📄 ১. মুসলিম সমাজে ইসলাম ও জাহেলিয়াতের অবস্থান
দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের মধ্যে সরাসরি কুরআন সুন্নাহ অনুসরণের চাইতে পীর বুযুর্গ, অলি, দরবেশ এবং মযহাবি আলেম উলামাগণকে অনুসরণের প্রবণতা বেশি। এ প্রবণতা এ অঞ্চলে ইসলামের আগমণের সময় থেকেই লক্ষ্য করা যায়। এর অনেকগুলো কারণ রয়েছে। কয়েকটি বড় বড় কারণ হলো:
১. এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারিত হয় ব্যবসায়ী, মুজাহিদ এবং ব্যক্তিগত দা'য়ীদের মাধ্যমে। তাঁরাই ছিলেন এদেশের লোকদের কাছে ইসলামের মডেল এবং ইসলামি জ্ঞানের সোর্স। ফলে কুরআন সুন্নাহর প্রত্যক্ষ জ্ঞানের অভাবে সর্বক্ষেত্রে লোকদের পক্ষে ইসলামের যথার্থ ও পূর্ণাঙ্গ (perfect) জ্ঞান লাভ করা সম্ভব হয়নি।
২. এসব প্রচারক ব্যক্তিগণ যিনি যে এলাকায় সেটেল হয়েছিলেন, সে এলাকায় তিনি ইসলামের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিলেন। তাঁর মাধ্যমে মূর্তি ও ব্যক্তি পূজারি ব্যক্তিগণ ইসলামে দীক্ষিত হবার কারণে তাঁর মৃত্যুর পর নব দীক্ষিত স্বল্প জ্ঞানী মুসলমানরা তাঁকে মহামানব ভাবতে থাকে এবং তাঁকে পূজনীয় ভাবতে থাকে।
৩. ইসলামের প্রকৃত জ্ঞানের অভাবে এসব মনীষীদের কবরকে কেন্দ্র করে একদল স্বার্থান্বেষী লোকের আবির্ভাব ঘটে। তারা তাঁদের কবরের খাদেম বনে যায়, কবরকে মাযার বানিয়ে নেয়, কবর সাজ সজ্জা করতে থাকে এবং নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্যে কবরের দিকে মানুষকে আকৃষ্ট ও আহবান করতে থাকে। এভাবেই চালু হয় কবর কেন্দ্রিক শিরক ও বিদ'আতের সিলসিলা।
৪. কুরআন এবং সুন্নাহ হিদায়াতের মূল উৎস হিসেবে চালু না হওয়ায় বিকল্প হিসেবে যত্রতত্র, পাত্র অপাত্র নির্বিশেষে পীর মুরিদীর সিলসিলা চালু হয়। প্রথম প্রথম অনেক ক্ষেত্রেই এই সিলসিলা নেক নিয়্যতে চালু হয়। কিন্তু পরবর্তীতে এই সিলসিলার মধ্যেও ব্যবসায়িক মনোভাব এবং স্বার্থ জড়িয়ে পড়ে। এর ফলে এখানে ঢুকে পড়ে- ক. গদ্দীনশীন হবার সিলসিলা, খ. খেলাফত আদান প্রদানের সিলসিলা, গ. কবর কেন্দ্রিক মাযার প্রতিষ্ঠার সিলসিলা, ঘ. পীরের পুত্রগণের সাহেবজাদা হবার বিশেষ মর্যাদা, ঙ. উরস আয়োজনের ব্যবস্থা, চ. মুরিদ ভাগাভাগির ব্যবস্থা, ছ. ব্যক্তি পূজার সিলসিলা।
