📄 ০৩. মাযারের নামে মান্নত করা, মৃত ব্যক্তিদের কাছে প্রার্থনা করা
৩. আমাদের দেশে দেখা যায়, অনেকেই বিপদ দূর হওয়ার জন্যে এবং উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে মাযারের নামে মান্নত করে, ঐ কবরে দাফন করা মৃত বুযুর্গ ব্যক্তির আশির্বাদ লাভের জন্যে তার মাযারে গিয়ে দোয়া প্রার্থনা করে, ফরিয়াদ করে। -এগুলো কি জায়েয?
এগুলো শুধু নাজায়েযই নয়, এগুলো সুস্পষ্ট শিরক। ইসলামের সুস্পষ্ট ঈমান আকিদা হলো:
- মৃত ব্যক্তি যিনিই হোন না কেন, তিনি মৃতই। তার পক্ষে কারো লাভ বা ক্ষতি করা সম্ভব নয়।
- তিনি নিজে জান্নাতে যাবেন কিনা তাও তিনি জানেন না।
- তার কবর আযাব হচ্ছে কিনা- তাও কেউ জানেনা।
- তার কবর আযাব হলে তা থেকে নিজেকে রক্ষা করার ক্ষমতাও তার নেই।
- সুতরাং তার পক্ষে অন্য কাউকে কোনো প্রকার সাহায্য করার প্রশ্নই আসেনা।
এ প্রসঙ্গে আল কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত সমূহ দেখুন:
সূরা ০৬ আল আন'আম: আয়াত ৪০-৪১ ও ৫৬। সূরা ০৭ আল আ'রাফ: আয়াত ১৯৪, ১৯৭। সূরা ১৭ ইসরা: আয়াত ৬৭। সূরা ১৯ মরিয়ম: আয়াত ৪৮। সূরা ২২ হজ্জ: আয়াত ৭৩। সূরা ২৬ শোয়ারা: আয়াত ৮২। সূরা ৩৫ ফাতির : আয়াত ১৩, ৪০। সূরা ৩৯ যুমার: আয়াত ৩৮। সূরা ৪০ গাফির: আয়াত ৬৬। সূরা ৭২ জিন: আয়াত ১৮।
📄 ০৪. কবরকে মাযার বলা
৪. কবরকে মাযার বলা বৈধ কি? আমাদের দেশে অনেক বুযুর্গ ও নেতার কবরকে মাযার বলা হয়।
মাযার মানে- দর্শনীয় স্থান, যেখানে পর্যটকরা দেখতে যায়। কবরকে মাযার বলা যায়না। রসূলুল্লাহ সা. কবরকে মাযার বলেন নাই, সাহাবীগণও বলেন নাই। আল্লাহর রসূলের কবরকে মাযার বলা হয়না, কোনো সাহাবীর কবরকেও মাযার বলা হয়না।
কবরকে মাযার বলা ইসলামের নীতি ও আদর্শের খেলাফ। কবরকে মাযার বলার উদ্দেশ্য তিনটি:
১. ঐ কবর পূজা করার জন্যে মানুষকে আহবান জানানো, অথবা
২. ঐ কবরে যাকে দাফন করা হয়েছে তার অনুসারী হওয়া, কিংবা
৩. যারা কবরকে ব্যবসা কেন্দ্র বানিয়েছে, তাদেরকে পয়সা দেয়া।
-এর কোনোটিই ইসলামে বৈধ নয়। -তবে নিজের মৃত্যুর কথা স্মরণ করার জন্যে রসূলুল্লাহ সা. কবর যিয়ারত করাকে বৈধ করেছেন।
📄 ০৫. বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিদের ‘অলি আল্লাহ’ বলা
৫. আমাদের দেশে বিশেষ বিশেষ পীর, বুযুর্গ, দরবেশ ও মৃত ব্যক্তিদের 'অলি' 'অলি আল্লাহ' বলা হয়। আসলে অলি আল্লাহর সঠিক পরিচয় কী?
