📄 ভাষা নিয়ে ভাবনা
বার বার ব্যবহৃত হওয়ার কারণে অসংখ্য শব্দ ও শব্দবন্ধ এখন অবিচ্ছেদ্যভাবে মিশে গেছে হিন্দু ধর্ম ও হিন্দু সংস্কৃতির সঙ্গে। অর্থাৎ বাংলাভাষার একটি বিরাট অংশের উপর হিন্দু মানসতার দখলিস্বত্ব পাকাপাকিভাবে কায়েম হয়ে গেছে। এবং অনেক হিন্দু যে বাংলাভাষাকে একমাত্র তাদেরই ভাষা বলে মনে করে।
কিছু উদাহরণ পেশ করলেই আশা করি বিষয়টি পরিষ্কার হবে। 'সারদামঙ্গল' 'অন্নদামঙ্গল' 'মঙ্গলঘট' 'মঙ্গলপ্রদীপ' 'মঙ্গলাচার' 'মঙ্গলগীত' ইত্যাদি লিখতে লিখতে 'মঙ্গল' শব্দটিই এমন হয়েছে যে, 'মঙ্গলবার্তা' বা 'তোমার মঙ্গল হোক' এসবের মধ্যেও একটা হিন্দুয়ানী গন্ধ জেগে ওঠে। এভাবে 'অঞ্জলি' 'চরণ' 'প্রণাম' 'ব্রাতা' 'আরাধ্য' 'উপাসনা' 'সুপ্রভাত' 'স্বর্গাদপি' 'পিতৃদেব' 'পূজ্যপাদ' 'কীর্তন' 'লীলা' 'বিসর্জন' 'জল' 'প্রণাম' ইত্যাদি কতো যে শব্দ একান্তভাবে হিন্দুদের হয়ে গেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই।
• মুসলিম চেতনা ও বিশ্বাসের সংগে সাংঘর্ষিক যে সকল শব্দ ও উপমা 'দেবভাষা' সংস্কৃত ও অন্য উৎস থেকে আহৃত, সেই ধরনের শব্দাবলীর অনুচিত ও অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার বর্জন করতে হবে। উদাহরণত, যেখানে স্বাভাবিকভাবেই 'জান্নাত' 'জাহান্নাম' ব্যবহৃত হওয়ার কথা, সেখানে 'নরক' 'স্বর্গলোক' 'অমরাবতী' ব্যবহারের যৌক্তিকতা কোথায়? 'ইন্তিকাল' এর বদলে 'পরলোকগমন' 'মরহুম'-এর স্থলে 'প্রয়াত' লেখা বা বলার মধ্যে সত্যিই কি কোনো যৌক্তিকতা আছে?
📄 ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষতা
• মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় এক বুদ্ধিজিবী বলেন, "হিজাব পরে ভণ্ডামি করলে চলবে না। অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির জন্য নিজে আগে পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক হতে হবে। মাথায় পাগড়ি পরে আমরা একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ করিনি” অর্থাৎ এই বক্তা মহোদয়ের বহুমূল্য বিবেচনায় মুসলিমত্ব পুরোপুরি পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত আদৌ অসাম্প্রদায়িক হওয়া যায় না। আসলে ধর্মনিরপেক্ষতা হলো, Green Snake in Green grass, সবুজ ঘাসে হরিৎবর্ণ বিষধর সরিসৃপ। আর এই সরীসৃপটির কাজই হলো, যে কোন উপায়ে ইসলাম ও মুসলিমকে দংশন করা। ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে ৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদে আরো বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
📄 মিডিয়ানের কুপ্রভাব
