সাম্যের স্লোগান রূপান্তরিত হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও জুলুমে।

সাংস্কৃতিক বহুত্ব সম্বন্ধেও একই কথা বলা চলে। বহুত্ব সম্বন্ধে আমাদের এখানকার কারও কারও বিভ্রান্ত বিশ্বাস আছে। এরা মনে করেন বহুত্ব মানে হলো- All Cultural position are equal. পৃথিবীতে যেহেতু বহু সংস্কৃতি আছে এবং প্রত্যেক সংস্কৃতির বিকাশ লাভের অধিকার আছে, তাত্ত্বিকভাবে এসব কথার সাথে দ্বিমত করার তেমন কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অধিকতর ধনী ও শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো তাদের কায়েমি স্বার্থের অভিসন্ধি ও ক্ষমতার বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা থেকে দুর্বল দেশ ও সমাজগুলোর ওপর এক দমনমূলক সংস্কৃতি প্রসারের চেষ্টা চালাচ্ছে এবং সেটিও হচ্ছে সাংস্কৃতিক বহুত্বের নামে। যেমন করে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের কথা বলেই সাম্রাজ্যবাদীরা আজকাল অন্য দেশ ও রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র কেড়ে নিচ্ছে। ইরাকের অবস্থা দেখুন। পশ্চিমের চিন্তা-ভাবনার একটা বড়ো ত্রুটি হলো- তাদের বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা ও মানবীয় সত্য সম্পর্কে একটা প্রভুত্ব ব্যঞ্জক বোধ এবং এই বোধ থেকেই আসে বহুত্ব সম্পর্কে অনাস্থা, অন্যের বিকাশ লাভের অধিকার সম্বন্ধে উদাসীনতা। আঠারো-উনিশ শতকের সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের White Men's Burden কিংবা Civilising Mission-এর অন্তর্গত মর্মবস্তু এবং আজকালকার পুঁজিবাদী ও ধনতান্ত্রিক বিশ্বের প্রচারিত বিশ্বায়ন, TINA (There is no alternative) অথবা ইতিহাস ফুরিয়ে যাওয়া তত্ত্বের মধ্যে মৌলিক কোনো তফাত নেই। এর প্রত্যেকটির উদ্দেশ্য হচ্ছে- প্রথম বিশ্ব কর্তৃক বাকি বিশ্বকে শাসন ও শোষণ করার নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈধতা দেওয়া। সেদিক দিয়ে বিবেচনা করলে সাংস্কৃতিক বহুত্বের উপাখ্যানও শেষ বিচারে পরম প্রাপনীয় কোনো সমাধান নয় যে- এর মধ্যে আমাদের ভবিষ্যৎ হবে সুরক্ষিত।

দুই.
বহুত্ব আর বৈচিত্র্য হচ্ছে প্রকৃতির নিয়ম। বহু জ্ঞানী-গুণী-দার্শনিক মনে করেন, দুনিয়ার যে ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা কাজ করছে, তার কিন্তু বিভিন্নভাবে প্রকাশ ঘটছে। ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ, সরল থেকে জটিল দুনিয়ার প্রত্যেকটি জিনিসই পারস্পরিক ঐকতানের ভেতর দিয়ে সহাবস্থান করছে। সামাজিকভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় একটি সমাজে নানা মত ও পথের লোক বাস করে এবং নানা রকম রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সহাবস্থানে সেই সমাজ সচল হয়ে ওঠে। সাংস্কৃতিকভাবে বিচার করলে বহুত্ব ও বৈচিত্র্যের যে ফুল দুনিয়া জুড়ে ফুটে আছে, তা রীতিমতো অভাবিত। দেখা গেছে, এক সংস্কৃতিতে যা চলে, অন্য সংস্কৃতিতে তা নিষিদ্ধ বা অনুপস্থিত। পেরুর লোকেরা যখন আলু খেত, তখন মেক্সিকোর লোকেরা আলু খায়নি। ভারতে যখন মুসলমানরা এলো, তখন তাদের নিজস্ব খাদ্যাভ্যাস তৈরি হলো- যা স্থানীয়দের পক্ষে গ্রহণ করা ছিল তাদের বিশ্বাসের জন্য গর্হিত। গ্রিকদের স্থাপত্যশৈলীর সাথে আরবদের স্থাপত্যশৈলীর কোনো মিল নেই। গ্রিক সাহিত্যে ট্রাজেডি হচ্ছে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট রচনা; অথচ অন্য একটা সংস্কৃতিতে গেলে দেখা যাবে কমেডি ছাড়া সেখানে কিছু ভাবাই যায় না।

এই বৈচিত্র্য তৈরি হয় সংস্কৃতির পার্থক্যের কারণে। কেননা, প্রত্যেক সমাজের নিজস্ব সংস্কৃতি আছে। আবার একাধিক সমাজ কখনও কখনও বিশেষ সংস্কৃতির একটি বৈশিষ্ট্যকে ভাগ করেও নেয়। সংস্কৃতির পার্থক্য যেমন আছে, তেমনি তাদের মধ্যে দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপারও আছে। এইভাবে একটি সংস্কৃতি আরেকটি সংস্কৃতিকে চিহ্নিত করে, আবার পরস্পরকে পুষ্টি জোগায়। এমনি করে সংস্কৃতির স্রোত এগিয়ে চলে। একালে বহুত্বের এই দৃষ্টিভঙ্গির কথা অনেক পাশ্চাত্যের পণ্ডিতরা প্রচার করেছেন সত্য, কিন্তু সেখানকার মাটিতেই আবার আত্মকেন্দ্রিক ও উচ্চমূল্য এক চিন্তা-ভাবনার বিকাশ ঘটেছে গত কয়েক শতাব্দী ধরে- যার মূলে আছে অন্যের সংস্কৃতি সম্বন্ধে এক অবিমিশ্র অবজ্ঞা। দুয়েকজন পণ্ডিত যা-ই বলুন না কেন, এই অবজ্ঞা মিশ্রিত মানসিকতাই পাশ্চত্যের মানুষের চিন্তা-ভাবনাকে অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ করছে। এই অবজ্ঞা সবচেয়ে স্থূল অভিব্যক্তি লাভ করেছিল সাম্রাজ্যবাদের কালে। এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত উপনিবেশের মানুষগুলোর সাথে সাম্রাজ্যবাদীরা যে নিষ্ঠুর ব্যবহার করেছিল, তা কোনোমতেই বহুত্ববাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়যুক্ত ছিল না। সাম্রাজ্যবাদের কালে ঔপনিবেশিক প্রভুদের সক্রিয় সমর্থনে গড়ে উঠেছিল প্রাচ্যবিদ্যার গবেষণা এবং এই সব প্রাচ্যবিদরা প্রাণপণ প্রমাণ করার চেষ্টা করতেন, উপনিবেশগুলোর ইতিহাসে ইতিবাচক বা গৌরবময় কিছু থাকতে পারে না। তাই তাদের কাছে অপাশ্চাত্য সব সংস্কৃতি ছিল নিকৃষ্ট। এই ধরনের উন্নাসিকতা সৃষ্টির পেছনে কাজ করেছিল সাম্রাজ্যবাদের রাজনৈতিক প্রাধান্য বিস্তারের প্রয়োজনীয়তা ও অর্থনৈতিক শোষণের যৌক্তিকতাকে বৈধতা দেওয়া। ভারতীয়দের সম্পর্কে লর্ড মেকলের মতামত এর নমুনা হিসেবে হাজির করাই যথেষ্ট হবে বলে মনে করি:
সংস্কৃত বা আরবিতে আমার কোনো জ্ঞান নেই। তবে তাদের যথার্থ মূল্য নিরূপণের জন্য যা করার তা আমি করেছি। .... প্রাচ্য জ্ঞানভাণ্ডার সম্পর্কে প্রাচ্যবিদদের মূল্যায়ন গ্রহণ করতে আমি প্রস্তুত। আমি তাদের মধ্যে এমন একজনকেও পাইনি, যিনি একথা অস্বীকার করতে পারেন যে, একটা ভালো ইউরোপীয় গ্রন্থাগারের এক তাকের তুল্য হলো ভারত ও আরবের সমগ্র স্থানীয় সাহিত্য।.... এখন আমাদের সামনে প্রশ্নটা আসলে এই যে, আমাদের যখন এই ভাষা (ইংরেজি) শেখানোর ক্ষমতা আছে, তখন কি আমরা এমন সব ভাষা শেখাব- যাতে আমাদের সঙ্গে তুলনীয় কোনো বই নেই বলে সর্বজন স্বীকার করেন। যখন আমরা ইউরোপীয় বিজ্ঞান শেখাতে পারি, তখন কি আমরা এমনসব পদ্ধতি শেখাব- যা ইউরোপীয় পদ্ধতির সঙ্গে যেখানে মেলে না, সর্বস্বীকৃতভাবে সেই অমিল খারাবের দিকে। যখন আমরা যুক্তিসঙ্গত দর্শন ও সত্য ইতিহাসের পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারি, তখন কি আমরা জনসাধারণের পয়সায় এমন চিকিৎসাতত্ত্ব সমর্থন করব- যা ইংল্যান্ডের অশ্ব পরিচর্যাকারীকেও হার মানাবে! এমন জ্যোতির্বিদ্যা সমর্থন করব- যা ইংলিশ বোর্ডিং স্কুলের মেয়েদেরও হাসিয়ে ছাড়বে। এমন সব ইতিহাস সমর্থন করব- যা বিশ ফুট লম্বা রাজা আর ত্রিশ হাজার বছর রাজত্বের গল্পে পূর্ণ। এমন ভূগোল সমর্থন করব- যাতে কেবল রয়েছে মিষ্টির সাগর আর ক্ষীর সমুদ্রের কথা।১

