📘 মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান 📄 মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান

📄 মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান


সংস্কৃতি
'সংস্কৃতি' শব্দটার ব্যবহার বাংলা ভাষায় খুব পুরোনো ঘটনা নয়। ইংরেজি ‘কালচার’ শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে ‘সংস্কৃতি’ শব্দটাকে বাংলায় গ্রহণ করা হয়েছে। একসময় কালচার শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে কৃষ্টি, অনুশীলন, প্রকর্ষ প্রভৃতি শব্দ ব্যবহারের রেওয়াজ ছিল। এখন সংস্কৃতি শব্দটাই বেশি চলে। এর কারণ রবীন্দ্রনাথ এই শব্দটিকে বেশি পছন্দ করেছেন এবং তার সমর্থনে এই শব্দটি বাংলা ভাষায় প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

যারা ইসলামি বাংলার পক্ষপাতী, তারা সংস্কৃতি অর্থে ‘তমুদ্দুন’ শব্দটা ব্যবহার করেন। তমুদ্দুন কথাটার উৎপত্তি আরবি ‘মাদানুন’ শব্দ থেকে, যার অর্থ শহর। শহরকে কেন্দ্র করেই প্রথম গড়ে উঠে সভ্যতা, নাগরিক আচরণ ও মূল্যবোধ। সেই হিসেবে তমুদ্দুন কথাটার যথার্থ মূল্য। লাতিন ভাষায় সিভিলাইজেশন কথাটার মানেও দাঁড়ায় নাগরিক জীবনযাত্রা বা জীবনরীতি।

‘কৃষ্টি’ শব্দটা কর্ষণ বা চাষ অর্থে কালচার শব্দের বেশি কাছাকাছি বলে মনে হয়। সংস্কৃতি শব্দটা বরং ইংরেজি রিফাইনমেন্ট অর্থে বেশি মানায়। তারপরও কথা হলো- কোন শব্দ বা শব্দপুঞ্জ কখন কোন জনসমাজের কাছে গ্রহণীয় হয়ে উঠবে, তা বলা মুশকিল। তবে একটা শব্দ কখনও একটা জনসমাজের দীর্ঘদিনের মিলিত ঐতিহ্য ও জাতীয় চেতনার প্রতীক হয়ে ওঠে। আরবিতে আরেকটা শব্দ হলো ‘তাহজিব’। তাহজিব অর্থ ঘষে ঘষে চকচকে করা। ইংরেজি কালচার ও বাংলা সংস্কৃতির প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যুৎপত্তিগত দিক বিচার করলে তাহজিবকে কাছাকাছি বলে মনে হয়। অন্যদিকে তমুদ্দুনকে মনে হয় সভ্যতা শব্দের নিকটতর।

ইংরেজি কালচার শব্দের মতো বাংলা সংস্কৃতি শব্দটির তাৎপর্য ও সীমানাও সুস্পষ্ট নয়। এর একটি জুতসই সংজ্ঞা হাজির করাও বেশ কঠিন। অনেক সময় আমরা কালচার্ড ও আনকালচার্ড শব্দের পার্থক্য দেখিয়ে সংস্কৃতি বলতে এক উন্নত রুচি ও ভাবের দিকে ইঙ্গিত করি। কিন্তু সংস্কৃতির সীমানা তার চেয়েও ব্যাপক। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমে তাই 'সংস্কৃতি' ব্যাপারে পণ্ডিতরা ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। আবার তারা কখনও কখনও কালচার ও সিভিলাইজেশনের সীমানার মধ্যেও গোল পাকিয়ে ফেলেছেন। কাকে বলব কালচার, কাকে বলব সিভিলাইজেশন- তা নিয়েও চলেছে দীর্ঘ বিতর্ক। ইংরেজিতে সিভিলাইজেশন শব্দটা এসেছে ফরাসি ভাষা থেকে। ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার 'সিভিলিজাশিয়' শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। ইংরেজি ভাষায় 'কালচার' শব্দটা প্রথম ব্যবহার করেন ফ্রান্সিস বেকন। বেকনের পর ইংরেজি ভাষায় সংস্কৃতিকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেন ইংল্যান্ডে ম্যাথু আর্নল্ড ও আমেরিকায় ওয়ার্ল্ড ইমার্সন। কিন্তু তারা কালচার শব্দকে যেভাবে ডিফাইন করার চেষ্টা করেছিলেন, সে অর্থ পশ্চিমে স্থায়ী হতে পারেনি। পরবর্তী প্রজন্মের পণ্ডিতরা সেই ব্যাখ্যাকে আরও ব্যাপকতর ও গভীরতর করে তোলেন। ফলে কালচার শব্দটা আরও জটিল হয়ে ওঠে।

ইউরোপীয়দের অনেক আগে থেকেই সংস্কৃতি ও সভ্যতা নিয়ে মুসলমানরা আলোচনা শুরু করেছিল। বলা চলে সভ্যতার আলোচনায় তারাই ছিল অগ্রণী। আঠারো-উনিশ শতকের আগে এ ব্যাপারে ইউরোপীয়দের কোনো ধারণাই ছিল না। চৌদ্দ শতকের মুসলিম বুদ্ধিজীবী, সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন সভ্যতা অর্থে প্রথম 'উমরান' শব্দটা ব্যবহার করেন এবং তিনি তাঁর মশহুর গ্রন্থ আল মুকাদ্দিমা-য় সর্বপ্রথম সভ্যতা নিয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করেন। সুসংবদ্ধভাবে ইবনে খালদুনের আগে সমাজ ও সভ্যতা নিয়ে আর কেউ এতখানি ভাবেনি। আল মুকাদ্দিমা-য় তিনি যেসব চিন্তা-ভাবনার কথা বলেছেন, এ কালের সমাজবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানীরা আজও তা অতিক্রম করতে পারেননি। সভ্যতার বিবর্তনের কথা লিখতে গিয়ে তিনি সভ্যসমাজের কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন- এর থাকবে একটা উচ্চতর ধর্মনীতি, একটা সুসংবদ্ধ রাষ্ট্র, একটা আইনি পদ্ধতি, নগরজীবন, লেখার প্রণালী এবং চারু ও নন্দনকলার বিশেষ ধরন। এভাবে সভ্যতাকে বিশ্লেষণ ও অধ্যয়ন করার বিদ্যাকে খালদুন বলেছেন 'ইলম আল উমরান'।

ইউরোপে রিফরমেশনের পর থেকে সেখানকার মানুষের চিন্তা-ভাবনায় একটা পরিবর্তন আসে। এ যুগে এসে ধর্মকে বাদ দিয়ে সংস্কৃতি নির্মাণ করার চিন্তা-ভাবনা বিকশিত হয় এবং কোনো কোনো পণ্ডিত সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ধর্মের কোনো ভূমিকা থাকতে পারে- এমনতর ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেন। এ নতুন সংস্কৃতির বুনিয়াদ হচ্ছে হিউম্যানিজম-মানবতাবাদ; কোনো অতিপ্রাকৃত রিলিজিয়ন নয়। এ প্রেক্ষিতেই আসে সেক্যুলার কালচারের কথা। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে পাশ্চাত্যে যতই সেক্যুলারিজমের কথা বলা হোক না কেন, সেখানকার সমাজ কিন্তু আজও পুরোপুরি সেক্যুলার হতে পারেনি। এ কারণেই আজও পাশ্চাত্যের সমাজে খ্রিষ্টধর্ম কিছুটা হলেও কর্তৃত্ব করছে। বিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত ইংরেজ কবি টি. এস. এলিয়ট মনে করতেন, ধর্ম হচ্ছে সংস্কৃতির জননী। আজকের যে পাশ্চাত্য বা খ্রিষ্টান সংস্কৃতি, এলিয়ট মনে করতেন এর প্রাণস্বরূপে আছে ক্যাথলিক চার্চ ও ক্যাথলিক সংস্কৃতি।

পশ্চিমা সাহিত্যে কালচার কথাটা আজকাল বিভিন্ন প্রেক্ষিতে ব্যবহৃত হয়। যেমন: এসথেটিক কালচার, এথিকাল কালচার, পলিটিক্যাল কালচার, ডেমোক্রাটিক কালচার, রোমান্টিক কালচার। এগুলো হচ্ছে মানুষের ভাব ও চিন্তার জগতের অভিজ্ঞতা এবং আলোড়নের ফল। পশ্চিমে একসময় যখন মার্ক্সবাদীরা প্রভাবশালী হয়ে উঠে, সংস্কৃতিকে তারা অর্থনৈতিক মানদণ্ডে বিশ্লেষণের কথা বলেন। এ সূত্রেই আমরা শুনতে পাই প্রোলেতারিয়েত কালচার ও বুর্জোয়া কালচারের কথা। এভাবে সংস্কৃতিকে ভাগ ভাগ করে বিশ্লেষণের একটা সুবিধা হচ্ছে সংস্কৃতির জটিলতাকে কিছুটা হলেও কাটানো যায়। কিন্তু অসুবিধার দিকটা হলো- সংস্কৃতির সমগ্রটুকু একসাথে চোখে পড়ে না। নৃবিজ্ঞানীদের ঝোঁক এই সমগ্রটুকু নিয়ে। তারা সংস্কৃতি বলতে বোঝেন একটি জনসমাজের সামাজিক উত্তরাধিকার। এই উত্তরাধিকারের মধ্যে যেমন পড়ে খেত চষার লাঙল, নীতি চেতনা, ধর্মীয় ধ্যানধারণা তেমনি শিল্প-সাহিত্য-সংগীত-চিত্রকলা প্রভৃতি। এই হিসেবে নৃবিজ্ঞানীদের কাছে সংস্কৃতি প্রত্যয়টি অনেক ব্যাপক। সে দিক দিয়ে টি. এস. এলিয়টের কথাটাই ঠিক। জীবনের নানা স্তরে মানুষের ভাবজগতে এক ধরনের আলোড়ন ঘটে এবং এই আলোড়ন প্রকাশের ক্ষেত্রে যে রূপ বা সৌন্দর্য তৈরি হয়, তা-ই সংস্কৃতি।

সংস্কৃতি ও সভ্যতা
বাংলা ভাষায় 'সংস্কৃতি' ও 'সভ্যতা' শব্দ দুটির অর্থ খুব বেশি সুনির্দিষ্ট নয়। সংস্কৃতির সীমানা কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে আর কোন জায়গা থেকে ঠিক সভ্যতার শুরু- এই বিভাজনরেখা আজও নির্ধারণ করা যায়নি। এটা ঠিক, সংস্কৃতি ও সভ্যতা বলতে দুটো ভিন্ন ভিন্ন জিনিস বোঝায়। কিন্তু ভিন্ন জিনিস বলেই তাদের ভেতর কোনো সম্পর্ক নেই ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়। একটা নজির দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। গাছ আর ফুল দুটি ভিন্ন অস্তিত্ব, কিন্তু সম্পর্কহীন নয় মোটেই। গাছ বাদ দিয়ে ফুলের কথা ভাবা যায় না, আবার ফুল বাদ দিয়ে গাছকে কল্পনা করাও কষ্টকর। সংস্কৃতি হচ্ছে আমার আমিত্ব, এককথায়- আত্মপরিচয়। আমি কী, আমি কী হতে পেরেছি, আমার নিজস্বতা- এইগুলো নিয়েই সংস্কৃতির কারবার।

ইকবাল বলেছেন, ব্যক্তির যেমন Ego বা পারসোনালিটি বা ব্যক্তিত্ব, তাঁর ভাষায় খুদি থাকে, তেমনি বৃহত্তর অর্থে একটা সমাজের সামাজিক খুদিও থাকে। একে বলা যায় কর্পোরেট পারসোনালিটি। ওই বিশেষ খুদির কারণে ওই সমাজের একটা Standard code of conduct, মুসলিম পরিভাষায় সামাজিক আখলাক বা ব্যবহারবিধি গড়ে ওঠে। ওই সামাজিক আখলাককে ওই জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি বলে ধরা যায়।

সভ্যতা বলতে বোঝায় মানুষের কার্যধারার বিভিন্ন দিক, সামাজিক সংগঠন, প্রকৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি। মানুষের যে বাইরের রূপ, সেই হলো সভ্যতা। এক দিক দিয়ে বলা যায়, সংস্কৃতি হলো আইডিয়া বা ভাবজগতের বস্তু। সভ্যতা বস্তুজগতের ব্যাপার। একজন পণ্ডিত বলেছেন, সংস্কৃতির কাজ হচ্ছে মানুষের মনের সুখ বর্ধন করা। সভ্যতার কাজ হচ্ছে দেহের সুখ বর্ধন করা। যদিও এই পার্থক্য সব সময় সুনির্দিষ্টভাবে ধরে রাখা যায় না। মানুষ অনেক কিছু নিজের প্রয়োজনে তৈরি করে। সেই তৈরি করা জিনিসে তারা সৌন্দর্য আরোপ করে। যাকে মনে করা হয় সংস্কৃতির পরিচায়ক। এসব বস্তু কিন্তু মানুষের দেহ ও মন উভয়েরই পরিতৃপ্তির কারণ হয়। অনেকে মনে করেন, সংস্কৃতি হচ্ছে তা-ই, যা মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে সৃষ্টি করেছে। সংস্কৃতি হচ্ছে মানুষের নিজের হাতে গড়া পরিবেশ। সংস্কৃতিবিহীন মানুষ চিন্তাই করা যায় না। যাদের আমরা আনকালচার্ড বলে তাচ্ছিল্য করি, আদিবাসী বলে উপেক্ষা করি, তাদেরও সংস্কৃতি আছে। তাদের নিজস্বতাই তাদের সংস্কৃতি।

সভ্যতা বলতে বোঝায় মানুষের ইতিহাসের একটি যুগ বিশেষের সংস্কৃতি। সভ্যতার জন্ম হয়েছে মানুষ যখন একত্রে বসবাস করতে শুরু করে তখন থেকে। তাদের মধ্যে উদ্ভব হয় জটিল নীতি-চেতনার। তারা বিভিন্নভাবে বিশেষ করে লেখনীর মাধ্যমে নিজেদের মনের অনুভূতি প্রকাশ করতে শুরু করে। এইভাবে শিক্ষা-দীক্ষায়, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, দর্শনে-সাহিত্যে, শিল্প-বাণিজ্যে, কলা-কারিগরি-স্থাপত্যে মানুষের এগিয়ে যাওয়ার নামই সভ্যতা। সভ্যতা হচ্ছে ক্রমবিকাশমান মানব-মনের চিহ্ন। তাই সভ্যতা স্থানু নয়; সতত গতিশীল। এই কারণেই সভ্যতার কোনো টেরিটরিয়াল বা জিওগ্রাফিকাল বাউন্ডারি থাকে না। কিন্তু কালচারের ন্যাশনাল বাউন্ডারি অত্যাবশ্যক। সেই হিসেবে বলা যায়, এক জাতির একাধিক সংস্কৃতি থাকতে পারে, কিন্তু সিভিলাইজেশন বা সভ্যতা তার একটিই।

ব্যাপারটা আরেকটু ব্যাখ্যা করা যাক। মুসলিম সভ্যতা বলতে আমরা কোনো মুসলিম দেশের সভ্যতার কথা বোঝাই না, বোঝাই একটা যুগের বা কালের সভ্যতা অথবা দীর্ঘ হাজার বছর ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে যে মুসলিম সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে, বিজ্ঞানে-দর্শনে-স্থাপত্যে, ললিতকলা-বুদ্ধিবৃত্তির জগতে বিভিন্ন সময় মুসলমানদের দ্বারা যে অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, তারই নাম মুসলিম সভ্যতা। সেই হিসেবে স্পেনের আল হামরা, মস্ক অব কর্ডোভা, দিল্লি-আগ্রার কুতুব মিনার, তাজমহল, মধ্যপ্রাচ্যের ক্যালিগ্রাফি, ইমাম গাজ্জালি-ইবনে রুশদ-ফারাবির দর্শন, রুমি-সাদি-খৈয়াম-ইকবাল-গালিবের রুবাইয়াৎ, গজল, কবিতা এই সভ্যতার অমূল্য ধন। এগুলো আজ কোনো ভৌগোলিক দেশের মুসলমানদের জাতীয় উত্তরাধিকার নয়; পৃথিবীর সব দেশের, সব মুসলমানদের যৌথ উত্তরাধিকার-এজমালি সম্পদ।

অন্যদিকে সংস্কৃতির একটা স্থানিক বা জাতীয় রূপ থাকে। ইসলাম যে দেশেই গিয়েছে, সেখানকার মাটি আর পরিবেশের সাথে মিলে নতুন নতুন সংস্কৃতির বিকাশ ঘটিয়েছে। নতুন জায়গায় নতুন পরিবেশে ইসলামের মূল্যবোধের গুণে নতুন নতুন সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে। এটা ইসলামের বিচিত্র সৃষ্টিশীলতার প্রকাশ। সেই হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার মুসলিম সংস্কৃতি, বাংলাদেশের মুসলিম সংস্কৃতি, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম সংস্কৃতি, সুদানের মুসলিম সংস্কৃতির মধ্যে যথেষ্ট রূপভেদ আছে। এই রূপভেদ ভাষা, জীবনপ্রণালি, সামাজিক প্রথা, খাবারের ধরণ, পোশাক-আশাক প্রভৃতির মধ্যে দৃশ্যমান। এই বৈচিত্র্য ইসলাম স্বীকার করে নিয়েছে। কারণ, পরিবেশের প্রভাবকে অস্বীকার করে চলার জো নেই। ইসলাম যেহেতু ফিতরাতের ধর্ম তাই মানুষের বাস্তব প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দিয়েই ইসলাম তার সংস্কৃতির বিচিত্র ফুল ফুটিয়েছে।

