📄 অনুকরণীয় আদর্শ
অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব তরুণদের মাঝে একধরনের আদর্শ মনস্তাত্ত্বিক নেতৃত্বের আভাস দেয়। ইসলামের ইতিহাসে অনুসরণীয় আদর্শিক নারী-পুরুষে ভরপুর। রাসূল ﷺ সকল বয়সের মানুষের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শিক ব্যক্তিত্ব।
আল্লাহ তায়ালা বলেন—
‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে তাদের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট আদর্শ, যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের ওপর আস্থা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।’ সূরা আহজাব : ২১
বর্তমানে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব কারা? এই ক্ষেত্রে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের মুসলিম তরুণরা এক নিরাশাপূর্ণ চিত্র অবলোকন করছে। তাদের চারদিকের পরিবেশ আজ উদ্ভাবনার ব্যর্থতা ও অক্ষমতার পরিপূর্ণ। বর্তমান বিশ্ব চরম নিপীড়িত অবস্থায় মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান মুসলিম নেতাদের প্রতি মুসলিম জনসাধারণের আস্থা নেই বললেই চলে। অনুকরণীয় আদর্শিক ব্যক্তিত্বের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দৃষ্টান্তমূলক খুবই কম। এই শূন্য জায়গাটা দখল করে নিয়েছে তথাকথিত সেলিব্রিটিরা, যাদের জীবনের লক্ষ্যই হলো ‘খাও-দাও, ফুর্তি করো!’ তারা ভোগবাদী সংস্কৃতি ও বস্তুবাদী আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থের হঠকারিত্বরূপে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সর্বোপরি সমাজ ও রাষ্ট্রে যোগ্য অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বের ঘাটতিও মুসলিম তরুণদের জন্য এক বিশাল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সন্তানদের জন্য সফলতা অর্জন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তাদের জানতে হবে—এই সফলতার অর্থ কী? সময়ের মধ্যে লক্ষ্য নির্ধারণের সাহস এই অর্জন করার সক্ষমতা থাকতে হবে। এজন্য তাদের এমন এক আদর্শিক ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন, যে তাদের সফলতার পন্থা বাতলে দেবে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রেরণা জোগাবে। এক্ষেত্রে পিতা-মাতার চেয়ে তাদের আপনজন আর কে আছে? পিতা-মাতাকেই সন্তানের অনুকরণীয় ব্যক্তি হতে হবে।
পিতা-মাতা সন্তানদের আকাশ ছোঁয়া লক্ষ্য নির্ধারণে সহযোগিতা করবে—এটাই স্বাভাবিক। তবে এই ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি কাম্য নয়। তাদের জন্য এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত, যা নির্ধারিত সময়ে অর্জন করা তাদের জন্য সম্ভব। সন্তানের সামর্থ্যের সীমা মাথায় রেখেই লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।
সন্তানদের সামনে সফলতার আসল অর্থটা তুলে ধরাও আমাদের দায়িত্ব। আল্লাহ মানুষের অন্তরের মধ্যে আত্মতৃপ্তি ও প্রশান্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষা জন্মত করে দিয়েছেন, যা শুধু অর্থপূর্ণ উপায়ে সময়কে কাজে লাগানোর মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন—
‘হে নবি! আমি তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে।’ সূরা আহজাব : ৪৫
