📄 ০৭. স্বপ্নে নির্দেশ লাভ
৭. অনেকে বলেন, স্বপ্নে নির্দেশপ্রাপ্ত হয়ে একাজ করছি। মনে রাখতে হবে, একমাত্র নবীগণের স্বপ্ন ছাড়া আর কারো স্বপ্নই হিদায়াত লাভের মাধ্যম নয়। শুধু নবীগণই স্বপ্নে ওহি লাভ করতেন। ইসলামের অকাট্য মূলনীতি হলো:
১. একমাত্র কুরআন সুন্নাহই 'আদদীনুল ইসলাম' বা ইসলামি জীবন ব্যবস্থার উৎস এবং মূলসূত্র। অন্য সকলের কথা ও কাজ কুরআন সুন্নাহ সমর্থিত হলেই কেবল গ্রহণযোগ্য নতুবা পরিত্যাজ্য।
২. স্বপ্ন দ্বারা অদৃশ্য জ্ঞান অর্জন হয় না এবং শরিয়তের বিধান নির্ণয় হয় না।
৩. স্বপ্নের চাইতে জাগ্রত অবস্থার চিন্তা গবেষণা বা ইজতিহাদের মূল্য অনেক বেশি- যদি তা কুরআন সুন্নাহর মূলনীতি দ্বারা সমর্থিত হয়।
৪. কোনো সমস্যার সমাধান এবং সংঘটিতব্য বিষয়ে কোনো কোনো স্বপ্নে ইংগিত পাওয়া যেতে পারে। তবে সে সম্পর্কে কুরআন সুন্নাহয় অভিজ্ঞ ব্যক্তির ব্যাখ্যা আবশ্যক।
৫. কোনো স্বপ্ন বা স্বপ্নের ব্যাখ্যা গ্রহণ করা জরুরি নয়, ঐচ্ছিক।
📄 ০৮. পীরের অন্ধ অনুকরণ
৮. পীর সাহেব করেছেন তাই আমরাও করি। পীর সাহেব বলেছেন তাই আমরা করি। তিনি আল্লাহর অলি। তাঁর কাজ বা কথা বেঠিক হতে পারে না। এই কথাটি সরাসরি ইসলামের খেলাফ। এটা একজন মুসলিমের কথা হতে পারে না। ইসলামের মূলনীতি হলো:
১. "কুরআন সুন্নাহ দ্বারা ব্যক্তিকে যাচাই করতে হবে, ব্যক্তির কথা বা কাজ দ্বারা কুরআন সুন্নাহকে নয়।"
২. কুরআন সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক হলে পীর, দরবেশ, অলি, আলেম, শায়খ, সুফী, কর্তা সকলের কথা ও কাজই বর্জনীয়।
৩. সাহাবীগণও কুরআন সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক প্রমাণিত হলে নিজেদের মত পরিবর্তন করেছেন। যেমন: মোহরানা নির্ধারণের বিষয়ে খলিফা উমর রা. নিজের মত পরিবর্তন করেন।
📄 ০৯. উসিলা ধরে দোয়া করা
৯. একদল লোক উসিলা ধরে দোয়া করে। তারা মনে করে: উসিলা ছাড়া আল্লাহ গুনাহগারদের দোয়া কবুল করেন না, গুনাহ মাফ করেন না। -এ ধারণা কি ঠিক? এ ধারণা ঠিক নয়। কুরআন মজিদে আল্লাহ দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন। নবীগণের দোয়াও কুরআনে উল্লেখ হয়েছে। কিন্তু উসিলা ধরে দোয়া করার কোনো উল্লেখ নেই। হাদিস গ্রন্থাবলীতে দেখুন রসূলুল্লাহ সা.-এর অসংখ্য দোয়া উল্লেখ হয়েছে। কোথাও তিনি উসিলা ধরে দোয়া করেন নাই। উসিলা ধরে দোয়া করার নির্দেশ আল্লাহও দেন নাই, আল্লাহর রসূলও এ ধরণের শিক্ষা দেন নাই। সাহাবীগণ কখনো উসিলা ধরে দোয়া করেন নাই। একমাত্র ইস্তিস্কার (পানি প্রার্থনার) দোয়া এর ব্যতিক্রম। কুরআন মজিদে সবাইকে সরাসরি আল্লাহর কাছে দোয়া করতে বলা হয়েছে:
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ
অর্থ: তোমাদের প্রভু বলেছেন: তোমরা আমাকে ডাকো-আমার কাছে দোয়া করো, আমি তোমাদের দোয়া কবুল করবো। (সূরা ৪০ আল মুমিন: আয়াত ৬০)
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ
অর্থ: আমার দাসেরা যখন তোমাকে আমার বিষয়ে প্রশ্ন করে, (তুমি তাদের বলো:) আমি তাদের একেবারে কাছেই আছি। আমি প্রার্থনাকারীর ডাকে সাড়া দিই-যখনই সে আমাকে ডাকে। (সূরা ২ বাকারা: আয়াত ১৮৬)
তবে নিজের কোনো নেক আমলের উল্লেখ করে আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়া যেতে পারে।
📄 ১০. জীবিত ও মৃত ব্যক্তিদের উসিলা বানানো
১০. কিছু লোক কুরআনের আয়াত 'ওয়াবতাগু ইলাইহিল ওসিলার' উল্লেখ করে বলে: উসিলা মানে পীর বুযুর্গ ধরা।' তারা আরো বলে: 'বিপদ মুসিবত, দুঃখ কষ্ট দূর করা ও আল্লাহর শান্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে এইসব উসিলার সাহায্য নিতে হবে। এসব কাজে তাদের অনেক ক্ষমতা।' এই ধারণার বশবর্তী হয়ে তারা মরা ও জীবিত ব্যক্তিদেরকে উসিলা ধরে এবং তাদের কাছে দোয়া প্রার্থনা করে, ফরিয়াদ করে এবং তাদের কাছে মুক্তি চায়। -এ বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভংগি কী?