গত কয়েক বছরে Music-এর (নাচ-গানের) চর্চা অকল্পনীয় মাত্রায় বেড়ে গেছে। দেশে যেখানে শিক্ষা-গবেষণা ও সুনাগরিক তৈরিতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নেই, সেখানে চরিত্রবিধবংসী নাচ-গানের পেছনে অনুদান বা বিনিয়োগ তথা আগ্রহের অন্ত নেই। যেখানে রোজই চিকিৎসার অর্থ না পেয়ে মৃত্যুর জন্য প্রহরগোনা অসহায় মানুষের করশ মুখ পত্রিকায় ছাপা হয় সেখানে বহুজাতিক কোম্পানি ও বড় বড় ব্যবসায়িক ইন্ডাস্ট্রিগুলো তাদের উপার্জিত অর্থের অনেকটাই ঢালে নৃত্য ও সঙ্গীতের পেছনে! এখনো যেদেশে বিরাটসংখ্যক মানুষের বাস দারিদ্র্যসীমার নিচে, আজো যারা পেটের আগুন নেভাতে গিয়ে নিজের ঈমান পর্যন্ত বিকিয়ে দিতে বাধ্য হয়, সেদেশেরই একশ্রেণীর নাগরিক নির্দ্বিধায় পঞ্চাশ হাজার টাকায় কেনে এক সন্ধ্যার কনসার্টের টিকেট! যেখানে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক নয়, সেখানে আবার অনেক কিন্ডারগার্টেনে নিষ্পাপ শিশুদের নৃত্য ও সঙ্গীত শেখা বাধ্যতামূলক! আমরা যে আজ নাচ-গানে কতটা মেতেছি তা প্রমাণে বোধ হয় আর কিছু বলার দরকার নেই। তারপরও খানেকটা ইঙ্গিত দেয়া যাক।
আসলে বাঙের ছাতার মতো যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা টিভি চ্যানেলগুলোই নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়াতে নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে নেমেছে মুসলিম সমাজকে গানে মাতাল বানাতে। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে নীতি ও আদর্শ বিবর্জিত ব্যবসায়ী কোম্পানিগুলো। 'ক্লোজ আপ নাম্বার ওয়ান', 'গাও বাংলাদেশ গাও', 'ক্ষুদে গানরাজ', 'নির্মাণশিল্পীদের গান', গার্মেন্ট শ্রমিকদের গান', 'বাংলাদেশ আইডল', 'শাহরুখ খান লাইভ ইন কনসার্ট', 'ডেসটিনি ট্রাইনেশন বিগ শো' ইত্যাদি সব শিরোনামের আড়ালেই রয়েছে এ দুই শ্রেণীর বস্তুগত উদ্দেশ্য।
মিডিয়ার অকল্পনীয় উন্নতির সুবাদে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীই মাতাল আজ এসব আয়োজনকে ঘিরে। দুঃখজনক সত্য হলো এসবে শুধু তরুণ প্রজন্মই মেতে নেই, মেতে আছেন একশ্রেণীর অপরিণামদর্শী অভিভাবক মহলও। নাচ-গান শেখানোর পেছনে নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ যদি তারা না ঢালেন, তবে তো নৃত্য-সঙ্গীতের স্কুলগুলো এত রমরমা ব্যবসা করতে পারে না। ইদানীং বিশ্বে অনেক কিছু নিয়েই জরিপ চালানো হয়। নাচ-গানে বিনিয়োগ-আত্মনিয়োগ নিয়ে যদি কোনো জরিপ পরিচালিত হয় তবে বাংলাদেশের মতো একটি গরিব দেশের নাম যে ওই তালিকার অন্যতম শীর্ষস্থানে থাকবে তাতে সন্দেহের কিছু নেই।
এতসব আয়োজন ও আয়োজকদের বদান্যতায় এ জাতি এতটাই মেতেছে, দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জর এ জাতি এতটা মাতাল হয়েছে যে ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষ কোনো শ্রেণীর মানুষই গানের জোয়ারে গা না ভাসিয়ে বসে থাকছে না। আর সে জোয়ারেই ভেসে যাচ্ছে তরুণ প্রজন্মের নীতি-আদর্শ ও কাম্য সচ্চরিত্র। যে ইভটিজিং ও যৌন অপরাধের ব্যাপক বৃদ্ধিতে এ দেশের চিরসবুজ শান্তির নিবাসগুলোতে জ্বলছে অশান্তির আগুন, তার অনেকখানি দায় এসব নাচ-গানকেন্দ্রিক আয়োজনের। অবৈধ ভালোবাসা আর জীবন ভোগের আহবানে সদা সরব এসব গান কাউকে স্বস্তি দিচ্ছে না। বরং তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে পাপের আগুনে ঘি ঢেলে দিচ্ছে।
