📄 অন্যান্য চ্যালেঞ্জ
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির পাওয়ার পর সন্তান পালনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। স্কুলজীবনের শুরুতেই নতুন একটি বিষয় সামনে চলে আসে, তা হলো—তারা স্কুলের নতুন পরিবেশের সাথে কীভাবে মানিয়ে নেবে; বিশেষ করে প্রথম কয়েক মাস। কিশোররা সাধারণত খুব দ্রুত বন্ধু বানাতে এবং নতুন সিস্টেমের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে। তবে এর জন্য স্কুলের পরিবেশ সহায়ক হতে হয়। যে সকল স্কুলে বিভিন্ন সংস্কৃতি এবং নানা ব্যাকগ্রাউন্ডের কিশোররা ভর্তি হয়, সেই সকল স্কুলে নিজেদের মানিয়ে নেওয়া কিশোরদের জন্য কষ্টকর। চঞ্চল ও মিশুক স্বভাবের কিশোররা খুব সহজেই নতুন পরিবেশে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে, কিন্তু চাপা ও লাজুক স্বভাবের কিশোররা নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে সময় নেয়। যে সকল কিশোর পিতা-মাতা এবং খুব বেশি নির্ভরশীল, তাদের জন্য নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া বেশ কঠিন।
যেহেতু এক্ষেত্রে মাধ্যমিক বিদ্যালয় কিশোরদের আরও স্বনির্ভর হিসেবে দেখতে চায়, তাই এখানে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের নৈতিক ও প্রাথমিকদের মতো নিবিড় সহায়তা পায় না। এক্ষেত্রে পিতা-মাতা ও শিক্ষকদের উচিত স্কুলের পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্য তাদের যথাসাধ্য সহযোগিতা করা।
মানিয়ে নেওয়ার বিষয়টি ছাত্র ও মাধ্যমিক পর্যায়ের কিশোর-কিশোরীদের শিক্ষা ও সামাজিক বিষয়াদিসহ আরও বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়।
বিদ্যালয়ে ইসলামে অনুশীলন
প্রান্তবয়স্ক তরুণ মুসলিমদের জন্য ইসলামের নৈতিক নীতির অনুসরণ অপরিহার্য। এটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য একধরনের চ্যালেঞ্জস্বরূপ। কারণ, স্কুলেই তাদের নিয়মিত সালাত আদায় এবং রমজান মাসে রোজা পালন করতে হয়। অন্যদিকে মেয়েদের শালীন পোশাক এবং মাথায় হিজাব পরিধান করে স্কুলের নিজস্ব ড্রেসকোডের অনুসরণ করতে হয়। খেলাধুলার সময় ছেলেমেয়েদের উভয়কে নিজেদের সতরের দিকে খেয়াল রাখতে হয়।
বর্তমানে কিছু কিছু স্কুলে হিজাব পরিধানের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে শিকার হলে মুসলিম শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ জায়গা থেকে প্রধান শিক্ষককে কাজে নিজেদের মৌলিক ও ধর্মীয় অধিকার দাবি করতে হবে। এবং এতে অনেক ভুল বোঝাবুঝির নিরসন হবে। এইক্ষেত্রে ইসলামের প্রতি ছেলেমেয়েদের দৃঢ় বিশ্বাস, শিষ্টাচারপূর্ণ আচরণ এবং অন্যকে প্রভাবিত করার যোগ্যতা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের মূল মৌলিক নীতি হলো স্কুলের ক্ষেত্রে খুবই শুদ্ধ শর্ত; তবে যুক্তি প্রদানের ক্ষেত্রে রাগান্বিত হওয়া যাবে না। এটি জানানো গুরুত্বপূর্ণ যে, নফল বিষয়ের ক্ষেত্রে ইসলামে বেশ ছাড় রয়েছে। মুসলিম কিশোরদের উচিত ইসলামের ব্যাপারে আগ্রহী হওয়া এবং নিজেদের জ্ঞানের ব্যাপারে গর্ববোধ করা। এই সকল ক্ষেত্রে পিতা-মাতার উচিতও সন্তানদের যথাসাধ্য সহযোগিতা করা।
বুলিং ও নিরাপত্তা জনিত ইস্যু
স্কুলে বুলিং একটি আলোচিত এবং বড়ো বড়ো ইস্যু, যেটি সমাজে নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি করে। বুলিং হলো ইচ্ছাকৃতভাবে বারবার কাউকে উত্যক্ত অথবা আঘাত করা। নিম্নোক্ত উপায়ে বুলিং হয়ে থাকে—
● শারীরিক : আঘাত করা, লাথি মারা কিংবা মালামাল ছিনিয়ে নেওয়া।
● মৌখিক : কটূ নামে ডাকা, অপমান করা কিংবা বাজেভাবে ইঙ্গিত করা।