এ প্রসঙ্গে প্রথম কথা হলো, দোয়া হচ্ছে ইবাদত। রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: الدُّعَاءُ هُوَ الْعِبَادَةِ : অর্থ: 'দোয়া হচ্ছে ইবাদত।' (মিশকাত: দোয়া অধ্যায়)
الدُّعَاءُ مُخُ الْعِبَادَةِ : অর্থ: 'দোয়া হলো ইবাদতের মস্তিষ্ক (অর্থাৎ মূল)।' (মিশকাত: দোয়া অধ্যায়)
সুতরাং যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদের কাছে দোয়া প্রার্থনা করে, ফরিয়াদ করে, এবং যা আল্লাহর কাছে চাওয়ার তা তাদের কাছে চায়, তারা সরাসরি শিরকে লিপ্ত। তারা অন্যদেরকে আল্লাহর সমকক্ষ বানাচ্ছে এবং তাদের ইবাদত করছে।
'ওয়াবতাগু ইলাইহিল ওসিলার' অর্থ পীর বুযুর্গ ধরতে হবে, এমন কথা যারা বলে, তারা কুরআন সম্পর্কে অজ্ঞ এবং কুরআনকে নিজেদের দুনিয়াবি স্বার্থে ব্যবহার করে। উসিলা শব্দটি কুরআন মজিদে দুই জায়গায় উল্লেখ হয়েছে। তা হলো:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَابْتَغُوا إِلَيْهِ الْوَسِيلَةَ وَجَاهِدُوا فِي سَبِيلِهِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
অর্থ: হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তাঁর নৈকট্য লাভের উসিলা (উপায়) অন্বেষণ করো, আর তাঁর পথে জিহাদ করো (প্রচেষ্টা চালাও), যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো। (সূরা ৫ আল মায়িদা: আয়াত ৩৫)
এ আয়াতে উল্লেখিত 'উসিলা অন্বেষণ করো' অর্থ কী? এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত সাহাবী ইবনে আব্বাস রা. বলেন: الْوَسِيلَةُ أَيْ الْقُرْبَةُ : "উসিলা মানে-নৈকট্য।" (তফসির ইবনে কাছির)
প্রখ্যাত তাবেয়ী কাতাদা (রহ.) বলেন: أَيْ تَقَرَّبُوا إِلَيْهِ بِطَاعَتِهِ وَالْعَمَلِ بِمَا يَرْضِيْهِ "উসিলা অন্বেষণ করো মানে: আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করো তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমে এবং এমন উত্তম আমলের মাধ্যমে, যে ধরণের আমল দ্বারা তিনি সন্তুষ্ট হন।" (তফসির ইবনে কাছির)
উসিলা শব্দটি সূরা বনি ইসরাঈলেও এসেছে। সেখানে আল্লাহ পাক বলেন:
قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُم مِّن دুত্ هِ فَلَا يَمْلِكُونَ كَشَفَ الضَّরِّ عَنكُمْ وَلَا تَحْوِيلاً • أُولَئِكَ الَّذِينَ يَدْعُونَ يَبْتَغُونَ إِلَى رَبِّهِمُ الْوَسِيلَةَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ وَيَرْجُونَ رَحْمَتَهُ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ ، إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحْذُورًا .
অর্থ: হে নবী! তাদের বলো: "তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর যাদের কাছে বিপদ মুসিবত ও দুঃখ কষ্ট দূর করার জন্যে) দোয়া-প্রার্থনা-ফরিয়াদ করো, দুঃখ ও বিপদ মুসিবত দূর করার কোনো ক্ষমতা তাদের নাই। এরা যাদের কাছে প্রার্থনা করে তারা নিজেরাই তো তাদের প্রভুর নৈকট্য লাভের উসিলা সন্ধান করে, এ উদ্দেশ্যে যে, কে তাঁর কতো নৈকট্যে যেতে পারে, তারাও তাঁরই রহমত প্রত্যাশা করে এবং তাঁর শাস্তির ভয়ে ভীত থাকে। কারণ তাঁর শাস্তি যে অতিশয় ভয়াবহ।" (সূরা ১৭ বনি ইসরাঈল: আয়াত ৫৬-৫৭)
এ আয়াতগুলোতে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্যে এবং বিপদ মুসিবত ও দুঃখ কষ্ট দূর করার জন্যে মরা বা জীবিত ব্যক্তিদের উসিলা বানাতে কুরআন সুস্পষ্টভাবে নিষেধ করেছে। বলা হয়েছে:
১. তারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরকে আল্লাহর শরিক ও সমকক্ষ বানাচ্ছে।
২. তারা যাদেরকে উসিলা বানায়, বিপদ মুসিবত ও দুঃখ কষ্ট দূর করতে তারা সম্পূর্ণ অক্ষম ও অসহায়।
৩. তারা নিজেরাই আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্যে উসিলা খোঁজে।
৪. উসিলা মানে-আল্লাহর আনুগত্য ও নেক আমল, যা আল্লাহর নৈকট্য ও দয়া লাভের উপায়।