সংস্কৃতি ও ধর্ম
কালচার ও রিলিজিয়ন এক নয় এটা সত্য। আবার দুটো ভিন্ন প্রকৃতির জিনিস হয়েও এরা পরস্পর সম্পর্কিত। মধ্যযুগ পর্যন্ত পৃথিবীর সব সমাজেই রিলিজিয়নের একচ্ছত্র প্রাধান্য ছিল। রিলিজিয়নকে মনে করা হতো সংস্কৃতির উৎস। রিলিজিয়নই মানুষের চিন্তা ও কর্মের ওপর কর্তৃত্ব করত এবং এখনও বহু সমাজে তা করে থাকে। এর কারণ, ধর্মের একটা জীবনবোধ বা ইডিয়লজি থাকে। এই জীবনবোধের উত্থান, সৃষ্টি ও স্রষ্টা সম্বন্ধে যে অনন্ত জিজ্ঞাসা মানুষের মনে জাগে, তার থেকে। এই জীবনবোধ কিছুটা ইডিয়লজির আকারে থাকে- যা মানুষের ভাবজগতের বস্তু, আর কিছুটা আচারগত- যা মানুষ প্রাত্যহিক জীবনে পালন করে। এইভাবে ধর্মের মাধ্যমে একদিকে একটা জ্ঞানকাণ্ড, তত্ত্বাংশ বা Theology গড়ে উঠে, অন্যদিকে সমাজের উপযোগী আচার-অনুষ্ঠান, সামাজিক বিধিব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়ায় ধর্ম আবার সংস্কৃতিকে সৃষ্টি ও নির্মাণ করে। তাই এককভাবে বলা যায়, ধর্ম যেমন সংস্কৃতির অংশ, তেমনি ধর্ম আবার সংস্কৃতির স্রষ্টাও। যেখানে ধর্ম সংস্কৃতির স্রষ্টা, সেখানে সংস্কৃতি ধর্মেরই অংশ। ধর্মের সাথে সংস্কৃতির সম্পর্ক তাই বৈরিতার নয়; বরং সহযোগিতার।

ইউরোপে রেনেসাঁর পর থেকে সেখানে ধর্মের এই সৃজনমূলক ভূমিকাকে পাশ কাটিয়ে সংস্কৃতির প্রাধান্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা চলে। আবার ধর্মগত কালচার ছেড়ে জাতিগত কালচার বিকাশের কথা বলা হয়। এর পেছনে সেখানকার পণ্ডিতরা যুক্তি দিতে শুরু করেন জগৎ ও জীবনজিজ্ঞাসা কালে কালে বদলায়। মানুষের প্রয়োজন ও চাহিদাও বদলায়। এমনিভাবে জীবনযাত্রার তাগিদে জগৎ ও জীবনচেতনা নতুন হয়। তাই কালচার যদি নতুন চেতনার তাগিদে নতুন নতুন ভাবে না বদলায়, তাহলে সমাজ অচল হয়ে যায়। এই অচলতা থেকে বাঁচার জন্যই আমাদের কালচারের সাধনা দরকার। ইউরোপের পণ্ডিতরা আমাদের বুঝানোর চেষ্টা করেছেন কালচারের মতো ধর্মের লক্ষ্য সৃষ্টি নয়; এটি হচ্ছে মূলগতভাবে স্থিতিধর্মী। ধর্মের যে জীবনবোধ, তা শাশ্বত বা চিরন্তন। তাকে পরিবর্তন করা যায় না। এর থাকে নিজস্ব গৎবাধা 'কোড'। এক যুগের কোড দিয়ে ধর্ম চায় সবযুগের জীবনযাত্রাকে একটি বিশেষ ছকে বেঁধে ফেলতে। এই পণ্ডিতদের ধারণা- ধর্ম সৃষ্টি করে না; ধর্ম সৃষ্টিকে আটকিয়ে রাখে। ইউরোপীয় পণ্ডিতদের এই ধর্মবিষয়ক বিবেচনা সঠিক নয়। যুগের সাথে মিলিয়ে ধর্মের চলার মতো একধরনের নিজস্ব ডায়নামিজম আছে। একটা নিজস্ব স্থিতিস্থাপকতা ধর্মকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এটা না থাকলে যুগযুগান্তব্যাপী মানবসমাজে ধর্ম টিকে থাকতে পারত না কিংবা ধর্মের প্রেরণায় দেশে দেশে শিল্প, সাহিত্য, স্থাপত্য, দর্শন, ইডিয়লজি, সমাজ-সংস্কৃতি সৃষ্টির বান জাগত না। যে জিনিস সৃষ্টি করতে পারে, যে জিনিস মানুষের মনের অনন্ত রস-পিপাসা নিবারণ করে, যে জিনিস মানুষের নশ্বরতা ও অস্থায়িত্বের মুখে তার পরম আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়, তা কী করে গৎবাধা ও স্থিতিধর্মী হয়? ধর্ম যখন সৃষ্টিশীল, তখন তাকে বড়োজোর বলা যায় ধর্মগত সংস্কৃতি। ধর্ম হিসেবে ইসলামের নিজস্ব সাংস্কৃতিক বাছবিচার আছে। এই বিচারের ভিত্তিতেই ইসলাম তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ তৈরি করে- যা ইউরোপীয় পণ্ডিতদের ব্যাখ্যা-তফসির থেকে পৃথক। ইসলামের বিবেচনায় নিম্নশ্রেণির প্রজাতি থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের উত্থান ঘটেনি। ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে এই পৃথিবীর একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন, যিনি মানুষকে তৈরি করেছেন আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে। সেই হিসেবে পৃথিবীর প্রথম মানুষ ছিলেন সভ্য ও সুসংস্কৃত- যাকে আল্লাহ পৃথিবীর খলিফা মনোনীত করে একটি জীবনধারা, পদ্ধতি বা কোড সহকারে প্রেরণ করেছিলেন। এই মানুষকে আমরা আল্লাহর নবি হিসেবে শ্রদ্ধা করি; যিনি এই পৃথিবীকে আবাদ করেন, নতুন সমাজের গোড়াপত্তন করেন এবং জীবনের প্রাণচাঞ্চল্যে পৃথিবীকে ভরিয়ে দেন। যে নতুন সমাজ তৈরি হয়, তার স্থায়িত্বের জন্য প্রয়োজন পড়ে নতুন মূল্যবোধ। কোড, কন্ডাক্ট, অর্ডার। পয়গম্বরই আল্লাহর নীতির ভিত্তিতে দেখিয়ে দেন নতুন কোড অফ কন্ডাক্ট।

এইভাবে সমাজ এগিয়ে চলে, নতুন সভ্যতার বিকাশ হয়। আবার কালের যাত্রাপথে এই সব সমাজের মধ্যে নানা রকম অসংগতি, বিকৃতি আসে। সেই বিকৃতি মোচনে নতুন পয়গম্বরের দরকার হয়। নতুন কালের উপযোগী করে তিনি নুতনভাবে আল্লাহর নীতিকে ব্যাখ্যা করেন। এই সিলসিলা শেষ হয় এসে রসুল মোহাম্মদ সা.-এর মধ্যে। সব পয়গম্বরই আল্লাহর একই নীতিকে ব্যাখ্যা করেছেন, আল্লাহর তৌহিদের ধারণাকে বুলন্দ করার চেষ্টা করেছেন এবং সেই ধারণার ভিত্তিতে সমাজ প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছেন। তৌহিদের নীতি হচ্ছে শাশ্বত, কিন্তু কালের ঝোঁক হচ্ছে পরিবর্তনের দিকে। তৌহিদের নীতিকে অক্ষুণ্ণ রেখে কালের গতিতে যে মানুষের রুচি, মূল্যবোধ, প্রয়োজন বদলায়, তার স্বীকৃতি ইসলাম দিয়েছে।

ইসলামি সমাজব্যবস্থার মধ্যে এই যে গতিশীলতার নীতি- এ কালে তার মূল্যবান ব্যাখ্যা দিয়েছেন আল্লামা ইকবাল তাঁর বিখ্যাত 'ইসলামে ধর্মীয় চিন্তার পুনর্গঠন' শীর্ষক বক্তৃতাবলিতে। ইসলামের এই গতিশীলতার নীতিকে বলা হয় ইজতিহাদ। ইসলামে পরিবর্তনশীল সময় বা আধুনিক জীবনের টানাপোড়েনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ইজতিহাদ প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে। আধুনিক জীবনযুদ্ধের নানা রকম জটিলতায় সব রকম সমস্যার সমাধান অক্ষরিক অর্থে কুরআন-হাদিস থেকে না-ও পাওয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে এর উত্তর খুঁজতে হয় কুরআনের নীতির ভিত্তিতে স্বাধীন বিচার-বুদ্ধি প্রয়োগ করে। ইজতিহাদ হচ্ছে সময়োপযোগী পরিবর্তনের জন্য স্বাধীন বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগের কৌশল। মুসলিম সমাজে ইজতিহাদের প্রক্রিয়া মোটের ওপর সব সময় চালু ছিল। কালের নানা ঝড়-ঝাপটা তরঙ্গ হয়তো ইসলামকে বিভিন্ন সময় অতিক্রম করতে হয়েছে। সেসময় কারও কারও মনে হতে পারে, ইসলামের কালোপযোগিতা কিংবা যুগোপযোগিতা বোধ হয় শেষ হয়ে গিয়েছে। ব্যক্তির মতো সভ্যতারও উত্থান-পতন আছে। মুসলিম সভ্যতাও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু সেই পতনের প্রান্ত থেকে ইসলাম বারবার শুধু ঘুরে দাঁড়ায়নি; বরং তার সংস্কৃতিরও নতুন বিকাশ ঘটেছে। এই কারণে তার অন্তর্গত ডায়নামিক্স কখনও অচল হয়ে যায়নি। মুসলিম সমাজ তাই বদ্ধজলা নয়। তার সংস্কৃতিও সৃষ্টিহীন নয়। মুসলিম সংস্কৃতি একটা গতিমান ধারণা।

মুসলিম সংস্কৃতি
মুসলিম সংস্কৃতি হচ্ছে আদর্শভিত্তিক। কুরআনে ইসলামকে দ্বীন বলা হয়েছে। দ্বীন মানে হচ্ছে জীবন-দর্শন বা জীবনের একটা সুষ্ঠু আদর্শবাদ। মুসলিম সংস্কৃতি এই আদর্শবাদের ভিত্তিতেই বিকশিত হয়েছে। কোনো কোনো সংশয়ী ইউরোপীয় পণ্ডিতদের যে মত -সংস্কৃতির উত্থানে ধর্মের কোনো ভূমিকা নেই- এই কথা ইসলামের ক্ষেত্রে আদৌ খাটে না। ইসলামের বিপুল জীবনীশক্তি ও তার রসুলের অসাধারণ ব্যক্তিত্বের গুণেই মুসলিম সংস্কৃতির ফুল ফোটে এবং প্রথমে আরবে, পরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে তার খুশবু ছড়ায়। এইভাবে ইসলামি আদর্শবাদের ভিত্তিতে মুসলিম সংস্কৃতি আর সেই সংস্কৃতির বুক চিরে মুসলিম সভ্যতার পত্তন হয়। মোহাম্মদ আসাদের মতো বুদ্ধিজীবী মনে করতেন কুরআনের নীতিই হচ্ছে মুসলিম সংস্কৃতি বিকাশের পূর্বশর্ত। তাঁর ভাষায়:
Ours was an ideological civilization with the ideology of the Quran as its source, and more than that-for its only justification.

আসাদ আরও উল্লেখ করেছেন, পৃথিবীর অধিকাংশ সভ্যতার উত্থান ঘটেছে এক অস্পষ্টতা ও দুর্বোধ্যতার মধ্যে এবং এসব সভ্যতার জন্মের মুহূর্তটাকে নির্দিষ্ট করে আঙুল তুলে দেখানো আজ আর সম্ভব নয়। অনেক সভ্যতার উত্থান খুঁজতে হয় কোনো অনৈতিহাসিক মিথ বা কিংবদন্তীর মধ্যে। অনেক সভ্যতা ইতিহাসের নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও বিবর্তনের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়, কিন্তু মুসলিম সভ্যতার ক্ষেত্রে সেরকম অস্পষ্টতার বালাই নেই। আসাদ লিখেছেন :
The civilization of Islam burst all of a sudden into life, endowed from the very beginning with all the essential attributes of a civilization: a sharply outlined community, a characteristic world view, a comprehensive system of law, and a definite pattern of social relations. This endowment was due not to many cross-currents and traditions but to a single, historic event: the revelation of the Quran, and to a single historic personality: the Arabian Prophet.

হযরত মোহাম্মদ সা.-এর ব্যক্তিত্বই যে মুসলিম সভ্যতার পত্তনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে মোহাম্মদ আসাদের মতো ইকবালও সেকথা উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন- ইসলামের নবির ওহিপ্রাপ্তির ঘটনার ভেতর দিয়ে সত্যিকার অর্থে মুসলিম সংস্কৃতির যাত্রা শুরু হয়। এ কারনেই ইকবাল দাবি করেছেন, মুসলিম সংস্কৃতি মূলত ধর্মগত সংস্কৃতি। প্রকাণ্ড মুসলিম জগতের পরস্পরের মধ্যে যে মিল তা এই ধর্মগত সংস্কৃতির মিল। সে মিল ইসলামের ও ইসলামের সঙ্গে সম্পর্কিত নিয়মনীতির মিল। আমরা যে 'মুসলিম উম্মাহ' কথাটা বলে থাকি, তা এই ধর্মগত সংস্কৃতির জোরে। আবার যে Brother in religion কথাটা আমরা ব্যবহার করি, তাও একই জোরে। মুসলিম সংস্কৃতির মূল বুনিয়াদ হচ্ছে তৌহিদ। এর অর্থ মানবজীবনে তৌহিদের নীতি প্রতিষ্ঠা এবং এই নীতির ভিত্তিতে সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব ও মানবতাবাদের বিকাশ সাধন করা। কথাটা আরেকটু স্পষ্ট হওয়া দরকার। মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ব্যাপারটা ভাষা, রক্ত, বর্ণ, শ্রেণি, অঞ্চল ইত্যাদি সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে না; এটা গঠিত হয় দ্বীনের ভিত্তিতে। এরা একই দ্বীনের অনুসারী, একই চিন্তা-ভাবনায় উদ্বুদ্ধ এবং একই লক্ষ্যপথের যাত্রী। এই দ্বীনভিত্তিক সমাজকে পরিচিত করানোর জন্য ইকবাল 'মিল্লাত' শব্দটির ওপর বেশি জোর দিয়েছেন। রসুল সা. এই মিল্লাতকে একটি মানবদেহের সাথে তুলনা করেছেন, যার কোনো অঙ্গে ব্যথা অনুভূত হলে পূর্ণ দেহটিই ব্যথায় জর্জরিত হয়ে ওঠে।

রসুল সা.-এর ইন্তেকালের পর দীর্ঘ ১৪০০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এ সময় ইসলামকে নানা উত্থান-পতন, টানাপোড়েন, কলহ-বিবাদ, গৃহদাহের মতো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছে। শিয়া-সুন্নিতে কলহ হয়েছে। শাফেয়ি, হানাফি, হাম্বলি, মালেকি, লা-মাযহাবিতে বিস্তর বিবাদ- বিসংবাদের মতো পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। মুতাজিলা, জাবরিয়া, কাদরিয়া, কারামতিয়া, ইসমাইলিয়া, আশারিয়া ইত্যাদি নানা মতের আবির্ভাব ইসলামের মধ্যে হয়েছে। সুফি, দরবেশ, পীরদের ভিন্ন ভিন্ন তরিকা-সাধনপদ্ধতির বিকাশ হয়েছে, আবার এদের সাথে শরিয়তপন্থিদের ঝগড়াও চলেছে। স্বার্থের কারণে মুসলিম রাজা-বাদশাহতে বিস্তর খুনোখুনিও হয়েছে।

তবুও বলতে হবে- অন্য ধর্মের মতো ইসলাম ধর্মে কোনো অস্পষ্টতা নেই। খুবই পরিষ্কার, সুস্পষ্ট। এর নড়চড় হওয়াও শক্ত। কোনো কিছুই এর পরিবর্তন ঘটেনি। মুসলিম ধর্মমত অনেকাংশেই একরূপ রয়ে গেছে। এর কারণ, এর মূল বুনিয়াদ হচ্ছে তৌহিদ, যার ব্যাপারে ইসলাম নড়চড় কিংবা একটুও আপস করেনি। এই কারণেই ইসলাম দেশগত বা জাতিগত ধর্ম নয়। এটি সকল মানুষের একমাত্র ধর্ম হওয়ার স্পর্ধা রাখে। সেই হিসেবে ধর্মগত বিচারে এর কোনো ন্যাশনাল ক্যারেক্টার নেই, পুরোটাই আন্তর্জাতিক। এর চেহারা তাই পুরোপুরি সর্বজনীন।

এতো গেল মুসলিম সংস্কৃতির ধর্মগত দিক। ধর্মগত দিকের বাইরে এই সংস্কৃতির একটা পরিবেশগত দিকও আছে। প্রকৃতি ও পরিবেশ মানুষের মনন বৈশিষ্ট্যে ছাপ ফেলে। তার ফলে সংস্কৃতির মধ্যে দেশে দেশে রূপভেদ দেখা যায়। এই পরিবেশগত সংস্কৃতির তাই একটা জাতীয় রূপ থাকে। এইভাবে ইসলাম একই সঙ্গে জাতীয়তা ও আন্তর্জাতিকতার সাধনা করেছে। ইসলাম যখন চীন, জাভা, মালয় থেকে বোখারা, ইস্পাহান, মরক্কো, ইস্তাম্বুল, আলবেনিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে, তখন বিভিন্ন স্থানের মুসলমানদের সৃষ্টিধারা ও জীবনধারা একইভাবে প্রবাহিত হয়নি। এই রূপ-বৈচিত্র্যকে ইসলাম মেনে নিয়েছে। বলা চলে এই বৈচিত্র্য সৃষ্টির কারণে মুসলিম সংস্কৃতির বিপুল বিকাশ ও সমৃদ্ধি ঘটেছে। স্পেনের মুরদের সৃষ্টিধারা, ভারতে মোঘলদের সৃষ্টি, মধ্যপ্রাচ্যে আরবদের সৃষ্টি, তুর্কিদের সৃষ্টির মধ্যে বিস্তর রূপভেদ আছে। মুরদের স্থাপত্যের সাথে তুর্কিদের স্থাপত্যের রূপভেদ ঘটেছে। ইরানি কবিরা যেখানে ইসলামের মরমি সাধনার দিকে ঝুঁকেছেন, আরবি কবিরা সেখানে রণ-দামামার ছবি এঁকেছেন। আবার দেখা যায়, পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার মারফত কিন্তু মুসলিম সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে। অন্যদিকে পরিবেশের কারণে বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের জীবনযাত্রা, আচার-অনুষ্ঠান, জীবনের উপায়-উপকরণের ব্যবহারের মধ্যে ঘটেছে তফাত। এই তফাতের কারণে দেশে দেশে মুসলিম সংস্কৃতির যে বাইরের রূপভেদ ঘটেছে, তা কিন্তু ইসলামবিরোধী নয়। দেখতে হবে, পরিবেশগত মূল্যবোধ ইসলামি ভাবধারার সাথে সাংঘর্ষিক কিনা কিংবা ইসলামি ভাবধারার বিপরীত মূল্যবোধ এটি ধারণ করে কিনা। কেউ আরবিতে কথা বললেই যেমন তা ইসলামি হয়ে যায় না, তেমনি ভিন্ন পরিবেশে বা ভাষার মারফত সংস্কৃতি চর্চা করেও তা মুসলিম সংস্কৃতির বাগানে ফুল ফোটাতে পারে। অনেক মুসলমানের সন্তানরাই আজকাল মার্কসের চর্চা করছেন কিংবা পশ্চিমি মূল্যবোধের অনুগ্রাহী হয়ে উঠেছেন, তাই বলে তো একে আর ইসলামি পদবাচ্য বলা যাবে না। ইসলামের তৌহিদের বিরোধী নয় এবং মানব-মনের সর্বজনীনতার দিকগুলো তুলে ধরে এরকম সবকিছুই ইসলামি সমাজে গৃহীত হতে পারে। আটশ বছর হলো ইসলাম বাংলাদেশে এসেছে। ইসলাম অনুসারীরা এই ভূখণ্ডের অনেক জীবনাচার, উপায়-উপকরণ, খাদ্যাভ্যাস রপ্ত করে নিয়েছেন। কিন্তু ইসলাম যা নেয়নি তা হলো- এই ভূখণ্ডের প্রাক-ইসলামিক শিরক-বিদআত আর দেবপূজা, দেবমন্দিরের সংস্কৃতি।