● পরোক্ষ : কারও নামে কদর্য গল্প ছড়িয়ে দেওয়া, সামাজিক বন্ধন থেকে কাউকে তাড়িয়ে দেওয়া কিংবা কারও সম্পর্কে জঘন্য মন্তব্য করা।
একটি কিশোর সাধারণত ছয়টি কারণে অন্যের দ্বারা বুলিংয়ের শিকার হয়। যথা—
● বর্ণ
● লিঙ্গ
● শারীরিক কাঠামো
● প্রতিবন্ধকতা
● যৌন দৃষ্টিভঙ্গি
● বয়স ও
● ধর্ম
দুঃখজনকভাবে শারীরিক ও মানসিক নিগ্রহের অন্যতম হাতিয়ার এই বুলিং অনেক স্কুলেই খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। শিক্ষার্থীদের অনেকেই বুলিং-এর শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে মাধ্যমিক স্কুলের নতুন শিক্ষার্থীরা এর শিকার বেশি হয়। ভালো মানের স্কুলগুলোতে সুষ্ঠু বুলিংবিরোধী নীতিমালা এবং তা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকে। যে সকল স্কুল বুলিংয়ের প্রতি জিরো টলারেন্স দেখায়, সেই সকল স্কুলে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্মানের অধিক উপস্থিতি দেখা যায়।
নির্যাতনকারীরা মূলত সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন, সহজ-সরল, নিরীহদের বুলিংয়ের জন্য টার্গেট করে থাকে। মুসলিম কিশোররা তাদের জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বুলিংয়ের শিকার হয়। মাথায় স্কার্ফ পরিধানকারী মুসলিম মেয়েরাও বুলিংয়ের শিকার হয়ে থাকে। পিতা-মাতার দায়িত্ব হলো সন্তানদের বুলিং মোকাবিলা করার যথাসাধ্য উপায় সন্তানদের শিক্ষা দেওয়া; তাদের বন্ধু বৃদ্ধি, অন্যের সঙ্গে মেলামেশা, ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা এবং চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার যোগ্যতা অর্জনে উৎসাহিত করা। তবে বুলিংয়ের মোকাবিলা করতে গিয়ে যাতে কোনো ধরনের অঘটন না ঘটে কিংবা বুলিংয়ের জবাবে পাল্টা বুলিংয়ের ঘটনা না ঘটে—এই ব্যাপারে লক্ষ রাখতে হবে।
স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা মানব-মনের স্বাভাবিক প্রকৃতি। কিশোররা যখন বড়ো হয় এবং মাধ্যমিক স্কুলে পদার্পণ করে, তখন তারা স্বাধীনতার স্বাদ অনুভব করতে শুরু করে। তারা স্কুল নিজেদের কাজ নিজেরা গুছিয়ে রাখে এবং অনেক ক্ষেত্রে লাঞ্চের সময় বাইরে যাওয়ার অনুমতি পায়। এবং এর স্বাধীনতায় ও সহজতা তাদের মনে সৃষ্টিশীলতা, নতুন চিন্তা, উদ্যোগ ও উৎসাহ যোগায়। অন্যদিকে মাত্রাধিক স্বাধীনতা ‘ছোট্ট কেয়ার’ মানসিকতা সৃষ্টি করে, যা পারিবারিক বন্ধনে ভাঙন সৃষ্টি এবং সামাজিক বন্ধনকে দুর্বল করে।
দায়িত্বহীনতা বিপজ্জনক।
যেকোনো সুস্থ সমাজের জন্য স্বাধীনতার সাথে দায়িত্বহীনতা জড়িত। ইসলামে আল্লাহর নিকট, নিজের ও অপরের নিকট দায়বদ্ধতা স্বাধীনতার পূর্ব শর্ত। এটিও অপরের স্বাধীনতার হস্তক্ষেপ বলে মনে হলেও তা স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তোলে এবং মানবজাতিকে বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করে। সীমাহীন স্বাধীনতা সমাজে নৈরাজ্যের সৃষ্টির কারণ।
সমাজের অনিয়ন্ত্রিত ও বিভ্রান্তিকর স্বাধীনতা স্কুলজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেক মাধ্যমিক স্কুলে শ্রেণিকক্ষে নিয়ম রক্ষা সবচেয়ে কঠিন বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক শিক্ষক ছাত্র-ছাত্রীদের আচার-আচরণের কারণে নিজেদের পেশা ছেড়ে দেয়। কিছু ছাত্র আছে যারা শিক্ষক কিংবা প্রতিষ্ঠানকে কোনো সম্মান প্রদর্শন করে না। এক্ষেত্রে সন্তানদের যাবতীয় আদব-কায়দা শেখানো পিতা-মাতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
