📄 আলেমদের পাণ্ডিত্যি
মুসলিম আলেমগণ (যারা ইসলাম মানেন, বুঝেন ও পালন করেন) তারা বর্তমানে আধুনিক ছেলেমেয়েদের কাছাকাছি আসতে পারছেন না। এসব ছেলেমেয়েরা ইসলামের প্রতিনিধি অর্থাৎ আলেমদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত স্ট্যাটাস অত ভালো নয় বলে তাদের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে না। আবার আলেমরাও ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদেরকে আধুনিক ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে দূরে রাখেন, তাদের কাছেও যান না আবার তাদেরকে নিজেদের কাছেও আসার পথও তৈরী করে দিচ্ছেন না। দীর্ঘ দিন ধরে এই দুই গ্রুপের মাঝে ব্যাপক ব্যবধান সৃষ্টি হয়ে আছে যা দূর হওয়া প্রয়োজন।
ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ধারণা এই ছেলেমেয়েরা যেমন জানেন না বা ইসলামের আসল রূপ ও সৌন্দর্য্য দেখার সৌভাগ্য তাদের হয়নি, ঠিক তেমনি আমরা যারা ইসলাম জানি, বুঝি, মানি ও ভালোবাসি, তারাও ইসলাম প্রচারের দায়িত্বকে ফরয মনে করে ইসলামকে তাদের কাছে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করিনি অথচ বিশাল অংকের টাকার চুক্তিতে ওয়াজ মাহফিল করে বেড়াচ্ছি।
📄 ইসলামিক লাইব্রেরীর অভাব
আমেরিকা, ক্যানাডা, সিঙ্গাপুরে দেশের প্রতিটি এলাকায় একটি করে উন্নতমানের রেফারেন্স লাইব্রেরী রয়েছে। অর্থাৎ পুরো দেশের আনাচে কানাচে শতশত লাইব্রেরী রয়েছে। যে কেউ বিনা পয়সায় মেম্বার হতে পারেন এবং লাইব্রেরীতে বসে পড়া-লেখা এবং রিসার্চ করতে পারেন এবং প্রয়োজনে বই, ডিভিডি বাসায় নিয়ে যেতে পারেন। প্রতিটি লাইব্রেরীতেই কম্পিউটার, প্রিন্টার এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা রয়েছে। সব সার্ভিসই ফ্রী। এই লাইব্রেরীগুলোতে বিভিন্ন ধর্মের উপর নানা ভাষায় বই রয়েছে।
কিন্তু আমাদের দেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একটি লাইব্রেরী ছাড়া দেশের আর কোথাও কোন ইসলামিক লাইব্রেরী নেই। অনেক এলাকাতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বা কোন সোসাল অর্গানাইজেশনের উদ্যোগে লাইব্রেরী থাকতে পারে কিন্তু তা রয়েছে শুধুমাত্র গল্প-উপন্যাসে ভরপুর। সেখানে শুধু অথেন্টিক ইসলামী বইয়ের অভাব।
বাংলাদেশ এখন মসজিদের জন্য বিখ্যাত এবং এই দেশ মসজিদের দেশ হিসেবে সারা পৃথিবীতে প্রথম স্থান পেয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে কোটি কোটি টাকা খরচ করে মসজিদ বানানো হচ্ছে কিন্তু মসজিদগুলোর তাকে হয়তো কিছু আরবী কুরআন রয়েছে তাও শুধু তিলওয়াত করার জন্য। কিন্তু ইসলামকে জানার জন্য, কুরআনকে জানার জন্য কোন ইসলামী সাহিত্য এবং তাফসীর নেই। রসূলকে জানার জন্য কোন সীরাত গ্রন্থ নেই।
প্রায় প্রতিটি শিক্ষিত পরিবারের ড্রইংরুমে একটি বইয়ের আলমিরা থাকে এবং সেখানে অনেক সাহিত্যের বই-ই থাকে কিন্তু শুধু থাকে না ইসলামের উপর অথেন্টিক বই। যদিও কারো কারো ঘরে 'মকসুদুল মোমিনুন' বা 'নিয়ামুল কুরআন' এই জাতীয় দুই একটা বই থাকে যা মানুষকে সঠিক ইসলাম থেকে আরো দূরে সরিয়ে নিয়ে যায় এবং ইসলামের নামে কিছু বিদ'আত ঘরের মধ্যে পালিত হয়।
