📄 “অনেক কষ্টে পাওয়া ইসলাম”
ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে অমুসলিমদের ইসলাম গ্রহণের অজানা কাহিনী (সত্য ঘটনা অবলম্বনে)
আজ এক শ্রেণী মুসলিম ঘরে জন্ম নিয়েও ইসলাম থেকে দিন দিন দূরে সরে যাচ্ছে! বর্তমানে আরেক শ্রেণী অমুসলিম ঘরে জন্ম গ্রহণ করেও বহু কষ্টে বহু ত্যাগ শিকার করে আল্লাহর শ্রেষ্ঠ নিয়ামত ইসলামের ছায়া তলে দলে দলে আসছেন এবং ইসলামের পতাকাকে সুউচ্চে তুলে ধরার কাজ করে যাচ্ছেন। মনে হচ্ছে মুসলিম দেশগুলো থেকে ইসলামের আলো আস্তে আস্তে নিভে যাচ্ছে আর পশ্চিমা দেশগুলো থেকে নতুন করে ইসলামের সূর্য উদয় হচ্ছে।
মহান আল্লাহ বলেন: হে ঈমানদার লোকেরা! তোমাদের মধ্য থেকে যারা আল্লাহর দ্বীন থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে আল্লাহ তাদের পরিবর্তে অন্য কাউকে এই কাজের সুযোগ করে দেবেন। তাদেরকে আল্লাহ ভালবাসেন এবং তারাও আল্লাহকে ভালবাসবে। তারা মু’মিনদের প্রতি হবে দয়ালু এবং কাফিরদের প্রতি হবে কঠোর। তারা সংগ্রাম করে যাবে আল্লাহর পথে। কোন নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া করবে না- এটাতো হবে আল্লাহর অনুগ্রহ-তিনি যাকে চান এভাবে অনুগ্রহ প্রদর্শন করে থাকেন। তিনি তো সীমাহীন জ্ঞানের অধিকারী।” (সূরা মায়িদা : ৫৪)
📄 ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে অমুসলিমদের ‘ইসলাম গ্রহণের কাহিনী
ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য দেখে ইউরোপিয়ান এক টুরিষ্ট-এর ইসলাম গ্রহণের বিরল ঘটনা
একজন ইউরোপিয়ান টুরিষ্ট টার্কিতে গিয়েছিলেন বেড়াতে। তিনি বিভিন্ন জায়গা ঘুরেফিরে দেখছেন। একদিনের ঘটনা। তিনি ঘুরতে ঘুরতে শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে চলে গেছেন। ঐ এলাকা ঘুরেফিরে দেখতে দেখতে দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। তিনি এবার তার হোটেলে ফিরবেন কিন্তু শহরে যাওয়ার জন্য কোন ট্রান্সপোর্ট পাচ্ছিলেন না। পথে এক ব্যক্তির সাথে দেখা, তাকে জিজ্ঞেস করলেন কিভাবে শহরে যাবেন? উত্তরে জানতে পারলেন যে এ এলাকা থেকে শহরে যাওয়ার জন্য কোন গাড়ি সন্ধ্যার পর আর চলে না, এছাড়া এখান থেকে শহরে যাওয়ার জন্য অন্য কোন ব্যবস্থাও নেই। একমাত্র উপায় পরের দিন সকাল। যাহোক তিনি ঐ পথচারীকে জিজ্ঞেস করলেন, এখানে রাত্রি যাপন করার জন্য হোটেল বা মোটেল কোথায়? কিন্তু অতি দুঃখের বিষয় হলো যে ঐ এলাকায় কোন হোটেল বা মোটেলও নেই, যেটা আছে তাও অনেক দূরে যেখানে গাড়ি ছাড়া যাওয়াও সম্ভব নয়।
এবার তিনি মহাবিপদে পড়ে গেলেন। অপরিচিত জায়গা, কি করবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না। এদিকে রাতও ঘনিয়ে আসছিল। ঐ পথচারী ব্যক্তি তার অবস্থা বুঝতে পেরে টুরিষ্টকে বললেন 'আপনি চিন্তা করবেননা। আপনি আজ রাতটা আমার বাড়িতে থেকে যান, কাল সকালে গাড়ি চালু হলে আপনি আপনার হোটেলে ফিরে যাবেন, ইনশাআল্লাহ'। টুরিষ্ট এতে রাজি হয়ে ঐ পথচারীর বাড়িতেই গেলেন। সেই ব্যক্তি তাকে রাতের আপ্যায়ন করে তাকে ঘরে ঘুমানোর ব্যবস্থা করে দিল।
পরের দিন সকালের ঘটনা। টুরিষ্ট যখন বিদায় নিচ্ছেন তখন ঐ পথচারীকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার পরিবারের আর লোকজন কোথায়? কাউকে দেখছিনা যে? তখন তিনি আশ্চর্য হয়ে আবিস্কার করলেন যে, লোকটির স্ত্রী, দুই সন্তান এবং বৃদ্ধা মা, তারা সকলেই বাড়ির পেছনে একটি গাছের তলায় অবস্থান করছে এবং সারা রাত তারা সকলেই ঐ গাছের তলায় রাত্রি যাপন করেছে কারণ তাদের থাকার ঘর ঐ একটিই যা তারা ঐ টুরিষ্টকে ছেড়ে দিয়েছিল। এই দৃশ্য দেখে এবং ঘটনাটা শুনে টুরিষ্ট তাদের দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন এবং আবেগে তার চোখ দিয়ে পানি এসে গেল।
এবার টুরিষ্ট জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তোমাদের থাকার একমাত্র ঘর ছেড়ে দিয়ে তোমার স্ত্রী, কন্যা, পুত্র এবং বৃদ্ধা মাকে নিয়ে সারা রাত শীতের মধ্যে গাছের নিচে কাটিয়েছো, তুমি কেন এই কাজ করলে? তখন ঐ ব্যক্তিটি উত্তরে বললোঃ এই শিক্ষা আমাদের ইসলামের শিক্ষা। আমাদের প্রফেট মুহাম্মাদ ﷺ আমাদেরকে শিখিয়েছেন অতিথির সাথে কেমন আচরণ করতে হয়, তাদেরকে কেমন সম্মান করতে হয়।
এই ঘটনা দেখে ঐ অমুসলিম ইউরোপিয়ান টুরিষ্ট ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যান। অতঃপর সে নিজ দেশে ফিরে গিয়ে ইসলামকে জানার চেষ্টা করেন, আল কুরআন অধ্যয়ন শুরু করেন এবং তার পাশাপাশি ইসলামের উপর লিখিত অন্যান্য বই থেকে ইসলামকে জানতে থাকেন। অতঃপর একসময় তৈরী হয়ে যান ইসলাম গ্রহণ করার জন্য এবং আলহামদুলিল্লাহ অল্প দিনের মধ্যেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ঐ টুরিষ্ট মুসলিম হওয়ার পর আজ তিনি সারা পৃথিবী ঘুরে ঘুরে ইসলামের দাওয়াতী কাজ করে বেড়াচ্ছেন।
আরেকটি শিক্ষণীয় ঘটনা
একই রকম ঘটনা ঘটেছে আমাদের জীবনেও যা আমরা আমাদের বাংলাদেশী মুসলিম পরিবারদের জন্য শিক্ষণীয় হিসেবে তুলে ধরতে চাই যে ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য এখনও বিদ্যমান।
আমি আমির জামান ২০১৩ সালে সিংগাপুরে যাই দ্বীনের দাওয়াতী কাজের উদ্দেশ্যে। আমার এক দ্বীনি ভাই সপরিবারে দীর্ঘ দিন ধরে সিংগাপুরে সিটিজেন হয়ে স্থায়ীভাবে সেখানে বসবাস করছেন। তিনি রাত তিনটায় এয়ারপোর্টে গিয়ে আমাকে পিকআপ করেছেন এবং আবার ফিরার দিন এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি আমাকে হোটেলে উঠতে দেননি এবং আলহামদুলিল্লাহ, আরাম-আয়েশে তার বাসায় ছিলাম এবং তিনি আমাকে আথিতেয়তার কোথাও কোন কমতি করেননি যে কদিন সিংগাপুরে ছিলাম।
পরের বছরের ঘটনা। ২০১৪ সালে আবার দ্বীনের দাওয়াতী কাজে আমি আমির জামান অস্ট্রেলিয়া যাই। এবার সাথে ছিল আমেরিকা থেকে আগত আমার বোনের ছেলে মোরশেদ। আমাদের অস্ট্রেলিয়া যাওয়া এবং আসার পথে ট্রানজিট ছিল সিংগাপুর। পথে আমরা সিংগাপুরে কয়েকদিন ছিলাম। এবারও একই ঘটনা। আমাদেরকে হোটেলে থাকতে দেয়া হয়নি। আমরা ঐ ভাইয়ের বাসাতেই থাকি এবং খাওয়া দাওয়া করি।
তার পরের বছরের ঘটনা অর্থাৎ তৃতীয় বছর ২০১৫ সালে আমরা সপরিবারে (আমার স্ত্রী এবং কন্যাসহ) সিংগাপুর এবং মালয়েশিয়া যাই বেড়াতে। সেই সাথে আমাদের দাওয়াতী কাজের মিশন। এবারও একই ঘটনা। এবারও সেই ভাই আমাদেরকে রাত তিনটায় এয়ারপোর্টে গিয়ে তার বাসায় নিয়ে যান এবং তার বাসায় খুবই আরাম-আয়েশে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। আসার সাথে সাথেই আমাদের ডলার ভাঙ্গানোর আগ পর্যন্ত যেন চলাফেরার কোন অসুবিধা না হয় সেজন্য দু'শ সিংগাপুর ডলার হাতে তুলে দেন। এখানেই শেষ নয়। আমরা যেন কোথাও হারিয়ে না যাই সে জন্য একটি একটিভ সেলফোন দিয়েছেন এবং নিজেরা যখন একাকী ঘোরাঘুরি করবো তার জন্য তিনজনকে তিনটি প্রিপেইড এম.আর.টি কার্ড (বাস এবং ট্রেনের পাস) দিয়ে রেখেছেন।
মূল শিক্ষণীয় ঘটনা এখন বলছি। সিংগাপুর থেকে ফিরে আসার দিন ঐ ভাই আমাদেরকে এয়ারপোর্টে পৌছে দিবেন তার ঠিক আগ মুহূর্তে বাসা থেকে বের হওয়ার কিছুক্ষণ আগে আমরা (আমি এবং আমার স্ত্রী) একটা বিষয় আবিস্কার করলাম। বিষয়টি মূলতঃ এটা আমার স্ত্রীরই আবিস্কার। আর তা হচ্ছেঃ আমরা যে রুমটাতে এই এক সপ্তাহ ছিলাম সেটা ছিল ঐ ভাই-ভাবীদের নিজস্ব বেড রুম যেখানে এটাচ বাথ, এয়ারকন্ডিশনসহ আরো অন্যান্য সুবিধা রয়েছে। ভাই এবং ভাবী তাদের নিজেদের বেডরুম অতিথিদের জন্য ছেড়ে দিয়ে নিজেরা থেকেছেন ফ্লোরিং করে অন্যরুমে, যা আমরা চিন্তাও করিনি। একই ঘটনা তারা করেছেন প্রতিবারই। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে তারা আমাদেরকে বিষয়টি কোনভাবে বুঝতে দেননি, এমনকি আকার-ইংগিতেও না। যেমন আমি যখন প্রথমবার এসেছিলাম তখন ছিলাম একজন সিঙ্গেল মানুষ, আমার একটি সাধারণ রুম হলেই তো হতো। কিন্তু তারা তা করেননি, তারা শুধু একজনেরই জন্যও তাদের নিজস্ব বেডরুম ছেড়ে দিয়ে ত্যাগ স্বীকার করেছেন। বিষয়টি আমার মাথায়ই আসেনি যে এ যুগে মানুষকে মানুষ এভাবে ভালোবাসতে এবং সম্মান করতে পারে। সুবহানাল্লাহ!
এখানে টার্কিতে টুরিষ্টের ঘটনা এবং সিংগাপুরে এই ভাই-ভাবীর ঘটনা দুটোই এসেছে রসূল ﷺ-এর যুগে সাহাবীদের থেকে। সেই সময়ে সাহাবীরা একে অপরের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতেন পাল্লা দিয়ে, তাঁরা মানুষকে ভালবাসতেন নিঃস্বার্থভাবে। আমরা যদি সকলে এই দুই পরিবারের মতো হতে পারি তাহলে প্রতিটি সমাজে বিরাজ করবে শান্তি আর শান্তি। আমরা এই দুই পরিবারের আখিরাতে মুক্তির জন্য দু'আ করি।
এন্ড্রু নামে একজন ২৫ বছর ক্যানাডিয়ান যুবকের ইসলাম গ্রহণের শিক্ষণীয় ঘটনা
ঘটনাটি ২০০৬ সালের মাঝামাঝি দিকের। আমি আমির জামান টরন্টো শহরের ডাউনটাউনে একটি নতুন চাকরিতে যোগদান করি। কিছু দিনের মধ্যে অফিসের সবার সাথে মোটামুটি পরিচিত হওয়ার পর আমার অফিসে সকল সহকর্মীকে কুরআনের ইংরেজী অনুবাদসহ অন্যান্য কিছু ইসলামী সাহিত্য উপহার দেই। মাঝে মাঝে কথা প্রসংগে তাদের ইসলাম সম্বদ্ধে জানার আগ্রহ সৃষ্টি করি। এদের মধ্যে একজন ক্যানাডিয়ান যুবক (Andrew Habard) বেশ উৎসাহ বোধ করে। সে আরো বই পুস্তক পড়তে আগ্রহী হয়ে উঠে। ঘটনা দেখে আমি আরো সিরিয়াস হয়ে তার উপর দাওয়াতী কাজ করতে থাকি। এক সময় আমাদের বন্ধুত্ব বাড়তে থাকে। এন্ড্রু খুবই পড়ুয়া একটি ছেলে। অবাক করা কথা হচ্ছে সে সম্পূর্ণ আল কুরআন (ইংরেজী অনুবাদ) বেশ কয়েকবার A to Z পড়ে ফেলেছে। অথচ আমরা মুসলিমরা অনেকেই হয়তো কোন দিন পুরো কুরআন জীবনে একবারও পড়ে দেখিনি।
আরো আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এন্ড্রু সম্পূর্ণ কুরআন অনেকবার পড়ার কারণে বিভিন্ন আয়াত তার মুখস্ত হয়ে গেছে। কুরআনের বিভিন্ন জায়গা থেকে সে আমাকে নানা রকম প্রশ্ন করা শুরু করল। মাঝে মাঝে আমি নিজেই অবাক হয়ে যেতাম যে এই কথাও কুরআনে আছে। মনে হয় নতুন শুনলাম। তার অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতাম আবার অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতাম না। সে কুরআনের বিভিন্ন সূরার উদ্ধৃতি অনর্গল দিতে পারতো অথচ সে একজন অমুসলিম।
আলহামদুলিল্লাহ ইসলামকে জানার জন্য তার আগ্রহ অসীম। অতঃপর সে কুরআনের ব্যাখ্যা জানতে আগ্রহী হয়ে উঠলো। আমি তাকে কুরআনের এক সেট তাফসীর কিনে দিলাম সেই সাথে সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ও রিয়াদুস সালেহীন হাদীস গ্রন্থ। এছাড়া তাকে দিলাম বেশ কিছু ডিভিডি লেকচার যেমন, ড. জাকির নায়েক, ড. বিলাল ফিলিপস, শেখ আহমেদ দিদাত, ড. ইউসুফ ইস্টেস ইত্যাদি।
তার সেল ফোনে এবং ল্যাপটপে কপি করে নিয়েছে আল-কুরআনের তিলাওয়াত এবং তার ইংরেজী অনুবাদ। যখনই সময় পায় সেল ফোন থেকে অর্থসহ কুরআন তিলাওয়াত শুনে। বাসায় যখন থাকে তখন জোরে জারে কুরআন তিলাওয়াত বাজায় যেন পরিবারের অন্যান্যরাও তা শুনতে পায়। এভাবে বাসায় জোরে জোরে কুরআন তিলাওয়াত বাজাতে বাজাতে তার বোনও এক সময় তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পরে। ভাইয়ের কাছ থেকে ইসলাম সম্পর্কে জানতে শুরু করে।
এক পর্যায়ে অবস্থার উন্নতি দেখে এন্ড্রু ইসলাম গ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করে। এবং একদিন এসে আমাকে জিজ্ঞেস করে "আমি ইসলাম গ্রহণ করতে চাই এবং কোন সময়টা উপযুক্ত সময়?" পরের মাসই ছিল রমাদান মাস, তাই আমি তাকে মাস খানেক পর রমাদান মাসে বুঝেশুনে ইসলাম গ্রহণ করার পরামর্শ দেই। যুবকটি এতে ধৈর্য ধরে সেদিনকার মত চলে যায়।
কিন্তু কয়েকদিন পরই সে আবার আমার কাছে দৌড়ে আসে এবং আমাকে অবাক করে দিয়ে বলে "আমি কুরআন পড়ে যা বুঝেছি তা হলো আমি যদি রমাদান আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে গিয়ে আজ বা কাল মারা যাই তা হলে আমি সোজা জাহান্নামে যাবো। আমার এতো দিনের ইসলামকে জানা ও বুঝার কোন মানে নেই, সব বৃথা। সুতরাং আর দেরী নয় আমি এক্ষুণি কালিমা পড়ে ইসলাম গ্রহণ করতে চাই।
আশহাদু আন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান 'আবদুহু ওয়া রসুলুহু।
আলহামদুলিল্লাহ, রমাদান মাস আসার আগেই আমার ঐ ক্যানাডিয়ান কলিগ ঐ মুহূর্তে ইসলাম গ্রহণ করে আমার সাথে একসাথে যোহরের সলাত আদায় করে। অতঃপর রমাদান মাস আসলো, এন্ড্রু জীবনের প্রথম সিয়াম পালন শুরু করল। কী যে তার আনন্দ তা ভাষায় বলে প্রকাশ করা যাবে না। মাঝে মধ্যে আমরা একসাথে ইফতার করি। একসাথে সলাত আদায় করি
আলহামদুলিল্লাহ, এন্ড্রু ব্রাজিলিয়ান এক মেয়েকে বিয়ে করেছে, তাদের সন্তান হয়েছে, স্ত্রী সন্তানদেরকে ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করছে। তাদেরকে নিয়ে নানা ইসলামিক সেমিনারে অংশগ্রহণ করছে। কয়েক বছর হলো এন্ড্রু ব্রাজিলে চাকুরি নিয়ে গেছে এবং সপরিবারে বর্তমানে সেখানেই রয়েছে। আমাদের সাথে মাঝে মাঝেই যোগাযোগ করে এবং ইসলামের উপর বিভিন্ন বইপত্র চেয়ে ইমেইল করে।
ব্রিটিশ মহিলা সাংবাদিকের মুসলিম হওয়ার ঘটনা
এটি আফগানিস্তানের একটি ঘটনা। আমেরিকা-ব্রিটিশ সেনারা যখন আফগানিস্তান দখল করে আছে সেই সময়ের একটি সত্য ঘটনা সারা পৃথিবীতে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। তালেবান বাহিনী Yvonne Ridley নামে এক ব্রিটিশ মহিলা সাংবাদিককে অপহরণ করে নিয়ে যায় এবং বেশ কিছুদিন তাকে তাদের নিষিদ্ধ এলাকায় একটি বাড়িতে গৃহবন্দি করে রাখে।
ঐ ব্রিটিশ মহিলা সাংবাদিক যখন তালেবানদের হাত থেকে মুক্তি পান তখন তিনি ব্রিটেনে ফিরে গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি কেন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন এবং অপহরণ অবস্থায় যে দিনগুলি তিনি মুজাহিদদের সাথে সম্মানের সাথে অতিবাহিত করেছিলেন তার উপর তিনি একটি বই লিখেছেন যা প্রথম প্রকাশের সাথে সাথেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইসলামের উপর সেমিনার করে বেড়াচ্ছেন। মুজাহিদরা যখন Yvonne Ridley-কে মুক্ত করে দেন তখন তাকে একটি ছোট্ট শর্ত দিয়ে দিয়েছিলেন যে, সে যেন ব্রিটেনে ফিরে গিয়ে আল কুরআনুল কারীমকে একবার পড়েন। তিনি ফিরে এসে শর্তানুযায়ী গোটা কুরআনের ইংলিশ ট্রান্সলেশন পড়েছিলেন। সেই Yvonne Ridley-র একটি ঘটনা এখানে শিক্ষণীয় হিসেবে তুলে ধরছি। তিনি তার বইয়ে বর্ণনা করেছেন তার নিজ চোখে দেখা Beauty of Islam। তিনি দেখেছেন মুসলিম মহিলাদের পর্দার বাস্তব রূপ। তিনি দেখেছেন মহিলাদের সম্মান। তিনি দেখেছেন মুসলিমদের পবিত্র চরিত্র, প্রকৃত সৎব্যবহার ইত্যাদি।
একদিন ঐ ব্রিটিশ মহিলা গোসলের পর তার ব্রা বাড়ির উঠানে একটি দড়ির উপর রোদে শুকাতে দিয়েছেন। এক সময় মুজাহিদ বাহিনীর লীডার এসে তাকে পরামর্শ দিলেন যে এভাবে খোলা জায়গায় পরপুরুষের সামনে তার ব্রা রোদে না দেয়াই উচিত। কারণ পুরুষরাতো মানুষ, আর শয়তানের প্ররোচণায় মানুষ ভুল করতে পারে। তাই তার এই undergarment দেখে কারো মনে খারাপ চিন্তা আসতে পারে এবং তার প্রতি কারো আকর্ষণ জাগ্রত হতে পারে।
এখানে শিক্ষণীয় যে, মহিলাদের পর্দার বিষয়টা কত সূক্ষ্ম এবং গুরুত্বপূর্ণ। একজন মহিলার অনেক দিক চিন্তা করতে হয়, আল্লাহ তাকে এতো দিক দিয়ে গুণ দিয়েছেন যে, যে কোন একটি দিক দেখেই পরপুরুষ আকর্ষণ বোধ করতে পারে। আর একজন মহিলার কোন কিছু দেখে যদি কোন পরপুরুষ আকর্ষণ বোধ করে বা মনে মনে খারাপ চিন্তা করার প্রয়াস পায় তাহলে তার জন্য আখিরাতের ময়দানে ঐ মহিলাকেই সর্বপ্রথমে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে।
আরো একটি শিক্ষণীয় ঘটনা। তালেবানদের ঐ টিমে কোন মহিলা ছিল না। Yvonne Ridley-কে যখন তারা খাবার দিত তখন কোন পুরুষ তার দিকে চোখ তুলে কখনো তাকাতো না। তিনি যে কদিন সেখানে বন্দি ছিলেন কোন পুরুষই তার সাথে খারাপ আচরণ করেনি। খারাপ দৃষ্টিতে দেখা তো দূরের কথা তার দিকে কোন দিন চোখ তুলে তাকাই নি।
এখানে শিক্ষণীয় যে, তারা Yvonne Ridley-কে নানাভাবে নির্যাতন করতে পারতো, তার শ্লীলতাহানী করতে পারতো, কিন্তু তারা তার কিছুই করেনি বরং সর্বত্রই ভাল আচরণ করেছেন যা ইসলামে নির্দেশ দিয়েছে। অথচ দেখা যায় আমেরিকান আর্মি, নেভী এবং এয়ারফোর্সের মধ্যে পুরুষ সোন্যদের দ্বারা নারী সোন্যরা নানা রকম সেক্সুয়াল হেরাজমেন্ট হচ্ছে। রেপ হওয়ার কথাতো পত্র- পত্রিকায় প্রায়ই দেখা যায়।
Yvonne Ridley সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানার জন্য তার ওয়েবসাইট দেখতে পারি:
http://yvonneridley.org/
(Yvonne Ridley British-born, award-winning Journalist, Broadcaster, Human Rights Activist)
কুরআনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ক্যানাডিয়ান এক যুবকের মুসলিম হওয়ার ঘটনা
টরন্টোতে শরীফ ভাই নামে আমাদের একজন দ্বীনি ভাই ও তার স্ত্রী গত সপ্তাহে (২০০৮ অক্টোবরের শেষের দিকে) একটি ইসলামিক গিফট কেনার জন্য একটি ইসলামী বইয়ের দোকানে গিয়েছিলেন। দোকানটি এখনো খুলেনি বিধায় তারা দোকানের সামনে অপেক্ষা করছিলেন এবং শরীফ ভাই লক্ষ্য করলেন সেখানে একটি নন-মুসলিম যুবকও অপেক্ষা করছে। শরীফ ভাই উৎসাহিত হয়ে তার কাছে জানতে চাইলেন 'তুমি এখানে কেন এসেছো?' সে প্রতি উত্তরে বলল সে এসেছে ইসলামের উপর কিছু বই কিনতে এবং সে মাঝে মধ্যেই এখানে আসে ইসলামের উপর বই, সিডি, ডিভিডি ইত্যাদি কিনতে। তারপর সে শরীফ ভাইকে জিজ্ঞেস করল 'তুমি কি মুসলিম?' শরীফ ভাই উত্তরে বললেন, হ্যাঁ। তারপর সে দ্বিতীয় প্রশ্ন করল যে 'তুমি কি কুরআন পড়?' শরীফ ভাই উত্তরে বললেন, হ্যাঁ মাঝে মাঝে পড়ি। তখন ছেলেটি অবাক হয়ে বলল 'তুমি মুসলিম হয়ে কুরআন মাঝে মাঝে পড়? আমি তো কুরআন প্রতিদিন পড়ি।' তখন শরীফ ভাই এবং ভাবী তার কথা শুনে অবাক হয়ে গেলেন এবং ভাবীর চোখে পানি এসে গেল। কারণ একজন নন-মুসলিম আজ তাদের চোখ খুলে দিল, তাদেরকে তাদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিল। শরীফ ভাই তখন তার কাছে জানতে চাইলেন 'তুমি নন-মুসলিম হয়ে কেন কুরআন পড়ছো, ইসলামের উপর কেনইবা পড়াশোনা করছ?' এবং সেও নির্দ্বিধায় তার বিস্তারিত ঘটনা বর্ণনা করল।
ছেলেটার নাম ডেভ, তার গার্লফ্রেন্ড তাকে ব্ল্যাক ম্যাজিক করেছিল, ক্যানাডিয়ান ডাক্তাররা কিছুতেই রোগ সারাতে পারছিলেন না এবং রোগটাও ধরতে পারছিলেন না। এতে ডেভ নিজে এবং তার পরিবারের সকলেই খুবই হতাশ হয়ে পড়েছিল। যাহোক, সে একদিন কোন এক মুসলিম ভাইয়ের নিকটে গিয়ে তার অসুখের কথা বলল এবং ঐ মুসলিম ভাই তাকে কুরআনের কিছু আয়াত পড়ে তার শরীরে ফুঁ দিয়ে দিলেন এবং আস্তে আস্তে সে কিছুটা সুস্থতাবোধ করতে লাগল এবং রোগ মুক্ত হতে লাগল। তখন সে ঐ মুসলিম ভাইয়ের নিকট আবার ফিরে গিয়ে জানতে চাইলেন তুমি কী পড়ে আমাকে ফুঁ দিলে আর আমি সুস্থ হতে থাকলাম? উত্তরে ঐ ভাই কুরআন খুলে তাকে দেখালেন যে সে সূরা বাকারার কিছু অংশ পড়েছিলেন। যাহোক ঘটনা এখানে শুরু।
সে দিন দিন সুস্থতার দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করল। এবার ডেভিডের মনে প্রশ্ন জাগলো এই বইয়ের মধ্যে কী এমন আছে যে তাকে সুস্থ করে তুলছে! তখন থেকে সে কুরআনের অর্থ পড়া শুরু করল এবং কয়েকবার গোটা কুরআনটা পড়ে ফেলল এবং মহান আল্লাহর কথাগুলো বুঝার চেষ্টা করতে লাগল। কুরআন এবং ইসলামকে বুঝার জন্য সে আরো ব্যাকুল হয়ে গেল এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে ইসলামের উপর প্রচুর বই-পত্র সংগ্রহ করে পড়তে লাগল। বাসায় নিয়মিত ইন্টারনেট থেকে সে ইসলামের উপর জ্ঞান অর্জন করে, কুরআন পড়ে এবং তিলাওয়াত শুনে, এভাবে তার পরিবারের উপরও ইসলামের প্রভাব পড়তে থাকে। সে এভাবে তার অভিব্যক্তি প্রকাশ করছিল যে, সে যখন কুরআন পড়ে তখন সে শরীরের মধ্যে এক রকম পাওয়ার অনুভব করে, সেই সময় তার কাছে মনে মনে হয় আশেপাশের সবকিছু কেমন যেন অন্যরকম। যাহোক পড়াশোনা করতে করতে ইতিমধ্যে ডেভের কিছু প্রশ্নও জমা হয়ে যায়। তখন শরীফ ভাই তাকে তার বাসায় আমন্ত্রণ জানালেন এবং ক্যানাডায় বসবাসরত এক সৌদি স্কলারেরর কাছে নিয়ে গেলেন ডেভের জমানো প্রশ্নে সঠিক উত্তরের জন্য। আলহামদুলিল্লাহ, ঐদিনই ডেভ, শরীফ ভাই এবং ঐ স্কলারের নিকট ইসলাম (শাহাদাহ) গ্রহণ করে এবং তাদের সাথে একসাথে আসরের সলাত আদায় করে। আলহামদুলিল্লাহ, সেদিন থেকে শরীফ ভাইও প্রতিদিন নিয়মিত কুরআন পড়া শুরু করেছেন এবং আল্লাহর কথাগুলো বুঝার চেষ্টা করছেন এবং সেই সাথে জীবনে তা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছেন।
এটা গেল একজন নন-মুসলিমের মুসলিম হওয়ার ঘটনার প্রথম ধাপ। এবার হচ্ছে দ্বিতীয় ধাপ। সে এখন আমাদের দ্বীনি ভাই এবং একজন মুসলিম। তার প্রতি আমাদের এখন আরো দায়িত্ব বেড়ে গেছে আর তা হচ্ছে তাকে সঠিক ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। যদি সে আমাদের অবহেলার কারণে এই বিষয়ে সহযোগিতা না পায় তাহলে আমাদেরকে মহান আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে। বিষয়টা শুধু 'ওয়ান ওয়ে' নয় অর্থাৎ তাকেও (ডেভিডকেও) জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে হবে। কারণ দ্বীন ইসলামের জ্ঞান অর্জন প্রত্যেকটি মুসলিম নরনারীর জন্য ফরয।
শিক্ষণীয় হিসেবে আমরা ডেভের ঘটনায় আবার ফিরে যাই। ডেভ সর্বপ্রথমে কুরআনের কিছু আয়াতের ঝাড়ফুঁকের মিরাকল দেখে কুরআনের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। আসলে এই ঝাড়ফুঁকের উসিলায় আল্লাহ তাকে কুরআনের সংস্পর্শে এসে কুরআন বুঝার সুযোগ করে দিয়েছেন। কিন্তু মূলতঃ সে ঝাড়ফুঁকের জন্যই ইসলাম গ্রহণ করেনি। সে গোটা কুরআনের অর্থ কয়েকবার পড়েছে এবং আল্লাহকে চেনার জন্য ইসলামের অন্যান্য বইপত্র পড়েছে, তারপর আল্লাহর দেয়া শ্রেষ্ঠ জীবন বিধান ইসলামকে বুঝেছে তাই শাহাদাহ নিয়েছে।
আমরা যেন এই ভুল ধারণা না করি যে আল কুরআন নাযিল হয়েছে ঝাড়ফুঁকের জন্য! হ্যাঁ কুরআনের কিছু আয়াত যেমন - সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরছি (সূরা বাকারার অংশ), সূরা ইখলাস, সূরা কাফিরুন, সূরা ফালাক এবং সূরা নাস ইত্যাদির দ্বারা কিছু ঝাড়ফুঁক করা যেতে পারে যা রসূল ﷺ সহীহ হাদীসে বলে গেছেন। আরো একটি বিষয় মনে রাখতে হবে ঝাড়-ফুঁকের মধ্যে কোন পাওয়ার নেই, আরোগ্য শুধু আল্লাহই দিতে পারেন। কিন্তু কুরআন নাযিলের মূল উদ্দেশ্য ঝাড়ফুঁক নয়। আল কুরআন সত্যিই মিরাকল কিন্তু সেই মিরাকল হচ্ছে এটা গোটা মানব জাতির জন্য হিদায়াত (Guideline for whole mankind). এতে রয়েছে ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, রাষ্ট্রিয় জীবন এবং আন্তর্জাতিক জীবন পরিচালনার constitution. যাকে বলা হয় Complete code of life বা পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান।
বুঝার সুবিধার্থে আর একটি উদাহরণ দেয়া যাক। কেউ একজন খুব মনোযোগের সাথে একটি বই পড়ছে, হঠাৎ তার কানের ভিতর চুলকাচ্ছে তখন সে তার চোখ থেকে চশমাটি খুলে চশমার ডাঁটি দিয়ে কানটি চুলকালো। এতে অবাক হয়ে সে লক্ষ্য করল যে চশমার ডাঁটি দিয়ে ভালইতো কান চুলকানো যায়। এবার সে চশমার দোকানে গিয়ে বলল ভাই আমাকে কয়েকটা চশমা দিনতো, আমি কান চুলকাবো! হ্যাঁ, প্রয়োজনে চশমার ডাঁটি দিয়ে কান চুলকানো যায় ঠিকই কিন্তু চশমা আসলে কান চুলকানোর জন্য তৈরী করা হয়নি, চশমা তৈরী হয়েছে চোখে দেয়ার জন্য। ঠিক তেমনি আল কুরআনের কিছু আয়াত দ্বারা ঝাড়ফুঁক করা যায় ঠিকই কিন্তু আল কুরআন আসলে ঝাড়ফুঁকের জন্য পাঠানো হয়নি। আল কুরআন এসেছে মানুষের জীবনকে পরিবর্তন করার জন্য। এতে লিখা আছে আমরা কী করবো আর কী করবো না। এই কুরআনের সংস্পর্শে এসে ১৪০০ বছর আগে আরব দেশের হাজার হাজার বর্বর মানুষ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু অতি দুঃখের বিষয় আজ এই কুরআন ব্যবহৃত হচ্ছে মৃত ব্যক্তিদের জন্য, জীন-ভূত তাড়ানোর জন্য, তাবিজ-কবজ করার জন্য, চাল পড়া দেয়ার জন্য আর অর্থ না বুঝে তিলাওয়াত করার জন্য!!
