📘 মুসলিম সমাজে প্রচলিত ১০১ ভুল 📄 ১৩. কাউকেও গাউসুল আযম বলা, আবদুল কাদের জিলানির নামে অলৌকিক কর্মকাণ্ডের মিথ্যা প্রচার

📄 ১৩. কাউকেও গাউসুল আযম বলা, আবদুল কাদের জিলানির নামে অলৌকিক কর্মকাণ্ডের মিথ্যা প্রচার


১৩. বলা হয়: আবদুল কাদের জিলানী গাউসুল আযম। মায়ের গর্ভে থাকতেই কুরআন মুখস্ত করেছেন। মেরাজে সিদরাতুল মুনতাহার পরে নবীকে অভয় দিয়েছেন- এগুলো কি ঠিক?

এ কথাগুলো থেকে বুঝা যায়, আবদুল কাদের জিলানি মানুষ ছিলেন না। কারণ এসব কথা মানব গুণাবলীর মধ্যে পড়ে না। এগুলো নিতান্তই জাহিল লোকদের কথাবার্তা যাদের মানবত্ব সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই।

গাউছ মানে-ত্রাণকর্তা, পরিত্রাণদানকারী, উদ্ধারকারী। আর গাউসুল আযম মানে-সর্বশ্রেষ্ঠ ত্রাণকর্তা। গাউছ কথাটি আল্লাহ ছাড়া আর কারো জন্যে ব্যবহার করা উচিত নয়। কারণ তাহলে তা হবে শিরকের নামান্তর। আবদুল কাদের জিলানি কখনো নিজেকে গাউছ বা গাউছুল আযম দাবি করেন নাই। পরবর্তীকালে জাহিল লোকেরা তাঁকে এই উপাধি দিয়েছে।

আর বাকি বিষয়গুলো তো কোনো মানুষের জন্যে প্রযোজ্য নয়। আবদুল কাদের জিলানি তো নস্যি, স্বয়ং নবীর কাছে এ ধরনের অনেক অলৌকিক বিষয় দাবি করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি বলেছেন, আমিতো মানুষ, আমার পক্ষে এগুলো করে দেখানো সম্ভব নয়। দেখুন কুরআন কী বলে:

وَقَالُوا لَن تُؤْمِنَ لَكَ حَتَّى تَفْجُرَ لَنَا مِنَ الْأَرْضِ يَنبُوعًا • أَوْ تَكُونَ لَكَ جَنَّةٌ মِّن نَّخِيلٍ وَعِنَبٍ فَتُفَجِّرَ الْأَنْهَارَ خِلَالَهَا تَفْحِيرًا . أَوْ تُسْقِطَ السَّمَاءَ كَمَا زَعَمْتَ عَلَيْنَا كِسَفًا أَوْ تَأْتِيَ بِاللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ قَبِيلاً • أَوْ يَكُونَ لَكَ بَيْتٌ مِّن زُخْرُفَ أَوْ تَرْقَى فِي السَّمَاءِ وَلَن تُؤْمِنَ لِرُقِيِّكَ حَتَّى تُنَزِّلَ عَلَيْنَا كِتَابًا نَّقْرَؤُهُ قُلْ سُبْحَانَ رَبِّي هَلْ كُنتُ إِلَّا بَشَرًا رَّسُولاً .

অর্থ: (কাফির মুশরিকরা) বলে: আমরা কখনো তোমার প্রতি ঈমান আনবোনা, যতোক্ষণ না তুমি ভূমি থেকে আমাদের জন্যে একটি ঝরণাধারা উৎসারিত করবে, অথবা তোমার খেজুর ও আংগুরের একটি বাগান হবে, যার ফাঁকে ফাঁকে তুমি অনেক নদী নালা, ঝরণাধারা প্রবাহিত করে নেবে, অথবা তুমি যেমন বলে থাকো, সে অনুযায়ী আকাশকে খণ্ডবিখণ্ড করে আমাদের উপর ফেলবে, অথবা আল্লাহকে এবং ফেরেশতাদেরকে আমাদের সম্মুখে এনে উপস্থিত করাবে, অথবা তোমার স্বর্ণ দ্বারা নির্মিত একটি ঘর হবে, অথবা তুমি আকাশে আরোহন করবে, কিন্তু তোমার ঐ আরোহনকে আমরা ততোক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বাস করবো না, যতোক্ষণ না তুমি ওখান থেকে আমাদের প্রতি একটি কিতাব নাযিল করবে যা আমরা পাঠ করবো। (হে নবী!) তুমি বলো: অতিশয় পবিত্র ও মহান আমার প্রভু! আমি কি একজন মানুষ রসূল ছাড়া আর কিছু? (সূরা ১৭ ইসরা: আয়াত ৯০-৯৩)