আমরা যদি ইতিহাস দেখি যে মুঘল সম্রাটরা কোটি কোটি রুপি খরচ করে প্রাসাদ বানিয়েছে, প্রেমের নিদর্শন স্বরূপ তাজমহল নির্মাণ করেছে, মার্বেল পাথর দিয়ে খুবই চাকচিক্যময় মসজিদ নির্মাণ করেছে কিন্তু তারা মুসলিমদের সঠিক ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য কোন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেননি, লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করেননি, ইসলামী গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করেননি।
ধনী আরব দেশগুলো ডোনেশন দিয়ে আমাদের মতো গরীব দেশেগুলোতে পাঁচওয়াক্ত সলাত আদায় করার জন্য অনেক মসজিদ তৈরী করে দিয়েছে, যা সলাত শেষে তালা মেরে রাখা হচ্ছে অন্য কোন কাজে লাগছে না। তারা আমাদের প্রতি দয়া পরবেশ হয়ে দেশের আনাচে কানাচে অনেক মসজিদ তৈরী করে দিয়েছে ঠিকই কিন্তু এই মসজিদগুলো আবাদ করার জন্য লোক তৈরীর ব্যবস্থা করেনি, কোন লাইব্রেরী বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেনি।
📄 ভুলের সাথে আপোষ মিলিয়ে ফেলা
সবকিছুতে আমরা ভাল-খারাপ তালগোল পাকিয়ে ফেলেছি, মিক্সআপ করে ফেলেছি। আমরা অনেক অন্যায়কেই আর অন্যায় বলে মনে করি না। আমাদের বিবেক ভোতা হয়ে গেছে। সুদ খাওয়া, ঘুষ খাওয়া আজ একটা সাধারণ ও গ্রহণযোগ্য ব্যাপার। বাবা ঘুষ খান, ঘুষ দেন, সুদ খান, সুদ দেন, মিথ্যা বলেন, আমানত খেয়ানত করেন, অন্যের ক্ষতি করেন, সরকারের ট্যাক্স ফাঁকি দেন, গ্যাস-পানি-বিদ্যুতের বিল ঠিক মতো পরিশোধ করেন না। সন্তানরা এগুলো জন্মের পর থেকে দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এসবকে এরা আর অন্যায় বলে মনে করে না।
* আমরা নামাযও পড়ছি আবার ব্যবসায় মানুষকে ঠকিয়ে যাচ্ছি, রোযাও রাখছি আবার অশ্লীল নাটক-সিনেমাও দেখছি, বেপর্দা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, অন্যের গীবত করে বেড়াচ্ছি, পরনিন্দা-পরচর্চা করে বেড়াচ্ছি। ভাল-মন্দ আলাদা করতে পারছি না। সমাজের সবাই এভাবেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে। সন্তানরাও জন্মের পর থেকে এগুলো দেখে আসছে। ওদের চোখে এসবই স্বাভাবিক, গ্রহণযোগ্য বলে মনে হচ্ছে। এসব অন্যায়কে এরা ঘৃণা করতে শিখছে না, মাবাবাও তা শেখাচ্ছেন না।
📄 ইসলামকে নিজেদের সুবিধামত কাস্টমাইজ করে নেয়া বা ব্যাখ্যা করা
* যদিও কোন পরিবার ইসলাম পালন করার চেষ্টা করেন তাদের মধ্যে থেকে অনেকেই ইসলামকে নিজেদের মতো করে কাস্টমাইজ করে নিয়েছেন। অর্থাৎ ইসলামের যা যা নিজের পালন করা সহজ হয় সেগুলো শুধু পালন করেন, আর ইসলামের যেগুলো পালন করা কঠিন বা যেগুলো পালন করতে গেলে কিছু সামাজিক ও আর্থিক ত্যাগ স্বীকার করতে হয় সেগুলো ইসলাম থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছেন।
* সারা দিনে কিছু সময় ইসলাম পালন করেন আর কিছু সময় পালন করেন না। যেমন একজন মহিলা সাধারণত পর্দা করে চলেন কিন্তু যখন কোন অনুষ্ঠানে যান তখন আর পর্দা করেন না বরং পর্দা খুলে সেখানে সাজগোজ করে নিজেকে উপস্থাপন করেন।
* যখন ঘরে থাকেন তখন সলাত আদায় করেন কিন্তু যখন শপিংয়ে যান, সারাদিন মার্কেটে ঘুরে বেড়ান তখন আর সলাত আদায় করেন না। মনে হয় সলাতটা শুধু বাসায় থাকলে আদায় করতে হয়, বাইরে গেলে প্রয়োজন নেই।
* রমাদান মাসে ঢাকার গাউসিয়া-নিউমার্কেটে মহিলাদের চাপে ঢুকাই যায় না। সম্মানিত মহিলারা রোযাও রেখেছেন কিন্তু সারা দিন বেপর্দা হয়ে শপিং করছেন এবং যোহর-আসর-মাগরিবের সলাত আদায় করছেন না।