📘 মুসলিম পরিবারের ছেলেমেয়েরা কেন ইসলাম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে > 📄 মাযহাব সংক্রান্ত জটিলতা

📄 মাযহাব সংক্রান্ত জটিলতা


ইসলাম পালনে মাসালা-মাসায়েলের বিষয়ে কোন কোন ক্ষেত্রে দেখা যায় ভিন্নতা। বিশেষ করে সলাত, যাকাত, সিয়াম, হাজ্জ ইত্যাদি পালনে প্রধান চার ইমামের মাযহাবে ভিন্ন ভিন্ন মত দেখা যায়। এখন একজন মুসলিম হিসেবে আমি কার মাযহাব অনুসরণ করবো? এটি একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন। রসূল নিজে কোন মাযহাবকে অনুসরণ করেছিলেন? বা চার খলিফাসহ সকল সাহাবীরাইবা কোন মাযহাবকে অনুসরণ করেছিলেন? আমরা মাযহাব অনুসরণ করলেও তার কতোটুকুইবা অনুসরণ করবো?
আমরা যারা নিজেকে হানাফী বা অন্য কোন মাযহাবের অনুসারী বলে দাবী করি তারা কি সেই মাযহাব সম্পর্কে একটু পড়াশোনা করেছি যে কেন আমি এই মাযহাব অনুসরণ করি? নাকি অন্যের দেখাদেখি অনুসরণ করে যাচ্ছি?
মাযহাব মানা কি ফরয? আমরা কি মাযহাব মানতে বাধ্য? অনেকে বলেন কোন একটি নির্দিষ্ট মাযহাবকে অবশ্যই মানতে হবে অর্থাৎ মাযহাব মানা ফরয। এবং চার মাযহাবের মধ্যে কোন প্রকার সংমিশ্রণ করা যাবে না! যেমন হানাফী মাযহাবের কিছু নিয়ম-কানুন এবং শাফী মাযহাবের কিছু নিয়ম-কানুন একই সাথে অনুসরণ করা যাবে না! এই দির্দেশ কি নাবী মুহাম্মাদ দিয়েছেন? আমরা মাযহাব মানতে অবশ্যই বাধ্য নই। কোন মাযহাবের ঐ বিষয়টুকু শুধু মানবো যেটুকু সহীহ হাদীসভিত্তিক। যা সহীহ হাদীসভিত্তিক নয় তা অবশ্যই মানা যাবে না। এটি রসূল -এর আদেশ। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেন,
"আল্লাহ ও তাঁর রসূল যখন কোন কাজের নির্দেশ প্রদান করেন তখন কোন ঈমানদার पुरुष ও ঈমানদার নারীর ঐ নির্দেশের ব্যতিক্রম করার কোন অধিকার থাকে না; আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের কথা অমান্য করল, সে স্পষ্টতই পথভ্রষ্ট হয়ে গেল।" (সূরা আহযাব: ৩৬)
যদি বলা হয় কোন একটি মাযহাব মানা ফরয তাহলে জানতে হবে যে এই ফরয হুকুমটি কার থেকে এসেছে। কারণ ইসলামের সমস্ত ফরয হুকুম এসেছে ওহীর মাধ্যমে নাবী মুহাম্মাদ -এর মাধ্যমে মহান আল্লাহর কাছ থেকে। কোন আলেম বা কোন হুজুর ইসলামের কোন বিষয় ফরয বা নফল করতে পারবে না, আর কেউ যদি তা করে থাকে তাহলে বুঝতে হবে যে সে মহান আল্লাহ তা'আলা ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছে। (নাউযুবিল্লাহ)
আর মাযহাব মানা যদি ফরয হতো বা সুন্নাহ হতো তাহলেও তার দলিল কুরআনের কোন আয়াতে থাকতো। কুরআনে না থাকলেও সহীহ হাদীসগ্রন্থগুলোতে থাকতো। কোন সহীহ হাদীসগ্রন্থে না থাকলেও হয়তো দুর্বল হাদীসে থাকতো। কিন্তু কুরআন-হাদীস তো দূরের কথা মাযহাব ফরয হওয়ার বিষয়ে একটি জাল হাদীসও নেই। তাই “মাযহাব মানা ফরয” এই প্রচার বা নির্দেশ মুসলিম সমাজে কীভাবে এলো তা চিন্তা করার বিষয়। মাযহাব আল্লাহর রসূল -এর মৃত্যুর চারশত বছর পরে এসেছে। এই চারশত বছর পর কে এই ফরয হুকুম নিয়ে এলো? কার কাছে ওহী এলো?
মাযহাব কী? মাযহাব অর্থ মত ও পথ। সারা পৃথিবীতে ছড়ানো সুন্নী মুসলিমদের প্রধানত চারটি মত ও পথ। সুন্নীদের ফিকহ (Figh or Jurisprudence) এর বিখ্যাত চার ইমামের নামানুসারে আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে বিভক্ত চারটি মত ও পথের অনুসারীগণ - যেমন : হানাফী, মালিকি, শাফেঈ এবং হাম্বালী মাযহাব। প্রচলিত চার মাযহাবের অস্তিত্ব রসূলুল্লাহ এর যমানায় ছিল না, এগুলোর সৃষ্টি হয়েছে তাঁর মৃত্যুর চারশত বছর পর।
ব্যাপক অর্থে মাযহাব হচ্ছে আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে কতিপয় মাসয়ালা- মাসায়েলের ব্যাপারে ওলামাদের মতামত, অনুধাবন ও গবেষণালব্ধ জ্ঞান। আল্লাহ ও তাঁর রসূল এই জ্ঞান, গবেষণা এবং মতামতের অনুসরণ করা কারো উপর অপরিহার্য করেননি। কেননা মতামতের মধ্যে শুদ্ধ-অশুদ্ধ উভয় সম্ভাবনা বিদ্যমান। তবে মাযহাবসমূহের যে সব বিষয় কুরআন-সহীহ হাদীসের ওপর নির্ভরশীল শুধু সেগুলোই অনুসরণ করা ওয়াজিব। আর যেগুলো কুরআন- হাদীসের বাণী দ্বারা সমর্থিত নয়, সেগুলো মতামত ও ইজতিহাদের বিষয়; এতে শুদ্ধ এবং অশুদ্ধ উভয় সম্ভাবনা রয়েছে। যে সকল মত ও পথ কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা মোটেও সমর্থিত নয়, এগুলো ইসলাম ধর্মে নূতন সৃষ্টি। মাযহাব মেনে চলা ফরয, ওয়াজিব, সুন্নত, নফল বা মুবাহ কোনটাই নয়। কারণ ফরয ও ওয়াজিব নির্ধারণ করতে পারেন একমাত্র মহান আল্লাহ তা'আলা এবং তাঁর রসূল।
জেনে রাখা ভালো যে মুসলিমদের জন্যে একটি মাত্র মাযহাব আল্লাহ অনুমোদন করেছেন তাদেরকে বিভ্রান্তি থেকে বাঁচানোর জন্যে, এবং সেই মাযহাব হচ্ছে কুরআন ও সহীহ হাদীসে বর্ণিত রসূলুল্লাহ -এর মাযহাব (মাযহাব মুহাম্মাদী), যা তিনি তাঁর জীবিতকালে তাঁর সাহাবীগণসহ, এবং তৎপর তাঁর চার খলিফা, তাবিঈন, তাবি-তাবিঈনগণ অনুসরণ করে গেছেন। মুসলিমদের মাঝে ভিন্ন ভিন্ন দল ও মত সৃষ্টি করা আল্লাহ নিষেধ করেছেন (সূরা আল আরাফ ৬ঃ ১৫৯; সূরা আলে ইমরান ৩: ১০৩)
যখন একজন অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তিনি কোন মাযহাব অনুসরণ করবেন?
আমরা যারা আমেরিকা, ক্যানাডা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়াতে থাকি তারা বিষয়টি অনুধাবন করে থাকি। এখানে নিয়মিত অমুসলিমরা ইসলাম গ্রহণ করছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যখন একজন অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তিনি কোন মাযহাব অনুসরণ করবেন? যারা হানাফী মাযহাব অনুসরণ করেন তারা হয়তো বলবেন সে হানাফী মাযহাব অনুসারে ইসলামের নিয়ম-কানুন মেনে চলবে। একইভাবে যারা মালিকী মাযহাব অনুসরণ করেন তারা হয়তো বলবেন সে মালিকী মাযহাব অনুসারে ইসলামের নিয়ম-কানুন মেনে চলবে। এখন ঐ নওমুসলিম বেচারা কোন দিকে যাবেন? একে তো সে নতুন মুসলিম এবং ইসলাম গ্রহণ করার পর ইসলামকে জানার জন্য পড়াশোনা শুরু করবেন তখন আবার দেখবেন ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ করে সলাত আদায়ের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন মাযহাবে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম, আবার আল্লাহর রসূল -এর সহীহ হাদীসে রয়েছে ভিন্ন নিয়ম! একেতো নিজের ধর্ম ত্যাগ করার কারণে পরিবার এবং পরিবেশ থেকে পাচ্ছেন নানা রকম অবহেলা, তার উপর ভিন্ন ভিন্ন মাযহাবের নিয়ম-কানুন নিয়ে ইসলামে টিকে থাকাটাই হবে তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
আমার সন্তান কোন্ মাযহাব অনুসরণ করবে?
এই সমস্যাটি বাংলাদেশে নেই বললেই চলে। কারণ বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলিম হানাফী মাযহাবের অনুসারী। আমরাও যেমন ছোটবেলা থেকে একটি মাযহাবই দেখে এসেছি তাই আমাদের মাঝেও এই প্রশ্নের উদয় হয় নাই। আমরা ইসলাম মানেই জেনেছি হানাফী মাযহাব। কিন্তু আমরা যারা প্রবাসে বসবাস করি আমাদের সন্তানেরা বড় হচ্ছে মাল্টিন্যাশনাল পরিবেশে। এই দেশে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মুসলিমরা বসবাস করে। আমাদের সন্তানরা স্কুল, কলেজ, মসজিদ বা প্রতিবেশী মুসলিমদের সম্মুখে বিভিন্ন মাযহাবের সম্মুখীন হয়। এই কচি বয়সে সে নিজের কাছে মাযহাব নিয়ে কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়! কোনটি সঠিক? বা কোনটি পালন করবো? শিক্ষক বলছেন একটা, আবার বাবামা বলছেন অরেকটা। বিরাট সমস্যা বটে!
বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। এই সমস্যায় আমরা ভুগছি গত পাঁচ বছর যাবত। আমাদের মেয়ের বয়স ১০ বছর। সে গত পাঁচ বছর যাবত বাংলাদেশী মাদ্রাসা শিক্ষিত একজন শিক্ষিকার নিকট আরবী পড়ে। পড়া শেষে প্রতিদিন শিক্ষিকা ছাত্রীদেরকে কিছু কিছু করে মাসলা-মাসায়েল শিক্ষা দিয়ে থাকেন। মাসলা-মাসায়েল যেহেতু মাযহাবের বিষয়, সেটা আসবেই। শিক্ষিকা ছাত্রীদেরকে শিক্ষা দিচ্ছেন যে, ইসলামে মাযহাব হচ্ছে চারটি। আমরা হচ্ছি হানাফী মাযহাবের অনুসারী, আর একটি মাযহাব মানা প্রতিটি মুসলিমের জন্য ফরয। এখন আমাদের মেয়ে বাসায় এসে আমাদেরকে প্রশ্ন করছেন যে, "তোমরা কোন মাযহাবের"? এখন আমার এই কচি সন্তানকে কী উত্তর দেবো? আমরা যদি বলি আমরা শাফী মাযহাবের, তাহলে তার সাথে সংঘাত হবে! আবার যদি বলি আমরা কোন নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরণ করিনা আমরা সরাসরি কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করি, তাহলে তার শিক্ষিকার সাথে সংঘাত হবে। আর শিক্ষিকা যদি এই খবর জানতে পারেন তাহলে হয়তো আমাদের সন্তানের সাথে ভাল আচরণ করবেন না! তাই আমাদের সন্তানদের জন্য বিষয়টি খুবই জটিল, আমাদের জন্যও জটিল!
মাযহাব নিয়ে মুসলিমদের মাঝে ভ্রাতৃত্ববোধ নষ্ট করা ঠিক না
মাযহাবের অনেক বিষয়ই সুন্নাহ। এই কাজগুলো আল্লাহর রসূল করেছেন। আমরা যদি এগুলো করি তাহলে রসূল -কে অনুসরণ করা হবে এবং ইবাদতের কোয়ালিটি (গ্রহণযোগ্যতা) বাড়বে। আর না করলে ইবাদত কোয়ালিটি সম্পন্ন হবে না এবং রসূল -কেও অনুসরণ করা হবে না। তবে সহীহ সাব্যস্ত হওয়া সত্ত্বেও কোন সুন্নাহকে অবজ্ঞা করা কিংবা ঘৃনা করা অবশ্যই গুনাহের কাজ।
তাই এই বিষয়গুলো নিয়ে দুই পক্ষেরই বাড়াবাড়ি করা মোটেও ঠিক নয়। তবে আমরা এতো কষ্ট করে ইবাদাত-বন্দেগী করছি তা সঠিকটা যাচাই-বাছাই করে নেয়া উচিত। আমরা বাজারে যখন কোন একটি জিনিস কিনতে যাই তখন কিন্তু ১০ দোকান ঘুরে যাচাই-বাছাই করে ভাল জিনিসটাই কিনি। তাই ইবাদাতের ক্ষেত্রে কেন যাচাই-বাছাই করে নেবো না? কেন অন্ধভাবে ওমুক হুজুর করে বলে আমিও করবো? আজকাল টেকনোলজির যুগ, যাচাই-বাছাই করা খুব কঠিন কাজ নয়। তবে অন্ধভাবে ইসলাম মনে করে কোন কাজ (ইবাদত) করার ভয়াবহ পরিনাম হচ্ছে 'বিদ'আত'। যা আল্লাহর রসূল করেন নাই তা ইবাদাতের অংশ মনে করে করলেই সেটা হবে সুস্পষ্ট বিদ'আত।
মাযহাব নিয়ে দুই দলে ঝগড়া মোটেও ঠিক নয়
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে হানাফী মাযহাবের ভাইয়েরা অন্যদেরকে খারাপ দৃষ্টিতে দেখেন। 'লা-মাযহাব' তাদের কাছে ভদ্র ভাষায় একটা গালি। কোথাও কোথাও তা শত্রুতায়ও পরিণত হয়েছে। রসূল -এর সহীহ নিয়মে সলাতের কথা উঠলে কেউ কেউ ক্ষেপে উঠেন, উচ্চস্বরে কথা কাটাকাটি করেন, এমনকি ঝগড়াও বাঁধিয়ে দেন। আমরা যখন দেশে বেড়াতে গিয়েছিলাম তখন আমাদের এক আত্মীয় আমাদেরকে রফউল ইয়াদাইন করতে দেখে এবং জোরে আমীন বলতে শুনে বললেন, 'এই ধরণের কাজ তাদের গ্রামে জোলারা করে'। জোলা হচ্ছে নীচু শ্রেণীর লোক। অথচ নিয়মটি রসূল -এর। রসূল -এর সলাতের সঠিক নিয়মগুলো আমাদের দেশে না জানার কারণে এবং প্রচলিত না থাকার কারণে তা হয়েছে আজ ঘৃণার কাজ। রসূল -এর নিয়মে সলাত আদায় করলে অনেকে হেয় দৃষ্টিতে দেখেন!
মু'মিনগণ পরস্পর ভাই ভাইঃ মহান আল্লাহ আল কুরআনে বলেনঃ
"মু'মিনগণ পরস্পর ভাই ভাই, সুতরাং তোমরা ভাইদের মাঝে শান্তি স্থাপন কর, আর আল্লাহকে ভয় কর যাতে তোমরা রহমত লাভ করতে পার।” (সুরা হুজুরাতঃ১০)
"হে মু'মিনগণ! কোন পুরুষ যেন অপর কোন পুরুষকে উপহাস না করে; কেন না, যাকে উপহাস করা হয় সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোন মহিলা অপর কোন মহিলাকেও যেন উপহাস না করে; কেননা যাকে উপহাস করা হয় সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং তোমরা একে অপরকে মন্দ নামে ডেক না; ঈমানের পর মন্দ নামে ডাকা গর্হিত কাজ। যারা তাওবা করেনা তারাই যালিম।” (সূরা হুজুরাত: ১১)
"তোমরা নিজেদের মাঝে বিবাদ করবে না, করলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে [মনের দৃঢ়তা হারাবে]। তোমরা ধৈয্যধারণ করবে, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সংগে রয়েছেন।" (সূরা আনফালঃ ৪৬)

ইসলাম পালনে মাসালা-মাসায়েলের বিষয়ে কোন কোন ক্ষেত্রে দেখা যায় ভিন্নতা। বিশেষ করে সলাত, যাকাত, সিয়াম, হাজ্জ ইত্যাদি পালনে প্রধান চার ইমামের মাযহাবে ভিন্ন ভিন্ন মত দেখা যায়। এখন একজন মুসলিম হিসেবে আমি কার মাযহাব অনুসরণ করবো? এটি একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন। রসূল নিজে কোন মাযহাবকে অনুসরণ করেছিলেন? বা চার খলিফাসহ সকল সাহাবীরাইবা কোন মাযহাবকে অনুসরণ করেছিলেন? আমরা মাযহাব অনুসরণ করলেও তার কতোটুকুইবা অনুসরণ করবো?
আমরা যারা নিজেকে হানাফী বা অন্য কোন মাযহাবের অনুসারী বলে দাবী করি তারা কি সেই মাযহাব সম্পর্কে একটু পড়াশোনা করেছি যে কেন আমি এই মাযহাব অনুসরণ করি? নাকি অন্যের দেখাদেখি অনুসরণ করে যাচ্ছি?
মাযহাব মানা কি ফরয? আমরা কি মাযহাব মানতে বাধ্য? অনেকে বলেন কোন একটি নির্দিষ্ট মাযহাবকে অবশ্যই মানতে হবে অর্থাৎ মাযহাব মানা ফরয। এবং চার মাযহাবের মধ্যে কোন প্রকার সংমিশ্রণ করা যাবে না! যেমন হানাফী মাযহাবের কিছু নিয়ম-কানুন এবং শাফী মাযহাবের কিছু নিয়ম-কানুন একই সাথে অনুসরণ করা যাবে না! এই দির্দেশ কি নাবী মুহাম্মাদ দিয়েছেন? আমরা মাযহাব মানতে অবশ্যই বাধ্য নই। কোন মাযহাবের ঐ বিষয়টুকু শুধু মানবো যেটুকু সহীহ হাদীসভিত্তিক। যা সহীহ হাদীসভিত্তিক নয় তা অবশ্যই মানা যাবে না। এটি রসূল -এর আদেশ। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেন,
"আল্লাহ ও তাঁর রসূল যখন কোন কাজের নির্দেশ প্রদান করেন তখন কোন ঈমানদার पुरुष ও ঈমানদার নারীর ঐ নির্দেশের ব্যতিক্রম করার কোন অধিকার থাকে না; আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের কথা অমান্য করল, সে স্পষ্টতই পথভ্রষ্ট হয়ে গেল।" (সূরা আহযাব: ৩৬)
যদি বলা হয় কোন একটি মাযহাব মানা ফরয তাহলে জানতে হবে যে এই ফরয হুকুমটি কার থেকে এসেছে। কারণ ইসলামের সমস্ত ফরয হুকুম এসেছে ওহীর মাধ্যমে নাবী মুহাম্মাদ -এর মাধ্যমে মহান আল্লাহর কাছ থেকে। কোন আলেম বা কোন হুজুর ইসলামের কোন বিষয় ফরয বা নফল করতে পারবে না, আর কেউ যদি তা করে থাকে তাহলে বুঝতে হবে যে সে মহান আল্লাহ তা'আলা ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছে। (নাউযুবিল্লাহ)
আর মাযহাব মানা যদি ফরয হতো বা সুন্নাহ হতো তাহলেও তার দলিল কুরআনের কোন আয়াতে থাকতো। কুরআনে না থাকলেও সহীহ হাদীসগ্রন্থগুলোতে থাকতো। কোন সহীহ হাদীসগ্রন্থে না থাকলেও হয়তো দুর্বল হাদীসে থাকতো। কিন্তু কুরআন-হাদীস তো দূরের কথা মাযহাব ফরয হওয়ার বিষয়ে একটি জাল হাদীসও নেই। তাই “মাযহাব মানা ফরয” এই প্রচার বা নির্দেশ মুসলিম সমাজে কীভাবে এলো তা চিন্তা করার বিষয়। মাযহাব আল্লাহর রসূল -এর মৃত্যুর চারশত বছর পরে এসেছে। এই চারশত বছর পর কে এই ফরয হুকুম নিয়ে এলো? কার কাছে ওহী এলো?
