📄 বাঙালি সংস্কৃতির পরিচয়
বাঙালি সংস্কৃতির রাজনৈতিক ব্যবহার শুরু হয় উনিশ শতকের শহর কলকাতাকে কেন্দ্র করে। ব্রিটিশের দানে ও করুণায় সেদিনের কলকাতা যেমন আশ্চর্য রকমের সমৃদ্ধি ও পরিপুষ্টি লাভ করে, তেমনি ব্রিটিশের পৃষ্ঠপোষণে তাদেরই সহযোগী ও অনুগত বাঙালি বাবুরা সেখানে এক বর্ণহিন্দুর সংস্কৃতির বিকাশ ঘটায়। ব্রিটিশ কলোনিয়ালিজমের শক্তি ও প্রচারের জোরে সেদিনের এই সাংস্কৃতিক প্রচেষ্টাসমূহ বাঙালির সংস্কৃতি নামে সিন্দাবাদের ভূতের মতো আমাদের ঘাড়ে চেপে বসে এবং সেই ভূতের বোঝা আজও আমাদের অনেকের ঘাড় থেকেই নামতে পারেনি।
ঔপনিবেশিক আমলে বর্ণহিন্দুর সংস্কৃতি এই যে এভাবে আত্মপ্রতিষ্ঠা অর্জন করল, তা কিন্তু কলকাতার বাবুদের ওপর দীর্ঘস্থায়ী এক ছাপ ফেলল এবং এই সংস্কৃতি কখনও অখণ্ড ভারত আবার কখনও দেশপ্রেম ও জাতীয়তার সাথে একাত্ম হয়ে গেল। বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শুরু করে শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ সবাই কমবেশি বাঙালিত্ব ও ভারতীয়তাকে হিন্দুত্বের সাথে এইভাবে গুলিয়ে ফেলেছিলেন। এ দেশে ইংরেজদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এখানে তাদের প্রধান সহযোগী ছিল কলকাতার বর্ণহিন্দুরা, যারা ইংরেজি শিক্ষার মানদণ্ডে ও ঔপনিবেশিক শক্তির কলাবরেটর হিসেবে ভদ্রলোক হিসেবে পরিচিত হলো। এই ভদ্রলোকরা বিশ্বাস করতে শুরু করল, এখন থেকে তারাই বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও রাজনীতির জগতে আধিপত্য কায়েম করবে। এক পা শহরে, আরেক পা গ্রামে রাখা এই শ্রেণি পশ্চিমের ‘মডার্ন’-এর কিছুটা অনুগামী হলো ঠিকই, কিন্তু হিন্দু ভাবাদর্শ ও প্রাচীন ভারতের উজ্জীবনের স্বপ্ন তাদেরকে মাতিয়ে রাখল আরও বেশি। এইভাবে উনিশ শতকী ভদ্রলোকের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রচেষ্টাসমূহ নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ভেতর দিয়ে হিন্দু জাতীয়তাবাদের পথ ঘুরে সাম্প্রদায়িকতায় এসে পৌঁছায়। এসব কথা আজকাল অনেক রাজনীতি নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক স্বীকার করছেন; বিশেষ করে সম্প্রতি প্রকাশিত জয়া চট্টোপাধ্যায়ের 'বেঙ্গল ডিভাইডেড' নামক ক্যাম্ব্রিজের গবেষণা সন্দর্ভে এর একটা তথ্যভিত্তিক চিত্র পাওয়া যায়। জয়া চট্টোপাধ্যায় দেখিয়েছেন- বঙ্গভঙ্গের রাজনীতির ভেতর দিয়ে কীভাবে কলকাতার ভদ্রলোক শ্রেণি সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদকে আলিঙ্গন করে নিয়েছিল। কলকাতার বাবু ভদ্রলোকদের মধ্যে সেই যে মৌলবাদের বীজ ঢুকে পড়েছিল, তার হাত থেকে বাবুরা কিন্তু আজও রেহাই পাননি; বরং ভারতের রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র পরিচয়ের আড়ালে সক্রিয় হিন্দুত্ববাদী ধ্যানধারণাকে শুধু দিল্লিকেন্দ্রিক কংগ্রেস বা বিজেপির নেতা ও চিন্তকরা প্রশ্রয় দেননি, কলকাতার প্রগতিশীল বাম রাজনীতিবিদ ও তাত্ত্বিকরাও এদিক দিয়ে মোটেই পিছিয়ে থাকেননি। কয়েক দশকের বাম রাজনীতিও বাবুদের হিন্দুত্বের বোধ ও মননে ফাটল ধরাতে পারেনি বলেই মনে হয়। অন্যথা সাম্প্রদায়িকতার বিপক্ষে এত তর্জন-গর্জন করার পরও কলকাতার হিন্দুপাড়ায় মুসলমানদের বাড়ি ভাড়া না দেওয়া এখনও অলিখিত রীতি রয়ে যায় কী করে- যাকে আর যাই হোক উদার অসাম্প্রদায়িকতাপ্রসূত কোনো মানবিক বিবেচনা বলা যাবে না।
সেই গত শতকের প্রথম দিকে যখন সোভিয়েত দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সমুপস্থিত হয়, তখন প্রায় সমসাময়িক কালেই এর ঢেউ এসে ভারতে আঘাত হানে। কিন্তু ভারতের- বিশেষ করে বাংলার কমিউনিস্ট নেতা, চিন্তক ও বুদ্ধিজীবীরা সেদিন কতটুকু সেক্যুলার হতে পেরেছিলেন, তাদের সাংস্কৃতিক ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ভেদজ্ঞান কতটুকু স্পষ্ট হতে পেরেছিল, তা নিয়ে কিন্তু বরাবর একটা সংশয়ের কুয়াশা ঝুলেই আছে। কমরেড মোজাফফর আহমদ বা এম. এন. রায়ের মতো দুই-একজন রাজনৈতিক মনীষী ও বুদ্ধিজীবীর ব্যতিক্রমী উপস্থিতি বাদ দিলে গত শতাব্দীর বাম বুদ্ধিজীবিতার প্রবণতা খেয়াল করলে হতাশ হতে হয়। লক্ষ করার ব্যাপার হলো- বাংলায় পুরো শতাব্দীর বাম রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব এসেছে অনুশীলন ও যুগান্তর গোষ্ঠীর দলছুট কর্মীদের ভেতর থেকে। গত শতকের বিশ আর ত্রিশের দশকের সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়লে এরাই পরবর্তীকালে মুখোশ পরিবর্তন করে কমিউনিস্ট অবতারে পরিণত হয় এবং এমনি করে ঋষি বঙ্কিম ও অরবিন্দের সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী ঐতিহ্যকে বাংলার কমিউনিস্ট নেতৃত্ব আত্মস্থ করে নেয়। বাইরে নিম্নবর্গের মানুষ আর প্রলেতারিয়েত শ্রেণির জন্য অশ্রু ভেজালেও ভেতরে ভেতরে কলকাতার বাবু সংস্কৃতির পূজা করতে তাদের এতটুকু বাধেনি। গীতা আর মার্ক্স তারা একই সাথে চর্চা করেছেন এবং সংগোপনে সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিকে তারা এমনভাবে লালন করে এসেছেন যে, কলকাতার বাবু বুদ্ধিজীবীদের মতোই এই বাম বুদ্ধিজীবীরাও বাঙালি মুসলমানদের এক আধিপত্যবাদী চোখ দিয়ে দেখতেই অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। লক্ষ করুন, কলকাতার বাবু সংস্কৃতির মতোই এই বাম বুদ্ধিজীবীতাও অখণ্ড ভারতের স্বপ্নে আজও বিভোর হয়ে আছে এবং এই অখণ্ড ভারত এক বিপজ্জনক ধারণা- যা শুধু কাল্পনিকই নয়; সাম্প্রদায়িক ও আধিপত্যবাদীও বটে। এ ধারণা বরাবরের মতো আজও উপমহাদেশের স্থিতিশীলতা ও সহাবস্থানের সংস্কৃতির জন্য হুমকিস্বরূপ।
কলকাতার বাম রাজনীতিবিদ ও সংস্কৃতিসেবীরা দীর্ঘদিন যে অরবিন্দ-বঙ্কিমের আদর্শকে সংগোপনে লালন করে এসেছেন, তার প্রভাব আমাদের এ পূর্ব বাংলায়ও কিছুটা পড়েছে বলে মনে হয়। কলকাতার বাবু কমিউনিস্টরা গোপনে গোপনে বঙ্কিম-অরবিন্দের পথ নিলেও এখানকার বাঙালি মুসলমানের ঘরে জন্ম নেওয়া কমিউনিস্টরা ঠিক তার উলটো পথে হাঁটতে শুরু করেছেন এবং পিতা-প্রপিতামহের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর ঠিকানা ছেড়ে-ছুঁড়ে কলকাতাকে আদর্শ বিচারের কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে ফেলেছেন। কলোনির যুগে বাঙালি হিন্দুর তুলনায় শিক্ষাদীক্ষা, অর্থনীতি আর সংস্কৃতি বিকাশের ক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমান পিছিয়ে থাকার কারণে তাদের মধ্যে একটা হীনম্মন্যতা কাজ করেছে এবং সেই হীনম্মন্যতা হেতু বাঙালি মুসলমানের কেউ কেউ বাঙালি বলতেই কলকাতার বর্ণহিন্দুর সংস্কৃতির দিকে লোভাতুর দৃষ্টি মেলে ধরেছেন। বাঙালি সংস্কৃতি বলতে এরা কলকাতার বাবুদের সংস্কৃতিকে সজ্ঞানে কিংবা অবচেতনভাবে আত্মস্থ করে ফেলেছেন। এ কারণেই এখানকার কমিউনিস্টদের মধ্যে একটা প্রবণতা দেখি, প্রলেতারিয়েত মার্কসের চর্চার চেয়ে ফিউডাল রবীন্দ্রনাথ চর্চার ব্যাপারে তাদের আগ্রহ বড্ড রকম বেশি। এই অতি আগ্রহই বলে দেয়- তাদের উদ্দেশ্যের উৎসমুখটা কোথায়? এখানকার বাম তাত্ত্বিক, লেখক ও সংস্কৃতিসেবীরা গত কয়েক দশক ধরে এ দেশের মানুষকে দিয়ে যে পরিমাণ রবীন্দ্রচর্চা করিয়েছেন, তা বোধ হয় পুরো ভারতবর্ষেও এ যাবৎকালের ইতিহাসে সম্ভব হয়নি। এদের কাছে কমিউনিস্ট এজেন্ডার চেয়ে কলকাতার এজেন্ডা যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ, তা বলাই বাহুল্য।
এটা সত্য, আজ বাঙালি মুসলমানের গণজীবনে বাম রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রভাব নিতান্তই তাৎপর্যহীন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এরা এখানকার ছাত্র ও বিদ্বৎসমাজের মধ্যে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছে; বিশেষ করে এখানকার সংস্কৃতির উৎসমুখগুলো চিহ্নিত করে তাতে ভাঙ্গন ধরানোর সবরকমের কারসাজি তারা করেছে। তারা এক ধরনের অবিশ্বাসের সংস্কৃতি ছড়িয়েছে, বিশেষ করে বাঙালি সংস্কৃতির নামে কলকাতামুখীনতার সুড়সুড়ি দিয়েছে এরাই। লক্ষ্যণীয়, এদের এই পাতা ফাঁদে এখানকার কেউ কেউ পা দিয়েও বসেছেন। এদেশে ইসলামবিরোধী মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটিয়েছে এরা এবং এটিকে নানা কৌশল ও প্রক্রিয়ায় সমাজের কোনো কোনো পদস্থ ব্যক্তি নিরাপত্তার ছায়া দিয়ে রেখেছেন। বাংলাদেশের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা পাড়তে গেলেই এসব অবিশ্বাসী সাহিত্যব্রতীরা প্রচার করে বেড়ান, বাংলার মুসলমানরা কখনও দেশকে ভালোবাসতে পারল না। এদের মন-মানস আজও ইরান-আরবমুখী হয়ে আছে, অতীতচারিতা তাদের মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। যুক্তি প্রয়োগের কৌশলটি লক্ষ করুন। এই মুসলমানই যদি পরমুহূর্তে কলকাতার বাবু সংস্কৃতিকে নির্বিচারে গ্রহণ করতেন, তবে তারা একদিনেই স্বদেশপ্রেমিক হয়ে যেতেন। অথবা এরা ইসলাম ছেড়ে দিয়ে অন্য কোনো মতাদর্শ (পাশ্চাত্য কিংবা সমাজতান্ত্রিক) গ্রহণ করতেন, তবে তারা হয়ে যেতেন প্রগতিশীল। অবশ্য গোলমালটা এখানেই। মুসলমানের কাছে পরম আদর্শ ইসলাম, যেকোনো আদর্শ ও নীতির চেয়ে এটি তার কাছে অধিক প্রয়োজনীয়। কিন্তু ইসলামের সারবান আদর্শ তার বিশিষ্ট মূল্যবোধের আওতায় দেশকেও ভালোবাসতে শেখায়। নিজের দেশকে ঘৃণা বা এর জনসাধারণকে তাচ্ছিল্যের সাথে দেখা ইসলামের নীতিবিরুদ্ধ। এই জন্যই দেখি- ঔপনিবেশিক শাসনের প্রথম দিকে বাঙালি মুসলমানরা কলোনির প্রভু ও তার এ দেশীয় বরকন্দাজদের বিরুদ্ধে নিরন্তর জিহাদে জড়িয়ে পড়েছেন। দেশের জন্য, ধর্মের জন্য অকাতরে জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন, তারাই প্রকৃত অর্থে স্বদেশগতপ্রাণ। আর এ দিকে বাঙালি হিন্দুরা তখন কী করছেন? কলোনির প্রভুদের সহযোগী হিসেবে এসব জানবাজ দেশপ্রেমিক মুসলমানদের কষে গালমন্দ আর নিন্দা করছেন, আর তাদেরই মতো করে ইংরেজি উচ্চারণে এদেরকে অভিযুক্ত করে বলছেন Raiders, Marauders, Fanatic কখনও Terrorist.
