📄 বিশ্ববিদ্যালয়; জ্ঞান অর্জনের রাজতোরন
শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বর্তমান চ্যালেঞ্জিং বিশ্বের সামনে সীমাহীন জ্ঞানের দ্বার খুলে দেয়। মুসলিম যুবকদের যদি সামর্থ্য থাকে এবং উন্নয়নের জন্য কিছু করার ইচ্ছা থাকে, তাহলে উচ্চ চ্যালেঞ্জ গ্রাহ্য তাদের উৎসাহী হওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি অনন্য জায়গা, যার লোকচারণগুলো মুক্ত পরিবেশে উন্মুক্ত জ্ঞান বিতরণ করে। সেখানে সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয়সহ বিভিন্ন ধরনের সংস্থা রয়েছে। মুসলিম ছাত্রদের উচিতও এই সমস্ত সংগঠনের পাশাপাশি ছাত্রদের কার্যক্রমও অংশগ্রহণ করা, যাতে সমাজের কল্যাণার্থে তারা নিজেদের যোগ্যতার বিকাশ সাধন করতে পারে। মুসলিম যুবকদের জন্য ইসলামিক, সামাজিক ও একাডেমিক কার্যক্রমের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি—যাতে তারা সমাজের বৃহৎ কল্যাণের জন্য নিজেদের তৈরি করতে পারে।
উচ্চশিক্ষা পাবলিক রিলেশন, মিডিয়া রিলেশন, গবেষণা ও উন্নয়ন, পাবলিক আউরিচ, গভর্নমেন্ট রিলেশনসহ নাগরিক ও মৌলিক অধিকার অর্জনসহপ্রতীয় বিষয়গুলোতে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ প্রদান করে। এটি তরুণ-তরুণীদের শরীরবিদ্যা ও জীববিজ্ঞান সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জনেও সুবিধা প্রদান করে, যা আধুনিক সমাজের অন্যতম ভিত্তি। মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার হিসেবে মুসলিম শিক্ষার্থীদের এ সমস্ত বাস্তবধর্মী জ্ঞান আহরণ করা জরুরি, যার মাধ্যমে তারা সমাজের সবার কল্যাণের পথ রচনা করতে পারে।
দূর্ভাগ্যবশত বর্তমান সময় ইসলাম সম্পর্কে সারা বিশ্বে অজ্ঞতার পরিবেশ বিরাজ করছে। অনেক মুসলিম শিক্ষার্থী নিজের মুসলিম পরিচয়কেও গোপন রাখতে চায়। মূলত বর্তমান সময়ে ইসলাম সম্পর্কে মিডিয়ার ক্রমবর্ধমান নেতিবাচক প্রচারণা, একই সঙ্গে তাদের জ্ঞান ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি থেকেই এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তরুণ মুসলিমরা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের পরিচয়ের কারণে গর্ববোধ করবে। ইসলাম হচ্ছে দুনিয়ার জন্য এক উপহার; ইষ্টতত্ত্ববোধ কিংবা আত্ম-অহংকারের বিষয় নয়। এটি রাসূল কারিম ﷺ কর্তৃক প্রদর্শিত পূর্ণাঙ্গ স্বীয় জীবন পদ্ধতি। পবিত্র কুরআন মানুষের ভেজাল মেশানো থেকে মুক্ত রয়েছে। মুসলিমরা এর ভিত্তি করে এমন উজ্জ্বল ও মানবিক সভ্যতা গড়ে তুলেছিল, যেখানে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের মানুষ সহাবস্থান বছর ধরে মিলেমিশে বসবাস করে এসেছে। মুসলিম সভ্যতা তখনকার শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের আবাসভূমি ছিল। মুসলিম বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছিলেন জ্ঞানের পরীক্ষা নিস্তৃত করার উপায় ও উপকরণ। এই উপকরণের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় রেনেসাঁ সংঘটিত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে নতুন নতুন আবিষ্কার, সৃষ্টিশীলতা ও মৌলিক জ্ঞান অর্জনের জায়গা। রাষ্ট্রের কল্যাণার্থে তারা দক্ষ জনবল, চমৎকার চিন্তা এবং বাস্তব কর্মপন্থা সরবরাহ করে।