মাযহাব কী? মাযহাব অর্থ মত ও পথ। সারা পৃথিবীতে ছড়ানো সুন্নী মুসলিমদের প্রধানত চারটি মত ও পথ। সুন্নীদের ফিকহ (Figh or Jurisprudence) এর বিখ্যাত চার ইমামের নামানুসারে আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে বিভক্ত চারটি মত ও পথের অনুসারীগণ - যেমন : হানাফী, মালিকি, শাফেঈ এবং হাম্বালী মাযহাব। প্রচলিত চার মাযহাবের অস্তিত্ব রসূলুল্লাহ এর যমানায় ছিল না, এগুলোর সৃষ্টি হয়েছে তাঁর মৃত্যুর চারশত বছর পর।
ব্যাপক অর্থে মাযহাব হচ্ছে আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে কতিপয় মাসয়ালা- মাসায়েলের ব্যাপারে ওলামাদের মতামত, অনুধাবন ও গবেষণালব্ধ জ্ঞান। আল্লাহ ও তাঁর রসূল এই জ্ঞান, গবেষণা এবং মতামতের অনুসরণ করা কারো উপর অপরিহার্য করেননি। কেননা মতামতের মধ্যে শুদ্ধ-অশুদ্ধ উভয় সম্ভাবনা বিদ্যমান। তবে মাযহাবসমূহের যে সব বিষয় কুরআন-সহীহ হাদীসের ওপর নির্ভরশীল শুধু সেগুলোই অনুসরণ করা ওয়াজিব। আর যেগুলো কুরআন- হাদীসের বাণী দ্বারা সমর্থিত নয়, সেগুলো মতামত ও ইজতিহাদের বিষয়; এতে শুদ্ধ এবং অশুদ্ধ উভয় সম্ভাবনা রয়েছে। যে সকল মত ও পথ কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা মোটেও সমর্থিত নয়, এগুলো ইসলাম ধর্মে নূতন সৃষ্টি। মাযহাব মেনে চলা ফরয, ওয়াজিব, সুন্নত, নফল বা মুবাহ কোনটাই নয়। কারণ ফরয ও ওয়াজিব নির্ধারণ করতে পারেন একমাত্র মহান আল্লাহ তা'আলা এবং তাঁর রসূল।
জেনে রাখা ভালো যে মুসলিমদের জন্যে একটি মাত্র মাযহাব আল্লাহ অনুমোদন করেছেন তাদেরকে বিভ্রান্তি থেকে বাঁচানোর জন্যে, এবং সেই মাযহাব হচ্ছে কুরআন ও সহীহ হাদীসে বর্ণিত রসূলুল্লাহ -এর মাযহাব (মাযহাব মুহাম্মাদী), যা তিনি তাঁর জীবিতকালে তাঁর সাহাবীগণসহ, এবং তৎপর তাঁর চার খলিফা, তাবিঈন, তাবি-তাবিঈনগণ অনুসরণ করে গেছেন। মুসলিমদের মাঝে ভিন্ন ভিন্ন দল ও মত সৃষ্টি করা আল্লাহ নিষেধ করেছেন (সূরা আল আরাফ ৬ঃ ১৫৯; সূরা আলে ইমরান ৩: ১০৩)
যখন একজন অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তিনি কোন মাযহাব অনুসরণ করবেন?
আমরা যারা আমেরিকা, ক্যানাডা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়াতে থাকি তারা বিষয়টি অনুধাবন করে থাকি। এখানে নিয়মিত অমুসলিমরা ইসলাম গ্রহণ করছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যখন একজন অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তিনি কোন মাযহাব অনুসরণ করবেন? যারা হানাফী মাযহাব অনুসরণ করেন তারা হয়তো বলবেন সে হানাফী মাযহাব অনুসারে ইসলামের নিয়ম-কানুন মেনে চলবে। একইভাবে যারা মালিকী মাযহাব অনুসরণ করেন তারা হয়তো বলবেন সে মালিকী মাযহাব অনুসারে ইসলামের নিয়ম-কানুন মেনে চলবে। এখন ঐ নওমুসলিম বেচারা কোন দিকে যাবেন? একে তো সে নতুন মুসলিম এবং ইসলাম গ্রহণ করার পর ইসলামকে জানার জন্য পড়াশোনা শুরু করবেন তখন আবার দেখবেন ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ করে সলাত আদায়ের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন মাযহাবে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম, আবার আল্লাহর রসূল -এর সহীহ হাদীসে রয়েছে ভিন্ন নিয়ম! একেতো নিজের ধর্ম ত্যাগ করার কারণে পরিবার এবং পরিবেশ থেকে পাচ্ছেন নানা রকম অবহেলা, তার উপর ভিন্ন ভিন্ন মাযহাবের নিয়ম-কানুন নিয়ে ইসলামে টিকে থাকাটাই হবে তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
আমার সন্তান কোন্ মাযহাব অনুসরণ করবে?
এই সমস্যাটি বাংলাদেশে নেই বললেই চলে। কারণ বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলিম হানাফী মাযহাবের অনুসারী। আমরাও যেমন ছোটবেলা থেকে একটি মাযহাবই দেখে এসেছি তাই আমাদের মাঝেও এই প্রশ্নের উদয় হয় নাই। আমরা ইসলাম মানেই জেনেছি হানাফী মাযহাব। কিন্তু আমরা যারা প্রবাসে বসবাস করি আমাদের সন্তানেরা বড় হচ্ছে মাল্টিন্যাশনাল পরিবেশে। এই দেশে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মুসলিমরা বসবাস করে। আমাদের সন্তানরা স্কুল, কলেজ, মসজিদ বা প্রতিবেশী মুসলিমদের সম্মুখে বিভিন্ন মাযহাবের সম্মুখীন হয়। এই কচি বয়সে সে নিজের কাছে মাযহাব নিয়ে কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়! কোনটি সঠিক? বা কোনটি পালন করবো? শিক্ষক বলছেন একটা, আবার বাবামা বলছেন অরেকটা। বিরাট সমস্যা বটে!
বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। এই সমস্যায় আমরা ভুগছি গত পাঁচ বছর যাবত। আমাদের মেয়ের বয়স ১০ বছর। সে গত পাঁচ বছর যাবত বাংলাদেশী মাদ্রাসা শিক্ষিত একজন শিক্ষিকার নিকট আরবী পড়ে। পড়া শেষে প্রতিদিন শিক্ষিকা ছাত্রীদেরকে কিছু কিছু করে মাসলা-মাসায়েল শিক্ষা দিয়ে থাকেন। মাসলা-মাসায়েল যেহেতু মাযহাবের বিষয়, সেটা আসবেই। শিক্ষিকা ছাত্রীদেরকে শিক্ষা দিচ্ছেন যে, ইসলামে মাযহাব হচ্ছে চারটি। আমরা হচ্ছি হানাফী মাযহাবের অনুসারী, আর একটি মাযহাব মানা প্রতিটি মুসলিমের জন্য ফরয। এখন আমাদের মেয়ে বাসায় এসে আমাদেরকে প্রশ্ন করছেন যে, "তোমরা কোন মাযহাবের"? এখন আমার এই কচি সন্তানকে কী উত্তর দেবো? আমরা যদি বলি আমরা শাফী মাযহাবের, তাহলে তার সাথে সংঘাত হবে! আবার যদি বলি আমরা কোন নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরণ করিনা আমরা সরাসরি কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করি, তাহলে তার শিক্ষিকার সাথে সংঘাত হবে। আর শিক্ষিকা যদি এই খবর জানতে পারেন তাহলে হয়তো আমাদের সন্তানের সাথে ভাল আচরণ করবেন না! তাই আমাদের সন্তানদের জন্য বিষয়টি খুবই জটিল, আমাদের জন্যও জটিল!
মাযহাব নিয়ে মুসলিমদের মাঝে ভ্রাতৃত্ববোধ নষ্ট করা ঠিক না
মাযহাবের অনেক বিষয়ই সুন্নাহ। এই কাজগুলো আল্লাহর রসূল করেছেন। আমরা যদি এগুলো করি তাহলে রসূল -কে অনুসরণ করা হবে এবং ইবাদতের কোয়ালিটি (গ্রহণযোগ্যতা) বাড়বে। আর না করলে ইবাদত কোয়ালিটি সম্পন্ন হবে না এবং রসূল -কেও অনুসরণ করা হবে না। তবে সহীহ সাব্যস্ত হওয়া সত্ত্বেও কোন সুন্নাহকে অবজ্ঞা করা কিংবা ঘৃনা করা অবশ্যই গুনাহের কাজ।
তাই এই বিষয়গুলো নিয়ে দুই পক্ষেরই বাড়াবাড়ি করা মোটেও ঠিক নয়। তবে আমরা এতো কষ্ট করে ইবাদাত-বন্দেগী করছি তা সঠিকটা যাচাই-বাছাই করে নেয়া উচিত। আমরা বাজারে যখন কোন একটি জিনিস কিনতে যাই তখন কিন্তু ১০ দোকান ঘুরে যাচাই-বাছাই করে ভাল জিনিসটাই কিনি। তাই ইবাদাতের ক্ষেত্রে কেন যাচাই-বাছাই করে নেবো না? কেন অন্ধভাবে ওমুক হুজুর করে বলে আমিও করবো? আজকাল টেকনোলজির যুগ, যাচাই-বাছাই করা খুব কঠিন কাজ নয়। তবে অন্ধভাবে ইসলাম মনে করে কোন কাজ (ইবাদত) করার ভয়াবহ পরিনাম হচ্ছে 'বিদ'আত'। যা আল্লাহর রসূল করেন নাই তা ইবাদাতের অংশ মনে করে করলেই সেটা হবে সুস্পষ্ট বিদ'আত।
মাযহাব নিয়ে দুই দলে ঝগড়া মোটেও ঠিক নয়
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে হানাফী মাযহাবের ভাইয়েরা অন্যদেরকে খারাপ দৃষ্টিতে দেখেন। 'লা-মাযহাব' তাদের কাছে ভদ্র ভাষায় একটা গালি। কোথাও কোথাও তা শত্রুতায়ও পরিণত হয়েছে। রসূল -এর সহীহ নিয়মে সলাতের কথা উঠলে কেউ কেউ ক্ষেপে উঠেন, উচ্চস্বরে কথা কাটাকাটি করেন, এমনকি ঝগড়াও বাঁধিয়ে দেন। আমরা যখন দেশে বেড়াতে গিয়েছিলাম তখন আমাদের এক আত্মীয় আমাদেরকে রফউল ইয়াদাইন করতে দেখে এবং জোরে আমীন বলতে শুনে বললেন, 'এই ধরণের কাজ তাদের গ্রামে জোলারা করে'। জোলা হচ্ছে নীচু শ্রেণীর লোক। অথচ নিয়মটি রসূল -এর। রসূল -এর সলাতের সঠিক নিয়মগুলো আমাদের দেশে না জানার কারণে এবং প্রচলিত না থাকার কারণে তা হয়েছে আজ ঘৃণার কাজ। রসূল -এর নিয়মে সলাত আদায় করলে অনেকে হেয় দৃষ্টিতে দেখেন!