এই ধারণা মূলত পৃথিবীকে বিভাজিত করে ফেলেছে- মুখ্য নিজেরটায় এবং গৌণ অন্যেরটায়। একটি শাসন করবে, অন্যটির শাসিত হওয়াই হবে নিয়তি। যে ফ্রান্সে একসময় রব উঠেছিল সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার, সেই ফ্রান্সই কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে তার অধীন উপনিবেশগুলোর সাংস্কৃতিক চরিত্র পালটে ফেলতে এবং সেখানকার মানুষদের কৃষ্ণাঙ্গ ফরাসি বানিয়ে তাদের ফরাসি সংস্কৃতির অঙ্গীভূত করতে চেয়েছে। আসল কথা হলো- পশ্চিমের সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো বহুত্বের কথা জোরে-শোরে প্রচার করলেও উপনিবেশগুলোতে বহুত্ববাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার বদলে তারা এককেন্দ্রিক একটি ব্যবস্থা, শাসন ও চিন্তা-ভাবনা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। একালেও তৃতীয় বিশ্বে- বিশেষ করে মুসলিম দুনিয়ার ওপর এরা নানা কৌশলে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় কোনো ত্রুটি রাখছে না।

বিশ্বায়নের প্রয়োজনে সাম্রাজ্যবাদী মিডিয়ার প্রভাব এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রভুসুলভ মনোবৃত্তিকে এড়িয়ে চলা গরিব ও প্রায়ুক্তিকভাবে অনগ্রসর দেশগুলোর জন্য রীতিমতো দুঃসাধ্য কাজ হয়ে উঠেছে। এই মুহূর্তের বাস্তবতা হলো- পৃথিবীব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও শোষণের তোপের মুখে অপশ্চিমি বিশ্বের জাতিগোষ্ঠীগুলোর সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বিপন্নপ্রায়। জগতে বিভিন্ন জাতির শরিকানা মানবিক ও সমতাভিত্তিক হওয়ার বদলে বিরোধ ও সংঘাতের ক্ষেত্রই যেন প্রস্তুত হচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে অনেক ক্ষেত্রেই বহুজাতিক সমাজের কথা বলা হলেও কার্যক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের প্রয়োজনীয়তাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে এক অসহনশীলতার মনোভাবকে উসকে দিয়ে। যেমন- আজকের ফ্রান্সের সংখ্যালঘু মুসলমানদের প্রতি সংখ্যাগুরু খ্রিষ্টানদের সাম্প্রদায়িক মনোভাব এই দুই সংস্কৃতির সহাবস্থানকে কষ্টসাধ্য করে তুলেছে। এই অস্বাচ্ছন্দ্যের প্রকাশ ঘটেছে সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দাঙ্গায়। অন্য সংস্কৃতির প্রতি এমনতর বিরূপতা যথার্থ বহুত্ববাদ চর্চার সম্ভাবনাকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং পাশ্চাত্যের বহুকথিত সেক্যুলার মানবিক সমাজের তত্ত্ব যে কত ফোঁপরা, তা ভয়ানকভাবে প্রকাশ করে দিয়েছে।

পাশ্চাত্যের এরকম ডাবল স্ট্যান্ডার্ডের নমুনা আরও দেওয়া যেতে পারে। বছরের পর বছর ধরে খোদ যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি যে প্রতিকূল ধারণা পোষণ করা হয়, তা কিন্তু একধরনের সাংস্কৃতিক অসূয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে এবং কৃষ্ণাঙ্গদের কখনোই মার্কিন সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। এখনও মানবাধিকারের সবচেয়ে বেশি স্লোগান উচ্চারণকারী দেশটিতে রেড ইন্ডিয়ানদের জীবন নির্বাহ করতে হয় রিজারভেশন-সংরক্ষিত এলাকায়। পাশ্চাত্যের আরেকটা জিনিস নিয়ে সেখানকার মানুষ রেনেসাঁ ও শিল্প বিপ্লবের পর থেকে গর্ব করে আসছিল। তাদের দাবি- তারা ধর্মকে রাষ্ট্র ও গণজীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছে এবং দেশের জনগণকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত করার সম্ভাবনাকে রুদ্ধ করেছে। পাশ্চাত্যের এই দাবি কিন্তু পুরোপুরি সত্য নয়। ইউরোপের কেন্দ্রস্থলে বসে আমাদের চোখের সামনে বসনিয়ায় যে পরিকল্পিত মুসলিম নিধনের ঘটনা ঘটেছে, তা কিন্তু সেখানকার ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বহাল থাকা অবস্থায়ই সম্ভব হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ খ্রিষ্টানদের সাথে পশ্চিমের রাষ্ট্রগুলো এক ধরনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারলেও সংখ্যালঘু মুসলমানদের সাথে একই রকম ব্যবহার তারা করতে ইচ্ছুক বলে মনে হয় না। এসব উদাহরণ থেকে মুসলমানদের প্রতি বিরূপতার বিষয়টি যেমন বোঝা যায়, তেমনি বহুল আলোচিত পশ্চিমের সেক্যুলার রাষ্ট্র-কাঠামোর মধ্যে যথার্থ বহুত্ববাদের কোনো জায়গা আছে কিনা- তাও একটা বড়ো প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিন.
এখন আমরা ভারতীয় উপমহাদেশের দিকে চোখ ফেরাই। এটি কখনোই এক সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিল না। এখানকার একত্ববোধের প্রেরণা এসেছে মূলত ধর্ম থেকে। যেমন- হিন্দু ভারত কিংবা মুসলিম ভারত। ভাষাগত কিংবা জাতিরাষ্ট্রের বিচারে এর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ব্যাপারটা একান্তই অসম্ভব। রাজনৈতিক দিক দিয়ে ভারত ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল একবার মোঘল আমলে আরেকবার ইংরেজ আমলে, কিন্তু এই ঐক্যটাও তৈরি হয়েছিল মোঘল বা ব্রিটিশ শাসন আরোপিত এক ঐক্য থেকে। সাংস্কৃতিক বিচিত্রতা ভারতবর্ষের একটা বৈশিষ্ট্য বটে; কিন্তু সাংস্কৃতিক বহুত্ব বলতে যা বোঝায়- যেমন পৃথক সংস্কৃতির সহাবস্থান এবং পারস্পরিক সহনশীলতার ব্যাপারটা, তা কিন্তু সব সময় এখানে দেখা যায়নি। আল-বেরুনির 'কিতাবুল হিন্দ'-এ ভারতের বর্ণভেদমূলক সমাজের যে বর্ণনা আছে, তা মোটেই সাংস্কৃতিক বহুত্বের সমার্থক নয়। এই ধরনের বর্ণভেদমূলক সমাজ শুধু পৃথক সংস্কৃতির সহাবস্থানকেই অস্বীকার করে না; নির্মূলও করতে চায়। এর সাথে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সংস্কৃতির উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।

মুসলমানরা ভারতে আসার পর মুসলিম সুলতান ও বাদশাহরা হিন্দু সমাজের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলাননি, কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতির দিক দিয়ে তারা এক ধরনের সহাবস্থানের পরিবেশ সৃষ্টিতে উৎসাহী ছিলেন। যে আওরঙ্গজেবকে ধর্মান্ধ বলে দোষারোপ করা হয়, তার বিরুদ্ধেও কিন্তু হিন্দুদের অধিকার হরণের অভিযোগ ইতিহাসবিদরা হাজির করতে পারেননি। কার্যকর অর্থেই মুসলিম শাসনামলে ভারতে বহু সংস্কৃতির পারস্পরিক সহাবস্থানের ভিত্তিতে এক বহুত্ববাদী সমাজ কাঠামো গড়ে উঠার পরিবেশ ছিল। এই বহুত্বের মধ্যেই প্রভেদ দেখা দেয় ইংরেজ আমলে। ইংরেজ তার সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে হিন্দুকে কোলে টেনে নেয় এবং মুসলমানকে পায়ে দলার চেষ্টা করে। এই পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘু মুসলমানরা নিজেদের সাংস্কৃতিক সত্তা সম্বন্ধে অধিকার সচেতন হয়ে ওঠে এবং একপর্যায়ে ভারতই ভাগ হয়ে যায়।

