📄 দ্বীনের সঠিক জ্ঞানের অভাব
দুঃখের বিষয়, আমরা বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ এটাই জানিনা যে দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে আমরা জানি না। পাক-ভারত-বাংলাদেশের অনেক মানুষই দ্বীন ইসলামের সওয়াবের কাজ মনে করে অনেক সময় খুব বেশী বেশী শিরক ও বিদ'আতি কাজ নিয়মিত করে যাচ্ছি। আমরা কুরআন থেকে নিজেদেরকে অনেক দূরে সরিয়ে রেখে নিজেদের মনগড়া ইসলাম পালন করে যাচ্ছি। আমাদের মধ্যে খুব কম লোকই পাওয়া যাবে যিনি জীবনে একবার সম্পূর্ণ কুরআনটা অর্থ বুঝে ব্যাখ্যাসহ পড়েছে, সহীহ হাদীসগ্রন্থগুলো পড়েছে। আল্লাহ বলেছেন, কুরআন মানুষের জন্যে পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান (complete code of conduct for life) অর্থাৎ আমাদের জীবন পরিচালনার গাইডলাইন।
আফসোস, সারা জীবন শুধু কুরআন তিলাওয়াতই করে গেলাম কিন্তু কিছুই বুঝলাম না! আর যদি কুরআন নাই বুঝি তাহলে আল্লাহর দেয়া জীবন পরিচালনা করব কিভাবে?
আমাদের সকলের মধ্যে একটা ভুল ধারণা সবসময় কাজ করে যে, যারা কুরআন-হাদীস নিয়ে মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন শুধু তারাই ইসলাম চর্চা করবেন এবং এই বিষয়টা শুধু তাদের জন্যেই। আমরা যদি উন্নত বিশ্বের দিকে তাকাই তাহলে দেখা যায় যে, হাজার হাজার ইসলামিক স্কলার ইউরোপ, আমেরিকা, ক্যানাডা, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকায় দ্বীন ইসলামের কাজ করে যাচ্ছেন যাদের মাদ্রাসার কোন ড্রিগ্রি নাই অথচ তারা একেক জন বিভিন্ন বিষয়ের উপর ডক্টরেট। এদের আহবানে হাজার হাজার নন-মুসলিম ইসলাম গ্রহণ করছেন।
রসূল বলেছেন: দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেকটি মুসলিম নরনারীর জন্য ফরয (ইবনে মাজাহ ও বাইহাকী)। ঈমানের অন্যতম দাবী হলো দ্বীনের জ্ঞানার্জন করা। আমার যদি নূন্যতম জ্ঞানই না থাকে তাহলে কিভাবে নিজ পরিবারকে দ্বীনের আলোকে গাইড করবো? কিভাবে সন্তানদের অন্তরকে সামান্য হলেও দ্বীনের আলোয় আলোকিত করবো? যুগ পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমার ভাসাভাসা আর আবোলতাবোল দ্বীনি জ্ঞান দিয়ে উঠতি বয়সের সন্তানদের আর বুঝ দেয়া যাবে না। তারা এখন লজিক চায়, তারা দ্বীনের ইনটেলেকচুয়াল ব্যাখ্যা চায়। আমরা নিজেরাই যদি আমাদের দ্বীন সম্পর্কে যথেষ্ট না জানি, আমাদের সন্তানদের কিভাবে আমরা দ্বীনের জ্ঞান দেবো?