📘 মুসলিম সমাজে প্রচলিত ১০১ ভুল 📄 ১৪. শাফায়াতের অলিক আশা

📄 ১৪. শাফায়াতের অলিক আশা


১৪. অনেক লোক নিজের আখিরাতের মুক্তির প্রচেষ্টা ছেড়ে দিয়ে পীর অলির শাফায়াতের আশায় মনগড়াভাবে তাদের খুশি করার চেষ্টা করছে। -এতে কি কোনো ফল পাওয়া যাবে?

প্রশ্ন হলো, যার শাফায়াতে পার পাওয়ার আশায় আপনি বুক বেঁধে আছেন, তার মুক্তির ব্যবস্থা করবে কে? তার বেহেশত কি নিশ্চিত? কে দিলো আপনাকে এই নিশ্চয়তা? ব্যাপারটা মনে হয় যেনো এমন যে, আপনার পীর অলির বেহেশতের নিশ্চয়তা দিচ্ছেন আপনি, আর আপনার মুক্তির দায়-দায়িত্ব পীরের বা অলির! মুক্তির এই সহজ সুন্দর ব্যবস্থা থাকতে মানুষ আল্লাহর কিতাব এবং নবীর অনুসরণের ঝামেলা পোহাতে যাবে কেন?

শাফায়াতের উদ্দেশ্যে মৃত কিংবা জীবিত লোকদের সাজদা করা, তাদের কাছে প্রার্থনা করা, ফরিয়াদ করা, মান্নত করা, তাদেরকে উসিলা ধরা, তাদেরকে ধ্যান করা- এসবই শিরক। আপনি নিজের মুক্তির ব্যবস্থা নিজে না করলে তারা আপনার কোনোই উপকার করতে পারবে না:

وَيَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلَاءِ شُفَعَاؤُنَا عِندَ اللهِ قُلْ أَتُنَبِئُونَ اللَّهَ بِمَا لَا يَعْلَمُ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ .

অর্থ: তারা আল্লাহ ছাড়া আর যাদের ইবাদত করে, সেদিন তারা তাদের ক্ষতিও করতে পারবে না, উপকারও করতে পারবে না। তারা বলে: 'আল্লাহর কাছে এরা আমাদের শাফায়াতকারী।' হে নবী বলো: তোমরা কি আল্লাহকে আকাশ ও পৃথিবীর এমন কিছু সংবাদ দিচ্ছো, যা তিনি জানেন না? তিনি পবিত্র, তারা তাঁর সাথে যাদের শরিক করে তাদের থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে। (সূরা ১০ ইউনুস: আয়াত ১৮)

মনে রাখবেন, আপনার অলি আর পীর তো দূরের কথা, সেদিন জিবরাঈল পর্যন্ত আল্লাহর অনুমতি ছাড়া টু শব্দটি করতে পারবে না:

يَوْمَ يَقُومُ الرُّوحُ وَالْمَلَائِكَةُ صَفًّا لا يَتَكَلَّمُونَ إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَنُ وَقَالَ صَوَابًا

অর্থ: সেদিন রূহ (জিবরিল) এবং সকল ফেরেশতা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। দয়াময় রহমান যাকে অনুমতি দেবেন, সে ছাড়া কেউই টু শব্দটিও করতে পারবে না। আর অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তি যা বলবে একেবারে ন্যায় ও ন্যায্য কথা বলবে। (সূরা ৭৮ আন নাবা: আয়াত ৩৮)

وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضَى وَهُم مِّنْ خَشْيَتِهِ مُشْفِقُونَ

অর্থ: তারা (অনুমতি প্রাপ্তরা) সুপারিশ করবে শুধু ঐসব লোকদের জন্যে যাদের প্রতি তিনি (আল্লাহ) সন্তুষ্ট, আর তারা নিজেরাই তো তাঁর ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত থাকবে। (সূরা ২১ আম্বিয়া: আয়াত ২৮)

📘 মুসলিম সমাজে প্রচলিত ১০১ ভুল 📄 ১৫. অলি আল্লাহদের কেরামতি

📄 ১৫. অলি আল্লাহদের কেরামতি


১৫. অনেকে মনে করে, কেরামতি প্রদর্শন করা অলি আল্লাহ হবার প্রমাণ - এটা কি সঠিক?