মুসলিমদের প্রথম প্রজন্ম তাঁদের সাহাবীদের মাঝে অসামান্য নিদর্শন উপস্থাপন করে গিয়েছেন, যা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল। তাঁদের ইসলামের প্রতি আহ্বানের ধরণ ও উপকরণ উগ্র আরবদের মাঝে অগ্রসরণা এগিয়ে গিয়েছিল। এই অনুপ্রেরণায় ইসলামের প্রতি তাঁদের যে গভীর উপলব্ধি তৈরি হয়েছিল, তা তাঁদের সামনে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছে। সাহাবীদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আমাদেরও এমন অনুকরণীয় চরিত্র উপস্থাপন করা উচিত, যাতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হয় এবং সামনে এগিয়ে যেতে উৎসাহ পায়।
📄 ভারসাম্যপূর্ণ লালন-পালন
সন্তান লালন-পালনে সফলতা তখনই আসে, যখন পিতা-মাতা সন্তানের শারীরিক- মানসিক অনুভূতি ও আধ্যাত্মিক প্রয়োজনে সব সময় নজর রাখেন।
এ সময়ে পিতা-মাতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সন্তানদের মধ্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি এবং তাদের ঈমানকে জাগ্রত করা। যে সকল সুস্থির ব্যবস্থা মুসলিম রাষ্ট্রের তরুণদের তৎপরশীলতা পছন্দ করে দিয়েছে, সেগুলো অর্জনের পরিবর্তে মুসলিম তরুণদের তৎপরশীল হতে হবে এবং তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বৈধিক জ্ঞান অর্জন এবং উম্মাহর শ্রেষ্ঠ অর্জনের জন্য প্রেরণা দেওয়া উচিত।
যে কারও জীবনে ভারসাম্য বজায় রাখা সর্বাবস্থায় সহজ হয়ে ওঠে না। এটি বাস্তবায়নের চেয়ে বলা অনেক সহজ। প্রাপ্তবয়স্ক বাচ্চারা সাধারণত অনুসরণকৃত ব্যক্তিত্ব কিংবা সমাজের রোলমডেলদের অনুসরণ করতে পছন্দ করে। তাই পিতা-মাতার উচিতও এমন কারও সাথে সন্তানদের সংযোগ স্থাপন করে দেওয়া, যাদের সাথে তারা ইতিবাচক ভারসাম্যপূর্ণ জীবন পরিচালনা করতে পারে; যারা নিজেরাও ইতিবাচক ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী। এই ক্ষেত্রে রাসূল ﷺ-এর জীবনী অধ্যয়নকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে। যাতে তরুণরা পবিত্র জীবন থেকে অনুপ্রেরণা পায়, তাঁকে ভালোবাসতে পারে এবং তাঁর পবিত্র জীবন পদ্ধতিকে অনুসরণ করতে পারে। ইসলামের ইতিহাসে এমন অসংখ্য আদর্শিক মহান ব্যক্তিত্ব রয়েছে, যাদের থেকে মুসলিম তরুণরা অনুপ্রেরণা পেতে পারে।
📄 প্রকৃত সফলতার দীক্ষা
প্রত্যেক পিতা-মাতাাই সন্তানদের সফলতা কামনা করে। স্বপ্নও দেখেন; যদিও সফলতার সংখ্যা ভিন্ন হতে পারে। সফলতার সাথে আত্মবিশ্বাসের একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে। ইসলামের দৃষ্টিতে সফলতার অর্থ হলো—ভারসাম্যপূর্ণ উপায়ে দুনিয়া ও পরকালীন জীবনের কল্যাণ অর্জন এবং একএকটির কারণে অপরটির ক্ষতিসাধন না করা। অর্থাৎ একই সঙ্গে দুনিয়া ও পরকালের কল্যাণ অর্জনই হচ্ছে চূড়ান্ত সফলতা।
আল্লাহর রাসূল ﷺ সহ অন্য সকল প্রেরিত নবী-রাসূল মানবতার মহান শিক্ষক ছিলেন। পবিত্র কুরআনে শোয়াইব -এর কথা এভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছে—
‘আমার সফলতা একমাত্র আল্লাহর দ্বারাই ওপরই নির্ভরশীল।’ সূরা হূদ : ৮৮
প্রত্যেক মুসলমানের জন্য এটি বিশ্বাস করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ, সফলতা একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। সচেতন অভিভাবকগণ উত্তম শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে সন্তানদের মঙ্গলের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। পিতা-মাতাকে অবশ্যই সন্তানদের জন্য মানসম্মত স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুঁজে বের করতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, নিজের ঘরই সবচেয়ে বড় আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—এখানেই জীবনের সূচনালগ্ন থেকেই শিশুদের প্রকৃত শিক্ষা শুরু হয়। খলিফা উমর (রা)-এর মতে, এর সময়কাল হচ্ছে বাচ্চার জন্য থেকে সাত বছর। এটি এমন একটি সময়, যখন পিতা-মাতার কর্তব্য হলো নিজের বেশিরভাগ সময় ও শক্তি সন্তানদের পেছনে বিনিয়োগ করা, তাদের সাথে খেলাধুলা করা এবং খেলার মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া।
