📘 মুসলিম প্যারেন্টিং 📄 উপসংহার

📄 উপসংহার


‘সব কর্মের মানসিকতা আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিরাট উপহার। কিন্তু শিষ্টাচারের শিক্ষা পিতা-মাতার পক্ষ থেকেই আসে।’ বুখারি
বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে প্রবেশের সাথে সাথে ছেলেমেয়েরা ব্যাপক শারীরিক ও মানসিক (Emotional) পরিবর্তনের সম্মুখীন হয়। পিতা-মাতার কর্তব্য হচ্ছে— এই সময়ে সন্তানদের সাথে এই সকল বিষয়ে শালীনতার সাথে খোলামেলা আলোচনা করা। ছোটো শিশুদের যেমন শারীরিক ও মানসিক চাহিদা থাকে এবং আদর যত্নের প্রয়োজন, তেমনি কিশোর ছেলেমেয়েদেরও মানসিক সমর্থন, পরামর্শ, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার প্রয়োজন—যাতে করে তারা নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এই ক্ষেত্রে পিতা-মাতার উচিত কিশোর সন্তানদের সাথে আরও আমায়িক আচরণ এবং তাদের জন্য আরও সহজ পন্থা অবলম্বন করা।
মানুষ কিশোর বয়সে জীবনের সবচেয়ে জটিল সময় অতিবাহিত করে। শারীরিক পরিবর্তন ছাড়াও এই সময় তারা চারদিকের বিশ্ব সম্পর্কে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা লাভ করে এবং সেখানে তারা নিজেদেরকে জড়াতে চায়। অনেকের জন্য এটি রোমাঞ্চকর বিষয়ও বটে। আবার অনেকে অজানা ভয়ে ভীত থাকে এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। অনেক কিশোর এই সময়ে দোটানায় পড়ে যায়, ফলে তাদের মাঝে বিপরীতমুখী চরিত্রও লক্ষ করা যায়। কতক সময় তারা খুবই উৎসাহী ও প্রাণবন্ত হয় এবং কতক সময় এলোমেলো ও অসহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব প্রদর্শন করে।
যে সকল অভিভাবক এই ধরনের পরিবর্তনকে সাধারণ প্রাকৃতিক পরিবর্তন হিসেবে গ্রহণ করেন, তারা এই সকল পরিস্থিতিকে ভীত হন না। তারা সন্তান লালন-পালনে এমন এক পন্থা অবলম্বন করেন, যা পরিবেশে পিতা-মাতা ও সন্তানের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে। এতে সন্তানেরা নির্বিঘ্নে নিজের বয়ঃসন্ধিকালীন অবস্থা পার করে। সন্তান প্রতিপালনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তাদের জন্য এমন একটি পারিবারিক পরিবেশ সৃষ্টি করা—যেটি হবে আস্থাযোগ্যতা, সম্মান ও শ্রদ্ধায় পূর্ণ। এটি তাদের সামাজিক পরিবেশে সাথে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে। কিশোরদের উচিত যখন এই সকল পরিবেশে গড়ে উঠতে, তখন তারা সমাজিকভাবে পরিপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ একজন মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। তারা হয় পিতা-মাতা ও সমাজের জন্য বিরাট সম্পদস্বরূপ। এর‍াই বড়ো হয়ে সমাজের ইতিবাচক সমৃদ্ধিতে বিরাট ভূমিকা পালন করে।
কথার চেয়ে কাজ কঠিন। অভিভাবকদের অবশ্যই নিজেদের কথাবার্তা ও কার্যক্রমে সচেতন হতে হবে। নিজেদের সকল কাজে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মাদ ﷺ-এর পন্থা অনুসরণ করতে হবে। দয়া, উত্তম আচরণ, ভদ্রতা, সততা পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষা এবং সর্বদা সেবা করার মতো বিষ্ণুবর্জীন মূল্যবোধ ধারণ করে পরিচালনা করতে হবে নিজের জীবন। ভালো গাছ যেভাবে সুস্বাদু ফল দেয়, ঠিক সেভাবে নৈতিকতাপূর্ণ পিতা-মাতা ও চরিত্রবান সন্তান উপহার দেয়।
এর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো—সন্তানদের সাথে পর্যাপ্ত পরিমাণ গুণগত সময় (Quality Time) ব্যয় করা। পিতা-মাতার সুসম্পর্ক সন্তান ও পিতা-মাতার মাঝে সম্পর্ক বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সন্তানদের মনে এই বিষয়টি গেঁথে দিতে হবে—তাদের সাথে কথা বলা, তাদের উপদেশ দেওয়া কিংবা আর দেওয়ার জন্য পিতা-মাতা সর্বদা প্রস্তুত। সন্তানদের সাথে খোলামেলা এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হলে মাতা-পিতা সন্তানের অবয়ব থেকে‌ই সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ বুঝতে পারবেন, যা সমাধান করতে সহজ হবে।