আগেই বলেছি, সাম্রাজ্যবাদকে স্থায়িত্ব দেওয়ার জন্য কলকাতার বাবু সংস্কৃতির উত্থান ঘটানো হয়েছিল। সংগত কারণে সাম্রাজ্যবাদের ইন্ধনেই সেদিন মুসলমানদের ইমেজ খাটো করার জন্য এসব ইংরেজের অর্থভোগী সংস্কৃতিসেবীরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে দেশপ্রেমহীনতার অভিযোগ আনে। আজ এতদিন পর নিরপেক্ষ অন্তর দিয়ে বিশ্লেষণ করার সময় এসেছে- কারা দেশপ্রেমিক আর কারা দেশদ্রোহী। বাবু সংস্কৃতির এ দেশীয় উত্তরাধিকারীরা কলোনির প্রভুদের সেই সিলসিলা আজও বহন করে চলেছেন এবং প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে এ দেশের স্বাতন্ত্র্যকামী মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের সেই 'প্রিয় ভাষণটি' উচ্চারণে দ্বিধা করেন না।
বাঙালি মুসলমানদের বিরুদ্ধে আরবমুখীনতা কিংবা অতীতচারিতার অভিযোগও আনা হয়ে থাকে। বাঙালি মুসলমানের মন যে কিছুটা আরব অভিমুখী হবে- এ তো খুবই স্বাভাবিক। কারণ, মুসলমানের আদর্শ ইসলাম অভিমুখী আর ইসলামের বিকাশ আরবদেশেই। সেখানেই ইসলামের নবির স্মৃতি জড়িয়ে আছে, আর আছে ইসলামের পূণ্য-পবিত্র স্থানগুলো। বাঙালি মুসলমানের মানসভূমিতে তাই যেমন দেখতে পাই নারিকেল, সুপারি, কোকিল, শালিক, ডাহুকের ছড়াছড়ি তেমনি মরুদ্যান, লু-হাওয়া, আখরোট, খুবানি বনের মৃদুমন্দ হাওয়া। এ দুটোকেই পাশাপাশি রাখা চাই এবং এতে কোনো দোষ নেই। নারিকেল-সুপারি হচ্ছে আমাদের বাস্তবজীবনের প্রতিধ্বনি; লু-হাওয়া, আখরোট, খুবানি বন হচ্ছে আমাদের মানসিক ঐতিহ্যের কলস্বর। এর মধ্যে অতীতে ফিরে যাওয়ার কী থাকতে পারে? আমরা যখন ইসলামি সমাজের কথা বলি, তখন কিন্তু আমরা অতীতে প্রত্যাবর্তন করি না। ইসলামের আদর্শ ও সম্ভাবনার কথা বর্তমানের প্রেক্ষিতে চিন্তা করে ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা করার কথা ভাবি মাত্র। অথচ এটিকেই নানা রকম বাকচাতুর্যের আড়ালে বলা হচ্ছে অতীতে প্রত্যাবর্তনের চেষ্টা। এটা যদি সেরকমই হয়, তাহলে পুরো ভারতজুড়ে আজ যে রামরাজত্বের কথা শোনা যাচ্ছে- সেটাকে আমরা কী বলব? অথবা রামজন্মভূমিকে কেন্দ্র করে অযোধ্যার বাবরি মসজিদ উড়িয়ে দেওয়ার যে ভয়ানক মানবতাবিরোধী ট্র্যাজেডি সংঘটিত হয়েছে, তা কি ভারতের মৌলবাদী হিন্দুদের চূড়ান্ত অতীত মানসিকতার ইঙ্গিত দেয় না?
রবীন্দ্রনাথ শান্তি নিকেতনে প্রাচীন ভারতের আদর্শে তপোবন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র 'আনন্দমঠ' উপন্যাসে আর্য ভারতের আদর্শ তুলে ধরেছেন। জওহরলাল নেহরু তার Discovery of India বইতে প্রাচীনকালের অনুসরণে পুরো ভারতব্যাপী হিন্দু সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার মানসিক অনুভূতির কথা প্রকাশ করেছেন। আর অতি সাম্প্রতিককালের সুদূর ত্রিনিদাদের অভিবাসী সন্তানের পুত্র হিন্দু ধর্মানুসারী ভি. এস. নাইপল তার নানা রকম উপন্যাস ও লেখালিখিতে প্রাচীন হিন্দু আদর্শের স্বপ্নের কথা তুলে ধরেছেন। অতীতচারিতার অভিযোগ কি এসব ক্ষেত্রে যথার্থভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে? আরেকটা উদাহরণ দিচ্ছি। এ দেশের কমিউনিস্টরা সুদূর ল্যাটিন আমেরিকার চে গুয়েভারার বিপ্লব, যুদ্ধ ও সংগ্রামের কথা স্মরণ করে যে রকম মানসিক শক্তি অনুভব করেন কিংবা মার্কস, লেনিন ও মাওসেতুঙের নানা রকম বিপ্লবী প্রচেষ্টা ও কর্মতৎপরতাকে যেরকম শ্রদ্ধা ও প্রেরণার মর্মমূল হিসেবে নিজেদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানিয়ে নিয়েছেন, তাকে কি আমরা দেশজ বলতে পারি? এক্ষেত্রে কোনো দেশপ্রেমহীনতার অভিযোগ এসেছে বলে কখনও শুনিনি। বোধ হয় একালে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা সহজ এবং অভিযোগকারীরাও বুঝতে পেরেছে, মুসলমানদের তরফ থেকে প্রতিবাদ আসার সম্ভাবনা একেবারেই কম। সুতরাং যত ইচ্ছে তাদের চরিত্র হনন করে যাও।
বাঙালি সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদ সেই উনিশ শতকের কাল থেকেই সাম্রাজ্যবাদের প্রশ্রয়ে মুসলমানের সংস্কৃতি হননের ক্রিয়াকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছে এবং এখন সাম্রাজ্যবাদের বিদায়ের পর বাঙালি সংস্কৃতি ভারতীয় আধিপত্যকামী হিন্দু মানসিকতার সাথে লগ্ন হয়ে বাঙালি মুসলমানের আইডেন্টিটি আর শিকড় নির্মূলের মহোৎসবে মেতে উঠেছে। লক্ষ করুন, গত কয়েক দশকের রাজনীতি ও সংস্কৃতি চর্চার মধ্যে বাঙালি আছে, ইসলাম নেই। বাঙালিরা যে মুসলমানও বটে, সে কথাটা বাঙালি সংস্কৃতি স্বীকার করে না। প্রকারান্তরে বাঙালি সংস্কৃতির মানেটা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে- ইতিহাসে একটি জাতির মন, মনন, রাজনৈতিক চেতনা বিচারের প্রশ্নে ইসলামকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা। গত শতকের সত্তর দশকের শুরুতে বাঙালি সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদের তীব্র দাপটের কাল থেকে ইসলাম বর্জন শুরু হয়েছে এবং আমাদের বুদ্ধিজীবীতার ইতিহাসে ইসলামের স্বীকৃতি অনেকখানি এখন গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। এসব বুদ্ধিজীবীদের কাছে ভাষার গুরুত্বটা মূখ্য; ইসলাম গৌণ। তার মানে এদের কাছে জাতি বিচারের প্রশ্নে ইসলামের ভূমিকাটা শিথিল হয়ে পড়ছে। এই ভাষার দাবির পেছনে মস্ত একটা ফাঁক আছে। ভাষার নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে এরা মূলত কলকাতার বাবু সংস্কৃতিরই পূজা করছে। বাঙালি সংস্কৃতির এ এক অদ্ভুত বৈপরীত্য, হিন্দু হিন্দু থাকতে পারবে, বৌদ্ধ বৌদ্ধ থাকতে পারবে, কিন্তু মুসলমান মুসলমান থাকতে পারবে না। মুসলমান বাঙালি হতে হলে তাকে ইসলাম ছাড়তে হবে। এ কারণেই দেখি এদেশে বাঙালিবাদীরা বাঙালিত্বের সন্ধান করেন ধর্মাশ্রিত বৌদ্ধ চর্যাপদ, দোঁহা ও হিন্দু পদাবলির মধ্যে। কিন্তু মুসলমানের পুঁথি ও কাহিনির মধ্যে তারা সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ পেয়ে আঁতকে ওঠেন। শ্রী চৈতন্যের আন্দোলনের মধ্যে তারা বাঙালি সংস্কৃতির সমন্বয়মূলক বৈশিষ্ট্য খুঁজে ফেরেন; অথচ শাহজালাল-খানজাহানের মধ্যে তারা তখন কিছু দেখতে পান না। বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণের মধ্যেও তারা বাঙালিত্বের অভিনব আর চমৎকার সব ছবি দেখে সম্মোহিত হয়ে ওঠেন, অথচ সেদিনের হাজি শরিয়তুল্লাহ, তিতুমীর, ফকির মজনু শাহ প্রমুখকে বাঙালি ডাকতে এদের দ্বিধার অন্ত নেই। এই বিভেদ-বিভাজন বাঙালি সংস্কৃতির দ্যোতক, এই বিচ্ছেদের বীজ বপন করে এরা বাঙালি মুসলমানকে তার সাংস্কৃতিক চৈতন্য থেকে এবং ইসলামের মূল্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে চায়। এই বিচ্ছেদ- বিভাজনের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আজ তাই সমবেত প্রচেষ্টা ও যৌথ উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
📄 সংস্কৃতির বিভাজন
দেশকে মা বলার রীতি ইসলামে নেই। তার ওপর দেশকে দেবী বলে বন্দনা করার তো কোনো প্রশ্নই আসে না। ইংরেজিতে মাদারল্যান্ড বলে যে কথাটা আছে, তার বাংলা এখন মাতৃভূমি। কিন্তু এই মাতৃভূমি মাতৃদেবীর মতোন নয়; অনেকটা জন্মভূমির মতোন। পিতৃভূমির অর্থও তাই। মাতৃভূমি, জন্মভূমি, পিতৃভূমি কোনোটিই পূজোর সেন্স বহন করে না। এমন যে তেত্রিশ কোটি দেব-দেবীর হিন্দু ধর্ম তাদের শাস্ত্রেও সরাসরি দেশকে সাকাররূপে পূজার কথা বলা হয়নি। হিন্দুশাস্ত্রে জননী ও জন্মভূমিকে স্বর্গাদপি গরিয়সি বলা হয়েছিল। দেশকে প্রতিমা বানিয়ে পূজা করতে হবে- এই ধারণা চালু হয় স্বদেশী আন্দোলনের কালে। বাংলা মা, বঙ্গমাতা, ভারতমাতা এসব শব্দ বাংলা ভাষায় তখন থেকেই চালু হয়েছে। বঙ্গমাতা, ভারতমাতা এসব কি এক-একটা দেবী বা মানবী? যে ধর্মে তেত্রিশ কোটি দেব-দেবীর ছড়াছড়ি, তাদের জন্য নতুন একটা দেবীর মাহাত্ম্য বর্ণনা খারাপ লাগেনি। হিন্দুরা ধর্ম বলতে দেব-দেবীকেই বোঝে। তাই দেশ হলো নতুন দেবী। এই দেবীর মাহাত্ম্য প্রচার করা চাই। স্বদেশী আন্দোলনের কর্তা ব্যক্তিরা এই কথাটা জনগণকে ভালো করে বুঝিয়ে দিলেন।
প্রত্যেকটা আন্দোলনের বা ঘটনার পেছনে সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মনৈতিক যেমন কারণ থাকে, তেমনি থাকে তাত্ত্বিক কারণ। যা না থাকলে আন্দোলনের জন্য, বিপ্লবের জন্য মানসিক প্রস্তুতি তৈরি হয় না। এই প্রস্তুতি ছাড়া যে আন্দোলন হয় তার নিয়তি মন্দ হয়। ফরাসি বিপ্লবের অনেক কারণ ছিল। এর মধ্যে বিপ্লবপূর্ব মনীষী ভলটেয়ার, রুশো, মন্টেস্কু, দিদেরা প্রমুখের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এদের লেখালিখি বিপ্লবের জন্য মানুষের মন প্রস্তুত করেছিল। ফরাসি বিপ্লবের সাথে প্রকৃতিগতভাবে স্বদেশী আন্দোলনের কোনো তুলনা হয় না। একটি মাত্র ব্যতিক্রম ছাড়া। ফরাসি বিপ্লবের মতো এখানেও ছিল তাত্ত্বিক কারণ, এখানকার হিন্দুদের একধরনের মানসিক প্রস্তুতি। ওখানে ভলটেয়ার যা করেছেন, এখানে বঙ্কিমচন্দ্র সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। বঙ্কিমচন্দ্র 'আনন্দমঠ' লিখে পুরো হিন্দু জাতির রিভাইভাল এনে দিয়েছিলেন। বঙ্কিমের পরে এই রিভাইভালের পতাকা উঁচিয়ে ধরেছিলেন শ্রী অরবিন্দ, কতকক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ। একটি বই যে একটি জাতির জীবনকে এতখানি ঘুরিয়ে দিতে পারে- 'আনন্দমঠ' তার বড়ো প্রমাণ।
এ বই যখন লেখা হয়েছিল, তখন ছিল ইংরেজের শাসন। ইংরেজ হিন্দুকেও পরাধীন করেছিল, মুসলমানকেও পরাধীন করেছিল, কিন্তু 'আনন্দমঠ' পাঠ করলে মনে হবে- যত শয়তানির গোড়া মুসলমান। সুতরাং মুসলমানদের যুদ্ধে হারিয়ে দিয়ে হিন্দু রাজত্ব পুনপ্রতিষ্ঠা করাই হচ্ছে মাতৃদেবীর সন্তানদের একমাত্র লক্ষ্য। বঙ্কিমচন্দ্রের মতো সেকালের অনেক হিন্দু মনীষীই মুসলমানদের চেয়ে ইংরেজকেই মিত্র মনে করতেন। দেশকে দেবী বানিয়ে প্রতিমা গড়ে পূজা করার এই চিন্তা-ভাবনা একান্তই বঙ্কিমের নিজস্ব। বন্দে মাতরম সংগীতে আছে- ‘ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণ ধারিণী, কমলা কমল দল বিহারিণী, বাণী বিদ্যাদায়িনী ণমামি ত্বাং।’ তার মানে মা দুর্গা, মা লক্ষ্মী, মা সরস্বতী হচ্ছে বঙ্গমাতা। আনন্দমঠের মধ্যে মা জগদ্ধাত্রী ও মা কালীর কথাও আছে। দেশ যেহেতু মুসলমানদের কারণে ধ্বংসপ্রায়, সুতরাং দেশকে উদ্ধারের জন্য মাতৃদেবীর সন্তানরা আগে তাকে পুজো দিয়ে, অর্ঘ্য দিয়ে দেশোদ্ধারে নামতে চান। আনন্দমঠের নিত্যানন্দ, ভবানন্দ, জীবনানন্দ, জ্ঞানানন্দ ও ধীরানন্দকে দিয়ে এই পুনরুজ্জীবিত হিন্দু ধর্মের মার্টায়ার বিগ্রেড (Martyr Brigade) তৈরি হয়েছে।
