📄 পরিবারই কিশোরদের ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তি
পিতা-মাতার উচিতও সন্তানের পেছনে সঠিক সময় ব্যয় এবং তার সুস্থ মনন গঠনে সহায়তা করা। এই ক্ষেত্রে পিতা-মাতাকে অনুকরণীয় চরিত্রের অধিকারী হতে হবে, যাতে কিশোরা সেলিব্রেটিদের পরিবর্তে নিজ পরিবারেই অনুসরণীয় আদর্শ খুঁজে পায়।
এর পাশাপাশি সন্তানদের বিশেষ প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলির প্রতিও পিতা-মাতার খেয়াল রাখতে হবে। সন্তানদের সমস্যা একেকজনের ক্ষেত্রে একক ধরনের হতে পারে। এই সকল সমস্যার নির্দিষ্ট ও একক কোনো সমাধান নেই। তাই অভিভাবকদের সুশীল ও অশীল চিন্তা অধিকারী হতে হবে, যাতে তারা সন্তানদের যাবতীয় সমস্যা সমাধান করতে এবং চারপাশের বিভ্রান্তির পরিস্থিতি থেকে ফিরিয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারেন।
পরিবার এমন একটি স্থান, যেখানে কিশোরদের নির্ভুলভাবে ভালোবাসা হয়, তাদের মতামত গ্রহণ করা হয় এবং নিরাপত্তা বিধান করা হয়। পারিবারিক পরিবেশ কিশোরাদের আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ করে তোলে। এর মাধ্যমে তারা বহির্বিশ্বে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে। এগুলোতে তখনই সম্ভব, যখন পিতা-মাতা দৃঢ় মানসিকতা ও ইসলামি ওলামা-মাসায়িহ হন এবং নিজেদের আচার-আচরণে কঠোরতা পরিহার করে ভালোবাসাসহ পরিপূর্ণ সহমর্মিতা প্রদর্শন করেন। কিশোরা চারদিক থেকে যখন নানামুখী কথাবার্তা শুনতে পায়, তখনও যেন পরিবারের লক্ষ্য ঠিক থাকে। যে সকল পিতা-মাতা সন্তানদের ইসলাম শিক্ষা দিতে চায়; কিন্তু নিজেদের জীবনে ইসলামের অনুশাসন মেনে চলে না কিংবা ইসলামের ওপর সামাজিক রীতির প্রাধান্য দেন, তাদের এই আচরণ সন্তানদের বিভ্রান্ত করে। এর মানে এই নয়, সামাজিক রীতি সব ক্ষেত্রেই পরিত্যাজ্য; বরং এটি সমাজের মানুষের আত্মপরিচয়ের অংশ। এগুলোতে মানুষের বিভিন্ন আচার-আচরণকে প্রভাবিত করে, তবে সকল সামাজিক রীতি অন্ধভাবে অনুসরণ করা যাবে না; অন্তত যেগুলোতে ধর্মীয় শিক্ষার বিরুদ্ধে যায়।
বয়ঃসন্ধিকাল সন্তানদের জীবনের আলাদা কোনো অংশ নয়। এই সময়টায় তারা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। তাদের আচার-আচরণে অনেক পরিবর্তন আসে। মেজাজ রুক্ষ হয়। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়। ফলে তাদের সঠিক গাইড করা সম্ভব না হলে বিপথে যাওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা থাকে এবং এর প্রভাব তার জীবনের পুরোটা সময়জুড়ে থাকে। তাই পিতার উচিতও
সেই সময়ে তাদের যোগ্য সঙ্গ দেওয়া, তাদের সাথে খোলামেলা কথা বলা এবং বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেওয়া।
ইসলামি অনুশাসনের অন্যতম রীতি হচ্ছে বয়ঃসন্ধিকালের পূর্বেই সন্তানদের এই ব্যাপারে অবগত করা; যদিও বয়ঃসন্ধিকালের আগে তা আবশ্যক নয়। যে সমাজে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা ব্যক্তিদের তাচ্ছিল্য করা হয় এবং ধার্মিকদের বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, সে সমাজে সন্তানদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। তারা তা ধর্মীয় বিধিবিধান মেনে চলছে –সে ব্যাপারে তাদের যথেষ্ট অবগত করতে হবে এবং নিজ ধর্মের আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে হবে।
