📄 নাটক-সিনেমার প্রভাব
আমি কি কখনো চিন্তা করেছি যে আমি এবং আমার পরিবারের সবাই মিলে নিয়মিত কী ধরণের নাটক-সিনেমা (অপসংস্কৃতি) দেখছি? এই ধরণের নাটক-সিনেমা, হিন্দি সিরিয়াল, হিন্দি মুভি আমাদেরকে কুরআনের পথ থেকে আস্তে আস্তে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অনেক হিন্দি মুভির মধ্যেই থাকে হিন্দুদের পূজা যা আমি দেখছি এবং শিরকের প্রশ্রয় দিচ্ছি। আবার হিন্দি মুভি যখন শুরু হয় তখন দেব-দেবীর নামে শুরু হয়। আসুন, একটিবার গভীরভাবে ভেবে দেখি: আমার ঘরে আমি এই টেকনোলজির মাধ্যমে আধুনিক উপায়ে হিন্দুদের মূর্তি পূজার আশ্রয় দিচ্ছি তার মানে নিজেদের ঘরেই ভার্চুয়াল পূজা হচ্ছে। কত বড় শিরকি অপরাধ এটা একবার ভেবে দেখেছি কি কখনো?
আমাদের মাঝে এমন অনেকেই আছেন যারা মনে করেন যদি নাটক সিনেমায় অশালীন কিছু না থাকে তাহলে তাতে সমস্যা নেই। আবার অনেকে মনে করেন যদি নাটকে/নাটিকায় নামায আদায়ে, রোযা রাখায় উৎসাহিত করা হয়, তাহলে সেই নাটক দেখা যাবে। অথচ তারা এটা ভেবে দেখেন না যে, এমন ভালো নাটকে যারা স্বামী-স্ত্রীর অভিনয় করছেন তারা কি সত্যিই স্বামী-স্ত্রী? এমন বেশ কিছু ইসলামী নাটক দেখা গেছে যেখানে নারী পুরুষের পর্দার বিষয়টি আদৌ খেয়াল রাখা হয়নি।
📄 দিন দিন টিভি সিরিয়ালের আমূল পরিবর্তন
আগে আমাদের দেশে একটি মাত্র টিভি চ্যানেল ছিল যা হচ্ছে বিটিভি। বুঝার সুবিধার্থে আমরা দুই একটা বিষয় উদাহরণস্বরূপ আনতে পারি। যেমন, বিটিভিতে একসময় ছায়াছন্দ নামে মাসে একটি গানের অনুষ্ঠান দেখানো হতো। তাও অনুষ্ঠানটি দেখানো হতো রাত ১০টার ইংরেজী সংবাদের পর যখন ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ঘুমিয়ে পরে। আমরা জানি যে তখনকার যুগে বাংলাদেশী সিনেমাগুলোও ছিল অনেকটা শালিন। শালিন বলে দাবি করে এটাও বলতে চাইছি না যে সেগুলি ইসলামের দৃষ্টিতে জায়েয ছিল। কিন্তু অন্তত শালিনতা ছিলো। ছায়াছন্দে যদি কোন নাচ-গান একটু অশালিন মনে হতো তাহলে পরিবারের বড়রা তা নিজেরাও দেখতেন না এবং অন্যদেরকেও দেখতে দিতেন না, টিভি বন্ধ করে রাখতেন। তখন বিটিভিতে মাসে মাত্র একটি বাংলা সিনেমা দেখানো হতো তাও বেশীরভাগ সময় সামাজিক। বিটিভিতে সপ্তাহে একটি বা দুটি শালিন ইংরেজী মুভি বা সিরিয়াল দেখানো হতো। বিটিভি যে কোন ইংরেজী মুভি প্রচারের আগে নিজেদের সেন্সরবোর্ড দ্বারা আগে দেখে নিতো এবং যদি কোন অশালিন দৃশ্য থাকতো তা তারা কেটে নিতো। এখন এই যুগে মুসলিম ঘরে ঘরে শতশত অশালিন চ্যানেল, পরিবারের সবাই মিলে কী উপভোগ করছে পূর্বের সাথে তুলনা করে তা কি একটি বার চিন্তা করে দেখেছি যে আমরা কোথায় পৌঁছে গেছি?