বঙ্কিম যে বীজ বুনলেন, তার ফল তুললেন স্বদেশী কর্মীরা, বঙ্কিম যে আগুন জ্বালালেন, তাতে ঘৃতাহুতি দিলেন স্বদেশী সন্তানরা। বঙ্কিমের জীবদ্দশায় তার বন্দে মাতরম সংগীতে সুরারোপ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। স্বদেশী আন্দোলনের সময় রবীন্দ্রনাথ কয়েকটি গান লিখেন। বঙ্কিম যেমন করে তার বন্দে মাতরম সংগীতে এবং আনন্দমঠ উপন্যাসে দেশকে প্রতিমা বানিয়ে পূজার কথা বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের এসব গানেও তারই প্রভাব দেখা যায়। এ সময় লেখা তার 'আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে', 'আমরা মিলেছি আজ মায়ের ডাকে', 'যে তোমার ছাড়ে ছাড়ুক', 'সার্থক জনম আমার' প্রভৃতি গানে মা-এর ছড়াছড়ি। এই মা একদিকে বঙ্গমাতা, অপরদিকে মা দুর্গা। এর মানে হচ্ছে মা দুর্গা একদিকে দেশের প্রকৃতির রূপ ধরে প্রকাশিত হন, অন্যদিকে সাকার রুপে তার পূজাও চলে।
বঙ্কিম এখন এক লিজেন্ড। তার ভাবানুসারী স্বদেশী বাহিনীর আত্মত্যাগও হিন্দু ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক অবিসংবাদিত ঘটনা। বিনয়, বাদল, দীনেশ, ক্ষুদিরাম, সূর্যসেনদের আত্মত্যাগের কাহিনিকে ছোটো করে দেখার কিছুই নেই। কিন্তু তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া হয়, তাদের অনুসৃত পথেই ব্রিটিশকে হটিয়ে দিয়ে ভারত স্বাধীন হতো, তবে তো সেটা হতো আনন্দমঠের সন্যাসীদের অভীষ্ট সাম্প্রদায়িক হিন্দু রাষ্ট্র। সেখানে কি আদৌ কোনো মুসলমানের স্থান সম্ভব ছিল? আর সম্ভব হলেও সে মুসলমানকে অবশ্যই সকাল-বিকাল বন্দে মাতরম ধ্বনি দিতে হতো। এভাবেই সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের রূপান্তর ঘটল সাম্প্রদায়িকতার সম্রাটরূপে।
মুসলমানরা আপসহীন তৌহিদবাদী। একেশ্বরবাদ তাদের ধর্মের মূল কথা। আল্লাহ ছাড়া কাউকে কুর্নিশ করা তাদের ধর্মবিরুদ্ধ। সেই মুসলমান কী করে মা দুর্গা, মা লক্ষী, মা সরস্বতী, মা জগদ্ধাত্রী, মা কালী, ভারতমাতা, বঙ্গমাতা প্রভৃতির বন্দনা করবে? অসম্ভব। এই অসম্ভব সম্ভব হয়নি বলেই ভারতের ইতিহাসে দ্বিজাতিতত্ত্বের উদ্ভব। সেই চাপে মারা যায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ, একই সাথে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ। ইতিহাসে দুটি জাতীয়তাবাদই আমরা দেখি- একটি হিন্দু জাতীয়তাবাদ, অপরটি মুসলিম জাতীয়তাবাদ। সমন্বয়ী বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সমন্বয়ী ভারতীয় জাতীয়তাবাদ কোনো কোনো বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদদের ইউটোপিয়ান ভাবনা-চিন্তা মাত্র।
উনিশ শতকে কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু জাগরণের সাথে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের কোনো সংশ্রব ছিল না। সেকালের বড়ো বড়ো হিন্দু মনীষী ও বুদ্ধিজীবীরা মুসলমানকে সাথে নিয়ে দেশোদ্ধারের কথা ভাবেননি। বঙ্কিমচন্দ্র তো মুসলমানদের কষে গাল দিয়েছেন। মুসলমানরাই যে সব নষ্টের গোড়া এ কথা বলতেও তিনি দ্বিধান্বিত হননি। বঙ্কিমচন্দ্রের বাঙালি জাতীয়তাবাদ ছিল একই সাথে তার হিন্দু জাতীয়তাবাদ চিন্তার সমার্থক। তিনি যেসব তত্ত্ব প্রচার করেছেন, সেসব মুসলমানের জন্য তো নয়ই। নিম্নবর্ণের হিন্দু, ব্রাহ্ম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কারও জন্যই নয়। তার উপন্যাসে শিল্প ছাড়িয়ে মাথা তুলেছে রাজনৈতিক বিশ্বাস। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাই বড়ো শিল্পী হয়েও একই সাথে ধর্মান্ধ ও মতান্ধ।
বঙ্গভঙ্গের সময় হিন্দু নেতা ও বুদ্ধিজীবীরা বাঙালি জাতি ভাগ হয়ে যাচ্ছে বলে আক্ষেপ করেছিলেন। দ্বিতীয়বার ৪৭ সালে বঙ্গভঙ্গের সময় তাদের বিষাদ পরিণত হয় উল্লাসে। ইতিহাসের দুটি ক্ষণে অথচ একই ঘটনায় এই বিষাদ ও উল্লাসের তাৎপর্য কী? হিন্দু সমাজনেতা ও বুদ্ধিজীবীরা উভয় স্থানেই নিজেদের স্বার্থবুদ্ধির দ্বারা তাড়িত হয়েছিলেন। নেশন কথাটা তারা ব্যবহার করেছিলেন নিজেদের রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই। নেশনের স্বার্থ বলতে তারা হিন্দুর স্বার্থকেই বুঝেছেন। ধর্ম নির্বিশেষে সকলের স্বার্থকে তারা বিবেচনা করেননি। দ্বিজাতিতত্ত্ব একদিনে আসেনি। জিন্নাহ সাহেবের অনেক আগেই দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত প্রস্তুত হয়েছিল। বঙ্কিমের, শ্রী অরবিন্দের, স্বামী দয়ানন্দের ভাবানুসারীরা সে কাজটা আগেই সুসম্পন্ন করে রেখেছিলেন। জিন্নাহ সাহেব শুধু রিঅ্যাক্ট করেছিলেন। ক্রিয়া থাকলেই প্রতিক্রিয়া হয়। একজাতিতত্ত্বের বদলে দ্বিজাতিতত্ত্বের কথা বলেছিলেন তিনি। হিন্দুর বাঁচার অধিকার থাকলে মুসলমানেরও বাঁচার অধিকার থাকবে এই দাবি তিনি করেছিলেন। এতে আর অন্যায় কী? বিচার করে দেখলে তাকেই বেশি ডেমোক্রাট মনে হয়। অন্যরা তার সামনে টেকে না। এমনকি গান্ধীও না, নেহেরুও না।
পাকিস্তান ভেঙে যখন বাংলাদেশ বের হয়ে আসে, তখন এখানকার সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীরা কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের সাথে গলা মিলিয়ে বলতে শুরু করেন দ্বিজাতিতত্ত্ব একটা ভুল হিসাব ছিল। বাংলাদেশ হওয়ার ভেতর দিয়ে সেই ভুলটি ইতিহাস সংশোধন করার চেষ্টা করেছে। দ্বিজাতিতত্ত্ব যদি ভুল হিসাব হয়, তাহলে সেই হিসেবের দায় থেকে বঙ্কিম রেহাই পান না। রবীন্দ্রনাথ রেহাই পান না। রেহাই পাননা কংগ্রেসের সব বড়ো বড়ো জাদরেল নেতারা। ভুলের একপ্রান্তে যদি থাকে মুসলিম লীগ, তবে আরেক প্রান্তে আছে কংগ্রেস। একজাতিত্ত্ব ছিল বলেই দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারণা এসেছে- আমরা যেন সে কথা ভুলে না যাই।
এখানে যারা সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত, নিজেদের যারা মুসলমানের চেয়ে বাঙালি পরিচয়ে তুলে ধরতে বেশি উৎসাহী, তাদের দুর্ভাগ্য তাদের বাঙালিত্বও কিন্তু অর্জিত হয়েছে পাকিস্তান হওয়ার পর। একজাতিতত্ত্বের হিসেবে পাকিস্তান হওয়ার আগে মুসলমানরা বাঙালি ছিল না। উনিশ আর বিশ শতকের অনেক হিন্দু সমাজনেতা ও বুদ্ধিজীবীরাই মুসলমানকে বাঙালি বলে স্বীকার করতেন না। শরৎচন্দ্রের মতো মানবদরদী ঔপন্যাসিকও যখন লিখেন- 'স্কুলের মাঠে বাঙালি ও মুসলমানে ফুটবল খেলা চলিতেছে', তখন মুসলমানদের সম্পর্কে তার ও তার সমধর্মীদের অনুভূতি কী তা লুকোছাপা করে বলার অবকাশ থাকে না। পাকিস্তানের ২৩ বছর এবং বাংলাদেশ হওয়ার পর আজতক এখানকার মুসলমান বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদদের একাংশের অন্তঃপরিবর্তন হয়। এরা মুসলিম সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদকে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করেন। অনেক মোল্লা-মৌলবির ছেলেরাও হয়ে ওঠে সেক্যুলার। আবুল ফজল, মুনীর চৌধুরীর মতো সাহিত্যিকদের পিতারা ছিলেন রীতিমতো আলেম। কেমন করে এরাই হয়ে যায় মুক্তবুদ্ধির প্রবক্তা। মুক্তবুদ্ধি তো একপ্রকার ধর্মহীনতার শামিল। এমনকি যেসব সাহিত্যিক পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার নির্যাতনের মুখে এ পারে পাড়ি জমান, তাদের অনেকে এখানে এসে মুসলিম জাতীয়তাবোধের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা খুঁজতে শুরু করেন। তারা হয়ে উঠেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা। তারা ভুলে যান, মুসলিম জাতীয়তার ভিত্তিতেই তারা কিন্তু এখানে আসতে পারেন এবং বসতি গড়েন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিকে আশ্রয় করে তারা পশ্চিমবঙ্গে ঠিকানা গড়তে পারেননি। এদের একজন হচ্ছেন বদরুদ্দীন উমর। তিনি এখানে এসে একটা বই লিখেন, এর নাম 'সাম্প্রদায়িকতা'। ভাবতে অবাক লাগে, তার মতো শিক্ষিত ও জানাশোনা ব্যক্তি শুধু মুসলমানদের মধ্যেই সাম্প্রদায়িকতা খুঁজে পান। এই বিরাট ভারতবর্ষ জুড়ে কত রাজনৈতিক উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে দেশভাগের মতো প্রলয়ংকরী ঘটনা ঘটে গেল, সে কি শুধুই মুসলমানদের সাম্প্রদায়িকতার কারণে? এই একমার্গী চিন্তা-ভাবনাও এক ধরনের সাম্প্রদায়িকতা। বদরুদ্দীন উমর সাহেবের এ বই এখানকার সেক্যুলার বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের প্রীতির কারণ হলেও ইতিহাসের জন্য তা মোটেই সুখকর হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এককালে হিন্দুরা কৌতুক করে বলত 'মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়'। পাকিস্তান হওয়ার পর এই মক্কা বিশ্ববিদ্যালয় কেমন করে ধর্মনিরপেক্ষতার যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। মরহুম নওয়াব সলিমুল্লাহ বাহাদুর দরিদ্র মুসলমানদের এগিয়ে নেওয়ার জন্য এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিরাট ভূমিকা পালন করেন। এই দরিদ্র মুসলমানের ছেলে-পেলেরাই শিক্ষিত হয়ে কেউ কেউ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে ধর্মনিরপেক্ষতার সাধনা শুরু করেন। এখানকার কোনো কোনো শিক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি যায় পালটে। মোফাজ্জল হায়দার, মুনীর চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, রাশিদুল হাসান, আহমদ শরীফ, আবদুর রাজ্জাক। শেষের জন এদের সবার গুরু। যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সাম্প্রদায়িকতা থেকে বাঁচার জন্য মুসলমানরা দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারণার সমর্থক হয়, এক প্রজন্মের মধ্যে তাদের ছেলে-পেলেরাই কেউ কেউ মুসলিম সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদের কথা শুনে নাক সিটকান। এসব বুদ্ধিজীবীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে ছাত্রদের ধর্মনিরপেক্ষ করে তোলেন আর প্রচার করেন- তারা আগে বাঙালি, তারপরে মুসলমান। এইভাবে মুসলিম সংস্কৃতির ভিত দুর্বল হয়। এক প্রজন্ম আগে যে মুসলমানরা এই হিন্দু রিভাইভালের সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বুক পেতে দাঁড়িয়েছিল, এক প্রজন্ম পর তাদের ছেলে-পেলেরাই সেই হিন্দু রিভাইভালের চেতনাকে বুকে টেনে নিচ্ছে। ইতিহাস মাঝে মাঝে কৌতুকও করে!