'অলি' বা 'অলি আল্লাহ' সম্পর্কে আমাদের সমাজে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। মুসলমানদের মধ্যে বিশেষ বেশভূষা এবং ধরণ ধারণের ব্যক্তিদেরকে লোকেরা 'আল্লাহর অলি' বা 'অলি আল্লাহ' মনে করে। কিন্তু আসল ব্যাপার তা নয়।
অলি শব্দের অর্থ- বন্ধু, অভিভাবক, পৃষ্ঠপোষক। অলির বহু বচন আওলিয়া।
'অলি আল্লাহ' মানে- আল্লাহর বন্ধু বা আল্লাহর প্রিয়জন। আল্লাহর বন্ধু বা প্রিয়জন কে, তা কারো দাবি বা ডাকা দ্বারা নির্ধারিত হয়না। তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব আল্লাহর। আল্লাহ নিজেই কুরআন মজিদে 'অলি আল্লাহর' পরিচয় দিয়েছেন এভাবে:
أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ * الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ .
অর্থ: জেনে রাখো! আল্লাহর অলিদের ভয়ও নেই, দুশ্চিন্তাও নেই- যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে। (সূরা ১০ ইউনুস: ৬২-৬৩)
إِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُمْ رَاكِعُونَ . وَمَن يَتَوَلَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا فَإِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْغَالِبُونَ .
অর্থ: নিশ্চয়ই তোমাদের অলি হলেন আল্লাহ এবং তাঁর রসূল আর ঈমানদার লোকেরা- যারা সালাত কায়েম করে, যাকাত দিয়ে দেয় এবং আল্লাহর প্রতি অনুগত বাধ্যগত থাকে। যারা অলি মানে আল্লাহকে এবং আল্লাহর রসূলকে আর ঈমানদার লোকদেরকে, তারাই আল্লাহর দল এবং আল্লাহর দলই থাকবে বিজয়ী। (সূরা আল মায়িদা: আয়াত ৫৫-৫৬)
এ দুটি আয়াত থেকে জানা গেলো, সকল মুমিনই আল্লাহর অলি, যারা সালাত কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে, আল্লাহকে ভয় করে এবং আল্লাহর অনুগত বাধ্যগত থাকে।
ইমাম তাহাবী তাঁর 'আল আকীদা' গ্রন্থে আহলুস সুন্নত ওয়াল জামা'আতের 'অলি আল্লাহ' সংক্রান্ত আকীদা পেশ করেছেন এভাবে:
الْمُؤْمِنُ هُمْ أَوْلِيَاءُ الرَّحْمَانِ وَأَكْرَمُهُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَطْوَعَهُمْ وَأَتْبَعَهُمْ لِلْقُرْآنِ
অর্থ: সকল মুমিনই আল্লাহ রহমানের অলি। তাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানিত তারা, যারা আল্লাহর অধিকতর অনুগত ও কুরআনের অধিকতর অনুসারী।"
📄 ০৬. কাশ্ফ এবং ইলহামের মাধ্যমে নির্দেশ লাভ
৬. কাশফ এবং ইলহামের মাধ্যমে পাওয়া নির্দেশ সম্পর্কে শরিয়তের বিধান কি? অলিগণ নাকি এভাবে নির্দেশ পেয়ে থাকেন? অনেক সময় বিভিন্ন পীর বুযুর্গ সম্পর্কে বলা হয়: অমুকের কাশফ হয়েছে, অমুকের কাছে ইলহাম হয়েছে। কাশফ ও ইলহাম দীনি জ্ঞানের ভিত্তি নয়। এ ধরণের কথাবার্তা সবই দীনের মধ্যে বিভ্রান্তিকারী। এ ব্যাপারে ইসলামের সুস্পষ্ট নীতিমালা হলো:
১. দীনি জ্ঞানের উৎস হলো আল কুরআন এবং সুন্নাহ। পীর বুযুর্গের কাশফ ও ইলহাম দীনি জ্ঞানের উৎস নয়।
২. দীনের ইলম, হুকুম আহকাম, বিধি বিধান, হালাল হারাম, সওয়াব গুনাহ ইত্যাদির ভিত্তি হলো আল কুরআন এবং সুন্নাহ। পীর বুযুর্গের কাশফ এবং ইলহাম নয়।
৩. ইসলামি বিশেষজ্ঞগণের ইজতিহাদ, কিয়াস ও মতামত কুরআন-সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক হলে পরিত্যাজ্য। কুরআন সুন্নাহ কর্তৃক অনুমোদিত হলে গ্রহণযোগ্য।
৪. কুরআন সুন্নাহই ইসলাম এবং ইসলামি শরিয়তের উৎস ও মানদন্ড, অন্য কিছু নয়।