📄 ভুল সংস্কৃতি চর্চা করার প্রভাব
শিরক হচ্ছে আল্লাহ-বিরোধী কাজ। মনে রাখতে হবে যে শিরকের গুনাহ আল্লাহ কখনোই ক্ষমা করবেন না। আমরা কি কখনো চিন্তা করে দেখেছি যে আমাদের মনে কালচার আর ফ্যাশনের নামে আল্লাহ-বিরোধী বিশ্বাস নিয়মিত ঢুকছে? যেমন, বৈশাখী মেলার নামে অনেক কাজকর্মই হয়ে থাকে যা সুস্পষ্ট শিরক এবং ইসলাম বিরোধী। বৈশাখী মেলার মঙ্গল শোভা যাত্রার জন্য যেসকল মূর্তি বানানো হয় তা শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
আমরা কি কখনো চিন্তা করে দেখেছি যে আমরা সাধারণত কী ধরণের গান শুনে থাকি? রবীন্দ্র সঙ্গীত বলি, আর পল্লীগীতি বলি, আর মারফতি বলি, আর দেশাত্মবোধক বলি, আর লালনগীতি বলি, আর ব্যান্ড সঙ্গীত বলি এই ধরণের গানের অনেক কথাতেই রয়েছে শিরক!
রক সঙ্গীত: আজকালকার ছেলেমেয়েরা এটা খুব ভালবাসে। আমরা কি জানি এই রক সঙ্গীত (Rock music)-এর অনেক গায়করাই রীতিমতো ইবলিসের (শয়তানের) পূজা করে থাকে? এবং তাদের গানের কথাগুলো হচ্ছে ঐ শয়তানের ইবাদত? যেমন: এ ধরণের একটি গানের লাইন "হে আমার প্রভু শয়তান ... আমাকে টানতে টানতে হেলে (জাহান্নামে) নিয়ে যাও ....."। এই সকল রকষ্টারগণ বিভিন্ন সময় নানা ধরনের চ্যারিটি কাজও করে থাকে। আর আমাদের সন্তানদের চোখে এরা আদর্শ মানুষরূপে গণ্য হয়। আমরা যারা মা-বাবা আমাদের দায়িত্ব সন্তানের চোখের সামনে সত্য ও মিথ্যাকে তুলে ধরা。
📄 মোমবাতি জ্বালানোর ইতিহাস
• স্যাটেলাইট টিভি আর ইন্টারনেটের বদৌলতে ঘরে ঘরে দেখেছি কিভাবে ভিন্ন ধর্মের মানুষেরা তাদের নিহত আত্মীয়স্বজনদের জন্য শোক প্রকাশ করে থাকে। যেমন তারা মৃতের জন্য ফুল দেয়, কার্ড দেয়, মোমবাতি জ্বালায়। তারপর থেকে আমাদের দেশে দেখা যাচ্ছে কিছু হলেই মোমবাতি জ্বালিয়ে নানা রকম শোক পালন বা উৎসব পালন করা হয়। এর আগে এই মোমবাতি জ্বালানোটা এতোটা প্রকট ছিল না। দিনের পর দিন এই মোমবাতি প্রজ্জ্বলন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মহল্লা, শহর, বিভাগ অর্থাৎ দেশের সর্বত্র পৌছে গেছে。
• অনেকেরই প্রশ্ন এই মোমবাতি জ্বালালে ক্ষতি কী? ইসলাম কেন এর বিরোধিতা করে? আসুন সংক্ষেপে এর ইতিহাস আলোচনা করি :
ইসলামী সন ৪০০ হিজরীর পূর্বেই সকল অগ্নিপূজকদের রাজ্যসমূহ মুসলিমদের দখলে এসে যায়। এরই মধ্যে 'বারামাকা' নামক এক শ্রেণীর অগ্নিপূজক প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করে কিন্তু সত্যিকার অর্থে মনেপ্রাণে তারা অগ্নিপূজকই থেকে যায়। তাই এরা মুসলিমদের ছদ্মাবরণে অগ্নিপূজার এক নতুন পন্থা হিসেবে উদ্ভাবন করে শবে বরাত নামক বিদ'আতটি। 'সলাতুর রাগায়েব' নামে চালু করে একটি সালাত (নামায)। এই সালাত ১০০ রাক'আত। এটাই শবে বরাতের সালাত বা সালাত বলে খ্যাত। তারা এ সালাতের জন্য জাঁকজমকের সাথে মুসলিমদের লেবাসে মসজিদে হাজির হত, সাধারণ মুসলিমদের মত সালাত আদায় করতো, কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল অগ্নিপূজা।
