📄 অবৈধ বা হারাম উপার্জনের প্রভাব
প্রত্যেক মুসলিম নরনারীর জন্য হালাল রুজির সন্ধান করা অবশ্যকর্তব্য। কেননা হালাল সম্পদ বা খাদ্যই হলো ইবাদত কবুলের শর্তসমূহের মধ্যে অন্যতম প্রধান শর্ত। হালাল উপায়ে অর্জিত ও শরীয়ত অনুমোদিত অর্থ- সম্পদ বা খাদ্যগ্রহণ ছাড়া আল্লাহর দরবারে কোন ইবাদতই কবুল হয় না। জীবিকা নির্বাহের জন্য উপার্জনের গুরুত্ব ইসলামে যেমনি রয়েছে, ঠিক তেমনি হালাল উপার্জনের গুরুত্বও অত্যধিক। ইসলাম অর্থসম্পদ উপার্জনের ক্ষেত্রে হালাল-হারামের পার্থক্য সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে। সমাজ, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির জন্য কল্যাণকর যাবতীয় ব্যবস্থাকে ইসলাম হালাল করেছে।
* পাঠক, আমি/আপনি যদি এক বা একাধিক সন্তানের অভিভাবক হয়ে থাকি, নিজেকে প্রশ্ন করে দেখি তো আমার সন্তানকে কখনো হালাল/হারাম উপার্জন নিয়ে সুপরামর্শ দিয়েছি কিনা বা এ বিষয়ে আল্লাহর কি হুকুম তা জানিয়েছি কিনা?
* ইসলাম মানুষের জন্য হালাল ও হারামের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য নিরূপণ করেই থেমে থাকেনি, বরং হালাল উপার্জনের দিয়েছে সুস্পষ্ট নির্দেশনা। (রেফারেন্স সূরা জুমা ৬২: ৯-১০) ফরয ইবাদত সমূহের আদায়ের পর এ মহতি কর্মে ঝাঁপিয়ে পড়তে উৎসাহিত করা হয়েছে। উপার্জনের ক্ষেত্রে হালাল ও বৈধ উপায় অবলম্বন করা ব্যবসায়ীসহ সকল মানুষের উপর ইসলামের একটি অলঙ্ঘনীয় বিধান। যারা উপার্জনের ক্ষেত্রে হালাল ও হারামের প্রশ্নে সতর্কতা অবলম্বন করে না তাদের ব্যাপারে রসূলুল্লাহ সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেছেন : মানুষের নিকট এমন একটি সময় আসবে যখন সেই ব্যক্তি কোন উৎস থেকে সম্পদ আহরণ করছে, তা হালাল না হারাম, সেদিকে কোন ভ্রূক্ষেপ করবে না। (সহীহ বুখারী)
* হালাল উপার্জন (ইনকাম) ইবাদত কবুল হবার পূর্বশর্ত। হারাম খেয়ে আমরা যতই সিজদা দেই না কেন, কোন লাভ নেই। হারাম উপার্জনে পালিত সন্তান ইসলামী তরীকা মানুষ হবারও কোন সম্ভাবনাই নেই।
📄 সর্বত্র দুর্নীতির প্রভাব
* আমরা জানি যে সারা বিশ্বে বাংলাদেশ দুর্নীতিতে কয়েকবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আমাদের দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্নীতির ভয়াবহতা আমরা সকলেই কমবেশী জানি। এই দুর্নীতি দেখতে দেখতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি, আর সেই সাথে আমাদের বিবেকও ভোঁতা হয়ে গেছে।
* আমাদের সন্তানেরা জন্মের পর থেকেই দেখে আসছে দুর্নীতির দাপট। নিজের বাবা, মা, চাচা, মামা, খালু, ভাই, বোন সকলেই কম বেশী দুর্নীতি করছে। দুর্নীতি করছে করছে মন্ত্রী, এমপি, মেয়র, কমিশনার, চেয়ারম্যান, শিক্ষক-শিক্ষিকা, পুলিশ, বিডিআর, ডাক্তার, নার্স, কম্পাউন্ডার, ইঞ্জিনিয়র, কন্ট্রাক্টর, জজ, উকিল, মোক্তার, পিয়ন, ব্যবসায়ী, সরকারী, আধাসরকারী, বেসরকারী কর্মকর্তারা। এদের লিস্ট করে শেষ করা যাবে না।
• আমাদের এক পরিচিত ভাই তিনি একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর ডাইরেক্টর। তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে বিদেশে যাচ্ছিলেন বেড়াতে। তাদের ভিসাসহ সকল কাগজ-পত্রই রয়েছে ঠিক মতো। কিন্তু ঢাকা এয়ারপোর্টে কাস্টমস অফিসার তাদেরকে আটকিয়েছে যে 'আপনি আপনার স্ত্রীকে নিয়ে যে বিদেশে যাচ্ছেন তার ফরেন মিনিষ্ট্রি থেকে এন.ও.সি লাগবে'। তখন ঐ ভাই একটু বিরক্ত হয়ে কাস্টমস অফিসারকে বলছেন 'ভাই কেন দুই নাম্বারী করছেন?' প্রতি উত্তরে কাস্টমস অফিসার বলছেন যে 'দুই নাম্বারীর দেখেছেন কি? দশ নাম্বারী করার জন্য ঘুষ দিয়ে এই পদে চাকুরী নিয়েছি।'