কিশোরদের জীবনে অনেক উত্থান-পতন ঘটে, এই সময়ে তারা অনেক অনিশ্চিত ও আকস্মিক পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়। পিতা-মাতা এই সময় বন্ধুত্বপূর্ণ সন্তানদের মাধ্যমে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারে। সন্তানদের অস্বাভাবিক আচরণের প্রতিক্রিয়া চিৎকার ও ধমক দেওয়া উচিত নয়।
যে সকল কিশোর প্রতিনিয়ত অস্বাভাবিক আচরণ করে, তাদের মধ্যে যেকোনো ধরনের গোপন ভীতি অথবা নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি দানা বাঁধতে পারে। সুতরাং কষ্ট হলেও তাদের সাথে ভালোবাসাপূর্ণ আচরণ করতে হবে এবং তাদের মনের মধ্যে সৃষ্ট বিষয়গুলোর ব্যাপারে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে। তারা প্রতিনিয়ত এই ভুল করে থাকে। বিবেকবান সকল পিতা-মাতাই জানেন, যখন কিশোর সন্তানদের একা ছেড়ে দিতে হবে এবং কখন তাদের ব্যাপারে নিয়ামানুযয়ি দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
নিয়মকানুন ও আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অহেতুক হস্তক্ষেপ নেতিবাচক ফলাফল বয়ে আনে। অনেক কিশোর পিতা-মাতার বিরুদ্ধাচরণ করে। যখন তারা দেখতে পায়, তাদের সুচিন্তাশীল ও অনুসন্ধিৎসু মননে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে, তখন তারা পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলে।
দায়িত্ববোধের জগতে ১১৯
মিডিয়ার মাধ্যমে বস্তুবাদী ও ভোগবাদী সংস্কৃতিকে তরুণদের সামনে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করা হয়। এর আকর্ষণে মোহগ্রস্ত হওয়া তাদের মোটেও অস্বাভাবিক বিষয় নয়। বাস্তবতা হচ্ছে, বর্তমান সমাজব্যবস্থা তার মূল্যবোধ ও চরিত্র রক্ষার ক্ষেত্রে বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই উত্তরআধুনিক সমাজ নিজের প্রতি যত্নশীল এবং সর্বব্যাপী হওয়ার পরিবর্তে খুব দ্রুততার সাথে ভোগবাদিতা ও আত্মকেন্দ্রিকতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের সন্তানদের ভোগবাদিতার অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। ফলে তারা ব্যর্থ হচ্ছে আকাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে। অনেকেই আত্মপরিচয় সংকট, হীনম্মন্যতা ও সংশয়ে ভোগে। ফলে বিরাটসংখ্যক তরুণ ইসলামের মধ্যমপন্থার নীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং কেউ কেউ চরমপন্থা অবলম্বন করছে।
বর্তমানে তরুণদের ক্ষেত্রে আমরা যে সমস্ত সমস্যার মুখোমুখি, তার মূল কারণ হচ্ছে দুর্বল বা খারাপ প্যারেন্টিং। সমাজের নানাবিধ উন্নতির ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে বড়ো বাধা। যে সকল পিতা-মাতা সন্তান পালনে উপযুক্ত সময় দিতে পারেন না, তারা নিজেদের বৃদ্ধাবস্থায় এর তিক্ত ফল ভোগ করেন। কিন্তু ততক্ষণে খুব দেরি হয়ে যায়। শুধু এই পৃথিবীতেই তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না; বরং পরকালেও তাদের এর ফলাফল ভোগ করতে হবে। জীবনোদ্দেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ উপায়ে সঠিকভাবে সন্তান পালন করা অপরিহার্য, যা দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ অর্জনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে বলব—স্বভাবগতভাবে তরুণরা সরলমন, সুখী, সৃষ্টিশীল ও দুঃসাহসী। তাদের প্রাণবন্ততা ও সরল পরিবর্তন আমাদের বড়োদের মাঝে প্রশান্তি জাগায়, সন্তান লালন-পালন পদ্ধতি যদি ভালোভাবে বোঝা যায় এবং সুজনশীল উপায়ে যদি তা সম্পাদন করা যায়, তাহলে তা হবে আনন্দদায়ক ও দুঃসাহসিক কাজ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px