এরা শবে বরাতে এই সলাতের জন্য মসজিদের ভিতরে ও বাইরে অসংখ্য আলো জ্বালাতো, সম্পূর্ণ মসজিদকে আলোতে ডুবিয়ে রেখে অগ্নিপূজার মন্দিরে পরিণত করতো। এভাবে আগুন দিয়ে গোটা মসজিদকে সাজিয়ে যখন সলাত আদায় করতো তখন তাদের চারদিকেই থাকতো আগুন। এই সলাত আদায় করার উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি নয় বরং আগুন পূজা ও আগুনকে সিজদাহ করানো। বারামাকা নামক সেই মুসলিম নামধারী ছদ্মবেশী অগ্নিপূজকদের ফাঁদে পা দিয়ে সরলমনা মুসলিমরাও মাসজিদে জমা হতো। আর এভাবেই তখন থেকে সওয়াবের কাজ মনে করে চলে আসছে শবে বরাত নামক বিদ'আতি প্রথাটি।
আমাদের দেশেও এই দিনে আলোকসজ্জা করা হয় এবং একটি বিদ'আতি কাজকে গুরুত্ব দিয়ে সরকারী ছুটি ঘোষণা করা হয়, আর আমরা সঠিক না জানার কারণে দেশবাসীরাও তা আনন্দের সাথে উদযাপন করি। যে সব ধরনের কাজ বা অনুষ্ঠান ইবাদত বা সওয়াবের কাজ বলে কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা স্বীকৃত নয়, রসূল নিজে যা কখনো করেননি বা কাউকে কখনো করতে বলেননি, তাঁর সাহাবাদের সময়ও তা ইবাদত হিসেবে প্রচলিত ছিলো না এমন সব কাজ বা অনুষ্ঠানাদি সওয়াবের উদ্দ্যেশে পালন করার নামই বিদ'আত। রসূল বলেছেন: দ্বীনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নতুন আবিষ্কৃত বিষয় বিদ'আত, প্রত্যেক বিদ'আতই পথভ্রষ্টতা এবং প্রত্যেক পথভ্রষ্টতার পরিণام হল জাহান্নাম। (সহীহ মুসলিম, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ)
তাই সওয়াবের কাজ হোক আর নাই হোক আগুন জ্বালিয়ে কোন প্রকার অনুষ্ঠান বা উৎসব করা ইসলাম-বিরোধী এবং এটি শিরকের অন্তর্ভুক্ত। আমাদের দেশের মানুষ এই মোমবাতি জ্বালানোতে এতোটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে অনেকেরই হয়তো এটা মেনে নিতে কষ্ট হবে। বিশেষ কারণে এভাবে মোমবাতি জ্বালানোকে মঙ্গল প্রদীপ নাম দিয়ে কাজটাকে আরো প্রবিত্রতার রূপ দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ২০১৩ ইং সনে একটা ইস্যুতে ফেসবুকের মাধ্যমে প্রচার করে বাংলাদেশের একটা বড় অংশ (বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম) নির্ধারিত একটা রাতে যার যার বাসা অফিস দোকানে ১ মিনিট মোমবাতি জ্বালিয়েছে।
তাই এই বিষয়ে আরো পরিষ্কার হওয়ার জন্য "ইসলামী আকীদার" উপর আরো অনেক গভীর জ্ঞান অর্জন করা প্রয়োজন। কারণ একজন মুসলিমের ঈমানের মূলধনই হচ্ছে সহীহ আকীদা, কারো আকীদাই যদি ঠিক না থাকে তাহলে তার ঈমান নিয়ে সংশয় দেখা দেবে। তাই আগুন নিয়ে মুসলিমরা কী কী করতে পারবে আর কী কী করতে পারবে না তা প্রতিটি মুসলিমেরই জানা থাকা অবশ্যই কর্তব্য, কারণ এটি ঈমানের অংশ।