এখানকার সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীরা ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে বোঝেন- ইসলাম বাদ দিয়ে অন্য সব ধর্মের স্বার্থ রক্ষা করা। আর সাম্প্রদায়িকতা বলতে বোঝেন- মুসলমানের স্বাধিকার ও স্বাতন্ত্র্যের অধিকার সংরক্ষণ করা। তাই রামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দ, বঙ্কিমচন্দ্র তাদের দৃষ্টিতে ধর্মনিরপেক্ষ কিন্তু মুসলমান মওলানা আকরম খাঁ, গোলাম মোস্তফা, ফররুখ আহমদ প্রমুখ তাদের হিসেবে সাম্প্রদায়িক হতে বাধ্য। সূর্য সেন, ক্ষুদিরাম স্বাধীনতা সংগ্রামী; তিতুমীর, হাজি শরিয়তুল্লাহ প্রতিক্রিয়াশীল।
ইংরেজের দুশো বছর ধরে বাঙালি মুসলমানরা তাদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষার জন্য লড়াই করেছে। ইংরেজ চলে যাওয়ার পর এদেরই একদল ইংরেজের লেখাপড়া নিয়ে স্বাতন্ত্র্যহীনতার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এর কারণ কী? ভৌগোলিক উপনিবেশ এখন আর তেমন নেই। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ অন্যভাবে টিকে আছে। এরা সৃষ্টি করেছে মনোজাগতিক উপনিবেশ। এটি আরও মারাত্মক। ভৌগোলিক উপনিবেশ চিহ্নিত করা যায়, মনোজাগতিক উপনিবেশ সহজে চেনা যায় না। সাম্রাজ্যবাদ তার নীতি ও দর্শন দিয়ে পুরোনো উপনিবেশগুলোর শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির একাংশকে বেঁধে ফেলেছে। এরা সাম্রাজ্যবাদের স্থানীয় প্রতিনিধি। এরাই একালের ক্লাইভ, বেন্টিংক। এদের ধর্ম সেক্যুলারিজম। এদের সংস্কৃতি এখানে আধুনিকতা-মানে পশ্চিমের খ্রিস্টান ও কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু সংস্কৃতির মিল-মিশাল দেওয়া এক মূল্যবোধ। ইসলাম এদের কাছে একান্তই গৌণ বিষয়। এই যে স্বাতন্ত্র্য থেকে স্বাতন্ত্র্যহীনতার দিকে যাত্রা, সংস্কৃতি থেকে সংস্কৃতিহীনতার দিকে পথ চলা- এটাই বোধ হয় একালের বাঙালি মুসলমানের সবচেয়ে বড়ো সংকট; এক অর্থে বিপর্যয়ও বলা যায়।
📄 সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা
রাজনৈতিক স্বাধীনতাপ্রাপ্তির অনেকদিন পার হয়ে গেলেও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রশ্নে আজতক আমাদের কোনো ফয়সালা হয়নি। এ কারণেই অনেকে মনে করেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতার ইপ্সিত ফল আমরা তেমন কিছু পাচ্ছি না। একটু গভীরভাবে মাথা খাটালেই বোঝা যাবে, এর কারণ হচ্ছে সাংস্কৃতিক পরাধীনতা। স্বাধীনতা কিংবা পরাধীনতার পুরোনো দিনের সংজ্ঞা এখন আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। স্বাধীনতা কিংবা পরাধীনতার ডাইমেনশনও এখন একমাত্রিকতার স্থলে বহুমাত্রিকতা অর্জন করেছে। স্বাধীনতা হরণ করতে হলে এখন পুরোনো দিনের কায়দায় সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দেশ দখল না করলেও চলে। সে সূত্রেই সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার মূল্য রাজনৈতিক স্বাধীনতার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। কারণ, এ দুটি ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা কোনোভাবেই কার্যকর হতে পারে না।
দুনিয়ার সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী শক্তিসমূহ তাদের পুরোনো অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝেছে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দেশ দখলে রাখার ঝুঁকি অনেক। এতে দখলদার শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধের সম্ভাবনা থাকে এবং সেই যুদ্ধ সামাল দেওয়া বেশ কঠিন। তাই তারা একালে নিজেদের আধিপত্যকে পাকাপোক্ত করতে এসব দেশে সামরিক উপনিবেশের বদলে মনোজাগতিক উপনিবেশ তৈরিতে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এসব উপনিবেশ সৃষ্টির উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশে দেশে একদল হীনম্মন্যতাবোধসম্পন্ন মানুষ সৃষ্টি করা- যাদের একমাত্র কাজ হচ্ছে নিজের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও জাতিসত্তাকে অস্বীকার করে আধিপত্যবাদী শক্তির চিন্তা-ভাবনা, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির পায়রাবী করা। স্বাধীনতা মানে জাতীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠা ও প্রসার। কিন্তু এই হীনম্মন্যতাবোধসম্পন্ন লোকগুলো জাতীয় সংস্কৃতির ভিতকে দুর্বল করে দেওয়ার জন্য অনুকরণ, শিকড়হীনতা এবং স্বদেশ ও স্বজাতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার প্রবণতা এমনভাবে সমাজের ভেতর ছড়িয়ে দেয় যে জাতীয় কৃষ্টি, দর্শন, ইতিহাস, ঐতিহ্য সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায়। কোনো দেশের সংস্কৃতিতে এরকম বেহাল অবস্থা সৃষ্টি করতে পারলে সেখানে অনায়াসে সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সহজ হয়। এ কারণে আধিপত্যবাদী শক্তি একালে দেশ দখলের বদনাম না নিয়ে প্রথমে অন্য সংস্কৃতির ভেতরে ঢুকে ধীরে ধীরে সেই সংস্কৃতির অন্তঃচরিত্র পরিবর্তন করে ফেলার চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী শক্তির ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করছে একদল বুদ্ধিজীবী, লেখক, সাহিত্যিক, রাজনীতিক ও সমাজের নানা শ্রেণি ও পেশায় কর্মরত বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা। এরাই সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের স্বার্থ রক্ষা করছে। সাম্রাজ্যবাদীরা এখন নিজেরা এসে জাকিয়ে না বসলেও চলছে। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জগতেও আজ চলছে অনুকারিতা ও হীনম্মন্যতার চর্চা এবং তার সুবাদে আমাদের সংস্কৃতির স্বরূপ নিয়ে একধরনের বিবাদ লাগিয়ে জাতিকে বিভক্ত করে রাখা হয়েছে।
মুসলিম সংস্কৃতি হচ্ছে একটা আদর্শমূলক সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতির গোড়ার কথা হচ্ছে- ইসলামি জীবন-দর্শন ও মানবতাবাদ। তাই ইসলামি সংস্কৃতির সাথে জাতি, দেশ, ভাষা ও বর্ণের ওপর ভিত্তি করে যেসব সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তার সাথে অনেক তফাত রয়েছে। আল কুরআনের নীতি ও মূল্যবোধ এবং হযরত রসুল সা.-এর জীবনব্যাপী সাধনার নমুনা হচ্ছে মুসলিম সংস্কৃতির ভিত্তি। সেই হিসেবে মুসলিম সংস্কৃতি হচ্ছে সর্বজনীন, দুনিয়ার তাবৎ মুসলমানই হচ্ছে এই সংস্কৃতির আওতাভুক্ত। ভাষা কিংবা ভূগোলের দূরত্বের কারণে খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-আশাক প্রভৃতির মধ্যে কিছু বৈসাদৃশ্য থাকতে পারে, কিন্তু মুসলিম সংস্কৃতির যে মৌলিক বৈশিষ্ট্য যেমন আল্লাহর একত্ব, নবি-রসুল, আখিরাত প্রভৃতিতে বিশ্বাস সবকিছুই অপরিবর্তিত থাকে। মুসলিম সংস্কৃতির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ভ্রাতৃত্ব। ইন্দোনেশিয়ার মুসলিম, বাংলাদেশের মুসলিম, চীনের মুসলিম, ইউরোপের মুসলিমের মধ্যে কোনো প্রভেদ নেই। তেমনি ইসলামের শিক্ষা হলো জন্ম, বংশ ও সামাজিক মর্যাদার কারণে কোনো ভেদজ্ঞান করা চলবে না। তবে অস্বীকার করা যাবে না মুসলিম সমাজের মধ্যে অনেক রকমের অনাচার ও পার্থক্য চেতনা ঢুকে পড়েছে। এটি সৃষ্টি হয়েছে আমাদের স্বার্থপরতার কারণে। এর সাথে ইসলামের সম্পর্ক নেই। সুতরাং এই আদর্শ ও মূল্যবোধ আশ্রিত সংস্কৃতি বিশ্বজুড়ে মুসলিম সংস্কৃতির একটি সেতুবন্ধন তৈরি করে। এই বন্ধনের নাম হচ্ছে মুসলিম উম্মাহ। বাংলাদেশের মুসলিম সংস্কৃতি হচ্ছে এই বিশ্বব্যাপী বন্ধনের একটি জোড়।