এক্ষেত্রে পিতা-মাতার কর্তব্য হচ্ছে, সন্তানদের ইসলামের মৌলিক অনুশাসনের সাথে পরিচিত করানো। বর্তমান সময়ে সমাজে আলো-বাতাসের সীমাবদ্ধতা বোঝানো এবং এই সকল অনুশাসনের পেছনের যে সমস্ত প্রজ্ঞা রয়েছে, তা বর্ণনা করা। সন্তানদের সাত বছর বয়স থেকেই নামাজ আদায়ের শিক্ষা দিতে হবে। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পূর্বে সিয়াম পালন এবং পর্দার চর্চা শুরু করাতে হবে, যাতে প্রাপ্তবয়স্ক উপনীত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এগুলো তাদের জন্য সহজ ও স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। তাদের মধ্যে ইসলামের প্রতি ভালোবাসা জানানোর উপায় হচ্ছে তাদের সামনে ইসলামের উদারতা, ধৈর্য ও সহানুভূতি ব্যাখ্যাগুলো উপস্থাপন করা। রুঢ়তা তাদের অন্তরকে বিপথের দিকে ধাবিত করে। আর হঠাৎ করে ধর্মীয় অনুশাসন প্রয়োগ করলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এজন্য ছোটকাল থেকেই এগুলো তাদের অভ্যাস করানো গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলাম বিষয়ে প্রতিটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে বিবেচনা করতে হবে। ইসলাম কখনো মৌলিক বিশ্বাস ও বিধিবিধানের ক্ষেত্রে আপস করে না। সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও কঠোর পরিশ্রমের সাথে উত্তম সামাজিক আচরণ, ইসলামি নিয়মানুবর্তিতা, পরিচ্ছন্নতা ও লজ্জাবোধ একজন মুসলিমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সকল মৌলিক মানবীয় যোগ্যতা ছাড়া একজন মুসলিম কখনো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে এবং সমাজের কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। তাই এই সব বিষয়ে অধিক গুরুত্বারোপ করতে হবে।
গোপন বিষয়ে ইসলামে ছাড় রয়েছে। মৌলিক মূল্যবোধের চেয়ে বাহ্যিক অবয়বের প্রতি অধিক গুরুত্বারোপ ধর্মীয় গোঁড়ামি। দিনশেষে একজন ভালো মানুষ এবং আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়াই একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যেভাবে ফলের গুণাগুণ তার বৃক্ষের মান নির্ণয় করে, ঠিক সেভাবে একজন মানুষের আচার-আচরণই তার পারিবারিক প্রতিফলনে ঘটে।
পরিবার ও পরিবেশে ভিন্নতা থাকা উচিত, কিন্তু বেশি পার্থক্য থাকা উচিত না, যাতে পরস্পরের পরিবেশ সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী হয়। কারণ, প্রত্যেক কিশোরের আচার-আচরণকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে এ দুটি পরিবেশের ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। সন্তানদের মঙ্গলের ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজ পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের সাথে শিক্ষকদের নিয়মিত যোগাযোগ ও সুসম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে বাড়ি ও স্কুলের মধ্যে সমন্বয় করা সহজ হয়।
📄 সন্তানদের সার্থক সময় দান
একটি উত্তম ও কার্যকর পারিবারিক পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে পিতা-মাতা উভয়েরই নিরবচ্ছিন্ন সাধনা ও মনোযোগ প্রয়োজন। আধুনিক সমাজে সন্তানদের অনিয়ন্ত্রিত চাহিদা পিতা-মাতার জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়ে। তাই পিতা-মাতার উচিতও সন্তানদের প্রতিনিয়ত সঙ্গ দেওয়া, যাতে তারা আর বিভ্রান্তির শিকার হিসেবে গণ্য না হয়। প্রত্যেক পিতা-মাতার সাথে সন্তানদের গভীর ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন অপরিহার্য। পরিবারকে ভালোবাসা, মমতাপূর্ণ ও ইসলামি ভাবধারায় পুষ্ট করে গড়ে তুলতে মায়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বেঁচে থাকা এবং মানসম্মত জীবনযাপনের জন্য অর্থ উপার্জনের প্রচেষ্টার কারণে সন্তানদের সাথে পর্যাপ্ত সময় দান অনেক কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চাপ বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