আবার সপ্তম শতাব্দীর মুসলিম সমাজের সাথে আজকের মুসলিম সমাজের বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। সপ্তম শতাব্দীর মুসলিম সমাজ এখন আর কোথাও অব্যাহত নেই। কালগতিতে মুসলিম সমাজের অনেক পরিবর্তন এসেছে। এ কালের, এ যুগের সভ্যতার অনেক দানই আমরা গ্রহণ করেছি। এর অনেক কিছুই পশ্চিমি সভ্যতার দান- যা তাদের বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষতার ফসল। এই উৎকর্ষতার অনেক কিছুই ইসলাম নিয়েছে, কিন্তু যা নেয়নি তা হলো- পাশ্চাত্য সভ্যতার একালের সেক্যুলার ভিত্তিকে। কারণ, এটি তার তৌহিদের পরিপন্থি।

দেশ, কাল ব্যতীত শ্রেণিভেদে, অর্থনৈতিক কারণে সংস্কৃতির রূপভেদ ঘটেছে। মুসলমান চাষীর কালচার আর মুসলমান আমির-ওমরাহদের কালচার একই ধারায় অব্যাহত থাকেনি। ধর্মীয় নীতিতে ইসলাম সমদর্শী বা সমরূপী হলেও আমাদের আত্মস্বার্থপরতার কারণে এই বিভাজন ঘটেছে এবং একজনকে অধিকারবঞ্চিত করে অন্যের স্ফীতি ঘটেছে। এটা ইসলামি নীতির পরিপন্থি এবং ইসলামকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার ফল।

টিকাঃ
১. Muhammad Asad, This Law of Ours and other Essays. Gibraltar: Dar Al- Andalus, 1981.
২. Ibid.

📘 মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান 📄 বাঙালি কাকে বলে

📄 বাঙালি কাকে বলে


এক.
বাঙালি ও বাঙালিত্বের সত্যিকারের সংজ্ঞা ও রূপ সম্পর্কে এ পর্যন্ত কোনো বুদ্ধিজীবী আমাদের তেমন কোনো স্বচ্ছ ধারণা দিতে পারেননি। তবে এক্ষেত্রে বলা যায়- বাঙালি সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার-প্রসারে আয়োজনের কিন্তু কমতি নেই কোথাও। বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে আবহমান বাংলা, হাজার বছরের বাঙালি, বাঙালি সংস্কৃতি প্রভৃতি শব্দ ও শব্দবন্ধ সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্যযুক্ত প্রচার-প্রোপাগান্ডার বাহক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এই সব শব্দের অর্থ কী? এর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যঞ্জনা আমাদের কীসের ইঙ্গিত দেয়? হিন্দু ও মুসলমান সত্তার উর্ধ্বে তৃতীয় কোনো সত্তা আছে কি? থাকলে এর স্বরূপ কী? অর্থাৎ সেই বাঙালিত্ব জিনিসটা কী এবং কাকে আমরা বাঙালি বলব?

বাঙালিয়ানার এই বিতর্কে প্রবেশ করার আগে বলে রাখি- আমাদের এখানে এইসব দৃষ্টিভঙ্গির প্রচারক হচ্ছেন একদল মার্ক্সবাদী ও পশ্চিমের উদারনৈতিক চিন্তা-ভাবনায় প্রভাবিত বুদ্ধিজীবী ও চিন্তক। এরা দাবি করেন, বাঙালি সংস্কৃতি-জাতীয়তাবাদ হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষ। জাতি পরিচয় নির্ণয়ে এরা মুসলমানিত্বের পরিবর্তে বাঙালিত্বকে অগ্রাধিকার দিতে আগ্রহী। এইভাবে তারা জাতি-পরিচয় নির্মাণে ইসলামের অগ্রবর্তী স্থানকে ক্ষুণ্ণ করে হিন্দু ও মুসলমানের যৌথ অবদানে গঠিত স্থানিক সংস্কৃতিকে আদর্শ বলে গ্রহণ করেছেন। হিন্দু ও মুসলমান ধর্মের কিছু কিছু নিয়ে এবং পরস্পরের মধ্যে সমন্বয় করে এরা একটি নতুন সাংস্কৃতিক ধর্মের উজ্জীবনও ঘটিয়েছেন। এটাকেই তারা বলছেন বাঙালিত্ব। সংস্কৃতির মধ্যে আদান-প্রদান হয়, ভাব বিনিময় হয়। পারস্পরিক সহাবস্থানের ভেতর দিয়ে একটি আরেকটিকে প্রয়োজনে পুষ্টিও জোগাতে পারে। কিন্তু সমন্বয় বলতে যা বোঝায়- তা কখনও সম্ভব হয় না এবং জগতে তার কোনো নজির নেই।

বলা বাহুল্য, আমাদের সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীরা এই নজিরবিহীন কাজটি সফল করতে নিশিদিন পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। বাঙালি সংস্কৃতি-জাতীয়তাবাদের রূপ সম্পর্কে এরা যে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন, তার বাস্তব ভিত্তি কতটুকু তা আমাদের সবার আগে জানা দরকার। এটাও জানা প্রয়োজন, এই চিন্তা-ভাবনার পেছনে যে রাজনৈতিক শক্তি কাজ করছে তাদের উদ্দেশ্য কেমন?

আগেই বলেছি এই বাঙালি সংস্কৃতি-জাতীয়তাবাদের চিন্তা-ভাবনা প্রচার করেছেন পশ্চিমের সেক্যুলার ও লিবারেল চিন্তা-ভাবনায় প্রভাবিত একদল লেখক, শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতি কর্মী। পশ্চিমের সেক্যুলার শিক্ষা গ্রহণ করে এবং এর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে গত শতকের বিশের দশকে ঢাকায় বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সূচনা হয়। ইসলামকে অতিক্রম করে এ আন্দোলনের প্রবক্তারা পশ্চিমকে আরাধ্য করে তোলেন। অবশ্য এ আন্দোলন বেশিদিন টেকেনি। তবে ষাটের দশকে এসে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগে এই ধারার আদর্শ ও চিন্তা-ভাবনা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চলে। আওয়ামী লীগের আন্দোলনের পাশাপাশি ছায়ানটের মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয় এবং আবুল ফজল, আবদুর রাজ্জাক, আহমদ শরীফ, আনোয়ার পাশা, মোফাজ্জেল করীম, আবদুল হক ও পরবর্তীকালে আনিসুজ্জামান, মোস্তফা নূর উল ইসলাম, আবদুল গাফফার চৌধুরী, ওয়াহিদুল হক, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, গোলাম মুরশিদ, হাবিবুর রহমান প্রমুখ এ ধারার প্রতিনিধিত্ব করেন।

কমিউনিস্টরা ছিলেন বরাবরই প্রলেতারীয় সংস্কৃতির অনুসারী। সে হিসেবে তারা চল্লিশের দশকে সূচিত মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদী পাকিস্তান আন্দোলনকে নিপীড়িতের সংগ্রাম হিসেবে উল্লেখ করে একে পূর্ণোদ্যমে সমর্থন করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের মধ্যেই মেরুকরণ, বিভাজন ও নানা রকমের অসংগতি দেখা দেয়। ফলে কমিউনিস্টরা তাদের প্রলেতারীয় সংস্কৃতির ডগমা ছেড়ে শিল্পকলা, নন্দনতত্ত্ব ও সংস্কৃতির উদারনৈতিক বুর্জোয়া আদর্শকে অনেকটাই আত্মস্থ করে নেয়। এইভাবে প্রলেতারীয় সংস্কৃতির বাহকরা কালক্রমে বুর্জোয়া আদর্শের তল্পীবাহকে পরিণত হয় এবং মার্ক্সবাদী ও বুর্জোয়া মানবতাবাদী ধারার বুদ্ধিজীবীদের চিন্তা-ভাবনার মধ্যে একধরনের অভিন্নতাও প্রতিষ্ঠিত হয়। এখন এই দুই ধারার বুদ্ধিজীবীরা বাঙালি সংস্কৃতি প্রসঙ্গে প্রায় একই রকম চিন্তা-ভাবনা করেন বলেই মনে হয়।

মার্ক্সবাদী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আছেন সালাহউদ্দিন আহমদ, বদরুদ্দীন উমর, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আহমদ রফিক, আবুল কাশেম ফজলুল হক, যতীন সরকার প্রমুখ। বুর্জোয়া চিন্তা-ভাবনার থেকে তফাত করে এদের চিন্তা-ভাবনার মৌলিকত্ব আবিষ্কার করা এখন বেশ দুষ্করই বটে। মোটের ওপর এরা সেক্যুলার রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী এবং মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদী রাজনীতি ও সংস্কৃতির ঘোর প্রতিপক্ষ। এরা বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানের যে স্বতন্ত্র সংস্কৃতি রয়েছে এ কথা আদৌ বিশ্বাস করেন না। এরা মনে করেন, বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান উভয়ের সংস্কৃতি অভিন্ন। এ আলোচনায় দেখানোর চেষ্টা করা হবে- বাঙালি সংস্কৃতির তাত্ত্বিক গঠনের অন্তঃসারশূন্যতা এবং বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানের সংস্কৃতির অভিমুখের ভিন্নতা, যে কারণে সকল বাংলা ভাষাভাষী মিলে আজতক এক জাতি-সংস্কৃতি গঠনের চেষ্টা কখনোই ফলবতী হয়নি। গতানুগতিক ধারায় সংস্কৃতি বলতে আমরা চারুকলা বিশেষত সাহিত্য, সংগীত, শিল্পকলাকে বুঝি এবং সংস্কৃতির এই সব বহিরাঙ্গিক উপাদান দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট সংস্কৃতিকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করি। কিন্তু সংস্কৃতিকে আরও গভীরতরভাবে বুঝতে হলে সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের ধারায় বিশ্লেষণ করা দরকার।

নৃবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা কোনো একটি জনসমাজের সংস্কৃতির স্বরূপ বিবেচনা করতে গিয়ে নানা রকম উপাদানকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন- যা নিয়ে সংস্কৃতি গঠিত হয়। এগুলো হচ্ছে- ধর্ম, ভাষা, শ্রেয়োবোধ ও মূল্যবোধ, খাদ্যাভ্যাস, আত্মীয়তা, বিবাহের রীতিনীতি, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পদ্ধতি, পোশাক-পরিচ্ছদ, গৃহনির্মাণ পদ্ধতি, চারুকলা, ঐতিহ্যসূত্রে প্রাপ্ত চিন্তা ও বিশ্বাস প্রভৃতি। পণ্ডিতদের ভেতর এসব উপাদানের মধ্যে সংস্কৃতির প্রধান ভিত্তি কোনটি- এটা নিয়ে আছে মতবিরোধ। কেউ কেউ বলেছেন ভাষা, কেউ কেউ বলেছেন ধর্ম। পৃথিবীর প্রতিটি জনসমাজ বা জনগোষ্ঠীর স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত হয় এই ধর্ম কিংবা ভাষা দিয়ে। এই ধর্ম বা ভাষা একটি জনগোষ্ঠীর জাতিতাত্ত্বিক (Ethnic) পরিচয়ের প্রতীক হিসেবেও চিহ্নিত হয়। তবে এটি সর্বজনীন ঘটনা নয়। এসব বৈশিষ্ট্যের সাথে সমাজবিজ্ঞানীরা অবশ্য নরগোষ্ঠীগত (Race) বৈশিষ্ট্যকেও বিবেচনার কথা বলেছেন। তারপরেও স্বীকার করতে হবে সংস্কৃতি একটি জটিল বিষয়। বিচিত্র সব বিষয়কে একটি সংস্কৃতি আত্তীকরণ করে। সুতরাং একরৈখিক কোনো সংজ্ঞা দিয়ে সংস্কৃতির পরিচয় নির্ধারণ করতে গেলে অনেক জটিলতার সম্মুখীন হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। এখন এসব উপাদানের আলোকে বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানের সংস্কৃতি অভিন্ন কিনা তা যাচাই করে দেখা যেতে পারে।

দুই.
আমাদের সেক্যুলারবাদীদের মতে, বাঙালি সংস্কৃতি-জাতিত্বের প্রধান ভিত্তি হচ্ছে বাংলা ভাষা। তাদের দাবি- ভাষার সম্পর্ক একদিক থেকে ধর্মের সম্পর্কের চেয়েও নিবিড়। এই কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের ধর্মের মিল থাকলেও তা ভাষার ভিন্নতার কারণে আলাদা হয়ে যায়। অবশ্য আমাদের সেক্যুলারবাদীরা কখনও বলতে পারেননি- ভাষানুগত্য যদি এখানে বড়ো ব্যাপার হয়, তাহলে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দুরা কেন পূর্ববঙ্গের বা বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমানের সাথে মিলে এক অখণ্ড বাঙালি সংস্কৃতি-জাতিত্বের বিকাশ ঘটাতে পারলেন না? বাঙালিত্বের পূর্ণাঙ্গতার জন্য তো দুই বঙ্গের একত্রীকরণ জরুরি। কিন্তু ইতিহাস সেভাবে এগোয়নি। এখানে বাঙালিত্ব অপেক্ষা বাঙালি হিন্দুর ধর্ম রক্ষার ব্যাপারটাই বড়ো হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু ধর্মের কারণেই বাঙালি হিন্দুরা প্রতিবেশী বাংলাভাষী মুসলমানের চেয়ে অবাঙালি হিন্দুর সাথে মিলে ভারতীয় জাতি গঠনে উদ্যোগী হয়েছে। এ তো গেল রাষ্ট্রনৈতিক ব্যাপার। আমাদের বাস্তবজীবনে বাঙালিত্বকে বেশি জোর দেওয়া হয় না মুসলমানিত্ব-হিন্দুত্বকে বড়ো করে দেখা হয়- তাও এখানে বিবেচনা করা যেতে পারে।

শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত উপন্যাসে একটা মেয়ের কথা উল্লেখ আছে, যার বাড়ি ছিল বর্ধমানে। কিন্তু তাকে বর্ণের কারণে বিয়ে দেওয়া হয় বিহারে। কারণ, দেশে স্ববর্ণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে অভিভাবকরা বাঙালিত্বের নামে কোনো মুসলমান জমিদার নন্দনের সাথে বিয়ে না দিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাগ্নী সরলাদেবীকে বিয়ে দেয় সুদূর পাঞ্জাবের এক জমিদার নন্দনের সাথে। কারণ, স্ববর্ণ পেতে অসুবিধা হয়েছিল। কবির জীবনীকাররা লিখেছেন, তার নিজের বিয়ের সময়ও স্ববর্ণ পেতে অসুবিধা হয়েছিল। সুতরাং এটা পরিষ্কার- বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানের ভেতরকার আত্মীয়তার সম্পর্ক বাঙালিত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নয়; উলটো আত্মীয়তার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় ধর্মের নীতি-নিয়ম দিয়ে। একজন মুসলমান পুরুষ ও নারীর দুনিয়ার যেকোনো ভাষাভাষী মুসলমান পুরুষ ও নারীর সাথে বিয়ে-শাদি ও সামাজিক মেলামেশায় কোনো বাধা নেই। এমনকি আহলুল কিতাবদের সাথেও শর্তাধীনে মুসলমানের বিয়ের সম্পর্ক হতে পারে। কিন্তু আহলুল কিতাব নয় বলে একমাত্র ধর্মান্তর ছাড়া হিন্দুর সাথে সে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাহলে আত্মীয়তার সম্পর্ক দিয়ে যেমন বাঙালিত্ব প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে না, তেমনি বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানের বিয়ে-শাদির আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেও আছে ভিন্নতা- যা দিয়ে বাঙালিত্ব প্রমাণ করা মুশকিল।

মুসলমানি বিয়ের আচার-অনুষ্ঠান যেমন পয়গাম, কবুলিয়াত, আকদ, ওয়ালিমা, কাবিন, তালাকের মতো ব্যাপারগুলো বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতির একান্ত নিজস্ব ব্যাপার। অন্যদিকে বাঙালি হিন্দুর বিয়ের আচার-অনুষ্ঠানও তাদের একান্ত নিজস্ব ধর্মাশ্রিত। হিন্দু ধর্মীয় মন্ত্রোচ্চারণ, সাত পাকের রীতি, অগ্নি সাক্ষী, সম্প্রদান হিন্দু বিয়ের আবশ্যকীয় বিষয়। পণ বা যৌতুকের অভিশাপ এখন অবশ্য প্রতিবেশী সমাজের প্রভাবে মুসলিম সমাজেও কিছু কিছু ঢুকে পড়েছে- যার অনুমোদন আদৌ ইসলামে নেই। বিধবা বিবাহের ধারণা হিন্দু সমাজে আদৌ চিন্তা করা যেত না- যা পরবর্তীকালে আইন করে সিদ্ধ করা হয়েছে। তারপরেও হিন্দু মেয়েদের দ্বিতীয় বিয়ে হয় না- এরকম সংস্কার এখনও বাঙালি হিন্দু সমাজে ভালোমতো টিকে আছে। বিয়ে-শাদির আচারের মতো হিন্দু-মুসলমানের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রথা-পদ্ধতিটিও আমরা নিরিক্ষা করতে পারি। মুসলমানের মুর্দা গোসল করিয়ে, কাফন দিয়ে, জানাজা পড়িয়ে তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে কবরে রেখে আসা হয়। অন্যদিকে হিন্দুর লাশ মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে দাহ করা হয়। সুতরাং বাঙালিত্বের প্রশ্নটা সমাজের বাস্তবতা দিয়ে ধারন করা দরকার।

