📄 “লাকুম দীনুকুম ওয়াল ইয়াদীন” আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা
অনেক বুদ্ধিজীবী এবং রাজনীতিবিদ সূরা কাফিরুনের (কুরআনের ১০৯ নম্বর সূরা) শেষের আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করে থাকেন। তারা বলেন, আল্লাহ নিজেই তো ধর্মনিরপেক্ষ। তখন তারা সূরা কাফিরুনের শেষ আয়াত quote করে বলেন যে "লাকুম দীনুকুম ওয়াল ইয়াদীন" অর্থাৎ তোমার ধর্ম তোমার, আমার ধর্ম আমার। কিন্তু তারা এই সূরার আগের আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা পড়েন না এবং এই সূরা নাযিলের উদ্দেশ্যই জানেন না। কখন এবং কেন আল্লাহ তাঁর নাবী -কে এই কথা কাফিরদেরকে বলতে বলেছিলেন সে সম্পর্কে এদের কোন ধারণাই নেই। দেখা যাক পুরো সূরাতে আল্লাহ কাফিরদেরকে কী বলছেন। আল্লাহ নাবী মুহাম্মাদ -কে নির্দেশ দিচ্ছেন...
(১) বল: হে কাফিররা! (২) আমি তার ইবাদত করি না যার ইবাদত তোমরা কর। (৩) এবং তোমরাও তাঁর ইবাদতকারী নও, যাঁর ইবাদত আমি করি। (৪) এবং আমি ইবাদতকারী নই তার, যার ইবাদত তোমরা করে আসছো। (৫) এবং তোমরা তাঁর ইবাদতকারী নও, যাঁর ইবাদত আমি করি। (৬) তোমাদের জন্য তোমাদের কর্মফল (দ্বীন) এবং আমার জন্য আমার কর্মফল (দ্বীন)।
কাফিররা যখন ইসলামের দাওয়াত গ্রহণ করছিল না এবং এক পর্যায়ে তারা রসূল -কে প্রস্তাব দিয়েছিল যে ঠিক আছে, আসুন আমরা একটা চুক্তি করি। আপনি কিছুদিন আমাদের মূর্তি পূজা করবেন তারপর আমরা কিছুদিন আপনার ইসলাম পালন করবো। এর উত্তরে আল্লাহ তা'আলা কঠোর হয়ে বলেছেন ঐ চুক্তির কোন প্রয়োজন নেই, বল তোমাদের ধর্ম তোমাদের, আমার ধর্ম আমার। অর্থাৎ বিধর্মী ও ধর্মহীনরা (যেমন আজকের বুদ্ধিজীবি শ্রেণী) তোমরা তোমাদের ধর্মবিশ্বাস বা অবিশ্বাস নিয়েই থাকো আমরা মুসলিমরা আমাদের ধর্ম নিয়েই থাকব। অতএব এই আয়াত এবং এই সূরা ধর্ম নিরপেক্ষতার সম্পূর্ণ বিপরীত।
এই আয়াতটি বুঝার জন্য আমাদেরকে সবগুলো মক্কী সূরার তাফসীর ভাল করে পড়তে হবে। শুধু মাঝখান থেকে একটি বা দুটি আয়াত নিয়ে quote করলে হবে না কারণ তাতে ভুল ব্যাখ্যার আশংকাই অধিক, যেমনটি আজকাল হচ্ছে।
📄 দেশের উন্নতিতে ইসলাম কি প্রতিবন্ধক?
ব্লগে, টক শো'তে বা পত্র-পত্রিকার আলোচনায় অনেকে বলেন: 'দেশের উন্নয়নের জন্য ধর্মের প্রয়োজন নেই। ধর্ম আরো সমস্যা তৈরী করে। তাই অনেকেই ধর্ম, বিশেষ করে ইসলামের, বিরোধিতা করে থাকে।' আসলে বিষয়টা কি তাই?