প্রচলিত পরিবারগুলোতে মায়েরা পারিবারিক বিষয়গুলো দেখভাল করার পাশাপাশি সন্তানদের মানসিক বিকাশের জন্য ঘরে অবস্থান করেন। কিন্তু বর্তমানে অনেক মা পারিবারিক উপার্জন বৃদ্ধি কিংবা আধুনিক জীবনযাত্রার সাথে নিজেদেরকে মানিয়ে নিতে নিজের ইচ্ছায় কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বামীর চাপের কারণে বাইরে কাজ করতে বাধ্য হন। ফলে কিশোরা টেলিভিশন, কম্পিউটার ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত বিনোদন সামগ্রীর মধ্যেই সময় কাটায়। এটা সন্তান ও পিতা-মাতার মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি করে এবং তাদের মাঝে পারস্পরিক যোগাযোগে ফাটল ধরে তোলে। বিশেষ করে সন্তানরা কীসে অভ্যস্ত হচ্ছে, সে ব্যাপারে পিতা-মাতা থাকে উদাসীন। অথচ পিতা-মাতার উচিতও এটি স্বীকার করতে হবে, সন্তানদের আধ্যাত্মিক, আবেগ ও মানসিক বিকাশের জন্য পিতা-মাতা মনোযোগ ও সাহায্য প্রয়োজন; যদি তারা বড়ো হয়ে যায়ও তবুও। কেবল প্রতিবন্ধী সন্তানদের জন্যই অভিভাবকদের সময় দরকার এমন নয়; সকল সন্তানের জন্যই তা দরকার।
এক্ষেত্রে পিতা-মাতা উভয়কে এমন একটি উপায় বের করতে হবে, যাতে সন্তানদের তপ্ত সময় দেওয়া এবং তাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা নিশ্চিত হয়। এক্ষেত্রে পারিবারিক বিষয়াদি দেখাশোনার জন্য বাইরের কাজ কমিয়ে দেওয়া যেতে পারে, বাইরে অযথা সময় না কাটিয়ে তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরা যেতে পারে, প্রয়োজনে পরিবারের অন্যান্য সদস্য যেমন : দাদা-দাদির সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
আমার অভিজ্ঞতায় যতটুকু দেখেছি, দায়িত্ববান পিতা-মাতার সন্তানরা সুখ-সমৃদ্ধি ও আত্মবিশ্বাসের সাথে বেড়ে ওঠে। যে সকল সন্তান ঘরের কাজকর্ম কার্যকর ভূমিকা রাখে, তারা অন্যদের চেয়ে তুলনামূলক অধিক আত্মবিশ্বাসসম্পন্ন। তাদের মধ্যে পড়াশোনায় ভালো করার প্রবণতা অধিক দেখা যায়। তাদের সমাজবিরোধী কাজে জড়ানোর সম্ভাবনা খুবই কম থাকে। পিতামাতার উচিত সন্তান লালন-পালনে মায়েদের সাহায্য করা। নেতিবাচক পরিবেশ এবং অসংখ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি মুসলিম ছেলেমেয়েদের আত্মোন্নয়ন উপযোগী পরিবার গঠনে পিতার ভূমিকা অতীব জরুরি।
প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েদের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে কিছু নির্দিষ্ট মানসিক চাহিদা থাকে। এগুলোর মধ্যে অনেক কিছুই বিতর্কময়, যা তারা অতি আপনজন ছাড়া অন্য কারোও কাছে প্রকাশ করে না। অনেক সময় ছেলেরা তাদের সমস্যার কথা সহজে প্রকাশ করতে পারলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেয়েরা পারে না। তারা নিজেদের সমস্যার কথা গোপন রাখে। তাই বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে একজন আত্মবিশ্বাসী ও মমতাময়ী মায়ের উচিত তার মেয়েকে মানসিকভাবে সাহায্য করা; বিশেষত মেয়েলি বিষয়গুলোতে। একইভাবে একজন আত্মবিশ্বাসী ও যত্নবান পিতারও উচিত পুরুষালি বিষয়গুলোর ব্যাপারে ছেলেকে সাহায্য করা। তবে এ ক্ষেত্রে সন্তানদের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রয়োজন। আত্মিক সম্পর্ক ছাড়া এগুলো সম্ভব নয়। কারণ, সন্তানরা সাধারণত পিতা-মাতার নিকট এই বিষয়গুলো প্রকাশ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না।