• পাঠক আপনি/আমিও হয়তো নিজ সন্তানকে ওর শিশুকাল হতে দুর্নীতি শেখাচ্ছি, সেটা কি জানি? যেমন: ✓ হয়তো সন্তানকে ডাক্তার দেখাতে গিয়েছি। আমার এপয়েন্টমেন্ট অনেক পরে, আর অপেক্ষা করতে ইচ্ছে করছে না। তখন আমি হয়তো সন্তানকে কোলে রেখেই ঘুষ দিয়ে সময়টা আগিয়ে নিলাম! ✓ ট্রাফিক সার্জন হয়তো আমার গাড়ির কাগজ পত্রে সমস্যা পেলো তখন আমি কিছু ঘুষ দিয়ে মুক্তি পেলাম! ✓ সন্তানকে ভাল স্কুলে ভর্তির জন্য ডোনেশন (ঘুষ) সংক্রান্ত কার্যকলাপ হয়তো সন্তানের সামনেই করলাম বা সন্তানের সামনেই এ বিষয়ে কথা পাকাপাকি করলাম! ✓ আমার সন্তান হয়তো পরীক্ষায় ফেল করেছে কিন্তু আমি অবৈধ পথে সেটাকে পাশ করিয়ে নিলাম! ✓ টেলিফোন আসলে সন্তানকে দিয়ে ফোন রিসিভ করিয়ে তাকে বলছি বলো বাবা বাসায় নেই! ✓ এসব ঘটনা আমাদের সন্তানরা শিশুকাল হতে দেখে দেখে বড় হচ্ছে। আর এদের মাঝেই কেউ কেউ বড় হয়ে ঘুষ নেবার কাজটা করছে, দুর্নীতি করছে!
• পাঠক দেখুন, আমরা মা-বাবারা যদি ইসলামের পথে থাকতাম এবং সকল ক্ষেত্রে ন্যায়ের উপর থাকতাম কেবল মাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, আমাদের সন্তানরাও সেভাবেই বড় হতো এবং ইসলাম হতে দূরে সরে যেতো না।
📄 রাজনৈতিক প্রভাব
ছেলেমেয়েরা কলেজ এবং ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পরপরই তারা নানাভাবে রাজনীতির সাথে জড়িয়ে যায়। বিভিন্ন নেতার আদর্শ অনুসরণ করে। তখন তাদের কাছে ইসলামের আদর্শের চেয়ে তার দলের আদর্শ বড় হয়ে দাঁড়ায়। এভাবেই দিন দিন তার চারিত্রিক আদর্শ গড়ে উঠতে থাকে। আমরা যদি বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকাই তাহলে দেখি যে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোন রাজনীতি নেই। ছাত্রছাত্রীরা কোন রাজনীতি করে না। অথচ তারা জীবনে খুবই উন্নতি করছে।
ছাত্র রাজনীতি : উন্নত দেশগুলোর ইউনিভার্সিটিতে কোন রাজনীতি নেই। শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং ছাত্র-ছাত্রীরা কোন প্রকার রাজনীতি করেন না। তারা পড়া-লেখা নিয়ে এতোই ব্যস্ত থাকেন যে এগুলো করার সময় কোথায়? এছাড়া কলেজ এবং ইউনিভার্সিটির কোর্সগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা যে কেউ নিয়মিত পড়া-লেখা না করলে এবং ক্লাসে উপস্থিত না হলে পরীক্ষায় কোনভাবেই পাশ করতে পারবে না। কেউ কোন অস্ত্র বহন করতে পারে না আর রাজনৈতিক দলগুলোও কাউকে কোন অস্ত্র সাপ্লাই দেয় না।
ইউনিভার্সিটিতে ভিপি পদ : উন্নত দেশগুলোর ইউনিভার্সিটিগুলোতে কোন দলাদলি নেই, কোন ক্যাডার নেই, ভিপি বলতে কোন পদ নেই, কেউ ভিপি পদের জন্য ইলেকশানও করে না। ছাত্রদের মধ্যে কেউ কাউকে চাপাতি দিয়ে কোপায় না বা ছাত্রীদের মধ্যে চুল ধরে টানাটানিও হয় না। ইউনিভার্সিটির হল দখল হয় না, খুনাখুনীও হয় না। ছাত্রদের এরকম কাজকর্ম কেউ কল্পনাও করতে পারে না।
পাঠক আপনি/আমি যদি এই সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদস্থ কেউ হই তাহলে মনে রাখবো এটা আমারই দায়িত্ব। আল্লাহ আমাকে এই পদে এনে দিয়েছেন এবং এটা আমার জন্য একটা পরীক্ষা। আমি কি আমার সাধ্য মতো চেষ্টা করছি দেশের শিক্ষা পদ্ধতিতে সঠিক পরিবর্তন আনতে বা শিক্ষার পরিবেশ সুস্থ রাখতে?