এই জোড় ভাঙার জন্য আমাদের এখানকার একদল হীনম্মন্যতাবোধসম্পন্ন মানুষ বাঙালি সংস্কৃতি নামক একপ্রকার মনগড়া, মূল্যবোধহীন সংস্কৃতির থিউরি আওড়ান। এরা বাংলাভাষী হিন্দু ও মুসলমানের যৌথ অবদানে গঠিত বাঙালি সংস্কৃতিকে আদর্শ বলে গ্রহণ করতে চান। এদের জাতীয়তার ভিত্তি বাংলা ভাষা। এ দৃষ্টিকোণ থেকে জাতি পরিচয় নির্ণয়ে তারা ইসলামের পরিবর্তে বাংলা, বাংলা ভাষা ও বাঙালিত্বের ওপর অগ্রাধিকার নেন। এটা করতে যেয়ে তারা প্রাক-মুসলিম কালের অমুসলিম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারকে নিজেদের বলে আত্মস্থ করে নেন। এ কারণেই তারা বলে থাকেন- তারা আগে বাঙালি, তারপরে মুসলমান। এইভাবে তাদের কাছে ইসলামের ভূমিকা নগণ্য হয়ে পড়ে; মূখ্য হয়ে যায় ভাষার ভূমিকা। এদের জাতিত্বের পক্ষে যুক্তি হলো- আমরা যেহেতু একই ভাষায় কথা বলি, একই রকম ভাত, ডাল, শাক, বেগুনভর্তা, পিঠাপুলি, পান-সুপারি খাই, আমাদের পোশাক-আশাকেও যেহেতু তেমন একটা পার্থক্য নেই, সুতরাং বাংলার হিন্দু-মুসলমান মিলে এক জাতি। তাদের এই সাংস্কৃতিক ঐক্য ১৯৪৭ সালে মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদী আন্দোলনের ফলে বিনষ্ট হয়ে গেছে।
কিন্তু তারা কখনও বলতে পারেননি- ১৯৭১ সালে যখন মুসলিম স্বাতন্ত্র্যকামীদের দূরবস্থা চলছে, চারিদিকে কেবল বাংলা ও বাঙালিত্বের জয়জয়কার, তখন কেন অখণ্ড-অবিভাজ্য বাংলা গড়ে উঠল না? তারা এটাও বলতে পারেন না, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দুরা কেন হিন্দুত্ব ও হিন্দু জাতীয়তাবাদের মোহ কাটিয়ে পূর্ববঙ্গের বাঙালিদের সাথে এসে মিলিত হলেন না? তাহলে দেখা যাচ্ছে- শুধু জাতিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য (Ethnicity) যেমন ভাষা ও খাদ্যাভ্যাস দিয়ে আমাদের এখানে জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠতে পারেনি, তেমনি দেখা যাচ্ছে- অমুসলিম প্রভাবিত বাংলাদেশের যে লোক-সংস্কৃতির ধারা, তা দিয়েও জাতীয়তাবাদ নির্মাণ করা যায়নি। এখানকার জাতীয়তাবাদের মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ধর্মে। সেটি ঐতিহাসিক কাল থেকেই হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতির মধ্যে ভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়েছে- যা পরবর্তীকালে হিন্দু ও মুসলিম জাতীয়তাবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
একটা জিনিস বোঝা দরকার- সাংস্কৃতিক পার্থক্য তৈরি হয় সাংস্কৃতিক দর্শনের পার্থক্যের জন্য। এই দর্শনের কারণেই সংস্কৃতির অভিমুখ, জাতীয়তাবাদের অভিমুখও ভিন্ন হয়। বাঙালি সংস্কৃতি, বাঙালি সত্তা, বাঙালি ঐতিহ্য, বাঙালি জাতির নামে একজন তৌহিদবাদী মুসলমানের পক্ষে কি কখনও প্রাক-ইসলামি ঐতিহ্য লিঙ্গপূজা, যোনিপূজা, মন্দিরের দেবদাসী ঐতিহ্য, রামলীলা, শিবের গাজন, শঙ্খ, উলুধ্বনি, ঢাকের বাদ্য, কাসার ঘন্টা, মঙ্গল প্রদীপের ধারণা আত্মস্থ করে নেওয়া সম্ভব? অথচ ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ ও সংস্কৃতির নামে এ সমস্ত শিরক-বিদআত আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গীভূত করার চেষ্টা চলছে। এসবই মনোদাসত্বের অভিব্যক্তি। এর একটাই উদ্দেশ্য- আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যমূলে ভাঙ্গন ধরিয়ে দিয়ে আমাদের ঐক্য ও সংহতি চেতনাকে বিপর্যস্ত করে দেওয়া। বাঙালি সংস্কৃতির বেনোপানি এখন আমাদের অস্তিত্বের গায়ে কাদা লেপে দিয়ে অতলে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে। এর লক্ষ্য পরিষ্কার- আমাদেরকে নাম-পরিচয়হীন করে তোলা, আমাদেরকে ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া।
ভাষাভিত্তিক উত্তরাধিকার ও সংস্কৃতির কথা বলে এখন আমাদের শোনানো হচ্ছে, রবীন্দ্র সংগীত শ্রবণ নাকি ইবাদতের মতো। অন্যদিকে প্রতিবেশী সমাজের অনুকরণে এখানকার কেউ কেউ সকল রকমের সভা, অনুষ্ঠান ও কাজের সূচনা করছেন মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে। রবীন্দ্র দর্শনের সারাৎসার আহরিত হয়েছে উপনিষদ থেকে। তার গানগুলোতে এই উপনিষদীয় দর্শনের প্রভাব স্পষ্ট। এখন যৌথ বাঙালি সংস্কৃতির নামে মুসলমান কি তৌহিদের দর্শন বাদ দিয়ে উপনিষদের দর্শন গ্রহণ করবে অথবা যে মুসলমান 'বিসমিল্লাহ' বলে সব কাজ শুরু করে এবং আল্লাহর রহমত প্রার্থনা করে, সে কী করে হিন্দু পূজার অনুকরণে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে মঙ্গল প্রার্থনা করবে? যৌথ সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে এখন যদি পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দুদের বলা হয় 'বিসমিল্লাহ' বলে কাজ শুরু করতে কিংবা নজরুল ইসলামের ইসলামি গানগুলোকে তাদের প্রার্থনার সমতুল্য হিসেবে মর্যাদা দিতে- তাহলে তারা কি রাজি হবে? এ ব্যাপারে আমাদের বাঙালিবাদীদের কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা অবশ্য আমরা পাইনি।
প্রকৃতপক্ষে যৌথ সংস্কৃতি, বাঙালি সংস্কৃতি বা একজাতিত্বের কোনো ঐতিহাসিকতা নেই। মধ্যযুগে বাঙালি শব্দটা ব্যবহৃত হতো দেশবাচক অর্থে। জাতিত্বের নির্ণায়ক ছিল ধর্ম। উনিশ শতক থেকে বাঙালি শব্দটা ব্যবহৃত হয় জাতি অর্থে, কিন্তু সেই জাতি ছিল হিন্দুত্বের ধারক। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাভাষী মুসলমান হিন্দু নেতৃত্বাধীন এই জাতিত্বের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি। আজকাল আমরা যে অসাম্প্রদায়িক, সেক্যুলার বাঙালি সংস্কৃতির কথা শুনি, তার মধ্যেও কিন্তু হিন্দুত্বের প্রবণতাগুলো প্রধান। সেদিক দিয়ে এর একটি সাম্প্রদায়িক রীতি-বৈশিষ্ট্য আছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এর ওপর একটি অসাম্প্রদায়িকতার লেবেল চড়িয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমানকে কৌশলে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।
আমাদের মনে রাখা চাই- সংস্কৃতিগত বিভাজনের কারণেই ভারত ভাগ হয়েছে, বাংলা ভাগ হয়েছে। স্রেফ মানুষের ভাষা-চেতনা কিন্তু এই বিভাজনকে ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। আবার বাংলাদেশের মানুষের স্বতন্ত্র ইসলামি চেতনাই বাংলাদেশকে ভারত থেকে পৃথক করে রেখেছে। তাই ইসলামি চেতনা দুর্বল হয়ে পড়লে বাংলাদেশের স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা দুর্বল হয়ে পড়বে। কাজেই বাংলাদেশের সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য খুঁজতে হবে ইসলামের মধ্যে। আবার ইসলামকে ভিত্তি করেই এর সংস্কৃতির নবনির্মাণ করতে হবে। এ ছাড়া আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার অর্থ বিফল হয়ে যাবে।
📄 সাংস্কৃতিক বহুত্ব
এক.
