📄 দাওয়াজি কাজের সুযোগ
দাওয়াতি কাজ হলো মানুষকে আল্লাহর বিশ্বাসের দিকে ডাকা। মুসলিম যুবকদের আত্ম-অহংকারের ডুবে না থেকে আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান ও হিদায়াতের ব্যাপারে গর্ববোধ করা উচিত। মুসলিম তরুণরা সমাজের সকলের সাথে মধুর সম্পর্ক রেখে ভালো কাজে উৎসাহ এবং খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখার প্রচেষ্টা চালাতে পারে। সুশীল চিন্তার দ্বারা নিজেদের এবং অন্য মানুষের সহযোগিতা করতে পারে। একজন মুসলিম যা করে, যা বলে, যা পরে, যা খায় এবং যেভাবে সময় কাটায়—সবকিছুতেই ইতিবাচক বার্তা থাকতে হবে। আমাদের কথা বলা, পোশাক-পরিচ্ছদ, দাওয়া ও হিজাবসহ আমাদের পরিচয় বহন করে। এমনকী আমাদের চেহারা, নখ্র চরিত্র, ভালো আচরণ, কঠেরির পরিশ্রম—সবকিছুই আমাদের মুসলিম পরিচয়ে চিহ্নিত বহন করে। আমরা প্রাত্যহিক জীবনে যা-ই করি, তার সবগুলোই ইসলামের সাক্ষ্য বহন করে। আমাদের কর্মকাণ্ড একজন মানুষকে হয় ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করে, নয়তো ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
ইসলাম কাজের ক্ষেত্রে সততা ও চারিত্রিক মাধুর্যতার কথা বলে। আমরা সামাজিক হওয়ার জন্য মদের বার কিংবা মদের দোকানে কেন যাই না—তা তাদের কাছে আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে হবে। আবার যারা এগুলো করে, তাদের বিরুদ্ধি দেখানোরও প্রয়োজন নেই। মানুষে মানুষে পার্থক্য থাকবে, পছন্দ ও আকাঙ্ক্ষায় ভিন্নতা থাকবে—এটা স্বাভাবিক। আমরা সঠিক সময়ে সালাত আদায় করব। আমাদের উচিতও কারও গিবত হয় করা কিংবা দোষ ধরা থেকে বিরত থাকা। আমাদের কর্তব্য হচ্ছে ওয়াদা রক্ষা এবং কোথায় হেরফের না করা। এগুলোর অনুসরণ মুসলিম সহকর্মীদের সাহস ও উৎসাহ জোগায়। এই সকল অভ্যাস অন্য মানুষের মনে ইসলামের ব্যাপারে কৌতূহল ও আগ্রহ সৃষ্টি করে। ইসলামে দীক্ষিত অনেকেই বলেছেন, তারা মুসলিমদের নম্রতা ও স্বাভাবিক জীবনযাপন দেখেই ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন।
📄 ইসলাম ও খিদমাহ
একবার ইমা (ছদ্মনাম) নামে এক ধর্মাত্ত্বব মুসলিম ও তার ইসলাম গ্রহণের কাহিনি বর্ণনা করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে সে ফাহিমা (ছদ্মনাম) নামের এক মুসলিম মেয়ের সাথে ফ্ল্যাট শেয়ার করে থাকত। ফাহিমা একজন প্র্যাকটিসিং মুসলিম ছিল এবং আচার-আচরণে খুব সামাজিক ও ভদ্র ছিল। একটা সময় ইমা ও ফাহিমা খুব ভালো বন্ধু বনে গেল। তারা ধর্মসহ অন্যান্য অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করত, কিন্তু কখনো ব্যক্তিগত বিষয়ে সীমা অতিক্রম করত না এবং একে অপরের ব্যক্তিগত স্পর্শকাতর বিষয়ে হস্তক্ষেপ করত না। এক্ষেত্রে ফাহিমা বেশি সতর্কতা অবলম্বন করত। ভোরবেলায় উঠে ফাহিমার সালাত আদায় ইমাকে হালকা বিরক্ত করত। কিন্তু ইমা ধীরে ধীরে এতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। ফাহিমা ইমার কাছে অসুবিধা সৃষ্টির জন্য ক্ষমা চেয়ে নিত। সময়ের সাথে সাথে ফাহিমার নম্রতা ও আন্তরিকতা ইমার কাছে আরও কাছে নিয়ে আসে।
একসময় ইমা অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং অনেক দিন ধরে বিছানায় পড়ে থাকে। পরিবারের থেকে দূরে থাকার কারণে ইমা অনেক অসহায় অনুভব করে থাকে। এই সময় ফাহিমা তার মূল বিদমাহ চরিত্রানুগ আত্মপ্রকাশ ঘটিয়ে ইমার সেবায় আত্মনিয়োগ এবং নার্সের ভূমিকা পালন করে। ইমা অনুভব করে, ফাহিমা শুধু তাকে সাহায্য করার চেষ্টাই করছে না; বরং প্রচণ্ড ভালোও বাসছে। ইমা ফাহিমার সেবা দেখে অভিভূত হয়। কৃতজ্ঞতায় তার মন ভরে ওঠে। এটাই ফাহিমার প্রতি অটুট্ব স্নেহ; যদিও সে তখন তা বুঝতে পারেনি।
পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর তারা আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু ফাহিমাকে সে ভোলেনি। বিভিন্ন উপলক্ষে তারা পরস্পর মিলিত হতো এবং একে অপরের বিভিন্ন ধরনের উপহার দিত। দূর্ভাগ্যবশত দুজনের কর্মক্ষেত্রে পরিবর্তনের কারণে ফাহিমার সাথে ইমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবে ইমার অন্তর সব সময় ফাহিমার সাড়া চেয়েছিল। কাজের চাপের মাঝে সেও আরেকরকম মারাত্মক অসহায় হয়েছে, কিন্তু কাজের সহজ সম্পর্ক। বিদায়কালে সেও কেবল ফাহিমাকে স্মরণ করত। তারও চেয়ে সে ফাহিমার সাড়া হাজারো বার উঠত। সে বিরক্ত হতো। সেও কথা বলতে পারত না।
সুস্থ হওয়া অনেক দিন পর ইমা প্রতিদিনের মতো লোকাল লাইব্রেতোয় যায় এবং ইসলামের ওপর লেখা বই খুঁজতে শুরু করে। হঠাৎ সে একটি কুরআনের অনুবাদ পেল। তাৎক্ষণিকভাবে তার মনে পড়ল ফাহিমা প্রায়-ই এই বইটি গভীর মনোযোগ সহকারে পড়ত। ফাহিমা একসময় তাকে বলেছিল, কুরআন অন্তরের সকল রোগের প্রতিষেধক এবং এতে মানবজাতির সকল সমস্যার সমাধান রয়েছে। ইমা অনুবাদটি বাসায় নিয়ে যায় এবং এক মাসের মধ্যে পুরোটা পড়ে ফেলে। পরের মাসে সে এক স্থানীয় মসজিদে যায় এবং ইসলাম গ্রহণ করে।
📄 জীবনচক্র
কিশোররা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর নিজেদের দায়িত্ব নিজেয় থাকে। এই সময় তাদের উচিতও দায়িত্ব মেনে চলতে হবে। পিতা-মাতা যথায়থাভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। এমনটা মনে করা উচিতও নয়। উৎপদের কখনোই পূর্বসুরিদের অপরাধ দেওয়া পছন্দও সময় ব্যয় করা ঠিক নয়। কারণ, ইসলামে সন্তানদের পিতা-মাতা প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে বলে এবং বৃদ্ধ বয়সে যত্ন সহকারে তাদের সেবা করার নির্দেশ দেয়।
মুসলিমরা এক মুহূর্তের জন্যও আত্মতুষ্টিতে ভোগে না। তাই শেষ নিশ্বাস ত্যাগের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া উচিতও।
মুসলিমদের কাছে সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রত্যেকটা মুহূর্তও আমাদের অর্থপূর্ণ কাজে ব্যয় করা উচিতও। কিছু মুহূর্তও আমাদের সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য নিয়ে
গভীর চিন্তা করে, কিছু মুহূর্ত আল্লাহর স্মরণে কাটিয়ে, কিছু মুহূর্ত জীবন পরিচালনার ন্যায় নির্বাহের জন্য উপার্জনের পেছনে এবং কিছু মুহূর্ত পরিবার ও চারপাশের মানুষদের সঙ্গ দেওয়ার পেছনে ব্যয় করা উচিত। আমরা তাৎক্ষণিক কিংবা প্রকাশ্য ফলাফল না-ও পেতে পারি; কিন্তু আমরা জানি, আমাদের কার্যক্রম ‘সম্মানিত লেখকবৃন্দ’ (আসমানী লেখার কাজে নিয়োজিত ফেরেশতাগণ) নিয়ামত লিপিবদ্ধ করছে। রাসূল ﷺ বলেন—
‘ওহ্ বাকি বার্থ, যার আজকের দিনটি গতকালের চেয়ে উত্তম হয়নি।’ সুনান আদ-দায়লামি
📄 প্যারেন্টিং কি সফল হয়েছে
যখন দেখা যাবে, সন্তানরা নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী একজন দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হয়ে বেড়ে উঠেছে, তখন বুঝতে হবে—সন্তান লালন-পালনের প্রচেষ্টা সফল হয়েছে। মুসলিম যুবকদের শুধু পরিবার ও সমাজের প্রতিই দায়িত্ব নেই; বরং বৃহৎ মুসলিম উম্মাহ এবং পুরো মানবজাতির প্রতিও তাদের দায়িত্ব রয়েছে। যে সকল পিতা-মাতা সন্তানদের শিক্ষিত করতে এবং মানবতার কল্যাণ সাধনের জন্য তাদের লক্ষ্য স্থির থাকেন, তারাই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করেন।