মু'মিনগণ পরস্পর ভাই ভাইঃ মহান আল্লাহ আল কুরআনে বলেনঃ
"মু'মিনগণ পরস্পর ভাই ভাই, সুতরাং তোমরা ভাইদের মাঝে শান্তি স্থাপন কর, আর আল্লাহকে ভয় কর যাতে তোমরা রহমত লাভ করতে পার।” (সুরা হুজুরাতঃ১০)
"হে মু'মিনগণ! কোন পুরুষ যেন অপর কোন পুরুষকে উপহাস না করে; কেন না, যাকে উপহাস করা হয় সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোন মহিলা অপর কোন মহিলাকেও যেন উপহাস না করে; কেননা যাকে উপহাস করা হয় সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং তোমরা একে অপরকে মন্দ নামে ডেক না; ঈমানের পর মন্দ নামে ডাকা গর্হিত কাজ। যারা তাওবা করেনা তারাই যালিম।” (সূরা হুজুরাত: ১১)
"তোমরা নিজেদের মাঝে বিবাদ করবে না, করলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে [মনের দৃঢ়তা হারাবে]। তোমরা ধৈয্যধারণ করবে, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সংগে রয়েছেন।" (সূরা আনফালঃ ৪৬)

📘 মুসলিম পরিবারের ছেলেমেয়েরা কেন ইসলাম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে > 📄 বেলাযীর সংখ্যা অধিক হওয়ার কারণ কী?

📄 বেলাযীর সংখ্যা অধিক হওয়ার কারণ কী?


বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া এবং পাকিস্তানের অধিকাংশই হানাফী মাযহাবের অনুসারী হানাফী মাযহাবের ফিক্হ অনুসারে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সলাতের রাকআত সংখ্যা ৪৬
ওয়াক্ত সুন্নাত ফরয সুন্নাত নফল বিতর মোট রাক'আত রাক'আত রাক'আত রাক'আত রাক'আত রাক'আত ফযর ২ ২ -- -- -- ৪ যোহর ৪ ৪ ২ ২ -- ১২ 'আসর ৪ ৪ -- -- -- ৮ মাগরিব -- ৩ ২ ২ -- ৭ ঈশা ৪ ৪ ২ ২ ৩ ১৫ মোট ১৪ ১৭ ৬ ৬ ৩ ৪৬
১. হানাফী ফিক্হ্ন অনুসারে বিভিন্ন ওয়াক্তে অতিরিক্ত সুন্নাত ও নফল সলাত যোগ করা হয়েছে যার ফলে সহীহ হাদীসে অনুমোদিত রাক'আতের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে এবং এতে মুসল্লিদের উপর অতিরিক্ত বোঝা সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই এত বেশী সলাতে আগ্রহী হয় না।
২. হানাফী ফিক্হ্ন অনুসারে সলাতের আগে অযু করার সময় এবং প্রতিটি অংগপ্রত্যংগ ধোয়ার সময় আরবী ভাষায় ভিন্ন ভিন্ন নিয়ত ও দু'আ পড়তে হয় যা সহীহ হাদীসে নেই, এগুলোই মুসল্লিদের নিকট বোঝা মনে হয়।
৩. হানাফী ফিক্‌হ্ন অনুসারে প্রতি ওয়াক্তে প্রতিটি ধরণের সলাত (সুন্নাত, ফরয ইত্যাদি) শুরু করার আগে মুখে উচ্চারণ করে আরবী ভাষায় ভিন্নভিন্ন নিয়ত করতে হয়, যা হাদীসে নেই। এই নিয়ম অনেকের কাছেই কঠিন ও জটিল মনে হয়।
৪. অথচ আরবী ভাষায় এতসব কঠিন কঠিন নিয়ত ও দু'আ মুখে উচ্চারণ করতে হবে এমন কোন নির্দেশ রসূলুল্লাহ -এর সহীহ হাদীসের কোথায়ও নেই। এগুলো নূতন সংযোজন এবং বিদ'আত।
৫. অযু এবং বিভিন্ন ধরণের সলাতের জন্যে (সহীহ হাদীস বহির্ভূত) কঠিন কঠিন আরবী নিয়ত ও দু'আ অত্যাবশ্যক করায় মানুষের মনে সলাতের প্রতি ভীতি সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সলাত পড়তে অনেকেই উৎসাহ বা আগ্রহ বোধ করেন না।
৬. সহীহ হাদীসের মর্মানুসারে যারা দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সলাত সময়মত আদায় করেনা তারা সবাই বেনামাযী, এমনকি যারা চার ওয়াক্ত সলাত আদায় করে তারাও বেনামাযী কারণ আল্লাহর হুকুম মত তারা পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায় করে না। আল্লাহর হুকুম অমান্য করার অপরাধে তারা অপরাধী। নামাযী ও বেনামাযীর সংজ্ঞা লোকজনদের বুঝিয়ে না বলার কারণে তারা অজ্ঞ থেকে যায়।
৭. কুরআনের সূরা রূম এর ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ জানিয়েছেন যে আকিমুস সালাতা ওয়ালা তাকুনু মিনাল মুশরিকীন, (সলাত কায়েম কর, মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়োনা)। আল্লাহর নির্দেশে প্রতিষ্ঠিত দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সলাত (১৭ রাক'আত ফরয সলাত) যথাসময়ে ও যথারীতি আদায় না করলে মুসলিম থাকা যায় না [উক্ত কুরআনের আয়াত ও রসূলুল্লাহ -এর সহীহ হাদীস] একথা গুরুত্বসহকারে মুসলিমদের বুঝিয়ে না বলার কারণে তারা সলাতকে অবহেলা করে।
৮. ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী বেনামাযীর জানাযা পড়া নিষেধ। অর্থাৎ যে ব্যক্তি জীবনে ঠিক মতো সলাত আদায় করেনি এবং এই অবস্থায় মারা গেছেন সমাজের লোকেরা তার জানাযার সলাত (নামায) পড়বে না, তাকে জানাযা ছাড়াই দাফন করতে হবে। এই সত্যটি আমাদের সমাজে মাওলানারা প্রচার করেন না এবং ইসলামের এই নিয়মটি পালনও করেন না। তাই সমাজে বেনামাযীর সংখ্যাও অধিক। যদি বেনামাযীর জানাযা পড়া না হতো তাহলে মান-সম্মানের ভয়ে হলেও মানুষ পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায় করতো। আমাদের অবস্থা এমন হয়েছে যে, মৃত্যুর পর জান্নাতে গেলাম কি জাহান্নামে গেলাম সেটা গুরুত্বপূর্ণ না, কিন্তু মৃত্যুর পর সমাজে মানুষের সামনে জানাযা ছাড়া দাফন করা হবে এটা মেনে নেয়া অপমানজনক।
৯. লোকজনকে বুঝিয়ে বলা হয়না যে ফরয, সুন্নত, ওয়াজিব এবং নফল সলাতের গুরুত্ব এক নয়, দৈনিক ১৭ রাক'আত ফরয সলাত সময়মত আদায় করতে পারলেই মুসলিম থাকা যাবে, তাতেই আল্লাহর হক আদায় হয়ে যাবে, শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। সুন্নাত আদায় করলে অধিক সওয়াব পাওয়া যাবে। আর নফল তো হলো অতিরিক্ত, পড়লে সওয়াব আছে, না পড়লে গুনাহ নেই।
১০. বহু রাক'আতবিশিষ্ট ওয়াক্তিয়া সলাতের ভয়ে লোকেরা সলাতের দু'আ, দুরূদও শিখতে উৎসাহী হয়না, এবং যেহেতু তারা দু'আ-দুরূদ জানে না, সেহেতু তারা সলাতই পড়তে চায় না।
১১. অন্যদিকে কাযা সলাত বলে কোন ওয়াক্তিয়া সলাত অন্য সময়ে আদায় করার কোন দলীল রসূলুল্লাহ -এর সহীহ হাদীসে নেই অথচ কাযা সলাত পড়া হানাফী ফিক্হ্ন অনুসারে জাইয। এমনকি "উমরী কাযা" প্রথা অনুমোদন থাকায় সলাত আরো অধিক গুরুত্বহীন এবং অবহেলার বস্তুতে পরিণত হয়েছে। ফলে সময়মত সলাত আদায় করার প্রতি মুসলিম নরনারী তাদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। "আচ্ছা এক সময় পড়ে নিলেই হবে" এমন একটা মনোভাব গড়ে উঠেছে মানুষের মনে।
১২. সলাত না পড়ার ক্ষতিপূরণ হিসেবে না-পড়া সলাতের জন্যে কাফ্ফারা (অর্থাৎ নির্দিষ্ট হারে অর্থদন্ড) দেয়ার প্রথা চালু করেছে হানাফী মাযহাবের ইমামগণ যা সম্পূর্ণরূপে রসূলুল্লাহ -এর সুন্নাহ বহির্ভূত প্রথা। ফলে সলাত আদায় না করে কাফ্ফারা দিয়ে আল্লাহর হুকুমকে পাশ কাটাতে চেষ্টা করে লোকেরা।
১৩. লোকজনকে তওবা করার জন্য উৎসাহিত করা হয় না। সলাত না পড়ে গুনাহগার হলে আল্লাহর কাছে অনুতপ্ত হয়ে খাঁটি দিলে তওবা করলে এবং অতঃপর নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায় করতে থাকলে আল্লাহ সেই বান্দাকে মাফ করে দিতে পারেন, একথা মানুষজনকে হুজুররা কখনো বুঝিয়ে বলেন না। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তওবার দরজা খোলা থাকে কারণ আল্লাহ তাঁর গুনাহগার বান্দাকে অনুতপ্ত হলে, ক্ষমা চাইলে, ক্ষমা করতে চান। তিনি তাঁর কুরআনে আশ্বাস দিয়েছেন।
১৪. হানাফী মাযহাবে অনেক জাল এবং দুর্বল হাদীস নিয়ে সলাতের নিয়ম- কানুন প্রচলিত আছে। যার কারণে রসূলুল্লাহ -এর প্রকৃত সলাতের রূপ আমাদের এই উপমহাদেশে এতোটা পরিবর্তন হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া এবং পাকিস্তানের অধিকাংশই হানাফী মাযহাবের অনুসারী হানাফী মাযহাবের ফিক্হ অনুসারে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সলাতের রাকআত সংখ্যা ৪৬
