📘 মুসলিম প্যারেন্টিং > 📄 আত্মপরিচয়

📄 আত্মপরিচয়


মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ওঠার পর কিশোরদের জানার আগ্রহের মাত্রা বাড়তে থাকে। ফলে তারা আত্মপরিচয় সম্পর্কে সচেতন হতে শুরু করে। শারীরিক ও মানসিকভাবে পরিপক্ক হওয়ার সাথে সাথে তারা ধীরে ধীরে জানতে শুরু করে নিজেদের উৎস, পরিবার ও সমাজের মূল ভিত্তি সম্পর্কে। তারা কীভাবে পালিত হচ্ছে, এর ওপর নির্ভর করে তারা কীভাবে বিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করছে। এই সময় কিশোরকালের প্রশ্নগুলো ধীরে ধীরে মুছে যেতে থেকে এবং তারা শিখতে থাকে—কীভাবে বাস্তব জীবনের বিভিন্ন বিষয় যথা ধর্মীয়, জাতিগত ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতা মোকাবিলা করতে হয়। কীভাবে ভিন্ন সমাজ ও সংস্কৃতির বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক গড়তে ইত্যাদি।
পিতা-মাতার দায়িত্ব হলো—সন্তানদের স্বার্থবাদী ও সংকীর্ণ মানসিকতাপূর্ণ হওয়া থেকে বিরত রাখা। কারণ, মুসলিম সমাজে উদ্দেশ্যে হলো পরস্পরের সাময়িক কল্যাণ সাধন। মুসলিমরা সবাই এক দেহের মতো। এখানে ব্যক্তিবাদের
কোনো স্থান নেই। সুতরাং সন্তানদের প্রকৃতিগতভাবে সামাজিক, আতিথিপরায়ণ, সহিষ্ণুতাপূর্ণ এবং খোলা মনের অধিকারী হতে হবে। ইসলামের সারমর্মই হচ্ছে মানবতার সেবা করা। অন্যের সেবা না করা কিংবা অপরের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা ইসলামি চেতনার বিরোধী।
মানুষের বহুমুখী পরিচয় রয়েছে। প্রত্যেকটি পরিচয়ই মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয়, জাতিগত, ভূখণ্ডগত ও অন্যান্য পরিচয় একজন মানুষের সার্বিক চিত্র তুলে ধরে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমান আধুনিক সমাজে কট্টরপন্থী সেক্যুলাররা ইসলামি পরিচয়ে নেতিবাচকভাবে দেখে। যখন জানতে পারে—কোনো তরুণ ব্যক্তিগত জীবনে ইসলাম অনুসরণ করে চলে, তখন তার সাথে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ শুরু করে। অনেক মানুষের মাঝেই ইসলামের ব্যাপারে ভুল ধারণা রয়েছে। মুসলিম কিশোররা স্কুল, মিডিয়া এবং প্রাত্যহিক জীবনে অনেক নেতিবাচক ধারণার সম্মুখীন হয়। ফলে তাদের অনেকেই নিজেদের দুর্বল মনে করে। তাদের কেউ কেউ নিজেদের মুসলিম পরিচয় দিতেও ইতস্তত বোধ করে! এই সামাজিক ব্যাধি অনেক মুসলিম তরুণকে হেয় প্রতিপন্ন করে। অনেকে (যদিও তাদের সংখ্যা খুবই কম) নিজেকে গ্রহণযোগ্যে করে তুলতে নিজের নাম পরিবর্তন করে ফেলে কিংবা নিজের শিক্ষক ও বন্ধু-বান্ধব কর্তৃক প্রদত্ত ভিন্ন নাম গ্রহণ করে। এটি খুব সহজেই তাদের আত্মসম্মান নষ্ট করে দেয়।
সন্তানরা ভালো আছে কি না কিংবা তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের উন্নতি হচ্ছে কি না—এই ব্যাপারে মুসলিম পিতা-মাতাকে নজর রাখতে হবে। ইসলাম ও মুসলিমবিরোধীদের মনোগত বিষয় মুসলিম কিশোরদের জীবন-হতাশা ও পরাজিত মনোভাবের দ্বারা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হতে পারে। মাতা-পিতার উচিত সন্তানদের প্রতি অধিক যত্নবান হওয়া, তাদের সময় দেওয়া এবং তাদের কষ্টের ভাগীদার হওয়া, যাতে তারা ‘প্রশান্ত আত্মা’ নিয়ে বেড়ে ওঠে।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে সন্তানদের শিক্ষা দিতে হবে। এই শিক্ষার মাধ্যমে তারা নিজেদের বহুমুখী পরিচয়ের ব্যাপারে পরিশোধ করবে। তাদের বোঝাতে হবে, মুসলিম হওয়া মানে এই নয়—নিজের জাতিগত পরিচয়ে ঢেকে রাখতে হবে; বরং জাতিগত পরিচয় একজন মানুষের মূল্যবান সম্পদ, এটি মানুষের বৈচিত্র্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্যকে প্রকাশ করে। সুতরাং নিজের বহুমুখী পরিচয়ে উপস্থাপন করা উচিত। এগুলো সমাজকে সফল দিক দিতে সক্ষম করে। মানব-মর্যাদা এবং সকলের সামাজিক সমতা বিধানের ক্ষেত্রে এই ধরনের বিষয় ব্যাপক ভূমিকা পালন করে।
সন্তানদের নিজেদের ‘মুসলমানিত্বের’ ব্যাপারে সচেতন করে গড়ে তুলতে হবে। তাদের জানাতে হবে, ইসলাম মানুষের মৌলিক অধিকার অর্জনের জন্য সামাজিক ও নাগরিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মানুষের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করার কথা বলে।