আবার ভাষার ব্যাপারটায় ফিরে যাই। প্রশ্নটা ছিল- ভাষা এক হলেই জাতিত্ব এক হয় কিনা? দুয়েকটা উদাহরণ দেখা যেতে পারে। বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, কানাডায় অন্যান্য ভাষাভাষীদের সাথে ফরাসিভাষীরাও বাস করে। এজন্য এসব দেশে একের অধিক ভাষাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন নানা রকম টানাপোড়েন সত্ত্বেও এসব দেশের ফরাসিভাষীরা কিন্তু নিজেদের জাতিত্ব ফ্রেন্স হিসেবে দাবি করেনি। তারা বেলজিয়ান, সুইস ও কানাডিয়ান হিসেবেই বসবাস করছে এবং স্ব-স্ব জাতিত্বের সীমানা কেটে বাইরে চলে আসেনি। ঠিক একই কথা খাটে জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার ক্ষেত্রে। জার্মান ও অস্ট্রিয়ানরা একই জার্মান ভাষায় কথা বলে, কিন্তু তাদের জাতিত্ব যথাক্রমে জার্মান ও অস্ট্রিয়ান। আবার ইংলিশ, স্কটস ও আইরিশরা ইংরেজি ভাষায় কথা বললেও নিজেদের একজাতি মনে করে না। আমেরিকানরাও ইংরেজি ভাষায় কথা বলে। কিন্তু তাদের জাতিত্ব ইংলিশ নয়। এই ইংরেজি ভাষার রূপ-কাঠামো, উচ্চারণ, বানানও আবার স্থানভেদে পৃথক। আমেরিকানদের উচ্চারণ, বানান, সাহিত্য ও লোক-ঐতিহ্য ইংলিশ, অস্ট্রেলিয়ান বা আইরিশদের থেকে ভিন্ন। আমেরিকানরা হুইটম্যান নিয়ে যে গৌরববোধ করে, ইংলিশরা শেক্সপিয়ারকে নিয়ে তা-ই করে। আবার আইরিশদের কাছে ইয়েটসের যেরকম মর্যাদা, ইংলিশ এলিয়টের মর্যাদা সেরকম নয়। তাই ভাষা এক হলেই জাতি বা জনগোষ্ঠী এক হবে এমন কোনো কথা নেই। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতই তার বড়ো প্রমাণ হতে পারে। বহু ভাষাভাষী দেশ হওয়া সত্ত্বেও হিন্দুত্বের ভিত্তিতে এক ভারতীয় জাতিত্ব তারা গড়ে তুলেছে। ভাষার ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি।

ভাষার তাই কোনো সর্বজনগ্রাহ্য রূপ নেই। বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান একই বাংলা ভাষায় কথা বলে ঠিক, কিন্তু একই রকম বাংলা ভাষায় কথা বলে না। লক্ষ করুণ- এখনও মুসলমানরা গোসল করে, স্নান করে না; পানি বলে, জল বলে না অথবা আল্লাহ বলে, ভগবান বলে না কিংবা বাড়িতে ভাবি ডাকে, বৌদি ডাকে না। এই ভাষিক পার্থক্যটা হুমায়ুন কবীর- যিনি আজীবন হিন্দু ও মুসলমানের মিলিত জাতীয়তাবাদে আস্থাশীল ছিলেন, তিনিও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন:
বাংলা ভাষায় সংস্কৃত ও আরবি ফারসি শব্দের ভাগাভাগ নিয়ে মতের অমিল রয়েছে, তারই ফলে একই ভাষার দুটি রূপ ফুটে উঠবার সম্ভাবনাও রয়েছে। ঢাকা-ফরিদপুরের মুসলমান চাষার কাছে ‘কাদম্বরীর’ ভাষা একেবারে বিদেশি- এমনকি, আধুনিক বাংলার অনেক মাসিক পত্রিকার প্রবন্ধ বোঝাও তার পক্ষে কঠিন। অন্যপক্ষে পুঁথি পড়ে স্কুল-কলেজে পড়া সাধারণ হিন্দুও তো আনন্দ পাবে না। অনেক জায়গায় অর্থও ঠিক ধরতে পারবে না। উর্দু ও হিন্দির ব্যাপারে ঠিক এই সমস্তই গোড়া থেকে ছিল। লিখবার আলাদা প্রণালী গ্রহণ করায় আজ তারা প্রায় সম্পূর্ণ বিভিন্ন দুটি ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলার বেলা যে তা হয়নি, তার একটি কারণ এই যে, একই হরফে হিন্দুয়ানি ও মুসলমানি বাংলা দুইই লেখা হয়। অন্য কারণ এই যে, বাংলার শ্রেষ্ঠ লেখকদের মধ্যে ভাষা নিয়ে জাতবিচার খুব বেশি প্রবল হয়ে ওঠেনি। তবু ভাষার তফাত যে খানিকটা এখানে রয়েছে, তা অস্বীকার করা চলে না।১

একই বাংলা ভাষায় তাই দুটো রূপ আছে। একটি হিন্দুয়ানি, অপরটি মুসলমানি। ইংরেজরা এটা বুঝেছিল বলেই তারা বাইবেলের তরজমা করে ব্রাকেটে লিখে দিত 'মুসলমানী বাংলায় অনূদিত'। রেভারেন্ড উইলিয়াম গোল্ডস্যাক তার মুসলমানি বাংলার অভিধানে প্রায় ছয় হাজার মুসলমানি শব্দের উল্লেখ করেছেন। তাই ফোর্ট উইলিয়ামের পণ্ডিতি বাংলার প্রচলন সত্ত্বেও এবং হরফ অপরিবর্তিত থাকার পরও বাংলা ভাষার হিন্দু ও মুসলমানি রূপ দু-ধারায় বয়ে গেছে। এর বহু রকমের সাংস্কৃতিক ও সমাজতাত্ত্বিক কারণ আছে। এর একটা হচ্ছে ধর্ম অনেক সময়ই ভাষাকে প্রভাবিত করে। এর প্রমাণ হচ্ছে উর্দু ও হিন্দি ভাষা। একটি ভাষা বা একটি শব্দ, শব্দবন্ধ ও ইডিয়ম কখনও কখনও একটি সংস্কৃতি বা জাতির প্রতীক হয়ে যায়। ভারতীয় ইতিহাসের উর্দু-হিন্দির বিবাদ তারই প্রমাণ- যার মূলে আছে ধর্মের প্রভাব। এরকম ঘটনা বাংলা ভাষাতেও ঘটেছে। ইসলাম ধর্মের প্রভাব বাংলা ভাষাও অতিক্রম করতে পারেনি। বাংলা সাহিত্যেও মুসলিম জীবনের প্রভাব পড়েছে। এ প্রভাব না থাকলে বাংলা সাহিত্য মুসলিম জীবনের প্রতিনিধিত্ব করতে পারত না। তাই পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বাংলার সাহিত্য একই বাংলা ভাষায় রচিত হলেও তার ইডিয়ম আলাদা, সাহিত্যের উপাদান, ঐতিহ্য, উপকথা, কিংবেন্ডতি আলাদা। এই আলাদা চরিত্রকে মুছে দেওয়ার জন্য আমাদের এখানকার সেক্যুলারবাদী শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতি কর্মীরা সচেতনভাবে উঠে পড়ে লেগেছেন- যাতে আমাদের মুসলিম চরিত্র ও আইডেন্টিটি ক্ষুণ্ণ হয়। এটা একান্তভাবেই সম্ভব নয়, এ কারণে ঐতিহ্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ইচ্ছায় পরিবর্তিত হয় না। এটি একটি সমাজের সম্পদ- যা হাজার বছর ধরে সমাজের ভেতর টিকে থাকে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে- ঐতিহ্য হচ্ছে একটি বিশেষ জনসমাজজাত ঘটনা; ভূখণ্ডজাত ঘটনা নয়।

এই হিসেবে বাংলাভাষী হিন্দু বা বাংলাভাষী মুসলমানের ঐতিহ্য থাকতে পারে, কিন্তু আলাদাভাবে বাংলার কোনো ঐতিহ্য থাকতে পারে না। রাম-লক্ষ্মণ, ভীম-অর্জুন, সীতা-সাবিত্রী, রাধা-কৃষ্ণ, মথুরা-অযোধ্যা, উজ্জয়িনী, ইন্দ্র-প্রস্থ বাঙালি হিন্দুর মনে যে স্মৃতি, কল্পনা, রস সৃষ্টি করে, তা বাঙালি মুসলমানের করে না। তাদের মনে আলী-হামজা, হাসান-হোসেন, হাজেরা-রহিমা-ফাতেমা, মক্কা-মদিনা-মিনা-আরাফাত-কারবালা সেই স্মৃতি, কল্পনা, রস উজিয়ে তোলে। এটা শুধু হিন্দু বা মুসলমানের কথা নয়; তামাম দুনিয়ার তামাম জাতি সম্বন্ধেই কথাটা খাটে। সব জাতির চেতনাই বিকশিত হয় তার ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে। সেই ঐতিহ্যকে বুনিয়াদ করেই সাহিত্য রচিত হয়। নাহলে সে সাহিত্য থেকে জাতি প্রেরণা পায় না। এই পার্থক্যের কথাটা পাকিস্তান আন্দোলনের সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যাতা ও আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আবুল মনসুর আহমদ নিপুণতার সাথে বিশ্লেষণ করেছেন:
বাংলার মুসলমানকে জীবনের সকল ক্ষেত্রে জাগ্রত ও জীবন্ত করে তুলতে হলে, তার জীবনে রেনেসাঁ আনতে হলে, তার সাহিত্য সাধনাকে অনুকরণ-অনুসরণ থেকে বাঁচাতে হবে। তাকে নিজস্ব সাহিত্য দিতে হবে। হিন্দুর সৃষ্ট বাংলা সাহিত্য খুবই বড়ো, খুবই জীবন্ত, খুবই উচ্চাঙ্গের। কিন্তু তার নকল করে মুসলমান অমন বড়ো, অমন জীবন্ত সাহিত্য রচনা করতে পারবে না। হোমার, মিল্টন, শেক্সপিয়রকে নকল করে রবীন্দ্রনাথ অত বড়ো সাহিত্য রচনা করতে পারতেন না। তিনি তার সাহিত্য সাধনাকে নিজস্ব কৃষ্টির ওপর দাঁড় করাতে পেরেছেন বলেই তিনি আজ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ। বাংলার মুসলমানও তেমনি রবীন্দ্রনাথের নকল করে বড়ো হতে পারবে না। তাকে বড়ো হতে হবে তার স্বকীয়ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে, নিজের কৃষ্টিকে বুনিয়াদ করে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের বিশ্ব-ভারতীর বিশ্বে কতবার শারদীয় পূজায় আনন্দময়ী মা এসেছে-গিয়েছে, কিন্তু একদিনের তরেও সে বিশ্বের আকাশে ঈদ-মহররমের চাঁদ ওঠেনি। সে চাঁদ ওঠবার ভার ছিল নজরুল ইসলামের ওপর। এতে দুঃখ করার কিছু নাই। কারণ, এটা স্বাভাবিক, কাজেই কঠোর সত্য।২

এতক্ষণ ভাষার যে রূপ, বৈচিত্র্য ও মূল্যবোধের কথা আলোচনা করা হলো তা দিয়ে কিন্তু বাঙালিত্ব বা বাঙালি সংস্কৃতি-জাতিত্বের ঐক্য প্রমাণ হয় না; বরং ঐতিহাসিকভাবেই হিন্দু ও মুসলমান যে সাংস্কৃতিকভাবে পৃথক, তার প্রমাণ কালান্তরে বাংলা ভাষাই হিন্দুয়ানি ও মুসলমানি চরিত্র অর্জন করেছে। সুতরাং গোঁফ দিয়ে যায় চেনার মতো শুধু ভাষা দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতি-জাতিত্বকে নির্ধারণ করতে যাওয়া কত দূর সঠিক তা বিবেচনা সাপেক্ষ।

তিন.
প্রখ্যাত ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন:
বাঙালি জাতি বললে যে জনসমষ্টি বাঙালা ভাষাকে মাতৃভাষারূপে বা ঘরোয়া ভাষারূপে ব্যবহার করে সেই জনসমষ্টিকে বুঝি।৩

অন্যদিকে আমাদের মার্ক্সবাদী বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর বাঙালিত্বের সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছেন এমনিভাবে:
বাংলাদেশের যেকোনো অংশে যারা মোটামুটি স্থায়ীভাবে বাস করে বাংলা ভাষায় কথা বলে, বাংলাদেশের আর্থিক জীবনে অংশগ্রহণ করে এবং বাংলার ঐতিহ্যকে নিজেদের ঐতিহ্য বলে মনে করে তারাই বাঙালি।৪

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সংজ্ঞায় ভাষাকেই বাঙালিত্বের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে উমর এই সংজ্ঞাকে একটু টেনে লম্বা করে বলেছেন বাংলা ভূখণ্ডের অধিবাসী ও তার ঐতিহ্যানুসারীদের বাঙালি বলতে হবে। অবশ্য বাংলা ভূখণ্ড বলতে তিনি ব্রিটিশ আমলের Province of Bengal-কে বুঝিয়েছেন বলে মনে হয়। সুনীতিকুমার ও উমরের সংজ্ঞার মধ্যে আংশিক সত্য আছে। এটিকে জাতিত্বের পূর্ণ সংজ্ঞা হিসেবে ধরা মুশকিল। উভয়র সংজ্ঞা অনুসারে ইউরোপ-আমেরিকায় বর্তমানে যে হাজার হাজার বাংলাভাষী বাস করে এবং এখন সেখানে তারা স্থায়ীভাবে বসবাস করার চিন্তাও করছে, তারা কি বাঙালি বলে পদবাচ্য হবে? এখন পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা শহরে বাংলাভাষীদের তুলনায় অবাংলাভাষীদের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে। দীর্ঘদিন বসবাসকারী এই বাংলা জানা জন্মসূত্রে অবাংলাভাষীদের কি বাঙালি বলে গণ্য করা যাবে? পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন স্থানে এবং আমাদের পুরোন ঢাকায় অনেক মুসলমান বসবাস করেন, যারা উর্দু মিশ্রিত বাংলায় কথা বলেন- যাকে সাধারণত খোট্টা ভাষা বলা হয়। তাদেরকে কি বাঙালি বলা যাবে? বাংলা ভাষার ব্যবহারই যদি বাঙালিত্বের পরিচায়ক হয়, তাহলে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আওয়ামী ঘরানার ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার ইশতিয়াক আহমদ, রেহমান সোবহান প্রমুখের আত্মীয়স্বজন বাঙালি বলে পদবাচ্য হবেন না। আবার বর্তমানে যারা সেক্যুলার ঘরানার বাঙালি সংস্কৃতি-জাতিত্বের তত্ত্বে নির্ভর করেন না; উলটো জাতিত্ব বিচারে ইসলামকে অগ্রাধিকার দেন, তারা কি তবে বাঙালি নন?

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে- রাষ্ট্র ছাড়া জাতি হয় না। সে হিসেবে পশ্চিম বাংলার বাংলাভাষীদের রাষ্ট্র হচ্ছে ভারত, তাদের জাতীয়তা ভারতীয়। ভাষানির্ভর বাঙালি সংস্কৃতি বা জাতিত্বে তারা আজকাল নির্ভর করেন না বলেই মনে হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশে এখন কয়েকটি উপজাতি সম্প্রদায় বাস করে; নৃতাত্ত্বিক কিংবা ভাষিক- কোনোভাবেই এদের বাঙালি বলা চলে না। বাংলাদেশ হওয়ার পর জোর করে এদের বাঙালি জাতীয়তাবাদের আওতায় আনার কুফল আমরা দেখেছি। ভাষাকে সংস্কৃতি বা জাতিত্বের ভিত্তি করলে এদেরকে আমাদের বর্জন করতে হয়।

রাষ্ট্র ছাড়া জাতি হয় না- এই ধারণা আমরা ইউরোপের সূত্রে পেয়েছি। ইউরোপে রিফরমেশনের পর জাতি-রাষ্ট্র (Sovereign state) প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু হয় এবং পরবর্তীকালে কলোনির সূত্রে এশিয়া-আফ্রিকায় তা ছড়িয়ে পড়ে। এই হিসেবে বলা যায়, একটি জনসমাজের সংস্কৃতি হচ্ছে অপেক্ষাকৃত অপরিবর্তনীয় অংশ- যা সহজে পালটায় না। কিন্তু জাতিত্ব বারবার পালটাতে পারে। ইউরোপের ইতিহাসে এরকম ঘটনা বহুবার ঘটেছে এবং সাম্প্রতিককালে এশিয়া, আফ্রিকায় এর যথেষ্ট নজির রয়েছে। মধ্যযুগে ধর্মই ছিল জাতিত্বের মাপকাঠি। ইউরোপ-এশিয়া-আফ্রিকা সর্বত্রই ধর্মকে জাতিত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এখনও অনেক দেশে ধর্ম জাতিত্বের শক্তিশালী উপাদান।

