📄 স্তবস্তুতিকে নিয়ে নানা রকম কান্ড
অনেকে জীবিত অবস্থায় ঠিক মতো ধর্ম-কর্ম পালন করেন না, বরং ধর্ম-কর্ম নিয়ে নানারকম বিপরীত লেখালেখি করেন, নানারকম আজেবাজে মন্তব্য করেন। যে নাকি জীবিত অবস্থায় এক ওয়াক্তও নামায পড়তো না কিন্তু দেখা যায় যে তার মৃত্যুর পর তার ভক্তরা এবং তার আত্মীয়-স্বজনরা তার জানাজার নামায নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায়, তাকে মসজিদের পাশে কবর দেয়ার জন্য হৈ-হুল্লা করে।
মৃত ব্যক্তির মৃতদেহ কবরে রাখার সময় আমরা বলি “বিসমিল্লাহি ওয়া ‘আলা সুন্নাতি রসূলিল্লাহি” অর্থঃ (আমরা এই মৃতদেহ) আল্লাহর নামে এবং রসূল ﷺ-এর আদর্শের উপর রাখছি। অথচ এই লোকটি জীবিত থাকা অবস্থায় সারাজীবন আল্লাহর বিরোধীতা করেছে, ইসলামের বিরোধীতা করেছে, রসূল ﷺ-এর আদর্শের বিরোধীতা করেছে। তার মৃত্যুর পর আমরা তার লাশকে কবরের মধ্যে রেখে যাচ্ছি আল্লাহ এবং রসূল ﷺ-এর আদর্শের উপর। বিষয়টি গভীরভাবে ভেবে দেখার।
📄 মৃত্যুর পর ইসলামের ব্যবহার
আমাদের দেশের অবস্থা দেখে মনে হয় মানুষের মৃত্যুর পরই ইসলামের ব্যবহার বেশী হয়, যদিও ইসলাম এসেছে জীবিতদের জন্য। মৃতদের ঘিরে আমরা যেসকল কাজগুলো করি এর মধ্যে আবার অনেক কাজই ইসলামের অংশ নয়। যেমন:
কোন আত্মীয় মারা গেলে হুজুর ভাড়া করে এনে নানা রকম খতম পড়ানো যেমন: জালালী খতম, সবীনা খতম ইত্যাদি। বা কেউ মৃত্যুশয্যায় থাকলে তার শিয়রে বসে সূরা ইয়াসিন পড়া, অনেকে মিলে সোয়া লক্ষবার খতমে ইউনুস পড়া, খতমে খাজেকান পড়া।
তারপর লাশ কাফন-দাফন করানো, টুপি না থাকলেও পকেটের রুমাল মাথায় বেধে টুপির কাজ চালিয়ে নেয়া। তারপর আগরবাতি, মোমবাতি এবং ফুল নিয়ে কবরস্থানে যাওয়া। কবরে সুন্দর করে বেড়া দেয়া ইত্যাদি।
মৃতবাড়ির লোকজন কিছুদিন নামায পড়া, নফল রোযা রাখা, গরীব মিসকিনদের খাওয়ানো, দান-খয়রাত করা, মহিলারা কিছুদিন মাথায় গোমটা দেয়া, পুরুষরা কিছুদিন পাঞ্জাবী-পায়জামা ব্যবহার করা, মাঝে মাঝে মসজিদে গিয়ে জামাতে নামায পড়া, তছবি হাতে রাখা, সিডি-ডিভিডিতে কুরআন তিলাওয়াত বাজানো, কিছুদিন টিভিতে নাচ-গান-নাটক না দেখা বা কম দেখা, হাসি-তামাসা কম করা ইত্যাদি।
তিনদিনের দিন গরু-ছাগল জবাই দিয়ে শতশত লোক দাওয়াত দিয়ে কুলখানি করা। তারপর একইভাবে চল্লিশ দিনের দিন চেহলাম বা চল্লিশা করা।
তারপর প্রতি বছর বছর শতশত লোক দাওয়াত দিয়ে অনুষ্ঠান করে মৃতব্যক্তির স্মরণে মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা।
তারপর শ্বেত পাথর, মাবেল পাথর বা টাইলস দিয়ে কবরকে বাঁধাই করা। মাঝে মাঝে কিছু হুজুর ভাড়া করে নিয়ে গিয়ে কবরের কাছে কুরআন তিলালাওয়াত করানো এবং দু’আ-দুরুদ পড়ানো।
কুরআনে একটি আয়াতও নেই মৃত মানুষের জন্য। যা আছে সব জীবিতদের জন্য। অথচ আমরা কুরআন তিলাওয়াত করে শুনাচ্ছি ডেডবডিকে। ডেডবডিকে শুনাচ্ছি আল্লাহর আদেশ-নিষেধ যা প্রয়োজন ছিল জীবিত অবস্থায়।
📄 অন্যান্য ফরয হুকুম ঠিক মতো পালন না করা