এমন কোনো স্থান নেই যেখানে গেলে গানের আযাব থেকে সম্পূর্ণ পরিত্রাণ মেলে। ঘরে বলেন বা বাইরে, পথে বলেন কিংবা যানবাহনে সর্বত্র ওই কানে অগ্নিবর্ষণকারী গানের আওয়াজ। বাসায় ঘুমিয়ে, পড়াশোনা করে এমনকি পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করতে গিয়েও নিস্তার নেই এই গানের অশ্রাব্য আওয়াজ থেকে। ঘর থেকে বের হলেন তো সেরেছে! কোথায় যাবেন? দোকানে? সেখানেও কিন্তু গানের উপকরণের অভাব নেই। হেঁটে পথ পাড়ি দেবেন? সেখানেও দেখবেন মোবাইলে সজোরে গান শুনতে শুনতে কেউ না কেউ পথ চলছে। আর বাস বা যানবাহনের কথা তো বলাই বাহুল্য। বড় পরিতাপের বিষয় হলো একমাত্র নিরাপদ স্থান আল্লাহর ঘর মসজিদেও এই অভিশপ্ত গানের আওয়াজ ইদানীং কানে আসছে। অসচেতন কিছু মুসল্লী তাদের মোবাইলের রিংটোন হিসেবে গান ব্যবহার করায় এমনটি হচ্ছে। একজন মুসল্লী কিভাবে নিজের নিত্যসঙ্গী এই মোবাইল ফোনের রিংটোন হিসাবে গান পছন্দ করেন, তা কিছুতেই বোধগম্য নয়! তাহলে পাঠক একবার ভেবে দেখি, আমরা মুসলিমরা কোন পর্যায়ে চলে গিয়েছি যে, হারাম গানবাজনাকে সাথে নিয়েই মসজিদে প্রবেশ করি সলাত আদায়ের জন্য। এই সলাত হতে কিভাবে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আশা করি?
কেবল সংবাদ শোনা কিংবা নিছক ক্রিকেট খেলা দেখার অজুহাতে যারা টিভি দেখেন, তারাও আজ বিপদে আছেন। সংবাদের ফাঁকে বিজ্ঞাপনগুলোতে নাচ-গানের এমন দৃষ্টিকটু অনুপ্রবেশ থাকে যা তাদের মতো 'স্বল্পপুঁজির' ঈমানদারদেরও টিভির সামনে বসতে দ্বিধান্বিত করে।
আসলে নাচ-গানের ক্ষতিকারক দিক এত বেশি যে তা নাজায়েয হওয়ার জন্য আলাদা কোনো প্রমাণের দরকার পড়ে না। তদুপরি মহান আল্লাহ ও রসূলুল্লাহ -এর বহু ভাষ্য থেকে তা হারাম হওয়া প্রমাণিত। যেমন: আল্লাহ তা'আলা বলেন,
• 'আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বাজে কথা খরিদ করে, আর তারা ঐগুলোকে হাসি-ঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে; তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর আযাব।' (সূরা লুকমান ৬-৭)
গান-গায়িকা এবং এর ব্যবসা ও চর্চাকে হারাম আখ্যায়িত করে রসূল ﷺ বলেন,
'তোমরা গায়িকা (দাসী) কেনাবেচা করো না এবং তাদেরকে গান শিক্ষা দিও না। আর এসবের ব্যবসায় কোনো কল্যাণও নেই। জেনে রেখ, এ থেকে প্রাপ্ত মূল্য হারাম।' (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)
• অন্যত্র রসূল ﷺ বলেন,