আধুনিক সময়ে তরুণ সমাজে আত্মসম্মানবোধ এবং প্রকৃত মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে পথ দেখানো খুবই চ্যালেঞ্জিং একটি ব্যাপার। বর্তমান উদাসীনতাপূর্ণ, ধর্মের প্রতি বিরূপ মনোভাবাপন্ন এবং আত্মতৃপ্তিরও অহংবোধে পরিপূর্ণ বিশ্বে সমাজের মৌলিক কল্যাণার্থে সামগ্রিক প্রচেষ্টার অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু ইসলামের সরলতা উম্মাহর একেক মন্ত্রে নিহিত। কুরআনে আমাদের একতাবদ্ধ হয়ে থাকার এবং অন্য মানুষের সহযোগিতা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন—
‘তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রজ্জুকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরো এবং দলদলি করো না।’ সুরা আলে ইমরান : ১০৩
পিতা-মাতার উচিতও সন্তানদের মাঝে সমাজের জন্য কাজ করার আগ্রহ ও অনুভূতিও তৈরি করা। আমার যখন স্বতপ্রণোদিত হয়ে এই সকল কাজে অংশগ্রহণ করি, তখন আমাদের সন্তানরা স্বাভাবিকভাবে এগুলোতেও অত্যন্ত অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
বর্তমান সংখ্যার বিচারে মুসলিম উম্মাহ অনেক বড়ো, কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাদের প্রভাব কতটুকু? বিশ্বকে ইসলামের ছাঁচে ঢালা সাজারনের দূরসাহসী প্রচেষ্টা শুরু করার সময় কয়জন মুসলিম ছিল? সংখ্যায় যদিও গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ইসলামি শক্তি তার অনুসারীদের যোগ্যতার দ্বারাই বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো—উম্মাহকে আবার পৃথিবীর বুকে শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে কাজ করা। বর্তমান সময়ে জন্য এমন কিছু মুসলিম প্রয়োজন, যারা স্বেচ্ছায় আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে, যাদের মধ্যে ইসলামের আদলে মানবতাপূর্ণ সমাজ পুনর্প্রতিষ্ঠার প্রেরণা রয়েছে। এমন একটি সমাজ—যেটি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সহিষ্ণুতা, সমতা ও ন্যায়বিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক কারণে এবং মুসলিমদের অতি ক্ষুদ্র একটা অংশের অনৈসলামিক কার্যকলাপের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে এটি সত্য, শত বছরের স্থবিরতা ও অনেকাংশ কাটিয়ে উঠে বর্তমানে মুসলিম উম্মাহ নিজেদের উন্নতির জন্য অনেক দৃঢ়মান প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মুসলিমেরা দীর্ঘদিন ধরে আত্ম-অনুসন্ধানে লিপ্ত এবং বর্তমানে তাদের মাঝে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক ইতিবাচক উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
অপরদিকে, বিগত উন্নতি এবং বিশাল প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সত্ত্বেও আধুনিক বিশ্ব বিশাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৈন্যদশা পার করছে, যার ফলাফল সামাজিক দিক দিয়ে খুবই ভয়াবহ। ক্ষমতার ভারসাম্য ধীরে ধীরে পশ্চিমাদেশের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কেউ-ই জানে না পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বিশ্বব্যবস্থা কীরকম হবে। বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সমাজে মারাত্মক আকারে বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। পৃথিবীর অনেক জায়গায় মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নাগরিক স্বাধীনতা হরণ অতি উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক অস্থিরতাও ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি আমাদের সকলের জন্য পরীক্ষার সময়। সচেতন তরুণ মুসলিমদের উচিত অগ্রাহের সাথে এটি পর্যবেক্ষণ এবং অসহিষ্ণুতা ঘৃণাযুক্ত বিশ্ব প্রতিষ্ঠায় সমাজের অন্যান্য তরুণদের সাথে কাজ করা।