স্কুল সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নয়। তরুণদের জীবন টিভি প্রোগ্রাম, ইন্টারনেট, ভিডিও গেম, পিতা-মাতার জীবনযাপন এবং সমাজের অন্যান্য বিষয়ের দ্বারা প্রভাবিত। তরুণরা নিজেদের জীবনে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। যেমন—
ব্যক্তিগত সমস্যা : দুর্বল আত্মসম্মানবোধ, পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া, আবেগ এবং আচার-আচরণগত সমস্যা।
পারিবারিক প্রভাব : প্যারেন্টিং-এ দুর্বলতা, অর্থনৈতিক দেনাদেনা, পারিবারিক কলহ।
স্কুলের পরিবেশ : পাঠ্যসূচি, সহপাঠীদের চাপ, অলিখিত কারিকুলাম, শিক্ষকদের নিম্নমানের প্রত্যাশা।
সামাজিক সমস্যা : বর্ণ ও সংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন, বেকারত্ব, মিডিয়া চিত্র।
সামাজিক প্রবণতা : নৈতিক অবক্ষয়, অবাধ যৌনতা ও আদর্শগত বাধা।
সমাজের প্রত্যেকের ন্যায় তরুণরাও নিজেরা স্বীকৃতি চায় ও সম্মান চায়। তারা প্রকৃত স্বাবলম্বিতা ও নিজেদেরকে বিত্ত মনে করে, তারা অস্বাভাবিক কার্যকলাপ করতে শুরু করে। নিজেদের হতাশা প্রকাশ কিংবা সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিজেদের ক্রোধ ব্যবহারের জন্য গ্যাংফাইট, মাদকের অপব্যবহারসহ এমন কোনো সমাজবিরোধী অপকর্ম নেই—যাতে তারা নিজেদের জড়ায় না। অনেক নেতিবাচক পরিবেশে নিজেদের রোলমডেল হিসেবে গ্রহণ করে, যা সমাজের বৃহৎ স্বার্থের পরিপন্থী। নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য মূল্যবোধবহির্ভূত নতুন নতুন প্রযুক্তির প্রয়োগে এবং অপব্যবহারের তরুণসমাজ আজ ধ্বংসের সম্মুখীন।
তরুণরা সব সময় বিশেষ কিছু চায়। তারা আলোচিত হতে চায়, নিজেদের স্বীকৃতি চায়। এই সমাজের যেকোনো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তারা নিজেদেরকে অগ্রভাগে দেখতে চায়। এর অন্যতম দৃষ্টান্ত হচ্ছে মোবাইল ফোনের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার। এর মাধ্যমে তারা স্কুল নিজেদের সামর্থ্যের প্রদর্শন করে বেড়ায়। বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, অন্যান্য বিষয়ের মতো মোবাইল ফোনও মর্যাদার অন্যতম চিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়—যা আধুনিক তরুণ সংস্কৃতির অন্যতম অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে বাজারের সৃষ্টি, যাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজেদের তৈরি পণ্যের বিস্তার নিশ্চিত করা। এটি আমাদের সময়ের জীবন্ত আলোচনার বিষয়।
সন্তানদের মাধ্যমিক স্কুলের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম উক্ত স্কুলের কঠোর ডিসিপ্লিন পলিসি আছে কি না তা খেয়াল রাখতে হবে। পাশাপাশি স্কুলের বাইরে ছাত্র-ছাত্রীদের আচার-আচরণ কীরকম, সে খোঁজও নিতে হবে। অ্যাকাডেমিক পারফরমেন্সের ব্যাপারেও যথাযথ নজর দিতে হবে। যেহেতু সুস্পষ্টভাবে নিয়মনীতি কার্যকর কোনো কিশোরীই কার্যকর উপায়ে শিক্ষা লাভ করতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, মুসলিম পিতা-মাতার উচিত পরিবার ও এলাকায় এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়মনীতি ও দায়িত্ব পালনের বাধ্যবাধকতা থাকবে। সে পরিবেশে কিশোররা অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলাফেলার সুযোগ পায় না। এটি শুধুমাত্র ছুটির দিন কিংবা স্কুল ছুটির পর বাড়িতে বা মসজিদে কুরআন ও সামাজিক রীতিনীতি শিক্ষাদানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। পিতা-মাতা যখন নিজ গৃহে, রাস্তাঘাটে, মসজিদে কিংবা কমিউনিটি সেন্টারে ইতিবাচক নিয়ম প্রতিষ্ঠা করবে, তখন কিশোররা প্রকৃতভাবে বেধ.