📘 মুসলিম প্যারেন্টিং > 📄 আনন্দ-উল্লাসের কৃষ্ণা বহর

📄 আনন্দ-উল্লাসের কৃষ্ণা বহর


বর্তমান সময়ে আনন্দ-বিনোদনের জগতের ইণ্ডাস্ট্রিগুলো খুব সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী, তারা অনেক কর্মী নিয়োগ দিয়ে থাকে। হলিউড, ডিজনি এবং অন্যান্য ইণ্ডাস্ট্রিগুলো তাদের বিশাল সাম্রাজ্যের দ্বারা ছেলেমেয়েদের কল্পরাজ্যের এবং অবসর সময়কে দখল করে নিয়েছে। বাচ্চারা বিনোদনের জন্য যখন-তখন এই সকল কোম্পানি কর্তৃক নির্মিত চলচ্চিত্রে প্রতি ঝুঁকে পড়ে। একজন খিলান ও রোমাঞ্চকর মুভিগুলো অবুঝ ও নরম মনের অধিকারী বাচ্চাদের ফাঁদে ফেলে। তারা তখন মুভিগুলোতে ড্রামা, সন্ত্রাসবাদি, খেলনা ইত্যাদি কিনতে ব্যস্ত হয়। এর মাধ্যমে কোম্পানিগুলো সন্তান ও অভিভাবকদের থেকে ব্যাপক পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয়। কিশোররা চিন্তা করে, তারা যদি পরিচিত সেলিব্রেটিদের মুভি না দেখে, তাহলে মানুষ তাদের সমস্যাগ্রস্ত ভাববে এবং স্কুলে তারা ব্যাকডেটেড সাব্যস্ত হবে।
শুধু মিডিয়া ইণ্ডাস্ট্রিগুলোই তরুণদের মন-মানসিকতাকে গ্রাস করেন; বরং প্রাচ্যের ইণ্ডাস্ট্রিগুলোও এশিয়ার সকল অঞ্চলের তরুণদের গ্রাস করেছে। বলিউড প্রতিবছর শত শত চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। তরুণ এশিয়ানদের জন্য এই আধুনিক ‘পাচাতা’ ফাঁদ এবং এশিয়ান বিনোদনের থেকে দূরে থাকা এখন খুবই কঠিন। অনেক মুসলিমের জীবনে ফিল্ম সেলেব্রিটিদের ছাপ দেখা যায়। অনেক মুসলিম তরুণ ইন্ডিয়ান ফিল্মস্টারদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে।
শুধু মিডিয়া তরুণদের সময় গ্রাস করেন; বরঞ্চ কম্পিউটার, মোবাইল, গেম, ভিডিও, টেলিভিশন ইত্যাদি যন্ত্র তাদের সময় অপচয়ের কৃষ্ণ গহ্বরে নিক্ষিপ্ত করেছে। Playstation, Gamecube এবং X Box/প্রস্টেশন, গেমিংকিউব ও সাউডবক্সগুলো আবশ্যিকভাবে দখল করে আছে, যা তাদের ফ্রি সময় কেড়ে নিচ্ছে এবং তাদের অন্তরকে ফ্যান্টাসিতে ব্যস্ত রাখছে। কম্পিউটারভিত্তিক ভার্চুয়াল বিশ্ব আজ তাদের কাছে বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। ফলে অনেক ছেলেমেয়েই বিশ্ব বাস্তবতার জটিল বিষয়াবলি অনুধাবন করতে পারে না; এমনকী তাদের এই ভার্চুয়াল রিয়েলিটির জগতের কাছে জীবন-মৃত্যুর মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বহীন
