📄 ১০০. নামাযের নিয়্যত পাঠ করা
১০০. নিয়্যত পাঠ করা: আমাদের দেশে নামাযের শুরুতে ব্যাপকভাবে "নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া....." বলে নিয়্যত পাঠ করা হয়। -এটা কি ঠিক?
এই নিয়্যত পাঠ করতে গিয়ে অনেক লোক জামাতের নামাযে রুকু মিস্ করে। নামায পড়ে কিনা জিজ্ঞাসা করলে অনেক যুবক বলে: 'নিয়্যত জানিনা, তাই নামায পড়িনা।'
নামাযে নিয়্যত পাঠ করার কোনো নিয়ম নেই। রসূল সা. নামাযে নিয়্যত পাঠ করেন নাই। সাহাবীগণও করেন নাই। অতীতে কোনো আলেম উলামা করেন নাই। আমাদের দেশে বেহেশতি জেওর এবং মকসদল মুমিনীন ধরণের বইতে মনগড়া নামাযের নিয়্যত লিখে দেয়া হয়েছে।
কোনো হাদিসে এ ধরণের কোনো নিয়্যতের উল্লেখ নাই। নামাযে নিয়্যত পাঠ করা একটা বড় বিদআত।
নিয়্যত মানে- সংকল্প, উদ্দেশ্য, ইচ্ছা, এরাদা। নামায পড়ার সংকল্প করার কারণেই একজন মুমিন কর্ম ব্যস্ততা ত্যাগ করে নামাযের দিকে ছুটে আসে।
সংকল্প করার কারণেই একজন মুমিন মসজিদের দিকে পা বাড়ায়। সংকল্প করার কারণেই একজন মুমিন ঘুম ত্যাগ করে নামাযের প্রস্তুতি নেয়।
সুতরাং একজন মুমিন যখন যে নামায পড়ার উদ্দেশ্যে ঘুম ত্যাগ করে, কর্ম ব্যস্ততা ত্যাগ করে, পবিত্র হয়, অযু করে, ছুটাছুটি করে, নামাযের দিকে দৌড়ায়, মসজিদে আসে, নামাযে দাঁড়ায় তখন সেটাই তার সেই নামাযের নিয়্যত।
নামাযের উদ্দেশ্যে 'দাঁড়িয়ে তাকবীরে তাহরিমা' অর্থাৎ 'আল্লাহু আকবার' বলে নামায শুরু করবে। নিয়্যতের জন্যে মুখে কিছুই বলতে হবেনা।
এটাই আল্লাহর রসূলের সুন্নত।
📄 ১০১. মোজা পরা থাকলেও অযুতো মাসেহ না করে মোজা খুলে পা ধোয়া
১০১. মোজা পরা থাকলেও অনেকেই নামাযের সময় হলে ভীষণ কষ্ট করে পুনরায় মোজা খুলে পা ধুইয়ে অযু করে। মোজার উপর মাসেহ করেনা। তারা বলে: মাসেহ করার জন্যে চামড়ার মোজা প্রয়োজন। -এ ব্যাপারে সুন্নত নিয়ম কি? মোজা খোলে পা ধোয়ার মধ্যে কি বেশি সওয়াব আছে?
অযুর সময় রসূলুল্লাহ সা.-এর পায়ে মোজা পরা থাকলে তিনি মোজা খুলতেননা। মোজা এবং জুতার উপর মাসেহ করে নিতেন। এটাই ছিলো তাঁর সুন্নত。
মোজা কিসের তৈরি হতে হবে- সে ধরণের কোনো নির্দেশ তিনি দিয়ে যাননি। প্রচলিত নিয়মে মানুষ যেটাকে মোজা বলে মনে করে, সেটাই মোজা।
সুতরাং যে কোনো পবিত্র জিনিসের তৈরি মোজা পরা থাকলে তার উপরই মাসেহ করা যাবে।
মোজার উপর মাসেহ করা সুন্নত। কষ্ট করে মোজা খুলে পা ধোয়া এবং পুনরায় পা শুকিয়ে মোজা পরা সুন্নতের খেলাফ।
আরো বিস্তারিত জানার জন্যে পড়ুন আল্লামা হাফিয ইবনুল কাইয়্যিমের "আল্লাহর রসূল কিভাবে নামায পড়তেন?" বইটি।
📄 ১০২. ফরয নামাযের সালাম ফেরানোর পর মুক্তাদিদের নিয়ে মুনাজাত করা
১০২. ফরয নামাযে সালামের পর মুক্তাদিদের নিয়ে মুনাজাত করা কি সুন্নত?
সালাম ফিরানোর পর কিবলার দিকে ফিরে, কিংবা মুক্তাদিদের দিকে ফিরে হাত উঠিয়ে দোয়া বা মুনাজাত করার যে প্রথা চালু হয়েছে, তার কোনো প্রমাণ রসূলুল্লাহ সা. থেকে পাওয়া যায়না। সহীহ বা হাসান কোনো সূত্রেই পাওয়া যায়না। আবার অনেকেই খাস করে ফজর এবং আসর নামাযের পর মুক্তাদিদের দিকে ফিরে এরূপ মুনাজাত করার রীতি চালু করেছেন। কিন্তু এটাও রসূল সা. কিংবা খুলাফায়ে রাশেদীনের কোনো একজন থেকেও প্রমাণিত নয়। এমনটি করার কোনো নির্দেশ বা ইংগিতও তিনি উম্মতকে প্রদান করেননি。
যারা সালামের পর কিবলার দিকে ফিরে কিংবা ফজর ও আসরের পরে মুক্তাদিদের দিকে ফিরে মুনাজাত করার প্রথা চালু করেছেন, এটা তারা সুন্নতের বিকল্প হিসেবে চালু করেছেন। এটাকে তারা ভালো কাজ মনে করেন। সুন্নতের পরিবর্তে এমনটি করা ভালো কাজ কিনা তা আল্লাহই ভালো জানেন।
হাদিসে নামায সংক্রান্ত যতো দোয়ার কথা উল্লেখ হয়েছে, সবই রসূলুল্লাহ সা. নামাযের ভিতর করেছেন এবং নামাযের ভিতরে করার জন্যেই নির্দেশ দিয়েছেন。
বাংলাদেশ ও আশে পাশের অঞ্চলের লোকেরা নামাযের সাথে একাজকে একাকার করে ফেলেছে। অজ্ঞ লোকেরা নামাযের পর হাত উঠিয়ে মুনাজাত করাকে নামাযের অংগ বা নামাযের সাথে যুক্ত মনে করে। অথচ রসূল সা. এবং সাহাবায়ে কিরাম এমনটি করেননি। নামাযের ইমামগণ এমনটি করাকে বাধ্যতামূলক করে নিয়েছেন। অনেক ইমাম এমনটি করেন মুক্তাদিদের মন রক্ষার্থে, না করলে ইমামতি রক্ষা করা যায়না বলে। আসলে যে কাজটি আদৌ সুন্নত নয়, এমন একটি কাজকে সুন্নত বানিয়ে নেয়া, এমনকি ফরযের মতো অনিবার্য করে নেয়াটা কি যুক্তিসংগত হতে পারে?
আমরা বলবো, কোনো ইমাম যদি কখনো মুসল্লিগণকে নিয়ে হাত উঠিয়ে মুনাজাত করেন, তবে তা নাজায়েয নয়। কিন্তু এটাকে নিয়মে পরিণত করা এবং প্রত্যেক নামাযে অপরিহার্য ও অবধারিত করে নেয়া সুন্নতে রসূলের পরিপন্থী। অতপর মুসল্লিদের বিরাগভাজন হবার ভয়ে একাজ ঠিক নয় জেনেও ছাড়তে না পারা নিজেদের মনগড়া রীতিকে শরিয়তের বিধানে পরিণত করার নামান্তর নয়কি?
📄 ১০৩. রফে ইয়াদাইনকে আহলে হাদিসের নিয়ম বলা
১০৩. রফে ইয়াদাইন করাকে আহলে হাদিসের নিয়ম বলা হয়। এটা কি ঠিক?
নামাযে রফে ইয়াদাইন করাকে আহলে হাদিসের নিয়ম বলাটা একটা মারাত্মক ভুল। এটা রসূলুল্লাহ সা.-এর সুপ্রমানিত সুন্নত。
রসূল সা. নামাযে তিন অথবা চার স্থানে রফে ইয়াদাইন করতেন। স্থানগুলো হলো: ১. তাকবীরে তাহরিমার সময়। ২. রুকুতে যাবার সময়। ৩. রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়াবার সময়। ৪. প্রথম তাশাহ্হুদ শেষে দাঁড়াবার কালে।
প্রথম তিনটি রফে ইয়াদাইনের কথা বর্ণনা করেছেন কমপক্ষে ত্রিশজন সাহাবী। তাঁরা রসূলুল্লাহ সা. সা.-এর নামযের নিয়ম বর্ণনা করতে গিয়ে তিন জায়গায় রফে ইয়াদাইনের কথা উলেখ করেছেন। এঁদের মধ্যে কয়েকজন সাহাবী চতুর্থ রফে ইয়াদাইনের কথাও উল্লেখ করেছেন। এ সংক্রান্ত সবগুলো হাদিসই সহীহ সূত্রে বর্ণিত।
সুতরাং রফে ইয়াদাইন করা কোনো বিশেষ মযহাব বা আহলে হাদিসের রীতি নয়, স্বয়ং আল্লাহর রসূলের সুস্পষ্ট সুন্নত。
কেবল হানাফি মযহাবে একটি মাত্র স্থানে (তাকবীরে তাহরীমার সময়) রফে হায়াদাইন করা হয়। বাকী সকলেই হাদিসে বর্ণিত তিন বা চার স্থানে রফে ইয়াদাইন করেন।
ইবনে মাসউদ রা.-এর একটি মাত্র বর্ণনার ফলে হানাফী মযহাব শুধু এক জায়গায় রফে ইয়াদাইন করে। অথচ ইবনে মাসউদ রা. বিশেষ কারণে শেষ দিকে একাধিক রফে ইয়াদাইন ত্যাগ করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম তাঁর যাদুল মা'আদ গ্রন্থে বলেন:
ইবনে মাসউদ রা.-এর রফে ইয়াদাইন ত্যাগ করাটা এ জন্যে ছিলোনা যে, তিনি তা রসূলুল্লাহ সা. থেকে জানতে পেরেছেন। তিনি আসলে রফে ইয়াদাইনের সাথে বিরোধও করেননি এবং তার পরিপন্থি কাজও করেননি। ব্যাপারটা হলো, সেকালে আমীর-উমারারা দেরি করে নামাযে আসতেন। ফলে তিনি আযান-ইকামত ছাড়া ঘরেই নামায পড়তেন। এসময় তাঁর দুপাশে দু'জন মুক্তাদি দাঁড়াতো। তিনি ইমাম হিসেবে সামনে না দাঁড়িয়ে তাদের সমান্তরালে তাদের মাঝখানে দাঁড়াতেন। এতে করে রফে ইয়াদাইন করতে অসুবিধা হতো বলে তিনি তা করতেন না। (দ্রষ্টব্য, গ্রন্থ: আল্লাহর রসূল কিভাবে নামায পড়তেন?)