সাংস্কৃতিক বহুত্ব (Cultural Pluralism) শব্দটা পশ্চিমি গণমাধ্যমের জোরে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে এবং হালে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এ নিয়ে একটা সংবেদনা সৃষ্টি হয়েছে। পুরালিজম, সেক্যুলারিজম, ন্যাশনালিজম প্রভৃতি ধারণা আমরা পেয়েছি পশ্চিমের সূত্রে। মজার কথা হলো, এসব ধারণা এখন আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজজীবনের গভীরে ঢুকে পড়লেও আদপে এসব মর্মবস্তু পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদ ও আধুনিকতার দ্বারা আরোপিত এবং আমাদের দেশের ক্ষেত্রে তা কতখানি প্রাসঙ্গিক- সেটাও ভাববার বিষয়। যে বিতর্ক ইউরোপ-আমেরিকায় প্রাসঙ্গিক হতে পারে, তা আমাদের মতো পশ্চাৎপদ পুঁজি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার দেশে এবং ভিন্ন চরিত্রসম্পন্ন সাংস্কৃতিক আবহাওয়ায় চলতে পারে কিনা- তাও বিবেচনা করা যেতে পারে।
আবার উলটো চিত্রও দেখি। গত একশ কী দু'শ বছরে সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের ফলে এসব চিন্তাধারার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব আমাদের বুদ্ধিজীবীদের একাংশের মধ্যে পড়েছে এবং এসব চিন্তা-ভাবনা চর্চায় তাদের উৎসাহও কম নয়। এই যে বিতর্কের একটি পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে- আমাদের মতো একদা সাম্রাজ্যবাদ শাসনাধীন দেশগুলোর ক্ষেত্রে তা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। পাশ্চাত্যকে গ্রহণ করব কি করব না, আধুনিকতাকে নেব কি নেব না এই দ্বিধার জন্ম সাম্রাজ্যবাদের শাসন-শোষণের ফলে। কারণ, সাম্রাজ্যবাদ আমাদের সমাজব্যবস্থাকে এতখানি বিকৃত ও বিপর্যস্ত করে গেছে যে, এর স্বাভাবিক চলমানতা অনেকখানি আটকে গেছে। এ কারণেই আমাদের অনেক বুদ্ধিজীবী আজও মনে করেন সাম্রাজ্যবাদের অনুপস্থিতিতে আমাদের সমাজ যদি নিজের শক্তিতেই বিবর্তিত হতো তবে এরকম সংশয় ও মূঢ়তার অবস্থা তৈরি হতো না। তাই আজও দেখা যায়- আমাদের এখানে আধুনিকীকরণ (Modernisation) ও আধুনিকতার (Modernity) ধারণার মধ্যে একটা ভেদরেখা তৈরির চেষ্টা। কারণ, আধুনিকতার ব্যবহারিক যৌক্তিক ভাষ্যের সঙ্গে এর নান্দনিক সাংস্কৃতিক ভাষ্যের প্রভেদটা অত্যন্ত মোটা দাগে চিহ্নিত করা সম্ভব। যেমন ফরাসি বিপ্লবের স্লোগান সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার কথা। আসলে এই স্লোগান যতই শ্রুতিমধুকর হোক না কেন, পাশ্চাত্যের ধনতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কারণে এই সাম্যের ধারণা স্রেফ নামকাওয়াস্তা সাম্যে পরিণত হয়েছে এবং অবস্থান ও দেশভেদে এই সাম্যের স্লোগান রূপান্তরিত হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও জুলুমে।
সাংস্কৃতিক বহুত্ব সম্বন্ধেও একই কথা বলা চলে। বহুত্ব সম্বন্ধে আমাদের এখানকার কারও কারও বিভ্রান্ত বিশ্বাস আছে। এরা মনে করেন বহুত্ব মানে হলো- All Cultural position are equal. পৃথিবীতে যেহেতু বহু সংস্কৃতি আছে এবং প্রত্যেক সংস্কৃতির বিকাশ লাভের অধিকার আছে, তাত্ত্বিকভাবে এসব কথার সাথে দ্বিমত করার তেমন কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অধিকতর ধনী ও শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো তাদের কায়েমি স্বার্থের অভিসন্ধি ও ক্ষমতার বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা থেকে দুর্বল দেশ ও সমাজগুলোর ওপর এক দমনমূলক সংস্কৃতি প্রসারের চেষ্টা চালাচ্ছে এবং সেটিও হচ্ছে সাংস্কৃতিক বহুত্বের নামে। যেমন করে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের কথা বলেই সাম্রাজ্যবাদীরা আজকাল অন্য দেশ ও রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র কেড়ে নিচ্ছে। ইরাকের অবস্থা দেখুন। পশ্চিমের চিন্তা-ভাবনার একটা বড়ো ত্রুটি হলো- তাদের বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা ও মানবীয় সত্য সম্পর্কে একটা প্রভুত্ব ব্যঞ্জক বোধ এবং এই বোধ থেকেই আসে বহুত্ব সম্পর্কে অনাস্থা, অন্যের বিকাশ লাভের অধিকার সম্বন্ধে উদাসীনতা। আঠারো-উনিশ শতকের সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের White Men's Burden কিংবা Civilising Mission-এর অন্তর্গত মর্মবস্তু এবং আজকালকার পুঁজিবাদী ও ধনতান্ত্রিক বিশ্বের প্রচারিত বিশ্বায়ন, TINA (There is no alternative) অথবা ইতিহাস ফুরিয়ে যাওয়া তত্ত্বের মধ্যে মৌলিক কোনো তফাত নেই। এর প্রত্যেকটির উদ্দেশ্য হচ্ছে- প্রথম বিশ্ব কর্তৃক বাকি বিশ্বকে শাসন ও শোষণ করার নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈধতা দেওয়া। সেদিক দিয়ে বিবেচনা করলে সাংস্কৃতিক বহুত্বের উপাখ্যানও শেষ বিচারে পরম প্রাপনীয় কোনো সমাধান নয় যে- এর মধ্যে আমাদের ভবিষ্যৎ হবে সুরক্ষিত।
দুই.