📄 দাওয়াজি কাজের সুযোগ
দাওয়াতি কাজ হলো মানুষকে আল্লাহর বিশ্বাসের দিকে ডাকা। মুসলিম যুবকদের আত্ম-অহংকারের ডুবে না থেকে আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান ও হিদায়াতের ব্যাপারে গর্ববোধ করা উচিত। মুসলিম তরুণরা সমাজের সকলের সাথে মধুর সম্পর্ক রেখে ভালো কাজে উৎসাহ এবং খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখার প্রচেষ্টা চালাতে পারে। সুশীল চিন্তার দ্বারা নিজেদের এবং অন্য মানুষের সহযোগিতা করতে পারে। একজন মুসলিম যা করে, যা বলে, যা পরে, যা খায় এবং যেভাবে সময় কাটায়—সবকিছুতেই ইতিবাচক বার্তা থাকতে হবে। আমাদের কথা বলা, পোশাক-পরিচ্ছদ, দাওয়া ও হিজাবসহ আমাদের পরিচয় বহন করে। এমনকী আমাদের চেহারা, নখ্র চরিত্র, ভালো আচরণ, কঠেরির পরিশ্রম—সবকিছুই আমাদের মুসলিম পরিচয়ে চিহ্নিত বহন করে। আমরা প্রাত্যহিক জীবনে যা-ই করি, তার সবগুলোই ইসলামের সাক্ষ্য বহন করে। আমাদের কর্মকাণ্ড একজন মানুষকে হয় ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করে, নয়তো ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
ইসলাম কাজের ক্ষেত্রে সততা ও চারিত্রিক মাধুর্যতার কথা বলে। আমরা সামাজিক হওয়ার জন্য মদের বার কিংবা মদের দোকানে কেন যাই না—তা তাদের কাছে আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে হবে। আবার যারা এগুলো করে, তাদের বিরুদ্ধি দেখানোরও প্রয়োজন নেই। মানুষে মানুষে পার্থক্য থাকবে, পছন্দ ও আকাঙ্ক্ষায় ভিন্নতা থাকবে—এটা স্বাভাবিক। আমরা সঠিক সময়ে সালাত আদায় করব। আমাদের উচিতও কারও গিবত হয় করা কিংবা দোষ ধরা থেকে বিরত থাকা। আমাদের কর্তব্য হচ্ছে ওয়াদা রক্ষা এবং কোথায় হেরফের না করা। এগুলোর অনুসরণ মুসলিম সহকর্মীদের সাহস ও উৎসাহ জোগায়। এই সকল অভ্যাস অন্য মানুষের মনে ইসলামের ব্যাপারে কৌতূহল ও আগ্রহ সৃষ্টি করে। ইসলামে দীক্ষিত অনেকেই বলেছেন, তারা মুসলিমদের নম্রতা ও স্বাভাবিক জীবনযাপন দেখেই ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন।
📄 ইসলাম ও খিদমাহ
একবার ইমা (ছদ্মনাম) নামে এক ধর্মাত্ত্বব মুসলিম ও তার ইসলাম গ্রহণের কাহিনি বর্ণনা করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে সে ফাহিমা (ছদ্মনাম) নামের এক মুসলিম মেয়ের সাথে ফ্ল্যাট শেয়ার করে থাকত। ফাহিমা একজন প্র্যাকটিসিং মুসলিম ছিল এবং আচার-আচরণে খুব সামাজিক ও ভদ্র ছিল। একটা সময় ইমা ও ফাহিমা খুব ভালো বন্ধু বনে গেল। তারা ধর্মসহ অন্যান্য অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করত, কিন্তু কখনো ব্যক্তিগত বিষয়ে সীমা অতিক্রম করত না এবং একে অপরের ব্যক্তিগত স্পর্শকাতর বিষয়ে হস্তক্ষেপ করত না। এক্ষেত্রে ফাহিমা বেশি সতর্কতা অবলম্বন করত। ভোরবেলায় উঠে ফাহিমার সালাত আদায় ইমাকে হালকা বিরক্ত করত। কিন্তু ইমা ধীরে ধীরে এতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। ফাহিমা ইমার কাছে অসুবিধা সৃষ্টির জন্য ক্ষমা চেয়ে নিত। সময়ের সাথে সাথে ফাহিমার নম্রতা ও আন্তরিকতা ইমার কাছে আরও কাছে নিয়ে আসে।