• মুসলিমদের ঠিক মতো যাকাত না দেয়া, রমাদানে ঠিক মতো রোযা (সিয়াম) পালন না করা, হাজ্জের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হাজ্জ না করা, সাবালিকা হওয়ার পরও পর্দা না করা, হালাল-হারাম বেছে না চলা, ইসলামের দাওয়াতী কাজ না করা, প্রতিবেশীর হক আদায় না করা, বাবা-মার হক আদায় না করা, গরীব আত্মীয়ের হক আদায় না করা, এতিমের হক আদায় না করা ইত্যাদি।
📄 ইসলামিক কালচার অনুসরণ না করা
• ইসলামিক কালচার একজন মুসলিমের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তাই ইসলাম মানব জীবনের সর্বক্ষেত্রে এর উপর খুব জোর দিয়েছে। আল্লাহর কুরআন ও রসূল -এর হাদীসে এর নানাদিক বর্ণনা করা হয়েছে এবং নারীপুরুষ নির্বিশেষে সকল মুসলিমকে তা পালন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে কুরআন-হাদীস নির্দেশিত নিয়মগুলো মেনে চলার চর্চা যত অধিক করবে, একজন মুসলিম তত অধিক আল্লাহর প্রিয়পাত্র হতে পারবে। অন্যদিকে এই নিয়মগুলো অবহেলা করলে সে ইসলামের মূল শিক্ষা হতে দূরে সরে যাবে, ফলে আল্লাহর প্রিয় সে হতে পারবে না। এটা একটা সুস্পষ্ট ক্ষতি বটে। অথচ আমাদের দেশে খুব কম পরিবারই পাওয়া যাবে যেখানে ইসলামিক কালচারের প্রচলন রয়েছে। ইসলামিক কালচারের মধ্যে রয়েছে যেমন:
১. নাবী মুহাম্মাদের নাম মুখে বললে অথবা অন্য কাউকে বলতে শুনলে "সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম” (তাঁর উপর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক) বলা। এটা একটা দু'আ রসূলের জন্যে। তাঁর সহীহ হাদীস মেনে চলা অতি জরুরী।
২. অন্য সব নাবীদের নাম নিলে "আলাইহিস সালাম" (তাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক) বলা।
৩. সাহাবীদের কারো নাম মুখে বললে পুরুষ হলে "রাদিআল্লাহু আনহু" বলা এবং নারী হলে "রাদিআল্লাহু আনহা” (আল্লাহ তাদের উপর রাজী হোন) বলা।
৪. কিছু করার শুরুতে “বিসমিল্লাহ” (আল্লাহর নাম নিয়ে শুরু করছি) বলা। এবং নিজ বাসায় ঢুকার সময়ও বিসমিল্লাহ বলে ঢুকা।
৫. কোন সুসংবাদ শুনলে অথবা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে “আলহামদুলিল্লাহ” (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর) অথবা “মাশা-আল্লাহ” (আল্লাহ যা ইচ্ছা করেছেন) বলা। আল্লাহর দেয়া সব নিয়ামতের জন্যে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ঘনঘন 'আলহামদুলিল্লাহ' বলা।
৬. কেউ বিদায় নেয়ার কালে পরস্পর সালাম বিনিময় করে বিদায় নেয়া।
৭. আশ্চর্যজনক কিছু শুনলে অথবা প্রশংসা করতে চাইলে “সুবহান আল্লাহ” (আল্লাহ অতি পবিত্র ও মহান) বলা।
৮. কাউকে কিছুর জন্যে ধন্যবাদ বা কৃতজ্ঞতা জানাতে হলে “জাযাকাল্লাহু খাইরান” (আল্লাহ তোমাকে উত্তম পুরষ্কার/বিনিময় দিন) বলা।
৯. কোন সমস্যায় পড়লে “তাওয়াক্কালুল্লাহ” (আমি আল্লাহর উপর নির্ভর করি) বলা।
১০. হাঁচি দিলে “আলহামদুলিল্লাহ” (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই প্রাপ্য) বলা।
১১. অন্য কেউ হাঁচি দিতে শুনলে “ইয়ারহামুকাল্লাহ” (আল্লাহ তোমার উপর রহমত করুন) বলা।
১২. কোন খারাপ কাজ করে ফেললে অথবা কোন নোংরা/আপত্তিকর কিছু হতে দেখলে অথবা তেমন সংবাদ শুনলে “আস্তাগফিরুল্লাহ” (হে আল্লাহ! তোমার কাছে ক্ষমা চাই) বলা।
১৩. ঘৃণা প্রকাশ করতে হলে “নাউজুবিল্লাহ” (আমি আল্লাহর আশ্রয় নিচ্ছি) বলা।