সমাধান: কয়েকটা বিষয় নিয়ে বাংলাদেশে ভুলবুঝাবুঝি সৃষ্টি হয়েছে, বিভিন্ন জায়গায় তর্কবিতর্ক হচ্ছে। বিষয়টা সকলের নিকট পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। সে বাঙালি হোক আর অবাঙালি হোক অন্য ধর্মের লোকেরা অবশ্যই মোমবাতি জ্বালিয়ে উৎসব করতে পারবে, শোক পালন করতে পারবে এতে ইসলামের কোন আপত্তি নেই। কিন্তু ইসলামের নির্দেশ হচ্ছে কোন মুসলিম এই ধরণের কোন কাজ করতে পারে না, অর্থাৎ আগুন নিয়ে কোন উৎসব করতে পারে না। আরো অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে কোন মুসলিম শিখা অর্নিবানে সম্মান প্রদর্শন করতে পারে না, কোন গেইমস বা অলিম্পিকের শুরুতে মশাল জ্বালাতে পারে না, মঙ্গল প্রদীপ জ্বালাতে পারে না, মঙ্গল শোভা যাত্রায় অংশগ্রহণ করতে পারে না, পহেলা বৈশাখ উদযাপন করতে পারে না, শহীদ মিনারে ফুল দিতে পারে না, কোন সৃতিসৌধে ফুল দিতে পারে না, কোথাও মাথা নত করতে পারে না, একমিনিট নিরবতা পালন করতে পারে না।
এই বিষয়গুলো নিয়ে যেন আমরা নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি না করি। এর সাথে দেশের প্রতি ভালবাসার বা শ্রদ্ধার কোন সম্পর্ক নেই এবং এবিষয়ে কোন ভুলবুঝাবুঝির সৃষ্টি করা ঠিক নয়। এগুলো কোন ব্যক্তির মতামত নয়, বিষয়গুলো ইসলাম সমর্থন করে না। এই বিষয়গুলো মুসলিম বাদে সকল ধর্মের লোকেরাই পালন করতে পারবেন এবং তাদেরকে কোন প্রকার বাধাও দেয়া যাবে না। যদি কেউ নিজেকে মুসলিম হিসেবে দাবি করেন আর তিনি যদি এই কাজগুলো করেন তাহলে গুনাহগার হবেন। এবিষয়ে এটাই শেষ কথা।
মুসলিমদেরতো প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায় করার কথা কিন্তু মুসলিম নামধারী কিছু মানুষ ঠিক মতো সলাত আদায় করেন না, রোযা রাখেন না, যাকাত দেন না, মিথ্যা কথা বলেন, চুরি করেন, ডাকাতি করেন, সুদ খান, ঘুষ খান, যিনা করেন, মানুষকে ঠকান, গীবত করেন, বেপর্দা চলেন, ওজনে কম দেন, আমানত খিয়ানত করেন, অন্যের হক নষ্ট করেন। এই কাজগুলো ইসলাম কখনোই সমর্থন করে না তারপরও মুসলিম নামধারী কিছু মানুষ এগুলো অহরহ করে যাচ্ছে। আর এর জন্য তাদেরকে অবশ্যই কাল কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। এসময় তাদের পক্ষে কথা বলা বা সুপারিশ করার জন্য কেউ থাকবে না।
📄 গল্প-উপন্যাসের প্রভাব
আমরা কি কখনো গভীরভাবে খেয়াল করেছি যে আমরা কী ধরনের বই বা গল্প-উপন্যাস-কবিতা পড়ছি? এবং এই ধরণের অনেক গল্প-উপন্যাস বা কবিতার মাধ্যমে খুব ধীরে ধীরে (স্লো-পয়জনিং) আমরা নানা রকম শিরকে আক্রান্ত হচ্ছি?