ভারত স্বাধীন হওয়ার পরও সেখানে প্রায়ই হিন্দুদের জঙ্গি প্রকাশ ঘটে এবং হিন্দুত্ববাদীরা বিভিন্ন সময় ক্ষমতায়ও চলে আসে। সেক্যুলার বলে পরিচিত কংগ্রেসও হিন্দুত্বের সংক্রমণ থেকে রেহাই পায়নি (যেমন- প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী বাবরি মসজিদ এলাকায় রামমন্দিরের শিলান্যাস করেছিলেন, আরেক প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের সময় বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছিল)। ভারত ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে দাবি করলেও কার্যক্ষেত্রে এটি ধর্মনিরপেক্ষ নয় এবং এর শাসকরা বহুত্ববাদী মত লালন করার পক্ষপাতীও নয়। অযোধ্যা, গুজরাটের পরিকল্পিত মুসলিম নিধন এর বড়ো প্রমাণ।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে যারা ধর্মের প্রবেশ ও সেক্যুলারিজমের নীতি বিসর্জন দেওয়াকে বহুত্ববাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার অন্তরায় বলে মনে করেন, তারা ভুল বলেন। সেক্যুলারিজম পশ্চিমে বহুত্ববাদী সমাজ নিশ্চিত করতে পারেনি। সেখানে মুসলমানরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। ভারতের কথা নাই-বা বললাম। আরব-রাষ্ট্রনায়করা একসময় ভেবেছিলেন, সেক্যুলার আরব জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বোধ হয় তারা ইজরাইলকে মোকাবিলা করতে পারবেন। কিন্তু পারেননি। ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ইজরাইলের হাতে বারবার আরব নেতৃবৃন্দ নাস্তানাবুদ হয়েছেন। উলটো আরব জাতীয়তাবাদ আরবদের কোনোরকম ঐক্যই তৈরি করতে পারেনি; বরং পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সন্দেহের স্থায়ী বীজতলা তৈরি করে দিয়েছে। ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের প্রতি ইজরাইলের জুলুম ও অবিচারকে একভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, কিন্তু জর্দানি শাসকরা যখন ফিলিস্তিনিদের ওপর একইরকম গুলিবর্ষণ করে, তখন তাকে কী বলা যায়? আরবরা যখন সেক্যুলারিজম, গোত্রতন্ত্র, শেখতন্ত্র, আরববাদ দিয়ে ইসলামকে অতিক্রম করার চেষ্টা করেছে, তখন থেকেই তাদের ভালোমতো বিপর্যয় শুরু হয়েছে। এর থেকে আমাদের এখানে যারা ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে বিসর্জন দেওয়ার কথা ভাবেন, তারা শিক্ষা নিতে পারেন।

চার.
এ আলোচনা থেকে আমরা দেখলাম- সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ব্যাপারটা খুবই স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক। কিন্তু তা সহজে গ্রহণযোগ্য হয় না, বিশেষ করে প্রভাবশালী সংস্কৃতি অন্য সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যগুলোকে অস্বীকার করতে চায়। সংস্কৃতির মধ্যে কখনও কখনও সহাবস্থান সম্ভব হয়েছে ঠিক, কিন্তু কখনও কখনও তা সূচনা করেছে বিরোধের। বিশেষ করে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো অন্যের সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করে, অন্যের সংস্কৃতিতে হস্তক্ষেপ করে, প্রয়োজনে বদলে ফেলার তাড়নাও অনুভব করে। বহু সংস্কৃতিভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাই এখনও সাম্রাজ্যবাদ একটা বড়ো অন্তরায়। আমাদের শিক্ষিত ও আধুনিকতাবাদীদের ভেতরে একটা ভুল ধারণা আছে— ইসলামের মধ্যে সহিষ্ণুতা ও বহুত্ববাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার কোনো প্রকার মূল্যচেতনা অনুপস্থিত। এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ঔপনিবেশিক আমলে এবং সাম্রাজ্যবাদীদের প্রচার-প্রোপাগান্ডা আমাদের আধুনিকতাবাদীদের মনে-মস্তিষ্কে এমন জবরদস্ত ছাপ ফেলে দিয়েছে যে, তা তারা অবলীলায় বিশ্বাসও করে ফেলেছে। পশ্চিমের বর্ণবাদী প্রচার-প্রোপাগান্ডা ইসলামকে যতই কুৎসিত ধর্ম হিসেবে খাড়া করার চেষ্টা করুক না কেন, ইসলামের মাহাত্ম্য, সর্বজনীন মানবতাবাদ, সহিষ্ণুতার ধারণার তুলনা ইতিহাসে বিরল। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য উভয় জগতের বড়ো বড়ো পণ্ডিত স্বীকার করেছেন- আহলুল কিতাবদের প্রতি ইসলামের যে সহনশীলতা ছিল, তা সমসাময়িক খ্রিষ্টানজগতে কল্পনাও করা যেত না।

উমাইয়াদের স্পেন, আব্বাসীয়দের বাগদাদ, তুর্কিদের ইস্তাম্বুল আর মোঘলদের দিল্লি ছিল নানা ধর্মের মানুষের সহবস্থান ও সম্প্রীতির প্রাণকেন্দ্র। এসব মুসলিম রাজধানীগুলোতে ইসলামের মানবতামুখী মনন ও প্রাণচাঞ্চল্যের মিলিতভাবে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ছিল সকল ধর্মের মানুষ। বহুত্ববাদী সমাজের সত্যিকার রূপ এসব মুসলিম রাজধানীগুলোতেই দেখা গেছে। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি ইসলাম যে সহনশীলতা দেখিয়েছে, তার কাছাকাছি কোনো সহনশীলতা খ্রিষ্টান ইউরোপে ইহুদিদের প্রতি, প্রোটেসট্যান্টদের জগতে ক্যাথলিকদের প্রতি কিংবা ক্যাথলিকদের জগতে প্রোটেসট্যান্টদের প্রতি ব্যবহারে পরিলক্ষিত হয়নি। অন্যদিকে ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা অন্যের ধর্মবিশ্বাসে আদৌ হস্তক্ষেপ করেনি। কারণ, কুরআন শরিফ দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছে- লা ইকরাহা ফিদদ্বীন- দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই।

মধ্যযুগে ইনকুইজিসন বা শুদ্ধাভিযান করে ইউরোপ থেকে উগ্রবাদী খ্রিষ্টানরা যখন ইহুদিদের বিতাড়িত করল, তখন তারা এসে আশ্রয় পেয়েছিল মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে। মুসলিম খলিফা ও সুলতানরা এসব বিতাড়িত ইহুদিদের সাদরে আশ্রয় দিয়েছিলেন। শুধু মধ্যযুগ নয়; এই মাত্র গত শতাব্দীতে নাৎসি হলোকাস্টের মাধ্যমে ইউরোপের খ্রিষ্টানরা ইহুদিদের ওপর চালায় নিপীড়ন-নির্যাতন। অথচ এই ইহুদিরাই আজ খ্রিষ্টান জগতের সাথে মিলেমিশে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে চলেছে। এভাবেই আজকের ইহুদিরা মুসলমানদের উপকারের প্রতিদান দিয়েছে। ইতিহাসের ধারা বড়োই অদ্ভুত!

সাম্রাজ্যবাদের বরকন্দাজ ওরিয়েন্টালিস্টরা একসময় প্রচার করেছিল, ইসলাম এক হাতে তরবারি আর অন্য হাতে কুরআন নিয়ে অগ্রসর হয়েছিল। তরবারি দিয়ে দুয়েকজনকে হয়তো ধর্মান্তরিত করা সম্ভব, একটি সর্বজনীন আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়- যা নাকি পৃথিবীর এক-চতুর্থাংশ মানুষের বিশ্বাসের উৎস হয়ে আছে। ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার সরল, অনাড়ম্বর, নিরাপস আদর্শ ও তার নবির অনুপম আত্মশুদ্ধি, সাহসিকতা, নির্ভীকতা এবং আদর্শের প্রতি অবিচল বিশ্বাসের জোরে। রসুল সা. তাঁর জীবদ্দশায় অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মাবলম্বীদের সাথে সহনশীলতা ও সহাবস্থানের যে নজির স্থাপন করেছিলেন, তা এক কথায় তুলনা বিরহিত। তাঁর ঘোষিত ঐতিহাসিক 'মদিনা সনদ' একটি সহনশীল মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। নাজরানের খ্রিষ্টান প্রতিনিধি দলকে রসুল সা. নিজে তাঁর মসজিদে প্রার্থনা করার অনুমতি দেন; পাশাপাশি তিনি নিজে একই গৃহভ্যন্তরে নামাজের ইমামতি করেন। রসুল সা.-এর ঔদার্যতা একই মসজিদের অভ্যন্তরে একই সময় দুই পৃথক মতের অনুসারীরা তাদের আরাধনা সম্পন্ন করেন। এই সহনশীলতা ইসলামের নীতি। এই নীতি থেকে ইসলাম বিশ্বাসীরা কখনোই সরে আসেনি। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, সহনশীলতার পরিবেশ প্রথম বিঘ্নিত হয় ক্রুসেডের কালে। ক্রুসেডের হিংসার নদী পাড়ি না দিতেই আসে উপনিবেশবাদ- সাম্রাজ্যবাদের কাল। সাম্রাজ্যবাদী শাসন-পীড়ন-নির্যাতনের ঐতিহ্য থেকে আজও পাশ্চাত্য বেরিয়ে আসতে পারেনি। হিংসার পূজা করে অহিংসা প্রতিষ্ঠা করা কখনোই সম্ভব নয়।

টিকাঃ
১. Minute on Education (1835) by Thomas Babington Macaulay.