বহুত্ব আর বৈচিত্র্য হচ্ছে প্রকৃতির নিয়ম। বহু জ্ঞানী-গুণী-দার্শনিক মনে করেন, দুনিয়ার যে ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা কাজ করছে, তার কিন্তু বিভিন্নভাবে প্রকাশ ঘটছে। ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ, সরল থেকে জটিল দুনিয়ার প্রত্যেকটি জিনিসই পারস্পরিক ঐকতানের ভেতর দিয়ে সহাবস্থান করছে। সামাজিকভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় একটি সমাজে নানা মত ও পথের লোক বাস করে এবং নানা রকম রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সহাবস্থানে সেই সমাজ সচল হয়ে ওঠে। সাংস্কৃতিকভাবে বিচার করলে বহুত্ব ও বৈচিত্র্যের যে ফুল দুনিয়া জুড়ে ফুটে আছে, তা রীতিমতো অভাবিত। দেখা গেছে, এক সংস্কৃতিতে যা চলে, অন্য সংস্কৃতিতে তা নিষিদ্ধ বা অনুপস্থিত। পেরুর লোকেরা যখন আলু খেত, তখন মেক্সিকোর লোকেরা আলু খায়নি। ভারতে যখন মুসলমানরা এলো, তখন তাদের নিজস্ব খাদ্যাভ্যাস তৈরি হলো- যা স্থানীয়দের পক্ষে গ্রহণ করা ছিল তাদের বিশ্বাসের জন্য গর্হিত। গ্রিকদের স্থাপত্যশৈলীর সাথে আরবদের স্থাপত্যশৈলীর কোনো মিল নেই। গ্রিক সাহিত্যে ট্রাজেডি হচ্ছে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট রচনা; অথচ অন্য একটা সংস্কৃতিতে গেলে দেখা যাবে কমেডি ছাড়া সেখানে কিছু ভাবাই যায় না।
এই বৈচিত্র্য তৈরি হয় সংস্কৃতির পার্থক্যের কারণে। কেননা, প্রত্যেক সমাজের নিজস্ব সংস্কৃতি আছে। আবার একাধিক সমাজ কখনও কখনও বিশেষ সংস্কৃতির একটি বৈশিষ্ট্যকে ভাগ করেও নেয়। সংস্কৃতির পার্থক্য যেমন আছে, তেমনি তাদের মধ্যে দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপারও আছে। এইভাবে একটি সংস্কৃতি আরেকটি সংস্কৃতিকে চিহ্নিত করে, আবার পরস্পরকে পুষ্টি জোগায়। এমনি করে সংস্কৃতির স্রোত এগিয়ে চলে। একালে বহুত্বের এই দৃষ্টিভঙ্গির কথা অনেক পাশ্চাত্যের পণ্ডিতরা প্রচার করেছেন সত্য, কিন্তু সেখানকার মাটিতেই আবার আত্মকেন্দ্রিক ও উচ্চমূল্য এক চিন্তা-ভাবনার বিকাশ ঘটেছে গত কয়েক শতাব্দী ধরে- যার মূলে আছে অন্যের সংস্কৃতি সম্বন্ধে এক অবিমিশ্র অবজ্ঞা। দুয়েকজন পণ্ডিত যা-ই বলুন না কেন, এই অবজ্ঞা মিশ্রিত মানসিকতাই পাশ্চত্যের মানুষের চিন্তা-ভাবনাকে অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ করছে। এই অবজ্ঞা সবচেয়ে স্থূল অভিব্যক্তি লাভ করেছিল সাম্রাজ্যবাদের কালে। এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত উপনিবেশের মানুষগুলোর সাথে সাম্রাজ্যবাদীরা যে নিষ্ঠুর ব্যবহার করেছিল, তা কোনোমতেই বহুত্ববাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়যুক্ত ছিল না। সাম্রাজ্যবাদের কালে ঔপনিবেশিক প্রভুদের সক্রিয় সমর্থনে গড়ে উঠেছিল প্রাচ্যবিদ্যার গবেষণা এবং এই সব প্রাচ্যবিদরা প্রাণপণ প্রমাণ করার চেষ্টা করতেন, উপনিবেশগুলোর ইতিহাসে ইতিবাচক বা গৌরবময় কিছু থাকতে পারে না। তাই তাদের কাছে অপাশ্চাত্য সব সংস্কৃতি ছিল নিকৃষ্ট। এই ধরনের উন্নাসিকতা সৃষ্টির পেছনে কাজ করেছিল সাম্রাজ্যবাদের রাজনৈতিক প্রাধান্য বিস্তারের প্রয়োজনীয়তা ও অর্থনৈতিক শোষণের যৌক্তিকতাকে বৈধতা দেওয়া। ভারতীয়দের সম্পর্কে লর্ড মেকলের মতামত এর নমুনা হিসেবে হাজির করাই যথেষ্ট হবে বলে মনে করি:
সংস্কৃত বা আরবিতে আমার কোনো জ্ঞান নেই। তবে তাদের যথার্থ মূল্য নিরূপণের জন্য যা করার তা আমি করেছি। .... প্রাচ্য জ্ঞানভাণ্ডার সম্পর্কে প্রাচ্যবিদদের মূল্যায়ন গ্রহণ করতে আমি প্রস্তুত। আমি তাদের মধ্যে এমন একজনকেও পাইনি, যিনি একথা অস্বীকার করতে পারেন যে, একটা ভালো ইউরোপীয় গ্রন্থাগারের এক তাকের তুল্য হলো ভারত ও আরবের সমগ্র স্থানীয় সাহিত্য।.... এখন আমাদের সামনে প্রশ্নটা আসলে এই যে, আমাদের যখন এই ভাষা (ইংরেজি) শেখানোর ক্ষমতা আছে, তখন কি আমরা এমন সব ভাষা শেখাব- যাতে আমাদের সঙ্গে তুলনীয় কোনো বই নেই বলে সর্বজন স্বীকার করেন। যখন আমরা ইউরোপীয় বিজ্ঞান শেখাতে পারি, তখন কি আমরা এমনসব পদ্ধতি শেখাব- যা ইউরোপীয় পদ্ধতির সঙ্গে যেখানে মেলে না, সর্বস্বীকৃতভাবে সেই অমিল খারাবের দিকে। যখন আমরা যুক্তিসঙ্গত দর্শন ও সত্য ইতিহাসের পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারি, তখন কি আমরা জনসাধারণের পয়সায় এমন চিকিৎসাতত্ত্ব সমর্থন করব- যা ইংল্যান্ডের অশ্ব পরিচর্যাকারীকেও হার মানাবে! এমন জ্যোতির্বিদ্যা সমর্থন করব- যা ইংলিশ বোর্ডিং স্কুলের মেয়েদেরও হাসিয়ে ছাড়বে। এমন সব ইতিহাস সমর্থন করব- যা বিশ ফুট লম্বা রাজা আর ত্রিশ হাজার বছর রাজত্বের গল্পে পূর্ণ। এমন ভূগোল সমর্থন করব- যাতে কেবল রয়েছে মিষ্টির সাগর আর ক্ষীর সমুদ্রের কথা।১
এই ধারণা মূলত পৃথিবীকে বিভাজিত করে ফেলেছে- মুখ্য নিজেরটায় এবং গৌণ অন্যেরটায়। একটি শাসন করবে, অন্যটির শাসিত হওয়াই হবে নিয়তি। যে ফ্রান্সে একসময় রব উঠেছিল সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার, সেই ফ্রান্সই কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে তার অধীন উপনিবেশগুলোর সাংস্কৃতিক চরিত্র পালটে ফেলতে এবং সেখানকার মানুষদের কৃষ্ণাঙ্গ ফরাসি বানিয়ে তাদের ফরাসি সংস্কৃতির অঙ্গীভূত করতে চেয়েছে। আসল কথা হলো- পশ্চিমের সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো বহুত্বের কথা জোরে-শোরে প্রচার করলেও উপনিবেশগুলোতে বহুত্ববাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার বদলে তারা এককেন্দ্রিক একটি ব্যবস্থা, শাসন ও চিন্তা-ভাবনা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। একালেও তৃতীয় বিশ্বে- বিশেষ করে মুসলিম দুনিয়ার ওপর এরা নানা কৌশলে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় কোনো ত্রুটি রাখছে না।
বিশ্বায়নের প্রয়োজনে সাম্রাজ্যবাদী মিডিয়ার প্রভাব এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রভুসুলভ মনোবৃত্তিকে এড়িয়ে চলা গরিব ও প্রায়ুক্তিকভাবে অনগ্রসর দেশগুলোর জন্য রীতিমতো দুঃসাধ্য কাজ হয়ে উঠেছে। এই মুহূর্তের বাস্তবতা হলো- পৃথিবীব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও শোষণের তোপের মুখে অপশ্চিমি বিশ্বের জাতিগোষ্ঠীগুলোর সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বিপন্নপ্রায়। জগতে বিভিন্ন জাতির শরিকানা মানবিক ও সমতাভিত্তিক হওয়ার বদলে বিরোধ ও সংঘাতের ক্ষেত্রই যেন প্রস্তুত হচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে অনেক ক্ষেত্রেই বহুজাতিক সমাজের কথা বলা হলেও কার্যক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের প্রয়োজনীয়তাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে এক অসহনশীলতার মনোভাবকে উসকে দিয়ে। যেমন- আজকের ফ্রান্সের সংখ্যালঘু মুসলমানদের প্রতি সংখ্যাগুরু খ্রিষ্টানদের সাম্প্রদায়িক মনোভাব এই দুই সংস্কৃতির সহাবস্থানকে কষ্টসাধ্য করে তুলেছে। এই অস্বাচ্ছন্দ্যের প্রকাশ ঘটেছে সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দাঙ্গায়। অন্য সংস্কৃতির প্রতি এমনতর বিরূপতা যথার্থ বহুত্ববাদ চর্চার সম্ভাবনাকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং পাশ্চাত্যের বহুকথিত সেক্যুলার মানবিক সমাজের তত্ত্ব যে কত ফোঁপরা, তা ভয়ানকভাবে প্রকাশ করে দিয়েছে।
পাশ্চাত্যের এরকম ডাবল স্ট্যান্ডার্ডের নমুনা আরও দেওয়া যেতে পারে। বছরের পর বছর ধরে খোদ যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি যে প্রতিকূল ধারণা পোষণ করা হয়, তা কিন্তু একধরনের সাংস্কৃতিক অসূয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে এবং কৃষ্ণাঙ্গদের কখনোই মার্কিন সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। এখনও মানবাধিকারের সবচেয়ে বেশি স্লোগান উচ্চারণকারী দেশটিতে রেড ইন্ডিয়ানদের জীবন নির্বাহ করতে হয় রিজারভেশন-সংরক্ষিত এলাকায়। পাশ্চাত্যের আরেকটা জিনিস নিয়ে সেখানকার মানুষ রেনেসাঁ ও শিল্প বিপ্লবের পর থেকে গর্ব করে আসছিল। তাদের দাবি- তারা ধর্মকে রাষ্ট্র ও গণজীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছে এবং দেশের জনগণকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত করার সম্ভাবনাকে রুদ্ধ করেছে। পাশ্চাত্যের এই দাবি কিন্তু পুরোপুরি সত্য নয়। ইউরোপের কেন্দ্রস্থলে বসে আমাদের চোখের সামনে বসনিয়ায় যে পরিকল্পিত মুসলিম নিধনের ঘটনা ঘটেছে, তা কিন্তু সেখানকার ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বহাল থাকা অবস্থায়ই সম্ভব হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ খ্রিষ্টানদের সাথে পশ্চিমের রাষ্ট্রগুলো এক ধরনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারলেও সংখ্যালঘু মুসলমানদের সাথে একই রকম ব্যবহার তারা করতে ইচ্ছুক বলে মনে হয় না। এসব উদাহরণ থেকে মুসলমানদের প্রতি বিরূপতার বিষয়টি যেমন বোঝা যায়, তেমনি বহুল আলোচিত পশ্চিমের সেক্যুলার রাষ্ট্র-কাঠামোর মধ্যে যথার্থ বহুত্ববাদের কোনো জায়গা আছে কিনা- তাও একটা বড়ো প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিন.
