📄 পারিবারিক অসচেতনতা
আমাদের মুসলিম ঘরের ছেলেমেয়েরা ইসলাম থেকে দূরে সরে যাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে পারিবারিক অসচেতনতা।
পিতামাতা এজন্য অনেকাংশে দায়ী, কারণ তারা তাদের সন্তানদের ইসলাম চর্চা বা ইসলামী জ্ঞান অর্জন নিয়ে খুব একটা চিন্তা করেন না।
আমরা জানি বাংলাদেশের ৮৩% লোক মুসলিম। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে এদের খুব অল্প সংখ্যকই ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো ভালো করে জানেন বা বুঝেন।
সন্তানেরা নিজ ঘরে ছোটবেলা থেকেই তেমন একটা ইসলামী পরিবেশ দেখে না।
সন্তানরা জন্মের পর থেকে নিজ ঘরে বাবা-মাকে ঠিক মতো নামায-রোযা করতে দেখে না, যাকাত দিতে দেখে না। কুরআন-হাদীস পড়তে, ইসলামী বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করতে দেখে না।
সন্তানেরা নিজ মা, ফুফু, খালাদেরকে পর্দা করতে দেখে না। কুরআন-হাদীস পড়তে দেখে না।
সন্তানেরা নিজ ঘরে অনৈসলামী অনুষ্ঠান ও কর্মকান্ড দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
📄 আমাদের অতিরিক্ত ব্যস্ততার প্রভাব
আমরা সবাই আজকাল পার্থিব জীবন নিয়ে এতো ব্যস্ত যে এই বিষয়ে সতর্ক করে দিয়ে মহান আল্লাহ ও তাঁর রসূল নাবী মুহাম্মাদ ﷺ বলে দিয়েছেন:
'আল্লাহ তা'আলা বলেন, হে আদম সন্তান, আমার দ্বীনের কাজের জন্য তুমি (দুনিয়ার) ব্যস্ততা কমাও, আমি তোমার অন্তরকে প্রাচুর্য দিয়ে ভরে দেব এবং তোমার দরিদ্রতা ঘুচিয়ে দেব। আর যদি তা না কর, তবে তোমার হাত (আমি) ব্যস্ততায় ভরে দেব এবং তোমার অভাব দূর করব না।' [তিরমিযী, মুসনাদ আহমদ, ইবন মাজাহ]
যে ব্যক্তি দুনিয়াকে তার জীবনের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে, আল্লাহ তার (ভালো-মন্দের) দায়িত্ব থেকে পৃথক থাকেন। তিনি (আল্লাহ) তার (ঐ ব্যক্তির) চোখের সামনে দরিদ্রতাকে তুলে ধরেন, আর প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ যা তাকদীরে লিখে রেখেছেন তা ব্যতীত ঐ ব্যক্তির জন্য আর কিছুই আসবে না। আর যে ব্যক্তি পরকালকে তার জীবনের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে, আল্লাহ ঐ ব্যক্তির (ভাল-মন্দের) দায়িত্ব নিজেই গ্রহণ করেন, তাকে অন্তরে সমৃদ্ধি দান করেন, আর পৃথিবী তার কাছে ছুটে আসে আকুল হয়ে। [ইবনে মাজাহ ও ইবনে হিব্বান]
আব্দুল্লাহ (রাদিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি নাবী ﷺ-কে বলতে শুনেছেন যে, যে ব্যক্তি পরকালকে তার জীবনের পরম ঠিকানা বানিয়ে নিয়েছে আল্লাহ তার যাবতীয় অভাব-অনটনের দেখাশুনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন; আর যে ব্যক্তির আগ্রহ-আরাধনা হয়েছে পার্থিব বিষয়াদি, আল্লাহ তার বিষয়ে কোনো জামিনদার নন। [ইবনে মাজাহ]
📄 আল-কুরআন থেকে দূরে সরে থাকা
ইসলামের মূল সোর্স আল-কুরআন হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান (Complete code of life) যার ছায়াতলে এসে এবং মর্ম বুঝে কোটি কোটি মানুষ মুসলিম হয়েছিলেন। সেই মুসলিম ঘরে জন্ম নেয়া ছেলেমেয়েরা আজ কুরআনের মধ্যে কী আছে তা জানে না। তাদেরকে এর অর্থ ও ব্যাখ্যা জানানোর জন্যে ব্যাপক কোন ব্যবস্থা জাতীয়ভাবে করা হয়নি। এমনকি পারিবারিকভাবেও করা হয়নি।
📄 কুরআন থেকে দূরে সরিয়ে রাখার পিছনে ইবলিস শয়তানের প্ররোচনা
• যারা কুরআনের অর্থ জানেন এবং বুঝেন, তারা নিজ দায়িত্বে এটা অন্যকে শিখানোর ব্যাপারে উদাসীন। চাকুরির বাইরে কুরআনের সঠিক শিক্ষা এবং প্রচারের কাজ আমরা কতজন করি?
• আল-কুরআনকে আমরা শুধু ব্যবহার করছি তিলাওয়াতের জন্য। যারাই কুরআন পড়ছি তাও শুধু মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে তিলাওয়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছি, অর্থ বোঝার কোন চেষ্টা করছি না। যেন কুরআনের অর্থ বোঝার কোন প্রয়োজনই নেই!