• 'আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে। আর তাদের মাথার ওপর বাদ্যযন্ত্র ও গায়িকা নারীদের গান বাজতে থাকবে। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে মাটিতে ধ্বসিয়ে দেবেন। এবং তাদের মধ্যে অনেককে শূকর ও বাঁদর বানিয়ে দেবেন।' (ইবনে মাজাহ, বায়হাকী)
রসূল ﷺ আরও বলেন, 'আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল সাব্যস্ত করবে।' (সহীহ বুখারী)
আরেক জায়গায় তিনি বলেন, 'আল্লাহ তা'আলা আমাকে মু'মিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছেন এবং বাদ্যযন্ত্র, ক্রুশ ও জাহেলি প্রথা অবলুপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন।' (মুসনাদ আহমদ, বায়হাকী)
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'পানি যেমন (ভূমিতে) তৃণলতা উৎপন্ন করে তেমনি গান মানুষের অন্তরে নিফাক সৃষ্টি করে।' (বায়হাকী)
অথচ সবাই জানেন বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে মাদক ও পাপাসক্তির ক্রমবিস্তার প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। হাজার প্রচারণা ও সচেতনতা বৃদ্ধির বিজ্ঞাপনেও নেশার ছোবল থেকে এদের রক্ষা করা যাচ্ছে না। এদের হাতেই রোজ খুন-ধর্ষণসহ ইত্যাকার নানা অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে। এসব নাচ-গানে ডুবে তারা মানবজীবনের মূল লক্ষ্য হারিয়ে হতাশার রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আর তাই দেখা যায় তথাকথিত উন্নত দেশগুলোতেই আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি।
• আসলে পরকালের ভাবনাই মানুষের কুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষের ভেতরে সুপ্রবৃত্তি ও সদগুণাবলী জাগিয়ে তোলে। আর নাচ-গানের মূল সাফল্যই এখানে যে তা আখিরাত ভাবনাকে একেবারে ভুলিয়ে দেয়। মানুষের সুকুমার বৃত্তির ওপর পর্দা ফেলে ক্ষণিকের বস্তুতে মজে রাখে।
• সাহাবী ও তাবেয়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী গান ও বাদ্যযন্ত্র বহু গুনাহের সমষ্টি। যেমন: ১) নিফাক বা মুনাফিকির উৎস ২) ব্যভিচারে উৎসাহদানকারী ৩) মস্তিষ্কের ওপর আবরণ ৪) কুরআনের প্রতি অনীহা সৃষ্টিকারী ৫) আখিরাতের চিন্তা নির্মূলকারী ৬) গুনাহের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টিকারী।
আজ বড্ড প্রয়োজন তাই এ নাচ-গানের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করা। মসজিদ, মাহফিলে, আলোচনার টেবিলে এবং সব ধরনের মিডিয়াতে এ ব্যাপারে সর্বশ্রেণীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা। এ জাতির অস্তিত্ব, সমৃদ্ধি ও মঙ্গলের স্বার্থেই তা জরুরী। হ্যাঁ, নাচ-গান তথা অসুস্থ বিনোদনের প্রতি মানুষকে নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি সুস্থ বিনোদনের দিকেও পথনির্দেশ করতে হবে। বিনোদন মাধ্যমের উন্নতির যুগে মানুষের জন্য কুরআন-হাদীসের আলোচনা, হামদ-নাত, ইসলামী সঙ্গীতও সহজলভ্য করতে হবে। এ জন্য দরকার এসব কাজে পৃষ্ঠপোষকতা করা। এসবের সঙ্গে জড়িতদের বুদ্ধি-পরামর্শ ও আর্থিক সাহায্য দিয়ে এগিয়ে যেতে সাহায্য করা। কারণ, মানুষকে উত্তম বিকল্প না দেয়া পর্যন্ত মানুষ কোনোদিন মন্দ থেকে বিরত থাকবে না।
আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে গান-বাদ্যের ফিতনা থেকে দূরে থাকার এবং এসব বন্ধে কাজ করার তাওফীক দিন।
📄 পহেলা বৈশাখ ও নিউইয়ার উদযাপন করার বিধান
নববর্ষ উদযাপন করা জায়িয কিনা
বাংলা নববর্ষ 'পহেলা বৈশাখ', ইংরেজি নববর্ষ 'থার্টিফাস্ট নাইট' কিংবা হিজরি নববর্ষ পালন করা ইসলাম সম্মত নয়। ইন্ন কাসির রাহিমাহুল্লাহ বলেন: "কোন মুসলিমের সুযোগ নেই কাফিরদের সামঞ্জস্য গ্রহণ করা, না তাদের ধর্মীয় উৎসবে, না মৌসুমি উৎসবে, না তাদের কোন ইবাদতে। কারণ আল্লাহ তা'আলা এ উম্মতকে সর্বশেষ নাবী দ্বারা সম্মানিত করেছেন, যাকে পরিপূর্ণ ও সর্বব্যাপী দ্বীন দেয়া হয়েছে। যদি মূসা ইব্ন্ন ইমরান জীবিত থাকতেন, যার উপর তাওরাত নাযিল হয়েছে; কিংবা ঈসা ইবন মারইয়াম জীবিত থাকতেন, যার উপর ইঞ্জিল নাযিল হয়েছে; তারাও ইসলামের অনুসারী হত। তারাসহ সকল নাবী থাকলেও কারো পক্ষে পরিপূর্ণ ও সম্মানিত শরীয়তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকত না। অতএব মহান নাবীর আদর্শ ত্যাগ করে আমাদের পক্ষে কীভাবে সম্ভব এমন জাতির অনুসরণ করা, যারা নিজেরা পথভ্রষ্ট, মানুষকে পথভ্রষ্টকারী ও সঠিক দ্বীন থেকে বিচ্যুত। তারা বিকৃতি, পরিবর্তন ও অপব্যাখ্যা করে আসমানী ওহির কোন বৈশিষ্ট্য তাদের দ্বীনে অবশিষ্ট রাখেনি। দ্বিতীয়ত তাদের ধর্ম রহিত, রহিত ধর্মের অনুসরণ করা হারাম, তার উপর যত আমল করা হোক আল্লাহ গ্রহণ করবেন না। তাদের ধর্ম ও মানব রচিত ধর্মের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। আল্লাহ যাকে চান সঠিক পথের সন্ধান দান করেন"।
নববর্ষ উদযাপন করে আমরা অন্যধর্মের অনুসরণ করতে পারি না। এসব তাদের বানানো উৎসব ও কুসংস্কার।
আমরা বিভিন্ন উপলক্ষে যেসব অনুষ্ঠান পালন করি তার অধিকাংশ ইহুদি, খৃস্টান ও মুশরিকদের তৈরি। সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে আমরা আকীকা ত্যাগ করে খাতনার সময় ঘটা করে অনুষ্ঠান করি। খাতনা করা সুন্নত, এতে কোন অনুষ্ঠান নেই, অথচ আমরা অনুষ্ঠান করি, এদিকে আকীকা দেয়া নাবী -এর নির্দেশ, অথচ আমরা অনেকেই তা ত্যাগ করেছি এবং অপরদিকে অনেকেই অতিরিক্ত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালন করি। আমরা কি এতটাই নির্বোধ বনে গেলাম! আমরা প্রতিদিন কমপক্ষে সতেরো বার সূরা ফাতিহা পাঠ করে সিরাতে মুস্তাকিমের প্রার্থনা করি, বাস্তবে আমরা যা ত্যাগ করছি, অর্থাৎ নাবী -এর পথ ও সুন্নত। কমপক্ষে সতেরো বার অভিশপ্ত ও পথভ্রষ্টদের রাস্তা থেকে পানাহ চাই, অথচ বাস্তবে আমরা তাদের অনুসরণ করছি!