আজকাল হাইস্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরাই বেশী গল্প- উপন্যাস পড়ে থাকে। এই পাঠক সমাজের জন্য এক শ্রেণীর লেখক- লেখিকাও তৈরী হয়েছে। তারা বেশীরভাগ সময় এই বয়সের ছেলেমেয়েদের উপযোগী করে তাদের মনের খোরাক যুগিয়ে গল্প-উপন্যাস লিখে থাকে। এই সকল গল্প-উপন্যাসগুলো যদি খুব গভীরভাবে বিশ্লেষণ (এনালাইসিস) করলে দেখা যাবে যে এদের একটি বিরাট অংশই আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে ইসলাম হতে দূরে সরে যেতে সহায়তা করছে। অল্প বয়স থেকে এই ধরণের লেখা পড়তে পড়তে একসময় মগজ ধোলাই (ব্রেইনওয়াশ) হয়ে যায়। ফলে বিভিন্ন রকমের ইসলাম-বিরোধী চিন্তা ভাবনা মাথার মধ্যে তৈরী হয়।
📄 তাগুতের প্রভাব
তাগুত হলো আল্লাহ বিরোধী শক্তি, এবং সেটা কোন মানুষও হতে পারে অথবা মানুষের তৈরী আইন-কানুনও হতে পারে।
তাগুত বলতে সুস্পষ্টভাবে এমন শাসককে বুঝায় যে নিজে আল্লাহর আইন মানে না এবং অন্যকেও না মানতে বাধ্য করে। এবং যে আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে অন্য কোন আইন অনুযায়ী ফায়সালা করে। আবার তাগুত বলতে এমন বিচার ব্যবস্থাকে বুঝানো হয়েছে যা আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতার আনুগত্য করে না এবং আল্লাহর কিতাবকে চূড়ান্ত সনদ হিসেবে স্বীকৃতিও দেয় না।
তাই তাগুত অর্থ হলো যে কোন আল্লাহ বিরোধী বিদ্রোহী শক্তি। কাফির ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহকে অস্বীকার করে মাত্র। কিন্তু তাগুত মানুষকে আল্লাহর দাসত্ব করতে বাধা দেয়, আল্লাহকে বাদ দিয়ে তার আনুগত্য করতে বাধ্য করে এবং রাষ্ট্রে ইসলাম-বিরোধী কার্যক্রম বিস্তার করতে সহায়তা করে। তাগুতের ভালো উদাহরণ হলো ফিরাউন যে মানুষকে আল্লাহর আনুগত্য করতে বাঁধা দিত। আল কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, হে নাবী! তুমি কি তাদেরকে দেখোনি, যারা এই মর্মে দাবী করে চলছে যে, তারা ঈমান এনেছে সেই কিতাবের প্রতি যা তোমার ওপর নাযিল করা হয়েছে এবং সেই সব কিতাবের প্রতি যেগুলো তোমার পূর্বে নাযিল করা হয়েছিল; কিন্তু তারা নিজেদের বিষয়গুলোর ফায়সালা করার জন্য 'তাগুতে'র দিকে ফিরতে চায়, অথচ তাদেরকে তাগুতকে অস্বীকার করার হুকুম দেয়া হয়েছিল? শয়তান তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে সরল সোজা পথ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে চায়। (সূরা আন নিসা ৪:৬০)
কুরআনের দৃষ্টিতে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা ও আল্লাহ বিরোধী তাগুতকে অস্বীকার করা, এ দু'টি বিষয় পরস্পরের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত (Interconnected)। আল্লাহ ও তাগুত উভয়ের সামনে একই সাথে মাথা নত করাই হচ্ছে সুস্পষ্ট মুনাফিকী।