৫. এ অঞ্চলে ইসলামের আগমণের পর নব দীক্ষিত মুসলমানগণকে কুরআন পাঠ, নামায রোযা শিক্ষা দান এবং মল্লা মাসায়েল অবহিত করার জন্যে প্রথমে মকতব এবং পরে মাদরাসা প্রতিষ্ঠার কাজ চালু হয়। প্রায় সকল মকতব মাদরাসাই মাযহাবি মকতব মাদরাসা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব মকতব মাদারাসা থেকে ছাত্ররা- ক. কুরআন পাঠ, নামায পড়া এবং মসলা মাসায়েল শিখেন। খ. মাদরাসাগুলোর উপরের ক্লাসের দিকে হানাফি মযহাবের ফিকাহ পড়ানোকে প্রাধান্য দেয়া হয়। গ. বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবার পূর্ব পর্যন্ত মাদরাসা গুলোতে মাতৃভাষার পরিবর্তে শিক্ষা দানের মাধ্যম ছিলো ফারসি এবং উর্দু। এখনো কওমি মাদারাসাগুলোতে উর্দু মাধ্যমেই শিক্ষা দেয়া হয়। ফলে, মাদরাসাগুলো ইসলামের আলো জ্বালিয়ে রাখলেও শিরক, বিদ'আত এবং জমাট বাঁধা অজ্ঞতা, অন্ধতা ও জাহিলিয়াত দূর করার ক্ষেত্রে কাংখিত মানের সাফল্য অর্জন করতে পারেনি এবং পারছেনা।
৬. এ দেশে ইসলামের প্রসার ঘটে প্রধাণত মুসলিম শাসক, সেনাপতি ও দ্বিগ্বিজয়ীগণের মাধ্যমে। পূর্ববর্তী শাসকদের অত্যাচার নিপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে এদেশের মানুষ মুসলিম শাসক ও সেনাপতিগণকে স্বাগত জানায় এবং দলে দলে সপরিবারে মুসলমান হয়ে যেতে থাকে। এই লোকদের মধ্যে খুব কম লোকেরই ইসলামের যথার্থ শিক্ষা লাভ করার সুযোগ হয়। ফলে- ক. এদের বিপুল সংখ্যার মধ্যে ইসলামের তেমন কোনো জ্ঞানই ছিলোনা। খ. জ্ঞানের অভাবে এ ধরণের লোকেরা ইসলামের কিছু আনুষ্ঠানিক বিধি বিধান পালন করলেও ইসলামের সামগ্রিক বিধান সঠিকভাবে পালন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হতোনা। এ ধারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলে আসছে। গ. এ অঞ্চলের লোকেরা ব্যাপকভাবে ইসলাম গ্রহণ করলেও তাদের পূর্বপুরুষদের প্রথা, রসম রেওয়াজ এবং পূজা পার্বনের ধ্যান ধারণা তাদের মাথা থেকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে ফেলা সম্ভব হয়নি। এরও মূল কারণ ইসলামের যথার্থ জ্ঞানের স্বল্পতা। ঘ. এ ধরণের অজ্ঞ লোকেরা মুসলমানিত্বের কাজ হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যক্তি ও মাজার কেন্দ্রিক কার্যক্রমের সাথে জড়িয়ে পড়ে এবং বিপুল সংখ্যক লোক নামায রোযা না করেও নিজেদেরকে মুসলমান বলেই ভাবতে থাকেন। এ ধারাও অব্যাহত আছে।