আমাদের বাংলা ভাষার বয়স প্রায় এক হাজার বছর, কিন্তু বাংলা ভাষা দিয়ে জাতিত্বের পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা খুবই সাম্প্রতিককালের ঘটনা এবং বলা চলে ষাটের দশকের আওয়ামী লীগের আন্দোলনই তার একমাত্র প্রমাণ। ঐতিহাসিকভাবে বিচার করলে বৌদ্ধ, হিন্দু ও মুসলিম আমলে আমাদের ভূখণ্ডে ধর্মই ছিল জাতিত্বের পরিচয়ের চিহ্ন। যে ভূখণ্ডকে আমরা বাংলা হিসেবে জানি, তার ইতিহাস মাত্র ৬০০ বছর। মুসলমানরা এ দেশে আসার আগে বাংলা নামে কোনো ভূখণ্ড ছিল না। বিভিন্ন নামে বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন এই ভূখণ্ডটিকে মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ করে এটিকে 'বাংলা' নামে অভিহিত করে। সে হিসেবে বাংলা ও বাঙালি শব্দটা ভৌগোলিক তাৎপর্যই বেশি বহন করত। ক্রমে বাংলা ভাষার বিকাশের সাথে সাথে এ শব্দগুলোর একটা ভাষিক ব্যঞ্জনাও শোনা যেতে থাকে, কিন্তু তা কোনোক্রমেই জাতি অর্থে নয়। ব্রিটিশ আমলে হিন্দু ও মুসলমান বাঙালি কেউ-ই ভারতকে বাদ দিয়ে জাতিত্ব নির্মাণের কথা ভাবেননি। ভারতীয়তার মধ্যেই সেদিন বাঙালিত্ব আত্মলোপ করে। ভারতীয়তা বলে কংগ্রেস যে জাতীয়তার কথা প্রচার করত তার আসলে কোনো শক্ত বুনিয়াদ ছিল না। মূলে ভারতে বরাবর দুটো জাতীয়তাবাদ ক্রিয়াশীল ছিল। একটি মুসলিম, অন্যটি হিন্দু জাতীয়তাবাদ। বলা অনাবশ্যক- এ জাতীয়তার ভিত্তি ছিল ধর্ম। এ কারণেই সে সময় 'মোসলেম ভারত', 'হিন্দু ভারত' কথাগুলো আমরা শুনেছি। এসব শব্দের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য বিশেষভাবে বোঝার মতো। ধর্মই ভারতের ইতিহাসকে যুগ যুগ ধরে নিয়ন্ত্রণ করছে। এই ধর্মীয় বিভাজনের কারণেই একসময় ভারত ভাগ হয়ে যায়। একই কারণে বাংলাও দ্বিখণ্ডিত হয়। সেই সাথে আমাদের জাতিত্বও চিহ্নিত হয় অন্যভাবে। মুসলমান প্রধান পূর্ব বাংলার বাংলাভাষীরা পরিণত হয় পাকিস্তানিতে, হিন্দু প্রধান পশ্চিম বাংলার বাংলাভাষীরা পরিণত হয় ভারতীয়তে। পূর্ব বাংলার মানুষ পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রথমে মাত্র তিন বছরের জন্য বাঙালি, পরে আবার বাংলাদেশিতে পরিণত হয়। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের বিচ্ছিন্নতার কারণ হিসেবে সেক্যুলারবাদীরা বাংলাকে উল্লেখ করেন। বাংলাকে ভিত্তি করে ষাটের দশকের স্বল্প কয়েক বছরের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনই হচ্ছে আমাদের সেক্যুলারবাদীদের ভাষিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একমাত্র নজির- যা নাকি এ ভূখণ্ডের এক হাজার বছরের ইতিহাসের মধ্যে সমুদ্রের মধ্যে বুদবুদের মতো ঘটনা। বাংলাদেশ হওয়ার পর এ দেশের মানুষ ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে পুরোপুরি গ্রহণ করেনি এবং পুনরায় ইসলাম প্রভাবিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে স্বাগত জানিয়েছে। এটি আবার একই সঙ্গে আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের শর্তও পূরণ করেছে। পাকিস্তান ভেঙে গেছে মূলত ঐ রাষ্ট্রের মধ্যকার ভৌগোলিক তফাতের কারণে। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে, যার জন্য তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃত্বের অকার্যকারিতাই দায়ী। ষাটের দশকের আওয়ামী লীগের আন্দোলন ছিল পাকিস্তানের রাজনীতির অব্যবস্থাপনার ফসল- যাকে কিনা পরবর্তীকালে 'বাঙালি জাতীয়তাবাদ' হিসেবে তত্ত্বীয় আকার দেওয়া হয় ওই রাজনীতির বৈধতা প্রতিপন্ন করার জন্য। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বৈধতা প্রতিপন্ন হতো, যদি একই ধরনের আন্দোলন পশ্চিম বাংলায়ও গড়ে উঠত। সে হিসেবে বলা যায়- ধর্মই এ অঞ্চলে জাতিত্ব নির্মাণের প্রধান উপাদান হিসেবে দীর্ঘ হাজার বছর ব্যাপী টিকে আছে।

চার.
তাহলে এটা পরিষ্কার, গত হাজার বছরেও ভাষা দিয়ে হিন্দু-মুসলমানের ধর্মোদ্ধ তৃতীয় কোনো বাঙালি সত্তা বা বাঙালিত্ব এখানে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। সেক্ষেত্রে ওই তৃতীয় বাঙালি সত্তাটির ধারণা কীসের ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে? অনেক গুণীজন মনে করেন- যেহেতু আমাদের একই পূর্বপুরুষ, তাই আমাদের একটা অভিন্ন বাঙালি সত্তা আছে। সেই হিসেবে সুনীতি কুমার একবার বলেছিলেন, মুসলমান তার রক্তের সম্পর্কের ভাই। এই বিবৃতির মধ্যে নাটকীয়তা আছে, কিন্তু বাস্তব মূল্য আদৌ নেই। রক্তের সম্পর্কের দাবি নিয়ে যদি কথা বলতে হয়, তাহলে তো বলতে হয়, সমগ্র বিশ্বমানব সমাজের একই উৎস বা একই পিতা থেকে উত্থান ঘটেছে। সেই হিসেবে পৃথিবীর যেকোনো মানুষ বা জনসমাজের সদস্য পরস্পর রক্ত সম্পর্কীয় কিংবা জ্ঞাতি গোত্র এবং একই দাবিতে তাদের সাথে সমজাতীয়ত্ব কল্পনা করাও অযৌক্তিক নয়। 'বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব' কথাটা চিন্তার জগতে বা ভাবজগতে যতখানি আলোড়ন তোলে, আমাদের বাস্তব পৃথিবীর রুঢ় চিত্র কিন্তু পুরোটাই তার অঙ্গীকার বহন করে না। সমজাতীয়ত্ব কিংবা ভ্রাতৃত্বের দাবি নিয়ে কেউ যদি আমাদের এখান থেকে ব্রিটেন বা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতে চায়, তবেই বোঝা যাবে- কত ধানে কত চাল। রক্তের সম্পর্ক কিংবা আদি পুরুষের কথা বাদ দিয়ে এখন যদি নৃগোষ্ঠী বা জাতিতাত্ত্বিক পরিচয়ের কথা ধরি, তাহলেও দেখা যায়- ধর্মের বাইরে তৃতীয় কোনো বাঙালি সত্তা সেখানে অনুপস্থিত। উলটো এই ধর্মই বাংলাভাষী জনসমাজের জাতিতাত্ত্বিক ও নরগোষ্ঠীগত (Ethnicity and Race) পরিচয়কে রাজনীতির মতোই বিভাজিত করে ফেলেছে। ভাষা এক হলেই যেমন একজাতি হয় না, তেমনি জাতিতাত্ত্বিক ও নরগোষ্ঠীগত বৈশিষ্ট্য এক হলেও জাতিত্ব এক না-ও হতে পারে। ইংরেজ ও জার্মানরা এক নরগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু কয়েকশ বছর ধরে তারা যেভাবে লাঠালাঠি করেছে, তাতে আর কেউ তাদের এক জাতীয়তার কথা শুনতে পারবে না। মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল অঞ্চলের জনসমাজ হচ্ছে সেমিটিক নরগোষ্ঠীভুক্ত। এর মধ্যে মুসলমান আছে, ইহুদি আছে, খ্রিষ্টান আছে। কিন্তু তাই বলে এখন যদি কেউ সেখানকার ইহুদি ও মুসলমানদের এক জাতি বলে দাবি করে থাকে, তবে তার মতো কৌতুক বোধ হয় একালে আর একটিও হবে না। ইরানিরা নরগোষ্ঠীগত দিক দিয়ে আর্য; ভারতের উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণদের দাবি তারাও আর্য, কিন্তু এদের দুয়ে মিলে কেউ একজাতিত্বের কথা ভাবেনি। ভারতবর্ষে আর্য, দ্রাবিড়, অস্ট্রো-মঙ্গোলয়েট ও আলপিনীয় গোত্রভুক্ত মানবধারার ছড়াছড়ি। কিন্তু তাই বলে এরা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে জাতিত্বের দাবি নিয়ে খাড়া হয়ে যায়নি। এর থেকে বোঝা যায়- কেন বাংলাভাষী হিন্দু ও মুসলমানের পূর্বপুরুষ নরগোষ্ঠীগতভাবে (আর্য-দ্রাবিড়-আলপিনীয় গোষ্ঠীর শংকর) এক হলেও শুরু থেকেই হিন্দু ও মুসলমান জনগোষ্ঠী বা জনসমাজ পৃথক হিসেবে গড়ে উঠেছে।

রক্ত বা কুলের (Race) সম্পর্ক দিয়েই কিন্তু সংস্কৃতির উত্তরাধিকার বর্তায় না- এ কথা সমাজবিজ্ঞানীরাই স্বীকার করেছেন। তারা দেখিয়েছেন, কীভাবে বিভিন্ন গোত্রের (Race) মধ্যে একই রকমের সংস্কৃতি দেখা যায়, আবার একই গোত্রের মধ্যে কোনো রক্তের পরিবর্তন ছাড়াই ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটতে পারে। রক্ত সম্পর্ক দিয়ে জাতিত্ব নির্ণয়ের অসুবিধার জন্য অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা আজকাল একটি জনমণ্ডলী বা জনসমষ্টিকে তার সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও ধর্ম দিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছেন। এসব সমাজবিজ্ঞানীরা এখন একমত হয়েছেন, এক ধর্মাবলম্বীরা একটি জনগোষ্ঠী (Ethnic group) হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে। এ বিষয়ে আমরা একজন বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানীর মতামতের উদ্ধৃতি নিতে পারি :
In the specific realities of social intercourse, however religious groups very often act as and are felt as ethnic groups. The overwhelming majority of people, after all are born in to a religion, rather than adapt it just as they are born into an ethnic group, in this respect both are similar. They are both groups in which one's status is immediately given by birth rather than given by some activities in one's life.৫

তিনি আরও লিখেছেন :
Aside from the normal close connection between religion and ethnic group, religion in itself is culture forming and thus fashions ethnic groups. সামাজিক মেল-বন্ধনের বিশেষ বাস্তবতার ক্ষেত্রে ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলো শুধুমাত্র ভিন্ন জনগোষ্ঠীর মতো আচরণই করে না; তারা নিজেদের ভিন্ন জনগোষ্ঠী হিসেবে অনুভবও করে। এর একটি কারণ হচ্ছে, বিপুল সংখ্যক সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই একটি ধর্মগোষ্ঠীর ভেতর জন্মগ্রহণ করে। তুলনায় ধর্মান্তর গ্রহণকারীর সংখ্যা কম, যেভাবে জন্মগ্রহণের কারণে মানুষ একটি Ethnic group-এর সদস্য হয় ঠিক সেই ভাবেই। এই ক্ষেত্রে ধর্মগোষ্ঠী আর জনগোষ্ঠী হচ্ছে সমপর্যায়ের। এগুলো সেরকম গোষ্ঠী- যেখানে জন্মগ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই সে সেই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়; কর্মক্ষেত্রে বিশেষ কোনো কার্যক্রমের ভিত্তিতে এই অন্তর্ভুক্তি ঘটে না। ধর্ম ও Ethnic গোষ্ঠীর স্বাভাবিক খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছাড়াও এটা সত্য যে, ধর্ম নিজেই সংস্কৃতির জন্মদাতা এবং সে কারণে ধর্ম একটি ভিন্ন জনগোষ্ঠী তৈরিতে সহায়তা করে।

ধর্মের এই যে একটি Culture forming ভূমিকা আছে, এর কারণে ধর্ম সংস্কৃতির প্রায় প্রত্যেকটি সূচককে স্পর্শ করে। যার ফলে ধর্ম মানুষের ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, আত্মীয় সম্পর্ক, রন্ধনশৈলী, পোশাক-পরিচ্ছদ প্রায় সবকিছুর মূল্য-চেতনায় একটা পরিবর্তন আনে। অনেক সেক্যুলারবাদী বুদ্ধিজীবীরা যেরকম দাবি করেন, প্রকৃত অর্থে ভাষার ধর্মের মতো ঠিক সেরকম সর্ববিস্তারী Culture forming ক্ষমতা নেই।

এরপরেও যারা বলেন- হিন্দু ও মুসলমান শত শত বছর ধরে পাশাপাশি বাস করেছে, একই ক্ষেতের ফল, একই নদীর পানি, একই সূর্যের আলো ভোগ করে আসছে, একই গ্রামে বাস করে প্রতিবেশী সমাজের তৈরি জিনিস ব্যবহার করেছে ও খেয়েছে, একই সঙ্গে হাটে-বাজারে উঠা-বসা করেছে, যাত্রাপালা উপভোগ করেছে, তাদের শুধু ধর্ম সংস্কারের কারণে তফাৎ করে দেওয়া কি যুক্তিযুক্ত! এ বিবৃতির মধ্যে এক ধরনের আবেগ সৃষ্টির চেষ্টা আছে, কিন্তু এর বাস্তব মূল্য খুব সামান্য। আবার সেক্যুলারবাদীরা যেভাবে বলেন, শুধু ধর্মীয় সংস্কারের ভিন্নতার জন্য হিন্দু-মুসলিম ভিন্নতার চেষ্টা করা অনর্থক। ধর্মকে সংস্কার বলে খাটো করার চেষ্টা সেক্যুলারবাদীদের মজ্জাগত অভ্যাস। ধর্ম নিছক সংস্কার নয়। কোটি কোটি মানুষের আচরণীয় রীতি সমাজবিজ্ঞানীদের মতে সংস্কার হয় না; হয় সংস্কৃতি এবং আগেই বলেছি ধর্মের একটা Culture forming ভূমিকা আছে। সেক্যুলারবাদীদের কথা সত্য হলে একই সূর্যের আলো ভোগ করি বিধায় আমেরিকানদের সাথে আমরাও সমজাতীয়ত্ব দাবি করতে পারি কিংবা আমরা এখন অনেকে চীনা খাবার খাই বলে চীনা ও আমরা একই জাতি। সংস্কৃতিতে সাধারণটা ধর্তব্য নয়; পার্থক্যটাই প্রধান। এই পার্থক্যটাই স্বাতন্ত্র্য সূচিত করে। দুনিয়ার সব মা-ই সন্তানকে দুধ খাওয়ায় এটা সংস্কৃতি নয়; কীভাবে খাওয়ায় সেটাই সংস্কৃতি। সংস্কৃতি মানে আত্মপরিচয়; কোনো সাধারণ পরিচয় নয়। সত্য বটে- বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানের সংস্কৃতিতে অনেক মিল আছে; কিন্তু এটাও ঠিক, তাদের মধ্যে গরিমিলও আছে। গরমিলটাই সত্তা। ওই সত্তা দিয়েই একজনকে আরেকজন থেকে তফাত করা যায়। গরমিলটা বাদ দিলে সত্তা থাকে না, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যেরও প্রয়োজন হয় না। আমাদের সেক্যুলারবাদীরা আমাদের এক স্বাতন্ত্র্যহীনতার দিকে টানতে চান। এটা যেমন অসম্ভব, তেমনি অবাস্তব।

ধর্ম হিসেবে ইসলাম খুব পরিষ্কার, সুস্পষ্ট- এর নড়চড় হওয়া শক্ত ব্যাপার। এরকম তৌহিদবাদী (Monotheistic) ধর্ম পৃথিবীতে আর একটিও নেই। প্রকৃতিগতভাবে হিন্দু ধর্ম পৌত্তলিক চরিত্রের। এর রীতিনীতি অনেকটা flexible এবং বর্ণাশ্রম এর বৈশিষ্ট্য। ধর্মের এই চরিত্রের কারণে হিন্দু ও মুসলমানের জীবনদর্শন ও জীবনবোধের মধ্যেও তৈরি হয় তফাত। এই জীবনদৃষ্টির পার্থক্যই সংস্কৃতির মধ্যে ভিন্নতা আনে। এই কারণেই বাঙালি মুসলমান হিন্দুর মতো ভাত, মাছ, ডাল, শাক, বেগুনবর্তা, লাউ, শুটকি, চচ্চড়ি খায় বটে, কিন্তু সে বিসমিল্লাহ বলে খাওয়া শুরু করে; হিন্দু সেটা করে না। হিন্দু গোশত খায়, মুসলমানও গোশত খায়, কিন্তু মুসলমান হালাল গোশত খায়, হিন্দুর তা প্রয়োজনে পড়ে না। ধর্মীয় কারণেই হিন্দু গরু খায় না, মুসলমান খায়। মুসলমান গরু জবাই করে, হিন্দু পাঠা বলি দেয়। বাঙালি হিন্দু মশলা দেওয়া খাবার কম খায়। মুসলমান বেশি খায়। এরকম নজির ভুরি ভুরি।

মুসলমানরা যখন এ দেশে আসে, তখন কিন্তু তাদের শিল্পীরা ভাস্কর্যে মন দেয় না; মন দেয় স্থাপত্য শিল্পে। কারণ, মুসলমান শিল্পীরা ধর্মীয় কঠোরতার কারণে মানুষের মূর্তি তৈরি করেনি। মুসলমানরা যে দেশেই গেছে, সেখানেই এক নগর সভ্যতা গড়ে তুলেছে। বড়ো বড়ো সৌধ, ইমারত সেই সভ্যতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু মুসলমান শিল্পীরা গ্রিক ভাস্কর্য কিংবা হিন্দু ভাস্কর্যের মতো কিছু গড়ে তোলেনি। চিত্রকলার ক্ষেত্রেও ঘটেছে একই রকম ঘটনা। মুসলমান শিল্পীরা লতা, ফুল, ফলের মতো অন্যান্য প্রাকৃতিক বিষয়ে যেমন আগ্রহ দেখিয়েছে, তেমনি মানুষের ছবি আঁকায় তেমন কোনো উৎসাহ দেখায়নি।