নিয়মের মধ্য থেকে চলাফেরা করবে। তখন কিশোররা প্রতিক্রিয়াশীল হওয়ার পরিবর্তে ক্রিয়াশীল, হতাশাবাদিতার পরিবর্তে আশাবাদী এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক হওয়ার পরিবর্তে সহযোাগিতাপূর্ণ মনোভাবাপন্ন হয়ে উঠবে। তারা তখন নিজ কূলে ও সুষ্ঠু পরিবেশে সুন্নিবং সর্বশ্রেষ্ঠ প্রচেষ্টা চালায়।
কিশোররা তখনই নিয়মানুবর্তী হয়, যখন তারা দেখে—তাদের পিতা-মাতা এবং সমাজের অন্যান্য সদস্যরাও নিয়মের মধ্যে চলে। তারা যথাসময়ে সালাত আদায় করে, ওয়াদা রক্ষা করে এবং অপরের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে। সন্তানদের নিকট যখন চালচলনের গ্রহণযোগ্য সীমা-পরিসীমা সম্পর্কে পরিষ্কার আলোকপাত করা হয়, পিতা-মাতা যখন নিয়ম-নীতি ভঙ্গকারী সন্তানদের নিয়মিত শাসনের মধ্যে রাখে এবং নিজেরা যখন উক্ত সীমা-পরিসীমা মানার ক্ষেত্রে সন্তানদের নিকট অনুকরণীয় হয়ে ওঠেন, ঠিক তখনই কিশোরদের মাঝে নিয়মানুবর্তিতা গড়ে ওঠে। এই ক্ষেত্রে পিতা-মাতাকে অবশ্যই সন্তানদের মাঝে সততা, সমতা, ও একনিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কিশোরদের কখনোই অপরের সামনে লজ্জায় ফেলা, হেয় করা কিংবা অপমান করা যাবে না।
মাতা-পিতাকে এটি অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে, জোর-জবরদস্তি করে কখনো কাউকে নিয়মকানুন শেখানো যায় না। জোর-জবরদস্তি ইতিবাচক মানসিকতা তৈরির পরিবর্তে নেতিবাচক ফলাফল বয়ে আনে। তরুণরা স্বাধীনচেতা হয়। তারা যেকোনো কিছুর কারণ জানতে চায়। তাই তাদের কারণ না বুঝিয়ে আদেশ-নিষেধ মানার ক্ষেত্রে অবিরামায় নিয়ন্ত্রণ করলে তা হিতে বিপরীত হয়: এমনকী তারা একপর্যায়ে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। তাই কার্যকর উপায়ে নিয়মকানুন শেখাতে হবে এবং পিতা-মাতাকে অবশ্যই সন্তানদের সাথে অহেতুক তর্ক এড়াতে হবে।
সন্তানদের স্বাভাবিক উপদেশ প্রদান করার ক্ষেত্রে আগে তাদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বুঝুন। তাদের আচার-আচরণের প্রতি স্বাভাবিক পর্যবেক্ষণ করুন। তাদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে নিচের বিষয়গুলো খেয়াল করা জরুরি—
* কিশোরদের সামনে নিজের আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণ করুন। অতিমাত্রায় স্বাধীনতাপন্থী তাদের পদস্খলন ঘটাতে পারে, আবার অতিমাত্রায় নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ তাদের বিদ্রোহী করে তুলতেও পারে। ইসলাম জীবনযাপনে মধ্যপন্থা অবলম্বনের কথা বলে। সন্তানরা যেন চরমপন্থার মধ্যে বেড়ে না ওঠে—সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
* তাদের ভুলের জন্য পাকড়াও করবেন না; শুধরানোর সুযোগ দিন। আত্মসংশোধনের প্রক্রিয়া প্রতি নিয়ত চলুক এবং এর মাঝেই তারা শিখবে। নিজের বিহ্বলতা, ক্রোধ, হতাশা ও বিষণ্নতা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য তাদের সুযোগ প্রয়োজন।
* কিশোরদের পছন্দ-অপছন্দ, আচরণ ও কার্যকলাপের ব্যাপারে মজা করা ও নেতিবাচক মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন। এটি তরুণ যুবকদের হতাশ করে।
* 'কখনো এই কাজটি করো না' এই ধরনের শব্দ থেকে পারতপক্ষে বিরত থাকুন। এর পরিবর্তে বলুন—'তুমি যদি এই কাজটি না করতে কিংবা এইভাবে না করতে, তাহলে আমি খুশি হব অথবা হতাম।'
* সন্তানদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করুন। ও ই সকল কথা ও কাজ থেকে দূরে থাকুন, যেগুলোর পুনরাবৃত্তি তাদের কষ্ট দেয়। বর্তমান সময়ে কিশোররা ব্যাপক মানসিক চাপের মধ্যে থাকে। আমাদের উচিত তাদের অবস্থা উপলব্ধি করা।