একসময় ইমা অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং অনেক দিন ধরে বিছানায় পড়ে থাকে। পরিবারের থেকে দূরে থাকার কারণে ইমা অনেক অসহায় অনুভব করে থাকে। এই সময় ফাহিমা তার মূল বিদমাহ চরিত্রানুগ আত্মপ্রকাশ ঘটিয়ে ইমার সেবায় আত্মনিয়োগ এবং নার্সের ভূমিকা পালন করে। ইমা অনুভব করে, ফাহিমা শুধু তাকে সাহায্য করার চেষ্টাই করছে না; বরং প্রচণ্ড ভালোও বাসছে। ইমা ফাহিমার সেবা দেখে অভিভূত হয়। কৃতজ্ঞতায় তার মন ভরে ওঠে। এটাই ফাহিমার প্রতি অটুট্ব স্নেহ; যদিও সে তখন তা বুঝতে পারেনি।
পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর তারা আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু ফাহিমাকে সে ভোলেনি। বিভিন্ন উপলক্ষে তারা পরস্পর মিলিত হতো এবং একে অপরের বিভিন্ন ধরনের উপহার দিত। দূর্ভাগ্যবশত দুজনের কর্মক্ষেত্রে পরিবর্তনের কারণে ফাহিমার সাথে ইমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবে ইমার অন্তর সব সময় ফাহিমার সাড়া চেয়েছিল। কাজের চাপের মাঝে সেও আরেকরকম মারাত্মক অসহায় হয়েছে, কিন্তু কাজের সহজ সম্পর্ক। বিদায়কালে সেও কেবল ফাহিমাকে স্মরণ করত। তারও চেয়ে সে ফাহিমার সাড়া হাজারো বার উঠত। সে বিরক্ত হতো। সেও কথা বলতে পারত না।
সুস্থ হওয়া অনেক দিন পর ইমা প্রতিদিনের মতো লোকাল লাইব্রেতোয় যায় এবং ইসলামের ওপর লেখা বই খুঁজতে শুরু করে। হঠাৎ সে একটি কুরআনের অনুবাদ পেল। তাৎক্ষণিকভাবে তার মনে পড়ল ফাহিমা প্রায়-ই এই বইটি গভীর মনোযোগ সহকারে পড়ত। ফাহিমা একসময় তাকে বলেছিল, কুরআন অন্তরের সকল রোগের প্রতিষেধক এবং এতে মানবজাতির সকল সমস্যার সমাধান রয়েছে। ইমা অনুবাদটি বাসায় নিয়ে যায় এবং এক মাসের মধ্যে পুরোটা পড়ে ফেলে। পরের মাসে সে এক স্থানীয় মসজিদে যায় এবং ইসলাম গ্রহণ করে।
📄 জীবনচক্র
কিশোররা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর নিজেদের দায়িত্ব নিজেয় থাকে। এই সময় তাদের উচিতও দায়িত্ব মেনে চলতে হবে। পিতা-মাতা যথায়থাভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। এমনটা মনে করা উচিতও নয়। উৎপদের কখনোই পূর্বসুরিদের অপরাধ দেওয়া পছন্দও সময় ব্যয় করা ঠিক নয়। কারণ, ইসলামে সন্তানদের পিতা-মাতা প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে বলে এবং বৃদ্ধ বয়সে যত্ন সহকারে তাদের সেবা করার নির্দেশ দেয়।
মুসলিমরা এক মুহূর্তের জন্যও আত্মতুষ্টিতে ভোগে না। তাই শেষ নিশ্বাস ত্যাগের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া উচিতও।
মুসলিমদের কাছে সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রত্যেকটা মুহূর্তও আমাদের অর্থপূর্ণ কাজে ব্যয় করা উচিতও। কিছু মুহূর্তও আমাদের সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য নিয়ে
গভীর চিন্তা করে, কিছু মুহূর্ত আল্লাহর স্মরণে কাটিয়ে, কিছু মুহূর্ত জীবন পরিচালনার ন্যায় নির্বাহের জন্য উপার্জনের পেছনে এবং কিছু মুহূর্ত পরিবার ও চারপাশের মানুষদের সঙ্গ দেওয়ার পেছনে ব্যয় করা উচিত। আমরা তাৎক্ষণিক কিংবা প্রকাশ্য ফলাফল না-ও পেতে পারি; কিন্তু আমরা জানি, আমাদের কার্যক্রম ‘সম্মানিত লেখকবৃন্দ’ (আসমানী লেখার কাজে নিয়োজিত ফেরেশতাগণ) নিয়ামত লিপিবদ্ধ করছে। রাসূল ﷺ বলেন—
‘ওহ্ বাকি বার্থ, যার আজকের দিনটি গতকালের চেয়ে উত্তম হয়নি।’ সুনান আদ-দায়লামি