📄 একটি মুসলিম যুব-সংস্কৃতি তৈরি
কাঙ্ক্ষিত প্রজন্ম গড়ার জন্য একটি চমৎকার ও যুগোপযোগী মুসলিম সংস্কৃতি প্রয়োজন। এটি মুসলিম তরুণদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। মুসলিম তরুণদের বিভিন্ন ঘরানা ও সংস্কৃতির মানুষের সাথে পরিচিতি হওয়া প্রয়োজন, এটি ইসলামি মূল্যবোধের অংশ। সমাজের সকল ধরনের মানুষের সাথে
তাদের বন্ধুত্ব রাখা প্রয়োজন। তবে ঘনিষ্ঠ বন্ধু তৈরির ক্ষেত্রে এমন মানুষ বাছাই করতে হবে —যাদের সাথে তার মূল্যবোধের মিল রয়েছে; অন্ততপক্ষে নিজেদের মূল্যবোধবিরোধী যেন না হয়।
শিশুরা যে বয়স থেকে মসজিদে আদাব রক্ষা করতে পারে, সে বয়স থেকেই তাদের মসজিদ নিয়ে যাওয়া উচিত। এতে তাদের নিকট বিভিন্ন বর্ণ ও সংস্কৃতির মানুষের সাথে খোলামেশার সুযোগ তৈরি হয়।
ইসলামের ইতিহাসে মসজিদ সব সময় সামাজিক ও শিক্ষাবিষয়ক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ভূমিকা রেখে এসেছে। দুর্ভাগ্যবশত বর্তমানে অনেক মসজিদই নিষ্ফল। শুধু সালাতের সময় ছাড়া বাকি সময় বন্ধই থাকে। মসজিদগুলো যদি শুধু সালাতের জন্যই ব্যবহার করা হয়, তাহলে উম্মাহর পুনর্গঠনের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। মদিনায় সমাজের কেন্দ্রবিন্দু ছিল রাসূল ﷺ-এর মসজিদ। সুতরাং বর্তমান সময়ের মসজিদগুলোও সেভাবে পরিচালনা করা উচিত।
জামাতের সাথে সালাত আদায় এবং কুরআন শিক্ষার পাশাপাশি মসজিদগুলোতে আরও কিছু সামাজিক কার্যক্রম আয়োজন করতে হবে। যেমন: জীবনধর্মী আলোচনা, কুইজ, সিরাত, ইতিহাস, গণিত, বিজ্ঞান প্রতিযোগিতা, নারীদের জন্য নারী সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পৃথকভাবে প্রশিক্ষণ ইত্যাদি। মসজিদের ইমামদের মানুষের সাথে যোগাযোগের দক্ষতা অর্জন করতে হবে। সমাজ সম্পর্কিত মৌলিক ধারণা রাখতে হবে—যাতে তারা বৃদ্ধ, কিশোর সবার সাথে মিশতে পারে। মসজিদভিত্তিক কার্যক্রমে তরুণদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুযোগ দিতে হবে।
ছুটির দিনে কিংবা বিভিন্ন উপলক্ষে মসজিদ ও সামাজিক সংগঠনগুলো সম্মিলিতভাবে আনন্দ ও শিক্ষামূলক বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারে। এতে কিশোরেরা একদিকে যেমন সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়, অন্যদিকে তেমনি ভালো মানুষদের সাথে একটি বন্ধুত্ব তৈরি করতে পারে। এর মাধ্যমে তারা প্রকৃত মুসলিম হিসেবে সবার সাথে বেড়ে ওঠে। এই সকল কার্যক্রম অন্যের সাথে বন্ধুত্ব তৈরির সুযোগ করে দেয়, যা কিশোরদের সামাজিক জীবনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিশোরেরা খুব সহজেই বন্ধুত্ব তৈরি করতে এবং তা ভাঙতে পারে। অনেক বন্ধু গ্রহণের মাধ্যমে তারা নিজেদের এবং চারদিকের বিশ্ব সম্পর্কে জানতে পারে। পিতা-মাতার কর্তব্য হলো উপযুক্ত বন্ধু বাছাইয়ে সন্তানদের সহযোগিতা করা। কারণ, তাদের আচার-আচরণে বন্ধু-বান্ধবের সাহচর্যের ভূমিকা অনেক বেশি। চরিত্রবান বন্ধুরা একে অপরকে কল্যাণমূলক কাজে উৎসাহিত করে, যা প্রধানত একাডেমিক নির্দেশনামূলক বক্তৃতা থেকে অনেক শক্তিশালী।
পিতা-মাতা এই বিষয়েও যত্নবান হবে—যাতে সন্তানরা এমন ছেলেদের সাথে না মিশে, যারা তাদের বিপথে নিয়ে যেতে পারে কিংবা অসৎ কাজে উৎসসাহিত করে। তরুণ যুবকরা সাধারণত জীকম্পকর্ম সংস্কৃতিতে অধিক অভ্যস্ত। অর্থ বর্তমান কর্পোরেট সংস্থাগুলো নিজেদের আর্থিক লাভের জন্যই এই সকল সংস্কৃতি তৈরি করে।
রাসূল ﷺ তাই সতর্ক করে বলেছেন— ‘মানুষ তার বন্ধুর দীনের অনুসরণ করে। সুতরাং বন্ধু হিসেবে কাকে গ্রহণ করেছ, এই ব্যাপারে লক্ষ রাখো।’ আবু দাউদ, তিরমিজি
