📄 বৃত্তি, ভাস্কর্য ও ইসলাম
আভিধানিক অর্থে ভাস্কর্য:
ভাস্কর্য বা স্কালপচার (Sculpture): যে আকৃতি বা ছবি পাথর বা অন্যকিছুতে খোদাই করে তৈরি করা হয় তা-ই ভাস্কর্য। 'ভাস্কর্য বিদ্যা'-এর অর্থ, The art of carving বা খোদাই বিদ্যা। যিনি এ বিদ্যা অর্জন করেছেন অর্থাৎ যিনি খোদাই করে আকৃতি বা ছবি নির্মাণ করেন, তাকে বলা হয় ভাস্কর (Sculptor)। অক্সফোর্ড অভিধানে ভাস্কর (Sculptor) সম্পর্কে বলা হচ্ছে- One who carves images or figures. অর্থাৎ যে ছবি অথবা আকৃতি খোদাই করে তৈরি করে।
পক্ষান্তরে মূর্তি অর্থ ছায়া অথবা এমন আকৃতি বা শরীর যার ছায়া আছে। ভাস্কর্য ও মূর্তির আভিধানিক অর্থে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা গেল। এককথায় যে সকল আকৃতি খোদাই করে তৈরি করা হয় তা ভাস্কর্য- রৌদ্র বা আলোর বিপরীতে যার ছায়া পড়ে না। আর যে সকল আকৃতি এমনভাবে নির্মাণ করা হয়, রৌদ্রে বা আলোর বিপরীতে যার ছায়া প্রকাশ পায়, তা হল মূর্তি। বিভিন্ন অভিধানে এভাবেই বলা হয়েছে।
কেউ কেউ মনে করেন যে সকল আকৃতি পূজা অর্চনার উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয় সেগুলোকে মূর্তি বলে। আর যা পূজার জন্য নয়, তার নাম ভাস্কর্য। এটা ঠিক নয়, পূজার জন্য হলেও মূর্তি, পূজার জন্য না হলেও মূর্তি।
কাজেই বিভিন্ন উন্মুক্ত স্থানে যে সকল মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে তাকে ভাস্কর্য বলে চালিয়ে দেয়া একটি মূর্খতা। উদ্দেশ্য হল, ভাস্কর্য শিল্পের নামে ইসলামী সংস্কৃতির বিরোধিতা করা এবং অন্ধকার যুগের পৌত্তলিক সংস্কৃতি-কে বাঙালীর সংস্কৃতি বলে প্রতিষ্ঠিত করা।
ভাস্কর্য সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি কী?
কোন প্রাণীর ছবি, ভাস্কর্য, মূর্তি একান্ত প্রয়োজন ব্যতীত তৈরি করা, প্রদর্শন করা বা স্থাপন করা যাবে না। ছবি, ভাস্কর্য, মূর্তি ইত্যাদিকে ইসলাম দু'ভাগে ভাগ করে। ১) প্রাণীর ছবি। ২) প্রাণহীন বস্তুর ছবি।
রসূলুল্লাহ ﷺ -এর হাদীসে এসেছে- আয়িশা (রাদিআল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রসূল' একদিন সফর থেকে ফিরে আসলেন। আমি একটি পর্দা টানিয়েছিলাম। যাতে প্রাণীর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছবি ছিল। রসূল ﷺ যখন এটা দেখলেন, ক্রোধে তার মুখমণ্ডল রক্তবর্ণ হয়ে গেল। তিনি বললেন, হে আয়িশা, কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি তার হবে, যে আল্লাহর সৃষ্টির সাদৃশ্য নির্মাণ করে।' অতঃপর আমি সেটাকে টুকরো করে একটি বা দুটি বালিশ বানালাম। (সহীহ মুসলিম)
আলী (রাদিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূল ﷺ আমাকে নির্দেশ দিয়ে পাঠালেন যে, 'কোনো প্রতিকৃতি রাখবে না, সবগুলো ভেঙে দেবে। আর কোনো উঁচু কবর রাখবে না, সবগুলো সমতল করে দেবে।' (সহীহ মুসলিম, আবু-দাউদ, আন-নাসাঈ)
আবু তালহা (রাদিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রসূল ﷺ বলেছেন, 'যে ঘরে কুকুর ও প্রতিকৃতি আছে সেখানে ফিরিশতা প্রবেশ করে না।' (সহীহ বুখারী, সহীh মুসলিম)
প্রাণী ব্যতীত যে কোনো বস্তুই হোক তার ছবি, ভাস্কর্য, মূর্তি ইত্যাদি অঙ্কন, নির্মাণ, স্থাপন ও প্রদর্শন করা যাবে। কারণ, হাদীসে যে সকল নিষেধাজ্ঞার কথা এসেছে তার সবই ছিল প্রাণীর ছবি বিষয়ে। কেউ যদি কোনো ফুল, ফল, গাছ, নদী, পাহাড়, চন্দ্র, সূর্য, ঝর্ণা, জাহাজ, বিমান, গাড়ি, যুদ্ধাস্ত্র, ব্যবহারিক আসবাব-পত্র, কলম, বই ইত্যাদির ভাস্কর্য তৈরি করে সেটা ইসলামে অনুমোদিত।
যতগুলো পৌত্তলিকতা-বিরোধী ধর্ম আছে তার মধ্যে ইসলাম সর্বশ্রেষ্ঠ ও পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে' বেশি সোচ্চার। পৌত্তলিকতা বা শিরক হলো মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি মারাত্মক অবিচার। এটা ক্ষমার অযোগ্য অন্যায়। এটা হলো আল্লাহর প্রভুত্বকে অস্বীকার করে তাঁর প্রাপ্য উপাসনা অন্যকে নিবেদন করা। অবশ্য যারা ভোগবাদী দর্শনে বিশ্বাসী, সৃষ্টিকর্তা ও পরকাল যাদের কাছে গুরুত্বহীন, তাদের কাছে পৌত্তলিকতা আর একত্ববাদ কোনো বিষয় নয়।