• আশ্চর্যের বিষয়, আমরা অনেক বই পড়ি কিন্তু কোন বই পড়তে মাথা দুলাইনা কিন্তু এই একটি মাত্র বই যা পড়ার সময় কেন যেন মাথা দুলাই আর এর অর্থও বুঝি না এবং প্রয়োজনও মনে করি না।
আল-কুরআন সম্পর্কে আমাদের ভুল ধারণা: এক প্রতিবেশী আপা তার বাচ্চাদের অনেকগুলো সূরা মুখস্ত করিয়েছেন কিন্তু তিনি তার বাচ্চাদের ইয়াসীন সূরা মুখস্ত করতে দেন না। তার কারণে তিনি বলেন, ইয়াসীন সূরা খুব গরম তো তাই ওদেরকে পড়তে দেই না। কোথায় পেলেন তিনি এই গরম সূরার খবর?
আল-কুরআনকে ব্যবহার করা হচ্ছে ঝাড়-ফুঁক, তাবিজ-কবজের জন্য। আবার ব্যবহার করা হচ্ছে কেউ মারা গেলে মৃত মানুষের কল্যাণের জন্য, অথচ আল কুরআনে মৃত মানুষদের কল্যাণের জন্য একটি আয়াতও নেই। এটা সম্পূর্ণভাবেই জীবিতদের জন্যে উপদেশের ও তা যথাযথভাবে পালনের নির্দেশ বহনকারি কিতাব।
• মুসলিমদেরকে কুরআন থেকে দূরে সরে থাকার জন্য যে বিষয়গুলো কাজ করে তার মধ্যে আর একটি বিশেষ কারণ হলো "ওজু ছাড়া কুরআন স্পর্শ করা যাবে না"। এটি ইবলিস শয়তানের একটি প্ররোচণা। তাই এই বিষয়ে আমাদের ভুল ধারণা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন যে কুরআন স্পর্শ করার জন্য অযুর প্রয়োজন নেই। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন 'পাক-পবিত্রতার কথা', ওজুর কথা বলেননি। 'কুরআন পড়তে বা ধরতে ওজু থাকতে হবে' এটি শয়তানের একটি প্ররোচনা। কারণ শয়তান চায় না মানুষ বেশী বেশী কুরআন পড়ুক, বুঝুক এবং সেই অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করুক। মানুষের বেশীরভাগ সময়ই সাধারণত ওজু থাকে না আর সেজন্য তারা ভয়ে কুরআনও স্পর্শ করে না। মানুষ কুরআন অর্থসহ বুঝে পড়লে এবং সেই অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করলে সেটাই হবে শয়তানের ব্যর্থতা। রসূল কুরআনের আয়াত দিয়ে চিঠি লিখে বিভিন্ন দেশের অমুসলিম রাজাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছিয়েছেন। সেই সকল অমুসলিম রাজারা ওজু ছাড়াই কুরআন স্পর্শ করেছেন। ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী একমাত্র নামায পড়তে ও কাবাঘর তাওয়াফ করতে ওজু লাগে, এছাড়া আর কোন কাজে ওজু লাগে না। এই বিষয়ে আরো বিস্তারিত জানার জন্য ডা. জাকির নায়েকের লিখা বই এবং ডা. মতিয়ার রহমানের লিখা বই পড়া যেতে পারে। "ওজু ছাড়া কুরআন স্পর্শ করলে গুনাহ হবে কিনা"।
২০১৩ সালে পাকিস্তানে এক লক্ষ ইমামের মধ্যে একটি সার্ভে করা হয়েছে যে তারা সলাতে (নামাযে) যা পড়ছে বা তিলাওয়াত করছে তা বুঝেন কিনা। এই এক লক্ষ ইমামই উত্তরে বলেছেন যে তারা যা তিলাওয়াত করেন তা বুঝেন না। শুধু পাকিস্তানেই নয়, বরং বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক মুসলিম অধ্যুষিত দেশেই এই অবস্থা বিরাজ করছে।
অনেক হুজুররাই সাধারণ মুসলিমদের কুরআন বুঝে পড়তে নিরুৎসাহিত করেন। তারা বলেন কুরআন বুঝার প্রয়োজন নেই, কুরআন বুঝবে শুধু আলেমরা। তারা মুসলিমদেরকে শুধু তিলাওয়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান। অনেক সাধারণ শিক্ষিত লোকেরাই আরবী দেখে শুদ্ধমতো কুরআন পড়তে পারেন না, হয়তো অনেক জায়গায় ঠেকে যান, তাই তারা কুরআনই পড়েন না।
এমন এক শ্রেণীর মানুষ-তো আছেই, যারা মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের প্রশ্নে শুধু অনীহ বা অনাগ্রহী নয়, রীতিমতো প্রতিশ্রুত শত্রুতা দ্বারা চালিত। এবং এইসঙ্গে একটি অতীব কৌতুককর বাস্তবতা হলো, এমন অসংখ্য ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি আছেন, যারা দলবদ্ধভাবে একটি বিশেষ পুস্তক ছাড়া অন্য কোনো বই, এমনকি কুরআন হাদীস পাঠ করাকেও নিরুৎসাহিত করেন। তাঁদের বিশ্বাস, বই-পুস্তক পড়লে অন্তরে অহেতুক ফিতনা সৃষ্টি হয়, আখিরাতমুখী 'যিকির ফিকির'-এর খুব ক্ষতি হয়। আর এই কারণে একটি বিরাট ইসলামপ্রেমী দল আজ বই-পুস্তক থেকে সতর্কভাবে দূরে থাকাই সমীচীন জ্ঞান করছেন!