উপরোক্ত কারণসমূহের প্রেক্ষিতে এবং বিশেষত সরাসরি কুরআন হাদিস অধ্যয়ন ও অনুসরণ না করার প্রেক্ষিতে এ দেশের মুসলিম সমাজে ঈমান আকিদা, ধ্যান ধারণা, বিশ্বাস দৃষ্টিভংগি, ইবাদত বন্দেগি এবং আচার অনুষ্ঠান ও রসম রেওয়াজের মধ্য দিয়ে ঢুকে পড়েছে শত রকম জাহিলিয়্যাত। ফলে- মুসলমানদের মধ্যে প্রবেশ করেছে শিরক, বিদআত; অনেক ক্ষেত্রে বিলুপ্ত হয়ে পড়েছে হালাল হারামের তারতম্য; উপেক্ষিত হচ্ছে ফরয নফলের পার্থক্য; ফরযের চাইতে প্রাধান্য পাচ্ছে নফল; হালালের চাইতে প্রাধান্য পাচ্ছে হারাম; সুন্নতের চাইতে প্রাধান্য পাচ্ছে বিদ'আত; তাওহীদের চাইতে প্রাধান্য পাচ্ছে শিরক; সত্য ন্যায় ও আদর্শের চাইতে প্রাধান্য পাচ্ছে ব্যক্তি; সত্য সন্ধানের চাইতে প্রাধান্য পাচ্ছে পূজনীয় ব্যক্তি ও অন্ধ অনুকরণ; কুরআন হাদিস জানা বুঝার চাইতে প্রাধান্য পাচ্ছে সহজে সওয়াব হাসিলের মানসিকতা; প্রাধান্য পাচ্ছে জ্ঞানের চাইতে অজ্ঞতা, আলোর চাইতে অন্ধতা।
📄 ২. ইসলামের পথ আলাদা জাহিলিয়াতের পথ আলাদা
কিন্তু, একথা পরিষ্কার, ইসলাম এবং জাহিলিয়াতের পথ সম্পূর্ণ আলাদা। ইসলামের বাহক বা জাহিলিয়াতের বাহক যার মধ্যেই উভয়টি একত্রিত হবে, তার জীবন থেকে একটিকে আরেকটি গ্রাস করে নেবে। তার বিশ্বাস ও চরিত্রে যেটির ভিত্তি দুর্বল সেটিকে গ্রাস করে নেবে যেটির ভিত্তি শক্তিশালী, সেটি।
📄 ৩. ইসলামের ভিত্তি বিধান ও মডেল
ইসলামি জ্ঞান, হিদায়াত ও জীবন পদ্ধতির মূল ভিত্তি হলো: ১. আল্লাহর কালাম আল কুরআন, ২. আখেরি নবী মুহাম্মদ রসূলুল্লাহর সুন্নাহ বা হাদিস।
কুরআন সুন্নাহ প্রদত্ত ইসলামের করণীয় ও পালনীয় বিধানের স্তর সমূহ হলো: ১. ফরয। ২. ওয়াজিব। ৩. নফল। ৪. মুবাহ। এগুলো প্রথম থেকে ক্রমানুসারে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ অবশ্য করণীয়, করণীয়, উত্তম, ঐচ্ছিক।
ইসলামের ভিত্তি ও বিধান সমূহের মডেল হলেন: ১. মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ সা. এবং ২. সাহাবায়ে কিরামের জামাত বা সমষ্টি।
📄 ৪. ইসলামের দৃষ্টিতে জাহিলিয়াত ও জাহিলিয়াতের বৈশিষ্ট্য
ইসলামের দৃষ্টিতে জাহিলিয়াত হলো: ১. আল্লাহর সম্পর্কে অজ্ঞতা, ২. শিরক, ৩. কুফর এবং মনগড়া (মানব রচিত) মতবাদে বিশ্বাস, ৪. ফিসক, যুলুম, ৫. বিদ'আত।
জাহেলিয়াতের ভিত্তি হলো: ১. অজ্ঞতা, ২. অন্ধ অনুসরণ, ৩. আত্মার দাসত্ব, ৪. স্বার্থপূজা, ৫. ভ্রান্ত রসম রেওয়াজ।
ইসলামের দৃষ্টিতে জাহিলিয়াতের বিধানসমূহ হলো: ১. হারাম (অকাট্য নিষিদ্ধ), অথবা ২. মাকরূহ তাহরিমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি মন্দ), অথবা ৩. মাকরুহ তানযিহি (মন্দ, তবে নিষিদ্ধ নয়)।