📘 মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান 📄 সংস্কৃতির রূপান্তর

📄 সংস্কৃতির রূপান্তর


সংস্কৃতি বলতে আগে মানুষ ধর্মভিত্তিক সংস্কৃতিকেই বোঝাত। ধর্মের কাছ থেকে প্রেরণা পেয়ে মানুষ দেশে দেশে শিল্প সংস্কৃতির এক-একটা সাগর সঙ্গম সৃষ্টি করেছে। তাজমহল, মাইলো দ্বীপের ভেনাস, অজন্তার গুহা চিত্র, তানসেনের ধ্রুপদ সংগীত- এসব কিন্তু সবই ধর্মের প্রেরণাজাত। আর্টের জগতে যারা বাস করেন, তাদের চাই একধরনের অন্তরের প্রেরণা। সেই প্রেরণাও কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে আসত ধর্ম থেকে।

প্রাচীনকালে মানুষ গুহাচিত্র আঁকত। দেখা গেছে- সেই সব গুহাচিত্রের মধ্যেও মানুষের বিচিত্র সব বিশ্বাসের ছাপ পড়ে আছে। মানুষ তার ধর্মবোধটাই গুহাচিত্রের বিচিত্র ভঙ্গিমার মধ্যে প্রকাশ করেছে।

পণ্ডিতেরা সভ্যতাকে শ্রেণিবিভাগ করেছেন বিভিন্নভাবে। তাদের মতে প্রাচীনতম হচ্ছে সুমেরীয় সভ্যতা। তারপর ইজিপ্টের সভ্যতা। সিন্ধু সভ্যতা হচ্ছে বিশ্বের তৃতীয় সভ্যতা। তারপরে চীন। এসব সভ্যতা নানা দিক থেকে সমৃদ্ধি অর্জন করেছিল। তারা গড়ে তুলেছিল স্থাপত্য, দুর্গ, পয়ঃপ্রণালী। এসব সভ্যতার লোকজন সংস্কৃতিমনস্কও ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা সংগীতচর্চা, চিত্রচর্চা, নৃত্যচর্চা, নাট্যচর্চা, ভাস্কর্যচর্চাও করত। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো- নানা রকম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে এটা স্পষ্ট হয়েছে, এসব সভ্যতার লোকজন কিন্তু ধর্মীয় চিন্তা-ভাবনাও করত। মানুষের যুগান্তরের যেসব প্রশ্ন- যার উত্তর মানুষ চিরকালই খুঁজেছে, তার উত্তর এসব সভ্যতার লোকজন ধর্মের ভেতর দিয়ে খোঁজার চেষ্টা করত। স্বর্গ-নরক, পাপ-পূণ্য, ঈশ্বর, পরলোক, অমরত্ব, নির্বাণ, স্যালভেশন, আত্মা-পরমাত্মা- এসব প্রশ্ন তাদেরও আচ্ছন্ন করেছিল। এসব সভ্যতার লোকজন কিন্তু মোটেই ধর্মহীন ছিল না; বরং বিচিত্র সব ধর্মবিশ্বাস তারা আঁকড়ে ধরেছিল।

এসব সভ্যতার ঘরে আলো জ্বালেন নবি, রসুল, মহাপুরুষগণ। এদের অনেকেই ছিলেন প্রত্যাদিষ্ট। এরা যেমন মানুষের আধ্যাত্মিক চাহিদা মেটান, তেমনি তাদের জাগতিক সমস্যা সমাধানের পথও বাতলে দেন। হযরত ঈসা জন্মান ইহুদিদের ঘরে, কিন্তু তিনি সমস্ত মানুষকে আলো দিয়ে যান। তাঁর অনুসারীরাই গড়ে তোলে হলি রোমান এম্পায়ার। খ্রিষ্টধর্ম বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এশিয়া, ইউরোপের সংস্কৃতিরও অভূতপূর্ব বিস্তার ঘটে। স্থাপত্য হিসেবে গথিক ক্যাথেড্রালগুলো আজও অনন্য। দান্তে, বোকাচিও, মোজার্ট, বেঠোভেন, গ্যয়টে, চসার, মিল্টন, শেক্সপিয়র, এলিয়ট প্রমুখ একদিক দিয়ে চিন্তা করলে খ্রিষ্টধর্মের প্রেরণারই ফল।

হযরত ঈসার আগে শাক্য উপজাতির ঘরে জন্মান সিদ্ধার্থ। সিদ্ধার্থের সদ্ধর্ম তক্ষশীলা থেকে বিস্তৃত হয়ে যায় মধ্য এশিয়ায় এবং সেই পথ দিয়ে চীন, মঙ্গোলিয়া, কোরিয়া, জাপানে। ধ্যানী বৌদ্ধ সাধকরা শুধু অহিংসার বাণী প্রচারই করেন না; তাদের মঠ ও বিহারগুলো ছিল শিল্প, সংস্কৃতি, জ্ঞানচর্চার পীঠস্থান। নালন্দার কথাতো অনেকেই জানেন।

এরপরে মরুচারী আরবদের ঘরে জন্মান রসুল মোহাম্মদ সা.। তখনকার দিনে সভ্য জাতি হিসেবে আরবদের কোনো খ্যাতি ছিল না। কিন্তু রসুলের শিক্ষার ফলে মাত্র একশ বছরের মধ্যে আরব বিশ্ব সভ্যতার চালকের আসনে আসীন হয়। দামেশক, বাগদাদ, ইস্পাহান, ইস্তাম্বুল, কর্ডোভা, কায়রো, দিল্লি, আগ্রা শুধু মুসলিম রাজ-রাজড়াদের নগর ও রাজধানী হিসেবে সমাদৃত হয়নি; জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সংস্কৃতি, ললিত কলা বিকাশের তীর্থস্থানে পরিণত হয়। ধর্মের প্রেরণা না থাকলে তাজমহল, আলহামরা, মস্ক অফ কর্ডোভার মতো শিল্প সৃষ্টি হতে পারত না।

সব ধর্মের গোড়ার কথা হচ্ছে এক- Core of Morality। খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, ইসলাম- প্রত্যেকেই চায় মরালিটির শাসন, মরালিটির নিয়ন্ত্রণ। ধর্মের এই সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় এক বড়ো রকমের ছেদ পড়ে ইউরোপীয় রেনেসাঁর কালে। রেনেসাঁর মূল কথা হচ্ছে- মানুষও ইচ্ছা করলে সর্বশক্তিমান হতে পারে। তার মধ্যে আছে সর্বগুণের সম্ভাব্যতা। এর গুণে মানুষও পারে সর্বশক্তিমানের মতো নতুন এক জগৎ সৃষ্টি করতে। রেনেসাঁর এই দর্শনের নাম- হিউম্যানিজম, যেখানে মানুষকে অপরিমেয় ভাবা হয়।

মনে রাখা দরকার- হিউম্যানিজম ও হিউম্যানিটি কিন্তু এককথা নয়। হিউম্যানিজম চায় মুক্তি। পারলৌকিকতা থেকে মুক্তি, পুরোহিতের হাত থেকে মুক্তি, রাজতন্ত্র থেকে মুক্তি, সামন্ততন্ত্র থেকে মুক্তি, ক্রীতদাসের মালিকের অধীনতা থেকে মুক্তি, কলামাত্রের কৃত্রিম বিধিনিষেধ থেকে মুক্তি। এমনকি মরালিটি থেকেও মুক্তি। এককথায় সর্ববন্ধন মুক্তি। লিবার্টি। হিউম্যানিজম আরও চায় ইকুয়ালিটি। শ্রেণি নির্বিশেষে সাম্য। আর চায় মৈত্রী। ফ্রাটারনিটি। রেনেসাঁ এই ট্রিনিটির সাধনাই করেছে। সেই সাধনার চর্চা থেকেই আসে ফরাসি বিপ্লব।

রেনেসাঁর মূলমন্ত্র হচ্ছে এই ট্রিনিটি। সেখান থেকে বাদ যায় মরালিটি। হিউম্যানিটি কিন্তু এই মরালিটি চর্চার ওপর জোর দেয়। ধর্মের ইচ্ছাও তাই। রেনেসাঁর জোর ট্রিনিটির ওপর, ধর্মের জোর মরালিটির ওপর। মরালিটি ছাড়া ট্রিনিটির বুনিয়াদ মজবুত হয় না। তার নজির আমরা ইতিহাসে পেয়েছি। ফরাসি বিপ্লব সম্ভব হয়েছে, কিন্তু বিপ্লবের আদর্শ ধরে রাখা যায়নি। বাস্তবে এ পৃথিবী থেকে আজও যুদ্ধ, বিদ্রোহ, সহিংসতা কোনোটাই নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। একজন মুসলিম সুফির কথা মনে পড়ছে, তিনি বলছেন: বুদ্ধি বলতে থাকে- নিজেকে বাড়াও, প্রেম বলতে থাকে- তুমি নিজ স্বার্থ ত্যাগ করো (ফরিদউদ্দিন আত্তার)।