ওয়াক্ত সুন্নাত ফরয সুন্নাত নফল বিতর মোট রাক'আত রাক'আত রাক'আত রাক'আত রাক'আত রাক'আত ফযর ২ ২ -- -- -- ৪ যোহর ৪ ৪ ২ ২ -- ১২ 'আসর ৪ ৪ -- -- -- ৮ মাগরিব -- ৩ ২ ২ -- ৭ ঈশা ৪ ৪ ২ ২ ৩ ১৫ মোট ১৪ ১৭ ৬ ৬ ৩ ৪৬
১. হানাফী ফিক্হ্ন অনুসারে বিভিন্ন ওয়াক্তে অতিরিক্ত সুন্নাত ও নফল সলাত যোগ করা হয়েছে যার ফলে সহীহ হাদীসে অনুমোদিত রাক'আতের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে এবং এতে মুসল্লিদের উপর অতিরিক্ত বোঝা সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই এত বেশী সলাতে আগ্রহী হয় না।
২. হানাফী ফিক্হ্ন অনুসারে সলাতের আগে অযু করার সময় এবং প্রতিটি অংগপ্রত্যংগ ধোয়ার সময় আরবী ভাষায় ভিন্ন ভিন্ন নিয়ত ও দু'আ পড়তে হয় যা সহীহ হাদীসে নেই, এগুলোই মুসল্লিদের নিকট বোঝা মনে হয়।
৩. হানাফী ফিক্‌হ্ন অনুসারে প্রতি ওয়াক্তে প্রতিটি ধরণের সলাত (সুন্নাত, ফরয ইত্যাদি) শুরু করার আগে মুখে উচ্চারণ করে আরবী ভাষায় ভিন্নভিন্ন নিয়ত করতে হয়, যা হাদীসে নেই। এই নিয়ম অনেকের কাছেই কঠিন ও জটিল মনে হয়।
৪. অথচ আরবী ভাষায় এতসব কঠিন কঠিন নিয়ত ও দু'আ মুখে উচ্চারণ করতে হবে এমন কোন নির্দেশ রসূলুল্লাহ -এর সহীহ হাদীসের কোথায়ও নেই। এগুলো নূতন সংযোজন এবং বিদ'আত।
৫. অযু এবং বিভিন্ন ধরণের সলাতের জন্যে (সহীহ হাদীস বহির্ভূত) কঠিন কঠিন আরবী নিয়ত ও দু'আ অত্যাবশ্যক করায় মানুষের মনে সলাতের প্রতি ভীতি সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সলাত পড়তে অনেকেই উৎসাহ বা আগ্রহ বোধ করেন না।
৬. সহীহ হাদীসের মর্মানুসারে যারা দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সলাত সময়মত আদায় করেনা তারা সবাই বেনামাযী, এমনকি যারা চার ওয়াক্ত সলাত আদায় করে তারাও বেনামাযী কারণ আল্লাহর হুকুম মত তারা পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায় করে না। আল্লাহর হুকুম অমান্য করার অপরাধে তারা অপরাধী। নামাযী ও বেনামাযীর সংজ্ঞা লোকজনদের বুঝিয়ে না বলার কারণে তারা অজ্ঞ থেকে যায়।
৭. কুরআনের সূরা রূম এর ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ জানিয়েছেন যে আকিমুস সালাতা ওয়ালা তাকুনু মিনাল মুশরিকীন, (সলাত কায়েম কর, মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়োনা)। আল্লাহর নির্দেশে প্রতিষ্ঠিত দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সলাত (১৭ রাক'আত ফরয সলাত) যথাসময়ে ও যথারীতি আদায় না করলে মুসলিম থাকা যায় না [উক্ত কুরআনের আয়াত ও রসূলুল্লাহ -এর সহীহ হাদীস] একথা গুরুত্বসহকারে মুসলিমদের বুঝিয়ে না বলার কারণে তারা সলাতকে অবহেলা করে।
৮. ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী বেনামাযীর জানাযা পড়া নিষেধ। অর্থাৎ যে ব্যক্তি জীবনে ঠিক মতো সলাত আদায় করেনি এবং এই অবস্থায় মারা গেছেন সমাজের লোকেরা তার জানাযার সলাত (নামায) পড়বে না, তাকে জানাযা ছাড়াই দাফন করতে হবে। এই সত্যটি আমাদের সমাজে মাওলানারা প্রচার করেন না এবং ইসলামের এই নিয়মটি পালনও করেন না। তাই সমাজে বেনামাযীর সংখ্যাও অধিক। যদি বেনামাযীর জানাযা পড়া না হতো তাহলে মান-সম্মানের ভয়ে হলেও মানুষ পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায় করতো। আমাদের অবস্থা এমন হয়েছে যে, মৃত্যুর পর জান্নাতে গেলাম কি জাহান্নামে গেলাম সেটা গুরুত্বপূর্ণ না, কিন্তু মৃত্যুর পর সমাজে মানুষের সামনে জানাযা ছাড়া দাফন করা হবে এটা মেনে নেয়া অপমানজনক।
৯. লোকজনকে বুঝিয়ে বলা হয়না যে ফরয, সুন্নত, ওয়াজিব এবং নফল সলাতের গুরুত্ব এক নয়, দৈনিক ১৭ রাক'আত ফরয সলাত সময়মত আদায় করতে পারলেই মুসলিম থাকা যাবে, তাতেই আল্লাহর হক আদায় হয়ে যাবে, শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। সুন্নাত আদায় করলে অধিক সওয়াব পাওয়া যাবে। আর নফল তো হলো অতিরিক্ত, পড়লে সওয়াব আছে, না পড়লে গুনাহ নেই।
১০. বহু রাক'আতবিশিষ্ট ওয়াক্তিয়া সলাতের ভয়ে লোকেরা সলাতের দু'আ, দুরূদও শিখতে উৎসাহী হয়না, এবং যেহেতু তারা দু'আ-দুরূদ জানে না, সেহেতু তারা সলাতই পড়তে চায় না।
১১. অন্যদিকে কাযা সলাত বলে কোন ওয়াক্তিয়া সলাত অন্য সময়ে আদায় করার কোন দলীল রসূলুল্লাহ -এর সহীহ হাদীসে নেই অথচ কাযা সলাত পড়া হানাফী ফিক্হ্ন অনুসারে জাইয। এমনকি "উমরী কাযা" প্রথা অনুমোদন থাকায় সলাত আরো অধিক গুরুত্বহীন এবং অবহেলার বস্তুতে পরিণত হয়েছে। ফলে সময়মত সলাত আদায় করার প্রতি মুসলিম নরনারী তাদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। "আচ্ছা এক সময় পড়ে নিলেই হবে" এমন একটা মনোভাব গড়ে উঠেছে মানুষের মনে।
১২. সলাত না পড়ার ক্ষতিপূরণ হিসেবে না-পড়া সলাতের জন্যে কাফ্ফারা (অর্থাৎ নির্দিষ্ট হারে অর্থদন্ড) দেয়ার প্রথা চালু করেছে হানাফী মাযহাবের ইমামগণ যা সম্পূর্ণরূপে রসূলুল্লাহ -এর সুন্নাহ বহির্ভূত প্রথা। ফলে সলাত আদায় না করে কাফ্ফারা দিয়ে আল্লাহর হুকুমকে পাশ কাটাতে চেষ্টা করে লোকেরা।
১৩. লোকজনকে তওবা করার জন্য উৎসাহিত করা হয় না। সলাত না পড়ে গুনাহগার হলে আল্লাহর কাছে অনুতপ্ত হয়ে খাঁটি দিলে তওবা করলে এবং অতঃপর নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায় করতে থাকলে আল্লাহ সেই বান্দাকে মাফ করে দিতে পারেন, একথা মানুষজনকে হুজুররা কখনো বুঝিয়ে বলেন না। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তওবার দরজা খোলা থাকে কারণ আল্লাহ তাঁর গুনাহগার বান্দাকে অনুতপ্ত হলে, ক্ষমা চাইলে, ক্ষমা করতে চান। তিনি তাঁর কুরআনে আশ্বাস দিয়েছেন।
১৪. হানাফী মাযহাবে অনেক জাল এবং দুর্বল হাদীস নিয়ে সলাতের নিয়ম- কানুন প্রচলিত আছে। যার কারণে রসূলুল্লাহ -এর প্রকৃত সলাতের রূপ আমাদের এই উপমহাদেশে এতোটা পরিবর্তন হয়ে গেছে।

📘 মুসলিম পরিবারের ছেলেমেয়েরা কেন ইসলাম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে > 📄 সুন্নতি পোশাকের নামে বিভ্রান্তি

📄 সুন্নতি পোশাকের নামে বিভ্রান্তি


সুন্নাতি পোশাক বলতে ইসলামে কিছু আছে কিনা তা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। কারণ এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের বাংলাদেশে মুসলিম সমাজে বেশ জটিলতা ও বিভ্রান্তি বর্তমান। কোন সহীহ হাদীসে এই সুন্নাতি পোশাক নিয়ে কোন আলোচনা বা নির্দেশ নেই। কুরআন ও সহীহ হাদীস অনুযায়ী ইসলামে পোশাকের বিষয়ে বলা হয়েছে যে পোশাকটি ঢিলেঢালা হতে হবে এবং যেন শরীরের গঠন অন্যের নিকট আকর্ষণীয় হয়ে ফুটে না উঠে। কিন্তু কুরআন অথবা হাদীসে কোথাও পোশাকের ডিজাইন বা দৈর্ঘ্য-প্রস্ত নিয়ে কোন কথা বলা হয়নি। এবার আরো বিস্তারিত জানা যাক।