এখন আমরা ভারতীয় উপমহাদেশের দিকে চোখ ফেরাই। এটি কখনোই এক সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিল না। এখানকার একত্ববোধের প্রেরণা এসেছে মূলত ধর্ম থেকে। যেমন- হিন্দু ভারত কিংবা মুসলিম ভারত। ভাষাগত কিংবা জাতিরাষ্ট্রের বিচারে এর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ব্যাপারটা একান্তই অসম্ভব। রাজনৈতিক দিক দিয়ে ভারত ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল একবার মোঘল আমলে আরেকবার ইংরেজ আমলে, কিন্তু এই ঐক্যটাও তৈরি হয়েছিল মোঘল বা ব্রিটিশ শাসন আরোপিত এক ঐক্য থেকে। সাংস্কৃতিক বিচিত্রতা ভারতবর্ষের একটা বৈশিষ্ট্য বটে; কিন্তু সাংস্কৃতিক বহুত্ব বলতে যা বোঝায়- যেমন পৃথক সংস্কৃতির সহাবস্থান এবং পারস্পরিক সহনশীলতার ব্যাপারটা, তা কিন্তু সব সময় এখানে দেখা যায়নি। আল-বেরুনির 'কিতাবুল হিন্দ'-এ ভারতের বর্ণভেদমূলক সমাজের যে বর্ণনা আছে, তা মোটেই সাংস্কৃতিক বহুত্বের সমার্থক নয়। এই ধরনের বর্ণভেদমূলক সমাজ শুধু পৃথক সংস্কৃতির সহাবস্থানকেই অস্বীকার করে না; নির্মূলও করতে চায়। এর সাথে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সংস্কৃতির উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।
মুসলমানরা ভারতে আসার পর মুসলিম সুলতান ও বাদশাহরা হিন্দু সমাজের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলাননি, কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতির দিক দিয়ে তারা এক ধরনের সহাবস্থানের পরিবেশ সৃষ্টিতে উৎসাহী ছিলেন। যে আওরঙ্গজেবকে ধর্মান্ধ বলে দোষারোপ করা হয়, তার বিরুদ্ধেও কিন্তু হিন্দুদের অধিকার হরণের অভিযোগ ইতিহাসবিদরা হাজির করতে পারেননি। কার্যকর অর্থেই মুসলিম শাসনামলে ভারতে বহু সংস্কৃতির পারস্পরিক সহাবস্থানের ভিত্তিতে এক বহুত্ববাদী সমাজ কাঠামো গড়ে উঠার পরিবেশ ছিল। এই বহুত্বের মধ্যেই প্রভেদ দেখা দেয় ইংরেজ আমলে। ইংরেজ তার সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে হিন্দুকে কোলে টেনে নেয় এবং মুসলমানকে পায়ে দলার চেষ্টা করে। এই পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘু মুসলমানরা নিজেদের সাংস্কৃতিক সত্তা সম্বন্ধে অধিকার সচেতন হয়ে ওঠে এবং একপর্যায়ে ভারতই ভাগ হয়ে যায়।
ভারত স্বাধীন হওয়ার পরও সেখানে প্রায়ই হিন্দুদের জঙ্গি প্রকাশ ঘটে এবং হিন্দুত্ববাদীরা বিভিন্ন সময় ক্ষমতায়ও চলে আসে। সেক্যুলার বলে পরিচিত কংগ্রেসও হিন্দুত্বের সংক্রমণ থেকে রেহাই পায়নি (যেমন- প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী বাবরি মসজিদ এলাকায় রামমন্দিরের শিলান্যাস করেছিলেন, আরেক প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের সময় বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছিল)। ভারত ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে দাবি করলেও কার্যক্ষেত্রে এটি ধর্মনিরপেক্ষ নয় এবং এর শাসকরা বহুত্ববাদী মত লালন করার পক্ষপাতীও নয়। অযোধ্যা, গুজরাটের পরিকল্পিত মুসলিম নিধন এর বড়ো প্রমাণ।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যারা ধর্মের প্রবেশ ও সেক্যুলারিজমের নীতি বিসর্জন দেওয়াকে বহুত্ববাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার অন্তরায় বলে মনে করেন, তারা ভুল বলেন। সেক্যুলারিজম পশ্চিমে বহুত্ববাদী সমাজ নিশ্চিত করতে পারেনি। সেখানে মুসলমানরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। ভারতের কথা নাই-বা বললাম। আরব-রাষ্ট্রনায়করা একসময় ভেবেছিলেন, সেক্যুলার আরব জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বোধ হয় তারা ইজরাইলকে মোকাবিলা করতে পারবেন। কিন্তু পারেননি। ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ইজরাইলের হাতে বারবার আরব নেতৃবৃন্দ নাস্তানাবুদ হয়েছেন। উলটো আরব জাতীয়তাবাদ আরবদের কোনোরকম ঐক্যই তৈরি করতে পারেনি; বরং পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সন্দেহের স্থায়ী বীজতলা তৈরি করে দিয়েছে। ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের প্রতি ইজরাইলের জুলুম ও অবিচারকে একভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, কিন্তু জর্দানি শাসকরা যখন ফিলিস্তিনিদের ওপর একইরকম গুলিবর্ষণ করে, তখন তাকে কী বলা যায়? আরবরা যখন সেক্যুলারিজম, গোত্রতন্ত্র, শেখতন্ত্র, আরববাদ দিয়ে ইসলামকে অতিক্রম করার চেষ্টা করেছে, তখন থেকেই তাদের ভালোমতো বিপর্যয় শুরু হয়েছে। এর থেকে আমাদের এখানে যারা ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে বিসর্জন দেওয়ার কথা ভাবেন, তারা শিক্ষা নিতে পারেন।
চার.
এ আলোচনা থেকে আমরা দেখলাম- সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ব্যাপারটা খুবই স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক। কিন্তু তা সহজে গ্রহণযোগ্য হয় না, বিশেষ করে প্রভাবশালী সংস্কৃতি অন্য সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যগুলোকে অস্বীকার করতে চায়। সংস্কৃতির মধ্যে কখনও কখনও সহাবস্থান সম্ভব হয়েছে ঠিক, কিন্তু কখনও কখনও তা সূচনা করেছে বিরোধের। বিশেষ করে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো অন্যের সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করে, অন্যের সংস্কৃতিতে হস্তক্ষেপ করে, প্রয়োজনে বদলে ফেলার তাড়নাও অনুভব করে। বহু সংস্কৃতিভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাই এখনও সাম্রাজ্যবাদ একটা বড়ো অন্তরায়। আমাদের শিক্ষিত ও আধুনিকতাবাদীদের ভেতরে একটা ভুল ধারণা আছে— ইসলামের মধ্যে সহিষ্ণুতা ও বহুত্ববাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার কোনো প্রকার মূল্যচেতনা অনুপস্থিত। এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ঔপনিবেশিক আমলে এবং সাম্রাজ্যবাদীদের প্রচার-প্রোপাগান্ডা আমাদের আধুনিকতাবাদীদের মনে-মস্তিষ্কে এমন জবরদস্ত ছাপ ফেলে দিয়েছে যে, তা তারা অবলীলায় বিশ্বাসও করে ফেলেছে। পশ্চিমের বর্ণবাদী প্রচার-প্রোপাগান্ডা ইসলামকে যতই কুৎসিত ধর্ম হিসেবে খাড়া করার চেষ্টা করুক না কেন, ইসলামের মাহাত্ম্য, সর্বজনীন মানবতাবাদ, সহিষ্ণুতার ধারণার তুলনা ইতিহাসে বিরল। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য উভয় জগতের বড়ো বড়ো পণ্ডিত স্বীকার করেছেন- আহলুল কিতাবদের প্রতি ইসলামের যে সহনশীলতা ছিল, তা সমসাময়িক খ্রিষ্টানজগতে কল্পনাও করা যেত না।
উমাইয়াদের স্পেন, আব্বাসীয়দের বাগদাদ, তুর্কিদের ইস্তাম্বুল আর মোঘলদের দিল্লি ছিল নানা ধর্মের মানুষের সহবস্থান ও সম্প্রীতির প্রাণকেন্দ্র। এসব মুসলিম রাজধানীগুলোতে ইসলামের মানবতামুখী মনন ও প্রাণচাঞ্চল্যের মিলিতভাবে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ছিল সকল ধর্মের মানুষ। বহুত্ববাদী সমাজের সত্যিকার রূপ এসব মুসলিম রাজধানীগুলোতেই দেখা গেছে। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি ইসলাম যে সহনশীলতা দেখিয়েছে, তার কাছাকাছি কোনো সহনশীলতা খ্রিষ্টান ইউরোপে ইহুদিদের প্রতি, প্রোটেসট্যান্টদের জগতে ক্যাথলিকদের প্রতি কিংবা ক্যাথলিকদের জগতে প্রোটেসট্যান্টদের প্রতি ব্যবহারে পরিলক্ষিত হয়নি। অন্যদিকে ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা অন্যের ধর্মবিশ্বাসে আদৌ হস্তক্ষেপ করেনি। কারণ, কুরআন শরিফ দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছে- লা ইকরাহা ফিদদ্বীন- দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই।
মধ্যযুগে ইনকুইজিসন বা শুদ্ধাভিযান করে ইউরোপ থেকে উগ্রবাদী খ্রিষ্টানরা যখন ইহুদিদের বিতাড়িত করল, তখন তারা এসে আশ্রয় পেয়েছিল মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে। মুসলিম খলিফা ও সুলতানরা এসব বিতাড়িত ইহুদিদের সাদরে আশ্রয় দিয়েছিলেন। শুধু মধ্যযুগ নয়; এই মাত্র গত শতাব্দীতে নাৎসি হলোকাস্টের মাধ্যমে ইউরোপের খ্রিষ্টানরা ইহুদিদের ওপর চালায় নিপীড়ন-নির্যাতন। অথচ এই ইহুদিরাই আজ খ্রিষ্টান জগতের সাথে মিলেমিশে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে চলেছে। এভাবেই আজকের ইহুদিরা মুসলমানদের উপকারের প্রতিদান দিয়েছে। ইতিহাসের ধারা বড়োই অদ্ভুত!
সাম্রাজ্যবাদের বরকন্দাজ ওরিয়েন্টালিস্টরা একসময় প্রচার করেছিল, ইসলাম এক হাতে তরবারি আর অন্য হাতে কুরআন নিয়ে অগ্রসর হয়েছিল। তরবারি দিয়ে দুয়েকজনকে হয়তো ধর্মান্তরিত করা সম্ভব, একটি সর্বজনীন আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়- যা নাকি পৃথিবীর এক-চতুর্থাংশ মানুষের বিশ্বাসের উৎস হয়ে আছে। ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার সরল, অনাড়ম্বর, নিরাপস আদর্শ ও তার নবির অনুপম আত্মশুদ্ধি, সাহসিকতা, নির্ভীকতা এবং আদর্শের প্রতি অবিচল বিশ্বাসের জোরে। রসুল সা. তাঁর জীবদ্দশায় অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মাবলম্বীদের সাথে সহনশীলতা ও সহাবস্থানের যে নজির স্থাপন করেছিলেন, তা এক কথায় তুলনা বিরহিত। তাঁর ঘোষিত ঐতিহাসিক 'মদিনা সনদ' একটি সহনশীল মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। নাজরানের খ্রিষ্টান প্রতিনিধি দলকে রসুল সা. নিজে তাঁর মসজিদে প্রার্থনা করার অনুমতি দেন; পাশাপাশি তিনি নিজে একই গৃহভ্যন্তরে নামাজের ইমামতি করেন। রসুল সা.-এর ঔদার্যতা একই মসজিদের অভ্যন্তরে একই সময় দুই পৃথক মতের অনুসারীরা তাদের আরাধনা সম্পন্ন করেন। এই সহনশীলতা ইসলামের নীতি। এই নীতি থেকে ইসলাম বিশ্বাসীরা কখনোই সরে আসেনি। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, সহনশীলতার পরিবেশ প্রথম বিঘ্নিত হয় ক্রুসেডের কালে। ক্রুসেডের হিংসার নদী পাড়ি না দিতেই আসে উপনিবেশবাদ- সাম্রাজ্যবাদের কাল। সাম্রাজ্যবাদী শাসন-পীড়ন-নির্যাতনের ঐতিহ্য থেকে আজও পাশ্চাত্য বেরিয়ে আসতে পারেনি। হিংসার পূজা করে অহিংসা প্রতিষ্ঠা করা কখনোই সম্ভব নয়।
টিকাঃ
১. Minute on Education (1835) by Thomas Babington Macaulay.