এভাবে দিন গড়িয়ে বছর কেটে যাচ্ছে আর আমরা ধবংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি! ঘরে ঘরে একসময় আসলো ভিসিপি, তারপর আসলো ভিসিআর, তারপর আসলো সিডি প্লেয়ার, তারপর ডিভিডি প্লেয়ার, আরও আধুনিক কিছু ইত্যাদি। একসময় আমাদের দেশের লোকেরা মিডিলিষ্টে চাকুরী করতেন। তারা যখন দেশে আসতেন তখন বিদেশ থেকে আর কিছু আনেন আর নাই আনেন সবাই সাথে করে অন্ততপক্ষে একটি ভিসিয়ার নিয়ে আসতেন। এই শুরু হয়ে গেল মুসলিম ঘরে ঘরে শয়তানের অশ্বিল নাচ-গান। আমরা ছোটবেলায় মিডিলিষ্ট থেকে আসা আত্মীয়-স্বজনের নিকট থেকে শুনেছি যে, হিন্দি ক্যাসেটের বদৌলতে আরবের লোকেরা নাকি অনর্গল হিন্দিতে কথা বলতে পারে, ঐ দেশের একটি ছোট বাচ্চাও অমিতাভ বচ্চনকে চিনে! এটি আশির দশকের কথা।
দিন আরো গড়াতে থাকলো! আমরা উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি! তার পরের উন্নতি হচ্ছে ঘরে ঘরে, বাসে, ট্রেনে, নাইট কোচে, লঞ্চে, স্টিমারে, হোটেলে, রেস্টুরেন্টে, চায়ের দোকানে, গ্রামে, হাটে, বাজারে সর্বত্রই একই আওয়াজ শোনা যাচ্ছে- "হাওয়া হাওয়া ও হাওয়া খুশবু লুটাদে......"। শুনেছি যে এই জনপ্রিয় গানের কথাগুলোর অর্থ ভাল নয়। যাহোক দেশের বা সমাজের এই যে উন্নতি (?), এতে আমরা মুসলিম পরিবারের লোকেরা কিছুই মনে করছি না!
হিন্দি সিনেমার গানের টপ টেন আর ড্যান্স ড্যান্স অনুষ্ঠান মুসলিম ঘরে ঘরে ঢুকে গেল। সাধারণত আইটেম সং বা সবচেয়ে যৌন আবেদনময়ী হিন্দি সিনেমার গানগুলোই হয় টপ টেন। কোন কোন বাংলাদেশী চ্যানেলে অনুষ্ঠানের মাঝে মাগরিবের আযান দেয়, পরিবারের কেউ কেউ ড্যান্সের মাঝে গিয়ে তাড়াহুড়ো করে মাগরিব পড়ে এসে আবার বসে রিমোট হাতে। যে নাকি ড্যান্সের মাঝে ছিল মাগরিবের সলাতের মধ্যে তো তার চোখে ঐ দৃশ্যই ভাসার কথা। এক প্রতিবেশী আপাকে দেখতাম তিনি তসবীহ হাতে গুনছেন আর একের পর এক হিন্দি সিনেমা দেখে সময় কাটাচ্ছেন। যাহোক আমরা যে মুসলিম পরিবারগুলো কী করছি তা হয়তো নিজেরাই জানি না। প্রায় প্রতিটি মুসলিম পরিবারেই সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে গেল।
বিবেকবান পিতামাতার শিক্ষণীয় হিসেবে বর্তমানের টিভিতে প্রচারিত একটি নাটকের ঘটনা তুলে ধরা যাক। নাটকের নায়িকা তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে অবৈধ সম্পর্কের কারণে প্রেগনেন্ট হয়ে গেছে। বেশ কয়েকদিন যাবত বয়ফ্রেন্ড নায়িকার সাথে যোগাযোগ করছে না, তাই নায়িকা বয়ফ্রেন্ডের খোঁজে তার এপার্টমেন্টে গেছে। সেখানে গিয়ে সে তার রুমমেট থেকে জানতে পারলো যে তার বয়ফ্রেন্ড এই বাসা ছেড়ে চলে গেছে! যাহোক নায়িকার পেটের সন্তান কিছুটা বড় হয়ে যাওয়াতে সে আর নিজের বাসায়ও ফিরে যেতে চাচ্ছে না। নায়িকা এবার তার বয়ফ্রেন্ডের রুমমেটের সাথেই বসবাস করা শুরু করলো। এবার রুমমেট নায়িকাকে প্রস্তাব দিচ্ছে গর্ভপাত করে ফেলার জন্য। কিন্তু নায়িকা এতে রাজি না। তখন রুমমেট নায়িকাকে প্রশ্ন করছে, লোকে যখন জিজ্ঞেস করবে যে এই সন্তানের পিতা কে তখন তুমি কী বলবে? নায়িকা উত্তর দিচ্ছে, বলবো "ঈশ্বরের সন্তান"। পাঠক আমি হয়তো সচেতন। আমি হয়তো এমন নাটক/সিনেমা দেখি না। কিন্তু আমি কি নিশ্চিত যে, আমার সন্তান এমন নাটক/সিনেমা দেখছে না? যদি নিশ্চিত না হই তাহলে একবার ভেবে দেখি আমাদের সন্তানরা কি ধরনের কন্টেন্ট গ্রহণ করছে! কতো ভয়ংকর দিকে চলে যাচ্ছে একের পর এক ভবিষ্যত প্রজন্ম।
📄 নাটক-সিনেমার মাধ্যমে ব্রেইনওয়াশ
আমরা জন্মের পর থেকেই শিখছি যে 'সাদা' মানেই ভালর প্রতীক আর 'কালো' মানেই খারাপের প্রতীক। যেমন শোক দিবসে কালো ব্যাজ, কালো পতাকা, কালো পোশাক। আবার খারাপ দিনকে কালো দিবস বলা ইত্যাদি। একইভাবে ভালোর প্রতিক হিসেবে আমরা দেখছি সাদা, যেমন সাদা পোশাক, সাদা পতাকা, শান্তির প্রতিক সাদা পায়রা ইত্যাদি। অর্থাৎ দিনের পর দিন এমন ভাবে আমাদের মনে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে যে সাদা মানে ভাল আর কালো মানে খারাপ, যা মোটেও ঠিক নয়।
একইভাবে কিছু সংখ্যক ইসলাম বিদ্বেষী লোক দিনের পর দিন নাটক-সিনেমার মাধ্যমে আমাদের মনে ঢুকিয়ে দিয়েছে যে খারাপ চরিত্রের লোক মানেই মুখে দাড়ি, মাথায় টুপি-পাগড়ী, গায়ে জুব্বা ইত্যাদি। ভাবখানা এমন যে হুজুর-মাওলানারা হলেন যত বাজে কাজের মূল। এই কাজ এক দিনের নয় দুই দিনের নয়, বছরের পর বছর ধরে করে আসছে। বাংলাদেশের ৮৩% লোক মুসলিম হয়েও তা দেখে আসছে, সহ্য করে আসছে। যারা নাটক-সিনেমার মাধ্যমে ইসলামকে এভাবে দীর্ঘদিন ধরে উপস্থাপন করে আসছে তাদের সংখ্যা কিন্তু খুব বেশী নয় কিন্তু এরা বিশাল প্রভাব বিস্তার করে আসছে মিডিয়ার মাধ্যমে।
এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার মিডিয়ার মাধ্যমে এটাকে সাপোর্ট করে ধামাচাপা দিতে চান। যেমন তারা বলতে চান যে অনেক নাস্তিকের মুখেও তো দাড়ি আছে তাতে কী হয়েছে? হ্যাঁ, আমরা জানি অনেক নাস্তিকরা বড়বড় দাড়ি রাখেন, বড়বড় মোছ রাখেন, চুল কাটেন না। কবি রবীন্দ্র নাথের মুখেও দাড়ি আছে, শিখদের মুখেও লম্বা দাড়ি আছে, তারাও পাগড়ী পরেন, হিন্দুরাও পাঞ্জাবী-পায়জামা পরেন, ইহুদীরাও লম্বা দাড়ি রাখেন, মাথায় টুপি পরেন, খ্রিষ্টান পাদ্রিরাও মুসলিম ইমামদের মতো জুব্বা পরেন, খ্রিষ্টান নান মহিলারাও হিজাব এবং বোরকা পরেন। তাই বলে নাটক সিনেমায় যাদেরকে নিয়ে কটাক্ষ করা হয় সেই গ্রুল্প আর এই গ্রুপ এক নয়। এটা একটা কমনসেন্স যা সকলেই বুঝে।
📄 ভুল সংস্কৃতি চর্চা করার প্রভাব
শিরক হচ্ছে আল্লাহ-বিরোধী কাজ। মনে রাখতে হবে যে শিরকের গুনাহ আল্লাহ কখনোই ক্ষমা করবেন না। আমরা কি কখনো চিন্তা করে দেখেছি যে আমাদের মনে কালচার আর ফ্যাশনের নামে আল্লাহ-বিরোধী বিশ্বাস নিয়মিত ঢুকছে? যেমন, বৈশাখী মেলার নামে অনেক কাজকর্মই হয়ে থাকে যা সুস্পষ্ট শিরক এবং ইসলাম বিরোধী। বৈশাখী মেলার মঙ্গল শোভা যাত্রার জন্য যেসকল মূর্তি বানানো হয় তা শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
আমরা কি কখনো চিন্তা করে দেখেছি যে আমরা সাধারণত কী ধরণের গান শুনে থাকি? রবীন্দ্র সঙ্গীত বলি, আর পল্লীগীতি বলি, আর মারফতি বলি, আর দেশাত্মবোধক বলি, আর লালনগীতি বলি, আর ব্যান্ড সঙ্গীত বলি এই ধরণের গানের অনেক কথাতেই রয়েছে শিরক!
রক সঙ্গীত: আজকালকার ছেলেমেয়েরা এটা খুব ভালবাসে। আমরা কি জানি এই রক সঙ্গীত (Rock music)-এর অনেক গায়করাই রীতিমতো ইবলিসের (শয়তানের) পূজা করে থাকে? এবং তাদের গানের কথাগুলো হচ্ছে ঐ শয়তানের ইবাদত? যেমন: এ ধরণের একটি গানের লাইন "হে আমার প্রভু শয়তান ... আমাকে টানতে টানতে হেলে (জাহান্নামে) নিয়ে যাও ....."। এই সকল রকষ্টারগণ বিভিন্ন সময় নানা ধরনের চ্যারিটি কাজও করে থাকে। আর আমাদের সন্তানদের চোখে এরা আদর্শ মানুষরূপে গণ্য হয়। আমরা যারা মা-বাবা আমাদের দায়িত্ব সন্তানের চোখের সামনে সত্য ও মিথ্যাকে তুলে ধরা。