টুপি : সলাত আদায় করার সময় টুপি, পাগড়ি, পায়জামা, পাঞ্জাবী, লুঙ্গি ইত্যাদি কি অত্যাবশ্যক? আমরা অনেকে মনে করে থাকি যে টুপি সলাতের অংশ এবং টুপি ছাড়া সলাত আদায় হবে না। আবার দেখা যায় যে কারো মাথায় টুপি না থাকলে তারা ফরয মনে করে পকেটের রুমাল বের করে মাথায় পেঁচিয়ে নেন। এ সবই আসলে ভ্রান্ত ধারণা। আমরা যদি হাদীসে রসূল -এর সলাতের পোশাক অধ্যায় দেখি তাহলে দেখবো যে, সেখানে পুরুষদের জন্য সলাতে পোশাক কতটুকু হতে হবে বা মহিলাদের জন্য কী হবে তার উল্লেখ আছে কিন্তু সেখানে কোথাও পুরুষদের টুপি অথবা পাগড়ির কথা নেই। তাই সলাত আদায়ে মাথায় টুপি ফরয নয়, সলাত আদায় টুপি ছাড়াও হবে। এবং একই নীতি পাগড়ি, পাঞ্জাবী, পায়জামা বা লুঙ্গির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য- এগুলোর উল্লেখ সহীহ হাদীসে পোশাক অধ্যায়ে বর্ণিত হয়নি। এসবই আঞ্চলিক পোশাক, এখানে সুন্নতি কোন বাধ্যবাধকতা নেই।
আরেকটি বিষয়। আমরা বাংলাদেশীরা যে ধরণের টুপি পরি আল্লাহর রসূল কি এই ধরণের টুপি পরতেন? বা আমরা যে ধরণের পাগড়ি পরি আল্লাহর রসূল একি এই ধরণের পাগড়ি পরতেন? আল্লাহর রসূল একজন এরাবিয়ান ছিলেন, তাই তিনি জন্মের পর থেকেই এরাবিয়ান কালচার অনুসরণ করেই বড় হয়েছিলেন। আরবের ইতিহাস পড়লে দেখা যায় যে তৎকালীন সময়ে এরাবিয়ানরা ছিল বেদুঈন, তাদের সাধারণ পেশা ছিল পশু চারণ, পাহাড়ে- জংগলে শিকার করা, কৃষি কাজ করা এবং এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় মরুভূমি পাড়ি দিয়ে বাণিজ্য করা ইত্যাদি। এই ধরণের কাজ করতে গিয়ে তাদের মূলত ঘরের বাইরেই থাকতে হতো। মরু-ঝড় থেকে আত্মরক্ষার জন্য এবং প্রচন্ড রোদের তাপ থেকে আত্মরক্ষার জন্য তারা এক ধরণের headscarf (মাথার আবরণী) ব্যবহার করতো এবং তা দিয়ে তারা মাথা ও মুখ ঢেকে রোদে চলা ফেরা করতো।
আরেকটি মজার বিষয় হচ্ছে যে, এরাবিয়ানরা মাথায় স্কার্ফের উপর যে কালো বিড়া বাঁধে (বর্তমানে তাদের সরকারী অফিশিয়াল ড্রেস) তার ইতিহাস হচ্ছে: এক সময় বেদুঈন আরবরা যখন মাঠে উট চড়াতো তখন ঐ উটের দড়ি লম্বা করে দিয়ে তার এক মাথায় ঐ বিড়া লাগিয়ে তা নিজ হাঁটুর মধ্যে ঢুকিয়ে বসে কোথাও বিশ্রাম নিতো বা ঘুমাতো এবং উট নিজে নিজে চড়ে ঘাস খেতো। ঐ একই কাজের উদ্দেশ্যে আমাদের দেশের রাখালরা গরুর খুঁটা ব্যবহার করে থাকে যেন গরু হারিয়ে না যায়।
আমাদের বাংলাদেশীদের ধারণা যে আমরা যে ধরণের টুপি পরি হয়তো এটাই ইসলামী পোশাক। কিন্তু এই টুপি একেক দেশে একেক ধরণের, যেমন, ইসরাঈলে ইহুদীরা এক রকমের টুপি পরে, আফগানিস্তানের লোকেরা আরেক রকমের পরে, তুরস্কের লোকেরা আরেক রকমের পরে, আফ্রিকানরা আরেক রকমের পরে, ইন্দোনেশিয়ার লোকেরা আরেক রকমের পরে।
পাগড়ি: একই প্রশ্ন: সলাত আদায়ে ইমাম সাহেবের জন্য কি পাগড়ি জরুরী? আমরা অনেকে মনে করে থাকি যে ইমাম সাহেব পাগড়ি পরবেন আর মুসল্লিরা টুপি পরবেন। আমাদের উপমহাদেশে এই পাগড়ি একটা শ্রেণীর নির্দিষ্ট পোশাকে পরিণত হয়েছে। যেমন পাগড়ি সাধারণত ইমাম সাহেব, পীর সাহেব, মাওলানা সাহেব বা মোয়াজ্জিন সাহেব পরে থাকেন। আমাদের বিশ্বাসের মধ্যেও এই বিষয়টি এমনভাবে ঢুকে গেছে যে আমরা ধরেই নিয়েছি যে এটি তাদের পোশাক, কিছুটা সেনা বাহিনীর র‍্যাংকের মতো। যা হোক এখানে কাউকে হেয় বা ছোট করা হচ্ছে না, শুধু বিষয়টা পরিষ্কার করার চেষ্টা করা হচ্ছে মাত্র।
টুপির মতো পাগড়িও সলাতের জন্য জরুরী নয় এবং এই পাগড়ি যে কেউ চাইলেই পরতে পারে, এর সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা আরবের ইতিহাস থেকে জেনেছি যে এরাবিয়ানদের কালচারাল পোশাক কী ছিল। আমাদের ভারত উপমহাদেশে শিখরা পাগড়ি পরে। আর বিয়েতে তো দেখা যায় সব ধর্মের বর-ই পাগড়ি পরে, বরের পুরুষ আত্মীয়রাও বিয়ের দিন পাগড়ি মাথায় দেয়। এটা ধর্মীয় পোশাক নয়, স্থানীয় সামাজিক, কালচারাল বিষয়।
পায়জামা-পাঞ্জাবী বা জুব্বা: একই প্রশ্ন: সলাত আদায়ের জন্য পায়জামা- পাঞ্জাবী বা জুব্বা কি জরুরী (অত্যাবশ্যক)? মরু-ঝড় থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য এবং প্রচন্ড রোদের তাপ থেকে আত্মরক্ষার জন্য এরাবিয়ানরা যে হেডস্কার্ফ ব্যবহার করতো তা দিয়ে তারা মাথা ও মুখ ঢেকে রোদে চলা ফেরা করতো। ঐ একই কারণে তারা এক ধরণের জুবব্বা (লম্বা ঢিলা পোশাক) ব্যবহার করতো, যা তাদের প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রেহাই পেতে সাহায্য করতো, রোদের তীব্র তাপ থেকে রক্ষা করতো, শীত থেকে রক্ষা করতো। তাই তারা জুব্বা পরতো।
আমরা জানি যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে অনেক দেশেই মুসলিমদের পাশাপাশি প্রচুর খৃষ্টান-ইহুদী নাগরিক রয়েছে, তারা অমুসলিম, তাদের ভাষাও আরবী, তারাও ঐ এরাবিয়ান কালচারের পোশাক জুব্বা পরে থাকে, অর্থাৎ আরবে মুসলিম-অমুসলিম সকলেই একই পোশাক পরে। তাই একথা বলা যাবে না যে ঐ জুব্বা শুধু মুসলিমদের পোশাক বা ইসলামী পোশাক। সাহাবীরা ইসলাম গ্রহণের পূর্বে অমুসলিম অবস্থায় যে পোশাক পরতেন মুসলিম হওয়ার পরও ঠিক ঐ একই পোশাক পরতেন। ইসলামের জন্য তাদের পোশাকের কোন পরিবর্তন হয়নি। ঐ সময় আবু লাহাব, আবু জাহিলও একই পোশাক পরতো। একই দৃশ্য আমাদের ভারত উপমহাদেশে। এই অঞ্চলে হিন্দুরাও পায়জামা-পাঞ্জাবী পরে, কিন্তু তাই বলে মুসলিমরা দাবী করে বলতে পারবো না যে ওরা ইসলামী পোশাক পরে। এখনো সারা পৃথিবীতে খৃষ্টান পাদ্রিরা সাদা রঙের জুববা পড়েন।
সুট-টাই: বর্তমানে বাংলাদেশে এই সুট-টাই নিয়ে চলছে এক মহাবিতর্ক। প্রশ্ন করা হচ্ছে: Peace TV-র ডা. জাকির নায়েক ইসলামের কথা বলেন অথচ তিনি সুট-টাই পরেন কেন? আমাদের অজ্ঞতার কারণে আমরা বিষয়টি সম্পর্কে সঠিকভাবে জানি না বা বিষয়টি নিয়ে কুরআন ও হাদীসের আলোকে কখনো গভীরভাবে চিন্তা করিনি বলেই এই প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের মধ্যে একটি বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছে যে ইসলামী পোশাক মানেই পায়জামা, পাঞ্জাবী ও জুববা, আর সুট-টাই মানেই হচ্ছে ইংরেজ খৃষ্টানদের ড্রেস। আমাদের অনুসন্ধান করে জানতে হবে যে এই পায়জামা, পাঞ্জাবী ও জুববা এবং সুট-টাই-এর ইতিহাস কী? কুরআন ও হাদীসে এ বিষয়ে কী নির্দেশ আছে? ইসলামী পোশাকের বিষয়ে কুরআনের সূরা আহযাব ও সূরা নূরে স্পষ্ট ভাষায় বলে দেয়া আছে যে মুসলিম নারী ও পুরুষদের পোশাক হতে হবে ঢিলাঢালা, যেন শরীরের অংগ-প্রত্যঙ্গের গঠন অপরের চোখে ফুটে না উঠে। সেই হিসেবে পায়জামা, পাঞ্জাবী, জুব্বা, সুট-টাই সকল মুসলিমের জন্য উত্তম পোশাক।
ইসলামের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে, সুট-টাই মুসলিমদের আবিস্কার, এক সময় শীত নিবারণের জন্য তারা সুট-টাই ব্যবহার করতো। আমরা যারা সুট-টাইকে অমুসলিমদের পোশাক বলে মনে করি তাদের ধারণাটা ঠিক না। কেউ কেউ বলে থাকেন যে, টাই খৃষ্টানদের ধর্মীয় প্রতীক। এই কথাটা মোটেও ঠিক না। যেকোন কথা বললে তার দলিল থাকতে হবে, সেই কথার ভিত্তি থাকতে হবে। টাই এবং খৃষ্টানদের ক্রুশের মধ্যে ধর্মীয় সম্পর্ক রয়েছে এটা একটা ভ্রান্ত ধারণা। টাই খৃষ্টানদের ধর্মীয় প্রতীক নয় এবং এ বিষয়ে খৃষ্টান আলেমরা কিছুই জানেন না, যেহেতু এর সাথে তাদের ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই। আবার কেউ কেউ বলেন টাই দেখতে খৃষ্টানদের ক্রুশের মতো লাগে। এই ধরনের ধারণাও বোকামী, কারণ ক্রুশের মতো দেখতো তো অনেক কিছুই লাগে যা আমরা মুসলিমরা ব্যবহার করে থাকি, যেমন আমাদের হাফ-শার্ট, ফুল-শার্ট, টি-শার্ট, পাঞ্জাবী, জুব্বা, শেরোয়ানী, কোট, কামিজ, ব্লাউজ ইত্যাদি; এ সবই মেলে ধরলে দেখতে ক্রুশের মতো লাগবে, তাই বলে কি এগুলো খৃষ্টানদের ধর্মীয় পোশাক? মোটেও না। এমনকি একজন মানুষও দুই হাত মেলে দাঁড়ালে তাঁকেও ক্রুশের মতো লাগবে।