ইংল্যান্ডের বিখ্যাত পপ সিংগার "ক্যাট স্টীভেনস" কিভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন
ব্রিটেনের বিখ্যাত পপ সিংগার "ক্যাট স্টীভেনস” কিভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন তা আমরা অনেকেই জানি। তিনি তার জীবনের এক অশান্তিময় মুহূর্তে কুরআনের একটা অনুবাদের কপি পেয়ে পড়া শুরু করেছিলেন। পড়তে পড়তে এক সময় তিনি এই বইয়ের লেখক কে তা খুঁজতে শুরু করলেন, তিনি অনুবাদকের নাম দেখতে পেয়েছেন কিন্তু লেখকের নাম কোথাও খুঁজে পাননি। যাহোক, এই বইয়ের লেখককে খুঁজতে গিয়ে তিনি এমন এক লেখকের সন্ধান পেলেন যিনি হলেন মহান আল্লাহ রাববুল আ'লামীন। আর সে জন্য তিনি সেই লেখক মহান আল্লাহর নিকট মাথা নত করে স্বীকার করে নিয়েছিলেন "লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ"। এই ক্যাট স্টীভেনস (বর্তমানে ইউসুফ ইসলাম) আজ ইউরোপের একজন বিখ্যাত ইসলামিক স্কলার। তিনি তার এক বক্তৃতায় বলেছেন যে, 'আমি আজ যে মুসলিমদের সাথে উঠাবসা করছি তাদের সাথে যদি আমার ইসলাম গ্রহণের পূর্বে দেখা হতো তাহলে হয়তো আমার আর ইসলাম গ্রহণ করা হতো না। কারণ আমি ইসলাম গ্রহণ করার পূর্বে কুরআনের দেখা পেয়েছি, কুরআন পড়েছি, বুঝেছি তারপর ইসলাম গ্রহণ করেছি। কিন্তু আজ যাদের সাথে আমি উঠা-বসা করছি তাদের চরিত্রের সাথে আমি কুরআনের কোন মিল পাচ্ছি না'।
ক্যাট স্টীভেনস এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি পাশ্চাত্যের চাকচিক্যময় পপ জগত ছেড়ে খৃস্ট ধর্ম বদলে শান্তির ধর্ম ইসলামের ছায়াতলে নিজের আশ্রয় খুঁজে নিয়েছেন। তাই প্রতিপদে তাকে মুখোমুখি হতে হচ্ছে নানা প্রতিকূলতার। তবু তার জনপ্রিয়তা কমেনি একদমই। চালিয়ে যাচ্ছেন ইসলামের সৌন্দর্য প্রচারে নিরলস কর্মযজ্ঞ।
"এটি আল্লাহর হিদায়াত। তিনি এর মাধ্যমে তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা সঠিক পথ দেখান। (সূরা আন'আম: ৪৪)
ইসলাম পালনের সাথে প্রগতি, প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা, জীবনে উন্নতি, নারী স্বাধীনতা ইত্যাদি সাংঘর্ষিক এমন ভ্রান্ত ধারণা প্রায়ই শোনা যায়। কোন ধর্মই অশান্তির কথা বলে না। ধর্ম চায় মানুষ সামাজিক নিয়মের মধ্যে থেকে স্রষ্টাকে মেনে চলুক। কিন্তু নিজের এবং স্ব-গোষ্ঠীর হীন স্বার্থ পূরণের জন্য ধর্ম অপব্যবহার হয়ে আসছে, যুগে যুগে এখনও। কলুষিত হচ্ছে ধর্ম। ইউসুফ ইসলামের জীবনী পর্যালোচনা করে দেখা যাবে, সঠিকভাবে ধর্ম-কর্ম পালন করেও সফল, পরোপকারী, আধুনিক মানুষ হিসেবে নিজেকে বদলে নেয়া যায়।
আঁধার থেকে আলোর পথে: ১৯৭৬ সালের ছোট একটি দূর্ঘটনা বদলে দেয় তার সারাটা জীবন। ঘটনার দিন আমেরিকার ম্যালিবু বিচে সাতার কাটতে যেয়ে প্রায় ডুবতে বসেছিল। তখন সে মৃত্যু ভয়ে চিৎকার করে উঠে, "Oh God! If you save me I will work for you." বলতে না বলতেই অপ্রত্যাশিত উল্টো একটি ঢেউ তাকে তীরে আছড়ে ফেলে! এই ঘটনার পর থেকে ক্যাট স্টিভেন্সের মনে আমূল পরিবর্তন আসে। পাশ্চাত্যের জড়বাদী জগতের পিছনে না দৌড়ে মনের শান্তি এবং আধ্যাত্মিক সত্যানুসন্ধানের দিকে ঝুঁকে পরেন। শুরুতে বৌদ্ধ ধর্ম, জেন, রাশিফল, অ্যাস্ট্রলজি, নিউমারলজি, টেরট কার্ড ইত্যাদি তুলনামূলক বোঝার চেষ্টা শুরু করেন।
আবার স্টিভেন্সের ভাই ডেভিড গর্ডন জেরুজালেম ঘুরতে যেয়ে ভাইয়ের জন্য একটি পবিত্র কুরআন নিয়ে আসেন। এমন সময় ছুটিতে স্টিভেনস মরোক্কো ঘুরতে যেয়ে প্রথম আজানের ধবনি শুনতে পেয়ে অভিভূত হয়ে পরেন। জানতে চান, "এটা কিসের শব্দ?” উত্তরে জানতে পারেন, "এটা আজান, ঐশ্বরীয় বার্তা। যার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকতে মুসলিমদের মসজিদ মুখে আহবান করা হয়।” স্টিভেন্স ভাবেন, জীবনে টাকার জন্য গান করতে শুনেছি, গান হয়েছে খ্যাতির জন্য.. ক্ষমতা.. কিন্তু ঐশ্বরিক গান? জীবনেও শুনি নি! অসাধারণ কনসেপ্ট! বলা যায় এই ভ্রমণটি ছিল ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পথে তার শেষ পদক্ষেপ। সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৭ সালের ক্যাট স্টিভেন্স তেইশ ডিসেম্বর খৃস্টান ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। নিজের নাম 'ক্যাট স্টিভেন্স' পরিবর্তন করে 'ইউসুফ ইসলাম' রাখেন। পবিত্র কুরআন শরীফের ইউসুফ নবীর কাহিনী পড়ে এই নামটির প্রতি তার বিশেষ দুর্বলতা তৈরি হয়।
ইসলাম ধর্ম প্রচারে অবদান : বর্তমানে ইংল্যান্ডে মুসলিম কমিউনিটিতে ইউসুফ ইসলাম জনপ্রিয় একজন ব্যক্তিত্ব। মূলত তিনটি মৌলিক ক্ষেত্রে তিনি নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন:
১) শিশুদের ইসলাম শিক্ষা : ১৯৮৩ সালে মাত্র ৩ থেকে চার বছর বয়সের ১৩ জন শিক্ষার্থী নিয়ে লন্ডনে Islamia Primary School প্রতিষ্ঠা করেন। অসাধারণ ব্যাপার সে বছরেই অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর আবেদনের ভীড়ে অপেক্ষামান শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যায়। ১৯৮৯ Islamia Girls Secondary School প্রতিষ্ঠা করে অভূতপূর্ব সাফল্য পান। GCSE examination level-এ এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা গড়ে ফলাফল সবার চাইতে ভাল হয়। যা ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এক নতুন ধারণা, মানদণ্ডের ভীত তৈরি করে। ইউসুফ ইসলাম Brondesbury College নামের আর একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। এখানে মূলতঃ স্কলারশিপ নিয়ে ছাত্ররা ইসলামী শিক্ষার আলোকে পড়াশোনা করে থাকে। তাদের ঈর্ষণীয় রেজাল্ট দেখলে ধারণা করা যায় তাদের সাফল্য।
ইউসুফ ইসলাম United Kingdom Islamic Education Waqf (UKIEW) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। এ প্রতিষ্ঠান মূলত ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থ সাহায্য দিয়ে থাকে। তিনি Association of Muslim Schools-এর ও চেয়ারম্যান। যারা সমগ্র ইংল্যান্ডে সকল ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থ, তথ্য, শিক্ষা, ট্রেনিং ইত্যাদি দিয়ে থাকে। ১৯৯২ সালে ইংল্যান্ডে তার তত্ত্বাবধানে Waqf Al-Birr Educational Trust নামের একটি চ্যারিটি প্রতিষ্ঠান নথিভুক্ত হয়। এই প্রতিষ্ঠান ইসলাম প্রচারে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। তাছাড়া ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠা এবং গবেষণার কাজও করে থাকেন তারা। ইংল্যান্ডের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (মুসলিম/অমুসলিম) তারা International Board of Educational Research and Resources (IBERR) সাথে নিয়ে বিষয় ভিত্তিক ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োগ, ট্রেনিং, শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করে থাকে।
২) ইসলামের দাওয়াত: ১৯৯৪ সালে ইউসুফ ইসলাম Mountain of Light প্রতিষ্ঠা করেন। সংস্থাটি মূলতঃ ইসলাম ধর্ম বিষয়ক দাওয়াতি তথ্য উপকরণ, প্রচারের বিভিন্ন মাধ্যম তৈরি করে থাকে। যেমন, মাল্টিমিডিয়া অডিও-ভিডিও ক্যাসেট, সিডি, ডিভিডি। এখান থেকে রিলিজ পায় Life of the Last Prophet। অ্যালবামটি ইন্সট্রুমেন্ট একদমই ব্যবহার হয়নি। এটা ২০ বছর মিউজিক ইন্ড্রাস্ট্রিস থেকে দূরে থাকার পর তার প্রথম অফিসিয়াল রিলিজ। তাদের নতুন রিলিজ A Is for Allah। ইসলাম শিক্ষা বিষয়ক ডাবল অ্যালবাম।
৩) বিশ্বের সুবিধা বঞ্চিত মানুষদের পাশে: Muslim Aid একটি আন্ত 'জাতিক সাহায্য সংস্থা। ১৯৮৫ সালে ইউসুফ ইসলাম সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করেন। পৃথিবীর অন্যান মুসলিম সাহায্য সংস্থার সাথে মিলিতভাবে তারা তাদের কাজ করে যাচ্ছে। সংস্থাটি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থ এবং প্রাকৃতিক বিপর্যস্থ মানুষদের সাহায্য করে থাকে। এযাবৎ কালে প্রায় চার লক্ষ মানুষকে তারা প্রত্যক্ষ সাহায্য করেছে। এছাড়া এতিম শিশু এবং দুস্থ পরিবারদের বিভিন্ন সাহায্য দিয়ে থাকে। আফ্রিকা, ইরাক, ইন্দেনেশিয়া এবং কসোভোতে হাজার হাজার দুস্থ পরিবার এবং এতিম শিশুকে পুনর্বাসন করেছে। বাংলাদেশে অনেকদিন ধরে এই সংস্থাটি বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। 'ক্যাট স্টিভেনস মিউজিক' হতে বছরে আয়কৃত প্রায় দের মিলিয়ন ডলার পুরোটা ইসলাম প্রচার প্রসার এবং বিভিন্ন ত্রাণ কার্যে দান করে থাকেন। ইউসুফ ইসলাম Forum Against Islamophobia And Racism (Fair) নামের ফোরামের হয়ে ইসলাম ভীতি এবং বর্ণবাদ (Islamophobia and Racism)-এর বিরুদ্ধে সর্বদা একটি সোচ্চার গলা। ভিন্ন বর্ণ-ধর্ম বিশ্বাসের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া নানা বৈষম্যমূলক নীতি, আইনের বিরুদ্ধে তারা কাজ করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ভ্রমণ : UNICEF-এর বিশেষ দূত হয়ে ক্যাট স্টিভেন্স যুদ্ধ বিধবস্থ বাংলাদেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, পটুয়াখালি, ভোলা, রংপুর ইত্যাদি স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছেন। দেশের ধনী ও গরীব শ্রেণীর বৈষম্য এবং রাজনীতির দৈন্যতা তার ভালই চোখে পরেছে!
হিজাব বিতর্ক : জার্মানে The Echo music award অনুষ্ঠানে life achievements as musician and ambassador between cultures নিতে যেয়ে ইউসুফ ইসলামের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ ওঠে যে, সে নিজের স্ত্রী ছাড়া হিজাব না পরা অন্য কোন নারীর সাথে কোন প্রকার কথা/ভাব আদান প্রদান করেন না! সে কারণে ইউসুফ ইসলামের প্রতিনিধি নাকি আগেই জানিয়েছে, কোন নারী উপস্থাপিকা থাকলে ইউসুফ ইসলাম সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হবেন না। World Entertainment News Network এর পক্ষে Contactmusic.com (প্রতি মাসে প্রায় বাইশ লক্ষ্য বার হিট) এ প্রকাশিত এক আর্টিক্যালে এই অভিযোগ জোরেসোরে ওঠে। এই মিথ্যা অভিযোগের কারণে ইউসুফ ইসলাম মামলা ঠুকে দেন। যথারীতি সত্যের জয় হয় এবং ক্ষতিপূরণ পান। এবং ক্ষতিপূরণ থেকে প্রাপ্ত সমস্ত টাকা Small Kindness Charity-তে দান করে দেন।
পরে এই বিষয়ে ইউসুফ ইসলাম বলেন, এটা সত্য যে আমার ম্যানেজার আগেই সেই অনুষ্ঠানের আয়োজকদের বলে রেখেছিল যেন উপস্থাপিকারা এমন কিছু না করে যাতে ইউসুফ ইসলাম কোন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পরেন। তার সাথে বিধর্মী কেউ হিজাব পরবে বা না পরবে সেটা নিয়ে আমার কাছ থেকে আপত্তি আসবে কেন? নারী স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কোন মর্যাদাহানিকর দাবী এখানে ছিল না যা সবাই অপপ্রচার করছে। ইসলামে নারীদের সম্মান সব থেকে বেশি। তবে ইসলাম ধর্মে যে কোন প্রাপ্ত বয়স্ক নারীর সাথে দৈহিক সংস্পর্শ আসে এমন কোন মেলামেশা নিষেধ আছে। আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পর থেকে নারীর সম্মান বুঝতে শিখেছি। কারণ আমার বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখেছি পশ্চিমা কালচারে নারীদের শুধু চকচকে ভোগ্য পণ্য হিসাবে ব্যবহার করে থাকে। সেখানে ইসলামের ন্যায় নারীর সম্মান বলতে কিছু নেই।
মুসলিম হবার পর পর মায়ের কাছে ফিরে আসি আমি এবং সাথে থেকে তাঁর দেখভাল শুরু করি। আমি আমার মায়ের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করি। ব্যাপারটা ছিল এই রকম, তাকে অনেকগুলো পাত্রীর ছবি দেখানো হলো। তাদের মধ্যে বউ হিসাবে একজনকে বেছে নিতে বলি। মা এভাবে আমার জীবন সঙ্গিনী বেছে দেন। অদ্ভুত ব্যাপার তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল শতভাগ সঠিক! আমি আমার স্ত্রীর সাথে সুখী জীবনযাপন করছি। পরের বছরই আমাদের কোল জুড়ে ফুটফুটে একটি মেয়ে সন্তান জন্ম নেয়। আল্লাহর রহমতে আমার এখন চার মেয়ে এক পুত্র সন্তান।
আমি সব সময়ই নারী শিক্ষা বিষয়ে জোড় দিয়ে থাকি। নারীদের শিক্ষা প্রসারে আমার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। আমার চার কন্যা সন্তান উগ্রতা প্রকাশ পায় না এমন পোশাক ব্যতিত সাধারণ-স্বাভাবিক সব পোশাকই পরে এবং সেই সকল পোশাক অবশ্যই তাদের শরীর ঢাকা থাকে। আমার মেয়েরা সবাই এই জীবন ব্যবস্থা থেকেই উচ্চ শিক্ষিত হয়েছে। আমার বড় মেয়ে, হাসনা, দুবাইতে একটি রেকর্ড কোম্পানী চালায়। তার পরের জন আসমা যোগ্যতাসম্পন্ন আইনজীবী এবং ছোট মেয়ে 'সু ডিজাইনার' বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। তাদের জীবনে প্রতিষ্ঠা হতে হিজাব কোন বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং হিজাবের কারণে তারা পশ্চিমা বিশ্বের আর দশজন নারীর ন্যায় জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা অযথা বিউটিফিকেশনে পেছনে ব্যয় না করে কনস্ট্রাকটিভ কাজে ব্যয় করতে পেরেছে বলে মনে করি।
বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইউসুফ ইসলাম: লন্ডন ভিত্তিক মুসলিম এইড গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সাবেক পপ সঙ্গীত শিল্পী জনাব ইউসুফ ইসলাম বলেছেন, "বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের আজকে বড় সমস্যা ইসলামের বাস্তব শিক্ষার অভাব এবং জীবনাচরণে ইসলামী আদর্শের অনুপস্থিতি। আমাদের ধর্মে যে আমাদের সকল সমস্যার সমাধান দিতে পারে সে সম্পর্কে আমরা অজ্ঞ।" তিনি যখন বাংলাদেশ ভিজিটে এসেছিলেন তখন একটি পত্রিকায় সাক্ষাতকার দিয়েছিলেন তা শিক্ষামূলক হিসেবে তুলে ধরা হলো:
প্রশ্ন: আপনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন কেন?
উত্তর: তিনি হেসে জবাব দিলেন, দেখুন সঙ্গীত আমাকে ঐশ্বর্য দিয়েছিল অপার। জীবন ভাগের সব আয়োজন ছিল আমার নাগালে। কিন্তু ভোগ বিলাস আমার মনকে শান্ত করতে পারেনি। আমি কিছুতেই তৃপ্তি পাচ্ছিলাম না। এই অশান্তি আমাকে ধর্মের দিকে ঝুঁকিয়ে দেয়। আমি আমার তদানীন্তন স্বধর্ম খ্রিস্টবাদ সম্পর্কে পড়তে শুরু করি। এরপর ইহুদী, হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের উপর আমি পড়াশোনা করি। কিন্তু আমি বিফল হই। আমার আকাঙ্খিত শান্তি আমি পেলাম না। এ সময় আমার ভাই জেরুজালেম থেকে আবেগ জড়িত কণ্ঠে অনেক কথাই বলল। আমি যে অনুসন্ধানের জন্য তখন ব্যাকুল হয়ে আছি, আমার ভাই সেই খবর জানতো। আমার জন্ম দিনে সে জেরুজালেম থেকে নিয়ে কুরআন আসা একখানা পবিত্র কুরআন শরীফ উপহার দিলো। আমি পবিত্র কুরআন পড়তে শুরু করি। কুরআন সেই মহা গ্রন্থ যা আমার জীবন ও চেতনার জগতকে পালটে দিয়েছে। আমার মনের সকল প্রশ্নের জবাব এই গ্রন্থে পেলাম। আমি আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করলাম। আমি মুসলিম হলাম।
প্রশ্ন: এখন আপনি আপনার বিগত জীবনকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন?
উত্তর: দেখুন আজ আমি পরিতৃপ্ত, সুখী। আল্লাহর সন্তুষ্টিই আমার লক্ষ্য, সে লক্ষ্যেই আমার জীবনকে পরিচালিত করার চেষ্টা করছি। আর আমার পূর্বের জীবন ছিল মোহাচ্ছন্ন, ভোগ বিলাসের, জীবনের কোন লক্ষ্য উদ্দেশ্য ছিল না।
প্রশ্ন: আপনার পুরানো বন্ধুরা আপনার সম্পর্কে কী বলে?
উত্তর: ওদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। দেখা সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময় হয়। তবে আমাদের জীবনের মৌল দর্শন পালটে গেছে। আমার লক্ষ্য হচ্ছে অনন্ত জীবন আখিরাতের প্রস্তুতি গ্রহণ, আর তাদের লক্ষ্য হচ্ছে এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীকে ভোগের জন্য প্রাণপাত করা।
প্রশ্ন: মুসলিমদের এই দুর্ভোগের কারণ কি বলে আপনি মনে করেন?
উত্তর: আমাদের সমস্যা তো একটি। ইসলাম সম্পর্কে আমাদের স্বচ্ছ ধারণার অভাব। ইসলামকে আমরা মুখে মুখে গ্রহণ করলেও আমাদের জীবনে এর আদর্শকে বাস্তবায়িত করতে পারিনি। ইসলামকে অনুসরণ করলে আমাদের সমস্যা থাকতো না। আমি পশ্চিমের ঐতিহ্য নিয়ে যেভাবে ইসলামের সৌন্দর্য, গুরুত্ব এবং সম্পদকে উপলব্ধি করছি, আমার সন্দেহ হয় অনেকেই হয়তো সেভাবে করছেন না।
প্রশ্ন: অনেকেই তো বলেন, ইসলাম ১৪শ বছরের পুরাতন আদর্শ, এ যুগের জন্য অচল। এ সম্পর্কে আপনি কি বলেন?
উত্তর: আমি বিনয়ের সাথেই বলছি, যারা এসব বলেন, তারা নিজেদের মনে স্থান করে নেয়া ইসলাম সম্পর্কে পূর্ব ধারণার বশবর্তী হয়েই ইসলামকে বিচার করে। যদি সঠিকভাবে তারা এ ব্যাপারে জানতে চাইতো তবে তাদের উক্তি হতো ইতিবাচক। এমন দায়িত্বহীন হতো না।
প্রশ্ন: যুক্তরাজ্যে ইসলামের দাওয়াতী কাজ কেমন চলছে?