ফরাসি বিপ্লবের পর হিউম্যানিজমের বিচিত্র শাখা-প্রশাখা পল্লবিত হয়। রোমানটিসিজম, আইডিয়ালিজম, ন্যাচারালিজম, রিয়েলিজম, ইমপ্রেসনিজম, এক্সপ্রেসিনজম, সুররিয়ালিজম- সবই মানুষকে নিয়ে, প্রকৃতিকে নিয়ে। কোনোটিই ইন্দ্রিয়াতীতকে নিয়ে নয়। মানুষ ভাবতে থাকে- নিজেকে বাড়াতে বাড়াতে সে অতিমানবে পরিণত হবে। সে অতিমানবের অসাধ্য কিছু থাকবে না। নিটশের ভাষায় সুপারম্যান। সুপারম্যানের আয়ত্তে এসেছে অনেক কিছু। আয়ত্তাতীত রয়ে গেছে প্রেম, মরালিটি- যা ছাড়া প্রলয়কে, প্রতিহিংসাকে জয় করা যায় না। ইউরোপীয় রেনেসাঁ জগৎ সম্বন্ধে মানুষের অনেক ধারণা পালটে দিয়েছে। মানুষ জগৎ সম্বন্ধে যে জ্ঞান অর্জন করেছে, তাকে নানা রকমভাবে ভাঙিয়ে নিয়েছে সে। মানুষকে করেছে শক্তিমান।

কিন্তু রেনেসাঁ মানুষের চরিত্র পালটাতে পারেনি। চোর-ডাকাতের হাতে বিদ্যুৎ, উড়োজাহাজ, পরমাণু বোমা গেলে তার পরিণতি বিপজ্জনক হবেই। মানবপ্রকৃতিকে সংশোধন না করে, বিশুদ্ধ না করে তার হাতে ক্ষমতা দিলে দানবিক কাণ্ড তো ঘটবেই। নিজাম ডাকাত দরবেশে পরিণত হন, বাল্মীকি ঋষি হন ধর্মের প্রভাবেই। রেনেসাঁ কাউকে ঋষি করেছে, দরবেশ করেছে— এমন কথা শোনা যায়নি। উলটো রেনেসাঁর সন্তানদের হাতেই দু-দুটো মহাযুদ্ধের দানবিকতা আমরা দেখেছি। এখনও তাদের হাতে দেশে দেশে চলছে নরমেধযজ্ঞ, রক্তপাত, সহিংসতা। বোঝাই যাচ্ছে রেনেসাঁর মূল্য জ্ঞান যথেষ্ট নয়। নবি-রসুলদের জ্ঞানও অতি আবশ্যক। তাঁরাই সত্যিকারের প্রেমশীলতা, সত্যানুবর্তিতা ও অহিংসার আলো জ্বেলেছেন। তারাই এগুলোর আবাদ করে সোনা ফলিয়েছেন। ধর্মের কাছ থেকে প্রেরণা পাওয়া মানে মধ্যযুগীয় হওয়া নয়, প্রিমিটিভ হওয়াও নয়। মরালিটির জগতে প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগ বলে কিছু নেই। মরালিটির মাত্রা স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে সমান। আর মধ্যযুগ, প্রাচীন যুগ মানেই সর্বনাশা কিছু নয়। হোমার, বাল্মীকি, কালিদাস, দান্তে, রুমি, ওমর খৈয়াম, শেক্সপিয়র কি এ যুগের মানুষ? প্রাচীন যুগের, মধ্যযুগের হয়েও এরা আধুনিককে ছাড়িয়ে গেছেন। এরা আধুনিকেরও আধুনিক, সর্বাধুনিক। এদের মতো প্রতিভা এ যুগে কয়টা জন্মেছে?

মুশকিল হচ্ছে বিজ্ঞানের কল্যাণে, আধুনিকের কল্যাণে এ যুগে আরেকটা তাজমহল হচ্ছে না। অজন্তা, আলটামিরার মতো গুহাচিত্র, প্রাচীন গ্রিসের নাটকের তুল্য কোনো কিছুই তৈরি হচ্ছে না। তাহলে আধুনিককালই কি চূড়ান্ত? প্রাচীন যুগ থেকে মধ্যযুগ থেকে আমরা কি কোনো প্রেরণা গ্রহণ করব না? একালের আন্তর্জাতিক সংঘাত, মহাযুদ্ধ, নাৎসি-ফাসিস্ট- জায়োনিস্ট-ইম্পেরিয়ালিস্ট প্রতিক্রিয়াশীলতা এসব তো প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগের চেয়েও অন্ধকারাচ্ছন্ন কাণ্ড-কারখানা। একালের অন্ধকারকে ঢেকে রাখতেই কি আমরা আমাদের অতীতকে অস্বীকার করি? আমাদের প্রয়োজন মডার্ন সভ্যতাকে মরাল সভ্যতা হিসেবে তৈরি করে নেওয়া। না হলে মডার্নের অপঘাতে সবকিছুর সমাপ্তি ঘটবে। মডার্ন হওয়া আমাদের একান্ত প্রয়োজন। কারণ, আমাদের বাস্তব জ্ঞান দরকার, প্রকৃতির ওপর প্রভাবকে বিস্তৃত করা দরকার। একই সাথে আমাদের মরাল হওয়াও দরকার। কারণ, মহাশক্তিমান হয়ে ইউরোপের মতো মানব-বিপর্যয়ের কারণ আমরা হতে চাই না। আমরা এমন একটা সম্পূর্ণতার, সৃষ্টিশীলতার স্বপ্ন দেখব- যেখানে আমরা পেছনে ফিরে যাব না ঠিক, কিন্তু পেছনকেও একেবারে অস্বীকার করব না। পেছনের প্রেরণাই আমাদের সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে। পুরোপুরি আধুনিকতার হিংসা ও চোরাবালির ওপর আমাদের স্বপ্নসৌধ গড়ে তুলতে দিতে পারি না। আমাদের ভবিষ্যতের সংস্কৃতি হবে একই সাথে মডার্ন ও মরাল। এককথায় মরালিটি হবে মডার্নিটির চালক।

একদিকে আমরা পেছনের সংস্কার-আবর্জনা সাফ করব, অন্যদিকে আমরা শক্তিমানদের চিত্তশুদ্ধি ঘটাব। যারা মনে করে ব্যক্তিজীবনের বাইরে ধর্মের ও নৈতিকতার কোনো স্থান নেই, তারা কিন্তু সভ্যতার জন্য আরেকটা অপঘাত ডেকে আনার চেষ্টা করছেন। ব্যক্তির মতো সামাজিক জীবনেও একধরনের মরালিটি দরকার। না হলে সমাজের স্থিতিশীলতা বিপন্ন হয়। তাই সামাজিক জীবনেও নীতিবোধ, ধর্মবোধ প্রতিষ্ঠা আজ জরুরি। তাহলেই আমাদের ভাবী সংস্কৃতি দুঃস্থতা কাটিয়ে পূর্ণাঙ্গ হয়ে উঠবে।

📘 মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান 📄 সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য

📄 সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য


অনেকে বলেন, এ যুগ হচ্ছে জাতীয়তাবাদের যুগ, জাতিরাষ্ট্রের যুগ। এর মোদ্দা কথা হচ্ছে- একটি নির্দিষ্ট ভাষাভাষী লোকজন কিংবা একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ ধর্ম-নির্বিশেষে একই সংস্কৃতির সাধনা করবে এবং তারই ভিত্তিতে একটি জাতিত্বের ধারণা গড়ে তুলবে। রাষ্ট্র ব্যাপারে কিংবা রাজনীতি ব্যাপারে ধর্মকে জড়িয়ে ফেলা সংগত হবে না। রাষ্ট্রের নাগরিক পরিচিত হবে রাষ্ট্র পরিচয়ে; ধর্ম পরিচয়ে নয়। রাষ্ট্রের কাজ হবে ধর্ম-নির্বিশেষে নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা-কল্যাণের দিকে দৃষ্টি রাখা; ধর্মের বিভূতি বর্ধন করা নয়।

কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে- ধর্মের থেকে রাজনীতিকে পৃথক করা শক্ত, আর সংস্কৃতির সাথে ধর্মের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। দেখা গেছে, ধর্ম কখনও কখনও ব্যক্তিমানস ও সমাজের খুব গভীরে পৌঁছে যায়, দেশে দেশে ধর্মই পুরো একটা সংস্কৃতির গতিপথ নির্মাণ করে এবং সেই সংস্কৃতিকে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য দেয়। আমাদের এই উপমহাদেশের ইতিহাস এর বড়ো প্রমাণ। বহু ধর্মমত এ মাটিতে বিকশিত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সংখ্যার দিক দিয়ে ইসলাম ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাই ভারতের মাটিতে প্রভাব বিস্তার করে এবং ধর্মকে ভিত্তি করে একালে হিন্দু ও মুসলিম জাতীয়তাবাদীদের উত্থান ঘটে। এই জাতীয়তাবাদের চাপে একসময় ভারতই ভাগ হয়ে যায়। যারা একালে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের বাড়-বাড়ন্তকে বক্র দৃষ্টিতে দেখেন, তারা ভারতীয় উপমহাদেশের দুই সম্প্রদায় হিন্দু ও মুসলমানের এই ঐতিহাসিক স্বাতন্ত্র্য চেতনাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? হিন্দু ও মুসলমানের বিরোধ তো একদিনের ঘটনা নয়; এমনকি ব্রিটিশ ও জিন্নাহ সাহেবের রাজনীতির ফলাফলও নয়। হিন্দু ও মুসলমানের বিরোধ শুধু রাজনীতিঘটিত নয়; সংস্কৃতিঘটিতও বটে। ব্রিটিশ আমলে কংগ্রেসের নেতারা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের নামে ওপরে ওপরে একধরনের হিন্দু-মুসলমানের মিলিত যৌথ জাতীয়তাবাদের কথা বলতেন। কিন্তু আদতে কংগ্রেসের হিন্দু নেতাদের কাজকর্মে দেখা গেল, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ভারতীয় মুসলমানদের ওপর এক সংস্কৃতিবাদ তথা হিন্দুত্ব চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। সেই চেষ্টার প্রতিক্রিয়ায় মুসলিম লীগের তরফ থেকে এলো স্বতন্ত্র আবাসভূমির দাবি।