আধুনিক যুগে যে সকল দেশ উন্নত হিসেবে বিবেচিত তাদের দিকে একটু তাকিয়ে দেখি। তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মকে কিভাবে নিয়েছে। কয়েকটি দেশের উদাহরণ দেখা যাক। তারা ধর্মের সাথে, বিশেষ করে ইসলামের সাথে কেমন আচরণ করেন।
ক্যানাডা
ক্যানাডা পৃথিবীর ৪র্থ শান্তিপ্রিয় এবং একটি অমুসলিম দেশ। আমরা জানি বাংলাদেশ একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ, আর স্বাভাবিকভাবেই সে দেশে ইসলামী নীতি পালিত হওয়ার কথা বেশী। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে যে আমাদের দেশে আমরা মুসলিম হিসেবে যতটা না ইসলামী নিয়ম-কানুন পালন করি ক্যানাডা একটি অমুসলিম দেশ হওয়া সত্ত্বেও সেদেশের সরকার আমাদের চেয়ে অনেক বেশী ইসলামী নিয়ম-কানুন পালন করে যাচ্ছে। আমরা মুসলিম হয়ে ইসলামী নিয়ম-কানুন ত্যাগ করেছি আর অমুসলিমরা তা গ্রহণ করে উপকৃত হচ্ছে।
ধর্মীয় অধিকার (Religious rights) : এদেশে প্রত্যেক ধর্মের লোকদের সমান অধিকার। কেউ কারো ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করতে পারবে না বা হেয় করতে পারবে না। যে যার ধর্ম অন্য ধর্মের লোকের নিকট প্রচার করতে পারবে। অর্থাৎ যার যার ধর্ম ঠিক মতো পালন করতে পারবে। যেমন: অফিসে সলাতের সময় হলে সলাতের জন্য সময় দিতে হবে বা রমাদানে ইফতারের জন্য সময় দিতে হবে। আবার কেউ চাইলে যে কারো বাসার দরজায় গিয়ে নক করে তার ধর্মের দাওয়াত দিতে পারে, ধর্মীয় বইপত্র দিতে পারে। অথবা কোন শপিং মলে বা ব্যস্ততম রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে যে কেউ যে কোন ধর্মগ্রন্থ বিলি ও ধর্মপ্রচার করতে পারেন।
আইন : কেউ যদি কোন দাড়িওয়ালা মুসলিমকে দাড়ির কারণে রাস্তা-ঘাটে অপমান করে বা টুপি পড়ার জন্য অপমান করে বা কোন মহিলাকে বোরকা পরার জন্য বা নিকাব করার জন্য অপমান করে তাহলে তৎক্ষনাৎ তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার পদ্ধতি বাস্তবে কার্যকর রয়েছে। তাই অন্য ধর্মের লোকেরাও এই বিষয়ে খুবই সাবধাণতা অবলম্বন করে থাকে। ক্যানাডার মুসলিমরা এখানে সবচেয়ে শান্তিপ্রিয় নাগরিক হিসেবে গন্য হয়েছে।
স্কুল/কলেজ : ক্যানাডাতে প্রচুর ইসলামিক স্কুল রয়েছে। হাজার হাজার ছেলেমেয়েরা সেখানে পড়াশোনা করছে, ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে। মেয়ে ছাত্রীরা এবং শিক্ষিকারা হিজাব পরে নিয়মিত স্কুল করছে। ইসলামিক সাবজেক্টগুলো শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষায় অতিরিক্ত মার্ক হিসেবে যুক্ত হচ্ছে।
সংগঠন (অর্গানাইজেশন) : এখানে অনেক ইসলামিক অর্গানাইজেশন রয়েছে যারা ইসলাম প্রচার এবং সামাজিক কর্ম-কান্ড করে থাকে। চাইলেই যে কেউ মিনিস্ট্রি থেকে রেজিস্ট্রেশন করে ইসলামিক অর্গানাইজেশন চালু করতে পারে। এই সকল ইসলামিক অর্গানাইজেশনের সদস্য হয়ে হাজার হাজার নরনারী সমাজসেবামূলক কাজকর্ম করছেন। এই ধরণের কাজের জন্য ইমিগ্রেশন মিনিষ্টার সরকারীভাবে প্রতি বছর এওয়ার্ড পুরষ্কার দিয়ে থাকেন।
ইনস্টিটিউশন : এখানে অনেক হালাল ফাইনানসিয়াল ইনস্টিটিউশন রয়েছে। যারা সুদমুক্ত অর্থনীতির কারবার করে থাকে। যেমন সুদবিহীন লোন দিয়ে বাড়ি কেনা, সুদমুক্ত পেনশন স্কিম, ছাত্রদের জন্য সুদমুক্ত এডুকেশন স্কিম এবং হালাল ইনভেস্টমেন্ট সার্ভিস রয়েছে।