উত্তর: সেখানকার পরিবেশ ও প্রচার মাধ্যমগুলো ইসলামের জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল। কিন্তু এরপরও কাজ হচ্ছে। নতুন নতুন লোক ইসলাম গ্রহণ করছে। আর এসব মুসলিম যেহেতু সেই দেশেরই নাগরিক, তাই সেখানকার সামাজিক জীবনে এর একটা প্রতিক্রিয়া পড়ছে। যুক্তরাজ্যে মুসলিম শিশুদের ইসলামী শিক্ষা দানের জন্য স্কুল খুলেছি।
প্রশ্ন: আপনার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
উত্তর: ১৯৩৮ সালের রমাদান মাসে আমি লন্ডনে জন্মেছি। আমার পিতা ছিলেন গ্রীক সাইপ্রিয়ট, মা সুইডিশ। আমার মা এখনো জীবিত। ১৯৭৭ সালে আমার ইসলাম গ্রহণের পর আমার স্বজনদের অধিকাংশই ইসলাম গ্রহণ করেছে। আমার স্ত্রী ফাউজিয়া আফগান ও তুর্কী বংশোদ্ভূত মুসলিম। আমাদের তিন কন্যা ও এক পুত্র রয়েছে। আমি ব্যবসায় কিছু পুঁজি বিনিয়োগ করেছি। এতেই আমার চলে যাচ্ছে।
প্রশ্ন: বাংলাদেশী মুসলিম ভাইদের জন্য আপনার কি কোন বাণী রয়েছে?
উত্তর: তাদের প্রতি আমার আবেদন, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হিসেবে ইসলামী উম্মাহর প্রতি তাদের দায়িত্ব অপরিসীম। ইসলামকে নিজেদের জীবনে সর্বোত্তমভাবে পালনের জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের প্রস্তুতি নেয়া।
Dr. Yusuf Islam, UK www.yusufislam.com
ড. শিবশক্তি স্বরূপজীর ইসলাম গ্রহণ
"অজ্ঞানতার দুনিয়ায় আমি 'ভগবান' হিসেবে পূজিত ছিলাম, আলোকিত বিশ্বে আমি নিজকে মানুষ হিসেবে খুঁজে পেয়েছি।"-ড. স্বরূপজী। ড. স্বরূপজী ইসলামে মুক্তির স্বাদ পেলেন গত ১০ই মে (১৯৮৬) ভারতের সাম্প্রতিক কালের এক মহাত্মা ধর্মগুরু যিনি সেদিন পর্যন্ত সেদেশের সর্বত্র 'ভগবান' নামে পরিচিত ও পূজিত ছিলেন সেই ডঃ শিবশক্তি স্বরূপজী মহারাজ উদাসেন নিজ স্ত্রী ও কন্যাসহ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তাহার নতুন নাম রাখা হয় ইসলামুল হক, পত্নীর নাম খাদিজা হক আর কন্যা নাম রাখা হয় আয়িশা হক। গুজরাটের প্রভাবশালী সাপ্তাহিক 'শাহীন' এর তরফ হতে সম্প্রতি ড. ইসলামুল হকের এক সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়।
প্রশ্ন: ইসলাম গ্রহণের পর আপনি কি অনুভব করছেন?
উত্তর: আল্লাহর হাজার শোকর যে, তিনি আমাকে ঈমানের অমূল্য সম্পদ প্রদান করেছেন। আমি নিজকে পৃথিবীর এক ভাগ্যবান ও বিজয়ী পুরুষ বলে মনে করি। অজ্ঞানতার দুনিয়ায় আমি 'ভগবান' হিসেবে পূজিত ছিলাম, আলোকিত বিশ্বে আমি নিজকে মানুষ হিসেবে খুঁজে পেয়েছি।
প্রশ্ন: আপনাকে ধন্যবাদ। এখন আপনি মেহেরবানী করে আপনার আগের নাম ও পরিচয় সম্বন্ধে কিছু বলুন?
উত্তর: আমার নাম মহানত, ড. শিবশক্তি স্বরূপজী মহারাজ উদাসেন, ধর্মচারিয়া, আদ্যশক্তিপীঠ। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত আমার পেশা মহানতগিরি। বৃন্দাবনে 'অনাখন্ড আশ্রম' নামে আমার বড় আশ্রম ছিল। দ্বিতীয় আশ্রম ছিল বোম্বাইয়ের মুলুনডে। আর তৃতীয় দেবালেইনে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এই আশ্রমটির নির্মাণ কাজ প্রায় ৫০ একর জমির উপর চলছিল। 'খারাপ পথে' চলা মানুষের সুপথে আনার উদ্দেশ্যে শিক্ষাদান' পথ প্রদর্শন ও শিষ্য তৈরী করা ছিল আমার প্রাত্যহিক কাজ।
প্রশ্ন: আপনার পান্ডিত্যের খ্যাতি সর্বত্র। আপনি আপনার নিজের সম্পর্কে, নিজের শিক্ষা জীবন ও ধর্মজীবন সম্পর্কে কিছু বলুন।
উত্তর: আশ্রমেই আমার শিক্ষার সূচনা হয়। পরে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ওরিয়েন্টালিজমে এম.এ.। গুরুকুল কাংডি থেকে 'আচারিয়া' (আচার্য) পদবী লাভ। বৃটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিশ্বের দশটি প্রধানতম ধর্মের উপর ডক্টর অব ডিভাইনিটি এবং সেই সাথে ওরিয়েন্টালিজমে আরেক পি.এইচ.ডি.। পোপ পল-৬ এর আহবানে ইতালী যাই। সেখানে সাতটি বিভিন্ন বিষয়ে ভাষণ দান করি। আমাকে এক মহাসম্মান ভাটিকানের নাগরিকত্ব দান করা হয়। এবং খ্রীষ্ট ধর্ম গ্রহণের জন্য বিশেষ অনুরোধ জানান হয়। আমি তাদের অনুরোধ উপেক্ষা করে ভারতে এসে বিধিমত মুকুট ধারণ করে আশ্রমের গদিতে বসে পড়ি। আমি প্রায় ১২টি ভাষা জানি, এর মধ্যে ইংরেজী, সংস্কৃত, গ্রীক, হিন্দি, পালি, গোরমুখী, মারাঠী, গুজরাতি, উর্দু ও আরবী আমার ভাল লাগে। আগেই বলেছি, আমি দুনিয়ার দশটি প্রধানতম ধর্মের উপর তুলনামূলক পড়াশুনা ও গবেষণা করেছি। সে জন্য সত্য স্বীকারে আমার কোন সংকোচ ছিল না। আমার সমকালীনদের মধ্যে হিন্দু জগতের বড় বড় জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিত্ব ও পন্ডিত রয়েছেন। যেমন জগৎগুরু শংকরাচার্য, রামগোপাল শারওয়ালে, পুরীর শংকরাচার্য, মহামন্ডেলশ্বর স্বামী অখন্ডানন্দজী, গুরু গোলওয়ালকার বাবা সাহেব দেশমুখ, বালঠাকুরে, অটলবিহারী বাজপায়ী, নানা সাহেব, দেশমুখ, বিনোবা ভাবে এবং অন্যান্য। একবার তিনি তার "পরমধাম" আশ্রমে আমাকে বক্তৃতাদানের বিশেষ আমন্ত্রণ জানান। সেখানে উপস্থিত লোকজনের সামনে দাদা ধর্মাধীকারী আমাকে জিজ্ঞাসা করে বসেন: "আপনি পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্ম সম্বন্ধে পড়াশুনা করেছেন, মানুষের জন্য কোন ধর্ম শ্রেষ্ঠ বলে মনে হয়? আমি জবাবে বলেছিলাম, 'ইসলাম' আমার জওয়াবে দাদা খুশী হন নাই। তিনি বলেন, উঠেন, "ইসলাম নানা বাধা-বন্ধন আরোপ করে।" আমি জবাব দিলাম, "যে বন্ধন বাঁধে, সেই বন্ধনই মুক্তি দিতে পারে। আর যে প্রথম থেকে স্বাধীন, তার সারা জীবনের জন্য বন্ধন সৃষ্টি প্রবণতা থেকে যাবে। এ ধরণীতে মানুষকে এক সাথে বেঁধে রাখার জন্য বন্ধনকারী ধর্মের প্রয়োজন রয়েছে, যা তাদের পৃথিবীতে ভাল করে বেঁধে রাখবে এবং পরলোকে মুক্ত করে দেবে। আর এ রকম ধর্ম আমার মতে একমাত্র ইসলামেই রয়েছে। ইসলাম ছাড়া এরকম ধর্ম আমি আর দেখি না।"
প্রশ্ন: আপনি বহু ধর্ম অধ্যয়ন করেছেন। ইসলামের পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থে আল্লাহ, কুরআন, মুহাম্মাদ অথবা ইসলাম সম্পর্কে কোন বর্ণনা দেখতে পেয়েছেন?
উত্তর: বৌদ্ধ ও জৈন মতবাদ ছাড়া বাকী সব ধর্ম গ্রন্থে আল্লাহ, মুহাম্মাদ অথবা আহমদ নাম পাওয়া যায়। বেদে খুবই স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়।
প্রশ্ন: আপনি লাখ লাখ টাকার সম্পদের মোহ ছেড়ে দিয়ে ইসলাম কবুল করেছেন। বর্তমানে আপনি কিভাবে জীবন নির্বাহ করছেন?
উত্তর: আমি সমগ্র বিশ্বের রাজত্বও ইসলামের এই মহান উপহারের বদলে ত্যাগ করতে দ্বিধা বা কুণ্ঠাবোধ করতাম না। ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে যে তৃপ্তি আমি পেয়েছি সাতরাজ্যের ধন সম্পদ লাভ করেও তা পাওয়া সম্ভব নয়। আমি আয়ুর্বেদিক পদ্ধতিতে চিকিৎসা করি। আল্লাহ তায়ালার কৃপায় প্যারা মাইক্রো পন্থায় দুরারোগ্য ব্যাধির উপশম ঘটাই। এতেই আমার, আমার পরিবারের ডাল রুটির ব্যবস্থা হয়ে যায়।
প্রশ্ন: মুহাম্মাদ ﷺ সম্পর্কে আপনার ধারণা কী?
উত্তর: আমি আল্লাহ তা'আলাকে চিনতাম না। আল্লাহর কসম, তিনি আমাকে চিনিয়ে দিয়েছেন...।
প্রশ্ন: ইসলামের সিপাহী হিসেবে আপনি দুনিয়ার মুসলিমদের উদ্দেশ্যে কি বাণী রাখতে চান।... আপনার মতে মুসলিমদের কেমন হওয়া উচিত?
উত্তর: এ ব্যাপারে নাবীজি যা বলেছেন তার চেয়ে ভাল কিছু আর কে বলতে পারে? তিনি মুসলিমদেরকে এমন সোনার টুকরার সাথে তুলনা করেছেন কোন অবস্থায়ই যার ঔজ্জ্বল্য কমে না। আরেক জায়গায় তিনি মুসলিমদের তুলনা করেছেন মধুমক্কীকার সাথে, যা ফুলের উপর গিয়ে বসে, নোংরা জায়গায় বসে না। ফুল থেকে রস চুষে মধু বানায়, বিষ তৈরী করে না। আর তা সে নিজের জন্য নয়, অপরের জন্য তৈরী করে। সে ডালে বসে, সে ডালের কোন ক্ষতি করে না। অন্যত্র তিনি বলেছেন, মুসলিম সেই, যার হাত ও কথা থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।
প্রশ্ন: আপনার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কিছু বলুন।
উত্তর: স্বার্থপরতার জাল হঠাতে হবে। মুসলিম মুজাহিদদের নতুন শপথ নিয়ে মাঠে নামতে হবে। সাহস, নিঃস্বার্থ ঈমান, আর মন-প্রাণ ঢেলে কাজে নামতে হবে। আমার নিজের তরফ থেকে আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টায় আছি। সমগ্র মুসলিম সমাজকে এক দেহ আর এক প্রাণে পরিণত করতে হবে। এ বিষয়ে আমার কার্যক্রম নিম্নরূপ:
(১) ইসলামের সুরক্ষা (২) মুসলিমদের দ্বীন-দুনিয়ার মূল্য ও গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করা (৩) সারা বিশ্বের মানুষের কাছে তাদের ভাষায় ইসলামের দাওয়াত পৌছান। তিনি সম্প্রতি একটি বই লিখেছেন, যার নাম "লিজিয়ে আপভি সোঁচে” এর বাংলা অর্থ- নিন আপনিও চিন্তা করুন। আশা করি হিন্দু ভাইয়েরা সত্যই চিন্তা করবেন।
মাইকেল জ্যাকসনের আইনজীবি মার্ক শেফার-এর ইসলাম গ্রহণের কাহিনী
বিশ্বের অন্যতম মিডিয়া আল-জাজিরা একটি প্রতিবেদন দেখিয়েছিল। সেই প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল এমন : 'ব্রিটিশ নারীদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে'। এতে বলা হয় :
'ব্রিটেনে গত দশ বছরে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ ধর্মান্তরিত হয়েছে। তাদের মধ্যে এগিয়ে রয়েছে নারীরা। তারা মূলত ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। 'ফেথ ম্যাটার্স' একটি ব্রিটিশ সংস্থা। এই সংস্থাটি সম্প্রতি একটি জরিপে চালিয়ে এ তথ্য জানায়। ব্রিটেনে শ্বেতাঙ্গরা, বিশেষ করে মেয়েরা খ্রিস্টান ধর্ম ছেড়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছে। ফলে রক্ষণশীল ব্রিটিশরা বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছে। জরিপে জানানো হয়, যারা ধর্মান্তরিত হয়েছে তাদের কারো বয়সই ২৭-এর বেশি নয়। এদের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা প্রায় ৬২ শতাংশ।'
বিশ্বের সকল মিডিয়া যখন ইসলামের উপর হামলা করছে; ইসলামের সুন্দর রূপটিকে কদর্য হিসেবে উপস্থাপনে আদাপানি খেয়ে মাঠে নেমেছে, তদুপরি ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয়গ্রহণকারীর সংখ্যার এমন উচ্চবৃদ্ধি কেবল ইসলামের সত্যতাই প্রমাণ করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, "তারা তাদের মুখের ফুৎকারে আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ তাঁর নূরকে পূর্ণতাদানকারী। যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে"। (সূরা আন- নূর : ০৮) এ আয়াতেরই উজ্জ্বল প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করতে পারি উপরোক্ত প্রতিবেদনটিকে। প্রতিদিনই বিশ্বের নানা দেশে অশান্তিভরা জীবন ত্যাগ করে শান্তি ও মুক্তির অব্যর্থ ঠিকানা ইসলামের পরিবারে শামিল হচ্ছেন অনেক সাধারণ নর-নারী থেকে নিয়ে জ্ঞানী-পণ্ডিতরা। এদের দীন বদলের গল্প হতে পারে আমাদের হেদায়াতের পাথেয়। হতে পারে অনেকেরই ইসলামের প্রতি পথ নির্দশক।
গত ২৪ অক্টোবর ২০০৯ শনিবার প্রখ্যাত আমেরিকান এ্যাডভোকেট ও মিলিয়নিয়ার মার্ক শেফার তার দশদিনের সৌদি ভ্রমণ শেষে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন। জনাব শেফার আমেরিকার লসএঞ্জেলস-এর একজন ডাকসাইটে আইনবিদ ও কোটিপতি। তিনি একজন খ্যাতনামা অর্পিতসম্পত্তি আইন বিশেষজ্ঞ। সর্বশেষ তিনি মৃত্যুর এক মাস আগে মাইকেল জ্যাকসনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটির বিরুদ্ধে লড়েছেন।
জনাব মার্কের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা ব্যক্ত করতে গিয়ে সৌদি ট্রাভেল গাইড জাবি বিন নাসির শরীফ বলেন, মার্ক শেফার সৌদি আরব পৌঁছার পর থেকেই ইসলাম সম্পর্কে, ইসলামের অন্যতম রুকন সলাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে শুরু করেন। রিয়াদে আমরা দুদিন অবস্থান করি। সেখানেও তিনি ইসলামের খুঁটিনাটি জিজ্ঞেস অব্যাহত রাখেন। তারপর আমরা গেলাম নাজরান। সেখান থেকে আবহা আবার সেখান থেকে উলায় গেলাম। উলায় পৌঁছার পর ইসলামের ব্যাপারে তার কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। এখানে একবার আমরা ঘুরতে বেরুনোর পর উলায় আমাদের সঙ্গে আসা তিনজন সৌদি যুবকের প্রশান্ত চিত্তে মরুবালুকার ওপর সলাত আদায় করার দৃশ্য তার হৃদয়কে প্রবলভাবে আন্দোলিত করে।
দু'দিন উলায় কাটিয়ে আমরা যাই জাউফ নামক স্থানে। জাউফে গিয়ে মার্ক শেফার আমার কাছে ইসলাম সম্পর্কিত যে কোনো গ্রন্থ চাইলেন। আমি তাকে ইসলাম ধর্মের ওপর লিখিত কয়েকটি পুস্তিকা সরবরাহ করি। তিনি মনোযোগসহ সেসব পড়া শুরু করলেন। ভোরবেলা তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন, সলাত কীভাবে আদায় করতে হয়? আমি তাকে সলাত কিভাবে পড়তে হয়, অযু করতে হয় কিভাবে তা ব্যাখ্যা করলাম। তৎক্ষণাৎ তিনি আমার পাশে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং আমার সঙ্গে সলাত আদায় করলেন। সলাত আদায়ের পর আমাকে জানালেন, তিনি সলাত আদায় করে খুব প্রশান্তি লাভ করেছেন।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আমরা জেদ্দায় ফিরে এলাম। তিনি কিন্তু পুস্তিকাগুলোর ওপর চোখ বুলানো অব্যাহত রেখেছেন। শুক্রবার সকালে আমরা পুরান জেদ্দায় গেলাম। জুমার সলাতের সময় ঘনিয়ে এলে আমরা হোটেলে ফিরে এলাম। সবাইকে জানালাম, কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি জুমার সলাত আদায় করতে যাব। মার্ক বললেন, 'আমি তোমার সঙ্গে যেতে চাই। আমি তোমাদের সলাত আদায় দেখব।' আমি তাকে স্বাগত জানালাম। মসজিদে গেলাম এবং সমবেত অনেক মুসল্লির সঙ্গে মসজিদের বহিপ্রাঙ্গণে জুমার সলাত আদায় করলাম। অনতিদূর থেকে সবই লক্ষ্য করছিলেন মার্ক শেফার। সলাত আদায়ের পর সব মুসল্লি একে অন্যকে সালাম-সম্ভাষণ জানাচ্ছেন। সবার মুখে এক অপার্থিব খুশির দীপ্তি। এসব দৃশ্য তাকে খুবই মুগ্ধ করলো।
আমরা যখন হোটেলে ফিরে এলাম, তিনি বললেন, 'আমি ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হতে চাই।' আমি তাকে গোসল করতে বললাম। সঙ্গে সঙ্গে তিনি গোসল করলেন। আমি তাকে কালিমায়ে শাহাদাতের তালকিন দিলাম। তিনি পড়লেন,
'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ'। তারপর তিনি দু'রাকাত সলাত আদায় করলেন। সলাতের পর তিনি আমাকে বললেন, আমি সৌদি ত্যাগ করার আগে পবিত্র মক্কার হারাম শরীফে যাবার বাসনা রাখি। শনিবার সন্ধ্যায় হারাম শরিফে গিয়ে তিনি সলাত আদায় করলেন। তারপর আমরা হামরায় অবস্থিত "দাওয়াহ ওয়াল ইরশাদ" অফিসে গেলাম। সেখানে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করলেন। তাকে ইসলাম গ্রহণের সাময়িক সনদ দেয়া হল। শনিবার সন্ধ্যায় তার আমেরিকান সঙ্গীরা যেহেতু চলে যাবেন তাই প্রফেসর তুরকিস্তানি মার্ক শেফারকে হারাম শরিফে পৌঁছানোর দায়িত্ব নিলেন।
স্যার মার্ক শেফারের হারাম শরীফ গমন সম্পর্কে প্রফেসর মুহাম্মদ আমিন তুরকিস্তানি বলেন, সাময়িক সনদ গ্রহণের পর মার্ক শেফার এবং আমি মক্কার হারাম শরিফে গেলাম। হারাম শরীফ দর্শন মাত্র তার চেহারায় ফুটে উঠল এক অনাবিল লাবণ্য। তার কপাল ও কপোল উদ্ভাসিত হল সৌভাগ্যের এক বিরল বৈভবে। আমরা যখন হারামে প্রবেশ করলাম। সরাসরি পবিত্র কাবা দেখতে পেলাম। তখন তার আপাদমস্তকে আনন্দের ঢেউ খেলে গেল। প্রাপ্তি ও তৃপ্তিতে ভরে উঠলো যেন তার মন। আল্লাহর শপথ! আমি সে দৃশ্যের বর্ণনা দিতে অক্ষম। মার্ক শেফার কাবা তাওয়াফ করলেন। আমরা সলাত আদায় করলাম। যখন ফিরছিলাম তখন মনে হচ্ছিল, এ ঘর তার কত আপন! কত চেনা! কাবাকে ছেড়ে তার মন যেন কিছুতেই ফিরে আসতে চাইছিল না।
'আমি যেন নব জীবন লাভ করেছি।' ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেবার পর রিয়াদে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্ক শেফার তার ইসলাম কবুলের সৌভাগ্যের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, 'আমার পক্ষে এ মুহূর্তের অনুভূতি ব্যক্ত করা আসলেই সম্ভব নয়। শুধু এতোটুকু বলতে পারি যে, আমি এক নব জীবন লাভ করেছি। আজ আমার নতুন জীবনের সূচনা ঘটলো।' তিনি আরও বলেন, আমি তো সৌভাগ্যের চূড়ায় উপনীত হয়েছি। যখন হারাম শরীফে প্রবেশ করলাম, পবিত্র খানায়ে কাবা দেখলাম সে যে কী প্রাপ্তি ও তৃপ্তির পূর্ণতার মুহূর্ত ছিল, তা আমি আপনাদের সামনে ব্যক্ত করতে সক্ষম নই।
পরবর্তীতে তিনি কী করবেন এমন এক প্রশ্নের জবাবে মার্ক শেফার বলেন, 'আমি ইসলাম সম্পর্কে আরও বেশি বেশি জানার চেষ্টা করব। আল্লাহর দ্বীন সম্পর্কে গভীরতায় পৌঁছার প্রয়াস চালাব এবং পবিত্র হাজ্জ সম্পাদনের জন্য অচিরেই আবার সৌদি আরবে ফিরে আসব।'
ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হলেন কীভাবে এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, 'ইসলাম সম্পর্কে খুব অল্পই জানা-শুনা ছিল। আমি যখন সৌদি আরব ভ্রমণ করলাম, সেখানকার মুসলিমদের জীবন যাপন প্রণালী দেখলাম, বিশেষত তাদেরকে প্রশান্তচিত্তে সালাত আদায় করতে দেখলাম, তখন ইসলাম সম্পর্কে জানতে প্রবলভাবে আগ্রহ বোধ করলাম। ইসলাম সম্পর্কে জানতে শুরু করা মাত্রই আমার প্রবল বিশ্বাস জন্মাল যে, এটি সত্য ধর্ম।
রবিবার প্রভাতে স্যার মার্ক আমেরিকার উদ্দেশে জেদ্দাস্থ কিং আব্দুল আজিজ বিমানবন্দর ত্যাগ করেন। এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন পর্ব অতিক্রম করার সময় ধর্ম ঘরে লিখেন ইসলাম। পাঠক, ছবিসহ মার্ক শেফারকে দেখতে চাইলে ভিজিট করতে পারেন।
http://www.ebnmaryam.com/vb/showthread.php?goto=newpost&t=50738
ইংল্যান্ডের ইউসুফ চেম্বারের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা
ইংল্যান্ড- লন্ডনের একটি ঘটনা। বর্তমান নাম Yousuf Chambers। তিনি ২০১০ সালে ICNA-র "Carry The Light" Annual Conference-এ Guest Speaker হিসেবে ক্যানাডায় এসেছিলেন। তিনি তার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা তার বক্তৃতায় শিক্ষণীয় হিসেবে বলেছিলেন তা তার নিজের ভাষায়ই তুলে ধরা হলো।
সত্যের সন্ধানে: আমি একটি লোকের সাথে উঠাবসা করতাম, সে একদিন আমাকে বলল তোমার মধ্যে কিছু ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে, সে আমাকে ডাক্তার দেখাতে বলল। আমি জানি আমি কেন এমন করছি, কারণ আমি বর্তমান সোসাইটির সাথে পেরে উঠতে পারছি না। আমি সত্য খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম, আমি এই পৃথিবীর অসৌন্দর্য্য থেকে বেড়িয়ে আসতে চাচ্ছি। আমি এই জীবনের কোন উদ্দেশ্য খুঁজে পাচ্ছিলাম না (What is the urpose of Life?)। আমার মনে হচ্ছিল এই পৃথিবীতে বেঁচে থেকে লাভ কি? মানুষের সঙ্গ ছেড়ে দিয়ে দীর্ঘদিন একাকী জীবন-যাপন করতে থাকি। আমি নানা রকম বইপত্র পড়তে থাকি। জ্যোতিষবিদ্যা সম্পর্কে পড়াশোনা করি। আমি নিজে নিজের সাথে যুদ্ধ করতে থাকি।
একদিন একটি চার্চে যাই। কারণ চার্চ থেকে হয়তো আমার সকল সমস্যার সমাধান পাবো। চার্চের কর্মকর্তার সাথে দেখা করি, সে আমাকে এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে অন্য দিন আসতে বলে। আমি তার কথা মতো এপয়েন্টমেন্ট করে আরেকদিন যাই, কিন্তু গিয়ে দেখি সে খুব ব্যস্ত, আমার দিকে আগ্রহই প্রকাশ করছে না। অনেক্ষণ পর আমাকে জিজ্ঞেস করল 'তোমার জন্য কী করতে পারি?' আমি তাকে বললাম: 'তুমি গডের পক্ষ থেকে একজন মানুষ, তুমি আমাকে বল গড কে? আমি কেন এই পৃথিবীতে এসেছি? সে উত্তরে বলল: 'তুমি কি কখনও থিওলজী ডিগ্রি (theology degree) সম্পর্কে চিন্তা করেছ?' আমি উত্তরে বললাম: 'হ্যাঁ, আমি এই বিষয়ে চিন্তা করেছি এবং ডাবলিন ট্রিনিটি (dublin trinity) নিয়ে চেষ্টাও করেছি, কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে এসবই ডগমেটিক (dogmatic) এবং এগুলোর কোন মানে হয় না।' আমার এই ধরণের কথা শুনে যে অবাক হলো এবং আমাকে বলল 'আমি দুঃখিত আমি তোমাকে কোন সাহায্য করতে পারছি না।' তবে তিনি আমাকে পরামর্শ দিলেন ওয়ার্ল্ড রিলিজিয়ন পড়ে দেখতে।
এর পর আমি বুদ্ধিজম, হিন্দুইজম, সোসালিজম, এবং খৃষ্টানিটি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করলাম। শুধু এগুলোই শেষ নয় আমি তাই-চাই, মেটারিয়াল আর্টস, মেডিটেশন এবং ভেজিটারিয়ানিজম, এস্ট্রলজি সাইন্স (Tai Chi, martial arts, meditation, vegetarianism, astology science)-এর উপরও পড়াশোনা করলাম। কিন্তু কোন বিদ্যাই আমাকে আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলো না।