একই কারণে দেখা গেছে- বাঙালি হিন্দুদের সাহিত্যে হিন্দু মহাকাব্য, পূরাণ ও হিন্দু চরিত্রের স্বাভাবিকভাবেই প্রাধান্য বেশি। অন্যদিকে বাঙালি মুসলমান রচিত সাহিত্যে হিন্দ মহাকাব্য ও পূরাণের প্রতিফলন নেই। একমাত্র ব্যতিক্রম নজরুল। একই ভাষায় লেখালিখির জন্য হিন্দুর রচিত সাহিত্য মুসলমানের মতোই বৃহত্তর বাংলা সাহিত্যের অংশ, কিন্তু কোনোভাবেই মুসলমান সংস্কৃতির অংশ নয়। এখন বাংলা সাহিত্যের হিন্দু উত্তরাধিকারকে মুসলমান কীভাবে বা কতটুকু গ্রহণ করবে? নিজ সংস্কৃতির মূল্যবোধের প্রতিপক্ষ না হলে বিশ্বের তাবৎ সাহিত্যের মতোই এ সাহিত্যের রস উপভোগ করতে কোনো বাধা নেই। সংস্কৃতির পরিধি অনেক ব্যাপক, তার নিজস্ব অনেক বাছবিচার, মাপকাঠি থাকে। এই মাপকাঠিতেই সংস্কৃতির প্রত্যেকটি উপাদানের চুলচেরা বিশ্লেষণের দরকার হয়। সেই মাপকাঠির কথা ভেবেই নজরুল লিখেছিলেন: বিশ্ব কলা লক্ষীর একটা মুসলমানী ঢং আছে। ঐ ঢংটাই স্বাতন্ত্র্য। বাংলা সাহিত্যের যে মুসলমানী ঢং, তা ঐ স্বাতন্ত্রের প্রকাশ মাত্র। যে কারণে সুকুমার সেনের মতো পণ্ডিতকেও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস লিখতে গিয়ে 'ইসলামী বাংলা সাহিত্য' বলে আরেকটি পৃথক বই লিখতে হয়েছিল।

এই মাপকাঠি অনুযায়ী আমাদের ভূখণ্ডের প্রাক-মুসলিম ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও বস্তুগত সৃষ্টিগুলো সম্বন্ধেও একই কথা বলা যায়। কুমিল্লার ময়নামতি ও বগুড়ার পাহাড়পুরের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও শিল্প সৃষ্টিকে এই ভূখণ্ডের বৌদ্ধ উত্তরাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা যায়; মুসলিম সংস্কৃতির অংশ বলা যায় না। সংস্কৃতিতে, সংস্কৃতিতে সহাবস্থান হয়। ইসলাম যে দেশে গিয়েছে, সেখানে এই নীতিকে অনুসরণ করেছে। প্রাক-মুসলিম ঐতিহ্যকে যথাস্থানে রেখে নিজের সংস্কৃতির বর্ধন করেছে। এর অর্থ এই নয়, ইসলাম প্রাক-মুসলিম সংস্কৃতির সাথে আপস করেছে কিংবা সমন্বয় করে চলার চেষ্টা করেছে। ইসলাম মিশরের পিরামিড ধ্বংস করেনি, কিন্তু সেখানে মুসলিম সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছে। ইসলাম ভারত এসেছে। এখানে নতুন মুসলিম সংস্কৃতি জেগে উঠেছে। কিন্তু মুসলমানরা এখানকার দেবমন্দির ও দেবমূর্তির মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেনি। দু'চারটি মন্দিরে ধ্বংসের কথা যেটা বলা হয় কিংবা সুলতান মাহমুদের সোমনাথ মন্দিরের লুটপাটের ব্যাপারটা- তার পুরোটাই রাজনৈতিক; এর সাথে ধর্মের সম্পর্ক নেই।

এভাবে ধর্মের সঙ্গে উৎসবের যোগও গভীর। উৎসব হচ্ছে মানুষের সামাজিকতার শিল্পিত প্রকাশ। সেই শিল্পিত প্রকাশকে এক একটি ধর্ম গভীর মহিমা দিয়েছে। উৎসবের এই আশ্চর্য রূপটা তৈরি হয়েছে ধর্মীয় মূল্যবোধের ছাঁচে। বাঙালি হিন্দুর বারো মাসে তেরো পার্বণ আর মুসলমানের ঈদ উৎসবের ভিন্ন ভিন্ন মহিমা। এই ভিন্নতাকে, সামাজিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করার জন্য আমাদের সেক্যুলারবাদীরা গত প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে ঢাকার নাগরিক জীবনে পহেলা বৈশাখের উৎসবকে চালু করেছেন। এদের দাবি- এটি নাকি হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সেক্যুলার উৎসব। উৎসবের সেক্যুলারইজেশন কথাটা অনেকটা কাঠালের আমসত্ত্বের মতো শোনায়। তাত্ত্বিকভাবে সেক্যুলারাইজেশন রাষ্ট্রের হতে পারে, কিন্তু সমাজের হতে পারে না। ধর্ম ও ধর্মীয় ঐতিহ্য ছাড়া কোনো সমাজ কল্পনা করা যায় না। সে হিসেবে উৎসবেরও সেক্যুলারাইজেশন হয় না। পশ্চিমের নিউ ইয়ার ও ইরানের নওরোজ উৎসব যথাক্রমে খ্রিষ্টীয় ও প্রাচীন জরথুস্ত্রীয় মূল্যবোধের মিল-মিশাল দেওয়া এক উৎসব। নওরোজের কথা শুনে আমাদের রসুল সা. বলেছিলেন- প্রত্যেক জাতির উৎসব আছে। মুসলমান জাতির উৎসব হলো ঈদ।

মুসলমান বাদশাহরা আমাদের এখানকার সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতার কথা চিন্তা করে হিজরি সনের সাথে মিলিয়ে বাংলা সনের সূচনা করেছিলেন। সে হিসেবে বাংলা সন হচ্ছে একান্তভাবে এখানকার মুসলমান সভ্যতার সৃষ্টি। কিন্তু আমাদের সেক্যুলারবাদীরা তাদের মজ্জাগত ইসলাম-বিদ্বেষের কারণে ঢাকার এই বৈশাখী উৎসবে প্রাক-মুসলিম সাংস্কৃতিক উপাদানকে অনুপ্রবেশ করার কসরত করে যাচ্ছেন। মন্দিরের পেন্টিং, আলপনা, উলকি, উলুধ্বনি ভূত-প্রেতের মুখোশ হলো একটি বিশেষ ধর্মের প্রতীক। এই বিশেষ ধর্মের প্রতীক চালু করে বৈশাখী উৎসবের তারা কী ধরনের সেক্যুলারাইজেশন করতে চান, তা বোঝা বেশ দুষ্কর। পহেলা বৈশাখ উদ্যাপিত হওয়া উচিত মুসলিম সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের আলোয়।

আমাদের সেক্যুলারবাদীদের আরেকটি মনগড়া তত্ত্ব হচ্ছে- বাঙালি সংস্কৃতি নাকি অবিভাজ্য, বৌদ্ধ-হিন্দু-মুসলমানের সংস্কৃতি সমৃদ্ধ ও সমন্বয়বাদী। এই সমন্বয় পন্থার উদাহরণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেন তান্ত্রিক বৌদ্ধ ও নাথবাদ। বাউলের সহজিয়া ধর্ম ইত্যাদি। এ সমস্ত সাংস্কৃতিক উপাদানগুলো যত বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হোক না কেন, এটি ইসলামের মূল্যবোধের বিপরীত। সে কারণে মুসলমানরা এসব লৌকিক ধর্মের কোনো বৈশিষ্ট্য গ্রহণ করেনি। অন্যদিকে এসব বৈশিষ্ট্যও কখনও মুসলিম গণজীবনে গভীরভাবে প্রবেশ করতে পারেনি। ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যের কারণেই ইসলামের সঙ্গে সেক্যুলারবাদের কোনো মিল-মিশাল সম্ভব নয়। মুসলমানের কাছে ইসলামের স্থান সবার আগে। সে হিসেবে দেশের মাটি থেকে উৎসারিত ইসলামের মূল্যবোধের বিপরীত পৌত্তলিকতাশ্রয়ী ধর্ম, কাব্য পূরাণ, পুণ্যস্থান, দেবদেবী মুসলমানের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এ কারণে মুসলিম জাতীয়তায় বিশ্বাসীদের পক্ষে বৌদ্ধ, হিন্দু সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সমৃদ্ধ চিন্তা-ভাবনায় বিশ্বাসী হওয়াও সম্ভবপর নয়। বাঙালিত্ব ও বাঙালি সংস্কৃতি হচ্ছে একটা মিথ। এর সমন্বয় পন্থার দাবিও একটা অনৈতিহাসিক কথা। অমুসলিম উপাদান দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমানকে কীভাবে সমন্বয় করা যাবে, কীভাবে একই মোহনায় তাদের মেলানো যাবে- তা বোধগম্য নয়। সেক্যুলারবাদীরাই এ মিথের প্রচারক, যারা অমুসলিম সাংস্কৃতিক উপাদান দিয়ে এ দেশের বাঙালি মুসলমানকে এক ঝড়ে পড়া পথহারা নৌকার যাত্রী বানাতে চান এবং এমনিভাবে তাদের আইডেন্টিটি বিসর্জন দেওয়ার পথেও ধাবিত করাতে চান। এই আত্মঘাতী প্রক্রিয়া বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমান কখনোই গ্রহণ করবে না। বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমান ইসলামভিত্তিক স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক সত্তা নিয়ে থাকবে, যেই সত্তা বিশ্ব মুসলিম সংস্কৃতিরই একটি প্রকাশ। ইসলাম যে দেশে গিয়েছে, সেখানেই তার সংস্কৃতির বিপুল ও বৈচিত্র্যময় প্রকাশ ঘটেছে। ইসলামি সংস্কৃতির বাগানে তাই নানা রঙের, নানা খুশবুর ফুল ফুটে আছে। বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি সেই রূপময় বাগানের একটি বাহারি ফুল।

টিকাঃ
১. হুমায়ুন কবীর, 'বাংলা ভাষা ও মুসলিম সাহিত্য', বাংলাদেশ: বাঙালী, আত্মপরিচয়ের সন্ধানে (সম্পাদক: মুস্তফা নূর উল ইসলাম)। ঢাকা: সাগর পাবলিশার্স ১৯৯০।
২. পাকিস্তান আন্দোলন ও মুসলিম সাহিত্য (সম্পাদনা: সরদার ফজলুল করিম, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৬৮।
৩. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ভারত সংস্কৃতি। কলকাতা: মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ১৪০৯।
৪. বদরুদ্দীন উমর, সংস্কৃতির সংকট। ঢাকা: গ্রন্থনা, ১৯৬৭।
৫. Nathan Glazer, Ethnicity: Dialogue in 1977, Published in Journal.

📘 মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান 📄 বাঙালি সংস্কৃতির পরিচয়

📄 বাঙালি সংস্কৃতির পরিচয়


বাঙালি সংস্কৃতির রাজনৈতিক ব্যবহার শুরু হয় উনিশ শতকের শহর কলকাতাকে কেন্দ্র করে। ব্রিটিশের দানে ও করুণায় সেদিনের কলকাতা যেমন আশ্চর্য রকমের সমৃদ্ধি ও পরিপুষ্টি লাভ করে, তেমনি ব্রিটিশের পৃষ্ঠপোষণে তাদেরই সহযোগী ও অনুগত বাঙালি বাবুরা সেখানে এক বর্ণহিন্দুর সংস্কৃতির বিকাশ ঘটায়। ব্রিটিশ কলোনিয়ালিজমের শক্তি ও প্রচারের জোরে সেদিনের এই সাংস্কৃতিক প্রচেষ্টাসমূহ বাঙালির সংস্কৃতি নামে সিন্দাবাদের ভূতের মতো আমাদের ঘাড়ে চেপে বসে এবং সেই ভূতের বোঝা আজও আমাদের অনেকের ঘাড় থেকেই নামতে পারেনি।

ঔপনিবেশিক আমলে বর্ণহিন্দুর সংস্কৃতি এই যে এভাবে আত্মপ্রতিষ্ঠা অর্জন করল, তা কিন্তু কলকাতার বাবুদের ওপর দীর্ঘস্থায়ী এক ছাপ ফেলল এবং এই সংস্কৃতি কখনও অখণ্ড ভারত আবার কখনও দেশপ্রেম ও জাতীয়তার সাথে একাত্ম হয়ে গেল। বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শুরু করে শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ সবাই কমবেশি বাঙালিত্ব ও ভারতীয়তাকে হিন্দুত্বের সাথে এইভাবে গুলিয়ে ফেলেছিলেন। এ দেশে ইংরেজদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এখানে তাদের প্রধান সহযোগী ছিল কলকাতার বর্ণহিন্দুরা, যারা ইংরেজি শিক্ষার মানদণ্ডে ও ঔপনিবেশিক শক্তির কলাবরেটর হিসেবে ভদ্রলোক হিসেবে পরিচিত হলো। এই ভদ্রলোকরা বিশ্বাস করতে শুরু করল, এখন থেকে তারাই বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও রাজনীতির জগতে আধিপত্য কায়েম করবে। এক পা শহরে, আরেক পা গ্রামে রাখা এই শ্রেণি পশ্চিমের ‘মডার্ন’-এর কিছুটা অনুগামী হলো ঠিকই, কিন্তু হিন্দু ভাবাদর্শ ও প্রাচীন ভারতের উজ্জীবনের স্বপ্ন তাদেরকে মাতিয়ে রাখল আরও বেশি। এইভাবে উনিশ শতকী ভদ্রলোকের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রচেষ্টাসমূহ নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ভেতর দিয়ে হিন্দু জাতীয়তাবাদের পথ ঘুরে সাম্প্রদায়িকতায় এসে পৌঁছায়। এসব কথা আজকাল অনেক রাজনীতি নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক স্বীকার করছেন; বিশেষ করে সম্প্রতি প্রকাশিত জয়া চট্টোপাধ্যায়ের 'বেঙ্গল ডিভাইডেড' নামক ক্যাম্ব্রিজের গবেষণা সন্দর্ভে এর একটা তথ্যভিত্তিক চিত্র পাওয়া যায়। জয়া চট্টোপাধ্যায় দেখিয়েছেন- বঙ্গভঙ্গের রাজনীতির ভেতর দিয়ে কীভাবে কলকাতার ভদ্রলোক শ্রেণি সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদকে আলিঙ্গন করে নিয়েছিল। কলকাতার বাবু ভদ্রলোকদের মধ্যে সেই যে মৌলবাদের বীজ ঢুকে পড়েছিল, তার হাত থেকে বাবুরা কিন্তু আজও রেহাই পাননি; বরং ভারতের রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র পরিচয়ের আড়ালে সক্রিয় হিন্দুত্ববাদী ধ্যানধারণাকে শুধু দিল্লিকেন্দ্রিক কংগ্রেস বা বিজেপির নেতা ও চিন্তকরা প্রশ্রয় দেননি, কলকাতার প্রগতিশীল বাম রাজনীতিবিদ ও তাত্ত্বিকরাও এদিক দিয়ে মোটেই পিছিয়ে থাকেননি। কয়েক দশকের বাম রাজনীতিও বাবুদের হিন্দুত্বের বোধ ও মননে ফাটল ধরাতে পারেনি বলেই মনে হয়। অন্যথা সাম্প্রদায়িকতার বিপক্ষে এত তর্জন-গর্জন করার পরও কলকাতার হিন্দুপাড়ায় মুসলমানদের বাড়ি ভাড়া না দেওয়া এখনও অলিখিত রীতি রয়ে যায় কী করে- যাকে আর যাই হোক উদার অসাম্প্রদায়িকতাপ্রসূত কোনো মানবিক বিবেচনা বলা যাবে না।

সেই গত শতকের প্রথম দিকে যখন সোভিয়েত দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সমুপস্থিত হয়, তখন প্রায় সমসাময়িক কালেই এর ঢেউ এসে ভারতে আঘাত হানে। কিন্তু ভারতের- বিশেষ করে বাংলার কমিউনিস্ট নেতা, চিন্তক ও বুদ্ধিজীবীরা সেদিন কতটুকু সেক্যুলার হতে পেরেছিলেন, তাদের সাংস্কৃতিক ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ভেদজ্ঞান কতটুকু স্পষ্ট হতে পেরেছিল, তা নিয়ে কিন্তু বরাবর একটা সংশয়ের কুয়াশা ঝুলেই আছে। কমরেড মোজাফফর আহমদ বা এম. এন. রায়ের মতো দুই-একজন রাজনৈতিক মনীষী ও বুদ্ধিজীবীর ব্যতিক্রমী উপস্থিতি বাদ দিলে গত শতাব্দীর বাম বুদ্ধিজীবিতার প্রবণতা খেয়াল করলে হতাশ হতে হয়। লক্ষ করার ব্যাপার হলো- বাংলায় পুরো শতাব্দীর বাম রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব এসেছে অনুশীলন ও যুগান্তর গোষ্ঠীর দলছুট কর্মীদের ভেতর থেকে। গত শতকের বিশ আর ত্রিশের দশকের সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়লে এরাই পরবর্তীকালে মুখোশ পরিবর্তন করে কমিউনিস্ট অবতারে পরিণত হয় এবং এমনি করে ঋষি বঙ্কিম ও অরবিন্দের সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী ঐতিহ্যকে বাংলার কমিউনিস্ট নেতৃত্ব আত্মস্থ করে নেয়। বাইরে নিম্নবর্গের মানুষ আর প্রলেতারিয়েত শ্রেণির জন্য অশ্রু ভেজালেও ভেতরে ভেতরে কলকাতার বাবু সংস্কৃতির পূজা করতে তাদের এতটুকু বাধেনি। গীতা আর মার্ক্স তারা একই সাথে চর্চা করেছেন এবং সংগোপনে সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিকে তারা এমনভাবে লালন করে এসেছেন যে, কলকাতার বাবু বুদ্ধিজীবীদের মতোই এই বাম বুদ্ধিজীবীরাও বাঙালি মুসলমানদের এক আধিপত্যবাদী চোখ দিয়ে দেখতেই অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। লক্ষ করুন, কলকাতার বাবু সংস্কৃতির মতোই এই বাম বুদ্ধিজীবীতাও অখণ্ড ভারতের স্বপ্নে আজও বিভোর হয়ে আছে এবং এই অখণ্ড ভারত এক বিপজ্জনক ধারণা- যা শুধু কাল্পনিকই নয়; সাম্প্রদায়িক ও আধিপত্যবাদীও বটে। এ ধারণা বরাবরের মতো আজও উপমহাদেশের স্থিতিশীলতা ও সহাবস্থানের সংস্কৃতির জন্য হুমকিস্বরূপ।