📄 ইসলামের দৃষ্টিতে “শহীদ” কে?
এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের দেশের বেশীরভাগ মানুষই পরিষ্কার ধারণা রাখে না। যে কাউকে যখন তখন শহীদ উপাধি দিয়ে দেয়া হয়। যেমন দেখা গেছে যে হিন্দু মারা গেলেও বলা হয় শহীদ, আবার নাস্তিক মারা গেলেও তাকে শহীদ উপাধি দেয়া হয় এবং বিরাট আয়োজন করে স্বঘোষিত নাস্তিকের জানাজা পড়ানো হয়। কী আশ্চর্য!
এবার জানা যাক ইসলামের দৃষ্টিতে আসলে শহীদ কে? সহীহ বুখারীর হাদীস অনুযায়ী ৫ প্রকার 'প্রকৃত মুসলিম' মারা গেলে শহীদ হয়। যেমন: ১) মহামারীতে ২) পেটের পীড়ায় ৩) পানিতে ডুবে ৪) ধ্বংসস্তূপে চাপা পরে এবং ৫) আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে। অন্যান্য বিষয়ে কোন মতভেদ নেই। শুধু শেষের বিষয়ে আমাদের পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন। যে ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহর পথে কাজ করতে গিয়ে, দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে, দ্বীনের কথা বলতে গিয়ে, দ্বীনের জন্য সংগ্রাম করতে গিয়ে মারা যান শুধু মাত্র তাকেই শহীদ বলা হয়। তবে কে শহীদ, কে জান্নাতী, কে জাহান্নামী এই ডিকলারেশনের অধিকার কাউকে দেয়া হয়নি। এই অধিকার শুধু মহান আল্লাহ তা'আলার। কেউ আল্লাহর এই অধিকার নিজের হাতে নিতে পারবে না। কে সত্যিকারভাবে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করেছে সেটাও তো সিদ্ধান্ত হবে কিয়ামতের দিনে। আমরা রসূল -এর জীবনীতে দেখেছি যে কোন এক ব্যক্তি রসূল -এর সাথে কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে মারা গেছেন কিন্তু তাকেও শহীদ বলা হয়নি। তাই কারো অন্তরের খবর একমাত্র মহান আল্লাহ তা'আলাই জানেন।
ইসলামের দৃষ্টিতে পরিস্কারভাবে আমাদের জানা থাকা প্রয়োজন যে কোন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, ইহুদী, নাস্তিক, মুরতাদ, মুনাফিক, বেনামাযী কখনো শহীদ হতে পারে না। কারণ বিষয়টা তাদের জন্য না। শহীদ হতে হলে প্রকৃত ঈমানদার, মু'মিন, মুসলিম হতে হবে, আংশিক ঈমানের অধিকারী হলেও হবে না। অর্থাৎ যদি আমি ইসলামের কিছু অংশ মানবো আর কিছু অংশ মানবো না বলে মত পোষণ করি তাহলে আমি প্রকৃত মুসলিম হতে পারবো না। যেমন শরীয়া মতে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এক ওয়াক্ত সলাত আদায় না করলে সে আর মুসলিম থাকে না। এর বিস্তারিত কুরআন ও সহীহ হাদীসের দলিল আমরা ৪র্থ পরিচ্ছেদে দেখতে পাবো, ইনশাআল্লাহ।
আমি সারা জীবন ইসলামের বিরোধিতা করলাম, ইসলামের কোন আইন মানলাম না, ইসলামের পক্ষে এক কলম লিখলাম না, ইসলামের পক্ষে কোন কথা বললাম না, ইচ্ছাকৃতভাবে নামায ছেড়ে দিতাম, বেপর্দায় চলতাম আর অতি সহজেই শহীদ হয়ে গেলাম! তা হবে না।
• একবার ভেবে দেখি, আমরা ইসলাম সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করি না বলে শহীদের মতো এতো মর্যাদার বিষয়টিতেও ভুল ধারণা পোষণ করি। আমাদের মাঝে যদি জ্ঞানের ঘাটতি থাকে তাহলে আমাদের সন্তানরা কিভাবে যোগ্য মুসলিম হবে?