* ন্যায়পরায়ণতার সাথে তাদের নিয়মকানুন শেখান। মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্রদের নিয়মকানুন শেখানোর ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন জরুরি। কোনো ভুল করে ফেললে, শাসন করার সময় খেয়াল রাখুন—তারা যেন কোনোভাবেই ছোটো ভাই-বোনের সামনে লাঞ্ছিত না হয়। ন্যায়বিচার এর প্রতি অবশ্যই লক্ষ রাখতে হবে এবং পিতা-মাতা উভয়কেই এই ক্ষেত্রে সমান অবদান রাখতে হবে।
* বন্ধুদের সামনে নিজ সন্তানদের ভর্ৎসনা করা থেকে বিরত থাকুন। যখন কোনো সমস্যা দেখা দেয়, পিতা-মাতার উচিত পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পর আলাদাভাবে তার সমাধান করা।
* পিতা-মাতার উচিত নিজেদের মিজাজ ও নিয়মকানুন মানার ক্ষেত্রে খারাপী থেকে বিরত থাকা, যাতে সন্তানদের মাঝে কোনোটি সঠিক এবং বাকিগুলি ভুল–এ ব্যাপারে পরিষ্কার ধারণা তৈরি হয়; অন্যথায় কিশোররা এই ব্যাপারে সন্দেহের মধ্যে পড়ে যাবে এবং অনির্দিষ্টভাবে স্বাভাবিক ভাবে তর্ক করবে।
যৌনতা ও যৌনশিক্ষা
মিশ্র শিক্ষাব্যবস্থার স্কুলগুলোতে মুসলিম কিশোররা সহপাঠীদের সাথে চলাফেরার ক্ষেত্রে ব্যাপক মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক চাপের মধ্যে থাকে। যদি কোনো কিশোর সঠিক ইসলামি পরিবেশে বেড়ে না ওঠে, তাহলে সে অসংখ্য জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়। সন্তানদের বিবাহবিযুক্ত যৌনকর্ম থেকে বিরত রাখতে পিতা-মাতা ও সমাজের কর্তব্য হচ্ছে বহুধা সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা। সন্তানদের অবশ্যই যথাযথ ইসলামি জ্ঞান ও তাকওয়া অর্জন করতে হবে, যাতে তারা বিভিন্ন ধরনের প্রলোভনের সময় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তাদের জন্য বিকল্প হালাল বিনোদনের ব্যবস্থা রাখতে হবে, যেখানে তারা নিজেদের তারুণ্যের শক্তিকে ব্যবহার করতে পারে। মুসলিম তরুণদের অবশ্যই ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনা স্মরণে রাখতে হবে, যিনি তাঁর তারুণ্যের সুন্দরী রমণীদের থেকে কুপ্রস্তাব পাওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ্র প্রতি ভালোবাসা ও ভয়ের কারণে নিজের যৌন প্রবৃত্তি বাস্তবায়নের পরিবর্তে কারাগারের জীবনে বেঁচে নিয়েছিলেন।
আধুনিক সমাজে অপ্রয়োজনীয় মেয়েদের অধিক হারে প্রেগনেন্সির কারণে প্রাথমিক স্কুলগুলোতেই যৌনশিক্ষা দেওয়া হয়। মাধ্যমিক স্কুলে অ্যাডজাস্ট রিলেশনশিপের মানবিক দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। বিজ্ঞান সম্পর্কিত অংশে বয়ঃসন্ধিকালীন শারীরিক পরিবর্তন এবং সন্তান জন্মদানের সময়ের শারীরিক অবস্থার বর্ণনা দেওয়া হয়। স্কুলে সন্তানদের কোন ধরনের যৌনশিক্ষা দেওয়া হয় এবং কোন বয়সে কোন ধরনের শিক্ষা দেওয়া হয়, সেই ব্যাপারে পিতা-মাতার সজাগ থাকতে হবে। প্রয়োজনে যৌনশিক্ষা কিছু ক্লাস থেকে তাদের দূরে রাখা যেতে পারে, তবে এই ব্যাপারে অবশ্যই স্কুল কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করতে হবে।
সন্তানদের বয়ঃসন্ধিকালীন ও গর্ভকালীন কিছু মৌলিক শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানাতে হবে। পিতা-মাতাকে এই সকল বিষয়ে সন্তানদের সাথে আলোচনা করতে হবে শালীন ও সতর্কতার সাথে।