কলকাতার বাম রাজনীতিবিদ ও সংস্কৃতিসেবীরা দীর্ঘদিন যে অরবিন্দ-বঙ্কিমের আদর্শকে সংগোপনে লালন করে এসেছেন, তার প্রভাব আমাদের এ পূর্ব বাংলায়ও কিছুটা পড়েছে বলে মনে হয়। কলকাতার বাবু কমিউনিস্টরা গোপনে গোপনে বঙ্কিম-অরবিন্দের পথ নিলেও এখানকার বাঙালি মুসলমানের ঘরে জন্ম নেওয়া কমিউনিস্টরা ঠিক তার উলটো পথে হাঁটতে শুরু করেছেন এবং পিতা-প্রপিতামহের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর ঠিকানা ছেড়ে-ছুঁড়ে কলকাতাকে আদর্শ বিচারের কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে ফেলেছেন। কলোনির যুগে বাঙালি হিন্দুর তুলনায় শিক্ষাদীক্ষা, অর্থনীতি আর সংস্কৃতি বিকাশের ক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমান পিছিয়ে থাকার কারণে তাদের মধ্যে একটা হীনম্মন্যতা কাজ করেছে এবং সেই হীনম্মন্যতা হেতু বাঙালি মুসলমানের কেউ কেউ বাঙালি বলতেই কলকাতার বর্ণহিন্দুর সংস্কৃতির দিকে লোভাতুর দৃষ্টি মেলে ধরেছেন। বাঙালি সংস্কৃতি বলতে এরা কলকাতার বাবুদের সংস্কৃতিকে সজ্ঞানে কিংবা অবচেতনভাবে আত্মস্থ করে ফেলেছেন। এ কারণেই এখানকার কমিউনিস্টদের মধ্যে একটা প্রবণতা দেখি, প্রলেতারিয়েত মার্কসের চর্চার চেয়ে ফিউডাল রবীন্দ্রনাথ চর্চার ব্যাপারে তাদের আগ্রহ বড্ড রকম বেশি। এই অতি আগ্রহই বলে দেয়- তাদের উদ্দেশ্যের উৎসমুখটা কোথায়? এখানকার বাম তাত্ত্বিক, লেখক ও সংস্কৃতিসেবীরা গত কয়েক দশক ধরে এ দেশের মানুষকে দিয়ে যে পরিমাণ রবীন্দ্রচর্চা করিয়েছেন, তা বোধ হয় পুরো ভারতবর্ষেও এ যাবৎকালের ইতিহাসে সম্ভব হয়নি। এদের কাছে কমিউনিস্ট এজেন্ডার চেয়ে কলকাতার এজেন্ডা যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ, তা বলাই বাহুল্য।

এটা সত্য, আজ বাঙালি মুসলমানের গণজীবনে বাম রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রভাব নিতান্তই তাৎপর্যহীন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এরা এখানকার ছাত্র ও বিদ্বৎসমাজের মধ্যে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছে; বিশেষ করে এখানকার সংস্কৃতির উৎসমুখগুলো চিহ্নিত করে তাতে ভাঙ্গন ধরানোর সবরকমের কারসাজি তারা করেছে। তারা এক ধরনের অবিশ্বাসের সংস্কৃতি ছড়িয়েছে, বিশেষ করে বাঙালি সংস্কৃতির নামে কলকাতামুখীনতার সুড়সুড়ি দিয়েছে এরাই। লক্ষ্যণীয়, এদের এই পাতা ফাঁদে এখানকার কেউ কেউ পা দিয়েও বসেছেন। এদেশে ইসলামবিরোধী মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটিয়েছে এরা এবং এটিকে নানা কৌশল ও প্রক্রিয়ায় সমাজের কোনো কোনো পদস্থ ব্যক্তি নিরাপত্তার ছায়া দিয়ে রেখেছেন। বাংলাদেশের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা পাড়তে গেলেই এসব অবিশ্বাসী সাহিত্যব্রতীরা প্রচার করে বেড়ান, বাংলার মুসলমানরা কখনও দেশকে ভালোবাসতে পারল না। এদের মন-মানস আজও ইরান-আরবমুখী হয়ে আছে, অতীতচারিতা তাদের মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। যুক্তি প্রয়োগের কৌশলটি লক্ষ করুন। এই মুসলমানই যদি পরমুহূর্তে কলকাতার বাবু সংস্কৃতিকে নির্বিচারে গ্রহণ করতেন, তবে তারা একদিনেই স্বদেশপ্রেমিক হয়ে যেতেন। অথবা এরা ইসলাম ছেড়ে দিয়ে অন্য কোনো মতাদর্শ (পাশ্চাত্য কিংবা সমাজতান্ত্রিক) গ্রহণ করতেন, তবে তারা হয়ে যেতেন প্রগতিশীল। অবশ্য গোলমালটা এখানেই। মুসলমানের কাছে পরম আদর্শ ইসলাম, যেকোনো আদর্শ ও নীতির চেয়ে এটি তার কাছে অধিক প্রয়োজনীয়। কিন্তু ইসলামের সারবান আদর্শ তার বিশিষ্ট মূল্যবোধের আওতায় দেশকেও ভালোবাসতে শেখায়। নিজের দেশকে ঘৃণা বা এর জনসাধারণকে তাচ্ছিল্যের সাথে দেখা ইসলামের নীতিবিরুদ্ধ। এই জন্যই দেখি- ঔপনিবেশিক শাসনের প্রথম দিকে বাঙালি মুসলমানরা কলোনির প্রভু ও তার এ দেশীয় বরকন্দাজদের বিরুদ্ধে নিরন্তর জিহাদে জড়িয়ে পড়েছেন। দেশের জন্য, ধর্মের জন্য অকাতরে জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন, তারাই প্রকৃত অর্থে স্বদেশগতপ্রাণ। আর এ দিকে বাঙালি হিন্দুরা তখন কী করছেন? কলোনির প্রভুদের সহযোগী হিসেবে এসব জানবাজ দেশপ্রেমিক মুসলমানদের কষে গালমন্দ আর নিন্দা করছেন, আর তাদেরই মতো করে ইংরেজি উচ্চারণে এদেরকে অভিযুক্ত করে বলছেন Raiders, Marauders, Fanatic কখনও Terrorist.

আগেই বলেছি, সাম্রাজ্যবাদকে স্থায়িত্ব দেওয়ার জন্য কলকাতার বাবু সংস্কৃতির উত্থান ঘটানো হয়েছিল। সংগত কারণে সাম্রাজ্যবাদের ইন্ধনেই সেদিন মুসলমানদের ইমেজ খাটো করার জন্য এসব ইংরেজের অর্থভোগী সংস্কৃতিসেবীরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে দেশপ্রেমহীনতার অভিযোগ আনে। আজ এতদিন পর নিরপেক্ষ অন্তর দিয়ে বিশ্লেষণ করার সময় এসেছে- কারা দেশপ্রেমিক আর কারা দেশদ্রোহী। বাবু সংস্কৃতির এ দেশীয় উত্তরাধিকারীরা কলোনির প্রভুদের সেই সিলসিলা আজও বহন করে চলেছেন এবং প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে এ দেশের স্বাতন্ত্র্যকামী মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের সেই 'প্রিয় ভাষণটি' উচ্চারণে দ্বিধা করেন না।

বাঙালি মুসলমানদের বিরুদ্ধে আরবমুখীনতা কিংবা অতীতচারিতার অভিযোগও আনা হয়ে থাকে। বাঙালি মুসলমানের মন যে কিছুটা আরব অভিমুখী হবে- এ তো খুবই স্বাভাবিক। কারণ, মুসলমানের আদর্শ ইসলাম অভিমুখী আর ইসলামের বিকাশ আরবদেশেই। সেখানেই ইসলামের নবির স্মৃতি জড়িয়ে আছে, আর আছে ইসলামের পূণ্য-পবিত্র স্থানগুলো। বাঙালি মুসলমানের মানসভূমিতে তাই যেমন দেখতে পাই নারিকেল, সুপারি, কোকিল, শালিক, ডাহুকের ছড়াছড়ি তেমনি মরুদ্যান, লু-হাওয়া, আখরোট, খুবানি বনের মৃদুমন্দ হাওয়া। এ দুটোকেই পাশাপাশি রাখা চাই এবং এতে কোনো দোষ নেই। নারিকেল-সুপারি হচ্ছে আমাদের বাস্তবজীবনের প্রতিধ্বনি; লু-হাওয়া, আখরোট, খুবানি বন হচ্ছে আমাদের মানসিক ঐতিহ্যের কলস্বর। এর মধ্যে অতীতে ফিরে যাওয়ার কী থাকতে পারে? আমরা যখন ইসলামি সমাজের কথা বলি, তখন কিন্তু আমরা অতীতে প্রত্যাবর্তন করি না। ইসলামের আদর্শ ও সম্ভাবনার কথা বর্তমানের প্রেক্ষিতে চিন্তা করে ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা করার কথা ভাবি মাত্র। অথচ এটিকেই নানা রকম বাকচাতুর্যের আড়ালে বলা হচ্ছে অতীতে প্রত্যাবর্তনের চেষ্টা। এটা যদি সেরকমই হয়, তাহলে পুরো ভারতজুড়ে আজ যে রামরাজত্বের কথা শোনা যাচ্ছে- সেটাকে আমরা কী বলব? অথবা রামজন্মভূমিকে কেন্দ্র করে অযোধ্যার বাবরি মসজিদ উড়িয়ে দেওয়ার যে ভয়ানক মানবতাবিরোধী ট্র্যাজেডি সংঘটিত হয়েছে, তা কি ভারতের মৌলবাদী হিন্দুদের চূড়ান্ত অতীত মানসিকতার ইঙ্গিত দেয় না?

রবীন্দ্রনাথ শান্তি নিকেতনে প্রাচীন ভারতের আদর্শে তপোবন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র 'আনন্দমঠ' উপন্যাসে আর্য ভারতের আদর্শ তুলে ধরেছেন। জওহরলাল নেহরু তার Discovery of India বইতে প্রাচীনকালের অনুসরণে পুরো ভারতব্যাপী হিন্দু সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার মানসিক অনুভূতির কথা প্রকাশ করেছেন। আর অতি সাম্প্রতিককালের সুদূর ত্রিনিদাদের অভিবাসী সন্তানের পুত্র হিন্দু ধর্মানুসারী ভি. এস. নাইপল তার নানা রকম উপন্যাস ও লেখালিখিতে প্রাচীন হিন্দু আদর্শের স্বপ্নের কথা তুলে ধরেছেন। অতীতচারিতার অভিযোগ কি এসব ক্ষেত্রে যথার্থভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে? আরেকটা উদাহরণ দিচ্ছি। এ দেশের কমিউনিস্টরা সুদূর ল্যাটিন আমেরিকার চে গুয়েভারার বিপ্লব, যুদ্ধ ও সংগ্রামের কথা স্মরণ করে যে রকম মানসিক শক্তি অনুভব করেন কিংবা মার্কস, লেনিন ও মাওসেতুঙের নানা রকম বিপ্লবী প্রচেষ্টা ও কর্মতৎপরতাকে যেরকম শ্রদ্ধা ও প্রেরণার মর্মমূল হিসেবে নিজেদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানিয়ে নিয়েছেন, তাকে কি আমরা দেশজ বলতে পারি? এক্ষেত্রে কোনো দেশপ্রেমহীনতার অভিযোগ এসেছে বলে কখনও শুনিনি। বোধ হয় একালে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা সহজ এবং অভিযোগকারীরাও বুঝতে পেরেছে, মুসলমানদের তরফ থেকে প্রতিবাদ আসার সম্ভাবনা একেবারেই কম। সুতরাং যত ইচ্ছে তাদের চরিত্র হনন করে যাও।

বাঙালি সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদ সেই উনিশ শতকের কাল থেকেই সাম্রাজ্যবাদের প্রশ্রয়ে মুসলমানের সংস্কৃতি হননের ক্রিয়াকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছে এবং এখন সাম্রাজ্যবাদের বিদায়ের পর বাঙালি সংস্কৃতি ভারতীয় আধিপত্যকামী হিন্দু মানসিকতার সাথে লগ্ন হয়ে বাঙালি মুসলমানের আইডেন্টিটি আর শিকড় নির্মূলের মহোৎসবে মেতে উঠেছে। লক্ষ করুন, গত কয়েক দশকের রাজনীতি ও সংস্কৃতি চর্চার মধ্যে বাঙালি আছে, ইসলাম নেই। বাঙালিরা যে মুসলমানও বটে, সে কথাটা বাঙালি সংস্কৃতি স্বীকার করে না। প্রকারান্তরে বাঙালি সংস্কৃতির মানেটা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে- ইতিহাসে একটি জাতির মন, মনন, রাজনৈতিক চেতনা বিচারের প্রশ্নে ইসলামকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা। গত শতকের সত্তর দশকের শুরুতে বাঙালি সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদের তীব্র দাপটের কাল থেকে ইসলাম বর্জন শুরু হয়েছে এবং আমাদের বুদ্ধিজীবীতার ইতিহাসে ইসলামের স্বীকৃতি অনেকখানি এখন গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। এসব বুদ্ধিজীবীদের কাছে ভাষার গুরুত্বটা মূখ্য; ইসলাম গৌণ। তার মানে এদের কাছে জাতি বিচারের প্রশ্নে ইসলামের ভূমিকাটা শিথিল হয়ে পড়ছে। এই ভাষার দাবির পেছনে মস্ত একটা ফাঁক আছে। ভাষার নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে এরা মূলত কলকাতার বাবু সংস্কৃতিরই পূজা করছে। বাঙালি সংস্কৃতির এ এক অদ্ভুত বৈপরীত্য, হিন্দু হিন্দু থাকতে পারবে, বৌদ্ধ বৌদ্ধ থাকতে পারবে, কিন্তু মুসলমান মুসলমান থাকতে পারবে না। মুসলমান বাঙালি হতে হলে তাকে ইসলাম ছাড়তে হবে। এ কারণেই দেখি এদেশে বাঙালিবাদীরা বাঙালিত্বের সন্ধান করেন ধর্মাশ্রিত বৌদ্ধ চর্যাপদ, দোঁহা ও হিন্দু পদাবলির মধ্যে। কিন্তু মুসলমানের পুঁথি ও কাহিনির মধ্যে তারা সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ পেয়ে আঁতকে ওঠেন। শ্রী চৈতন্যের আন্দোলনের মধ্যে তারা বাঙালি সংস্কৃতির সমন্বয়মূলক বৈশিষ্ট্য খুঁজে ফেরেন; অথচ শাহজালাল-খানজাহানের মধ্যে তারা তখন কিছু দেখতে পান না। বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণের মধ্যেও তারা বাঙালিত্বের অভিনব আর চমৎকার সব ছবি দেখে সম্মোহিত হয়ে ওঠেন, অথচ সেদিনের হাজি শরিয়তুল্লাহ, তিতুমীর, ফকির মজনু শাহ প্রমুখকে বাঙালি ডাকতে এদের দ্বিধার অন্ত নেই। এই বিভেদ-বিভাজন বাঙালি সংস্কৃতির দ্যোতক, এই বিচ্ছেদের বীজ বপন করে এরা বাঙালি মুসলমানকে তার সাংস্কৃতিক চৈতন্য থেকে এবং ইসলামের মূল্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে চায়। এই বিচ্ছেদ- বিভাজনের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আজ তাই সমবেত প্রচেষ্টা ও যৌথ উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য হয়ে উঠেছে।

📘 মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান 📄 সংস্কৃতির বিভাজন

📄 সংস্কৃতির বিভাজন


দেশকে মা বলার রীতি ইসলামে নেই। তার ওপর দেশকে দেবী বলে বন্দনা করার তো কোনো প্রশ্নই আসে না। ইংরেজিতে মাদারল্যান্ড বলে যে কথাটা আছে, তার বাংলা এখন মাতৃভূমি। কিন্তু এই মাতৃভূমি মাতৃদেবীর মতোন নয়; অনেকটা জন্মভূমির মতোন। পিতৃভূমির অর্থও তাই। মাতৃভূমি, জন্মভূমি, পিতৃভূমি কোনোটিই পূজোর সেন্স বহন করে না। এমন যে তেত্রিশ কোটি দেব-দেবীর হিন্দু ধর্ম তাদের শাস্ত্রেও সরাসরি দেশকে সাকাররূপে পূজার কথা বলা হয়নি। হিন্দুশাস্ত্রে জননী ও জন্মভূমিকে স্বর্গাদপি গরিয়সি বলা হয়েছিল। দেশকে প্রতিমা বানিয়ে পূজা করতে হবে- এই ধারণা চালু হয় স্বদেশী আন্দোলনের কালে। বাংলা মা, বঙ্গমাতা, ভারতমাতা এসব শব্দ বাংলা ভাষায় তখন থেকেই চালু হয়েছে। বঙ্গমাতা, ভারতমাতা এসব কি এক-একটা দেবী বা মানবী? যে ধর্মে তেত্রিশ কোটি দেব-দেবীর ছড়াছড়ি, তাদের জন্য নতুন একটা দেবীর মাহাত্ম্য বর্ণনা খারাপ লাগেনি। হিন্দুরা ধর্ম বলতে দেব-দেবীকেই বোঝে। তাই দেশ হলো নতুন দেবী। এই দেবীর মাহাত্ম্য প্রচার করা চাই। স্বদেশী আন্দোলনের কর্তা ব্যক্তিরা এই কথাটা জনগণকে ভালো করে বুঝিয়ে দিলেন।