ইউনিভার্সিটিতে একটি মালইশিয়ান মেয়ের সাথে আমার সম্পর্ক ছিল। আমি জানতাম না সেদিন ছিল রমাদান মাস। মেয়েটি আমাকে বলল এই এক মাস তুমি আমার কাছে আসবে না। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম কেন? সে বলল আমার ধর্মে নিষেধ আছে। আমি আর দেরি করলাম না, সাথে সাথে চলে গেলাম ইউনিভার্সিটির ইসলামিক সোসাইটিতে। সেখানে গিয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস বললাম 'আমি ইসলাম সম্পর্কে জানতে চাই, আমি এই মেয়েটিকে ভালবাসি, তাকে কিভাবে পেতে পারি।' তারা আমাকে জানালো বিয়ের আগে সে তোমরা সাথে কোন প্রকার সম্পর্কে করতে পারবে না, তুমি তাকে ছেড়ে দাও।
আমি এবার নানা রকম বইপত্র জোগাড় করে ইসলামের উপর রীতিমতো পড়াশোনা শুরু করলাম। ইসলাম সম্পর্কে প্রতিদিন কিছু না কিছু জানছি ও শিখছি এবং প্রায়ই ঐ মেয়েটার নিকট গিয়ে তাকে বলছি তোমার এটা করা উচিত না, ওটা করা উচিত না। আমি আমার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে থাকলাম, দিন দিন আমার ইসলামের জ্ঞান বাড়তে থাকলো। আস্তে আস্তে আমার চোখের পর্দা সরে যেতে থাকলো, আমার এতো দিনের সকল প্রশ্নের জট আপনা আপনি খুলতে থাকলো। আমার মাথার উপর থেকে কালো মেঘ সরে যেতে থাকলো।
আমি মসজিদে যাওয়া শুরু করলাম, মুসল্লিদের সাথে দেখা-সাক্ষাত করতে থাকলাম, এক রমাদান মাস থেকে সিয়ামও পালন শুরু করলাম। আমি এর পর আবিষ্কার করলাম যে আমার এখনকার পৃথিবীটা আগের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
একদিন সকালে উঠে ওযু-গোসল করে মসজিদে গেলাম। আমি জেনে গেছি যে কুরআন আমার সকল সমস্যার সমাধান দিতে পারে। আমি জানতাম না ইসলাম গ্রহণকে 'শাহাদাহ' বলে। আলহামদুলিল্লাহ আমি মহান আল্লাহর অনুগ্রহে ঐ দিন সকালে ইসলাম গ্রহণ করি। ঐ দিন মসজিদে ৩০০ থেকে ৪০০ লোক উপস্থিত ছিল, সবাই আমাকে কনগ্রাচুলেশন জানালো।
এই বৃটিশ নাগরিকের ইসলাম গ্রহণ করার আগের ঘটনা। তিনি লন্ডনে একটি বাড়িতে দীর্ঘ দিন ভাড়া ছিলেন। বাড়ির মালিক বাংলাদেশী মুসলিম, মালিক সপরিবারে ঐ বাড়ির উপরের তলায়ই বসবাস করতেন। Yousuf Chambers-এর সাথে তাদের নিয়মিতই দেখা-সাক্ষাৎ হতো, এক সাথে খাওয়া দাওয়া হতো। সেই সময় Yousuf Chambers-এর খুব দুর্দিন চলছিল, অশান্ত মন নিয়ে দিন কাটাচ্ছিল কিন্তু তার কোন সমাধান তিনি পাচ্ছিলেন না যা বাড়িওয়ালা জানতেন। একসময় তিনি বাড়ি পরিবর্তন করে অন্যত্র চলে যান।
তিনি মুসলিম হওয়ার পর নিজেকে একজন ইসলামের দা-'ঈ হিসেবে তৈরী করেন এবং ইংলান্ডের Islamic Education and Research Academy (IERA)-এর সাথে মিলে দাওয়াতী কাজ শুরু করেন। তিনি অবাক হয়ে ভাবেন যে তিনি দীর্ঘ দিন একটি মুসলিম পরিবারের সাথে ছিলেন কিন্তু কোন দিন দ্বীন ইসলামের দাওয়াত পাননি, ইসলামের কোন নামগন্ধও শুনেননি তাদের থেকে।
পরবর্তীতে তিনি তার ঐ মুসলিম বাড়িওয়ালার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন এবং তার ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ঘটনা বললেন। বাংলাদেশী মুসলিম বাড়িওয়ালা এতে খুবই অবাক হলেন এবং মন্তব্য করলেন যে Are you OK? তিনি মনে করলেন Yousuf Chambers-এর মাথা হয়তো ঠিক নেই, হয়তো মানসিকভাবে অসুস্থ। কারণ বাড়িওয়ালার দৃষ্টিতে ইসলাম গ্রহণের মধ্যে কোন কল্যাণ নেই, সে এই কাজ করে ভুল করেছে (নাউযুবিল্লাহ)।
www.facebook.com/OfficialYusufChambers
একজন জন্মান্ধ ক্যানাডিয়ান নাগরিকের ইসলাম গ্রহণের করুণ কাহিনী
বর্তমান নাম আবু হাফসা। তিনি জন্মান্ধ কিন্তু খুব ট্যালেন্টেড অর্থাৎ মেধা সম্পন্ন। আমরা জানি এই আধুনিক যুগে অন্ধরাও অন্যান্যদের মতো সব কিছুই করতে পারেন, তারা পড়াশোনা করেন, বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করেন, আর উন্নত দেশে হলে তো কথাই নেই। যাহোক, আবু হাফসা টরন্টোর একটি ইসলামিক কনফারেন্সে তার ইসলাম গ্রহণের পূর্বের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা আমাদের শিক্ষণীয় হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
তিনি ছাত্রজীবনে বই পড়তে খুবই পছন্দ করতেন। পাঠ্য বই পড়ার পাশাপাশি তিনি অন্যান্য বিষয়ের বইও পড়তেন। এক সময় তিনি MalcolmX এর জীবনী পড়লেন, ইসলামের ইতিহাস পড়লেন এবং তখন থেকে তিনি ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন। ইসলামকে আরো জানার জন্য এবং ইসলাম কবুল করার জন্য মুসলিমদেরকে খোঁজা শুরু করলেন। তিনি চিন্তা করলেন, মুসলিমদেরকে কোথায় পাওয়া যেতে পারে? তার জানা মতে অনেক মুসলিই পিজ্জা ডেলিভারি দেয়। তাই তিনি বিভিন্ন পিজ্জা স্টোরে ফোন করা শুরু করলেন। পিজ্জাম্যানদের থেকে তিনি কোন সাড়া পেলেন না, কারণ তারা তাকে দেখে কাষ্টমার হিসেবে, ইসলাম নিয়ে তারা মাথা ঘামান না।
এবার তিনি আবিষ্কার করলেন যে এই শহরে সবচেয়ে বেশী ট্যাক্সি ড্রাইভার হচ্ছে মুসলিম। তিনি তখন ট্যাক্সি ড্রাইভারদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করলেন কিন্তু তাতেও ব্যর্থ হলেন। কারণ ইসলাম নিয়ে তাদেরও কোন মাথা ব্যাথা নেই, তারা খুঁজে প্যাসেঞ্জার। তিনি যে শহরে থাকেন (Newfoundland) সেখানে মসজিদ খুবই কম। এবার তিনি একটি মসজিদের ঠিকানা যোগাড় করে সেখানে গেলেন এবং ইসলামকে জানার জন্য, সেখানেও তেমন কাউকে পেলেন না।
তবুও তিনি হাল ছাড়লেন না। তিনি তার পরিবারের সাথে পরামর্শ করলেন যে তিনি নিজ জন্মভূমি ত্যাগ করে যে শহরে সবচেয়ে বেশী মুসলিম থাকে সেখানে যাবেন। যেই কথা সেই কাজ। তিনি প্লেনের টিকেট কেটে টরন্টো শহরে চলে এলেন। এবার তিনি ইসলামকে জানলেন, বুঝলেন এবং শাহাদাহ নিয়ে মুসলিম হলেন (১৯৯৬ সালে)। আলহামদুলিল্লাহ, আবু হাফসা বর্তমানে টরন্টোর একটি বড় মসজিদের ইমাম এবং নর্থ আমেরিকার একজন বিখ্যাত ইসলামিক স্কলার।
তার বক্তৃতার ডিভিডি বাজারে এবং ইউটিউবে পাওয়া যায়। আরেকটি আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে যে তিনি অসাধারণ কুরআন তিলাওয়াত করতে পারেন।
রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর দাওয়াতী কাজের প্রাথমিক যুগে পুরো সমাজটাই ছিল অজ্ঞতার মুঠোয়। তিনি যে দ্বীন প্রচারে নেমেছিলেন তাতে মানুষের দ্বীন গ্রহণের প্রবণতা অতি কম ছিল। তথাপি অধিকাংশ ক্ষেত্রে দ্বীন গ্রহণের মূলে কাজ করেছে ব্যক্তিগত সম্প্রীতি, ভাল ব্যবহার, উদ্দেশ্যের খোলামেলা প্রকাশ ও আলোচনা, গোঁজামিলের আশ্রয় না নেয়া, মানুষের প্রতি ভালবাসা, ন্যায়বিচার, ইনসাফ ও ইহসান ইত্যাদি। আমরা যদি দাওয়াতী কাজ করে ভাল ফল পেতে চাই তা হলে নিজেদের সেভাবে প্রস্তুত করে নিতে হবে। আশা করা যায় নিয়মিত দাওয়াতী কাজ একজন ব্যক্তির আত্মগঠনে ব্যাপক সাহায্য করবে। এভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব হবে। তার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যেই আমরা সকল কাজ করে থাকি।
Abu Hafsah Abdul Malik Clare, Canada www.facebook.com/AbuHafsahAbdulMalikClare
মুসলিম রোগী দেখে আমেরিকান ডাক্তার অরিভিয়ার ইসলাম গ্রহণের ঘটনা
সম্প্রতি আমেরিকান শিশু ও নারী বিশেষজ্ঞ ডা. ইউ এস অরিভিয়া ইসলাম গ্রহণ করেন। নিজের ইসলাম গ্রহণ প্রসঙ্গে ডা. অরিভিয়া বলেন, আমি আমেরিকার একটি হাসপাতালে নারী ও শিশু বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করি। একদিন হাসপাতালে এক আরব মুসলিম নারী এলেন বাচ্চা প্রসবের জন্য। প্রসবের পূর্ব মুহূর্তে তিনি ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন। প্রসব মুহূর্ত ঘনিয়ে তাকে জানালাম, আমি বাসায় যাছি, আর আপনার বাচ্চা প্রসবের দায়িত্ব অর্পণ করে যাছি অন্য এক ডাক্তারের হাতে। মহিলা হঠাৎ কাঁদতে লাগলেন, দ্বিধা ও শঙ্কায় চিৎকার জুড়ে দিলেন, ‘না না, আমি কোনো পুরুষ ডাক্তারের সাহায্য চাই না। আমি তার কথা শুনে অবাক হয়ে গেলাম। এমতাবস্থায় তার স্বামী আমাকে জানালেন, সে চাইছে তার কাছে যেন কোনো পুরুষের আগমন না ঘটে। কারণ সে সাবালক হওয়া থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত আপন বাপ, ভাই ও মামা প্রভৃতি মাহরাম পুরুষ ছাড়া অন্য কেউ তার চেহারা দেখেনি।
আমি হেসে উঠলাম আর অপার বিস্ময় নিয়ে তাকে বললাম, অথচ আমি কিনা এমন এক আমেরিকান নারী, হেন কোনো পুরুষ নেই যে তার চেহারা দেখেনি। অতঃপর আমি তার আবেদনে সাড়া দিলাম।
বাচ্চা প্রসবের পরদিন আমি তাকে সাহস ও সান্তনা দিতে এলাম। পাশে বসে তাকে জানালাম, প্রসাবোত্তর সময়ে দাম্পত্যমিলন অব্যাহত রাখার দরুন আমেরিকায় অনেক মহিলা অভ্যন্তরীণ সংক্রমণ এবং সন্তান প্রসবঘটিত জ্বরে ভোগেন। তাই এ সম্পর্ক স্থাপন থেকে আপনি কমপক্ষে চল্লিশ দিন বিরত থাকবেন। এ চল্লিশ দিন পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ এবং শারীরিক পরিশ্রম থেকে দূরে থাকার গুরুত্বও তুলে ধরলাম তার সামনে। এটা করলাম আমি সর্বশেষ ডাক্তারি গবেষণার ফলাফলের নিরিখে।
অথচ আমাকে হতভম্ব করে দিয়ে তিনি জানালেন, ইসলাম এ কথা বলে দিয়েছে। প্রসবোত্তর চল্লিশ দিন পবিত্র হওয়া অবধি ইসলাম স্ত্রী মিলন নিষিদ্ধ করেছে। তেমনি এ সময় তাকে সলাত আদায় এবং সাওম পালন থেকেও অব্যাহতি দিয়েছে।
এ কথা শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। বিস্ময়ে বিমূঢ় হলাম। তাহলে আমাদের এত গবেষণা আর এত পরিশ্রমের পর কেবল আমরা ইসলামের শিক্ষা পর্যন্ত পৌঁছলাম!!
আরেকদিন এক শিশু বিশেষজ্ঞ এলেন নবজাতককে দেখতে। তিনি শিশুর মায়ের উদ্দেশ্যে বললেন, বাচ্চাকে যদি ডান কাতে শোয়ান তবে তা শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। এতে করে তার হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক থাকে। শিশুর বাবা তখন বলে উঠলেন, আমরা সবাই সবসময় এ নিয়ম মেনে চলি। আমরা সর্বদা ডান পাশ হয়ে ঘুমাই। এটা আমাদের নাবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রাকটিস। এ কথা শুনে আমি বিস্ময়ে থ হয়ে গেলাম!!
এই জ্ঞান লাভ করতে আমাদের জীবনটাই পার করলাম আর সে কিনা তার ধর্ম থেকেই এ শিক্ষা পেয়ে এসেছে! ফলে আমি এ ধর্ম সম্পর্কে জানার সিদ্ধান্ত নিলাম। ইসলাম সম্পর্কে পড়াশুনার জন্য আমি এক মাসের ছুটি নিলাম এবং আমেরিকার অন্য শহরে চলে গেলাম, যেখানে একটি ইসলামিক সেন্টার রয়েছে। সেখানে আমি অধিকাংশ সময় নানা জিজ্ঞাসা আর প্রশ্নোত্তরের মধ্যে কাটালাম। অনেক আরব ও আমেরিকান মুসলিমদের সঙ্গে উঠাবসা করলাম। আলহামদুলিল্লাহ এর কয়েক মাসের মাথায় আমি ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিলাম।
কুরআনের ভালোবাসায় রাশিয়ান তরুণীর ইসলাম গ্রহণ এবং রুশ ভাষায় কুরআনের অনুবাদ
বিশ বছরের অধিককাল আগে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। বর্তমানে তাঁর করা কুরআনের অর্থানুবাদকে বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা অন্যতম সেরা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদ হিসেবে গণ্য করছেন। তিনিই এগিয়ে এসেছেন রাশিয়ায় কুরআনুল কারীমের ক্ষেত্রে অনেক গবেষণাকারী ও বিজ্ঞজনদের মৃত্যুজনিত অভাব পূরণে। তিনি হলেন রাশিয়ান নারী ভেলেরিয়া বোরোচভা (Valeria Borochva)। নিজের কুরআন অনুবাদ সম্পর্কে তিনি বলেন, 'পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াত আমাকে তার প্রেমিক বানিয়েছে আর এ ভালোবাসাই আমাকে তা রুশ ভাষায় অনুবাদে অনুপ্রাণিত করেছে।'
ভেলেরিয়া বোরোচভা কিন্তু কোনো আলেমা বা ইসলাম বিশেষজ্ঞ নন। ইসলামের আইনশাস্ত্র বা ফিকহ বিষয়েও তিনি কোনো ডিগ্রিধারী নন। হ্যা, তাঁর বিশেষত্ব হলো তিনি রাশিয়ান ভাষায় পবিত্র কুরআনের অনুবাদ সমাপ্ত করেছেন। সাবেক সোভিয়েত রাশিয়ার ৬০ মিলিয়ন মুসলিমের জন্য যা এক গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি হিসেবে বর্ণিত ও প্রশংসিত হচ্ছে।
আল-আরাবিয়া ডট নেটকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর রুশ ভাষায় মহাগ্রন্থ আল-কুরআন অনুবাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, 'আমার স্বামী সিরিয়ার দামেস্ক শহরে বসবাসকারী এক আরব। তাঁর সঙ্গে আমি ১০ বছর কাটাই দামেস্কে। ইতোপূর্বে আমি আরবী জানতাম না। সেখানেই আরবী শিখি। আরবী শেখার পর সেখানে আমি একটি আরবী-রুশ অভিধান রচনা করি।'
তিনি আরও বলেন, 'আমার শ্বশুর একজন ধার্মিক পুরুষ ছিলেন। তাঁর একটি বড় লাইব্রেরি ছিল। সেখানে নিয়মিত অধ্যয়নের পাশাপাশি আমি পূর্ণ আন্ত রিকতা ও নিষ্ঠার সাথে কুরআন তরজমায় মনোনিবেশ করি। দামেস্ক থেকে ফি বছর মিশরের আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন একটি গবেষণা একাডেমির উদ্দেশ্যে সফর করতাম। একাডেমিতে ছিল একটি অনুবাদ দপ্তর। দশ পারা অনুবাদ সম্পন্ন করার পর একাডেমির আলেমগণ পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি রিভিউ কমিটি গঠন করেন। আরবী ও রুশ ভাষা জানা তিন বিজ্ঞ আরব ও দুই রাশান আলেম সদস্যের এ কমিটি খুব ভালোভাবে আমার তরজমা পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন।'
বোরোচভা উল্লেখ করেন, প্রথমে এ বোর্ড তাঁর তরজমা সম্পর্কে অনেক টীকা যোগ করেন। পাশাপাশি তাঁরা অনুবাদের ভূয়সী প্রশংসাও করেন। তাঁরা বলেন, অনুবাদ হয়েছে প্রথম শ্রেণীর। এ কারণেই আমরা এর অধ্যয়ন ও মূল্যায়ন চালিয়ে যেতে পারছি। এর মধ্যে যদি অনেক ভুল-ভ্রান্তি পেতাম তবে পর্যবেক্ষণে আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারতাম না। প্রতিবারই তাঁরা অনুবাদ সম্পর্কে বৈঠক বসতেন এবং এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা করতেন।'
তিনি জানান, তাঁকে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তবে সিরিয়ায় বসবাসের সুবাদে তা সহজেই ডিঙ্গানো সম্ভব হয়েছে। সিরিয়ার সাবেক মুফতী শায়খ আহমদ কিফতারো এবং তার পুত্র শায়খ মাহমুদ কিফতারো সবসময় তাকে সাহায্য করেছেন। প্রেরণা এবং দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'আমি প্রতিনিয়ত অনেক বিষয়ে তাঁদের জিজ্ঞেস করেছি। প্রয়োজনীয় সব কিছুই তাঁদের কাছ থেকে জেনে নিয়েছি। তেমনি ড. যুহাইলিরও সাহায্য নিয়েছি, যার কাছে কুরআনুল কারীমের তাফসীর সংক্রান্ত অনেক কিতাব ছিল।'
তিনি যোগ করেন, 'বহু আলেম আমাকে সাহায্য করেছেন। 'আমি ভেলেরিয়া যদি একা একা বসে থাকতাম তাহলে কুরআনের তরজমায় অনেক ভুল হত।' নিজের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে তিনি বলেন, 'আসমানী গ্রন্থ পবিত্র কুরআনের ভালোবাসাই আমাকে ইসলামে দীক্ষিত হতে প্রেরণা ও চেতনা জুগিয়েছে। আমার বিশ্বাস, খোলা মন নিয়ে যিনিই এ কুরআন শেষ পর্যন্ত পড়বেন, শেষাবধি তাকে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ বলতেই হবে।'
অনুবাদের মুদ্রণ ব্যয় সংগ্রহ সম্পর্কে তিনি বলেন, 'শেখ যায়েদ ইবন সুলতান (আল্লাহ তার ওপর রহমত করুন) আল-আজহার একাডেমির কাছে একটি চিঠি পাঠান, তরজমা যথার্থ কি-না তিনি তা জানতে চান। নিশ্চিত হবার পর ২৫ হাজার কপি অনুবাদ ছাপার খরচ বহনে আগ্রহ প্রকাশ করেন শেখ যায়েদ। এ পর্যন্ত অর্ধ মিলিয়ন কপি অনুবাদ ছাপা হয়েছে। সৌদি আরবের শায়খ খালেদ কাসেমীও অনেক কপি ছাপিয়েছেন। লিবিয়া ও কাতারে থেকেও এ অনুবাদ ছাপা হয়েছে।'
মুসলিম বালকের হাতে খ্রিস্টান প্রশিক্ষকের ইসলাম গ্রহণ
ফিলিপাইনের জাতীয় সাঁতার দলের প্রশিক্ষক, ম্যানিলা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানের ওপর ডিগ্রি নেয়া ক্যাপ্টেন আব্দুল কারীম এরসিনাস নিজের ইসলাম গ্রহণের গল্প তুলে ধরেন এভাবে- আল্লাহর অসংখ্য প্রশংসা যে, (এরসিনাস) খ্রিস্টান পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে তিনি আমাকে ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার সৌভাগ্যে ভূষিত করেছেন। আমার জন্ম ও শিক্ষা রাজধানী ম্যানিলার এক খ্রিস্টান পরিবেশে। এখানে কোনো মুসলিম নেই। ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলগুলোতেই মুসলিমদের অবস্থান সীমিত। বাল্যকালে আমার পরিবার চাইতো গির্জায় আমি বেশি বেশি সময় দেই। বাবা যখন আমাকে গির্জায় নিয়ে যাবার সুযোগ করতে পারছিলেন না, তখন আমার বয়সে বড় এক ভাই এলেন। তিনি রোজ আমাকে গির্জায় নিয়ে যেতেন।
আমি যখন যৌবনে পা রাখলাম, গির্জায় যেতে কোনো আগ্রহ বোধ করছিলাম না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর নিজ ধর্ম খ্রিস্টবাদ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে লাগলাম। এ সম্পর্কে বিস্তর পড়াশুনা শুরু করলাম। আমি বিস্ময়ের সঙ্গে দেখতে পেলাম, খ্রিস্ট ধর্মে ক্যাথলিক, প্রোটেস্টান্টসহ নানা বিভক্তি। আমার বিস্ময় বেড়ে গেল যখন দেখলাম ধর্মমতে ব্যাপক বিভক্তি থাকলেও তাওহীদ তথা আল্লাহর একত্ববাদে ঈমান না আনার বেলায় এরা সব এক।
শিক্ষা জীবন শেষে সাঁতার প্রশিক্ষক হিসেবে আমি সৌদি আরব গেলাম। এই প্রথম আমার মুসলিমদের সংস্পর্শে আসা। আগেই বলেছি ফিলিপাইনে থাকতে আমি কোনো মুসলিমের সঙ্গ পাইনি। ফিলিপাইনের মুসলিমরা তাদের অঞ্চলগুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকেন। আমরা তাদের সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য পাই না। সরকারি প্রচার মাধ্যম যা প্রচার করে অগত্যা আমাদেরকে তা-ই বিশ্বাস করতে হয়। মিডিয়া দেশের জনসাধারণের মধ্যে প্রচার করে, দক্ষিণাঞ্চলে মুসলিমদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর যেসব সংঘর্ষ হয় তা রাজনৈতিক। এর সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা মুসলিমদের একটি উগ্রগোষ্ঠী হিসেবে তুলে ধরে। যারা কেবল তাদের দেশকে দ্বিখণ্ডিত করতে চায়। পেতে চায় তাদের রাজনৈতিক অধিকার। আল্লাহর অসংখ্য শুকরিয়া যে, আজ আমি যাদের একজনে পরিণত হয়েছি সেই মুসলিম ভাইদের কারও দিকে কখনো অস্ত্র তাক করিনি।
আমি সৌদি আরবে যাওয়ার পরেই কেবল মুসলিম সম্পর্কে জানতে পারি। তাদের অবস্থা, আচার ও আকীদা (বিশ্বাস) সম্পর্কে অবহিত হই। আমি যাদের সাঁতার প্রশিক্ষণ দিতাম তাদের মধ্যে এক বালক ছিল। বয়স তার অনূর্ধ্ব তেরো। ক্ষুদে এই মুসলিমের চলাফেরা ও কাজকর্মে লক্ষ্য করতাম দারুণ এক নিয়মানুবর্তিতা। ওর স্বভাব শান্ত। জীবন যাপন সুশৃঙ্খল। আমাকে দেয়া প্রতিশ্রুতির অন্যথা করে না সে কখনো। যথাসময়ে সালাত আদায়ে তার চেষ্টা দেখার মতো। অবসরের সিংহভাগ সময়ই কাটত তার নিবিষ্টমনে কুরআন তেলাওয়াতে।
মুসলিম বালকটির ছিল তীক্ষ্ণ মেধা আর বিস্ময়কর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। আমি তার কর্মকাণ্ডের প্রতি লক্ষ্য করছি, তার সঙ্গ আমাকে আনন্দ দিচ্ছে- এতটুকু বুঝতে পেরেই সে আমার সামনে একগাদা ইংরেজিতে অনূদিত ইসলাম ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের বই উপস্থাপন করল। ইংরেজি অনুবাদসহ কুরআন শরীফের একটি কপিও দিল। সঙ্গে সে এও বলল, 'আপনি এসব পড়লেই আমার সুবিন্যস্ত জীবন যাপনের রহস্য উদ্ধার করতে পারবেন।'
এই প্রথম ইসলাম সম্পর্কে জানার অভিজ্ঞতা। যত পড়লাম আমার সামনে একে একে অজানা জগত উদ্ভাসিত হতে লাগল। আমি বা আমার মতো অন্য কেউ এ জগতের সন্ধান পাননি। এসব পড়ে আমি খুব প্রভাবিত হলাম। বিশেষ করে যখন কুরআন শরীফের তরজমা পড়লাম। এ কিতাবে যে একক স্রষ্টার কথা বলা হয়েছে, তা আমার চিন্তার সঙ্গে মিলে গেল। এ চিন্তায় আমি খুব তৃপ্তি ও স্বস্থি বোধ করলাম। এরপর আমি প্রবলভাবে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হলাম। এমনকি আমি ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেয়ার আগেই নিজের নতুন নামও (আব্দুল করীম) ঠিক করে ফেললাম। আসলে ইসলামের সঙ্গে আমার এই পরিচয়ের জন্য আল্লাহর অনুগ্রহের পর এই বালকটির প্রতিই আমি কৃতজ্ঞ। এই পরিচয়ের পরই শুরু হয় হিদায়াতের পথে আমার অভিযাত্রা।
আমি খুব গুরুত্ব দিয়ে প্রতিদিন দেখতে লাগলাম আমার সহকর্মীদের সময়মতো সালাত আদায়ের দৃশ্য। আমার কর্মক্ষেত্রেই ছিল মসজিদ। আমি পর্যবেক্ষণ করতাম তাদের সলাত। কী বিস্ময়কর তন্ময়তায় তারা সলাতে নিমগ্ন হত! সবাই একসঙ্গে রুকু করছে, সিজদা করছে! একই ইমামের পেছনে সবাই কত শৃঙ্খলা ও গুরুত্বের সঙ্গে সালাত আদায় করছে!