হয়ে পড়েছে। এর ফলাফল কী? গবেষণায় দেখা গেছে—টেলিভিশন, ভিডিও ও কম্পিউটার গেম কিশোরদের আগ্রাসী ও আক্রমণাত্মক করে তোলে।
এ ছাড়াও আছে অনেক মিউজিক ইণ্ডাস্ট্রি যা অনুষঙ্গমূলক মিউজিক এবং গানের অর্থহীন বার্তা, যা আমাদের তরুণদের ব্যক্তিত্বকে পুরোপুরি নষ্ট করে দিচ্ছে। এটি সত্য, মানবজীবনে কিছু গান বা বিনোদনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, তবে সেগুলো কী ধরনের?
সঙ্গীত মানব সংস্কৃতির অন্যতম অংশ। মানবসভ্যতায় বহু আগ থেকেই এর ব্যবহার হয়ে আসছে। সঙ্গীত বা গানের মধ্যে কথা বলার, আবেগ-অনুভূতি জাগ্রত করার ক্ষমতা রয়েছে। সন্তানদের ঘুম পাড়ানোর জন্য মায়েরা গান গায়, সেনাবাহিনী ড্রামের আওয়াজের মাধ্যমে কুচকাওয়াজ করে, অন্যান্য সৃষ্টি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থে গান গেয়ে থাকে। পবিত্র কুরআনের সুমিষ্ট তিলাওয়াতও মুমিনদের মাঝে একনিষ্ঠতা, আনন্দ ও উদ্বেগে প্রশমনের অনুভূতি সৃষ্টি করে। সকল কিশোরই সুর ও ছন্দের প্রতি আকৃষ্ট। বর্তমানে অনেক ধরনের ইনস্ট্রুমেন্টবিহীন গান ও নাশিদ রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ ও তাঁর সৃষ্টির প্রতি প্রশংসা জ্ঞাপন করা যায়।
ইসলাম নীরস ও একঘেয়েমিপূর্ণ ধর্ম নয়। এতে মানব-মনকে আনন্দ দেওয়ার জন্য অনেক ধরনের বিনোদন ও উপভোগের ব্যবস্থা রয়েছে। মুসলিমদের মাঝে কখনোই বিনোদন ও আনন্দদায়ক মুহূর্তের অভাব ছিল না। রাসূল ﷺ বলেন— ‘মাঝে মাঝে নিজ অন্তরকে বিনোদিত করো। কারণ, অন্তরগুলোও ক্লান্ত হয়ে যায়।’ সুনান আদ-দায়লামি
মুসলিম পিতা-মাতা কি নেতিবাচক বিনোদন থেকে সন্তানদের দূরে রাখতে পারবে? বাস্তবিক অর্থে তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও সন্তানদের মানসিক পরিপক্বতার জন্য এটা-ওটা কিনে দিতে হয়। তাদের অনেক আবদারকে কোনোভাবেই অগ্রাহ্য করতে পারি না। কারণ, এতে তারা বন্ধুদের কাছে নিজেদের তুচ্ছ ভাবতে পারে। কিন্তু কেনার ক্ষেত্রে পিতা-মাতাকে অবশ্যই কিছু নিয়মকানুন তৈরি করতে হবে এবং সেগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে হবে। এক্ষেত্রে অনেক মুসলিম এ ছাড় দেওয়াকে আপন মনে করতে পারে, তবে ইসলামের মৌলিক নীতি হচ্ছে—যখন দুটো খারাপ বিষয় সামনে চলে আসে, তখন দুটোর মধ্যে তুলনামূলক কম খারাপ বিষয়কে গ্রহণ করতে হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00