প্রত্যেকটা আন্দোলনের বা ঘটনার পেছনে সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মনৈতিক যেমন কারণ থাকে, তেমনি থাকে তাত্ত্বিক কারণ। যা না থাকলে আন্দোলনের জন্য, বিপ্লবের জন্য মানসিক প্রস্তুতি তৈরি হয় না। এই প্রস্তুতি ছাড়া যে আন্দোলন হয় তার নিয়তি মন্দ হয়। ফরাসি বিপ্লবের অনেক কারণ ছিল। এর মধ্যে বিপ্লবপূর্ব মনীষী ভলটেয়ার, রুশো, মন্টেস্কু, দিদেরা প্রমুখের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এদের লেখালিখি বিপ্লবের জন্য মানুষের মন প্রস্তুত করেছিল। ফরাসি বিপ্লবের সাথে প্রকৃতিগতভাবে স্বদেশী আন্দোলনের কোনো তুলনা হয় না। একটি মাত্র ব্যতিক্রম ছাড়া। ফরাসি বিপ্লবের মতো এখানেও ছিল তাত্ত্বিক কারণ, এখানকার হিন্দুদের একধরনের মানসিক প্রস্তুতি। ওখানে ভলটেয়ার যা করেছেন, এখানে বঙ্কিমচন্দ্র সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। বঙ্কিমচন্দ্র 'আনন্দমঠ' লিখে পুরো হিন্দু জাতির রিভাইভাল এনে দিয়েছিলেন। বঙ্কিমের পরে এই রিভাইভালের পতাকা উঁচিয়ে ধরেছিলেন শ্রী অরবিন্দ, কতকক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ। একটি বই যে একটি জাতির জীবনকে এতখানি ঘুরিয়ে দিতে পারে- 'আনন্দমঠ' তার বড়ো প্রমাণ।

এ বই যখন লেখা হয়েছিল, তখন ছিল ইংরেজের শাসন। ইংরেজ হিন্দুকেও পরাধীন করেছিল, মুসলমানকেও পরাধীন করেছিল, কিন্তু 'আনন্দমঠ' পাঠ করলে মনে হবে- যত শয়তানির গোড়া মুসলমান। সুতরাং মুসলমানদের যুদ্ধে হারিয়ে দিয়ে হিন্দু রাজত্ব পুনপ্রতিষ্ঠা করাই হচ্ছে মাতৃদেবীর সন্তানদের একমাত্র লক্ষ্য। বঙ্কিমচন্দ্রের মতো সেকালের অনেক হিন্দু মনীষীই মুসলমানদের চেয়ে ইংরেজকেই মিত্র মনে করতেন। দেশকে দেবী বানিয়ে প্রতিমা গড়ে পূজা করার এই চিন্তা-ভাবনা একান্তই বঙ্কিমের নিজস্ব। বন্দে মাতরম সংগীতে আছে- ‘ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণ ধারিণী, কমলা কমল দল বিহারিণী, বাণী বিদ্যাদায়িনী ণমামি ত্বাং।’ তার মানে মা দুর্গা, মা লক্ষ্মী, মা সরস্বতী হচ্ছে বঙ্গমাতা। আনন্দমঠের মধ্যে মা জগদ্ধাত্রী ও মা কালীর কথাও আছে। দেশ যেহেতু মুসলমানদের কারণে ধ্বংসপ্রায়, সুতরাং দেশকে উদ্ধারের জন্য মাতৃদেবীর সন্তানরা আগে তাকে পুজো দিয়ে, অর্ঘ্য দিয়ে দেশোদ্ধারে নামতে চান। আনন্দমঠের নিত্যানন্দ, ভবানন্দ, জীবনানন্দ, জ্ঞানানন্দ ও ধীরানন্দকে দিয়ে এই পুনরুজ্জীবিত হিন্দু ধর্মের মার্টায়ার বিগ্রেড (Martyr Brigade) তৈরি হয়েছে।

বঙ্কিম যে বীজ বুনলেন, তার ফল তুললেন স্বদেশী কর্মীরা, বঙ্কিম যে আগুন জ্বালালেন, তাতে ঘৃতাহুতি দিলেন স্বদেশী সন্তানরা। বঙ্কিমের জীবদ্দশায় তার বন্দে মাতরম সংগীতে সুরারোপ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। স্বদেশী আন্দোলনের সময় রবীন্দ্রনাথ কয়েকটি গান লিখেন। বঙ্কিম যেমন করে তার বন্দে মাতরম সংগীতে এবং আনন্দমঠ উপন্যাসে দেশকে প্রতিমা বানিয়ে পূজার কথা বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের এসব গানেও তারই প্রভাব দেখা যায়। এ সময় লেখা তার 'আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে', 'আমরা মিলেছি আজ মায়ের ডাকে', 'যে তোমার ছাড়ে ছাড়ুক', 'সার্থক জনম আমার' প্রভৃতি গানে মা-এর ছড়াছড়ি। এই মা একদিকে বঙ্গমাতা, অপরদিকে মা দুর্গা। এর মানে হচ্ছে মা দুর্গা একদিকে দেশের প্রকৃতির রূপ ধরে প্রকাশিত হন, অন্যদিকে সাকার রুপে তার পূজাও চলে।

বঙ্কিম এখন এক লিজেন্ড। তার ভাবানুসারী স্বদেশী বাহিনীর আত্মত্যাগও হিন্দু ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক অবিসংবাদিত ঘটনা। বিনয়, বাদল, দীনেশ, ক্ষুদিরাম, সূর্যসেনদের আত্মত্যাগের কাহিনিকে ছোটো করে দেখার কিছুই নেই। কিন্তু তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া হয়, তাদের অনুসৃত পথেই ব্রিটিশকে হটিয়ে দিয়ে ভারত স্বাধীন হতো, তবে তো সেটা হতো আনন্দমঠের সন্যাসীদের অভীষ্ট সাম্প্রদায়িক হিন্দু রাষ্ট্র। সেখানে কি আদৌ কোনো মুসলমানের স্থান সম্ভব ছিল? আর সম্ভব হলেও সে মুসলমানকে অবশ্যই সকাল-বিকাল বন্দে মাতরম ধ্বনি দিতে হতো। এভাবেই সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের রূপান্তর ঘটল সাম্প্রদায়িকতার সম্রাটরূপে।

মুসলমানরা আপসহীন তৌহিদবাদী। একেশ্বরবাদ তাদের ধর্মের মূল কথা। আল্লাহ ছাড়া কাউকে কুর্নিশ করা তাদের ধর্মবিরুদ্ধ। সেই মুসলমান কী করে মা দুর্গা, মা লক্ষী, মা সরস্বতী, মা জগদ্ধাত্রী, মা কালী, ভারতমাতা, বঙ্গমাতা প্রভৃতির বন্দনা করবে? অসম্ভব। এই অসম্ভব সম্ভব হয়নি বলেই ভারতের ইতিহাসে দ্বিজাতিতত্ত্বের উদ্ভব। সেই চাপে মারা যায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ, একই সাথে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ। ইতিহাসে দুটি জাতীয়তাবাদই আমরা দেখি- একটি হিন্দু জাতীয়তাবাদ, অপরটি মুসলিম জাতীয়তাবাদ। সমন্বয়ী বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সমন্বয়ী ভারতীয় জাতীয়তাবাদ কোনো কোনো বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদদের ইউটোপিয়ান ভাবনা-চিন্তা মাত্র।

উনিশ শতকে কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু জাগরণের সাথে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের কোনো সংশ্রব ছিল না। সেকালের বড়ো বড়ো হিন্দু মনীষী ও বুদ্ধিজীবীরা মুসলমানকে সাথে নিয়ে দেশোদ্ধারের কথা ভাবেননি। বঙ্কিমচন্দ্র তো মুসলমানদের কষে গাল দিয়েছেন। মুসলমানরাই যে সব নষ্টের গোড়া এ কথা বলতেও তিনি দ্বিধান্বিত হননি। বঙ্কিমচন্দ্রের বাঙালি জাতীয়তাবাদ ছিল একই সাথে তার হিন্দু জাতীয়তাবাদ চিন্তার সমার্থক। তিনি যেসব তত্ত্ব প্রচার করেছেন, সেসব মুসলমানের জন্য তো নয়ই। নিম্নবর্ণের হিন্দু, ব্রাহ্ম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কারও জন্যই নয়। তার উপন্যাসে শিল্প ছাড়িয়ে মাথা তুলেছে রাজনৈতিক বিশ্বাস। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাই বড়ো শিল্পী হয়েও একই সাথে ধর্মান্ধ ও মতান্ধ।

বঙ্গভঙ্গের সময় হিন্দু নেতা ও বুদ্ধিজীবীরা বাঙালি জাতি ভাগ হয়ে যাচ্ছে বলে আক্ষেপ করেছিলেন। দ্বিতীয়বার ৪৭ সালে বঙ্গভঙ্গের সময় তাদের বিষাদ পরিণত হয় উল্লাসে। ইতিহাসের দুটি ক্ষণে অথচ একই ঘটনায় এই বিষাদ ও উল্লাসের তাৎপর্য কী? হিন্দু সমাজনেতা ও বুদ্ধিজীবীরা উভয় স্থানেই নিজেদের স্বার্থবুদ্ধির দ্বারা তাড়িত হয়েছিলেন। নেশন কথাটা তারা ব্যবহার করেছিলেন নিজেদের রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই। নেশনের স্বার্থ বলতে তারা হিন্দুর স্বার্থকেই বুঝেছেন। ধর্ম নির্বিশেষে সকলের স্বার্থকে তারা বিবেচনা করেননি। দ্বিজাতিতত্ত্ব একদিনে আসেনি। জিন্নাহ সাহেবের অনেক আগেই দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত প্রস্তুত হয়েছিল। বঙ্কিমের, শ্রী অরবিন্দের, স্বামী দয়ানন্দের ভাবানুসারীরা সে কাজটা আগেই সুসম্পন্ন করে রেখেছিলেন। জিন্নাহ সাহেব শুধু রিঅ্যাক্ট করেছিলেন। ক্রিয়া থাকলেই প্রতিক্রিয়া হয়। একজাতিতত্ত্বের বদলে দ্বিজাতিতত্ত্বের কথা বলেছিলেন তিনি। হিন্দুর বাঁচার অধিকার থাকলে মুসলমানেরও বাঁচার অধিকার থাকবে এই দাবি তিনি করেছিলেন। এতে আর অন্যায় কী? বিচার করে দেখলে তাকেই বেশি ডেমোক্রাট মনে হয়। অন্যরা তার সামনে টেকে না। এমনকি গান্ধীও না, নেহেরুও না।

পাকিস্তান ভেঙে যখন বাংলাদেশ বের হয়ে আসে, তখন এখানকার সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীরা কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের সাথে গলা মিলিয়ে বলতে শুরু করেন দ্বিজাতিতত্ত্ব একটা ভুল হিসাব ছিল। বাংলাদেশ হওয়ার ভেতর দিয়ে সেই ভুলটি ইতিহাস সংশোধন করার চেষ্টা করেছে। দ্বিজাতিতত্ত্ব যদি ভুল হিসাব হয়, তাহলে সেই হিসেবের দায় থেকে বঙ্কিম রেহাই পান না। রবীন্দ্রনাথ রেহাই পান না। রেহাই পাননা কংগ্রেসের সব বড়ো বড়ো জাদরেল নেতারা। ভুলের একপ্রান্তে যদি থাকে মুসলিম লীগ, তবে আরেক প্রান্তে আছে কংগ্রেস। একজাতিত্ত্ব ছিল বলেই দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারণা এসেছে- আমরা যেন সে কথা ভুলে না যাই।

এখানে যারা সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত, নিজেদের যারা মুসলমানের চেয়ে বাঙালি পরিচয়ে তুলে ধরতে বেশি উৎসাহী, তাদের দুর্ভাগ্য তাদের বাঙালিত্বও কিন্তু অর্জিত হয়েছে পাকিস্তান হওয়ার পর। একজাতিতত্ত্বের হিসেবে পাকিস্তান হওয়ার আগে মুসলমানরা বাঙালি ছিল না। উনিশ আর বিশ শতকের অনেক হিন্দু সমাজনেতা ও বুদ্ধিজীবীরাই মুসলমানকে বাঙালি বলে স্বীকার করতেন না। শরৎচন্দ্রের মতো মানবদরদী ঔপন্যাসিকও যখন লিখেন- 'স্কুলের মাঠে বাঙালি ও মুসলমানে ফুটবল খেলা চলিতেছে', তখন মুসলমানদের সম্পর্কে তার ও তার সমধর্মীদের অনুভূতি কী তা লুকোছাপা করে বলার অবকাশ থাকে না। পাকিস্তানের ২৩ বছর এবং বাংলাদেশ হওয়ার পর আজতক এখানকার মুসলমান বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদদের একাংশের অন্তঃপরিবর্তন হয়। এরা মুসলিম সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদকে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করেন। অনেক মোল্লা-মৌলবির ছেলেরাও হয়ে ওঠে সেক্যুলার। আবুল ফজল, মুনীর চৌধুরীর মতো সাহিত্যিকদের পিতারা ছিলেন রীতিমতো আলেম। কেমন করে এরাই হয়ে যায় মুক্তবুদ্ধির প্রবক্তা। মুক্তবুদ্ধি তো একপ্রকার ধর্মহীনতার শামিল। এমনকি যেসব সাহিত্যিক পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার নির্যাতনের মুখে এ পারে পাড়ি জমান, তাদের অনেকে এখানে এসে মুসলিম জাতীয়তাবোধের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা খুঁজতে শুরু করেন। তারা হয়ে উঠেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা। তারা ভুলে যান, মুসলিম জাতীয়তার ভিত্তিতেই তারা কিন্তু এখানে আসতে পারেন এবং বসতি গড়েন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিকে আশ্রয় করে তারা পশ্চিমবঙ্গে ঠিকানা গড়তে পারেননি। এদের একজন হচ্ছেন বদরুদ্দীন উমর। তিনি এখানে এসে একটা বই লিখেন, এর নাম 'সাম্প্রদায়িকতা'। ভাবতে অবাক লাগে, তার মতো শিক্ষিত ও জানাশোনা ব্যক্তি শুধু মুসলমানদের মধ্যেই সাম্প্রদায়িকতা খুঁজে পান। এই বিরাট ভারতবর্ষ জুড়ে কত রাজনৈতিক উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে দেশভাগের মতো প্রলয়ংকরী ঘটনা ঘটে গেল, সে কি শুধুই মুসলমানদের সাম্প্রদায়িকতার কারণে? এই একমার্গী চিন্তা-ভাবনাও এক ধরনের সাম্প্রদায়িকতা। বদরুদ্দীন উমর সাহেবের এ বই এখানকার সেক্যুলার বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের প্রীতির কারণ হলেও ইতিহাসের জন্য তা মোটেই সুখকর হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এককালে হিন্দুরা কৌতুক করে বলত 'মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়'। পাকিস্তান হওয়ার পর এই মক্কা বিশ্ববিদ্যালয় কেমন করে ধর্মনিরপেক্ষতার যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। মরহুম নওয়াব সলিমুল্লাহ বাহাদুর দরিদ্র মুসলমানদের এগিয়ে নেওয়ার জন্য এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিরাট ভূমিকা পালন করেন। এই দরিদ্র মুসলমানের ছেলে-পেলেরাই শিক্ষিত হয়ে কেউ কেউ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে ধর্মনিরপেক্ষতার সাধনা শুরু করেন। এখানকার কোনো কোনো শিক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি যায় পালটে। মোফাজ্জল হায়দার, মুনীর চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, রাশিদুল হাসান, আহমদ শরীফ, আবদুর রাজ্জাক। শেষের জন এদের সবার গুরু। যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সাম্প্রদায়িকতা থেকে বাঁচার জন্য মুসলমানরা দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারণার সমর্থক হয়, এক প্রজন্মের মধ্যে তাদের ছেলে-পেলেরাই কেউ কেউ মুসলিম সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদের কথা শুনে নাক সিটকান। এসব বুদ্ধিজীবীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে ছাত্রদের ধর্মনিরপেক্ষ করে তোলেন আর প্রচার করেন- তারা আগে বাঙালি, তারপরে মুসলমান। এইভাবে মুসলিম সংস্কৃতির ভিত দুর্বল হয়। এক প্রজন্ম আগে যে মুসলমানরা এই হিন্দু রিভাইভালের সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বুক পেতে দাঁড়িয়েছিল, এক প্রজন্ম পর তাদের ছেলে-পেলেরাই সেই হিন্দু রিভাইভালের চেতনাকে বুকে টেনে নিচ্ছে। ইতিহাস মাঝে মাঝে কৌতুকও করে!

এখানকার সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীরা ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে বোঝেন- ইসলাম বাদ দিয়ে অন্য সব ধর্মের স্বার্থ রক্ষা করা। আর সাম্প্রদায়িকতা বলতে বোঝেন- মুসলমানের স্বাধিকার ও স্বাতন্ত্র্যের অধিকার সংরক্ষণ করা। তাই রামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দ, বঙ্কিমচন্দ্র তাদের দৃষ্টিতে ধর্মনিরপেক্ষ কিন্তু মুসলমান মওলানা আকরম খাঁ, গোলাম মোস্তফা, ফররুখ আহমদ প্রমুখ তাদের হিসেবে সাম্প্রদায়িক হতে বাধ্য। সূর্য সেন, ক্ষুদিরাম স্বাধীনতা সংগ্রামী; তিতুমীর, হাজি শরিয়তুল্লাহ প্রতিক্রিয়াশীল।

ইংরেজের দুশো বছর ধরে বাঙালি মুসলমানরা তাদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষার জন্য লড়াই করেছে। ইংরেজ চলে যাওয়ার পর এদেরই একদল ইংরেজের লেখাপড়া নিয়ে স্বাতন্ত্র্যহীনতার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এর কারণ কী? ভৌগোলিক উপনিবেশ এখন আর তেমন নেই। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ অন্যভাবে টিকে আছে। এরা সৃষ্টি করেছে মনোজাগতিক উপনিবেশ। এটি আরও মারাত্মক। ভৌগোলিক উপনিবেশ চিহ্নিত করা যায়, মনোজাগতিক উপনিবেশ সহজে চেনা যায় না। সাম্রাজ্যবাদ তার নীতি ও দর্শন দিয়ে পুরোনো উপনিবেশগুলোর শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির একাংশকে বেঁধে ফেলেছে। এরা সাম্রাজ্যবাদের স্থানীয় প্রতিনিধি। এরাই একালের ক্লাইভ, বেন্টিংক। এদের ধর্ম সেক্যুলারিজম। এদের সংস্কৃতি এখানে আধুনিকতা-মানে পশ্চিমের খ্রিস্টান ও কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু সংস্কৃতির মিল-মিশাল দেওয়া এক মূল্যবোধ। ইসলাম এদের কাছে একান্তই গৌণ বিষয়। এই যে স্বাতন্ত্র্য থেকে স্বাতন্ত্র্যহীনতার দিকে যাত্রা, সংস্কৃতি থেকে সংস্কৃতিহীনতার দিকে পথ চলা- এটাই বোধ হয় একালের বাঙালি মুসলমানের সবচেয়ে বড়ো সংকট; এক অর্থে বিপর্যয়ও বলা যায়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px