আমার কর্মস্থলের বন্ধুরাও অনুদারতা দেখাননি। তারা আমাকে জেদ্দায় রাখা এই বালকটির মতই সহযোগিতা করেছেন। যথেষ্ট যত্ন-আত্তি করেছেন। তারা যখন আমার ইসলাম সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসা, ইসলাম নিয়ে বেশি বেশি আলোচনা এবং সলাতের ব্যাপারে অনন্ত কৌতূহল লক্ষ্য করলেন, আমাকে ইসলাম সম্পর্কে কিছু বই পড়তে দিলেন।
তাদের দেয়া গ্রন্থগুলোর মধ্যে ছিল পাদ্রীদের সঙ্গে আহমদ দিদাতের সংলাপের বই। আমি অনেক শুনেছি, মুসলিমরা অন্যদের ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করে। সৌদি আরবে আসার আগে থেকেই আমার মাথায় এই চিত্র আঁকা ছিল। কিন্তু এখানে এসে আমি এ ধরনের কোনো আচরণ দেখলাম না। সিজওয়ার্টের সঙ্গে আহমদ দিদাতের বিতর্ক অনুষ্ঠানের বই আমার মনে অনেক গভীর প্রভাব সৃষ্টি করল। এই লোকটির ব্যাপারে আমি যার পর নাই বিস্মিত। কিভাবে তিনি একেরপর এক প্রমাণ উপস্থাপন করেন! একটির পিঠে আরেকটি যুক্তি তুলে ধরেন! বর্ণনা আর যুক্তি কোনোটির অভাব নেই তাতে! প্রতিটি আসর পাঠে আমি হেসে মরি আর সিজওয়ার্ট পরাজিত বিষন্ন হতে থাকে। তার প্রতিক্রিয়া ছিল অতৃপ্ত মানুষের নির্ভুল প্রতিক্রিয়া। তার অবস্থান যে ভ্রান্তির পক্ষে, মুসলিমদের আগে তা খ্রিস্টানরাও বুঝতে পারছিল। এক পর্যায়ে আমি আহমদ দিদাতের কাছে চিঠি লিখলাম। এতে আমি তার যুক্তির শাণিত অস্ত্র দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার অসাধারণ ক্ষমতার প্রশংসা করলাম। তার কাছে এ ধরনের অসত্য থেকে সত্য উন্মোচনকারী বিতর্ক ও সংলাপের বেশি বেশি বই চাইলাম।
এখন আমি খ্রিস্টান থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম হওয়ার প্রয়োজন বোধ করলাম। এতদুদ্দেশ্যে আমার সহকর্মীদের কাছে এ জন্য আমার করণীয় কী তা জানতে চাইলাম। আর সেদিনই আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম। আমি ঈমান আনলাম আল্লাহর উপর, তাঁর রসূলের উপর এবং শেষ দিবসের উপর। বিশ্বাস স্থাপন করলাম জান্নাত ও জাহান্নাম সম্পর্কেও। সে এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি। আমি নিজের অপরিমেয় সৌভাগ্য অনুভব করলাম। আজ অনুগত মুসলিম হিসেবে জীবন যাপন করি। আমি সলাত আদায়ে মসজিদে যাই। সেখানে সিজদাবনত হয়ে এক অপার্থিব তৃপ্তি ও সুখ বোধ করি। জীবন যাপনেও তেমনি অপূর্ব প্রশান্তির আস্বাদ পাই। আমার অতীত জীবন ছিল বিশৃঙ্খলা আর উদ্দেশ্যহীন হট্টগোলে পূর্ণ। আল্লাহ আমাকে সে অবস্থার বদলে আজ আলো, শৃঙ্খলা, সচ্চরিত্র ও মূল্যবোধের জীবন দান করেছেন। সত্যিই আমি মুসলিম ভাইদের সঙ্গ পেয়ে সৌভাগ্যবান। সন্দেহ নেই ইসলাম অনেক মহান ধর্ম। এর সঙ্গে জড়িয়ে ধন্য আমার জীবন।
"বহু কষ্টে পাওয়া ইসলাম" এক কলেজ তরুণীর ইসলাম গ্রহণের কাহিনী
অনেকেই আমার কাছে আমার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে জানতে চান এবং আমি তাদেরকে খুব সংক্ষেপেই আমার ঘটনাটা বলে থাকি। কিন্তু আজ আমি আপনাদের সাথে আমার কাহিনীর পুরোটাই শেয়ার করতে চাই কিভাবে আমি এই সত্য ও সুন্দরের ধর্ম ইসলামের সুশীতল ছায়া তলে আশ্রয় গ্রহণ করলাম। প্রায় আট বছর আগের কথা বলছি; হঠাৎ একদিন এক অদ্ভুত রকমের স্বপ্ন দেখলাম; বিশ্বাস করুন, একেবারেই অদ্ভুত এক স্বপ্ন; স্বপ্নটা কোনভাবেই মেলাতে পারছিলাম না। স্বপ্নটা কতটা অদ্ভুত তা গল্পের বাকিটা পড়লেই বুঝতে পারা যাবে।
ঘটনার প্রথম সূত্রপাত ২০০২ সালে: আ্যকাউনটিং বিষয়ে পড়াশোনা করার জন্য কিছুদিন আগেই আমাকে নিজ শহর ছেড়ে পাশের উপশহরে আসতে হয়েছে। নতুন জায়গা, আশপাশের মানুষরা সব অপরিচিত, নতুন পড়াশোনা- সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল স্কুলের প্রথম দিনটার কথা। প্রথম যেদিন স্কুলে গিয়েছিলাম সেদিনও ঠিক এমনটাই মনে হয়েছিল।
কলেজের প্রথম দিন; প্রথম ক্লাস শুরু হয়েছে প্রায় পনেরো মিনিট হল। দেখলাম মেয়েটি ক্লাসে প্রবেশ করল। হয়ত এমনিতেই খুব বেশী মনোযোগ দিতাম না ওর দিকে কিন্তু দিলাম কারণ আমি যেখান থেকে এসেছি সেখানে ওর মতো কাউকে দেখিনি কখনো। আর যদিও বা দুই একজনকে দেখা যায় তাদের দিকে মানুষের দৃষ্টি থাকে ঘৃণা আর অবজ্ঞার। মেয়েটির নাম ফাতিমা; লেবাননের মেয়ে; ইসলামী হিজাবে আপদমস্তক ঢাকা। একটু পরেই শুরু হবে দ্বিতীয় ক্লাস; ক্লাসে ঢুকতেই ফাতিমার দিকে চোখ পড়ল। কেন জানিনা ওর দিকে তাকাতেই মনে হল ও আমার অনেক দিনের পরিচিত কেউ। ওকে জিজ্ঞাস করলাম, "তোমার পাশে বসতে পারি?” সেই যে শুরু বন্ধুত্বের, আলহামদুলিল্লাহ্, এতো বছর পরেও আমরা একে অপরের বন্ধু। পুরো কলেজ লাইফে আমরা ছিলাম একেবারে আত্মার আত্মীয়। আমাদের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা দেখে শিক্ষকরা বলাবলি করতেন আমরা সম্ভবত দু'বোন। কলেজের ঐ বছরগুলোতে আমি নিজে একজন খ্রিষ্টান হওয়া সত্ত্বেও ফাতিমার ধর্মের (ইসলাম) ব্যাপারে ছিলাম চরম আগ্রহী। সেও যতটুকু জানত আমার সাথে শেয়ার করত। দেখতাম ইসলাম সম্পর্কে কথা বলার সময় তার চোখ দুটো কেমন স্পৃহায় ছলছল করে উঠত। আর এই ব্যাপারটি আমাকে খুব নাড়া দিত। কারণ আমিও একটা ধর্মের অনুসারী অথচ আমার মাঝে ঐ ধরনের কোন বিষয় কাজ করত না।
এমনকি মাঝে মাঝে আমরা আন্তঃধর্ম বিতর্কের আয়োজন করতাম যেখানে আমি কথা বলতে গিয়ে প্রায় রেগে যেতাম যখন দেখতাম নিজের ধর্মের অনেক বিষয়ই আমার জানা নেই বা তার করা কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছি না। তবে ফাতিমার প্রতি ছিল আমার অগাদ শ্রদ্ধাবোধ। আমার এখনও মনে আছে আমি ভাবতাম কি করে ফাতিমা দিনে পাঁচ পাঁচবার করে সলাত আদায়ের জন্য ওযু করত, গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরেও নিজেকে হিজাব পরে ঢেকে রাখত, রমাদান মাসে সারাদিন না খেয়ে রোজা রাখত এমন আরো অনেক বিষয়। অথচ নিজেকে একজন ধর্মপ্রাণ খ্রিষ্টান বলে ভাবলেও অনন্ত রবিবার করেও চার্চে যাওয়া হয়ে উঠত না আমার।
আমরা দু'জন দুই ধর্মের হলেও আমাদের জীবন যাত্রার অন্যান্য বিষয়গুলো ছিল একই ধরনের। আমি কখনই ছেলেদের সাথে ঘনিষ্ঠ হতাম না। আর সত্যি কথা বলতে কি, এসব ব্যাপারে স্বাভাবিকভাবেই আমার একধরনের লজ্জাবোধ কাজ করে। তবে যে ব্যাপারটি ফাতিমার জন্য স্বস্তির বিষয় ছিল তা হল আমি কখনই খোলামেলা পোশাক পরতাম না যেটা ফাতিমা আর আমার ভিতর সাদৃশ্যগুলোর অন্যতম। একদিন ফাতিমা আর আমি কলেজের ভিতর দিয়ে হেঁটে দুপুরের খাবারে জন্য আমাদের একটা নির্ধারিত জায়গায় যাচ্ছিলাম। আমরা প্রায় ওখানেই খাই। কিন্তু আজ যখন ওখান দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন একটি ব্যাপার আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। জায়গাটার দিকে ভালো করে খেয়াল করতেই মনে পড়ল সেই অদ্ভুত স্বপ্নটার কথা যেটা একবছর আগে কলেজে ভর্তির শুরুতেই দেখেছিলাম।
মনে পড়ে গেল আমি স্বপ্নে, দেখেছিলাম আমি যেন একটা হিজাব পরা মেয়েকে আমার ডান পাশে নিয়ে কোথাও হেঁটে যাচ্ছি। আর জায়গাটা ঠিক আজকের এই জায়গা। অন্য কেউ হলে হয়ত স্বপ্নে কি দেখল বা দেখেছিল তা নিয়ে মাথা ঘামাতো না। কিন্তু স্বপ্নের সাথে বাস্তবতার এমন অসম্ভব মিল দেখে আমি একেবারেই হতবাক হয়ে গেলাম। আমার মনে হচ্ছিল আমি আর হাঁটতে পারছিলাম না। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল। আমি ফাতিমাকে বললাম, "কি আশ্চর্য! এটা কি করে সম্ভব!! আমি তো এটা স্বপ্নে, দেখেছি!!" এমন তো নয় যে ফাতিমার আগে আমার মুসলিম কোন বন্ধু ছিল বা আমি কোনভাবে কাউকে চিনতাম। তাহলে না হয় বলতাম তাদের সাথে ঘুরে বেড়িয়েছি আর তাই হয়ত স্বপ্নে দেখেছি। কলেজে ভর্তি হওয়ার আগেও কখনো আমি এই কলেজে প্রবেশ করিনি। অথচ হুবহু আমাদের খাওয়ার সে জায়গাটা স্বপ্নে দেখেছি। এই বিষয়টিই আমার কাছে বেশী আশ্চর্যজনক মনে হয়েছিল। যাই হোক, অনেকেই হয়ত বলবেন এই আর এমনকি, স্বপ্ন নিয়ে কে আর এতো মাথা ঘামায়। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, ঐ স্বপ্ন ছিল আমার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট হিদায়াতের নিদর্শন এবং ফাতিমা আর আমার বন্ধুত্ব হল তাঁরই ইচ্ছার প্রতিফলন। ফাতিমার মাধ্যমেই আল্লাহ্ রব্বুল 'আলামীন আমাকে ইসলামের সাথে পরিচিত করালেন।
সেদিনের পর থেকে এক অজ্ঞাত কারণে ইসলামের প্রতি আমার আগ্রহ বহুগুণে বাড়তে থাকে। আমি ফাতিমাকে ইসলাম বিষয়ে অনেক অনেক প্রশ্ন করতে থাকি। লক্ষ্য করি, নিজ ধর্মের প্রতি আমার বিশ্বাস ও আস্থা ক্রমশই ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যাচ্ছে। আমার নীতি হল আমি যদি কোন বিষয়ে একবার সন্দেহ পোষণ করি এবং নিজেকে প্রশ্ন করে সন্দেহের কোন জবাব না পাই তাহলে ধরে নিই যে আমার সন্দেহ বাস্তব এবং আমার বিশ্বাসে গোলমাল আছে।
আমার সকল সন্দেহের অবসান হল যেদিন ফাতিমা আমাকে আহমেদ দিদাত (রাহিমাহুল্লাহ)-এর সাথে খ্রিষ্টান পন্ডিতদের বিতর্কের কয়েকটি ডিভিডি দিল। দিনটি ছিল সত্যিই আমার জীবনকে বদলে দেয়ার দিন। বিতর্কগুলো দেখার পর আমার অন্তর চক্ষু দিয়ে উপলব্ধি করলাম এতোদিন যে ধর্মকে পুঁজি করে বেঁচে আছি তা আসলে সত্য নয়। আমি দেখলাম কোন একজন খ্রিষ্টান পন্ডিতও আমার তথাকথিত ধর্মের ব্যাপারে সন্দেহগুলোর সত্য উত্তর দিতে পারেনি। তাহলে আমি কি করে নিজে নিজে আমার সন্দেহ দূর করতে পারি? আমি সত্যিই হতবাক হয়ে গেলাম!! বিশ্বাস করুন, একটুও বাড়িয়ে বলছিনা। ফাতিমার সাথে কথা বলতে বলতে হঠাৎ কেঁদে ফেললাম। আর কাঁদতে কাঁদতেই বাড়ীর দিকে হাঁটতে লাগলাম। আমার বারবার মনে হতে লাগল, "সর্বনাশ!! আমি এতদিন কী করেছি!!"
আমি তখন আমার বন্ধুর সাথে থাকতাম। সেও নিজেকে একজন ধর্মপ্রাণ খ্রিষ্টান বলে মনে করত। আমার ভেঙ্গেপড়া দেখে ও আমাকে সান্তনা দিতে লাগল। ও আসলে বোঝাতে চাচ্ছিল যে ফাতিমা ইসলামের ব্যাপারে আমার মগজধোলাই করার চেষ্টা করছে। প্রথমে শুনে আমারও খানিকটা তাই মনে হল। পরের দিন ফাতিমার কাছে গিয়ে বললাম যে আমি আর ধর্ম নিয়ে তার সাথে কোন কথা বলতে চাই না। উত্তরে ফাতিমা যা বলল তা খুবই সহজ!! কি বলল জানেন? ও বলল, "তোমার কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেয়া আমার কর্তব্য ছিল। আমি আমার কর্তব্য পালন করেছি। ইসলাম মানবে কি না মানবে সেটা নিতান্তই তোমার ব্যাপার। শেষ বিচারের দিন তুমি আমাকে এই বলে দোষ দিতে পারবে না যে আমি তোমাকে ইসলামের দাওয়াত দেয়নি।"
বেশ কয়েক বছর কেটে গেল। আমি আর ফাতিমা এখনও আগের মতোই ভাল বন্ধু। ইতোমধ্যেই আমি ফাতিমার পরিবারের সাথে অনেক বেশী সময় কাটাতে শুরু করেছি। ফলে ইসলাম সম্পর্কেও আমার জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গি আগের চেয়ে অনেক বদলে গেছে। তাদের সাথে থাকতেও আমার ভাল লাগে। তাদের ওখানে নেই কোন মদ্যপানের আসর বা কোনরকম হারাম কাজকর্ম। এখনও মনে হয় ঐ সময়টা ছিল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। আটটি বছর আমি আমার বিশ্বাসের চড়াই-উৎরাই দেখলাম। মনে হল যেন আল্লাহ্ আমাকে ইসলামের সঠিক পথ দেখানোর আগেই অন্যান্য মিথ্যা পথগুলো ভালভাবে চিনিয়ে দিলেন।
ইসলামে আসার আগে আমার প্রথম পর্যায়টা ছিল অজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। কোন ধর্মই আমার ছিল না তখন, না খ্রিশ্চিয়ানিটি না ইসলাম। আমি প্রথমে কোনটাই জানতাম না ফলে মানতামও না। আমার দ্বিতীয় পর্যায়টা ছিল বিদ্রোহপূর্ণ। আপনজন কারোর কথাতেই আমি কর্ণপাত করতাম না। সকলকে ত্যাগ করে মত্ত ছিলাম শয়তানি কর্মকান্ডে। ২০০৮ সালটি ছিল আমার জীবনে সবচেয়ে ভয়াবহ। চরম ভুগেছি ঐ বছর। নিজের সাথে লড়েছি। জর্জরিত থেকেছি হাজারো সমস্যায়। যেন জীবন গিয়ে সর্বনাশের অতল গহীনে ঠেকেছিল। ঐ বছরই ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় আমার সাত বছরের প্রেমিকের সাথে। সবখানেই আঘাত আর আঘাত। ভাল সব বন্ধুরা পর হয়ে যেতে থাকে, এসে জুটে যতসব খারাপের দল। পরিবারের একজন মানুষের সাথেও ভাল ব্যবহার করতে পারছিলাম না। আর ঐ সময়টাতেই আমি ফাতিমার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াতাম। নিজের কাছেই নিজেকে অনেক বড় অপরাধী মনে হচ্ছিল। আমি চাইনি ফাতিমা আমাকে ঐ অবস্থায় দেখে দুঃখ পাক।
হঠাৎ মনে হল, "এসবের মানে কি? কেন এই অপরাধ বোধ? আমি কেন ফাতিমার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছি? সে তো আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু; আমি যা করছি তা ভুল হলে কেন তা করছি?" এমন হাজারো প্রশ্ন মনে উদয় হতে লাগল। আমি তখনও জানতাম আমি যা করছিলাম তা আল্লাহ পছন্দ করেন না এবং আমি ওসব কাজ বন্ধ না করলে নির্ঘাত জাহান্নামে যেতে হবে। এসব ভাবতাম এবং লজ্জিত হতাম। ফাতিমার মাধ্যমেই আমার ইসলামের সাথে যোগসূত্র। তার ওসীলায় ইসলামকে সত্য বলে জানার সুযোগ হয়েছে। তাই আমার কাছে মনে হল আমি আসলে ফাতিমার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছি না বরং আল্লাহর কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ানোর চেষ্টা করছি যা অসম্ভব।
শেষ পর্যায়টা ছিল আমার জন্য অনেকটা সতর্ক সংকেতের মত। শেষবার দেখা হল আরেকজন মুসলিমের সাথে; তার সাথে দেখা হওয়াটাই বলতে গেলে আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার মত ঘটনা। সে আমাকে অনেকটা জোর করেই খারাপ কাজগুলো থেকে বাধা দিতে শুরু করল। শুনে অবাক লাগতে পারে কিন্তু সত্যি হল আমি ঐ সময়টাতে কারোর কোন কথাই শুনতাম না। আর তাই হয়ত বাধ্য হয়েই সে আমার উপর জোর খাটাতে শুরু করল। আলহামদুলিল্লাহ্, সে সময়মত আমার জীবনে হাজির হয়েছিল। আমি তখন যে মানসিক অবস্থার মধ্যে ছিলাম তাতে মনে হয়না যে কোন খ্রিষ্টান, বা ইহুদী এমনকি কোন নাস্তিক আমার ঐ মানসিক খঙ্কা দূর করতে পারত।
ফাতিমার দেয়া ডিভিডিগুলো দেখার দিন থেকেই আমি জানতাম আমি ইসলাম গ্রহণ করব। শুধু একটা শেষ ধাক্কা বাকি ছিল। আল্লাহ্ রাব্বুল 'আলামীন যা করেন ভালোর জন্যেই করেন। তিনি আট বছর আগে আমাকে একটি হিজাব পরা মেয়েকে (যে পরে হলো আমার বেস্ট ফ্রেইন্ড) স্বপ্নের মাধ্যমে জানিয়েছিলেন যে ইসলাম সত্য। তিনি আমাকে দেখিয়েছেন স্রষ্টায় বিশ্বাস না করার কি কষ্ট; তিনি আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন নিষিদ্ধ জীবন যাপন কতটা যন্ত্রণাদায়ক; অবশেষে তিনি আমাকে ইসলাম উপহার দিয়ে দেখিয়েছেন মানব জীবনে প্রকৃত সুখ কোথায়। আলহামদুলিল্লাহ, অবশেষে আমি ২০০৯ সালের ১লা জানুয়ারি ইসলাম গ্রহণ করি।
ইসলাম গ্রহণ করলেন আমেরিকার প্রভাবশালী ক্যাথলিক ধর্ম যাজক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ক্যাথলিক ধর্মযাজক কার্ডিনাল থিওডোর ম্যাককারিক ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ওয়াশিংটনের আর্চবিশপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০১ সালে তিনি ক্যাথলিকদের শীর্ষস্থানীয় ধর্মযাজক বা কার্ডিনাল পদে উন্নীত হন। ১০ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে পরোক্ষভাবে তিনি ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন।
মুসলিম পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিল আয়োজিত এক অনুষ্ঠান তিনি শুরু করেন বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম পাঠ করে। পবিত্র কুরআনের একটি বাদে প্রতিটি সূরাই শুরু হয়েছে এই মহান বাক্যটি দিয়ে।
ম্যাককারিক বলেন, ক্যাথলিক ধর্মের সামাজিক শিক্ষা হচ্ছে মানবিক মর্যাদা। আপনি যদি কুরআন অধ্যয়ন করেন অথবা ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা করেন তবে দেখবেন যে মুহাম্মাদ ﷺ এটাই শিক্ষা দিয়েছেন।
অনুষ্ঠানে ইসলামিক সোসাইটি অব নর্থ আমেরিকার প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। ম্যাককারিক বলেন, 'আমরা সবাই খারাপের বিরুদ্ধে, হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে এবং ধ্বংসের বিরুদ্ধে। আল্লাহ এই কাজে আপনাদের সহায়তা করুন।'
'আমরা বিশ্বাস করি ইসলাম এমন একটা ধর্ম যা মানুষকে সাহায্য করে, তাদেরকে হত্যা করে না মুসলিম সম্প্রদায় এই শিক্ষাই দিয়েছেন।'
ইরাক ও সিরিয়ার সমস্য নিয়ে আমেরিকান মুসলিমদের সমর্থন নিয়ে সংশয় দূর করতে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
তিনি বলেন, 'অবশ্যই অনেক খ্রিস্টান দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। কাজেই আজ আমি এখানে এসেছি মুসলিম সম্প্রদায়ের ভাইবোনদের প্রতি সমর্থন জানাতে যারা যুক্তরাষ্ট্রে অত্যন্ত শক্তিশালী নেতৃত্ব দিচ্ছেন।' 'আমেরিকান হতে পেরে তারা গর্বিত, তারা আমেরিকাকে ভালাবাসে', যোগ করেন ম্যাককারিক।
"যা কিছু পেয়েছি কুরআন থেকে পেয়েছি" এক জাপানী নারীর কাহিনী
২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের রহস্যময় হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্বের বহু প্রচার মাধ্যম ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ব্যাপক নেতিবাচক প্রচারণা শুরু করে তখন ইসলাম ধর্মের প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন জাপানি যুবতী 'অতসুকু হুশিনু'। ইসলাম সম্পর্কে ব্যাপক গবেষণা ও জানা-শোনার পর অবশেষে তিনি এই ধর্মের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন।
'অতসুকু হুশিনু' ইন্টারনেটে অনুসন্ধান চালিয়ে সংগ্রহ করেন পবিত্র কুরআন। পবিত্র কুরআনের পরিপূর্ণতা ও সার্বজনীনতা অভিভূত করে অতসুকু হুশিনু-কে। আর এ জন্যই তিনি ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে সবার থেকে দূরে থেকে ইন্টারনেট থেকে পবিত্র কুরআন পড়তেন তিনি যাতে এ মহাগ্রন্থের বাণীগুলো ভালোভাবে বুঝতে পারেন। অতসুকু অত্যন্ত কোমল ও দয়ার্দ্র মনের মানুষ। তিনি পড়াশুনা করেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে। বর্তমানে অতসুকু ইরানে রয়েছেন এবং তিনি ইসলাম ও বিশ্বনাবী মুহাম্মাদ -র পবিত্র আহলে বাইত সম্পর্কে ব্যাপক ধারণা অর্জনের চেষ্টা করছেন।
ইসলামের প্রতি ঈমান আনার ঘটনা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি জানান, ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলার দৃশ্য বার বার দেখার পর প্রথম দিকে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত হন। এরপর তার কাছে মনে হয়েছে এই ঘটনার সঙ্গে হলিউডের ছায়াছবিগুলোর বেশ মিল রয়েছে এবং ঘটনাটি এমন রহস্যময় যে এর পেছনে বা নেপথ্যে অনেক চালিকাশক্তি কাজ করছে। এই ঘটনার সঙ্গে ইসলাম ও মুসলিমদের জড়িয়ে অনেক নেতিবাচক কথা প্রচার করা হয়। আর সেসব প্রচারণায় প্রভাবিত না হয়ে বরং এ ধর্ম সম্পর্কে সত্যিকারের চিত্র জানতে আগ্রহী হন অতসুকু। এরপর অনুসন্ধান চালিয়ে দেখতে পান যে ইসলামই হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে মহৎ ও বড় ধর্ম। ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পেক্ষাপট প্রসঙ্গে অতসুকু বলেছেন: 'আমি বড় হয়েছি এক বৌদ্ধ পরিবারে। বৌদ্ধরা নিজ ধর্ম বিষয়ে খুবই রক্ষণশীল। আমার এক চাচা জাপানী সংসদে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিনিধি ছিলেন। তাই এ ধর্ম সম্পর্কে আমার গভীর জানাশোনা ছিল। আমার আরেক চাচা ছিলেন পুরোহিত। তিনি খ্রিষ্টানদের বাইবেলও পড়েছেন। ফলে খ্রিষ্ট ধর্মের সঙ্গেও আমি পুরোপুরি পরিচিত ছিলাম। আমার মনে কোনো কোনো বিষয়ে কিছু প্রশ্ন জাগতো, কিন্তু কেউই সেসব প্রশ্নের জবাব দিতে সক্ষম হননি।
কিন্তু ইসলামের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর আমার জীবনের রঙ ও ঘ্রাণ বদলে যায়। মুসলিমদের ধর্মগ্রন্থ আল-কুরআন প্রথমবারের মত পড়েই মনে হয়েছে যে, সত্যিই তা আসমানী কিতাব এবং অন্য ধর্মগ্রন্থগুলোর সঙ্গে এর রয়েছে আকাশ- পাতাল পার্থক্য। তাই বুঝলাম যে ইসলামই প্রকৃত ধর্ম। পবিত্র কুরআন আমার মনের অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে এবং দূর করেছে দ্বিধা-দ্বন্ধ। ফলে ইসলামের দিকে আরো গভীরভাবে ঝুঁকে পড়ি এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণের সিন্ধান্ত নেই।
নিজের উপর পবিত্র কুরআনের অমূল্য ও অতুলনীয় বাণীর প্রভাব প্রসঙ্গে জাপানী নওমুসলিম অতসুকু বলেছেন: 'আমি যা কিছু পেয়েছি তা এই কুরআন থেকেই পেয়েছি। কুরআনই আমাকে চিনিয়েছে ধর্মের বাস্তবতা ও এর ফলে আমি মুসলিম হয়েছি। এ মহাগ্রন্থ আমাকে দিয়েছে প্রশান্তি এবং কুরআনের নির্দেশনা পেয়েই আমি কঠোর পরিস্থিতিতেও ধৈর্য ধরেছি ও হিযরত করেছি নিজ দেশ থেকে এমন এক দেশে যে দেশ আর তার জনগণ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। এই দেশে আমি ছিলাম আগন্তক বা প্রবাসী; কিন্তু কুরআনের কারণেই আমি এখানে নিঃসঙ্গতা অনুভব করিনি। কুরআন সব সময়ই আমার জন্য আলো ও মুক্তির উৎস। এ মহাগ্রন্থ আমাকে ভয় ও নিঃসঙ্গতার শিকার হতে দেয়নি। যে কেউ কুরআন পড়লে অবশ্যই সুপথ বা মুক্তির দিশা পাবেন। আমি আমার সমগ্র অস্তিত্বের মধ্যে এই মহাসত্যটি অনুভব করছি। কঠিন অবস্থার মধ্যে আমি যখন বিশ্বনাবী -এর পবিত্র আহলে বাইতের দু'আগুলি পাঠ করতাম তখন মনে হত যেন স্বয়ং মহানাবী ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত যেন আমাকে শিক্ষা দিচ্ছেন। তাই যতই আহলে বাইতের সঙ্গে সম্পর্কিত দু'আ ও যিয়ারত পাঠ করি ততই তাঁদের প্রতি এবং তাঁদের জীবনাদর্শ সম্পর্কে আমার ভালবাসা বাড়তেই থাকে ও তাঁদের মাধ্যমে বাড়তে থাকে আল্লাহপ্রেম।'
জাপানী নওমুসলিম অতসুকু মহানাবী -এর পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য নাবী-নন্দিনী ফাতিমা জাহরা (রা.)-কে গভীরভাবে ভালবাসেন। আর তাই মুসলিম হওয়ার পর নিজের নাম হিসেবেও বেছে নিয়েছেন জ্যোতির্ময় ও পবিত্র এই নাম। তিনি ফাতিমা (রা.)-র জীবনী ও বাণী অধ্যয়ন করে নিজেকে তাঁরই আদর্শের অনুসারী হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন।
অতসুকু তার স্বামীর সঙ্গে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আগে ইন্টারনেটে ফাতিমা (রা.)-র জীবনী সম্পর্কে জেনেছেন। বিশ্বের সর্বকালের সেরা এই নারীর জীবনাদর্শ তাকে এতটা অভিভূত করেছে যে তিনি নিজেকে তাঁরই অনুসারী হিসেবে গড়ে তুলতে আগ্রহী হন। এই মহিয়সী নারী আলী (রা.)-র সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন অতি সামান্য মোহরানা নিয়ে, আর কনের জন্য নির্ধারিত সেই পুরস্কার বা মোহরানাও সংগ্রহ করা হয়েছিল আলী (রা.)-র বর্ম বিক্রি করার মাধ্যমে। এ ঘটনাও জাপানী নওমুসলিম অতসুকুকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ফলে তিনিও নিজের জন্য একই ধরনের পরিস্থিতি কামনা করেছেন মহান আল্লাহর কাছে যাতে নাবী-নন্দিনীর মতই আচরণ করতে পারেন। এরপর অতসুকু বিয়ের মোহরানা হিসেবে স্বামীর কাছে কেবল একটি স্বর্ণমুদ্রা দাবি করেন এবং তা দিয়েই নতুন সংসারের জন্য প্রয়োজনীয় বা জরুরি জিনিসগুলো কেনেন। এত কম পরিমাণ মোহরানা নেয়ার জন্য তিনি মোটেই অনুশোচনা করছেন না, বরং দাম্পত্য জীবন শুরু করার ক্ষেত্রে হাসান-হোসাইনের মাতা ও আলী (রা.)-র স্ত্রী ফাতিমা (রা.)-র আদর্শ অনুসরণ করতে পেরে গভীর আধ্যাত্মিক তৃপ্তি অনুভব করছেন। তার মতে মাত্র এই একটি স্বর্ণমুদ্রা তার জীবনে এনেছে অনেক বরকত বা প্রাচুর্য। আর এ জন্য তথা ফাতিমা (রা.)-র আদর্শ অনুসরণের সুবাদে এতো বরকত পেয়ে অতসুকু আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ।
অতসুকুর পরিবার তার মুসলিম হওয়ার প্রবল বিরোধিতা করেছিল। বিষয়টা তাদের কাছে ছিল বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত। প্রথমে তারা বিষয়টিকে বিশ্বাসই করেননি। পরে দেখলেন যে তাদের মেয়ে নিজেকে অনেক কিছু থেকেই দূরে রাখছে, বিশেষ করে তারা যখন দেখলেন যে অতসুকু হারাম গোশত খাচ্ছেন না তখন তারা বিরোধিতা জোরদার করেন। এবার তারা অতসুকুর উপর অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপসহ নানা ধরনের চাপ দিতে থাকে ও তাকে হয়রানি করতে থাকে যাতে সে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে। অতসুকুর সমস্ত বন্ধু ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরাই তাকে ত্যাগ করেন। ফলে পরিবার ও নিজ শহরে নিঃসঙ্গ ও কোনঠাসা হন অতসুকু। অত্যন্ত কঠিন সেই দিনগুলোতে ইন্টারনেটে পবিত্র কুরআনই ছিল তার একমাত্র সঙ্গী যে তাকে যোগ্যতা প্রশান্তি ও সহায়তা। কুরআনের সহায়তার কারণেই তিনি সে সময় নিজ ঈমানের উপর অবিচল থাকতে পেরেছেন। নানা ধরনের চাপ অতসুকুর ঈমানকে বরং আরো মজবুত করে দেয়। ফলে চাপ ও হয়রানি বাড়তেই থাকে। কিন্তু প্রশান্ত হৃদয়ে সব সহ্য করে যান তিনি। এ সময় অতসুকু পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী কেবল আল্লাহর উপরই ভরসা করতেন ও আশার আলো দেখতেন। অতসুকু হুশিনু থেকে ফাতিমা হুশিনুতে পরিণত হওয়া জাপানী নারী ইসলাম সম্পর্কে ভালোভাবে জানার জন্য ইরানে আসেন। কোনো একটি ইসলামী দেশে জীবন যাপন করা ছিল হুশিনুর বহু বছরের স্বপ্ন। তার সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার ফলে একটি অমুসলিম দেশে মুসলিমত্ব বজায় রাখার কঠোরতা থেকে মুক্তি পান তিনি।
“ইসলামেই পেয়েছি আমার প্রকৃত সত্ত্বা” আমেরিকান ডাক্তার সারা ট্রাস
উনত্রিশ বছর বয়স্ক সারা ট্রাস একজন আমেরিকান ডাক্তার। তিনি ও তার বাবা ছিলেন খ্রিষ্টান। আর মা ছিলেন ইহুদি। ট্রাস ইসলাম ধর্ম গ্রহণের আগের কথা তুলে ধরে বলেন, আমি কৈশোরেই ইসলাম সম্পর্কে কিছু না জানা সত্ত্বেও উৎসব অনুষ্ঠানগুলোতে শালীন পোশাক পরার চেষ্টা করতাম। কারণ, তাতে আমি প্রশান্তি পেতাম। সে সময় পর্যন্ত কখনও কোনো মুসলিমকে কাছ থেকে দেখিনি। আর ইসলাম সম্পর্কেও তেমন কিছুই জানতাম না। আশপাশের লোকদের কাছ থেকে কেবল এটা শুনেছিলাম যে ইসলাম নারীদের সঙ্গে সহিংস আচরণ করে। মুসলিমদের কাছে নারী হল দাসী-বাঁদীর মত। কিন্তু ব্যাপক গবেষণার পর এখন এটা বুঝতে পেরেছি যে এ সম্পর্কে আমি যা শুনেছিলাম তা ছিল ভুল। আমি সৌভাগ্যবান যে সত্যকে জানতে পেরেছি।
কৈশোরেই ধর্ম সম্পর্কে সারার আগ্রহ ছিল ক্রমবর্ধমান। ধর্ম সম্পর্কে নানা প্রশ্ন ও অস্পষ্টতা তার জীবনের এক বড় উৎকণ্ঠা হয়ে দাঁড়ায়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'আমার ও সব মানুষের প্রকৃতিই হল ইসলাম। তাই সব মানুষের মধ্যেই রয়েছে ধর্মের প্রতি আকর্ষণ। আসলে ধর্ম ও আল্লাহতে বিশ্বাস হচ্ছে মানুষের এমন এক চাহিদা যা মানুষকে দেয় নিরাপত্তা ও প্রশান্তি। তাই প্রকৃতিগত এই চাহিদা পূরণের জন্য চেষ্টা করতাম। আর এ জন্য নানা ধর্ম সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতাম। কিন্তু যতই জানার চেষ্টা করতাম ততই প্রশ্ন ও অস্পষ্টতা বাড়তেই থাকে।'
সারা ট্রাস তার ইসলাম ধর্ম গ্রহণের প্রাথমিক আগ্রহের উন্মেষ প্রসঙ্গে বলেন 'আমার আশপাশে কোনো মুসলিম ছিল না। এমন কেউ ছিল না যিনি ইসলাম সম্পর্কে আমার মনে আগ্রহের আলো জ্বেলে দিতে পারেন ও ইসলামের পরিচয় তুলে ধরতে পারেন। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম সেখানে নানা ধর্মের অনুসারীদের দেখতে পেতাম। বিষয়টা আমার কাছে ছিল বেশ আকর্ষণীয়। তাদের কারো কারো সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর তাদের আচার-আচরণ এবং দৃষ্টিভঙ্গি বা মন-মানসিকতায় আমি অভিভূত হই। বিশেষ করে, এক ব্যক্তির আচার-আচরণ ও মন-মানসিকতা আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছে। তিনি ছিলেন অন্যদের চেয়ে ভিন্ন ধরনের। আর ইবাদত-বন্দেগি, আল্লাহভীতি, সততা ও চারিত্রিক পবিত্রতা আমাকে বেশ আকৃষ্ট করে।
আমেরিকান নও-মুসলিম সারা ট্রাস আরো বলেন, 'অবশ্য আমি ও অন্য কেউই জানতাম না যে তিনি ছিলেন মুসলিম। তার আচার-আচরণ আমার কাছে ছিল আদর্শ স্থানীয়। যখন বুঝলাম যে তিনি মুসলিম তখন অনেকেই তার কাছ থেকে আমাকে দূরে থাকার পরামর্শ দেন। কিন্তু আমি এর পেছনে কোনো যুক্তি দেখলাম না। কারণ, তিনি ছিলেন সেই সময় পর্যন্ত আমার দেখা লোকদের মধ্যে অন্য সবার চেয়ে পবিত্র ও সর্বোত্তম। আমি তাকে তার কোনো কোনো বিশেষ চিন্তা-ভাবনা ও আচরণ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি জানান যে ধর্মই এর কারণ। তার কথাবার্তা ও আচার-আচরণ ইসলাম সম্পর্কে আমার এতদিনের ভুল ধারণা ভেঙ্গে দেয়। আমি তার কাছে ইসলাম সম্পর্কে জানতে অনুরোধ করি এবং এভাবেই ইসলামের সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত হই।
ইসলাম এমন এক ধর্ম বা মানুষের প্রকৃতির সঙ্গে মানানসই। কেউ যদি প্রকৃত অর্থেই সত্যের সন্ধান করেন মহান আল্লাহ তাকে পথ দেখাবেন। ঠিক যেমনটি আমি মহান আল্লাহর দয়ায় ইসলামের মধ্যেই আমার প্রকৃত সত্ত্বাকে খুঁজে পেয়েছি, যা হারিয়ে গিয়েছিল।
ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্তের কারণে কখনও অনুতপ্ত হয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে সারা ট্রাস দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, না তিনি কখনও তা অনুভব করেননি, বরং ইসলাম গ্রহণের পর নবজন্মের অনুভূতি ও প্রশান্তি লাভ করেছেন তিনি। এখন নতুন করে আল্লাহর অসন্তুষ্টি জাগানোর ভয় ছাড়া কোনো ভয় তার মধ্যে নেই। সারা আরো জানান, পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াতও তাকে প্রশান্তি দেয়। কারণ, কুরআন তার প্রশ্নগুলোর জবাব দেয় এবং তাকে ইসলামের আরো কাছে নিয়ে যায়।
উল্লেখ্য, ইউরোপ-আমেরিকায় খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে ইসলাম। বিশেষ করে সেখানকার নারী সমাজ ব্যাপক হারে আকৃষ্ট হচ্ছে এ ধর্মের দিকে। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মনে করেন পশ্চিমে আধ্যত্মিক শূন্যতা, আত্মপরিচয়হীনতা ও নৈতিক অধঃপতনের প্রতি বিতৃষ্ণার কারণেই ইসলামের দিকে ঝুঁকছেন সেখানকার জনগণ। নারীরা যত্ন, সম্মান ও সুরক্ষার মত যা যা পছন্দ করেন ইসলামের মধ্যে তা পাচ্ছেন বলেও এই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। নারী ও পুরুষের বৈশিষ্ট্য যে ভিন্ন- ইসলামে এর স্বীকৃতি এবং এ ধর্মে পরিবার ও মায়ের প্রতি অফুরন্ত সম্মানও পশ্চিমা নারীদের মন জয় করছে।
পশ্চিমা নারীরা ক্রমেই এটাও বুঝতে পারছেন যে পাশ্চত্য নারীকে একটি পণ্য হিসেবে দেখে থাকে। তাই মর্যাদাহীন এই জীবনের মোকাবেলায় ইসলামের হিজাব, শালীনতা ও আধ্যত্মিকতা তাদেরকে দিচ্ছে সার্বিক নিরাপত্তার সুদৃঢ় আশ্রয়। শহীদ অধ্যাপক আয়াতুল্লাহ মুর্তাজা মুতাহহারির মতে ইসলাম নারী ও পুরুষের সৃষ্টিশীলতা বা প্রতিভা বিকাশের ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্র সম্পর্কে সচেতন। নারী ও পুরুষের সুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পবিত্র ও যৌক্তিক সম্পর্ক সমাজকে সব ধরনের বিচ্যুতি আর প্রবৃত্তি-পূজা থেকে রক্ষার মাধ্যমে তাদেরকে দেয় প্রকৃত সৌভাগ্য।
আমেরিকান নও-মুসলিম সারা ট্রাস ঘরের বাইরে হিজাব পরে বের হন। তার মতে, ইসলাম তার সামাজিক তৎপরতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি, বরং তিনি এখনও তার পছন্দের কাজগুলো হিজাব পরে অব্যহত রাখছেন। সারা মনে করেন হিজাব মানুষের আত্মিক পবিত্রতা ও সমাজকে অধঃপতন থেকে রক্ষার মাধ্যম। অথচ তার মতে এটা খুবই লজ্জাজনক যে পশ্চিমা সমাজপতিদের অনেকেই এমন একটি জরুরি বা অপরিহার্য বাস্তবকে অন্ধের মত চোখ বুজে নিষিদ্ধ ঘোষণা করছেন।
তিনি বলেন, কখনও এটা ভাবিনি যে একদিন মুসলিম হব। এখন এটা বুঝি যে মুসলিমদের সম্পর্কে আমার আগের ধারণা ছিল পুরোপুরি ভুল। পশ্চিমা গণমাধ্যমের কারণেই এ ধরনের ভুল ধারণা জন্মেছিল আমার মধ্যে। সে সময় পর্যন্ত পশ্চিমা গণমাধ্যম যা-ই বলতো আমি তাই বিশ্বাস করতাম। যে মুসলিমদের আমি পছন্দ করতাম না একদিন সেই মুসলিম সমাজেরই সদস্য হব তা কখনও ভাবিনি। কিন্তু আজ মুসলিম হতে পারার জন্য আমি গর্বিত এবং এ জন্য আমি খুবই আনন্দিত।
সম্পূর্ণ শরীর প্যারালাইজ্ একজন আমেরিকান যুবকের গল্প
আমেরিকান একজন ইসলামিক স্কলার নুমান আলী খান এক খুৎবায় রবার্ট ডেভিলার গল্প সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, তিন মাস আগে আমি আমেরিকার ফোর্টওয়ার্টে খুৎবা দিয়েছিলাম। সেই মসজিদটিতে আমি গত চার থেকে পাঁচ বছরেও যায়নি। কোন এক কারণে তারা সেখানে আমাকে আমন্ত্রণ করেন। আমার খুৎবার বিষয় ছিল দু'আ। খুৎবা শেষ হয়ে গেলে একজন ইজিপশিয়ান যুবক আমার কাছে এসে বলল- আল্লাহ আজ আমার দু'আ কবুল করেছে। জিজ্ঞাসা করলাম আপনার দু'আ কী ছিল? তিনি বললেন রবার্ট ডেভিলার সাথে যেন নুমান আলী খানের সঙ্গে দেখা হয়। নুমান আলী তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, "আপনি রবার্ট ডেভিলা?” সে বলল না। আমি রবার্ট ডেভিলা নই, আমি তার বন্ধু। কিন্তু আমার ধারণা আল্লাহ আমার দু'আ কবুল করা শুরু করেছেন। আমি খুব আগ্রহী হলাম।
রবার্ট ডেভিলা যেখানে থাকে সেখান থেকে ফোর্টওয়ার্টের দূরত্ব ৪০ মিনিটের পথ। তিনি এক সময় কৃষি কাজ করতেন। তার কোন একটা জেনেটিক সমস্যা ছিল যার কারণে জীবনের একটা সময় এসে তার শরীরের গলার নিচ থেকে পা পর্যন্ত সমস্ত শরীর প্যারালাইজড্ড হয়ে গিয়েছিল। এখন সে একটা নার্সিং হোমেই ভর্তি আছে। বেশির ভাগ রোগীই সেখানে ৯০ বা ১০০ বছরের বৃদ্ধ। একমাত্র রবার্ট ডেভিলাই ৩০ বছরের যুবক যার পুরো শরীরই প্যারালাইজ্ড্। সে গত ১০ বছর যাবৎ এই নার্সিং হোমেই আছে। তার পরিবার তার জন্য এক বিশেষ ধরনের Voice Command Computer-এর ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। যেটা দিয়ে সে তার কন্ঠের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করে পৃথিবীর খোঁজ খবর রাখত। তার রুমে খৃস্টান পাদরিরা সাপ্তাহিক প্রার্থনার জন্য আসত। আর তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু তার পাশের বেডেই থাকতো। সে ও প্যারালাইজড্ড ছিল। তার একটা লিভারের প্রয়োজন ছিল। তারা সবসময় স্রষ্টা, জীবন ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করত। তারা একে অপরে খুবই ভাল বন্ধু ছিল। একদিন রবার্টের বন্ধু খবর পেল তার জন্য এক লিভার ডোনার পাওয়া গেছে। সে খুবই খুশী হল। সে রবার্টকে বলল-আমি একজন ডোনার পেয়েছি আমাকে যেতে হবে। আমি তোমাকে খুবই মিস করব। কিন্তু আমাকে যেতে হবে। রবার্টের বন্ধু চলে যায়। সে আসলেই চলে যায়। অপারেশন টেবিলে লিভার ট্রান্সপ্লান্টের সময় সে মারা যায়। রবার্টের এই বন্ধুটি ও একজন খৃস্টান ছিলেন। তার গলায় একটা ক্রুশ ঝুলতো সবসময়। তার বোন ক্রুশটা স্মৃতি চিহ্ন হিসেবে রবার্টকে দিয়ে দেয়। ক্রুশটা রবার্টের বিছানার পাশেই ঝুলতো। সেটা তার বন্ধুর স্মৃতি ছিল।
রবার্ট খুব সাধারণ জীবনযাপন করত। আর সে নাসিং হোমেই থাকত। নার্সরা তাকে দেখাশুনা করত। একদিন রবার্ট স্বপ্নে, একজন লোককে দেখলো। সে তার নাম বলল মুহাম্মাদ। লোকটি আঙ্গুল দিয়ে ক্রুশটি দেখিয়ে রবার্টকে বললেন, আল্লাহ এই জন্য তার নাবীদের পাঠাননি যেন মানুষ তাদের উপাসনা করে বরং আল্লাহ নাবীদের পাঠিয়েছেন যেন মানুষ আল্লাহর উপাসনা করে। আর ঈসা (আ.) হচ্ছেন কেবলমাত্র একজন মানুষ। তিনি (ঈসা) বাজারেও যেতেন খাবারও খেতেন। স্বপ্নটা এখানেই শেষ হয়ে যায়। রবার্ট শুধুমাত্র ঈসা (আ.) নামে একজনকে জানত। এখন সে মুহাম্মাদ নামে একজনের নাম শুনলো যে তাকে বলেছেন, নাবীদের কাজ হল তারা মানুষকে আল্লাহর ইবাদত করতে বলা। সে মুহাম্মাদ -কে খুঁজতে লাগল। মুহাম্মাদ -কে খুঁজতে গিয়ে ইসলামকে খুঁজে পেলো। সে ঈমান আনলো।
যেহেতু সে একজন মুসলিম সে কুরআন সম্পর্কে জানতে চাইলো। সে খুঁজে খুঁজে কিছু ইন্টারনেটের চেট রুমে গেলো এবং অনুরোধ জানালো কেউ একজন আমাকে কুরআন শিখাও। প্রায় সাথে সাথেই সে একজন ইজিপশিয়ানকে পেয়ে গেলো। সে তাকে আরবী শিখাতে এগিয়ে আসে। সে তাকে আরবী বর্ণমালা শিখিয়ে দেয়। আর যখন আরবী বর্ণমালা শিখা হয়ে গেলো তখন সে কুরআন পড়া শিখলো। সে তার বেডে শুয়ে শুয়ে দশটি সূরা মুখস্ত করল। রবার্টের মনে হল আমি কুরআন পড়তে শিখলাম, নাবী মুহাম্মাদ সম্পর্কে জানা শুরু করলাম। কিন্তু আমাকে জানতে হবে কুরআনের শিক্ষা আসলে কী? সুতরাং সে খুঁজতে লাগল কীভাবে কুরআন বুঝা যায়। কোন এক ভাবে সে আমার (নুমান আলী খান) লেকচারের ভিডিও গুলো পায়। সে সেগুলো দেখা শুরু করে এবং প্রায় সবগুলোই দেখে ফেলে।
এর মধ্যে আরও একটি ঘটনা আছে। সেই নাসিং হোমেই আরো একজন লোক ছিল সে টুকটাক সার্ভিসিং এর কাজ করত। তার নিজেরই একটা চমৎকার গল্প আছে। সে একজন মুসলিম। কিন্তু সে খুব একটা ধর্ম মেনে চলতো না। তার সবচেয়ে কাছের মসজিদ ছিল প্রায় পঞ্চাশ মাইল দূরে। সে আল্লাহকে পাওয়ার জন্য চার্চে যেতো! সে মুসলিম কিন্তু আল্লাহকে পাওয়ার জন্যে সে চার্চে যেতো! একদিন সে রবার্টের রুমের পাশ দিয়ে যেতে শুনলো "ওয়াল আসরী ইন্নাল ইনসানা লাফী খুসর......"। সে রুমে ঢুকে জিজ্ঞেস করল 'রবার্ট তুমি কী শুনছো?' রবার্ট বলল কই কিছু নাতো আমিই পড়ছিলাম। সে জিজ্ঞেস করল তুমি মুসলিম হয়েছো? রবার্ট বলল হ্যাঁ আমি মুসলিম হয়েছি। এবার রবার্টের বন্ধু খুবই অবাক হল। কীভাবে আল্লাহ আমেরিকার চার্চের নগরীর মধ্যে একজনকে পথ দেখাতে পারলো। যার বেডের পাশে ক্রুশ ঝুলে থাকে। নাসিং হোমে শুয়ে থাকা ছাড়া নড়াচড়া করার মত যার কোন ক্ষমতা নেই। সে নিজে নিজে বলে উঠলো আমি আবার আল্লাহর কাছে ফেরত আসতে চাই। রবার্ট তার এই ইজিপশিয়ান বন্ধুকে তার অনলাইন শিক্ষক নুমান আলী খানের কথা বলে। এবার সে ও আমার ভিডিওগুলো দেখতে শুরু করল।
একদিন রবার্ট তার বন্ধুকে বলল আমার খুব ইচ্ছা যদি নুমান আলী খানের সাথে আমার দেখা হত। বন্ধুটি বলল ঠিক আছে আমি তোমার জন্য দু'আ করব। ঠিক পাঁচ বছর পড়ে সেই বন্ধুটি আমার খুৎবা শুনতে আসে যেখানে আমি বিগত চার বছরেও যায়নি। জুম'আর সলাতের শেষে সে আমাকে বলল, মনে হয় আল্লাহ আমার এবং আমার বন্ধুর দু'আ পূরণ করতে যাচ্ছেন। আমি বললাম হ্যাঁ আমারও তাই মনে হচ্ছে। আমরা কয়েকজন মিলে সেখানে গেলাম। রবার্টের সাথে দেখা করলাম। আমরা সেখানে চমৎকার কিছু সময় কাটালাম। আমরা সবাই যখন সেখানে যাই নার্সরাও আমাদের দেখে অবাক হল। জিজ্ঞেস করল আপনারা সবাই তাকে দেখতে এসেছেন? তিনি বললেন, কেন দেখা করতে চান? আমরা বললাম 'তিনি আমাদের অনুপ্রেরণা'। নার্সরা সমস্ত সিকিউরিটি চেকআপ করে তারপর আমাদের যেতে দিল। রবার্ট আমাদেরকে দেখে চমকে উঠল। আমি (নুমান আলী খান) রবার্ট এর সাথে কথা বললাম। তাকে বললাম রবার্ট আমি (নুমান আলী খান) শুনেছি আপনি কয়েকটি সূরা মুখস্ত করেছেন। সে বলল হ্যাঁ। আমি (নুমান আলী খান) বললাম আমাকে একটু শুনাতে পারবেন। সে আমাদেরকে সূরা আসর শুনালো। আমাদের মধ্যে এমন একজন ছিল না যে তাদের চোখ থেকে পানি ঝরছিল না। যখন কেউ আল্লাহর পথে ফিরে আসতে চায় তখন সাহায্য নিয়ে ভাববেন না। আল্লাহর সাহায্য অবশ্যই আসবে, পথ নির্দেশনাও অবশ্যই আসবে।
আমি (নুমান আলী খান) রবার্টকে নিয়ে তরুণদের উদ্দেশ্য করে আরো কিছু বলতে চাই। আমি (নুমান আলী খান) রবার্টের প্যারালাইজড্ড সম্পর্কে বলেছি। তার একটা বিশেষ হুইল চেয়ার ছিল যেটি তার শরীরের প্রত্যেকটি অংশকে আটকে রাখতো। এটি তার ঘার থেকে পুরো শরীরকে আটকে রাখতো। কারণ শরীরের উপর তার কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না এবং তার একটা বিশেষ গাড়ি ছিল যেটি তার এই হুইল চেয়ারকে আটকে রাখতো। যাতে করে তার শরীরে কোন প্রকার ঝাকুনি না লাগে। সে ঝাকুনি সহ্য করতে পারতো না। একদিন সে অনুরোধ করল সে জুম'আর সলাতে যাবে। সেদিন তার বিশেষ গাড়িটি ছিল না। তাকে একটা সাধারণ গাড়িতে মসজিদে পাঠানো হল এতে তার বেশ আঘাত লাগল। তিনি জুম'আর সলাত থেকে ফিরে এল প্রচন্ড ব্যাথা নিয়ে। ডাক্তাররা বলল রবার্ট আমরা দুঃখিত তোমাকে আর হুইল চেয়ারটিতে বসতে দিতে পারবো না। তোমাকে বেড রেষ্ট এ থাকতে হবে অন্তত আগামী ছয় মাসের জন্য। তুমি যদি এরপর ভাল হও তারপর আমরা ভেবে দেখবো।
আমরা যখন তার সাথে দেখা করতে যাই তখন প্রায় তিন মাস হয়ে গেছে সে পুরোপুরি বিছানায়। তার পিঠে ব্যাথার কারণ ছিল সে জুম'আর সলাতে গিয়েছিল। তারপরও সে আমাদের বলে, আমি আমার জীবনের এত শান্তিপূর্ণ জায়গায় কোনদিন যায়নি। নুমান ভাই আপনি জানেন আমি কি করব? আমি আমার চেয়ারটি ফেরত পেলেই আবারো সলাতে যাবো, আবারো মসজিদে যাব। কারণ আমার জীবনে আমি এরকম অনুভূতি কোন দিন পাইনি। সে এমন একজন লোক যার চোখ এবং মুখ ছাড়া কোনই শারীরিক ক্ষমতা নেই। তারপরও সে বলে আমি মসজিদে শান্তি পাই। রবার্ট আমাকে আরো বলেছে জানেন আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আল্লাহ আমার সাথে কেন এমন করলেন? তারপর আমি নিজেই নিজের উপর হাসি। আল্লাহ আমাকে অনেক অনেক কিছু দিয়েছেন। আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞ। যদি এটাই হয় প্ল্যান আমাকে ইসলামের পথে আনার জন্য তবে এটাই যথেষ্ট, এটাই ঠিক আছে।
আপনারা এমন অনেক মুসলিম দেখবেন যারা অল্প একটু অসুখ হলেই বলে আল্লাহ আমার সাথে এটা করতে পারলেন? এবং মাঝে মাঝে এ লোকটাই বলে বসে যে আল্লাহ বলতে আসলে কেউ নেই। আমি (নুমান আলী খান) আপনাদের বলতে চাই যদি একজন লোকের এই কথা বলার অধিকার থাকে তবে সে হল রবার্ট ডেভিলার। আমি তার মত সুখী মানুষ দেখিনি। সে একজন পরিপূর্ণ সুখী মানুষ। আল্লাহ যদি রবার্ট ডেভিলাকে পথ দেখাতে পারেন তাহলে তিনি যে কাউকে পথ দেখাতে পারেন।
https://www.youtube.com/watch?v=r7kjLJL7Z1o
একজন আমেরিকান শিল্পী এবং লেখিকার গল্প 'ড্যানিয়েলে লোডুকা'
আমি কখনোই আল্লাহকে খোঁজার গরজ অনুভব করিনি। যখন কিছুই করার থাকত না, তখন কোনো পুরনো বই বা ভবন দেখে সময় কাটাতাম। কখনো কল্পনাও করিনি আমি মুসলিম হব। আমি খৃস্টানও হতে চাইনি। যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের প্রতিই আমার তীব্র বিতৃষ্ণা ছিল। প্রাচীন কোনো গ্রন্থ আমার জীবনযাপনের পথ-নির্দেশ করবে, তা নিয়ে কখনো ভাবিইনি। এমনকি কেউ যদি আমাকে কয়েক কোটি ডলার দিয়েও কোনো ধর্ম গ্রহণ করতে বলত, আমি সরাসরি অস্বীকার করতাম।
আমার প্রিয় লেখকদের অন্যতম ছিলেন বার্টান্ড রাসেল। তার মতে, ধর্ম হলো কুসংস্কারের চেয়ে একটু ভালো, সাধারণভাবে লোকজনের জন্য ক্ষতিকর, যদিও এর ইতিবাচক কিছু বিষয়ও আছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্ম ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি জ্ঞানের পথ বন্ধ করে দেয়, ভীতি আর নির্ভরতা বাড়িয়ে দেয়। তাছাড়া বিশ্বের যুদ্ধ, নির্যাতন আর দুর্দশার জন্য অনেকাংশে দায়ী ধর্ম। আমার মনে হতো, ধর্ম ছাড়াই তো ভালো আছি। আমি প্রমাণ করতে চাইতাম, ধর্ম আসলে একটা জোচ্চুরি। ধর্মকে হেয় করতে আমি পরিকল্পিত কাজ করার কথা ভাবতাম।
হ্যাঁ, সেই আমিই এখন মুসলিম। আমি ঘোষণা দিয়েই ইসলাম গ্রহণ করেছি। আর সেটা না করে উপায়ও ছিল না। আমি অনুগত হয়েছি, ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছি। মজার ব্যাপার হলো, যখন ধর্মাবলম্বনকারীদের সাথে বিশেষ করে মুসলিম হিসেবে পরিচয়দানকারীদের সাথে কথা বলতাম, আমি প্রায়ই লক্ষ করতাম, তারা বিশ্বাস করার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে। তাদের ধর্মগ্রন্থে যতই সাংঘর্ষিক বিষয় থাকুক, ভুল থাকুক, তারা সবকিছু এড়িয়ে দ্বিধাহীনভাবে ধর্মকে আঁকড়ে ধরে। তারা জানে, তারা কী বিশ্বাস করে।
ব্যক্তিগতভাবে আমি কখনো আল্লাহকে খুঁজতে চাইনি, সেই ইচ্ছাও আমার কখনো হয়নি। একদিন আমার এক বন্ধু ইসলামে আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে বোঝাতে চাইল, আমি ক্ষুব্ধ হলাম। কোনো মানুষ যখন কিছু বিশ্বাস করতে চায়, তখন তার মধ্যে অনেক সময়ই এমন একটা বোধ সৃষ্টি হয়, যার ফলে সেটা গ্রহণ করার ব্যাপারে আগ্রহ তার মধ্যে তৈরি হয়। ধর্মের ব্যাপারেও আমার মধ্যে তেমন একটা ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল। আমি ধর্মকে স্রেফ একটা বাজে জিনিস হিসেবে বিশ্বাস করতে চাইতাম। এমন বিশ্বাস কিন্তু কোনো দৃঢ় প্রমাণের ভিত্তিতে হয়, এমন নয়। স্রেফ অনুমানের উপর গড়ে ওঠে এ ধরনের বিশ্বাস। আমি যখন কোনো ধর্মীয় বই পড়তাম, তখন সেগুলোর প্রতি আমার কোনো পক্ষপাতিত্ব থাকত না, তবে আমার উদ্দেশ্য থাকত তা থেকে ভুল-ত্রুটি বের করা। এর ফলে আমি আমার উদ্দেশ্যের প্রতি অটল থাকতে পারতাম।
আমার কুরআনের পেপারব্যাক অনুবাদটি পেয়েছিলাম বিনা মূল্যে। একদিন দেখলাম, এমবিএ'র কিছু ছেলে কুরআন বিলি করছে। আমি জানতে চাইলাম, এগুলো কি ফ্রি? তারা হ্যাঁ সূচক জবাব দিলে আমি একটা নিয়ে রওনা দিলাম। এসব বইয়ের প্রতি আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। কেবল ফ্রি পেয়েছিলাম বলে নিয়েছিলাম। তবে আমার উদ্দেশ্য ছিল, বইটা পড়ে আরো কিছু খুঁত যদি পাওয়া যায়, তবে ধর্মটির বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে।
আমি কুরআনের যে কপিটা পেয়েছিলাম, সেটির পাতাগুলো মলিন হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমি যতই পড়তে থাকলাম, ততই বশীভূত হতে লাগলাম। আমি আগে যেসব ধর্মীয় গ্রন্থ পড়েছি, তা থেকে এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমি অর্থ সহজেই বুঝতে পারছিলাম। সবকিছুই ছিল স্পষ্ট। আমার মনে পড়ল, আমার এক বন্ধু যখন আমাকে ইসলামে আল্লাহ কেমন তা বোঝাচ্ছিল, আমি রেগে গিয়েছিলাম, কিন্তু এবার পাতার পর পাতা উল্টে অনেক জায়গায় দেখতে পেলাম তাতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, 'অবশ্যই আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়াময়।'
মনে হলো, পবিত্র কোরআন সরাসরি আমার সাথে কথা বলছে, আমার জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে। এটা একটা 'পুরনো গ্রন্থ' কিন্তু পুরোপুরি প্রাসঙ্গিক। এর কাব্যিকতা, কল্পনাশক্তি এবং যেভাবে বার্তা পৌঁছে দেয়, তা আমাকে অন্তর থেকে নাড়া দিল। এর অভূতপূর্ব সৌন্দর্য আমি আগে কখনো টের পাইনি। মরুভূমির দমকা হাওয়া যেন সবকিছু উল্টে দিল। মনে হলো আমি যেন কিছু একটার জন্য দৌড়াচ্ছি। কুরআন আমার বোধশক্তিতে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল। নিদের্শনাবলী দেখে তারপর আমাকে চিন্তা করতে, ভাবতে, বিবেচনা করতে বলল। এটা অন্ধ বিশ্বাস প্রত্যাখ্যান করে, কিন্তু যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিকে উৎসাহিত করে। কুরআন মানুষকে কল্যাণের দিকে আহবান করে, স্রষ্টাকে স্বীকার করে নিতে বলে, সেইসাথে আধুনিকতা, মানবিকতা, সহমর্মিতার কথা বলে।
অল্প সময়ের মধ্যেই আমার জীবনকে বদলে দেয়ার আগ্রহ তীব্র হয়। আমি ইসলাম সম্পর্কে অন্যান্য বই পড়তে শুরু করলাম। আমি দেখতে পেলাম, কুরআনে অনেক ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে, অনেক হাদিসেও তেমনটা আছে। আমি দেখলাম, পবিত্র কুরআনে অনেক স্থানে নাবী মুহাম্মাদকে সংশোধন করা হয়েছে। আমার কাছে অদ্ভূত লাগল। এতেই বোঝা যায়, তিনি গ্রন্থটির লেখক নন। আমি নতুন পথে হাঁটতে শুরু করলাম, পবিত্র কুরআনের জ্যোতি আর নাবী মুহাম্মাদের দেখানো রাস্তায়। এই লোকটির মধ্যে মিথ্যাবাদির কোনো আলামত দেখা যায়নি। তিনি সারা রাত সলাত আদায় করতেন, তিনি নির্যাতনকারীদের ক্ষমা করে দিতেন, দয়া প্রদর্শনকে উৎসাহিত করতেন। সম্পদ আর ক্ষমতা তিনি প্রত্যাখান করতেন, কেবল আল্লাহর দিকেই নিবেদনের বিশুদ্ধ বার্তাই প্রচার করতেন। আর তা করতে গিয়ে নির্মম নির্যাতন সহ্য করেছেন।
সব কিছুই সরল, সহজেই বোঝা যায়। আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। এই মহাবিশ্বের জটিল আর বৈচিত্রময় কোনো কিছুই ঘটনাক্রমে ঘটেনি। তা-ই সাধারণ বিষয় হলো, সেই একজন- যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, তাকে অনুসরণ করতে হবে। আমার এপার্টমেন্টের কৃত্রিম লাইটিং এবং বাতাসের ওজন নিয়ে ভাবতে ভাবতে পবিত্র কুরআনের এই আয়াতটি পড়লাম:
কাফিররা কি ভেবে দেখে না যে, আকাশমন্ডলীর ও পৃথিবীর মুখ বন্ধ ছিল, এরপর আমি উভয়কে খুলে দিলাম এবং প্রাণবন্ত সবকিছু আমি পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। এরপরও কি তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না? (কুরআন ২১:৩০)
এই আয়াত পড়ে আমার মাথা যেন দুই ভাগ হয়ে গেল। এটাই তো বিগ ব্যাং তত্ত্ব, এটা স্রেফ একটা তত্ত্ব নয়। সব জীবন্ত সত্তাই পানি থেকে সৃষ্টি হয়েছে, বিজ্ঞানীরা মাত্র এটা আবিষ্কার করেছে। এটা ছিল অবাক করা বিষয়। এটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে উত্তেজনাকর এবং সবচেয়ে ভীতিকর সময়। আমি বইয়ের পর বই অধ্যায়ন করতে লাগলাম, তথ্যগুলো যাচাই করতে থাকলাম। এক রাতে আমি প্র্যাট ইনস্টিটিউট লাইব্রেরিতে বসে খোলা বইগুলোর দিকে হা করে তাকিয়ে ছিলাম। কী ঘটতে যাচ্ছে, আমি বুঝতে পারছিলাম না। তবে এটুকু অনুভব করলাম, আমার সামনে যা রয়েছে, তা হলো সত্য। আগে আমি যেটাকে সত্য ভাবতাম, সেটার আর কোনা অস্তিত্ব ছিল না।
এখন কি আমার সামনে কোন বিকল্প ছিল? আসলে কোনো বিকল্পই ছিল না। আমি যা আবিষ্কার করেছিলাম, তা অস্বীকার করতে পারছিলাম না, অগ্রাহ্য করতে পারছিলাম না। আগের মতোই চলব, এমনটাও ভাবছিলাম সামান্য সময়ের জন্য। সেটাও সম্ভব ছিল না। আমার কাছে পথ খোলা ছিল কেবল একটাই। ইসলাম গ্রহণ করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না আমার সামনে। অন্য কিছু করা মানেই ছিল সত্যকে অস্বীকার করা।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের শালিকা লরেন বুথের ইসলাম গ্রহণ
লরেন বুথকে অনেকে চেনেন। তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের শালিকা। পেশায় তিনি একজন সাংবাদিক এবং সোসাল একটিভিস্ট। তার নিজ মুখেই শুনা যাক তার জার্নি টু ইসলাম-এর ঘটনা।
আমি আল্লাহকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি যে তিনি আমাকে মুসলিমদের সাথে এক মাস সময় কাটানোর একটা সুযোগ করে দিয়েছিলেন। আমার প্রফেশনাল কাজের অংশ হিসেবে আমি রমাদানের শেষের দিকে রাফাতে একটি রিফুজি ক্যাম্পে গিয়েছিলাম এবং সেখানে তাবুতে একটি দরিদ্র পরিবারের সাথে থেকেছিলাম। আমি ঐ পরিবারটির সাথে ইফতার করেছিলাম। তাদের একটি মাত্র পাটি ছিল যেটা তারা রাত্রে ঘুমানোর জন্য ব্যবহার করত। তাবুর মাঝখানে মা বাচ্চাদেরকে খাবার বেড়ে দেয়। যদি কোন খাবার অবশিষ্ট থাকে তা থেকে মা খায়। এই মহিলাটি আমাকে আমন্ত্রণ করল তার তাবুতে। আমার মনে হল সে আমাকে আমন্ত্রণ করল তাজমহলে। সে হাসি দিয়ে বলল, আসসালামু আলাইকুম। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম রাফাতে রমাদান কেমন কাটে এত কম খাবার দিয়ে? সে হাসি দিয়ে বলল, আলহামদুলিল্লাহ! আমিও তাদের সাথে ইফতার করলাম। ইফতারে ছিল রুটি ও চানা। আমি মনে মনে অনেক রেগে গেলাম ঈশ্বরের উপর। আমি ভাবলাম ঈশ্বর কেন যে ক্ষুধার্ত মানুষদেরকে আরও ক্ষুধার্ত করে রাখে। এটা কেমন ঈশ্বর যে দরিদ্র মানুষদের জন্য রোযার নিয়ম বানিয়েছে। আমি বোনটির দিকে ঘুরে তাকিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম "সম্মানের সাথে আমি আপনাকে একটি প্রশ্ন করতে চাচ্ছি, আপনার ঈশ্বর কেন আপনাদেরকে ক্ষুধার্ত রাখে রমদানের সময়"? বোন আপনি কেন রোযা রাখেন আমাকে একটু বুঝাতে পারেন? সে আমাকে বলল "বোন আমরা রোযা রাখি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে"। তখন আমি ভাবলাম নিশ্চয় ইসলাম আমার জন্য না এটা অন্য মানুষের জন্য।
এবার এক বছর পরের ঘটনা। পরবর্তী বছরের রমাদানে আমি ইরানে গিয়েছিলাম একজন সাংবাদিক হয়ে। এখানে উল্লেখ্য যে আমরা অমুসলিম হলেও মধ্যপ্রাচ্যের কোন দেশে কোন কাজে গেলে সেখানে তাদের মতোই পর্দা করি। আমি ওখানে একটি মসজিদে গেলাম। মসজিদটির নাম ছিল ফাতিমা মসজিদ। আমি ওযু করলাম এবং তা আমি আগেই শিখে নিয়েছিলাম, আমি আমার হিযাবটা পড়ে নিলাম এবং মসজিদে অন্যান্যদের মতো নামাযও পড়লাম (যদিও আমি অমুসলিম)। নামাযের পর আমি বললাম "আল্লাহ আমাকে কিছু দিওনা আমার সবকিছু আছে। শুধু তোমাকে ধন্যবাদ জানাই এই ভ্রমণটার জন্য কিন্তু আল্লাহ তুমি প্যালেস্টিয়ান মানুষদেরকে ভুলে যেও না।"
তারপর আমি এই ব্যস্ততম মসজিদে বসে থাকলাম। কিন্তু যখন আমি মসজিদে বসলাম তখন আমি কেমন যেন শান্তি অনুভব করলাম। যে শান্তি আমি আগে কখনও অনুভব করিনি, আমার সব দুশচিন্তা দূর হয়ে গেলো। একটা সময় একজন মহিলা আমার কাছে এসে বলছে আমরা আপনাকে অনেক ভালোবাসি। কিছুক্ষণ পর একটা বাচ্চা এসেও আমাকে একই কথা বলল। আমি আমার সাথী নাদিয়াকে জিজ্ঞেস করলাম "একে অন্যের প্রতি আন্তরিক ব্যবহার এটা কি মসজিদে সাধারণত হয়ে থাকে"? নাদিয়া বলল আসলে না। আমি সেই রাতটি মসজিদের ফ্লোরে মহিলা সেকশনে অন্যান্য মহিলাদের সাথে থাকলাম। পরের দিন সকালে ফযর ওয়াক্তে আযান দিল আমি তখন মসজিদের ভেতরে ফযরের নামায পড়ে নিলাম। তারপর আমার ভেতরে অদ্ভুত কিছু পরিবর্তন হচ্ছিল।
তেহেরান থেকে লন্ডনে ফিরে যাবার জন্য আমি প্লেনে উঠলাম। যখন প্লেনটা লন্ডনের কাছাকাছি এলো তখন পাইলট এসে আমাকে বলল- আমাদের সাথে এই ভ্রমণটায় থাকার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আমরা লন্ডনে ২০ মিনিটে পৌঁছে যাবো। আমি ঐ মূহূর্তে ভাবলাম আমার মাথার হিযাবটা খুলে ফেলবো। কিন্তু আমি তা পারলাম না। সাতদিন পর আমি লন্ডনের একটি মসজিদে ইসলাম গ্রহণ করলাম। যখন আমার কুরআনের কাছে ফিরে যাওয়ার সময় তখন আমি কুরআন খুললাম। কুরআন খুলে প্রথমেই দেখলাম সূরা আল ফাতিহা। আমার মনে হল সূরা ফাতিহা আমাকে শান্তির ধর্মে আমন্ত্রণ জানালো। আমি আর কুরআন পড়া বন্ধ করতে পারলাম না।
কেউ হয়তো আমাকে বলেছিল তুমি ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছো। কিন্তু ঈশ্বর কখনও তোমার প্রতি বিশ্বাস হারাবে না। আমার দুই মেয়ে ৮ এবং ১০ বছর বয়স। আমি যখন ইসলাম গ্রহণ করলাম তখন তারা আমাকে কিছু প্রশ্ন করেছিল তার মধ্যে একটি প্রশ্ন হচ্ছে "মা তুমি যে এখন মুসলিম হলে তুমি কি এখনোও আমাদের মা থাকবে”? আমি উত্তরে বললাম, "আমি এখন মুসলিম, আমি আগের থেকে এখন আরো ভালো মা হবো তোমাদের জন্য"।
https://www.facebook.com/Official.Lauren.Booth/
ক্যানাডিয়ান স্কলার ড. আবু আমিনাহ বিলাল ফিলিপ্স
ড. আবু আমিনাহ বিলা ফিলিপ্স জন্মগ্রহণ করেন জামাইকার একটি খৃষ্টান পরিবারে। তিনি বড় হয়েছেন ক্যনাডার টরোন্টো শহরে এবং সেখানেই ইসলাম গ্রহণ করেন ১৯৭২ সালে। তিনি মদিনা ইসলামিক ইউনিভার্সিটির কলেজ অব ইসলামিক ডিসিপ্লিনস থেকে ১৯৭৯ সালে ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জন করেন। তারপর তিনি ১৯৮৫ সালে রিয়াদের কিং সাউদ ইউনিভার্সিটি থেকে আকীদার উপর মাষ্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। সবশেষে, তিনি ১৯৯৪ সালে ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েল্স থেকে ইসলামিক থিউরোলজীর উপর পি.এস.ডি করেন। কেউ কেউ তার নাম দেখে মনে করতে পারেন যে আমিনাহ তো মেয়েদের নাম। হ্যাঁ, তার মেয়ের নাম আমিনাহ আর আরবীতে আবু মানে বাবা। সেই সুবাদে তার নাম আমিনাহর বাবা বিলাল ফিলিপ্স।
কীভাবে ইসলামে পদার্পণ? তিনি বললেন- "আমি একটি খৃষ্টান পরিবারে বড় হয়েছি। আমি আমার ইউনিভার্সিটিতে থাকাকালিন একটি কমিউনিষ্ট পার্টিতে যোগ দেই, এই ইচ্ছা নিয়ে যেন আমরা পৃথিবীকে একটি ভালো জায়গায় নিয়ে যেতে পারি। পৃথিবী থেকে অবিচার, অনাচার, নিপীড়ন সব মুছে ফেলতে পারি এবং সমতা গড়তে পারি। কিন্তু কিছুদিন পর আমি বুঝতে পারলাম যে এই কমিউনিষ্ট পার্টিতে থেকে বেশি কিছু করা যাবে না। কমিউনিষ্ট পাটির মধ্যে আমার একটি ঘনিষ্ট বন্ধু ছিল যিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এই বিষয়টি আমাকে ইসলামের ব্যাপারে জানার জন্য উৎসাহিত করল। আমি একটি অটো বায়োগ্রাফি করেছিলাম সেটা ছিল ম্যালকম-এক্স-এর ব্যাপারে। যিনি ১৯৬০ ও ১৯৭০ সালে কালো আমেরিকান যাদের ইসলাম গ্রহণ করার পেছনে একটি বড় কারণ ছিল। কিন্তু আমি ভাবলাম আমি কি ম্যালকম-এক্স-এর মত মানসিকভাবে তৈরি আছি এরকম কিছু করার। আমাকে আরো সবচেয়ে বেশি ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে যেই বিষয়টি আকর্ষণ করেছিল সেটি ছিল একটি বই যেটার নাম ছিল "Islam, The Misunderstood Religion" এই বইটির লেখকের নাম ছিল মুহাম্মাদ কুতুব। এই বই পড়ে ইসলামের উপর আমার অনেক ভুল ভেংগে গেল।
আমার একদিন একটি ভিন্ন রকম অভিজ্ঞতা হয়েছিল। আমি ঘুমন্ত অবস্থায় একটি স্বপ্ন দেখেছিলাম। দেখি আমি একটি অন্ধকার জায়গায় বন্ধি এবং বের হওয়ার কোন রাস্তা নেই, মনে হচ্ছিল যে আমি মরে যাচ্ছি, আমি বাঁচার জন্য চেঁচামেচি করছি কিন্তু কেউ আমার আওয়াজ শুনতে পারছিল না। যখন কোন অবস্থায় আমি নিজেকে বাঁচাতে পারছিলাম না, তখন আমি হার মানলাম আর ভাবতে লাগলাম আমি এখন মরে যাবো। কিন্তু সেই মুহূর্তে আমি আমার জীবন আত্মসমর্পন করলাম। তখনি আমি ঘুম থেকে উঠে পরলাম এবং বুঝতে পারলাম যে ঈশ্বর বলে কেউ আসলেই আছেন। সে আমাকে সাহায্য করল, যখন কেউ আমাকে সাহায্য করতে পারছিল না।
আমার মূল লক্ষ্য হল ইসলামের পড়ালেখা ও প্রচারের উপর। আমি পৃথিবীর অনেক ইউনিভার্সিটিতে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ের উপর অনেক লেকচার দিয়েছি। ইসলামের নামে যতো ধরনের সহিংসতা হয়েছে আমি ওগুলোকে কখনই সমর্থন করি না।
ইসলাম গ্রহণ করার পর পারিবারিকভাবে আমাকে তেমন কোন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়নি। কারণ আমার বাবা-মা অনেক খোলা মনের মানুষ। তারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাস করেছিলেন। যেমন - নাইজেরিয়া, মালয়েশিয়া, ইয়ামেন, সউদি আরব ইত্যাদি। তাই মুসলিমদের সাথে তাদের অনেক উঠা বসা হয়েছিল। তাদের অনেক ভাল মুসলিম বন্ধুও ছিল এবং সেই কারণে ইসলামের প্রতি তাদের ভাল ধারণা ছিল। অবশেষে আমার ইসলাম গ্রহণ করার ২১ বছর পর তারাও ইসলাম গ্রহণ করেছিল।
ড. বিলাল ফিলিপ্স-এর কাতার ভিত্তিক একটি অনলাইন ইসলামিক ইউনিভার্সিটি রয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ এই ইউনিভার্সিটিতে বর্তমানে দেড় লাখের উপর ছাত্র-ছাত্রী আছে যারা ২১৯টা দেশ থেকে ইসলামের উপর পড়াশোনা করছে।
আশা করি আগামি ৫ বছরে এর ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা মিলিনিয়নে ছাড়িয়ে যাবে। এই ইউনিভার্সিটির মূল লক্ষ্য হচ্ছে যত বেশী মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেয়া যায়। এই ইউনিভার্সিটির লক্ষ্য টাকা নয়, মানুষকে ইসলামের সঠিক শিক্ষা দেয়া। গালফ ওয়ারের সময় ড. বিলাল ফিলিপ্স আমেরিকান এবং ব্রিটিশ সৈন্যদের মধ্যে ইসলামের দাওয়াতী কাজ করেছিলেন এবং আলহামদুলিল্লাহ সেই সময় ড. বিলাল ফিলিপ্সের হাতে তিন হাজার আমেরিকান এবং ব্রিটিশ সৈন্য ইসলাম গ্রহণ করেছিল। আল্লাহু আকবার।
আরনড ভ্যান ডুরণ (যিনি ইসলামের বিরুদ্ধে ‘ফিতনা’ নামে মুভি তৈরী করেছিলেন)
কে এই আরনড? বিশ্ব বিখ্যাত একজন আলোচিত ব্যক্তি যিনি ডেনমার্কে নাবী মুহাম্মাদ এবং ইসলামের বিরুদ্ধে ‘ফিতনা’ নামে একটি মুভি বানিয়েছিলেন। যিনি প্রচন্ড ইসলাম বিদ্বেষী ছিলেন, আল্লাহ বিরোধী ছিলেন এবং গ্রীট উইলডার্স এর ইসলাম বিরোধী পার্টির একজন মেম্বার ছিলেন। কিন্তু মহান আল্লাহর পরিকল্পনা ভিন্ন। এই আরনড একদিন সাক্ষ্য দিলেন যেঃ “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতিত অন্য কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রসূল”।
আরনড ইসলাম গ্রহণ করলেন, ইসলামের শত্রু থেকে হয়ে গেলেন ইসলামের সেবক। এখন তিনি সারা পৃথিবী ঘুরে ইসলাম প্রচার করে বেড়াচ্ছেন, অমুসলিমদের ইসলামের দাওয়াত দিয়ে বেড়াচ্ছেন।
আরনডের ইসলাম গ্রহণের পর অনেকেই যারা তাকে চিনত তারা খুব আশ্চর্য হয়ে গেলো এবং কেউ কেউ তাকে খুব কটুক্তি করল। সে তার টুইটার একাউন্ট থেকে খুব দুঃখ প্রকাশ করলেন। অনেক রকম কটুক্তির সম্মুখীন হয়েও আরনড কোন রকম উত্তর দেননি, ধৈর্যধারণ করলেন।
আল জাজিরা নেটে একটি ইউনিভার্সিটির কনফারেন্সে আরনড পরিস্কারভাবে বর্ণনা করলেন যে কেন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন। সে বলল, “আমাকে যারা খুব কাছ থেকে চিনে তারা আমার এই সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ জানে। কারণ আমি গত এক বছর ধরে খুব গভীরভাবে ইমলামী বই-পত্র পড়েছি এবং মোটামুটি বুঝেছি। আমার কাছের মানুষ ছাড়া বাকী সবাই আমার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে খুব বিস্মিত হয়েছে। বিশেষ করে আমার ইসলাম বিরোধী কার্যক্রমের ব্যাপারে যারা জানত”।
আরনডের সিদ্ধান্তের পিছনের কারণগুলো তিনি ব্যাখ্যা করলেন, “আমি এমন একজন মানুষ যে বাইরের দিক না দেখে ভিতরের দিকটা দেখে মানুষকে বিচার করি। হগ সিটির কাউন্সিলে একটি মুসলিম কলিগের সাথে আলাপ-আলোচনার পর সে আমাকে একটি মসজিদ দেখিয়ে দিল। যখন আমি সেই মসজিদে গেলাম সেখানকার মুসলিমরা সম্মান এবং ভালবাসার সাথে আমাকে অভিবাদন করল।”
আরনড আরো বললেন, "আমরা সবাই ভুল করে থাকি কিন্তু ভুল করার পরেও আমার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে কিছু অর্থ খুঁজে পাই এবং ঐ অর্থ থেকেই আমার নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ। আমি জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে অনেক কিছু শিখেছি এবং আমি বিশ্বাস করি যে, এই অভিজ্ঞতাগুলোই আমার মুসলিম হওয়ার পিছনের কারণ। এটা আমার জীবনের নতুন শুরু এবং আমি আল্লাহ ও রসূল ﷺ -এর দিক-নির্দেশনা মতই চলতে চাই"।
আরনডের সাথে একটি সাক্ষাতকার
প্রশ্নঃ যদি সম্ভব হয় আপনার ইসলাম গ্রহণ করার প্রধান কারণটি বলুন?
আরনড: আমি কৌতুহল থেকে কুরআন একবার পড়েছিলাম যেটা শুরু করেছিলাম একবছর আগে। আমি কুরআন পড়ার আগে ইসলাম সম্পর্কে নেগেটিভ কথা শুনেছিলাম। কিন্তু আমি যত বেশি কুরআন, সুন্নাহ্ ও হাদীস ইত্যাদি পড়লাম ততবেশী আমার ইসলাম সম্পর্কে পজিটিভ ধারণা হল যে, এটা একটি শান্তিময় পবিত্র ধর্ম। আমার আগে ধর্মীয় শিক্ষা হয়েছিল একজন খ্রিস্টান হিসেবে তাই আমার বিশ্বাস ও মূল্যবোধ অনেকটা ইসলামের সাথে মিলে যায়। তাই আমার জন্য খুব সহজ হয়ে গেল ইসলামকে মেনে নেয়া।
প্রশ্ন: আপনি এমন একটা ইসলাম বিরোধী সংগঠনের সাথে লিপ্ত ছিলেন যারা ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপের সাথে যুক্ত ছিল এবং তারা নাবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর উপর একটা মুভি বানিয়েছিল। কিন্তু এখনতো দেখা যাচ্ছে তারা ইসলামের ব্যাপারে তেমন কিছুই জানে না। তাদের ইসলামের বিরুদ্ধে এই ধরনের মনোভাব কেন?