মুসলিমের একমাত্র উৎসবঃ ঈদ
আমাদের মুসলিমদেরকে ইসলামে স্বীকৃত উৎসব ঈদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। আমাদের উৎসব ঈদ শুধু একটি উৎসবই নয়, বরং একটি ইবাদতও, যার দ্বারা আমরা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করি। এ ঈদের সংখ্যা তিনটি, চতুর্থ কোন ঈদ নেই। জুমা, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আদহা। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি নাবী -কে বলতে শুনেছি: "নিশ্চয় জুমার দিন ঈদের দিন, অতএব তোমাদের ঈদের দিনকে তোমরা সিয়ামের দিন বানিয়ো না, তবে তার পূর্বে কিংবা পরে যদি সিয়াম রাখ, তাহলে পার"। (সহীহ মুসলিম)
আনাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
"নাবী ﷺ মদিনায় আগমন করলেন, তখন তাদের দু'টি দিন ছিল, যেখানে তারা খেলা-ধুলা করত। তিনি বললেন: এ দু'টি দিন কী? তারা বলল: আমরা এতে জাহিলি যুগে খেলা-ধুলা করতাম। রসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা তার পরিবর্তে তার চেয়ে উত্তম দু'টি দিন দিয়েছেন: ঈদুল আদহা ও ঈদুল ফিতর"।
ইবন তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন: এ হাদীস প্রমাণ করে যে কাফিরদের উৎসব পালন করা হারাম। কারণ নাবী ﷺ আনসারদের জাহিলি দুই ঈদের উপর বহাল রাখেননি। রীতি মোতাবেক তাতে খেলা-ধুলার অনুমতি দেননি। তিনি বলেছেন: নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে পরিবর্তন করে দিয়েছেন। এর দাবি পূর্বের আমল ত্যাগ করা। কারণ বদল করার পর উভয় বস্তুকে জমা করা যায় না। বদল শব্দের অর্থ একটি ত্যাগ করে অপরটি গ্রহণ করা। অতএব কোন মুসলিমের জন্য বৈধ নয় ইহুদি, খৃস্টান ও মুশরিকদের উৎসব পালন করা, যেমন নববর্ষ ও অন্যান্য উৎসবসমূহ।
শুভ নববর্ষ বলা
আমরা চিন্তা করেছি কিংবা ভেবে দেখেছি যে, নববর্ষের শুরুতে যখন বলি, যাকেই বলি: "শুভ নববর্ষ", কিংবা "হ্যাপি নিউ ইয়ার"? কার অনুসরণ করছি, কাকে বলছি ও কী বলছি? নিশ্চয় আমরা চিন্তা করিনি, চিন্তা করলে কখনো আমাদের বিবেক সায় দিত না কুফরী কথার পক্ষে, কিংবা তাদের শুভেচ্ছা জানানোর প্রতি, যারা ঈসা আলাইহিস সালামকে বলেছে স্বয়ং আল্লাহ, কখনো বলেছে আল্লাহর পুত্র, কখনো বলেছে তিনজনের তৃতীয় সত্ত্বা।
যারা আল্লাহর সাথে শরীক করেছে ও তাঁর অসন্তোষের পাত্রে পরিণত হয়েছে, তাদের জন্য আল্লাহ জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছেন, আমরা কিভাবে তাদেরকে শুভেচ্ছা জানাই, কিভাবে তাদের অনুসরণ করি এবং বলি নববর্ষের শুভেচ্ছা! ইব্ নুল কায়্যিম জাওযি রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “তাদেরকে তাদের কুফরী উৎসব উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানানো সবার জন্যে হারাম, যেমন বলা: "তোমার উৎসব সফল হোক", "শুভ বড় দিন" অথবা এ জাতীয় অন্যান্য শব্দ, যা বর্তমান আমরা শুনতে পাই। এভাবে শুভেচ্ছা জানানোর ফলে যদিও সে কাফির হয় না, কিন্তু তার এ কর্ম হারাম তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ প্রকারান্তরে এভাবে সে ক্রুশকে সিজদার প্রতি উদ্বুদ্ধ করছে! এ জাতীয় শুভেচ্ছা মদ্যপ, হত্যাকারী ও ব্যভিচারীকে শুভেচ্ছার জানানোর চেয়ে মারাত্মক। অথচ যে কবীরা গুনাহের জন্য শুভেচ্ছা জানাল, সে নিজেকে আল্লাহর শাস্তি ও অসন্তোষের জন্য প্রস্তুত করল"।