নারী-পুরুষের মধ্যে মেলামেশার ক্ষেত্রে ইসলাম শালীনতা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়। এই বিষয়গুলো তরুণদের ক্ষেত্রে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তারা অপরিণত ও বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে প্রাকৃতিগতভাবে আবেগপ্রবণ হয়ে থাকে। তরুণ ছেলেমেয়েদের একসঙ্গে মেলামেশার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মান, জীবনের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং আল্লাহ্র নিকট জবাবদিহিতার বিষয়সমূহ শেখাতে হবে।
তাদের কিশোরকালে থেকেই শালীনতার শিক্ষা দিতে হবে। প্রাপ্তবয়স্ক তরুণ-তরুণীদের শারীরিক সম্পর্ক এবং ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থেকে বিরত থাকার দীক্ষা দিতে হবে। কারণ, এগুলো পরবর্তী সময়ে তাদের শারীরিক সম্পর্কের দিকে প্ররোচিত করে।
পিতা-মাতাকে সন্তানদের সাথে এই সকল বিষয়ে অবশ্যই খোলামেলা আলোচনা করতে হবে। বিবাহিত লিঙ্গের সাথে মেলামেশার ক্ষেত্রে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গি শালীনতা ও সতর্কতার সাথে সন্তানদের জানাতে হবে। সন্তানরা স্কুল, টেলিভিশন এবং সমাজে প্রচলিত অন্যান্য উৎস থেকে নারী-পুরুষের সম্পর্কের ব্যাপারে শেখার আগেই ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি আলোকে তাদের যৌন শিক্ষা দিতে হবে। তারপরের অতি উদার পরিস্ফুর্তি সত্ত্বেও তাদের আত্মসংযম ও আধ্যাত্মিক কল্যাণ অর্জনের শিক্ষা দিতে হবে। কারণ, ভেতরের দৃঢ় তাকওয়া (আল্লাহ্র উপস্থিতি, অসংখ্য কর্ম থেকে বিরত থাকা এবং সৎকর্ম সম্পাদনের সুফল সম্পর্কে সচেতন থাকা) এই কঠিন সময়ে নিজেকে রক্ষা করার একমাত্র উপায়।
একইসাথে সমকামিতা এবং সমলিঙ্গের সাথে যৌন সম্পর্ক নিয়ে তাদের সাথে শালীন আলোচনা করতে হবে। এই ব্যাপারে ইসলামের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি তাদের জানাতে হবে।
📄 আত্মপরিচয়
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ওঠার পর কিশোরদের জানার আগ্রহের মাত্রা বাড়তে থাকে। ফলে তারা আত্মপরিচয় সম্পর্কে সচেতন হতে শুরু করে। শারীরিক ও মানসিকভাবে পরিপক্ক হওয়ার সাথে সাথে তারা ধীরে ধীরে জানতে শুরু করে নিজেদের উৎস, পরিবার ও সমাজের মূল ভিত্তি সম্পর্কে। তারা কীভাবে পালিত হচ্ছে, এর ওপর নির্ভর করে তারা কীভাবে বিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করছে। এই সময় কিশোরকালের প্রশ্নগুলো ধীরে ধীরে মুছে যেতে থেকে এবং তারা শিখতে থাকে—কীভাবে বাস্তব জীবনের বিভিন্ন বিষয় যথা ধর্মীয়, জাতিগত ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতা মোকাবিলা করতে হয়। কীভাবে ভিন্ন সমাজ ও সংস্কৃতির বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক গড়তে ইত্যাদি।
পিতা-মাতার দায়িত্ব হলো—সন্তানদের স্বার্থবাদী ও সংকীর্ণ মানসিকতাপূর্ণ হওয়া থেকে বিরত রাখা। কারণ, মুসলিম সমাজে উদ্দেশ্যে হলো পরস্পরের সাময়িক কল্যাণ সাধন। মুসলিমরা সবাই এক দেহের মতো। এখানে ব্যক্তিবাদের
কোনো স্থান নেই। সুতরাং সন্তানদের প্রকৃতিগতভাবে সামাজিক, আতিথিপরায়ণ, সহিষ্ণুতাপূর্ণ এবং খোলা মনের অধিকারী হতে হবে। ইসলামের সারমর্মই হচ্ছে মানবতার সেবা করা। অন্যের সেবা না করা কিংবা অপরের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা ইসলামি চেতনার বিরোধী।
