📄 ইসলামী শিক্ষা-সংস্কৃতিই মানবতার একমাত্র উপায়
সাহিত্য-সংস্কৃতি একান্ত নিজের মত করে গড়ে ওঠে না, উঠতেও পারে না; এটা গড়ে ওঠে কোনো-না কোন ধর্ম বা মতবাদ বা জীবনদর্শনের আশ্রয় ও অবলম্বনে। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করতে পারি, ভারতীয় সংস্কৃতির যে-রূপ, তার প্রধান ভিত্তি হলো অংশীবাদ, পৌত্তলিকতা ও প্রকৃতিপূজা, এবং তৎসঙ্গে অবতারবাদ-নির্ভর মানবপূজা। বিপ্লবোত্তর সোভিয়েত-সাহিত্য গড়ে উঠেছে মার্কসীয় দর্শনপুষ্ট সমাজতন্ত্রবাদের ভিত্তিতে। এবং ইয়োরোপীয় কি আমেরিকান সংস্কৃতি আসলে ধনতান্ত্রিক বস্তুবাদী জীবনদর্শনেরই অভিব্যক্তি। এবং আমরা এইকথাও জানি, একদা এই বাংলাদেশে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা যে চর্যাপদ রচনা করেছিলেন, তারও মূল অবলম্বন ছিল বৌদ্ধ-ধর্মদর্শন। এবং পরবর্তী সময়ে বৈষ্ণব পদাবলী, বাউল গানের যে প্রসার ঘটে, সেসবও ছিল যথাক্রমে বৈষ্ণব ও বাউল ধর্মাশ্রিত। উল্লেখ্য যে, মধ্যযুগীয় বৈষ্ণব গীতিকবিতা রাধা-কৃষ্ণের লীলা বিষয়ক অনেকটা মানবিক বটে কিন্তু তার মধ্য দিয়ে মুখ্যত একটা ঐশ্বরিক আবেদন সৃষ্টির প্রেরণা ছিল। এবং একইভাবে বহু-প্রচলিত বাউলগান হলো যৌনতাশ্রয়ী দেহবাদ-নির্ভর একটা 'আধ্যাত্মিক' উপধর্ম।
সাহিত্য ও সংস্কৃতি মনুষ্যত্বের উৎকর্ষ সাধনে কতটা কী ফলপ্রসু ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে ও করে, সে বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে হলে আল কুরআন এবং রসূল ﷺ-এর জীবনাদর্শের নির্ভুল পথনির্দেশনা ছাড়া আমাদের জন্য দ্বিতীয় কোন পথ নেই। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'ইন্নাদ্বীনা ইন্দাল্লাহিল ইসলাম' তাঁর কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য দ্বীন বা ধর্ম হলো ইসলাম (সূরা আলে ইমরান: ১৯)। অর্থাৎ ইসলামের বাইরে অন্য যে সকল ধর্ম, তার কোনোটাই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। অতএব এই সকল প্রত্যাখ্যাত ধর্ম ও মতবাদকে আশ্রয় করে যে সাহিত্য ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, নিশ্চয়ই তারও কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই। আর এই অগ্রহণযোগ্য সংস্কৃতি বা সাহিত্য যে মানবকল্যাণের প্রশ্নে আদৌ কোন ভূমিকা রাখতে সক্ষম নয়, বরং মানবতার অপকর্ম সাধনই তার লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, এটা অস্বীকার করার কোন হেতু নেই, কোন যুক্তিও নেই।
এখন প্রশ্ন হলো, ইসলাম কি তাহলে সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চাকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে? ইসলামে কাব্য কবিতার স্থান কি একেবারেই নেই? এই বিষয়ে ভুল ব্যাখ্যার অবকাশ নেই, কাব্য কবিতার স্থান ইসলামে অবশ্যই আছে তবে তা যেন কোনভানেই ইসলামী আকীদার সাথে সাংঘর্ষিক না হয়।
📄 ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা ও বর্তমান পরিপ্রেক্ষিত
ইসলামী শিক্ষার অর্থ শুধু নিরঙ্কুশভাবে পরকালমুখী শিক্ষা নয়; ইহকাল পরকাল উভয়কে নিয়ে আল্লাহ ও আল্লাহর রসূল কর্তৃক পেশকৃত হিদায়াতকে সামনে রেখে যে সর্বাঙ্গসম্পূর্ণ শিক্ষা, সেটাই ইসলামী শিক্ষা। এখানে আত্মিক ও নৈতিক মানসকাঠামো সবল করে তুলবার কার্যক্রম যেমন অপরিহার্য, একই সঙ্গে ইহজাগতিক বৈষয়িক যোগ্যতালাভের বিষয়টিও সমান অপরিহার্য। এটা কোন আলেম-উলামার কথা নয়, পীর-মুর্শিদের কথা নয়; এই কথা স্বয়ং আল্লাহর কথা, আল্লাহর রসূল -এর কথা, ইসলামের কথা।