ভারতের ইতিহাসে ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ কখনোই ঘটেনি। ন্যাশনালিজম যে তত্ত্বটা, তা কোনোকালেই কোনো সম্প্রদায় গ্রহণ করেনি- না হিন্দু আমলে, না বৌদ্ধ আমলে, আর না মুসলিম আমলে। ন্যাশনালিজম বলতে এখানে বারবরই বুঝিয়েছে- হিন্দু ন্যাশনালিজম বা মুসলিম ন্যাশনালিজম। তার মানে- ধর্ম অনুসারে ন্যাশনালিটির চরিত্র নির্ধারিত হয়েছে। আমাদের এখানকার কোনো কোনো পণ্ডিত ভারতের ইতিহাস ঘেঁটে একটি যৌগিক সংস্কৃতি ও সমন্বয় পন্থা আবিষ্কার করার চেষ্টা করেন বটে, কিন্তু তার বাস্তব কার্যকারিতা নেই বললেই চলে। আবার অনেকে আছেন ধর্মের বাইরে গিয়ে লোক সংস্কৃতিকে ভিত্তি করতে চান। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো- লোক সংস্কৃতিকে ভিত্তি করে একটা জাতীয়তাবাদ গড়ে ওঠে না। তাহলে তো লালন ফকিরের খোল-করতালেই আমাদের জাতীয়তাবাদঘটিত সমস্যার সমাধান ঘটত।

যে ইউরোপ থেকে আমরা সাংস্কৃতিক বহুত্ব (Cultural Pluralism) ও ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা পেয়েছি, সেখানে কিন্তু বহুত্ববাদী চিন্তা-ভাবনা আজ ব্যর্থ হতে চলেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভাষাগত পার্থক্য থাকলেও ধর্ম এক হওয়ার কারণে এক খ্রিষ্টীয় সংস্কৃতি পুরো ইউরোপকে একধরনের সমজাতীয়তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এতকাল ইউরোপে অন্য ধর্মাবলম্বী বিশেষ করে মুসলমানদের সংখ্যা কম ছিল। এখন সেখানে মুসলমানদের সংখ্যা বাড়ছে এবং একটি মুসলিম সমাজ গড়ে উঠছে। এই ক্রমবর্ধমান মুসলিম সমাজের সাথে সেখানকার খ্রিষ্টানদের এখন ঠোকাঠুকি শুরু হয়েছে। যে সমাজে খ্রিষ্টানরা একচ্ছত্র, সেখানে মুসলমানরা তাদের আত্মপরিচয় বিকশিত করতে চাওয়ার কারণেই এই বিরোধের সূত্রপাত। সাম্প্রতিককালে ফ্রান্সে মুসলিম মেয়েদের হিজাব পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা সেখানকার খ্রিষ্টানদের অসহিষ্ণুতার নমুনা এবং বহুদিনের ইসলাম-বিদ্বেষের ফল বলে মনে হয়।

এতকাল বলা হয়েছে, ধর্মের ভিত্তিতে কোনো নাগরিকের ওপর বৈষম্য সৃষ্টি করা ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাংস্কৃতিক বহুত্বের ধারণার পরিপন্থি। অথচ সেই কাজটিই এখন করা হচ্ছে ফ্রান্সে, যেটি নাকি ধর্মনিরপেক্ষতার সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত। এর থেকে স্পষ্ট হয়, শুধু ঘোষণা দিলেই একটা রাষ্ট্র সেক্যুলার হয়ে যায় না। অন্যদিকে ধর্মীয় আইডেন্টিটি যে সেক্যুলারিজমকে ছাড়িয়ে যায়, ফ্রান্সের খ্রিষ্টান-মুসলমান বর্তমান সম্পর্ক তা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট।

বাংলাদেশের মতো দেশে সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ কাজ করেনি। এর একটা কারণ হচ্ছে, হিন্দু-মুসলমানের মিলিত বাঙালি জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের সন্দেহ ও তাদের স্বাতন্ত্র্য চেতনা। বাঙালি সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদে হিন্দু-মুসলমানের সমতা ও সমন্বয়ের কথা বলা হলেও ঐতিহাসিক কার্যকারণ ও ঘটনা পরম্পরায় এই সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদ অনেকখানি হিন্দুত্বনির্ভর হয়ে উঠেছে। ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালি সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদের নেতৃত্ব দিয়েছে হিন্দু সমাজপতি ও বুদ্ধিজীবীরা। ফলে এই সংস্কৃতির যে পাটাতনটি তৈরি হয়েছে, তাতে হিন্দুত্বের প্রবণতাসমূহ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এখনও বাঙালি সংস্কৃতি বলতে এখানকার বাঙালিয়ানায় মুগ্ধ বুদ্ধিজীবীরা সেই উনিশ শতকীয় কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু মধ্যবিত্তীয় প্রেক্ষিতটি আবিষ্কার করার চেষ্টা করেন। বাঙালি সংস্কৃতির এই অসংগত হিন্দুত্বমুখীনতার কারণেই এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সম্প্রদায় এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং হাল আমলে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মধ্যে তাদের স্বাতন্ত্র্য আবিষ্কারের চেষ্টা করছে। একটা জিনিস বোঝা দরকার, মুসলমানদের জাতীয়তাবাদ কখনোই ইসলামকে অতিক্রম করে নয়। এই কারণেই কোনো মুসলিম রাষ্ট্রে সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ আজতক শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি। ৫০ ও ৬০-এর দশকে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে আরব জাতীয়তাবাদের ঢেউ লেগেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, নেতৃত্বের বাগাড়ম্বর ও দুর্নীতি ছাড়া সেক্যুলারিস্টরা কিছুই দিতে পারেনি। ফলে সেখানে তারা আজ পিছু হটতে শুরু করেছে এবং সেই শূন্যস্থান ভরে ফেলেছে ইসলামপন্থিরা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মনে হয়েছিল তুরস্কের কামালিজম বোধ হয় সেখানে ইসলামের শেষ চিহ্ন রাখবে না। যাবতীয় নিষ্ঠুরতা, সহিংসতা ও রক্তপাতের ভেতর দিয়ে কামালও চেষ্টা করেছিলেন ইসলামপন্থিদের উত্থান চিরতরে ঠেকিয়ে রাখতে। কিন্তু শতাব্দী শেষে দেখা গেল, কামালের হিসাব-কিতাব ভুল প্রমাণিত হয়েছে। প্রচণ্ড বৈরিতার মধ্যেও তুরস্কে আজ ইসলাম মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।

মুসলিম দেশগুলোতে ধর্মনিরপেক্ষতার ইতিহাস খুব মধুর নয়। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই এটি মুসলিম জনসাধারণের মতামতের বিরুদ্ধে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সর্বত্রই একধরনের সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা সকলের সহাবস্থানের কথা বললেও এটি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে এর পৃষ্ঠপোষকরা সহাবস্থান ও সম্প্রীতির ধারণা ছুড়ে ফেলেছেন এবং সাংস্কৃতিক বহুত্বের স্থলে একরৈখিক, মনোলিথিক (Monolithic) চিন্তার প্রশ্রয় দিয়েছেন। এটি সহাবস্থানের বদলে সংঘাতের অবস্থা সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরেও এরকম একটা অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল এবং সকল ধরনের ইসলামভিত্তিক রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার- একদিকে আমরা বলছি গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতায় সকলের কথা বলার অধিকার থাকবে, অন্যদিকে আমরা অন্যের রাজনীতিচর্চার ওপর খড়গহস্ত হব! মুসলিম দেশগুলোতে সেক্যুলার জাতীয়তবাদের গোড়া শক্ত না হওয়ার কারণ এর অযৌক্তিক ও নিষ্ঠুর ধর্মবিরোধিতা। এ কারণেই মুসলমানরা সেক্যুলার জাতীয়তাবাদকে ধর্মহীনতার সাথে একার্থক হিসেবে দেখেছে এবং শেষমেষ প্রত্যাখ্যান করেছে। এই প্রত্যাখ্যানের আরেকটা কারণ হচ্ছে- ধর্মনিরপেক্ষতা সর্বত্রই মুসলমানের স্বাতন্ত্র্য চেতনাকে খর্ব করার চেষ্টা করেছে। ইসলামের মৌলিক প্রবণতাগুলোকে বাদ দিয়ে ইসলামপূর্ব স্থানিক সংস্কৃতির মধ্যে সেক্যুলারিস্টরা আত্মপরিচয় খোঁজায় বেশি আগ্রহী।