সিঙ্গাপুর ওদেশে সরকার চালান মূলতঃ সংখ্যাগরিষ্ঠ চাইনিজ অরিজিনের লোকেরা। ইসলাম ধর্মের বিরোধিতা করে না তাঁরা। কিন্তু তাঁরা মুসলিমদের কী পরিমাণ সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে তা বলে শেষ করা যাবে না। সিঙ্গাপুরে বসবাসরত যেকোন পরিবারের সাথে কথা বললেই তা জানা যায়। বিশাল বিশাল মসজিদ বানিয়ে সরকারী বেতন দিয়ে খতিব-ইমাম-মুয়াজ্জিনদের রাখা হয়েছে সলাত আদায় করানোর জন্য। প্রতিটি এলাকাতেই একটি করে মসজিদ রয়েছে এবং প্রতিটি মসজিদেই রয়েছে আফটার স্কুল মাদ্রাসা। মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদেরকে বৃত্তি দেয়া হয় আরব দেশে গিয়ে কুরআন অধ্যয়নের জন্য, ইসলাম শেখার জন্যে। মুসলিমদের নানা রকম সেবা দেয়ার জন্য সিঙ্গাপুর সরকারের মন্ত্রনালয়ে 'মুইস' নামক একটি বিভাগ রয়েছে। মুসলিমদের জন্য সর্বত্রই হালাল খাবার পাওয়া যায়। এজন্য হালাল মনিটরিং অথরিটি রয়েছে যারা মুসলিমদের জন্য হালাল মাংস এবং অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের পরীক্ষার পর সার্টিফিকেশন দিয়ে থাকে এবং প্যাকেটের গায়ে লিখা থাকে 'হালাল'।
অস্ট্রিয়া অস্ট্রিয়া যদিও একটা সেকিউল্যার দেশ, কিন্তু সেখানে সকল ধর্মকে আন্ত রিকভাবেই সম্মান করা হয়। যদি কোন সরকারী স্কুলের কোন ক্লাসে ৬-৭ জন মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীও থাকে, তাদের জন্যে স্কুলের পক্ষ থেকেই একজন ইসলামিক স্টাডিজের শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে তাদেরকে ইসলাম শিক্ষা দেয়া হয়।
ইংল্যান্ড
ইংল্যান্ড একটা সেকিউল্যার দেশ। তারপরও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুন বলে থাকেন- এই ইংল্যান্ড খৃষ্টানদের। তারপরও কেউ ইসলামসহ অন্য কোন ধর্মকে প্রকাশ্যে অবমাননা করলে তার শাস্তির বিধান আছে এবং শাস্তি দেয়াও হয়। বাংলাদেশে এখনো মাত্র তিনটি সরকারী মাদ্রাসা। কিন্তু ইংল্যান্ড সরকারী মাদ্রাসার সংখ্যা অনেক।
ইংল্যান্ডের ইস্ট লন্ডন এলাকায় গেলে মনে হবে কোন মুসলিম দেশে প্রবেশ করেছি। চারিদিকে দাড়ি-টুপিওয়ালা লোক। প্রচুর মসজিদ এবং ইসলামিক স্কুল। সেখানে মাইকে আযান দেয়া হয়। মুসলিমদের নামে পার্ক এবং রাস্তা রয়েছে। ইস্ট লন্ডনের রাস্তায় যতো হিজাব পরিহিতা মহিলা দেখা যায় তা মুসিলমদেশের রাজধানী ঢাকার রাস্তায়ও দেখা যায় না।
আমরা বিভিন্ন উন্নত দেশের সরকারগুলোর ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি মনোভাব ও কার্যক্রম সম্পর্কে জানলাম। এর বিপরীতে যদি মুসলিম প্রধান বাংলাদেশের অবস্থা চিন্তা করি? লেখক নিয়মিত ক্যানাডার টরোন্টো শহরের ব্যস্ততম রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ইসলাম প্রচার করেন, ইসলামী বইপুস্তক ও কুরআন অমুসলিমদের মাঝে বিলি করেন। অসংখ্য লোক এই জায়গায় (ইটন সেন্টার) দাঁড়িয়ে মুসলিম হয়েছেন, আলহামদুলিল্লাহ।
বাংলাদেশ উন্নত হবার জন্যে ধর্মের বা ইসলামের দরকার আছে কি-না, বা কতটুকু দরকার আছে তা নিয়ে হয়ত আলোচনা বা বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু একটা বিষয়ে কোন দ্বিমত করার সুযোগ নেই যে, ধর্মের বিরোধিতা করে দেশকে কোন ক্রমেই উন্নত করা যায় না। আমাদের সম্মানিত রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজ, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদেরকে এই সহজ সত্যটা বুঝতে হবে। এখনো সময় আছে। তা না হলে আমাদেরকে আরো জঘন্য পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে।