📄 ভুল পন্থায় ঈদ উদযাপন ও রমাদানের পরের চিত্র
আমরা বিদায় জানাচ্ছি মহান রমাদানকে। এই তো বিদায় দিচ্ছি কুরআন তিলাওয়াত, তাকওয়ার অনুশীলন, ধৈর্য, রহমত, মাগফিরাত ও মুক্তি লাভের মুবারক মাসটিকে। তাহলে কি আমরা প্রকৃত তাকওয়া অর্জন করতে পেরেছি? যে ব্যক্তি মুবারক মাসটিতে নিজেকে সংশোধন করতে পারল না সে আর কখন নিজের জীবন গঠন করবে? মহান রমাদান এমন একটি মাস যাতে এ সময়টিকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগিয়ে আমরা শরিয়ত-পরিপন্থী আচার-ব্যবহার পরিত্যাগ ও চরিত্র সংশোধন করে নিজেদের আমল ঠিক নিতে পারি। আল্লাহ বলেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ ঐ পর্যন্ত কোন জাতির পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদেরকে পরিবর্তন করে নেয়।" (সূরা রা'দঃ ১১)
লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো আমরা রমাদানে আল্লাহর সাথে যে ওয়াদা করেছি তা ভঙ্গ করার অনেক চিত্রই রমাদান শেষ হওয়ার সাথে সাথে সমাজে ফুটে উঠে। যেমন,
পুরো রমাদান মাস তারাবীহর (সুন্নত) সলাতে মুসল্লি দ্বারা মসজিদ পরিপূর্ণ থাকার পর অন্য মাসগুলোতে পাঁচ ওয়াক্ত ফরয সলাতে মুসল্লির সংখ্যা কমে যায়। তার মানে ফরযের চেয়ে সুন্নাতকে বেশী গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে তাই সুন্নাত সলাতে মসজিদ ভরে যাচ্ছে কিন্তু ফরয পাঁচ ওয়াক্ত সলাতে মাত্র এক-দুই কাতার পূর্ণ হচ্ছে!
সারা রমাদান মাস তাকওয়া অর্জন করে ঈদ উদযাপন করা হচ্ছে নাচ-গান ও সিনেমা এবং ইসলাম-বিরোধী কর্মকান্ড দিয়ে। ঘরে ঘরে নারীপুরুষের ফ্রী মিক্সিংয়ের মাধ্যমে ঘরোয়া পার্টি দিয়ে।
টিভি চ্যানেলগুলো সপ্তাহব্যাপী নানারকম অনুষ্ঠান প্রচার করে। এক চ্যানেলের সাথে অপর চ্যানেলের প্রতিযোগিতা, কে কত নাটক-সিনেমা-নাচ-গান, ফ্যাশন শো, ম্যাগাজিন ইত্যাদি দেখাতে পারে। সারা মাস রোযা রেখে চাঁদ রাত থেকেই মুসলিমরা টিভির সামনে রিমোট হাতে বসে যায় অনৈসলামী অনুষ্ঠান দেখতে। অথচ এই সকল টিভি চ্যানেলগুলিই রমাদান মাসে নানা ধরনের ইসলামিক প্রোগ্রাম দেখিয়েছে। সাহরীর সময় কুরআনের তাফসীর শুনিয়েছে, নানা ধরনের প্রশ্ন উত্তর প্রোগ্রাম দেখিয়েছে। এ কেমন double-standard নীতিমালা!
আমাদের দেশে দেখা যায় রমাদান মাসে জাঁকজমক করে পত্রিকায় এবং টিভিতে বিজ্ঞাপন দেয়া হয় যে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে এবার সারা দেশব্যাপী সিনেমা হলগুলোতে মুক্তি পাচ্ছে নাচেগানে মনমাতানো এবং প্রেমের ছবি। এই হচ্ছে একমাস তাকওয়া অর্জনের পর পবিত্র ঈদের উপহার।
• শুধু রমাদান মাসে পর্দা করা আর রমাদানের পরে ঈদের দিন থেকেই পর্দা ছেড়ে দেয়া। উদাহরণ স্বরূপ দেখা যায় আমাদের দেশে টিভিতে রমাদান মাস এলে মহিলারা খবর পড়ার সময় মাথায় কাপড় দেন আর ঈদের দিন থেকে মাথার কাপড় সরিয়ে নেন।
• এত বড় নিয়ামতের এটাই কি শোকর আদায়, এটাই কি আমল কবুল হওয়ার নিদর্শন? নিশ্চয়ই নয়। বরং এটা আমল কবুল না হওয়ার আলামত। কেননা প্রকৃত সিয়াম পালনকারী ঈদের দিন সিয়াম ছেড়ে দিয়ে আনন্দিত হবে এবং সিয়াম পূর্ণ করার তাওফীক পাওয়ার দরুন তার প্রতিপালকের প্রশংসা করবে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। সাথে সাথে এই ভয়ে কাঁদবে যে, না জানি আমার সিয়াম কবুল হয়নি। আমাদের পূর্বসূরীগণ রমাদানের পর ছয় মাস পর্যন্ত আল্লাহর দরবারে কেঁদে কেঁদে সিয়াম কবুল হওয়ার দু'আ করতেন। আমল কবول হওয়ার আলামত হল, পূর্ববর্তী অবস্থার চেয়ে বর্তমান অবস্থা উন্নত হওয়া। সত্যিকার মু'মিন বান্দা সর্বদাই আল্লাহর ইবাদত করবে। কোন নির্দিষ্ট মাস, জায়গা অথবা জাতির সাথে মিলে আমল করবে না।
• রমাদান মাসে আমরা সিয়ামরত অবস্থাতেই শপিং সেন্টারে গিয়ে প্রচুর অপচয়ের প্রতিযোগিতা করি। প্রয়োজনের চাইতে অধিক শপিং করছি। আমাদের সন্তানরাও ছোটবেলা হতেই এভাবে রমাদান মাসের ফযিলত হতে বঞ্চিত হচ্ছে এবং ওরাও বড় হয়ে সেগুলিই করছে যা আমরা করেছি。
📄 অনেক স্কুল-কলেজে মেয়েদের হিয়াব হিনিয়ে নেয়া হচ্ছে
• आजकल দেখা যাচ্ছে অনেক স্কুল-কলেজেই মেয়েদেরকে হিযাব পরতে দেয়া হয় না, বোরকা পরতে দেয়া হয় না। অনেক জায়গায়ই হিযাব পড়ার কারণে স্কুল-কলেজের কর্তৃপক্ষ ছাত্রীদেরকে স্কুল-কলেজ থেকে বের করে দিয়েছেন। এমনও ঘটনা ঘটেছে যে ছাত্রীরা ফুল হাতা জামা পড়ে স্কুলে যাওয়ার কারণে স্কুলের প্রিন্সিপাল ও কর্তৃপক্ষ কেচি দিয়ে ছাত্রীদের জামার হাতা কেটে দিয়েছেন। আমরা জানি যে স্কুল-কলেজ হচ্ছে চরিত্র গঠনের প্রতিষ্ঠান। একটি মুসলিম মেয়ের হিযাব হচ্ছে তার চরিত্রের একটি মূল্যবান অংশ। আর যে স্কুল-কলেজের প্রিন্সিপাল বা শিক্ষক-শিক্ষিকারা ছাত্রীদের চরিত্রের মূল্যবান অংশ পোশাক খুলে নেয় সেই জায়গাতো চরিত্র গঠনের জন্য নয় বরং চরিত্র হরণের জায়গা। তাই কুরআন-সুন্নাহ মতে ও ইসলামিক স্কলারদের মতে সেইসকল স্কুল-কলেজে মেয়েদের পড়ানো জায়েজ নেই। সন্তানদেরকে সেই সকল স্কুল-কলেজে পাঠনো ঠিক নয়। হতে পারে তাদের লেখা-পড়ার মান অনেক উন্নত। কিন্তু সন্তানের চরিত্রই যদি চলে যায় তাহলে আর ঐ উন্নতমানের পড়াশোনা দিয়ে কী হবে! যে স্কুল-কলেজ সন্তানদের চরিত্র গঠনের জন্য সহায়তা করে সেখানে পাঠাতে হবে। প্রয়োজনে নিজেদের এই ধরণের আরো অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
শিক্ষণীয় হিসেবে ভুক্তভুগী একজন ছাত্রীর বক্তব্য তুলে ধরা হলো। আমরা পত্রিকায় দেখেছি যে, ঢাকার উত্তরার একটি স্কুলের কর্তৃপক্ষ হিযাব পরিহিতা মেয়েদেরকে স্কুল থেকে বহিস্কার করে দিয়েছে। স্কুলের কর্তৃপক্ষের অভিযোগ যে মেয়েদেরকে হিযাব পড়তেই হবে কেন? তখন তাদের মধ্য থেকে একটি মেয়ে উত্তরে বলেছিল যে, "যে মহান আল্লাহ পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায় ফরয করেছেন, তিনিই মেয়েদের জন্য পর্দা বা হিযাব ফরয করেছেন, যার হুকুম পালন করার জন্য আমরা পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায় করি, তারই হুকুম পালন করার জন্য আমরা হিযাব পরি"। আমরা মুসলিমরা কি আমাদের সন্তানদের এভাবে গড়তে পারছি যেন আমাদের সন্তানরা সত্য কথা বলতে ভয় না পায়। যেভাবে এই মেয়েটি বলেছে?
📄 তরুণদের ভাবনা
এক তরুণের বক্তব্য। সে তার বন্ধু মহলে আড্ডার মাঝে কুরআন থেকে দু'একটা পয়েন্ট তুলে ধরেছে। এতে অন্যান্য বন্ধুরা মন্তব্য করছে যে, "তোর মাথায় ইসলামের ভূত চেপেছে, ইসলাম তোর ব্রেইন ওয়াশ করে দিয়েছে"। আমরা একটু গভীরে চিন্তা করে দেখি। যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং এই পৃথিবীতে সুখে শান্তিতে থাকার জন্য একটি সুন্দর জীবন বিধান দিয়ে দিয়েছেন আর আমাদের তরুশ সমাজ তাকে বলছে ভূত, তাকে বলছে ব্রেইন ওয়াশ!
আমাদের তরুণ সমাজ আজকাল ইসলামকে শত্রু ভাবছে। তারা ইসলামকে ভয় পায়। তাদের ধারণা ইসলাম পালন করলে হয়তো জীবনে অনেক কিছুই করা যাবে না। এখন যা ইচ্ছে করছি তা হয়তো আর করা যাবে না।
তারা ইসলামী বই পড়ে মজা পায় না, এছাড়া তারা ইসলামী বই পড়তেও চায় না।
আমাদের অধিকাংশ ট্রেডিশনাল হুজুররা অনেক সময় ইসলামকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যে, তরুণ সমাজের কাছে তা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তারা সারাক্ষণ নেগেটিভ ওয়াজ করতে থাকেন যে এইটা করা যাবে না... ঐটা করা যাবে না... ইত্যাদি ইত্যাদি। তারা কোন আশার আলো দেখান না। যার কারণে তরুশরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। অধিকাংশ হুজুরদের বক্তব্যের মধ্যে হয়তো কোথাও একটা বড় ধরণের গ্যাপ রয়েছে, যার কারণে কঠিন মনে হয়। আসলে ইসলাম মানুষের জীবনকে কঠিন করার জন্য আসেনি, এসেছে আরো সহজ করার জন্য।
আমাদেরকে খেয়াল রাখতে হবে যে, ইসলাম Extremism সমর্থন করে না। ইসলাম আত্মঘাতি বোমা হামলা (Suicide bombing) সমর্থন করে না। এগুলো ইসলামের অংশ নয়। কেউ বা কোন দল যদি এই ধরণের সন্ত্রাসীমূলক কর্মকান্ড করে তাহলে বুঝতে হবে যে এর সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই, এটা তার বা তাদের নিজস্ব বিষয় এবং এর জন্য সে নিজে দায়ী। এর জন্য তাদেরকে আখিরাতে কঠিন শাস্তির সম্মুখিন হতে হবে। ইসলামের শত্রুরা মিডিয়ার মাধ্যমে এই অপকর্মগুলোকে ইসলামের সাথে সংযুক্ত করে মানুষকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে নিতে চায়।
📄 ‘মধ্যযুগ' বা ‘আইয়ামে জাহিলিয়াতের যুগ' নিয়ে ভুল বুঝাবুঝি
প্রায়ই পত্র-পত্রিকায় এবং টিভি চ্যানেলগুলোতে দেখা যায় যে এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীরা বলেন যে ইসলাম দ্বারা দেশ চালালে দেশ আবার মধ্যযুগে ফিরে যাবে, দেশ আইয়ামে জাহিলিয়াতের যুগে চলে যাবে, দেশ ১৪শ বছর পিছিয়ে যাবে।
আমাদের কাছে হয়তো এই বিষয়টা পরিষ্কার না যে, আইয়ামে জাহিলিয়াতের যুগ বলতে আসলে কী বুঝায়? এই বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়ার জন্য আমাদের মুহাম্মাদ ﷺ-এর বিস্তারিত জীবনী পড়া প্রয়োজন। মুহাম্মাদ ﷺ ৪০ বৎসর বয়সে নবুয়ত পেয়েছেন (৬১১ খৃষ্টাব্দে)। নবুয়ত পাওয়ার বছর থেকে শুরু করে মোট ২৩ বছর সময় ধরে কুরআন নাযিল হয়েছে। আল কুরআনের একেকটা আয়াত নাযিল হয়েছে আর তিনি তা সমাজে বাস্তবায়ন করেছেন। আল কুরআনের এই একেকটা আয়াতই হচ্ছে ইসলাম। পরিপূর্ণ ইসলাম আসার আগ পর্যন্ত সময়টাকে বলা হয় আইয়ামে জাহিলিয়াতের যুগ। আইয়ামে জাহিলিয়াত আরবী শব্দ এর মানে হচ্ছে অজ্ঞতার যুগ। ঐ সময়ে মানুষ ইসলাম বিরোধী সকল কাজ-কর্ম করতো। এখন আমরা নিজেদেরকে নিজে প্রশ্ন করতে পারি যে, ইসলাম সমাজে প্রতিষ্ঠা হলে কিভাবে দেশ আইয়ামে জাহিলিয়াতের যুগে চলে যাবে? ইসলামের মাধ্যমেইতো আইয়ামে জাহিলিয়াতের যুগ পরিবর্তন হয়ে সুস্থ সমাজে ফিরে এসেছে। আল কুরআনের একেকটা আয়াত নাযিল হয়েছে আর জাহিলিয়াতের যুগের একেকটা অন্যায় ও অপকর্ম দূর করা হয়েছে।
ইসলাম আসার আগ পর্যন্ত সময়টা ছিল আইয়ামে জাহিলিয়াতের যুগ। বরং এখন দেখা যাচ্ছে আমরা মুসলিমরা দিন দিন ইসলাম ত্যাগ করে সমাজকে আইয়ামে জাহিলিয়াতের যুগের দিকে নিয়ে যাচ্ছি। যেমন একটি বাস্তব উদাহরণ দিলে বিষয়টা আরো পরিস্কার হবে। আইয়ামে জাহিলিয়াতের যুগে মেয়েরা সংক্ষিপ্ত কাপড় পরতো, অশালিন পোশাক পরে পর পুরুষকে আকর্ষণ করতো। এতে পুরুষরাও উত্তেজিত হতো, মেয়েদেরকে রাস্তা-ঘাটে ইভটিজিং (Eve Teasing) করতো, অসম্মান করতো। ইসলাম এসে মেয়েদেরকে সঠিক কাপড় পরিয়েছে, শালিন পোশাক দিয়েছে, বখাটেদের হাত থেকে রক্ষা করে অসম্মান থেকে সম্মান দিয়েছে। আর আজকে এই শতাব্দিতে এসে আমাদের মেয়েরা আবার আইয়ামে জাহিলিয়াতের যুগের ন্যায় সংক্ষিপ্ত কাপড় পরছে, অশালিন পোশাক পরে বাইরে যাচ্ছে আর নিজেরা পরপুরুষের কাছে অসম্মানিত হচ্ছে, সমাজে ইভটিজিংয়ের পরিমান বাড়িয়ে দিচ্ছে, নিজেদের বিপদ ডেকে আনছে।