ছবি, প্রতিকৃতি, ভাস্কর্য আর মূর্তিকে ইসলাম পৌত্তলিকতার প্রধান উপকরণ বলে মনে করে। শুধু মনে করা নয়, তার ইতিহাস, অভিজ্ঞতা স্পষ্ট। শুধু ইসলাম ধর্ম যে পৌত্তলিকতাকে ঘৃণার চোখে দেখে তা নয় বরং আরো দুটি একেশ্বরবাদী ধর্মের অনুসারী ইহুদি ও খ্রিস্টানদের কাছেও তা ঘৃণিত।
অতীতে পৌত্তলিকতার সূচনা হয়েছিল ছবি বা প্রতিকৃতির মাধ্যমে। ছবি ও ভাস্কর্যের পথ ধরেই যুগে যুগে পৌত্তলিকতার আগমন ঘটেছে। আর এ পৌত্তলিকতার অন্ধকার থেকে তাওহীদের আলোতে নিয়ে আসার জন্যই আল্লাহ যুগে যুগে নাবী ও রসূলদের পাঠিয়েছেন। আজীবন তাঁরা এ পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম করেছেন। অনেকে জীবন দিয়েছেন। অনেকে দেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। এ জন্যই ইসলাম ও অন্যান্য একেশ্বরবাদী ধর্ম মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে সোচ্চার। মূর্তিপূজা ও পৌত্তলিক সংস্কৃতির বিরোধিতা করা তাদের ধর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
📄 সকল প্রশ্নের একমাত্র জবাব আমি মুসলিম
একজন মুসলিম, সে যতো বড় বাঙ্গালীই হোক, তাঁর কাছে কোনটা অধিক গৌরবের, কাহ্নপা জ্ঞানদাস-গোবিন্দদাস কি শ্রীচৈতন্য বা ন্যাড়ার ফকির সাঁইবাবাদের উত্তরাধিকার, নাকি মহানাবী এবং তাঁর অনুপম-চরিত্র সাহাবী (রা.)-দের উত্তরাধিকার? একজন মুসলিম সন্তানের অন্তর সত্যসত্যই কোন আনন্দে হিল্লোলিত হয়ে ওঠে, কবিগান-ঘেটুগান শারদীয় দুর্গোৎসব, রথযাত্রা, রাখীবন্ধন, ভাইফোঁটা ইত্যাদি নিয়ে, নাকি উমার (রা.), খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.), সালাহদীন আইয়ূবী, মুহম্মদ বিন কাসিম, মাহমুদ গজনাবী, বখতিয়ার খিলজী প্রমুখ বীর সিপাহসালার, যাঁরা ইসলামকে অপ্রতিহত বেগে ছড়িয়ে দিয়েছেন দিকে দিকে। এই শেষোক্ত গৌরবোজ্জ্বল উত্তরাধিকারকে যদি কেউ ভুলে থাকতে চায়, থাকতে পারেন; কেউ যদি অস্বীকার করতে চায়, তাও পারেন; কিন্তু সেটা যেহেতু ইসলামী চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, এই বিস্মৃতি ও অস্বীকৃতিকে ঘোরতর আত্মঘাতী বলা হবে।
আল কুরআনে আল্লাহ সমস্ত সমস্যার সমাধান দিয়েছেন, তিনি বলেন: এটাই আমার সহজ পথ সুতরাং এ পথ ধরেই চল। অন্য পথে যাবে না। তাহলে তোমরা পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে। (সূরা আন'আম ৬: ১৫৩)
নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন জাতির পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা নিজেরা নিজেদেরকে পরিবর্তন করে। (সূরা রা'দ ১৩: ১১)
মু'মিনদের বৈশিষ্ট্য এই যে, যখন তাদেরকে ফায়সালার জন্যে আল্লাহ ও রসূলের (বিধানের) প্রতি ডাকা হয়, তখন তারা বলে, আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম। আর এরূপ লোকেরাই প্রকৃত সফলকাম। (সূরা নূর ২৪: ৫১)
আজ তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে সম্পূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহকে সম্যকভাবে সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্যে ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম (মনোনীত করলাম)। (সূরা মায়িদা ৫:৩)
হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবারের লোকদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও যার ইন্ধন (জ্বালানী) হবে মানুষ ও পাথর। (সূরা আত তাহরীম: ৬)
সন্তানদেরকে এবং নিজ পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করার জন্য পিতামাতাদের যে গাইডলাইন প্রয়োজন তা আমাদের প্রকাশিত "ফ্যামিলি ডেভেলপমেন্ট প্যাকেজ" সংগ্রহ করে অনুসরণ করতে পারি।