📄 ভুল ইসলাম চর্চার প্রভাব
ইবলিস শয়তানের পলিসি হচ্ছে মুসলিমদেরকে কুরআনের সঠিক শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা, কুরআনের সঠিক ব্যাখ্যা বুঝতে না দেয়া। কারণ আমি যদি কুরআন বুঝে সেই অনুযায়ী আমার জীবন পরিচালনা করতে থাকি তাহলে সেখানেই ইবলিস শয়তানের ব্যর্থতা।
তাই শয়তান সুকৌশলে মানুষকে বোকা বানানোর জন্য বেছে নিয়েছে কুরআনকেই কিন্তু ভিন্ন উপায়ে। যেমন: খুব সহজে কিভাবে কিছু দু'আ-দুরূদ পড়ে জান্নাত লাভ করা যাবে, কোন্ দু'আ কত হাজার বার পড়লে কী হবে, কোন্ আয়াত জাফরান দিয়ে লিখে পেটে বেঁধে রাখলে বাচ্চা হবে, কোন্ দু'আ পড়ে চাল পড়া দিয়ে চোর ধরা যাবে, কোন্ আয়াত লিখে বালিশের নিচে রেখে ঘুমালে প্রেমিকাকে পাওয়া যাবে, কোন্ দুরূদ কাগজে লিখে পানিতে ভিজিয়ে ভিজিয়ে খেলে রোগ মুক্তি হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। এই ধরনের আমলের কোন সহীহ দলিল কুরআন বা সহীহ হাদীসে নেই। বাজারে এই ধরনের অনেক বই-ই পাওয়া যায়, যেমন: মকছুদুল মোমিনীন, বেহেশতের পথ, নেয়ামুল কুরআন, আমলে নাজাত, আমালে কুরআন, সোলেমানী খাবনামা, নূরানী মজমুয়ায়ে পাঞ্জেগানা অজিফা, ফাজায়েলে আমল, বেহেশতী জেওর ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই এই ধরনের ভিত্তিহীন বই- পাপ, অজীফা এবং মানুষের বানানো দুরুদ হতে খুব সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।
* ইবলিশ শয়তান আমাদের সহজে অনেক সওয়াব অর্জন করা যায় এমন আমলের লোভ দেখায়, যাতো তাওয়াল্লার শর্টকাট রাস্তা দেখায়। সে বলে এই দু'আ ৪০ বার পড়লে ৮০ বৎসরের গুনাহ মাফ হয়ে যাবে, ঐ দুরুদ এতোবার পড়লে ১ লক্ষ ফিরিশতা কিয়ামত পর্যন্ত দু'আ করতে থাকবে। এ কথা শুনে আমরা বলি ‘সুবহানাল্লাহ’, এর ফলিলত এতো!
* এসব সহজে অর্জিত ফযিলতের মিথ্যা আশ্বাসের কারণে গুনাহের প্রতি মানুষের ভয় কমে যাচ্ছে, ফলে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে। তখন মানুষ মনে করে ২-৫ টা গুনাহ করলে কী আর ক্ষতি হবে? অমুক দু'আ পড়লে তো ৮০ বছরের গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। এভাবে শয়তান অসচেতন লোকদেরকে তথাকথিত সহজ আমলের মাধ্যমে অর্জিত অফুরন্ত সওয়াবের লোভ দেখিয়ে ইসলামের মূল শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।
* মনে রাখতে হবে, আমি আমার জীবনে ইবাদত মনে করে যা কিছু করবো তা কুরআন অথবা সহীহ হাদীসে অবশ্যই থাকতে হবে। কেউ যদি আমাকে কোন স্পেশাল দু'আ-দুরুদ বা কোন মহাপুণ্যের আমলও শিখিয়ে দেয় তাহলে অবশ্যই তার authentic দলিল চাইতে হবে অথবা আমি নিজে কুরআন ও সহীহ হাদীস ঘেঁটে তা অবশ্যই যাচাই করে নেবো। বাজারে দু'আ-দুরুদ এর যেসব বইপত্র পাওয়া যায় তার মধ্যে বেশীর ভাগই সহি (authentic) নয় অর্থাৎ কুরআন-হাদীস দ্বারা সমর্থিত নয়।
📄 ভুলে ভরা তথাকথিত ইসলামী সাহিত্যের প্রভাব