মানুষের বহুমুখী পরিচয় রয়েছে। প্রত্যেকটি পরিচয়ই মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয়, জাতিগত, ভূখণ্ডগত ও অন্যান্য পরিচয় একজন মানুষের সার্বিক চিত্র তুলে ধরে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমান আধুনিক সমাজে কট্টরপন্থী সেক্যুলাররা ইসলামি পরিচয়ে নেতিবাচকভাবে দেখে। যখন জানতে পারে—কোনো তরুণ ব্যক্তিগত জীবনে ইসলাম অনুসরণ করে চলে, তখন তার সাথে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ শুরু করে। অনেক মানুষের মাঝেই ইসলামের ব্যাপারে ভুল ধারণা রয়েছে। মুসলিম কিশোররা স্কুল, মিডিয়া এবং প্রাত্যহিক জীবনে অনেক নেতিবাচক ধারণার সম্মুখীন হয়। ফলে তাদের অনেকেই নিজেদের দুর্বল মনে করে। তাদের কেউ কেউ নিজেদের মুসলিম পরিচয় দিতেও ইতস্তত বোধ করে! এই সামাজিক ব্যাধি অনেক মুসলিম তরুণকে হেয় প্রতিপন্ন করে। অনেকে (যদিও তাদের সংখ্যা খুবই কম) নিজেকে গ্রহণযোগ্যে করে তুলতে নিজের নাম পরিবর্তন করে ফেলে কিংবা নিজের শিক্ষক ও বন্ধু-বান্ধব কর্তৃক প্রদত্ত ভিন্ন নাম গ্রহণ করে। এটি খুব সহজেই তাদের আত্মসম্মান নষ্ট করে দেয়।
সন্তানরা ভালো আছে কি না কিংবা তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের উন্নতি হচ্ছে কি না—এই ব্যাপারে মুসলিম পিতা-মাতাকে নজর রাখতে হবে। ইসলাম ও মুসলিমবিরোধীদের মনোগত বিষয় মুসলিম কিশোরদের জীবন-হতাশা ও পরাজিত মনোভাবের দ্বারা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হতে পারে। মাতা-পিতার উচিত সন্তানদের প্রতি অধিক যত্নবান হওয়া, তাদের সময় দেওয়া এবং তাদের কষ্টের ভাগীদার হওয়া, যাতে তারা ‘প্রশান্ত আত্মা’ নিয়ে বেড়ে ওঠে।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে সন্তানদের শিক্ষা দিতে হবে। এই শিক্ষার মাধ্যমে তারা নিজেদের বহুমুখী পরিচয়ের ব্যাপারে পরিশোধ করবে। তাদের বোঝাতে হবে, মুসলিম হওয়া মানে এই নয়—নিজের জাতিগত পরিচয়ে ঢেকে রাখতে হবে; বরং জাতিগত পরিচয় একজন মানুষের মূল্যবান সম্পদ, এটি মানুষের বৈচিত্র্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্যকে প্রকাশ করে। সুতরাং নিজের বহুমুখী পরিচয়ে উপস্থাপন করা উচিত। এগুলো সমাজকে সফল দিক দিতে সক্ষম করে। মানব-মর্যাদা এবং সকলের সামাজিক সমতা বিধানের ক্ষেত্রে এই ধরনের বিষয় ব্যাপক ভূমিকা পালন করে।
সন্তানদের নিজেদের ‘মুসলমানিত্বের’ ব্যাপারে সচেতন করে গড়ে তুলতে হবে। তাদের জানাতে হবে, ইসলাম মানুষের মৌলিক অধিকার অর্জনের জন্য সামাজিক ও নাগরিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মানুষের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করার কথা বলে।
📄 আনন্দ-উল্লাসের কৃষ্ণা বহর
বর্তমান সময়ে আনন্দ-বিনোদনের জগতের ইণ্ডাস্ট্রিগুলো খুব সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী, তারা অনেক কর্মী নিয়োগ দিয়ে থাকে। হলিউড, ডিজনি এবং অন্যান্য ইণ্ডাস্ট্রিগুলো তাদের বিশাল সাম্রাজ্যের দ্বারা ছেলেমেয়েদের কল্পরাজ্যের এবং অবসর সময়কে দখল করে নিয়েছে। বাচ্চারা বিনোদনের জন্য যখন-তখন এই সকল কোম্পানি কর্তৃক নির্মিত চলচ্চিত্রে প্রতি ঝুঁকে পড়ে। একজন খিলান ও রোমাঞ্চকর মুভিগুলো অবুঝ ও নরম মনের অধিকারী বাচ্চাদের ফাঁদে ফেলে। তারা তখন মুভিগুলোতে ড্রামা, সন্ত্রাসবাদি, খেলনা ইত্যাদি কিনতে ব্যস্ত হয়। এর মাধ্যমে কোম্পানিগুলো সন্তান ও অভিভাবকদের থেকে ব্যাপক পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয়। কিশোররা চিন্তা করে, তারা যদি পরিচিত সেলিব্রেটিদের মুভি না দেখে, তাহলে মানুষ তাদের সমস্যাগ্রস্ত ভাববে এবং স্কুলে তারা ব্যাকডেটেড সাব্যস্ত হবে।