📄 ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য পূর্ণাঙ্গ মানুষ পূর্ণাঙ্গ সমাজ
আসলে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা যা বলে বা বলতে চায়, সেটা নতুন কিছু নয়। আল কুরআন এবং রসূল -এর জীবনাদর্শ থেকে প্রাপ্ত যে সর্বতোমুখী হিদায়াত, পূর্ণাঙ্গ মানুষ ও পূর্ণাঙ্গ সমাজ বিনির্মাণের যে পথ ও পাথেয়, ইসলামী শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা সেই কথাই বলে। ইসলাম যেমন একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান, ইসলাম একটি নির্ভুল জীবনদর্শনও বটে। আর এই জীবনদর্শন তাওহীদ রিসালাত ও আখিরাতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই জীবনদর্শনই ইসলামের প্রাণ। এ থেকে অন্যথা হলে, এই জীবনদর্শনের ব্যতিক্রম ঘটলে, ইসলাম আর ইসলাম থাকে না, মুসলিমও আর মুসলিম থাকে না। ইবলিস নানাভাবে প্রলুব্ধ ও প্ররোচিত করতেই পারে, এবং প্ররোচিত করাই তার কাজ। বিশেষ করে শিক্ষাব্যবস্থার অন্ত রে-বাইরে যে প্রশস্ত অঙ্গন, সেই অঙ্গন ইবলিসদের একটি বড় প্রিয় ও জরুরী কর্মক্ষেত্র। কারণ এখান থেকেই পর্যায়ক্রমে বেরিয়ে আসে দেশ জাতি ও সমাজের জন্য প্রয়োজনীয় জনস্রোত। অতএব ইবলিস ও তার সহযোগীদের কাজই হলো এই জনস্রোতকে কলুষিত ও বিপথগামী করা, নৈতিকভাবে পঙ্গু অক্ষম অপদার্থে পরিণত করা। বলা যায়, এই কাজে তার সাফল্য আশাতীতভাবে প্রমাণিতও হয়েছে, যে কারণে দেশব্যাপী আজ এই সমূহ দুরবস্থা。
একজন প্রকৃত মুসলিম কোনো অবস্থাতেই জীবনে শিরককে গ্রহণ করতে পারে না, সহস্র প্রলোভনেও পৌত্তলিকতাকে প্রশ্রয় দিতে পারে না, সংস্কৃতির নামে তাগুতের (আল্লাহ বিরোধী শক্তি) ইবাদতে মগ্ন হতে পারে না। তাই খাঁটি মুসলিমের পক্ষে ভাষা ও সংস্কৃতির নামে মঙ্গলপ্রদীপ জ্বেলে আরতি করা, নিষিদ্ধ-পুরুষের হাতে সিঁদুর-পরিধান, নগ্ন-পৃষ্ঠদেশে উল্কি অঙ্কন, ভাইফোঁটা ইত্যাদিকে মেনে নেয়া সম্ভব নয় এবং এসব কাজকে ঈমান আকিদার সাথে সাংঘর্ষিক ভাবাই ঈমানের পরিচয়।
📄 ভাষা নিয়ে ভাবনা
বার বার ব্যবহৃত হওয়ার কারণে অসংখ্য শব্দ ও শব্দবন্ধ এখন অবিচ্ছেদ্যভাবে মিশে গেছে হিন্দু ধর্ম ও হিন্দু সংস্কৃতির সঙ্গে। অর্থাৎ বাংলাভাষার একটি বিরাট অংশের উপর হিন্দু মানসতার দখলিস্বত্ব পাকাপাকিভাবে কায়েম হয়ে গেছে। এবং অনেক হিন্দু যে বাংলাভাষাকে একমাত্র তাদেরই ভাষা বলে মনে করে।
কিছু উদাহরণ পেশ করলেই আশা করি বিষয়টি পরিষ্কার হবে। 'সারদামঙ্গল' 'অন্নদামঙ্গল' 'মঙ্গলঘট' 'মঙ্গলপ্রদীপ' 'মঙ্গলাচার' 'মঙ্গলগীত' ইত্যাদি লিখতে লিখতে 'মঙ্গল' শব্দটিই এমন হয়েছে যে, 'মঙ্গলবার্তা' বা 'তোমার মঙ্গল হোক' এসবের মধ্যেও একটা হিন্দুয়ানী গন্ধ জেগে ওঠে। এভাবে 'অঞ্জলি' 'চরণ' 'প্রণাম' 'ব্রাতা' 'আরাধ্য' 'উপাসনা' 'সুপ্রভাত' 'স্বর্গাদপি' 'পিতৃদেব' 'পূজ্যপাদ' 'কীর্তন' 'লীলা' 'বিসর্জন' 'জল' 'প্রণাম' ইত্যাদি কতো যে শব্দ একান্তভাবে হিন্দুদের হয়ে গেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই।
• মুসলিম চেতনা ও বিশ্বাসের সংগে সাংঘর্ষিক যে সকল শব্দ ও উপমা 'দেবভাষা' সংস্কৃত ও অন্য উৎস থেকে আহৃত, সেই ধরনের শব্দাবলীর অনুচিত ও অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার বর্জন করতে হবে। উদাহরণত, যেখানে স্বাভাবিকভাবেই 'জান্নাত' 'জাহান্নাম' ব্যবহৃত হওয়ার কথা, সেখানে 'নরক' 'স্বর্গলোক' 'অমরাবতী' ব্যবহারের যৌক্তিকতা কোথায়? 'ইন্তিকাল' এর বদলে 'পরলোকগমন' 'মরহুম'-এর স্থলে 'প্রয়াত' লেখা বা বলার মধ্যে সত্যিই কি কোনো যৌক্তিকতা আছে?