এটা একেবারেই ভ্রান্ত কথা! কেরামতির সাথে অলি আল্লাহর কি সম্পর্ক? সাহাবীগণ, তাবেয়ীগণ, ইমাম আবু হানিফা, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আহমদ, ইমাম মালেক, ইমাম মুহাম্মদ, আবু ইউসুফ, ইমাম বুখারি, ইমাম মুসলিম তাঁরা কেউই কেরামতি প্রদর্শন করেন নাই। মুসলিম উম্মতের মধ্যে এদের চাইতে বড় বুযুর্গ বা অলি আর কেউ আছে কি? কেরামতি প্রদর্শন করে বুযুর্গি প্রমাণ করা আল্লাহর রসূলের সুন্নত নয়। কেরামতির নামে সমাজে অনেক বানোয়াট কাহিনী প্রচলিত আছে। এগুলোতে কান দেয়া ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য নয়।

📘 মুসলিম সমাজে প্রচলিত ১০১ ভুল 📄 ১৬. দরগাহ, মাযার, শরিফ এবং দরগাহ ও মাযারের প্রতিসম্মান প্রদর্শন

📄 ১৬. দরগাহ, মাযার, শরিফ এবং দরগাহ ও মাযারের প্রতিসম্মান প্রদর্শন


১৬. দরগাহ এবং মাযারের মধ্যে পার্থক্য কি? দরগাহ এবং মাযারকে শরিফ বলা যাবে কি? যেমন দরগাহ শরিফ, মাযার শরিফ। দরগাহ এবং মাযারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা জায়েয আছে কি?

দরগাহ ফারসি শব্দ। মাযার আরবি শব্দ। উভয় শব্দের একই অর্থ। অর্থাৎ পরিদর্শনের স্থান, দর্শণীয় স্থান, রাজসভা। -এগুলো হলো আভিধানিক অর্থ। প্রচলিত অর্থে দরগাহ এবং মাযার মানে- বুযুর্গ বা পুণ্যবান ব্যক্তির সমাধি।

আমাদের উপমহাদেশে যে কোনো কিছুর সাথে 'শরিফ' শব্দটি ব্যবহার করা হয়। শব্দটি ব্যবহার করা একটা বাতিকে পরিণত হয়েছে। শরিফ মানে- মর্যাদাবান, সম্মানার্হ, অভিজাত, ভদ্র। সাধারণত কোনো কিছুর সাথে 'শরিফ' কথাটি জুড়ে দেয়া হয় শ্রদ্ধা এবং সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে। তাই কোনো কোনো ক্ষেত্রে 'শরিফ' প্রয়োগ করা জায়েয। যেমন: কুরআন শরিফ, কাবা শরিফ, হারাম শরিফ, হাদিস শরিফ, খানকা শরিফ।

উল্লেখিত ক্ষেত্র সমূহে যেরূপ সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভক্তি প্রকাশার্থে শরিফ শব্দটি ব্যবহার করা হয়, অনুরূপ ভক্তি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনার্থে নিম্নোক্ত ক্ষেত্রে শরিফ শব্দ প্রয়োগ একেবারে না জায়েয। যেমন: মাযার শরিফ, দরগাহ শরিফ, উরস শরিফ, আজমীর শরিফ। এর কারণ হলো, ইসলামে প্রথমোক্তগুলো ঈমান, আকিদা এবং কুরআন সুন্নাহর ভিত্তিতেই সম্মানার্হ। কিন্তু শেষোক্তগুলোর প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা প্রকাশ করা ঈমান আকিদার সাথে সাংঘর্ষিক। বরং অনেক ক্ষেত্রেই শিরক।

ফন্ট সাইজ
15px
17px