অনেক প্রকাশনী শুধু আরবী টেক্সট দিয়ে আল কুরআন ছাপিয়ে বাজারে ছাড়েন, তাতে কোন অর্থ বা সংক্ষিপ্ত তাফসীর থাকে না। যার কারণে যারা তিলাওয়াত করেন তারা ঔ তিলাওয়াতের বাইরে এক অক্ষরও কুরআনের অর্থ জানার সুযোগও পান না আর জানেনও না। তারা শুধু নিজেদেরকে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে তিলাওয়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন, আর মনে করেন অনেক সওয়াব হচ্ছে। মনে রাখতে হবে যে, আল-কুরআন শুধু সওয়াবের জন্য আসেনি, এসেছে মানব জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করার জন্য।
অনেক প্রকাশনী খুবই ছোট সাইজের কুরআন ছাপিয়ে বাজারে ছাড়েন যা চশমা বা খালি চোখে দেখে পড়া যায় না। এতো ছোট সাইজ যে পড়তে হলে ম্যাগনিফাইং গ্লাস লাগে। তারা এই কুরআন হয়তো ছাপায় মুসলিমদের গলায় ঝুলানোর জন্য বা পকেটে রাখার জন্য যাতে ভূত-প্রেত কাছে আসতে না পারে। এই ধরণের আচরণের সমর্থনে কোন দলিল কুরআন বা হাদীসে নেই। সঠিক ব্যবহার বাদ দিয়ে আজ কুরআনকে শুধু ব্যবহার করা হচ্ছে তাবিজ হিসেবে।
অনেক উচ্চ শিক্ষিত লোকেরা সারা জীবন মোটা মোটা বই পড়ছেন এবং বড় বড় ডিগ্রি নিচ্ছেন, নিজেরাও বড় বড় বই লিখছেন কিন্তু কুরআন পড়ার কোন সময় করতে পারলেন না। যার কারণে উচ্চ শিক্ষিত লোকদের মধ্যে একটি বিশাল অংশ আল কুরআন বুঝেন না এবং সৃষ্টিকর্তা কী বলেছেন তা জানেনও না। তবে জাতি গঠনের জন্য এই শিক্ষিত শ্রেণীর কুরআন বুঝা খুবই জরুরী।
বাংলাদেশের প্রতিটি মুসলিম শিক্ষক-শিক্ষিকার আল কুরআনের উপর ভাল জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। তারা যদি আল-কুরআন না বুঝে থাকেন তাহলে তারা কীভাবে কুরআনের আলোকে যুব সমাজ গঠন করবেন? কীভাবে জাতি গঠন করবেন? তারাই তো জাতির ফাউন্ডেশন তৈরী করেন। আমরা জানি যে স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের একেকজন শিক্ষক-শিক্ষিকা একেক বিষয়ের উপর পারদর্শী। যেমন, সমাজ-বিজ্ঞান, পৌরনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, অংকবিদ্যা, রসায়ন বিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ের একেকজন শিক্ষক যদি আল কুরআনের সঠিক শিক্ষা পেতেন এবং গোটা কুরআন যদি বুঝতেন তাহলে তাদের প্রতিটি বিষয়ের সাথে কুরআনকে সম্পৃক্ত করে ক্লাশে বুঝাতে পারতেন। এতে ছোটবেলা থেকেই ছাত্র-ছাত্রীরা আল কুরআনের সাথে পরিচিত হয়ে যেত।
আমাদের ভুল ধারণা যে আল-কুরআন বুঝবেন শুধু স্কুলের ধর্ম শিক্ষক, এটা তার বিষয়। আর স্কুলের মধ্যে সবচেয়ে অবহেলিত বিষয় হচ্ছে এই ইসলাম ধর্ম। আমি সমাজ-বিজ্ঞানের শিক্ষক, আমি কুরআন নিয়ে মাথা ঘামাবো কেন? এই ধরণের চিন্তা সম্পূর্ণরূপে ভুল। আমি সমাজ-বিজ্ঞানের শিক্ষক হয়ে যদি আল-কুরআন না বুঝি তাহলে কীভাবে কুরআনের আলোকে সমাজ গঠন করবো? কীভাবে ক্লাশে সুষ্ঠ সমাজনীতি শিখাবো? আমার কাজ তো সমাজ নিয়ে। অথচ ১৪শত বছর আগে আল্লাহর রসূল এতো আল কুরআন দিয়েই তখনকার বর্বর সমাজের পরিবর্তন এনেছিলেন।