* ভুল শিক্ষা, বানোয়াট গল্প কাহিনী মানুষকে সহজেই পথভ্রষ্ট করে। ইসলামের উপর বাজারে অনেক বই-ই পাওয়া যায় যাতে মানুষের মধ্যে আবেগ (জজবা) সৃষ্টির জন্য এমন সব কথা তুলে ধরা হয়েছে যা সত্য নয়, যা কুরআন-হাদীসের আলোকে গ্রহণযোগ্য নয়।
* কুরআন ও সুন্নাহর বাইরে কোন ইসলাম নেই। কারামত ও সাজানো মজাদার গল্প-কাহিনী মানুষকে বিমোহিত করে ঠিকই কিন্ত তাতে অনেক সময় সমূহ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেহেতু ইসলাম-বিরোধী শক্তি মুসলিমগণকে কুরআন ও হাদীস দিয়েই ঘায়েল করার জন্য কুরআনের ভুল ব্যাখ্যা ও অসংখ্য মিথ্যা হাদীস ও গল্প বেশী ফায়েদার লালসা দেখিয়ে মুসলিম সমাজে ঢুকিয়ে দিয়েছে সেহেতু আমাদের প্রত্যেকের আরো বেশী সচেতন হওয়া উচিৎ। বিশেষ করে আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.), মঈনুদ্দিন চিশতী (রহ.), ইমাম গাজ্জালী (রহ.), রূমী (রহ.), বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.), শাহজালাল (রহ.), শাহপরাণ (রহ.) প্রমুখ ব্যক্তিদের নামে বাজারে নানা রকম কারামত সম্বলিত গল্পের বই পাওয়া যায় যা সত্য নয় এবং তাঁদের সঠিক জীবনীর সাথে কোন সম্পর্ক নেই। আর এই ধরনের বানানো গল্প কিচ্ছা-কাহিনী বিশ্বাস করা শিরকের অন্তর্ভুক্ত। ['কারামত' কথাটা ফার্সি যার অর্থ অলৌকিকতা, অসাধারণ শক্তি।]
আমাদের ঘরে এই ধরনের বইপত্রই কি পড়া হয়? যদি হয়ে থাকে, এগুলি দ্রুত বাতিল করি। আমরা যারাও বা ইসলামের পথে আসতে চাই, তারা এগুলি পড়ার মাধ্যমে প্রকৃত ইসলাম হতে দূরে সরে যাচ্ছি।
বাংলাদেশে ইসলামকে সহজ ভাষায় উপস্থাপন না করে এটাকে ভিনদেশী কায়দায় বিকশিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। মাওলানারা তাদের বয়ানে ঘনঘন উচ্চারণ করেন আরবি-ফার্সি ও উর্দু শব্দ, ভাষা ও কবিতা যা আমাদের সাধারণ লোকেরা বুঝেন না, এসব বলে তারা পান্ডিত্য জাহির করেন, শ্রোতারা চমৎকৃত হয়। যেহেতু কুরআনের ভাষা আরবী ও এদেশের মানুষের ভাষা বাংলা, তাই আরবী ও বাংলা ছাড়া অন্য কোন ভাষায় ইসলাম প্রচার বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা। এর একমাত্র ব্যতিক্রম হতে পারে ইংরেজী যা আজকাল অনেক শিশুর মাতৃভাষায় পরিণত হয়েছে।
📄 আল্লাহ ছাড়া অন্যের নিকট সাহায্য চাওয়া
একটা কথা সব সময় স্মরণে রাখা প্রয়োজন যে মহান আল্লাহ ছাড়া কারো কিছু করার বা দেয়ার ক্ষমতা নেই, তার জীবনকালে তিনি যতো বড় ওলি বা বুজুর্গই হোক না কেন। আমার ভাগ্যের পরিবর্তন, যেমন: ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকুরী, প্রোমোশন, সন্তান-সন্ততি, বাড়ি-গাড়ি, রোগ-মুক্তি, আয়-উন্নতি, ব্যাংক ব্যাল্যান্স, ফসলের উন্নতি, পরীক্ষায় ভাল রিজাল্টস, স্বামী-স্ত্রীর মিল, বিদেশ গমন ইত্যাদি কোন পীর-মুর্শিদ বা কোন মাজার দিতে পারবে না। আর আমি যদি গায়রুল্লাহর (আল্লাহ বাদে অন্যকেউ) কাছে কোন কিছু পাওয়ার আশায় কোথাও যাই তাহলে সেটা হবে সরাসরি আল্লাহর সাথে শিরক।
আমার যা কিছু চাওয়ার সরাসরি আল্লাহর কাছে চাইব এবং ইন্শাআল্লাহ, আমার জন্য যা সবচেয়ে উত্তম ও কল্যাণকর, সেটাই আল্লাহ আমাকে দেবেন। এখানেই খাঁটি ঈমানের পরীক্ষা।