এই বিষয়গুলো নিয়ে যেন আমরা নিজেদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি না করি এবং বিষয়গুলো নিয়ে যেন বিতর্ক সৃষ্টি না করি। কেউ যেন মনে না করি যে এখানে টুপি, পায়জামা, পাঞ্জাবী, জুব্বা, পাগড়ি ইত্যাদিকে ছোট করা হচ্ছে। মোটেও তা নয়। কেউ যদি এগুলো পরতে চান, পরতে পারেন, কিন্তু এগুলো নিয়ে ধর্মীয় বাড়াবাড়ি করা মোটেও ঠিক নয়, এটাই এখানে বুঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। সুন্নাতি পোশাক বা ইসলামী পোশাক বলতে কুরআন বা হাদীসে কোন dress code অথবা বিধিবদ্ধ কোন নির্দেশ নেই। যা আছে তা আছে সূরা নূর (২৪) এবং সূরা আহযাবে (৩৩)। পোশাক হতে হবে শালীন, সুন্দর, উলংগতা বর্জিত, তা হতে হবে যৌন-উত্তেজনা সৃষ্টি থেকে মুক্ত, অনায়াসে পরিধানযোগ্য, এবং পোশাক যেন পরিধানকারীর মনে গর্বের সৃষ্টি না করে। পোশাকটা হতে হবে সুন্দর, কুৎসিৎ নয়, কারণ আল্লাহ কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন যে সলাতে তোমরা তোমাদের সুন্দর পোশাকটি পরে দাঁড়াবে। [সূরা আ'রাফ ৭ঃ ৩১]

সুন্নাতি পোশাক বলতে ইসলামে কিছু আছে কিনা তা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। কারণ এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের বাংলাদেশে মুসলিম সমাজে বেশ জটিলতা ও বিভ্রান্তি বর্তমান। কোন সহীহ হাদীসে এই সুন্নাতি পোশাক নিয়ে কোন আলোচনা বা নির্দেশ নেই। কুরআন ও সহীহ হাদীস অনুযায়ী ইসলামে পোশাকের বিষয়ে বলা হয়েছে যে পোশাকটি ঢিলেঢালা হতে হবে এবং যেন শরীরের গঠন অন্যের নিকট আকর্ষণীয় হয়ে ফুটে না উঠে। কিন্তু কুরআন অথবা হাদীসে কোথাও পোশাকের ডিজাইন বা দৈর্ঘ্য-প্রস্ত নিয়ে কোন কথা বলা হয়নি। এবার আরো বিস্তারিত জানা যাক।
টুপি : সলাত আদায় করার সময় টুপি, পাগড়ি, পায়জামা, পাঞ্জাবী, লুঙ্গি ইত্যাদি কি অত্যাবশ্যক? আমরা অনেকে মনে করে থাকি যে টুপি সলাতের অংশ এবং টুপি ছাড়া সলাত আদায় হবে না। আবার দেখা যায় যে কারো মাথায় টুপি না থাকলে তারা ফরয মনে করে পকেটের রুমাল বের করে মাথায় পেঁচিয়ে নেন। এ সবই আসলে ভ্রান্ত ধারণা। আমরা যদি হাদীসে রসূল -এর সলাতের পোশাক অধ্যায় দেখি তাহলে দেখবো যে, সেখানে পুরুষদের জন্য সলাতে পোশাক কতটুকু হতে হবে বা মহিলাদের জন্য কী হবে তার উল্লেখ আছে কিন্তু সেখানে কোথাও পুরুষদের টুপি অথবা পাগড়ির কথা নেই। তাই সলাত আদায়ে মাথায় টুপি ফরয নয়, সলাত আদায় টুপি ছাড়াও হবে। এবং একই নীতি পাগড়ি, পাঞ্জাবী, পায়জামা বা লুঙ্গির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য- এগুলোর উল্লেখ সহীহ হাদীসে পোশাক অধ্যায়ে বর্ণিত হয়নি। এসবই আঞ্চলিক পোশাক, এখানে সুন্নতি কোন বাধ্যবাধকতা নেই।
আরেকটি বিষয়। আমরা বাংলাদেশীরা যে ধরণের টুপি পরি আল্লাহর রসূল কি এই ধরণের টুপি পরতেন? বা আমরা যে ধরণের পাগড়ি পরি আল্লাহর রসূল একি এই ধরণের পাগড়ি পরতেন? আল্লাহর রসূল একজন এরাবিয়ান ছিলেন, তাই তিনি জন্মের পর থেকেই এরাবিয়ান কালচার অনুসরণ করেই বড় হয়েছিলেন। আরবের ইতিহাস পড়লে দেখা যায় যে তৎকালীন সময়ে এরাবিয়ানরা ছিল বেদুঈন, তাদের সাধারণ পেশা ছিল পশু চারণ, পাহাড়ে- জংগলে শিকার করা, কৃষি কাজ করা এবং এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় মরুভূমি পাড়ি দিয়ে বাণিজ্য করা ইত্যাদি। এই ধরণের কাজ করতে গিয়ে তাদের মূলত ঘরের বাইরেই থাকতে হতো। মরু-ঝড় থেকে আত্মরক্ষার জন্য এবং প্রচন্ড রোদের তাপ থেকে আত্মরক্ষার জন্য তারা এক ধরণের headscarf (মাথার আবরণী) ব্যবহার করতো এবং তা দিয়ে তারা মাথা ও মুখ ঢেকে রোদে চলা ফেরা করতো।
আরেকটি মজার বিষয় হচ্ছে যে, এরাবিয়ানরা মাথায় স্কার্ফের উপর যে কালো বিড়া বাঁধে (বর্তমানে তাদের সরকারী অফিশিয়াল ড্রেস) তার ইতিহাস হচ্ছে: এক সময় বেদুঈন আরবরা যখন মাঠে উট চড়াতো তখন ঐ উটের দড়ি লম্বা করে দিয়ে তার এক মাথায় ঐ বিড়া লাগিয়ে তা নিজ হাঁটুর মধ্যে ঢুকিয়ে বসে কোথাও বিশ্রাম নিতো বা ঘুমাতো এবং উট নিজে নিজে চড়ে ঘাস খেতো। ঐ একই কাজের উদ্দেশ্যে আমাদের দেশের রাখালরা গরুর খুঁটা ব্যবহার করে থাকে যেন গরু হারিয়ে না যায়।
আমাদের বাংলাদেশীদের ধারণা যে আমরা যে ধরণের টুপি পরি হয়তো এটাই ইসলামী পোশাক। কিন্তু এই টুপি একেক দেশে একেক ধরণের, যেমন, ইসরাঈলে ইহুদীরা এক রকমের টুপি পরে, আফগানিস্তানের লোকেরা আরেক রকমের পরে, তুরস্কের লোকেরা আরেক রকমের পরে, আফ্রিকানরা আরেক রকমের পরে, ইন্দোনেশিয়ার লোকেরা আরেক রকমের পরে।
পাগড়ি: একই প্রশ্ন: সলাত আদায়ে ইমাম সাহেবের জন্য কি পাগড়ি জরুরী? আমরা অনেকে মনে করে থাকি যে ইমাম সাহেব পাগড়ি পরবেন আর মুসল্লিরা টুপি পরবেন। আমাদের উপমহাদেশে এই পাগড়ি একটা শ্রেণীর নির্দিষ্ট পোশাকে পরিণত হয়েছে। যেমন পাগড়ি সাধারণত ইমাম সাহেব, পীর সাহেব, মাওলানা সাহেব বা মোয়াজ্জিন সাহেব পরে থাকেন। আমাদের বিশ্বাসের মধ্যেও এই বিষয়টি এমনভাবে ঢুকে গেছে যে আমরা ধরেই নিয়েছি যে এটি তাদের পোশাক, কিছুটা সেনা বাহিনীর র‍্যাংকের মতো। যা হোক এখানে কাউকে হেয় বা ছোট করা হচ্ছে না, শুধু বিষয়টা পরিষ্কার করার চেষ্টা করা হচ্ছে মাত্র।
টুপির মতো পাগড়িও সলাতের জন্য জরুরী নয় এবং এই পাগড়ি যে কেউ চাইলেই পরতে পারে, এর সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা আরবের ইতিহাস থেকে জেনেছি যে এরাবিয়ানদের কালচারাল পোশাক কী ছিল। আমাদের ভারত উপমহাদেশে শিখরা পাগড়ি পরে। আর বিয়েতে তো দেখা যায় সব ধর্মের বর-ই পাগড়ি পরে, বরের পুরুষ আত্মীয়রাও বিয়ের দিন পাগড়ি মাথায় দেয়। এটা ধর্মীয় পোশাক নয়, স্থানীয় সামাজিক, কালচারাল বিষয়।
পায়জামা-পাঞ্জাবী বা জুব্বা: একই প্রশ্ন: সলাত আদায়ের জন্য পায়জামা- পাঞ্জাবী বা জুব্বা কি জরুরী (অত্যাবশ্যক)? মরু-ঝড় থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য এবং প্রচন্ড রোদের তাপ থেকে আত্মরক্ষার জন্য এরাবিয়ানরা যে হেডস্কার্ফ ব্যবহার করতো তা দিয়ে তারা মাথা ও মুখ ঢেকে রোদে চলা ফেরা করতো। ঐ একই কারণে তারা এক ধরণের জুবব্বা (লম্বা ঢিলা পোশাক) ব্যবহার করতো, যা তাদের প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রেহাই পেতে সাহায্য করতো, রোদের তীব্র তাপ থেকে রক্ষা করতো, শীত থেকে রক্ষা করতো। তাই তারা জুব্বা পরতো।
আমরা জানি যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে অনেক দেশেই মুসলিমদের পাশাপাশি প্রচুর খৃষ্টান-ইহুদী নাগরিক রয়েছে, তারা অমুসলিম, তাদের ভাষাও আরবী, তারাও ঐ এরাবিয়ান কালচারের পোশাক জুব্বা পরে থাকে, অর্থাৎ আরবে মুসলিম-অমুসলিম সকলেই একই পোশাক পরে। তাই একথা বলা যাবে না যে ঐ জুব্বা শুধু মুসলিমদের পোশাক বা ইসলামী পোশাক। সাহাবীরা ইসলাম গ্রহণের পূর্বে অমুসলিম অবস্থায় যে পোশাক পরতেন মুসলিম হওয়ার পরও ঠিক ঐ একই পোশাক পরতেন। ইসলামের জন্য তাদের পোশাকের কোন পরিবর্তন হয়নি। ঐ সময় আবু লাহাব, আবু জাহিলও একই পোশাক পরতো। একই দৃশ্য আমাদের ভারত উপমহাদেশে। এই অঞ্চলে হিন্দুরাও পায়জামা-পাঞ্জাবী পরে, কিন্তু তাই বলে মুসলিমরা দাবী করে বলতে পারবো না যে ওরা ইসলামী পোশাক পরে। এখনো সারা পৃথিবীতে খৃষ্টান পাদ্রিরা সাদা রঙের জুববা পড়েন।
সুট-টাই: বর্তমানে বাংলাদেশে এই সুট-টাই নিয়ে চলছে এক মহাবিতর্ক। প্রশ্ন করা হচ্ছে: Peace TV-র ডা. জাকির নায়েক ইসলামের কথা বলেন অথচ তিনি সুট-টাই পরেন কেন? আমাদের অজ্ঞতার কারণে আমরা বিষয়টি সম্পর্কে সঠিকভাবে জানি না বা বিষয়টি নিয়ে কুরআন ও হাদীসের আলোকে কখনো গভীরভাবে চিন্তা করিনি বলেই এই প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের মধ্যে একটি বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছে যে ইসলামী পোশাক মানেই পায়জামা, পাঞ্জাবী ও জুববা, আর সুট-টাই মানেই হচ্ছে ইংরেজ খৃষ্টানদের ড্রেস। আমাদের অনুসন্ধান করে জানতে হবে যে এই পায়জামা, পাঞ্জাবী ও জুববা এবং সুট-টাই-এর ইতিহাস কী? কুরআন ও হাদীসে এ বিষয়ে কী নির্দেশ আছে? ইসলামী পোশাকের বিষয়ে কুরআনের সূরা আহযাব ও সূরা নূরে স্পষ্ট ভাষায় বলে দেয়া আছে যে মুসলিম নারী ও পুরুষদের পোশাক হতে হবে ঢিলাঢালা, যেন শরীরের অংগ-প্রত্যঙ্গের গঠন অপরের চোখে ফুটে না উঠে। সেই হিসেবে পায়জামা, পাঞ্জাবী, জুব্বা, সুট-টাই সকল মুসলিমের জন্য উত্তম পোশাক।
ইসলামের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে, সুট-টাই মুসলিমদের আবিস্কার, এক সময় শীত নিবারণের জন্য তারা সুট-টাই ব্যবহার করতো। আমরা যারা সুট-টাইকে অমুসলিমদের পোশাক বলে মনে করি তাদের ধারণাটা ঠিক না। কেউ কেউ বলে থাকেন যে, টাই খৃষ্টানদের ধর্মীয় প্রতীক। এই কথাটা মোটেও ঠিক না। যেকোন কথা বললে তার দলিল থাকতে হবে, সেই কথার ভিত্তি থাকতে হবে। টাই এবং খৃষ্টানদের ক্রুশের মধ্যে ধর্মীয় সম্পর্ক রয়েছে এটা একটা ভ্রান্ত ধারণা। টাই খৃষ্টানদের ধর্মীয় প্রতীক নয় এবং এ বিষয়ে খৃষ্টান আলেমরা কিছুই জানেন না, যেহেতু এর সাথে তাদের ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই। আবার কেউ কেউ বলেন টাই দেখতে খৃষ্টানদের ক্রুশের মতো লাগে। এই ধরনের ধারণাও বোকামী, কারণ ক্রুশের মতো দেখতো তো অনেক কিছুই লাগে যা আমরা মুসলিমরা ব্যবহার করে থাকি, যেমন আমাদের হাফ-শার্ট, ফুল-শার্ট, টি-শার্ট, পাঞ্জাবী, জুব্বা, শেরোয়ানী, কোট, কামিজ, ব্লাউজ ইত্যাদি; এ সবই মেলে ধরলে দেখতে ক্রুশের মতো লাগবে, তাই বলে কি এগুলো খৃষ্টানদের ধর্মীয় পোশাক? মোটেও না। এমনকি একজন মানুষও দুই হাত মেলে দাঁড়ালে তাঁকেও ক্রুশের মতো লাগবে।
এই বিষয়গুলো নিয়ে যেন আমরা নিজেদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি না করি এবং বিষয়গুলো নিয়ে যেন বিতর্ক সৃষ্টি না করি। কেউ যেন মনে না করি যে এখানে টুপি, পায়জামা, পাঞ্জাবী, জুব্বা, পাগড়ি ইত্যাদিকে ছোট করা হচ্ছে। মোটেও তা নয়। কেউ যদি এগুলো পরতে চান, পরতে পারেন, কিন্তু এগুলো নিয়ে ধর্মীয় বাড়াবাড়ি করা মোটেও ঠিক নয়, এটাই এখানে বুঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। সুন্নাতি পোশাক বা ইসলামী পোশাক বলতে কুরআন বা হাদীসে কোন dress code অথবা বিধিবদ্ধ কোন নির্দেশ নেই। যা আছে তা আছে সূরা নূর (২৪) এবং সূরা আহযাবে (৩৩)। পোশাক হতে হবে শালীন, সুন্দর, উলংগতা বর্জিত, তা হতে হবে যৌন-উত্তেজনা সৃষ্টি থেকে মুক্ত, অনায়াসে পরিধানযোগ্য, এবং পোশাক যেন পরিধানকারীর মনে গর্বের সৃষ্টি না করে। পোশাকটা হতে হবে সুন্দর, কুৎসিৎ নয়, কারণ আল্লাহ কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন যে সলাতে তোমরা তোমাদের সুন্দর পোশাকটি পরে দাঁড়াবে। [সূরা আ'রাফ ৭ঃ ৩১]

📘 মুসলিম পরিবারের ছেলেমেয়েরা কেন ইসলাম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে > 📄 ৫ বছরে মুসলিমদের ইসলাম ধর্ম ত্যাগের পরিসংখ্যান

📄 ৫ বছরে মুসলিমদের ইসলাম ধর্ম ত্যাগের পরিসংখ্যান


আমাদের নিজেদের বিবিধ অবহেলার কারণে, নিজেদের মধ্যে নানা বিষয়ে দ্বন্দ্ব এবং কোন্দলের কারণে, রাজনৈতিক রোশানলে পরে, অর্থনৈতিক অভাবে পরে ইসলাম থেকে দূরে সরে যাওয়ার দৃশ্য শুধু বাংলাদেশে নয় আজ সারাবিশ্বেই দেখা যাচ্ছে। ইন্টারনেটে সার্চ দিলে বিভিন্ন রিসার্চ অর্গানাইজেশনের ভিন্ন ভিন্ন বছরের ডাটা পাওয়া যাবে। নিম্নে আমাদের মুসলিমদের ইসলাম থেকে দূরে সরে যাওয়ার গত পাঁচ বছরের একটি চিত্র তুলে ধরা হলো।
• শুধু আফ্রিকাতে প্রতিদিন ১৬,০০০ মুসলিম ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে এবং বছরে ৬ মিলিওন মুসলিম খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে।
• ইংল্যান্ডে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করেছে ২০০,০০০।
• গত দুই বছরে ৫০,০০০ ইরানীয়ান মুসলিম ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে।
• মালয়শিয়াতে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করেছে ২৫০,০০০।
• ফ্রান্সে প্রতি বছর ১৫,০০০ মুসলিম ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে।
• তার্কীতে প্রতি বছর ৩৫,০০০ মুসলিম ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে।
• কাজাকিস্তানে গত দুই বছরে ১০০,০০০ মুসলিম ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে।
• ইন্দোনেশিয়াতে প্রতি বছর ১০,০০০ মুসলিম ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে।
• রাশিয়াতে এ পর্যন্ত ২ মিলিয়ন মুসলিম ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে।
• এছাড়া প্রতি বছর ইন্ডিয়া এবং বাংলাদেশে হাজার হাজার মুসলিম ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে থাকে।

আমাদের নিজেদের বিবিধ অবহেলার কারণে, নিজেদের মধ্যে নানা বিষয়ে দ্বন্দ্ব এবং কোন্দলের কারণে, রাজনৈতিক রোশানলে পরে, অর্থনৈতিক অভাবে পরে ইসলাম থেকে দূরে সরে যাওয়ার দৃশ্য শুধু বাংলাদেশে নয় আজ সারাবিশ্বেই দেখা যাচ্ছে। ইন্টারনেটে সার্চ দিলে বিভিন্ন রিসার্চ অর্গানাইজেশনের ভিন্ন ভিন্ন বছরের ডাটা পাওয়া যাবে। নিম্নে আমাদের মুসলিমদের ইসলাম থেকে দূরে সরে যাওয়ার গত পাঁচ বছরের একটি চিত্র তুলে ধরা হলো।
• শুধু আফ্রিকাতে প্রতিদিন ১৬,০০০ মুসলিম ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে এবং বছরে ৬ মিলিওন মুসলিম খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে।
• ইংল্যান্ডে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করেছে ২০০,০০০।
• গত দুই বছরে ৫০,০০০ ইরানীয়ান মুসলিম ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে।
• মালয়শিয়াতে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করেছে ২৫০,০০০।
• ফ্রান্সে প্রতি বছর ১৫,০০০ মুসলিম ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে।
• তার্কীতে প্রতি বছর ৩৫,০০০ মুসলিম ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে।
• কাজাকিস্তানে গত দুই বছরে ১০০,০০০ মুসলিম ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে।
• ইন্দোনেশিয়াতে প্রতি বছর ১০,০০০ মুসলিম ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে।
• রাশিয়াতে এ পর্যন্ত ২ মিলিয়ন মুসলিম ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে।
• এছাড়া প্রতি বছর ইন্ডিয়া এবং বাংলাদেশে হাজার হাজার মুসলিম ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে থাকে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00