📄 পর্যায়ক্রমিক উন্নতি
সফলতার জন্য মানবীয় যোগ্যতা, তথা ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায়, সহনশীলতা ও নিয়ন্ত্রিত জীবন অপরিহার্য উপাদান। এই সকল গুণাবলি হঠাৎ করে বা কাকতালীয়ভাবে অর্জিত হয় না। এর জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা এবং ধাপে ধাপে উন্নয়ন। সকল মানুষ সমানভাবে এই সকল গুণের অধিকারী হয় না। অনেকের মধ্যে ছোটোকাল থেকেই এগুলোর একটি কিংবা একাধিক গুণাবলিই ঘাটতি থাকে। পরিবার ও চারপাশের ইতিবাচক পরিবেশই এই সকল ঘাটতি অনেকটা পুষিয়ে নিতে পারে। সন্তানদের মধ্যে এই সকল গুণাবলি অর্জনে পিতা-মাতার বিরাট ভূমিকা রয়েছে।
নিজেদের প্রতিভা বিকাশের ক্ষেত্রে সন্তানদের উৎসাহের প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে তাদের সাহস জোগানোর পাশাপাশি সকল ধরনের চাপমুক্ত রাখতে হবে। তাদের ভালো কাজের স্বীকৃতি, লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রেরণা এবং পিতা-মাতার সাথে পর্যাপ্ত পরিমাণ সময় কাটানোর সুযোগ দিতে হবে। পিতা-মাতা যদি সন্তানদের চরিত্রের মাঝে কার্যকর উপায়ে আল্লাহ ও রাসূল (স)-এর প্রতি ভালোবাসা ও বিশ্বাস, আত্মনির্ভরশীলতা, আত্মবিশ্বাস ও আত্মপর্যালোচনার সমন্বয় ঘটাতে পারে, তাহলে তা তাদের ভারসাম্যপূর্ণ ও সমৃদ্ধ জীবনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। পিতা-মাতার সন্তানদের সাথে চিরকাল থাকতে পারবে না, কিন্তু নিম্নোক্ত কাজগুলো মাধ্যমে তারা সন্তানদের জীবনে সফলতার বীজ বপন করে যেতে পারে—
১. জোর-জবরদস্তির পরিবর্তে উৎসাহদানের মাধ্যমে তাদের আগ্রহী করে তোলা।
২. স্বেচ্ছাচারিতার পরিবর্তে যথাযথ দিকনির্দেশনা প্রদান।
৩. নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখে তাদের মেধার মূল্যায়ন।
৪. সহজ উপায়ে তাদের জন্য দৈনন্দিন কাজের রুটিন নির্ধারণ।
৫. নিয়ন্ত্রণ ও চাপ প্রয়োগের পরিবর্তে সমর্থন ও উৎসাহ প্রদান।
৬. কোনো ধরনের অযথা হস্তক্ষেপ ছাড়াই তাদের নিজ নিজ পদের প্রতি গুরুত্ব প্রদান।
পিতা-মাতার উচিত সন্তানদের থেকে অল্প সময়ে বিশাল কিছু প্রত্যাশা না করা। তবে তাদের শক্তি-সামর্থ্যের যথাযথ প্রবৃদ্ধির ব্যাপারে অবশ্যই যত্নশীল হতে হবে। কারণ, এর মাধ্যমে তারা ধীরে ধীরে নিজেদের উন্নতি ঘটাতে সক্ষম হয়। 'পৃথিবী একটি জটিল ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ জায়গা। এখানে জীবন চলার পথ কণ্টাকাকীর্ণ'—এই বিশ্বাস জীবনকে চ্যালেঞ্জিং ও দুঃসাহসিক করে তোলে। এই বিশ্বাসকে সন্তানদের হৃদয়ে বদ্ধমূল করার মাধ্যমে তাদের জীবনকে উপভোগ্য করে তুলতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে—জীবন খুবই কঠিন, কাউকে উপরে উঠতে হলে সফল হওয়ার দৃঢ় সংকল্প থাকতে হবে। আন্দালুসিয়ার কিংবদন্তি ইমাম কুরতুবি (রহ.) একবার বলেছিলেন—
'একটি প্রথম শ্রেণির ইচ্ছা এবং দ্বিতীয় শ্রেণির মেধা, একটি প্রথম শ্রেণির মেধা এবং দ্বিতীয় শ্রেণির ইচ্ছার ওপর জারী হয়।'