ইসলাম স্থানিক সংস্কৃতির সাথে একধরনের সহাবস্থানে বিশ্বাসী। প্রয়োজনে ইসলামের মৌলিক প্রবণতার বিপরীতার্থক না হলে এর সদর্থক উপাদানগুলো গ্রহণ করতে রাজি। কিন্তু ঢালাওভাবে ইসলামের সাথে সমন্বয়ের নামে জগাখিচুড়ি সংস্কৃতি চর্চার পক্ষপাতী নয়। এ ধরনের সমন্বয়বাদিতার কারণে ইসলামের মৌলিক প্রবণতাগুলো দুর্বল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেই সম্ভাবনাকে তাই ইসলাম তার গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশের অনুমতি দেয় না। আগেই বলেছি হিন্দুত্বনির্ভর বাঙালি সংস্কৃতি এখানকার বাংলাভাষী মুসলমানকে এক সংস্কৃতিহীনতার দিকে টানছে। এর সাথে তাই ইসলামের সমন্বয় সম্ভব নয়। বাঙালি সংস্কৃতি যদি হয় সকল বাংলাভাষাভাষীর সংস্কৃতি, তাহলে সেখানে বাঙালি মুসলমানের জীবন-ভাবনার প্রতিফলন অবশ্যই থাকতে হবে। কেননা, সংখ্যার দিক দিয়ে তারাই অগ্রগণ্য। বাঙালি সংস্কৃতিতে উনিবিংশ শতাব্দীর হিন্দু মধ্যবিত্তের প্রেক্ষিত ভেঙে ফেলে বাঙালি মুসলমানকে বাঙালিত্বের নতুন একটা প্রেক্ষিত তৈরি করতে হবে এবং তার ভিত্তিতে বাঙালিত্বের নতুন একটা সংজ্ঞা নির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি, ইসলাম হবে যার মেনস্ট্রিম ফিলসফি। ইতিহাস বাঙালি মুসলমানের ওপর বাঙালিত্বের নতুন সংজ্ঞা নির্মাণের দায়িত্ব তুলে দিয়েছে। আশা করা যায়, এই প্রস্তাবিত নতুন সংস্কৃতির পটভূমি ইসলামের বৈশ্বিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে সম্প্রসারিত হবে এবং উনিশ শতকীয় প্রেক্ষাপট ছুড়ে ফেলে নতুন যুগের মুখোমুখি হওয়ার সাধনা করবে।

📘 মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান 📄 সংস্কৃতির সীমানা

📄 সংস্কৃতির সীমানা


সংস্কৃতির জগতে নান্দনিকতা ও অশ্লীলতার সীমানা নিয়ে একটা বিতর্ক আছে। কাকে বলব নান্দনিকতা, আর কাকে বলব অশ্লীলতা এই বিতর্কের ফয়সালা আজও সাহিত্যরসিকরা পুরোপুরি করতে পারেননি। এর কারণ হচ্ছে- রসিকজনেরা এই মামলার মীমাংসা করতে চান তাদের নিজের নিজের চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান থেকে। যার ফলে কোনো ফয়সালাই শেষ পর্যন্ত মূল্যবোধ নিরপেক্ষ হতে পারেনি।

ব্রিটেনে একটা সময় ডি.এইচ. লরেন্সের 'লেডি চ্যাটারলিজ লাভার' বইটিকে অশ্লীল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। একটা পর্যায়ে বইটিকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এখন আর বইটি বেআইনি নয়। বইটি পেয়েছে প্রথম শ্রেণির উপন্যাসের স্বীকৃতি। নান্দনিকতা ও শ্লীলতা, সংস্কৃতি ও অপসংস্কৃতি- এর যে মানদণ্ড, এটি কিন্তু নির্ভর করে আমাদের মূল্যবোধ ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর।

সেভিয়েত রাশিয়ায় কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় আসার পর দস্তয়েভস্কির উপন্যাসকে বেআইনি ঘোষণা করেছিল। কমিউনিস্টরা যুক্তি দিয়েছিল তার উপন্যাস সমাজ-প্রগতির জন্য বড়ো রকমের বাধা। তেমনি করে বরিস পাস্তারনাক ও আলেক্সান্ডার সোলঝেনিৎসিনের উপন্যাসের ওপরও তারা অনেক কড়াকড়ি আরোপ করেছিল। কমিউনিস্টরা গোর্কি, মায়াকোভস্কি ও শলোকভের লেখালিখি যেমন করে বিশ্বব্যাপী প্রচার করেছে, টলস্টয় কিংবা তুর্গেনিভের লেখা নিয়ে তেমন কোনো উৎসাহ দেখায়নি। এই কমিউনিজমের যখন পতন ঘটল, তখন কিন্তু একই রাশিয়ায় শোনা গেল ভিন্ন কথা। রাশিয়ার লোকজন অন্য রকম এক মতামত প্রচার করতে শুরু করল। তারা বলতে লাগল, কমিউনিস্টরা রুশ শিল্প-সাহিত্যের যে অপূরণীয় ক্ষতি করে গেছে, তার তুলনা একেবারে নেই। তাদের সংস্কৃতি চেতনা ছিল অপসংস্কৃতির প্রকৃষ্ট নিদর্শন। কমিউনিস্টরা মানবমুক্তি ও বৈজ্ঞানিক চেতনা প্রতিষ্ঠা করার নামে যত অপকর্ম করেছে, তা আর কেউ করতে পারেনি। তারা শ্রেণি-সংগ্রামের কথা বলে একধরনের বিদ্বেষ প্রচার করেছে এবং একদেশদর্শী মতান্ধ মানসিকতার প্রকাশ ঘটিয়েছে।

কমিউনিস্টরা যে মতান্ধ, তার কারণ হচ্ছে- তাদের গুরু মার্কসের ইতিহাসভাষ্য। ইতিহাসে কী ঘটেছে তার সত্যিকার যাচাই-বাছাই না করে শ্রেণি স্বার্থ ও অর্থনীতির ভাষ্য দিয়ে একটা পূর্ব নির্ধারিত ছকে তারা ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করেন। ৫০ ও ৬০-এর দশকে ঠান্ডা যুদ্ধের সময় সেভিয়েত রাশিয়ার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব পড়ে আমাদের দেশে এবং এখানকার কিছু বুদ্ধিমান তরুণ মার্কসবাদ দ্বারা প্রভাবিত হন। এই মতান্ধ মার্কসবাদীরা শ্রেণি-সংগ্রাম দিয়ে ইতিহাস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রচার করেন, ইসলাম হচ্ছে শোষক শ্রেণির ধর্ম এবং এই ধর্ম যাবতীয় সমাজ প্রগতির অন্তরায়।

কমিউনিস্টরা এ অঞ্চলের মুসলমানদের স্বাতন্ত্র্যমুখী আন্দোলন ও কার্যকলাপকেও সাম্প্রদায়িকতা হিসেবে চিহ্নিত করে; অথচ এরা কখনও হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলনকে একইভাবে আক্রমণ করে না। কমিউনিস্টদের এই দ্বিমুখী আচরণ কার্যত একধরনের ইসলামবিরোধী সাম্প্রদায়িক চেতনার ফল। কমিউনিজমের পতনের পরও বাংলাদেশের এই ক্ষুদ্র সমাজবাদী গোষ্ঠী চিন্তা-চেতনা লেখালিখিতে নিস্তেজ হয়ে যায়নি। এখনও তারা ইসলামবিদ্বেষ সমানে ছড়িয়ে চলেছে। ইসলামবিরোধী এইসব কমিউনিস্ট বুদ্ধিজীবীদের সাথে এখন যুক্ত হয়েছেন একদল সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী। এসব সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীরা প্রায় একচ্ছত্রভাবে বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকা, সাময়িকী ও মিডিয়ার জগৎ দখল করে বসে আছেন এবং অনবরত প্রচার করে চলেছেন ইসলাম আর সংস্কৃতি একসাথে চলতে পারে না। এদের আমূল ইসলামবিরোধিতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এরা প্রয়োজনে সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ রক্ষা করতে রাজি, কিন্তু ইসলামকে ঘায়েল করা চাই। তাদের এই অসংগত ইসলামবিরোধিতার মূলে আছে ইসলাম সম্পর্কে তাদের বিপুল অজ্ঞতা ও পাশ্চাত্যের বৈরী প্রচারণা।

ইসলামের মধ্যে সমাজ পরিবর্তনের শক্তি আগেও ছিল এবং এখনও আছে। এই শক্তি না থাকলে ইসলামে বিশ্বাসীরা মানুষের ইতিহাসে এত বড়ো সভ্যতা সৃষ্টি করতে পারত না। মুসলিম সভ্যতার গোড়ায় যে এক নতুন ধর্মবিশ্বাসের প্রেরণা কাজ করেছিল এসব কথা ঐতিহাসিকরা মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করেছেন। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের ইসলামবিরোধিতার সুরটা এসেছে ইউরোপের রেনেসাঁ উদ্ভূত চিন্তা-ভাবনা থেকে। কিন্তু একটা জিনিস বোঝা দরকার- ইউরোপের ইতিহাসে খ্রিষ্টান ধর্মের বিবর্তন যেভাবে হয়েছে, মুসলিম ভূখণ্ডগুলোতে ইসলামের বিবর্তন সেরকম হয়নি। ইসলামের ইতিহাসে রেনেসাঁর প্রয়োজন হয়নি। আবার রেনেসাঁর পেছনে যেরকম চার্চ ও পাদরিদের অত্যাচারের ইতিহাস আছে, ইনকুইজিসনের ঘটনা আছে, ডার্ক এজের কথা আছে- ইসলামের ইতিহাসে তার নজির নেই। তাই ইসলামকে বিবেচনা করতে হবে ইসলামের ধারায়। ইসলামকে ইউরোপীয় আয়নায় বিচার করতে গেলে ইসলাম বিশ্বাসীদের প্রতি একধরনের অবিচার করা হবে।