শুধু মিডিয়া ইণ্ডাস্ট্রিগুলোই তরুণদের মন-মানসিকতাকে গ্রাস করেন; বরং প্রাচ্যের ইণ্ডাস্ট্রিগুলোও এশিয়ার সকল অঞ্চলের তরুণদের গ্রাস করেছে। বলিউড প্রতিবছর শত শত চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। তরুণ এশিয়ানদের জন্য এই আধুনিক ‘পাচাতা’ ফাঁদ এবং এশিয়ান বিনোদনের থেকে দূরে থাকা এখন খুবই কঠিন। অনেক মুসলিমের জীবনে ফিল্ম সেলেব্রিটিদের ছাপ দেখা যায়। অনেক মুসলিম তরুণ ইন্ডিয়ান ফিল্মস্টারদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে।
শুধু মিডিয়া তরুণদের সময় গ্রাস করেন; বরঞ্চ কম্পিউটার, মোবাইল, গেম, ভিডিও, টেলিভিশন ইত্যাদি যন্ত্র তাদের সময় অপচয়ের কৃষ্ণ গহ্বরে নিক্ষিপ্ত করেছে। Playstation, Gamecube এবং X Box/প্রস্টেশন, গেমিংকিউব ও সাউডবক্সগুলো আবশ্যিকভাবে দখল করে আছে, যা তাদের ফ্রি সময় কেড়ে নিচ্ছে এবং তাদের অন্তরকে ফ্যান্টাসিতে ব্যস্ত রাখছে। কম্পিউটারভিত্তিক ভার্চুয়াল বিশ্ব আজ তাদের কাছে বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। ফলে অনেক ছেলেমেয়েই বিশ্ব বাস্তবতার জটিল বিষয়াবলি অনুধাবন করতে পারে না; এমনকী তাদের এই ভার্চুয়াল রিয়েলিটির জগতের কাছে জীবন-মৃত্যুর মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বহীন
হয়ে পড়েছে। এর ফলাফল কী? গবেষণায় দেখা গেছে—টেলিভিশন, ভিডিও ও কম্পিউটার গেম কিশোরদের আগ্রাসী ও আক্রমণাত্মক করে তোলে।
এ ছাড়াও আছে অনেক মিউজিক ইণ্ডাস্ট্রি যা অনুষঙ্গমূলক মিউজিক এবং গানের অর্থহীন বার্তা, যা আমাদের তরুণদের ব্যক্তিত্বকে পুরোপুরি নষ্ট করে দিচ্ছে। এটি সত্য, মানবজীবনে কিছু গান বা বিনোদনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, তবে সেগুলো কী ধরনের?
সঙ্গীত মানব সংস্কৃতির অন্যতম অংশ। মানবসভ্যতায় বহু আগ থেকেই এর ব্যবহার হয়ে আসছে। সঙ্গীত বা গানের মধ্যে কথা বলার, আবেগ-অনুভূতি জাগ্রত করার ক্ষমতা রয়েছে। সন্তানদের ঘুম পাড়ানোর জন্য মায়েরা গান গায়, সেনাবাহিনী ড্রামের আওয়াজের মাধ্যমে কুচকাওয়াজ করে, অন্যান্য সৃষ্টি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থে গান গেয়ে থাকে। পবিত্র কুরআনের সুমিষ্ট তিলাওয়াতও মুমিনদের মাঝে একনিষ্ঠতা, আনন্দ ও উদ্বেগে প্রশমনের অনুভূতি সৃষ্টি করে। সকল কিশোরই সুর ও ছন্দের প্রতি আকৃষ্ট। বর্তমানে অনেক ধরনের ইনস্ট্রুমেন্টবিহীন গান ও নাশিদ রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ ও তাঁর সৃষ্টির প্রতি প্রশংসা জ্ঞাপন করা যায়।
ইসলাম নীরস ও একঘেয়েমিপূর্ণ ধর্ম নয়। এতে মানব-মনকে আনন্দ দেওয়ার জন্য অনেক ধরনের বিনোদন ও উপভোগের ব্যবস্থা রয়েছে। মুসলিমদের মাঝে কখনোই বিনোদন ও আনন্দদায়ক মুহূর্তের অভাব ছিল না। রাসূল ﷺ বলেন— ‘মাঝে মাঝে নিজ অন্তরকে বিনোদিত করো। কারণ, অন্তরগুলোও ক্লান্ত হয়ে যায়।’ সুনান আদ-দায়লামি
মুসলিম পিতা-মাতা কি নেতিবাচক বিনোদন থেকে সন্তানদের দূরে রাখতে পারবে? বাস্তবিক অর্থে তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও সন্তানদের মানসিক পরিপক্বতার জন্য এটা-ওটা কিনে দিতে হয়। তাদের অনেক আবদারকে কোনোভাবেই অগ্রাহ্য করতে পারি না। কারণ, এতে তারা বন্ধুদের কাছে নিজেদের তুচ্ছ ভাবতে পারে। কিন্তু কেনার ক্ষেত্রে পিতা-মাতাকে অবশ্যই কিছু নিয়মকানুন তৈরি করতে হবে এবং সেগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে হবে। এক্ষেত্রে অনেক মুসলিম এ ছাড় দেওয়াকে আপন মনে করতে পারে, তবে ইসলামের মৌলিক নীতি হচ্ছে—যখন দুটো খারাপ বিষয় সামনে চলে আসে, তখন দুটোর মধ্যে তুলনামূলক কম খারাপ বিষয়কে গ্রহণ করতে হবে।