আরনড: আমি কখনই এগুলোর ব্যাপারে এত বেশী ভাবিনি। কিন্তু অনেকের মতই আমারও ইসলামের ব্যাপারে খুব নেগেটিভ ধারনা ছিল। যেমন তারা মহিলাদেরকে পরাধীন করে রাখে, তারা ওয়েস্টার্ন কমিউনিটির প্রতি আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়ে থাকে। এরকম আরো অনেক কিছু।
প্রশ্ন: ইসলাম গ্রহণ করার পর আপনার সহকর্মীদের আপনার উপর কি রকম প্রতিক্রিয়া হয়েছিল?
আরনড: যিনি আমার পাটির নেতা ছিলেন তার কাছ থেকে আজ পর্যন্ত কোন রকম প্রতিক্রিয়া পাইনি এবং অন্যান্য সহকর্মীরা আমার সাথে যোগাযোগ করতে ভয় পেত কারণ এটা তাদের ক্যারিয়ারের জন্য খারাপ হতে পারে।
প্রশ্ন: আপনি অমুসলিমদের যদি দাওয়াত দেন তা হলে কীভাবে দেন?
আরনড: আমি বলি ইসলামকে জানো, ইসলামের ব্যাপারে খারাপ ধারণাগুলো দূর কর তারপর জানতে পারবে যে ইসলাম কত শান্তিময় ও সুন্দর ধর্ম যার সাথে অনেক উঁচু মানের ইতিহাস রয়েছে। জীবনে টাকার চেয়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার রয়েছে যেগুলো পশ্চিমা সাফল্যের মূল মন্ত্র।
প্রশ্ন: প্রাচ্যে ইসলামের সাধারণ মানে হল জঙ্গি এবং মহিলাদের তারা পরাধীন করে রাখে! এই ব্যাপারে আপনার কী মতামত?
আরনড: এই ধরনের বিচারের পিছনের কারণ হলো ইসলামের ব্যাপারে কম জানা। আমাদের দায়িত্ব তাদেরকে ইসলাম সম্পর্কে জানানো।
ভ্যানের ছেলে ইসকান্দার বাবাকে অনুসরণ করে ইসলাম গ্রহণ করেছে। ইসকান্দার ছাড়াও আরো ৩৭ জন যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে আরনডকে অনুসরণ করে। ইসকান্দার বললেন, আমি দেখলাম আমার বাবা আগের চেয়েও অনেক বেশী শান্তিময় এবং হাসিখুশি হয়েছে ইসলাম গ্রহণের পর। তখনই আমি বুঝতে পারলাম যে এই ধর্মে অবশ্যই ভালো কিছু রয়েছে এবং সেটাই ছিল আমার ইসলামের প্রতি আকৃষ্টের মূল কারণ। তারপর আমি কুরআন পড়া শুরু করলাম এবং ইসলামিক প্রোগ্রামগুলোতে যাওয়া শুরু করলাম এবং ইসলামকে আরো বেশী করে জানতে থাকলাম।
http://www.new-muslims.info/converts/arnoud-van-doorn/
আবদুর রহীম গ্রীণ
আবদুর রহীম গ্রীণ একজন ব্রিটিশ ইংরেজ। আমাদের সবার এই মানুষটা সম্পর্কে জানা প্রয়োজন, আমরা তার জন্য খুবই গর্ব বোধ করি। ইসলাম গ্রহণের পর থেকে তিনি ইসলামের জন্য দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন এবং অনেক বাঁধা-বিপত্তির মধ্য দিয়েও ইসলাম প্রচার করে যাচ্ছেন। আবদুর রহীম গ্রীণের ইসলামে প্রবেশের ঘটনা তার নিজ মুখ থেকেই শুনা যাক।
আমার যখন জন্ম হয় তখন আমার বাবা একজন ব্রিটিশ Empire Administrator ছিলেন। আমার বাবা-মা আমার নাম রেখেছিলেন এ্যানযোনি ভেট সোয়াপ গেলভিন গ্রীন। ভেট সোয়াপ ছিল একটি পলিশ নাম। কারণ আমার মা পোল্যান্ডের ছিলেন। আমার মা যেহেতু একজন পলিশ ছিলেন, তাই সে একজন রোমান ক্যাথলিক ছিলেন এবং সে আমাকে এবং আমার ভাই ড্যানকানকে ক্যাথলিক হিসেবেই বড় করেছিলেন। সেই কারণে আমাদের জন্মের পর আমাদেরকে খুব বিখ্যাত একটা ক্যাথলিক স্কুলে ভর্তি করেছিলেন। সেই স্কুলটি যারা চালাতো এবং যারা শিক্ষক ছিলেন তারা ছিলেন ক্যাথলিক Priest। স্কুলটির নাম ছিল Ample Forth College. এটি একটি ধর্মীয় স্কুল হওয়াতে সেখানে নিয়মিত প্রার্থনা হতো। আমাদের প্রার্থনা শুরু হতো এমন একটা গান দিয়ে যেমন: "Hail Mary mother of God, blessed art thou amongst women and blessed is the fruit of thy womb, Jesus."
এই ছোট বয়সে আমি নিজে নিজেই ভাবতে লাগলাম "কীভাবে ইশ্বরের মা থাকতে পারে"? ইশ্বরের তো কোন শুরু ও শেষ থাকার কথা নয়। কীভাবে ইশ্বরের মা থাকতে পারে? এটাই আমি বসে বসে ভাবতে লাগলাম যে যদি ম্যারী ইশ্বরের মা হয়ে থাকে তবে ম্যারী নিজে তো আরো বড় ইশ্বর, কারণ সে ইশ্বরের মা। এই প্রশ্নগুলো আমার মাথায় ঘুরতে লাগল। যখন আমার বয়স ১৯ বছর তখন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটল। একসময় আমরা বেশ কিছু দিন ছুটি কাটালাম মিশরে। সেখানে একজন মুসলিমের সাথে পরিচয় হয় যিনি ইসলামের বিষয়ে অনেক কথা বলত। আমার অনেক প্রশ্ন ছিল আমার নিজ ধর্ম ক্যাথলিজম সম্পর্কে এবং কিছু প্রশ্ন ছিল সন্দেহজনক। এই প্রশ্নগুলো আমি করতাম ঐ মিশরী লোকটির কাছে। একদিন ৪০ মিনিট তার সাথে তর্ক-বিতর্ক করার পর লোকটি আমাকে কিছু সাধারণ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করল যেমন:
"তুমি কী এটা বিশ্বাস কর যে যীশু ইশ্বর?” আমি বললাম- "হ্যাঁ।” তিনি বললেন- "তুমি কি এটাও বিশ্বাস কর যে যীশুকে ক্রুশের মধ্যে ঝুলিয়ে মারা হয়েছিল?” আমি বললাম "হ্যাঁ”। তিনি বললেন- "তুমি কি বিশ্বাস কর যে ইশ্বর মারা গিয়েছিলেন"? যখন তিনি এই প্রশ্ন করলেন তখন আমার কাছে মনে হল কেউ আমার গায়ে জোরে একটা থাপ্পর দিল। আমি ভাবতে লাগলাম যে কী রকম অস্বাভাবিক পুরো বিষয়টা যে ইশ্বর মারা গেছেন! তখন আমি ঐ লোকটিকে বললাম যে, ইশ্বরকে কেউ মারতে পারে না। তখন আমি বুঝতে পারলাম যে এগুলো বইয়ের কথা যা আমাদেরকে শেখানো হয়েছে, এগুলো যুক্তি সংগত নয়। আমি ভাবতে লাগলাম আমি এই লোকটির সাথে তর্কে হারবো না।
সেই লোকটি আমাকে অনুরোধ করলো কুরআন পড়ে দেখার জন্য। আমি বললাম ঠিক আছে। তাদের ইসলাম ধর্মের ব্যাপারে, নিয়মনীতি এবং তাদের পবিত্র কুরআনের ব্যাপারে আমার আরো জানা উচিত। কারণ কুরআনের মধ্যে এমন কিছু অবশ্যই থাকবে যেটা থেকে আমি প্রেরণা পাবো। তাই আমি এই বিষয়ে খোলা মনে গবেষণা করতে লাগলাম, আমি সত্য খুঁজতে থাকলাম। আমার মধ্যে শুধু কৌতুহল ছিল যে কুরআনে কী বলা হয়েছে? তাই আমি একটা কুরআন নিয়ে পড়তে শুরু করলাম। আর আমি যখন কুরআন পড়া শুরু করলাম তখন নতুন নতুন তথ্য পেতে থাকলাম। তখন থেকে নিয়মিত কুরআন পড়তে থাকি এবং বুঝার চেষ্টা করতে থাকি। আমি ঐ মিশরী লোকটিকে দোকানের মধ্যে প্রায়ই নামায পড়তে দেখতাম। তাই তার দেখাদেখি মাঝে মাঝে আমিও নামায পড়ারও চেষ্টা করতাম।
একদিন আমি একটি বইয়ের দোকানে গেলাম যেটি ছিল একটি মসজিদের সাথে লাগানো। যেখানে মুহাম্মাদ ﷺ এবং নামাযের ব্যাপারে অনেক রকম বই ছিল। আমি এই বইগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলাম যে, বইগুলো খুব সুন্দর এবং তখনই একটা লোক এসে জিজ্ঞেস করল "আপনি কী মুসলিম"? আমি মনে মনে ভাবলাম, "আমি কি মুসলিম"? এই কথাটি দিয়ে লোকটি কী বোঝাতে চাচ্ছেন? আমি ঐ লোকটিকে বললাম- "শুনুন আমি বিশ্বাস করি যে, একটাই ইশ্বর আছেন যিনি হলেন আল্লাহ এবং মুহাম্মাদ ﷺ ছিলেন তার রসূল।” “তিনি তখনই বললেন আপনি আসলে একজন মুসলিম” আমি তাকে বললাম- “ও আচ্ছা ধন্যবাদ"। তারপর তিনি বললেন- "নামাযের সময় প্রায়ই হয়ে গেছে। আপনি কী আমাদের সাথে নামায পড়বেন?” সেদিন ছিল শুক্রবার আর মসজিদটা ছিল পুরোপুরি মানুষে ভরপুর। কিন্তু আমি তো জুমআর ব্যাপারে ঠিক জানতাম না। তাই আমি খুব Confused হয়ে গেলাম। আমি দেখলাম সবাই নামায পড়ছে। আমিও তাদের সাথে সাথে নামায পড়লাম। নামায শেষে অনেকেই আমাকে ঘিরে দাঁড়ালো পাঁচ মিনিট ইসলাম শিখানোর জন্য। কারণ আমি সত্যি কথাটা জানতাম কিন্তু আমি সত্যিটা অনুসরণ করছিলাম না।
আসলে সেটাই সবচেয়ে খারাপ অবস্থা একটা মানুষের জন্য যে সত্যটা জানার পরও ভুল পথ অনুসরণ করে। আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম এবং আমি সবাইকে বলতাম আমি মুসলিম কিন্তু মানুষ আমাকে সিরিয়াসলি নিত না। কারণ আমি পার্টিতে যেতাম মদ খেতাম এবং মানুষকে ইসলামের ব্যাপারে বলতাম। যেই জিনিসটা আমাকে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন করল তা হচ্ছে আমি দিনে ৫ ওয়াক্ত নামায পড়া শুরু করলাম, আমি শপথ নিলাম আল্লাহর কাছে, যাই কিছুই হোক আমি ৫ ওয়াক্ত নামায পড়ব। এটাই ছিল আমার জীবনের পরিবর্তনের পেছনের সবচেয়ে বড় কারণ। আলহামদুলিল্লাহ।
আবদুর রহীম গ্রীণ মনে করেছিলেন তার বাবা কোন দিন ইসলাম গ্রহণ করবেন না। কিন্তু মহান আল্লাহর ইচ্ছা তিনি তার মৃত্যুর দশদিন আগে ইসলাম গ্রহণ করেন। আবদুর রহীম গ্রীণ বর্তমানে একজন বড় মাপের ইসলামিক স্কলার। আবদুর রহীম গ্রীণ ইংল্যান্ডে একটি অর্গানাইজেশন প্রতিষ্ঠা করেছেন যার নাম IERA – Islamic Education and Research Academy। এই অর্গানাইজেশনের দাওয়াতী কাজের মাধ্যমে ইউরোপ, আমেরিকা এবং ক্যানাডায় প্রতি দিন শতশত অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করছে। আল্লাহু আকবার। আবদুর রহীম গ্রীণ-এর কার্যক্রম সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানার জন্য তার ফেইসবুক দেখা যেতে পারে।
https://www.facebook.com/AbdurraheemGreen/
ইসলাম ধর্ম থেকে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ এবং আবার খৃষ্টান ধর্ম থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ
নাম স্টিভ রকওয়েল, ক্যানাডিয়ান নাগরিক। এই ঘটনাটি অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এই ঘটনায় মুসলিম থেকে খৃষ্টান, আবার খৃষ্টান থেকে মুসলিম। স্টিভ রকওয়েলের পূর্ব পুরুষ ছিলেন মুসলিম। সেই সূত্রে তিনিও ছিলেন মুসলিম। হয়তো পারিবারিক অবহেলা, মুসলিম সোসাইটির অবহেলা ও বর্তমান বিশ্বের মুসলিমদের চারিত্রিক দুর্বলতা ইত্যাদির নানা কারণে এক সময় মুসলিমদের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন, ইসলাম থেকে দূরে সরে যান। খৃষ্টানিটি সম্পর্কে জানতে থাকেন এবং খৃষ্টান মিশনারির দাওয়াত পেয়ে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেন এবং এই ধর্ম পালন করতে করতে একসময় খুব ভাল খৃষ্টান আলেম হয়ে যান। এরপর দীর্ঘদিন চার্চের পাদ্রীর ভূমিকায় দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। তিনি খুবই ভাল বক্তা। বিশেষ করে চার্চের পাদ্রিরা খুব ভাল বক্তা হন।
ইসলামের জন্য ত্যাগ : হিদায়াত দেয়ার মালিক আল্লাহ। তিনি স্টিভ রকওয়েলকে দিয়ে ইসলামের খিদমত করাবেন বলে তাকে হিদায়াত দিলেন। স্টিভ রকওয়েল ইসলামের দাওয়াত পেলেন এবং আবার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন। স্টিভ রকওয়েলের ইসলামের জন্য ত্যাগ অপরিসীম। আমি আমির জামান যে মসজিদে জুম্মার সলাত আদায় করি সেই মসজিদের তিনি ইমাম। মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ রকওয়েল নিজে যা টরন্টো শহরের হার্ট অফ দ্যা সিটিতে অবস্থিত। সেই এলাকা কমার্শিয়াল প্লেস হিসেবে পরিচিত (ডানডাস স্কোয়ার)। তিনি যেই জায়গায় মসজিদ করেছেন সেই জায়গার দাম স্বর্ণের দামের চেয়েও বেশী মূল্যবান। এই মসজিদ তিনি নিজের খরচেই পরিচালিত করে থাকেন।
জুম্মার খতিব : আলহামদুলিল্লাহ, প্রতি জুম্মায়ই তিনি বিশ্বের সমসাময়িক পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে খুতবাহ দেন। তিনি কাউকে ভয় করে কথা বলেন না। তিনি খুব স্পষ্টভাষী এবং কাস্টমাইজ করে কোন খুতবাহ দেন না। এই মসজিদে দু'টি জুম্মা হয়। (আমেরিকা-ক্যানাডার প্রায় সব মসজিদেই এক ঘন্টার ব্যবধানে দু'টি জুম্মা হয়)। এই মসজিদের এক পাশে রায়ারসন ইউনিভার্সিটি। প্রথম জুম্মার খুতবা দেন সাধারণত রায়ারসন ইউনিভার্সিটি প্রফেসরগণ এবং দ্বিতীয় খুতবা দেন স্টিভ রকওয়েল। জুম্মার মুসল্লিদের মধ্যে হয়তো অর্ধেকই রায়ারসন ইউনিভার্সিটির মুসলিম ছেলেমেয়েরা।
ইসলামের দাওয়াতী কাজ : ইসলামের দাওয়াতী কাজের জন্য তার ত্যাগ অসাধারণ। তার মসজিদের নিকটেই টরন্টোর বিখ্যাত শপিংমল ইটন সেন্টার। এই শপিংমলের সামনে আমাদের একটি টিম প্রতি শনি ও রবিবারে টেবিল নিয়ে বসে এবং পথচারীদের মধ্যে হাজার হাজার দাওয়াতী মেটারয়াল বিতরণ করে থাকেন। অনেকেই অন দ্যা স্পটে ইসলাম গ্রহণ করেন। যাহোক, স্টিভ রকওয়েল এই দাওয়াতী কাজের জন্য নানা রকম সহযোগীতা করে থাকেন। মাঝে মাঝে তিনি রায়ারসন ইউনিভার্সিটির অমুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের দাওয়াত দেন জুম্মার খুতবা শুনার জন্য। মসজিদের ভিতরে শেষের দিকে এক সারি চেয়ার দেয়া হয় তাদের বসার জন্য। আলহামদুলিল্লাহ অনেকেই হিদায়াত পায় এই খুতবা শুনে।
টিভি শো : তিনি প্রতি শনিবার ভিশন টিভিতে Call to the Minarat নামে একটি টিভি শো পরিচালনা করে থাকেন। এই টিভি শোটি মূলতঃ Comparative Religion-এর উপরে। এই অনুষ্ঠান দেখে নিয়মিত প্রচুর অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করে থাকে। আলহামদুলিল্লাহ এই টিভি চ্যানেলের খরচও তিনি নিজেই জুগিয়ে থাকেন।
নাম কেন স্টিভ রকওয়েল? তিনি তার নাম কেন পরিবর্তন করেননি এই নিয়ে মাঝে মাঝে প্রশ্নের সম্মুখিন হন। একবার এক বাংলাদেশী কমিউনিটি প্রোগ্রামে গেষ্ট স্পিকার হিসেবে এসেছিলেন। ঐ একই প্রশ্ন বাংলাদেশীদের মধ্য থেকে একজন তাকে করেছিলেন। তার প্রশ্নের উত্তরে তিনি প্রশ্নকর্তাকে জিজ্ঞেস করলেন 'আপনার নাম কি?' প্রশ্নকর্তা বললেন 'জামাল হোসেন'। এবার স্টিভ রকওয়েল বলছেন আপনি জামাল হোসেন নাম নিয়ে যতোটা না অমুসলিমদের নিকট দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে যেতে পারেন আমি স্টিভ রকওয়েল নাম নিয়ে তার চেয়ে অনেক বেশী দ্বীন ইসলামের দাওয়াত নিয়ে অমুসলিমদের নিকট যেতে পারি। আমার এই নামের জন্য অমুসলিমরা আগ্রহ করে আমার কথা শুনে থাকে। কথাটি সত্যি, নর্থ আমেরিকা বা ইউরোপে যারাই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন তাদের বেশীরভাগই তাদের পূর্বের নামের কিছু অংশ নতুন নামের সাথে রেখে দিয়েছেন এতে দাওয়াতী কাজ করতে সুবিধা হয়। একজন অমুসলিম তখন চিন্তা করেন যে এই লোক তো আমার মতোই অমুসলিম ছিল। যেমন : ইউসুফ স্টেস, আব্দুর রহিম গ্রীন, ইউসুফ চেম্বারস, আব্দুল মালেক ক্লেয়ার, বিলাল ফিলিপস, আব্দুল্লাহ হাকীম কুইক প্রমুখ।
https://www.youtube.com/watch?v=KjODAaF-XFE
ইসলাম সম্পর্কে পৃথিবীর বিখ্যাত অমুসলিম ব্যক্তিগণের মন্তব্য
Former U.S Attorney General Ramsey Clark: Islam is the best chance the poor of the planet have for any hope of decency in their lives. It is the one revolutionary froce that cares about humanity. (1998)
U.S Supereme Court Justice Anthony Kennedy: Muslims are decent, brilliant, and talented with a great civilization and traditions of their own, inlcuding legal traditions. American know nothing about them.
Napoleon Bonaparte: I hope the time is not far off when I shall be able to unite all the wise and educated people and establish a uniform regime based on the principles of Quran which is true.
Sir George Bernard Shaw: I have always held the religion of Muhammad in high estimation because of its wonderful vitality.
H.G. Wells: The Islamic teachings have left great traditions for equitable and gentle dealings and behaviour, and inspire people with nobility and tolerance.
Sarojini Naidu: It was the first religion that preached and practiced democracy;
A. S. Tritton: The picture of the Muslim soldier advancing with a sword in one hand and the Qur'an in the other is quite false.
Gibbon: The good sense of Muhammad despised the pomp of royalty.
Edward Gibbon and Simon Oakley: The greatest success of Mohammad's life was affected by sheer moral force.
Edward Montet: Islam is a religion that is essentially rationalistic in the widest sense of this term considered etymologically and historically.
Michael Hart: My choice of Muhammad who was the only man in history who was supremely successful on both the secular and religious level.
Carly Fiorina, Ex-CEO of Hewlett-Packard: The technology industry would not exist without the contribution of Arab mathematicians.
Mahatma Gandhi: I became more than ever convinced that it was not the sword that won a place for Islam in those days in the scheme of life.
📄 অভিভাবকগণ খেয়াল করি
যে সকল পিতা-মাতাদের সন্তান বড় হয়ে গেছে অর্থাৎ ইউনিভার্সিটি পাশ করে গেছে অথবা বিয়ে-স্বাদী হয়ে গেছে তারা মনে করেন যে, বিষয়টি আমাদের না। আমাদের সন্তানতো বড় হয়েই গেছে, তারা তো পড়াশোনা শেষ করে প্রফেশনাল হয়ে গেছে। আমি এখন আল্লাহ-বিল্লাহ করে বাকী জীবনটা কাটিয়ে দিব। আমরা কি কখনো গভীরভাবে চিন্তা করে দেখেছি যে আমার ইউনিভার্সিটি পাশ করা প্রফেশনাল ছেলে বা মেয়ে কি প্রকৃত মুসলিম হয়েছে? তারা কি পরিপূর্ণভাবে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবন-যাপন করছে? তাদেরকে প্রকৃত মুসলিম হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আমার কি কোন অবদান আছে?
শিশু, বালক, যুবক, বৃদ্ধ সকলের মন এক চলমান মেশিন। এ মেশিন সর্বদা সচেতন ও অবচেতনমনে ইনপুট (Input) গ্রহণ করছে। সে ইনপুট প্রসেস (Process) হয়ে আউটপুট (Output) বেরোয় মানুষের কর্ম ও দৃষ্টিভঙ্গীর মাধ্যমে। ফলে কেউ হয় দানশীল, কেউ উদ্ধত, কেউ হয় আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা আবার কেউ হয় বিপথগামী। আমার শিশু কোন না কোন কিছু শিখছে। প্রতিদিন সে নিত্য নূতন কায়দা রপ্ত করছে। এটা ভাবা যাবে না যে আমরা যদি কিছু না শেখাই তাহলে কোথা হতে সে শিখবে? আসলে এই ধারণাটা ভুল। আশেপাশের পরিবেশ, টিভি, রেডিও, স্কুল-কলেজ, ইন্টারনেট, পত্র-পত্রিকা, আমার আচরণ, আমার স্ত্রীর আচরণ সবকিছু হতে প্রতিনিয়ত সে ইনপুট সংগ্রহ করছে।
সুতরাং আমি কি সতর্ক হবো না? আমি কি চাই না যে আমার শিশুর মনে ভাল উপাদানগুলি বেশী করে ঢুকুক? আমি কি চাই না যে আমার শিশু একজন ভাল একাডেমিক হওয়ার পাশাপাশি একজন ভাল মুসলিম হোক? আমি কি চাই না যে সে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হয়ে পিতামাতার মুখ উজ্জ্বল করার পাশাপাশি কুরআন-হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে দ্বীনের উপর অনর্গল বক্তৃতা দিয়ে অমুসলিমদের হিদায়াতের নূর দেখাক?
আসুন চোখ বন্ধ করে খানিক চিন্তা করি। হলিউড বলিউড বা এর অন্ধ অনুসারী অন্য টিভি চ্যানেলগুলি প্রতিনিয়ত মুভি আর বিচিত্র অনুষ্ঠান চালিয়ে যাচ্ছে। বলিউডের প্রভাব এখন প্রযুক্তির আশীর্বাদে সর্বত্রই দৃঢ়ভাবে প্রসারিত। আমি এবং আমার সন্তানেরা প্রতিনিয়তই এগুলি হতে মনের খোরাক নিচ্ছি। শিশুরা অনুকরণ প্রিয় হবার কারণে এসব বিনোদনের মৌলিক বিষয়গুলির সাথে খুব সহজে পরিচিত হয়ে যাচ্ছে। এভাবেই তদের মননশীলতার উপর ঐসব উপাদানগুলির স্থায়ী প্রভাব পড়ছে। আসুন এবার চিন্তা করি এসব অখাদ্য কুখাদ্যের (অপসংস্কৃতির) বিপরীতে আমি নিজে ও আমার সন্তানরা কী ইনপুট নিচ্ছি? খোদ হলিউডের জন্মস্থান হতেই এখন এর কুরুচি আর বিকৃত সংস্কৃতির বিরুদ্ধে শ্লোগান উঠেছে। এর বদৌলতে ছেলেমেয়েরা বইয়ের চাইতে বন্দুকের প্রতি বেশী আগ্রহী হয়ে উঠেছে। ড্রাগ, ভায়োলেন্স, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধার অভাব, পারিবারিক বন্ধন শিথিল হওয়া ইত্যাদির অবদানে বলিউড সংস্কৃতি বেশ নাম করেছে।
বলিউড সংস্কৃতি আজ এমন এক টর্নেডোর নাম যা সারা বিশ্বের আনাচে কানাচে লজ্জা শরমের অবশিষ্টাংশটুকুও ধুয়ে মুছে পরিস্কার করে ফেলতে চায়। এক আমেরিকান আইডলই দুনিয়া কাঁপানোর জন্য যথেষ্ট। নিজেকে এবং আমার পরিবারকে এগুলি হতে বিরত রাখার দায়িত্ব আমারই। এটি আমার জ্ঞান ও বিশ্বাসের গভীরতার উপর নির্ভর করে। তবে সন্তানের চরিত্র গঠনে একটি ভারসাম্যপূর্ণ স্ট্রাটেজীর অংশ হিসেবে হলিউড-বলিউডের কুখাদ্যের পাশাপাশি যদি কিছু পুষ্টিকর ভালো খাবার সরবরাহ না করা হয় তাহলে এ সন্তানটি যে কি হবে তা এখন হয়তো আমরা বুঝবো না কিন্তু ভবিষ্যতে যখন বুঝবো তখন আর আমাদের করার কিছু থাকবে না। তখন চিন্তা করে বা চেষ্টা করেও কোন কুলকিনারা করা যাবে না। কারণ আমার শিশু তখন বড় হয়ে যুবক হয়ে গেছে। তার নিজস্ব মূল্যবোধ তৈরী হয়ে গেছে। এখন তার নতুন তাগুতি বিশ্বাস (conviction) ও মূল্যবোধের দাওয়াতী কাজের প্রথম টার্গেট হবো আমি নিজে ও আমারা স্বামী/স্ত্রী। আমরা কবরে বসে তাদের কাছ থেকে কোন দু'আ পাবোনা।
হাইস্কুল পাস মেয়েরা আজকাল নিজেরাই একটা আদর্শ তৈরী করে নেয়। সেটি হতে পারে Rock n Roll এর আদর্শ, কিংবা আমেরিকান আইডলের আদর্শ, কিংবা ইন্ডিয়ান কোন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী গায়ক বা গায়িকার আদর্শ। শুধু তাই নয়, এর বাইরে সব কিছুকে তারা সেকেলে বা নিম্নস্তরের জিনিস বলে মনে করে। শুধু নিজেরা এই আদর্শ অনুসরণ করেই ক্ষান্ত হয়না, অন্যদেরকেও সে আদর্শের অনুসারী বানানোর চেষ্টা করে।
আমরা পিতামাতারা জেগে উঠি, সময় দ্রুত বয়ে যাচ্ছে, সঠিক ইসলামী শিক্ষায় নিজেদের ও সন্তানদের দীক্ষিত করার এটাই প্রকৃষ্ট সময়। আর অবহেলা না করি।