ইউরোপীয় সংস্কৃতির মূলকথা হচ্ছে- ইহজাগতিকতা। মানে এই সংস্কৃতির মূল পরিমণ্ডল হচ্ছে জাগতিক ক্রিয়াকাণ্ডের দ্বারা সীমাবদ্ধ। ইসলাম হচ্ছে দ্বীন ও দুনিয়ার সমন্বয়। মৃত্যুতেই জীবনের শেষ নয়; মৃত্যুর পরেও একটি জীবন আছে এবং সেই জীবনে জবাবদিহি করতে হবে। এই বিশিষ্ট চিন্তা ইসলাম বিশ্বাসীদের একটি নৈতিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে সাহায্য করে। তাই ইসলামি সংস্কৃতি হচ্ছে নৈতিকতাভিত্তিক এবং মানবতামুখী। তাই 'শিল্পের জন্য শিল্প' কথাটা ইউরোপীয় ইহজাগতিকতার ফ্রেমে বন্দি করা গেলেও ইসলামি নীতির আলোকে পুরোপুরি ব্যাখ্যাযোগ্য নয়। ইসলামের সাথে বরং 'মানুষের জন্য শিল্প' কথাটা বেশি মানানসই। প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী মারমাডিউক পিকথল ইসলামি সংস্কৃতির একটা জুতসই সংজ্ঞা দিয়েছেন: By Islamic culture, I mean not the culture, from whatever source derived, attained at any given moment by people who profess the religion of Islam, but the kind of culture prescribed by a religion of which human progress is the definite and avowed aim.¹

এর মানে হচ্ছে- শিল্প সংস্কৃতি, স্থাপত্য, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যত বড়ো অর্জনই আমরা করি না কেন, তা যদি ইসলামের মৌলিক লক্ষ্য অর্জনের পথে সহায়ক না হয়, তবে তাকে ইসলামি সংস্কৃতি বলা যাবে না। তাহলে একদিক থেকে বলা যায়- সমাজ থেকে যদি বেইনসাফি, অসহিষ্ণুতা, ভোগবাদী ক্ষয়িষ্ণুতা প্রভৃতি প্রবণতাগুলোকে হটানো না যায়, সমাজের ভেতর যদি তৌহিদের নীতিকে প্রতিষ্ঠা না করা যায়, তবে শুধু কলাচর্চা করে ইসলামের সংস্কৃতির নীতি বাস্তবায়ন করা যাবে না। এই নীতি কার্যকর করতে হলে চাই কুরআনের মৌলিক নিয়ম-কানুনকে বাস্তব অর্থে ব্যক্তি ও সমাজজীবনে আভাসিত করে তোলা। এই কার্যকর করার যাত্রাপথে সংস্কৃতি ও কলাচর্চা হচ্ছে একটা মাধ্যম। তাই ইসলামি নীতিতে মাধ্যম কখনও লক্ষ্যের স্থান দখল করে নিতে পারে না।

মারমাডিউক পিকথল তাঁর বিখ্যাত Cultural Side of Islam গ্রন্থে পাশ্চাত্যের ইহজাগতিক সংস্কৃতির সাথে ইসলামি সংস্কৃতির পার্থক্য দেখাতে গিয়ে সেখানকার পত্র-পত্রিকায় বহুল প্রচারিত একটা বিতর্কের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। প্রশ্নটা হলো- একটি ঘরে তুলনাহীন ও অপরিবর্তনযোগ্য একটি প্রাচীন গ্রিক ভাস্কর্যের সাথে একটি মানবশিশু অবস্থান করছে এবং হঠাৎ করে ঘরটিতে আগুন ধরে গেছে। এ পরিস্থিতিতে কেবলমাত্র দুটির একটি রক্ষা করা সম্ভব, কোনটি রক্ষা করা উচিত? পিকথল লিখেছেন সেদিন পাশ্চ্যাত্যের বুদ্ধিজীবী ও বিজ্ঞজনেরা ভাস্কর্যটি রক্ষার জন্য জোর দেন। তাদের অদ্ভুত যুক্তি ছিল- এই পৃথিবীতে প্রতিদিন হাজার হাজার শিশু জন্মগ্রহণ করছে। কিন্তু প্রাচীন গ্রিক স্থাপত্য একবার হারিয়ে গেলে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। এই ধরনের চিন্তার কথা কোনো মুসলমানের মাথায় আসতেই পারে না। এটি হচ্ছে মূর্তিপূজার আধুনিক সংস্কৃত রূপ। একজন মুসলিম মানুষের সৃষ্ট কোনো কলাশৈলী- তা সে যতই নান্দনিক তাৎপর্যপূর্ণ হোক না কেন- তাতে সে কখনও দেবত্ব আরোপ করতে পারে না। এটি হচ্ছে আল্লাহর ইচ্ছা ও মানবজাতির প্রতি তার মহান উদ্দেশ্য অস্বীকৃতির নামান্তর। গ্রিক ভাস্কর্য রক্ষার ইচ্ছা একধরনের নৈরাশ্য লালন করার ফল। কিন্তু ইসলাম নৈরাশ্যের কথা বলে না; বলে প্রত্যয়ের কথা। এ কারণে ইসলামে পার্থিব ও অপার্থিব, সেক্যুলার ও ধর্মীয় বিষয়ের মধ্যে কোনো রকমের ভেদরেখা টানা হয়নি। ইসলাম মানুষকে একটি অবিভাজ্য সামগ্রিক সত্তা হিসেবে দেখে। এ কারণে ইসলামে একই সাথে কুরআন চর্চার কথা বলা হয়েছে। কুরআনে পার্থক্যটা করা হয়েছে ভালো ও মন্দের ধারণা থেকে। এই ভালো ও মন্দের মানদণ্ডটা নির্ধারণ করা হয়েছে মানুষের জন্য কোনটা কল্যাণকর আর কোনটা অকল্যাণকর সেই হিসেবে।

ইসলামের মধ্যে এসব প্রগতিশীল উপায়-উপকরণের ব্যবস্থা থাকলেও আমাদের আধুনিকতাবাদীদের কথা একটাই- ইসলাম এ যুগে অচল। কেননা, এটি মধ্যযুগীয় ধর্মচিন্তার ওপর প্রতিষ্ঠিত। বর্তমানকালের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সিভিল সোসাইটি, জেন্ডার ইস্যুর মতো ব্যাপারগুলো ঠিক ইসলামের সাথে খাপ খায় না। একালে ইসলামের প্রবক্তারা এসব কথার সাথে একমত হতে পারছেন না। যেমন, ইকবাল ইসলামকে বলেছেন Theocratic Democracy -ধর্মীয় গণতন্ত্র। এ গণতন্ত্র ঠিক দূরবর্তী কোনো ধর্মতন্ত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয় যে, শুধু প্রার্থনার সময় এর প্রয়োজন পড়বে এবং বাকি সময় এটি বিস্মৃত থাকলেই চলবে। পক্ষান্তরে এটি হচ্ছে একটি বাস্তবসম্মত, কার্যক্ষম ধর্মীয় ব্যবস্থাপনা ও গণতন্ত্র- যা সার্বক্ষণিকভাবে পালন করা চাই। জীবনে, সমাজে, রাষ্ট্রে সর্বত্র এর প্রতিফলন থাকতে হবে।

মনে রাখা দরকার, ইসলামকে অন্যান্য অনেক তামাদি হয়ে যাওয়া ধর্মের সাথে তুলনা করলে চলবে না। কারণ, ইসলামে সমাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতির একটা রূপরেখা আছে- যা অন্য ধর্মে নেই। এর ওপর ভিত্তি করে একালের ইসলামপন্থিরা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের একটা বিকল্প পথ আমাদের দেখাচ্ছেন। তারা এটাও বলতে চাইছেন, পশ্চিমি আধুনিকতার বাইরেও ইসলামের নিজের মতো করে আধুনিকতা রূপায়নের একটি বিকল্প শক্তি আছে। সুতরাং ইসলামি সমাজ কোনো বদ্ধজলা নয়। ধর্ম নিয়ে যে আধুনিকতার চর্চা করা যায়, তা একালের ইসলামপন্থিরা দেখিয়ে দিচ্ছেন। ইজতিহাদের প্রক্রিয়াগুলো আবার সচল হয়ে উঠেছে। ইজতিহাদ হলো সময়োপযোগী পরিবর্তনের জন্য যুক্তি ও বিচারবুদ্ধি ব্যবহারের নির্দেশ। আমাদের পাশ্চাত্য অনুগত আধুনিকতাবাদীরা ইসলামের ভেতরের এই পরিবর্তনগুলো গভীরভাবে বুঝে দেখলে তাদের অনেক ভ্রান্তির অবসান ঘটবে।

টিকাঃ
১. Muhammad Marmaduke Pickthall, The Cultural side of Islam. New Delhi: Kitav Bhavan, 1990.

ফন্ট সাইজ
15px
17px