নববর্ষ ও আমাদের সতর্কতা
আমরা বছরের অন্যান্য দিনের ন্যায় নববর্ষের দিনকে গণ্য করব। এতে কোন ধরণের অনুষ্ঠান করব না ও তাতে অংশ নেব না। আমাদের সন্তানদের প্রতি গভীর দৃষ্টি রাখব, যেন তারা বিজাতীয় উৎসবে অংশগ্রহণ না করে।
সন্তান কিংবা পরিবারের কোন সদস্যের আবদার রক্ষার্থে আল্লাহর নির্দেশ উপেক্ষা করে তাদের উৎসব উদযাপন করা যাবে না। ইমাম যাহাবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “যদি কেউ বলে: আমরা এগুলো ছোট বাচ্চা ও নারীদের জন্য করি, তাকে বলা হবে: সবচেয়ে হতভাগা সে ব্যক্তি যে আল্লাহর অসন্তোষের বস্তু দ্বারা পরিবার ও সন্তানকে সন্তুষ্ট করে।
ভুল ধারণার অপনোদন
আমরা বলে থাকি পহেলা বৈশাখ পালন হচ্ছে বাঙালী কালচারাল অনুষ্ঠান, এর সাথে ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই, আমরা বাঙালী জাতি হিসেবেই পহেলা বৈশাখ পালন করে থাকি, এতে অসুবিধাটা কোথায়? অবশ্যই ধর্মের জায়গায় ধর্ম, আর জাতির জায়গায় জাতি।
সর্বপ্রথম দেখতে হবে আমার পরিচয় কী? আমার পরিচয় হচ্ছে আমি মুসলিম। জাতিগতভাবে একজন মুসলিম হতে পারে বাঙালী, ইংরেজ, চাইনিজ অথবা আফ্রিকান। এই সকল জাতি তার জাতিগত কালচারাল অনুষ্ঠান পালন করতে পারবে কিন্তু অবশ্যই একজন মুসলিম হিসেবে যেন তা ইসলামী আকীদার সাথে সাংঘর্ষিক না হয়। কারণ আকীদা হচ্ছে ঈমানের সাথে সম্পর্কিত বিষয়। তাই আমি যেই জাতির মুসলিম-ই হই না কেন একজন ঈমানদার মুসলিম হিসেবে আগে আমাকে ইসলামী আকীদাগত বিষয়গুলো সম্পর্কে খুব ভাল করে পড়াশোনা করে জেনে নিতে হবে যে আমি কী করতে পারবো আর কী করতে পাবো না। কোন ভাবেই যেন হালালের সাথে হারামের সংমিশ্রণ হয়ে না যায়।
চাইনিজদের সবচেয়ে বড় উৎসব হচ্ছে 'চাইনিজ নিউ ইয়ার'। এই সময় তাদের সাতদিন সরকারী ছুটি থাকে এবং এই সাতদিন ধরে চলে তাদের নানা রকম কালচারাল অনুষ্ঠান, বিগত পূর্বপুরুষদের পূজা করা এই অনুষ্ঠানের একটি অংশ। চাইনিজদের মধ্যেও অনেক মুসলিম রয়েছে। তারা কি তাদের জাতির ঐ সাতদিন ব্যাপি 'চাইনিজ নিউ ইয়ার' উৎসব পালন করে? অবশ্যই মুসলিম চাইনিজরা তা পালন করে না। কারণ ঐ সাতদিন ব্যাপী যে কালচারাল অনুষ্ঠান হয় তা ইসলামী আকীদা অর্থাৎ ঈমানের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
পৃথিবীতে দু'প্রকার দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা) রয়েছে: (ক) মানব রচিত দ্বীন যেমন হিন্দু, বৌদ্ধ ও অগ্নিপূজক ইত্যাদি। (খ) আল্লাহর দেয়া (আসমানী বা ওহী নির্ভর) দ্বীন যেমন ইহুদিধর্ম, খৃস্টান ধর্ম ও ইসলাম।
মানব জাতির হিদায়াত ও কল্যাণের জন্য আল্লাহ তা'আলা সকল নাবী ও রসূলকে এ দ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন। ইহুদি-খৃস্টানদের দ্বীন আজ পরিবর্তিত, রহিত ও মানব রচিত দ্বীনের ন্যায় প্রত্যাখ্যাত। আল্লাহর নিকট তার কোন মূল্য নেই। আল্লাহ আমাদেরকে সর্বোত্তম দ্বীন, সর্বোত্তম কুরআন এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নাবী ও রসূল দান করেছেন।
আসুন আমরা কুরআন ও হাদীসের আলোকে পরিপূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশ করি এবং কাফির মুশরিকদের সঙ্গ ত্যাগ করি, তাদের কৃষ্টি-কালচার পরিহার করি। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর নিকট আত্মসমর্পণকারী ও একনিষ্ঠভাবে শুধু তাঁরই ইবাদতকারী হিসেবে কবুল করুন। আমীন।