যদি সময় ও প্রয়োজনীয় অর্থ থাকে, তাহলে ছুটির দিনগুলো পরিবার নিয়ে ইসলামিক ঐতিহাসিক স্থানগুলোতে কাটাতে উচিত। এক্ষেত্রে উমরাহ পালন সবচেয়ে উত্তম। এই সকল ভ্রমণের মাধ্যমে পূর্ব ইতিহাসের সাথে পরিচিত হওয়া যায়। এতে কিশোরেরা আরও উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত হয়।
মুসলিম কিশোরদের সম্ভাবনা বিকাশের অন্যতম উপায় হলো ছোটোবেলা থেকেই তাদের বিভিন্ন ইসলামিক আসরে নিয়ে যাওয়া এবং মুসলিম ভাবাপন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য উৎসাহিত করা। নবিজি৬৯৯৯৯ তরুণ বয়সে হিলফুল ফুজুল নামক সমাজকল্যাণমূলক একটি সংস্থার সদস্য হয়েছিলেন। ছোটোবেলা থেকে এসব কাজ অনুসরণ করার ফলে কিশোররা চ্যালেঞ্জিং দায়িত্ব গ্রহণে সাহস পায়। একই সঙ্গে তারা বেড়ে ওঠার জন্য যথাযথ ইসলামিক পরিবেশেও পায়।
মুসলিম পিতা-মাতার উচিতও সন্তানদের প্রয়োজনীয় সমর্থন দেওয়া, যাতে তারা নিজেদের সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম থেকে কোনো কিছু পাওয়ার জন্য এটিই আমাদের উত্তম বিনিয়োগ। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের উচিতও সন্তানদের ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ অথবা অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ থেকে বিরত থাকা।
📄 গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
সহযোগিতাপূর্ণ ও ইতিবাচক পারিবারিক পরিবেশ সৃষ্টি করা একটি বিশাল কাজ। ঠিক কীভাবে এই কাজ শুরু করতে হবে, তা নির্ধারণ করা সহজ নয়।
তবে কিছু পরামর্শ অনুসরণ করা যেতে পারে, যেগুলো এক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে—
● যথাসময়ে সালাত আদায় করুন। সম্ভব হলে সন্তানদের মসজিদে নিয়ে যান। নির্দেশপক্ষে ঘরেই একসাথে নামাজ আদায় করুন。
● প্রত্যেক দিন কুরআন তিলাওয়াত করুন। এটি ঘরে কল্যাণ বয়ে আনে এবং শ্রোতা ও পাঠক উভয়ের অন্তরে প্রশান্তি জোগায়。
● যেকোনো ব্যাপারে কষ্ট পরামর্শ চাইলে কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ করতে বলুন। এই দুই প্রধান উৎস মানবজীবনের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় সকল সমস্যার সমাধান পেশ করে। তাই সকল ক্ষেত্রে মুসলিমদের এগুলোর শরণাপন্ন হওয়া উচিত。
● দৈনন্দিন কার্যক্রমে আল্লাহর দেওয়া নির্দেশ এবং রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহর অনুসরণ করুন। সর্বদা আল্লাহর স্মরণ ও তওবার মধ্যে থাকুন। প্রতিটি কাজে রাসূল ﷺ-এর শেখানো মাসনুন দুআগুলো পাঠ করুন。
● কথা ও কাজে ইসলামের অনুসরণ করুন। কারণ, এটিই মুসলিম হওয়ার মূলকথা। এর মাধ্যমে সন্তানরা আপনাকে নিজেদের রোলমডেল মনে করবে এবং আপনার কাছে ইসলামের সঠিক বার্তা পাবে。
● সকল নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশীর সাথে আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রাখুন। এগুলো কিশোরদের সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধি করে এবং অভাবীদের সাহায্য করার মানসিকতা তৈরি করে। এগুলো নবি-রাসূলদের কাজ, যা একটি সুখী ও সফল সমাজ গঠনের অন্যতম উপাদান。
● নিয়মিত পারিবারিক প্রোগ্রামের আয়োজন করুন। এই ধরনের প্রোগ্রাম পরিবারের সদস্যদের মাঝে বন্ধনকে আরও মজবুত এবং ইসলামের প্রতি বিশ্বাস ও জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে। সন্তানদের পারিবারিক বিষয়ে পরামর্শদানের সুযোগ দিন। পরিবার নিয়ে চিন্তা করার ক্ষেত্রে তাদের উৎসাহিত করা উচিত。