📘 মুসলিম প্যারেন্টিং > 📄 দিবাস্বপ্ন নাকি দুঃসাহসিকতা

📄 দিবাস্বপ্ন নাকি দুঃসাহসিকতা


কিশোরেরা তাদের বেপরোয়া, আবেগপ্রবণ ও খামখেয়ালীপূর্ণ আচরণের কারণে সব সময় বড়োদের সমালোচনার বিষয় হয়। এর ইতিবাচক দিক হলো—এর মাধ্যমে তাদের সৃষ্টিশীলতা উদ্যোগ, জীবনশক্তি ও উদ্দীপনা বৃদ্ধি পায়। এটি এমন একটি সময়, যখন মানুষ তার শক্তি ও সম্ভাবনা আবিষ্কার করে এবং দুঃসাহসিক কিছু করার ইচ্ছা পোষণ করে।
এই সমস্ত শক্তি যদি আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ এবং ইতিবাচক সামাজিক আচরণ দ্বারা পরিচালিত হয়, তাহলে এই গতিশীলতা সমাজকে উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌঁছে দেয়; কিন্তু পথভ্রষ্ট কিশোর একটি ধ্বংসাত্মক শক্তি, যা সমাজকে টেনে নিচে নামিয়ে আনে এবং সমাজে বিরাট বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
ইসলামকে পুরা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে প্রতিটি যুগে তরুণরাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। তারা নিজের মানবিকতা, ভাবাবেগ, প্রাণশক্তি ও ত্যাগের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের মাধ্যমে ইসলামকে ছড়িয়ে দিতে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেছে। এদের মধ্যে অন্যতম হলো মুহাম্মাদ বিন কাসিম। তিনি উমাইয়া শাসনামলে কিশোর বয়সেই দুঃসাহসিকতা ও আধ্যাত্মিক শক্তির জন্য খ্যাতিলাভ করেছিলেন।
মুসলিম উম্মাহ যখন অভিযাত্রায় আত্মাতৃপ্তিতে লিপ্ত হলো এবং মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে এলো, ঠিক তখনই তরু হলো মুসলিম যুবশক্তির অপচয় ও অপব্যবহার। ফলে উম্মাহর পতনের সময় ঘনিয়ে এলো।
যুবকরা সেই নির্দেশনা অনুযায়ী নিজের শক্তি-সামর্থ্য ব্যয় করে, যা তারা পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের থেকে শেখে। তাদের আচার-আচরণ মূলত ছোটো বেসে পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের থেকে প্রাপ্ত শিক্ষার দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়। অভিভাবকদের উচিত কিশোর সন্তানদের ব্যাপারে গভীর জ্ঞান রাখা, যাতে বৃহত্তর সমাজের কল্যাণার্থে তাদের একজন ভালো মুসলিম হিসেবে গড়ে তোলা যায়। এর জন্য এমন পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে, যা অতি উদারও নয়, আবার অতি কঠোরও নয়।

📘 মুসলিম প্যারেন্টিং > 📄 বিরাট পরিবর্তন

📄 বিরাট পরিবর্তন


পিতা-মাতা শিশুদের যে সমস্ত বিষয়াবলি শিক্ষা দেন, সেগুলোতেই তারা অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু কিশোররা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। শিশু যখন শৈশব থেকে কৈশোরের দিকে পদার্পণ করতে শুরু করে, তখন শারীরিকভাবে বিরাট পরিবর্তনের সম্মুখীন হয়; এমনকী তাদের আবেগ-অনুভূতিও বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়। এই ধরনের বেড়ে ওঠা তাদের জীবনের এক বড়ো অভিজ্ঞতা, যা অনেকের কাছে উৎসাহব্যঞ্জক আবার অনেকের জন্য যন্ত্রণাদায়ক।
জীবনে এই ধরনের আকস্মিক পরিবর্তন কোনো সহজ বিষয় নয়; কিশোর হিসেবে বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মধ্যে নতুন ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটে। এই কারণে আনন্দদায়ক বা চমৎকার ব্যাপারটাও তাদের কাছে হঠাৎ করে হতাশা কিংবা উদ্বেগে রূপান্তরিত হতে পারে। জীবনের এই পর্যায়ে পিতা- মাতাকে সন্তানদের জন্য নিজেদের আচার-আচরণের পরিবর্তন আনতে হয়। সন্তানকে একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তা হিসেবে বিবেচনা করে তাদের পরিপূর্ণ অধিকার দিতে হয়। তাদের স্বতন্ত্র আচরণকে শুধু সহ্য করলেই চলে না; বরং এটিকে পূর্ণতাও গ্রহণ করতে হয়। এই সময়েই মূলত অভিভাবকদের সন্তান লালন-পালনের সক্ষমতা যাচাই হয়।
অনেক অভিভাবক সন্তানদের এই নতুন আচরণে অনেক কষ্ট পান। অনেকে আবার শিথিলতা প্রদর্শন এবং কিশোর সন্তানদের স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেন। অন্যদিকে, অনমনীয় ও কর্তৃত্বশীল অভিভাবক সন্তানদের ওপর নানা সীমাবদ্ধতা আরোপ করেন। এগুলোতে কোনোটিই শোভনীয় নয়। বিবেকবান পিতা-মাতা
ধৈর্য ও বিচক্ষণতার সাথে ভারসাম্যপূর্ণ উপায়ে সন্তানদের সাথে আচরণ করেন এবং তাদের আকস্মিক পরিবর্তনের সঙ্গে বিবেচনাপূর্বক নিজেদের মানিয়ে নেয়।
কৈশোর কখন শুরু হয়—তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা খুবই কষ্টসাধ্য। এটি দশ, বারো কিংবা আঠারো বছর বয়সে শুরু হতে পারে, তবে পুরো কৈশোরজুড়েই এর ব্যাপ্তি। জীবনের এই পর্যায়ে কী ঘটে? কৈশোর জীবন নিয়ে কোনোটি মিথ আর কোনোটি বাস্তবতা?
কৈশোর হলো শৈশবকালের পরিসমাপ্তির শুরু, যা তরুণদের দায়িত্ব নেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। এই সময়টা যেহেতু তরুণদের মাঝে একধরনের মানসিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা জাগিয়ে তোলে, তাই অভিভাবকদের উচিতও সন্তানদের কার্যক্রমে খুব নিকট থেকে পর্যবেক্ষণ করা। এই সময় সন্তানরা শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক পরিবর্তনের সম্মুখীন হয়।
শারীরিক পরিবর্তন (Physical Changes) : শারীরিক পরিবর্তন বা বয়ঃসন্ধিকাল জীবনের সে সময়কে বলা হয়, যে সময়ে সন্তানের শরীর ডিম্বাশয় ভিন্ন উপায়ে কাজ করতে শুরু করে এবং যা তাদের শরীরকে সন্তান জন্মাদানে সক্ষম করে তোলে। মেয়েদের ক্ষেত্রে স্ত্রী হরমোনের বৃদ্ধি তাদের শরীরকে একজন পরিপূর্ণ নারীর গঠনে রূপান্তরিত করে এবং তাদের মধ্যে হায়েজ (মাসিক স্রাব) শুরু ঘটে। শারীরিক পরিমাণে টেসটোসটেরন (Testosterone) থাকার কারণে মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের উচ্চতা ও ওজন অধিক পরিমাণে বেড়ে যায়। তাদের কণ্ঠস্বর পরিবর্তন হয় এবং শরীরে বিভিন্ন স্থানে লোম গজায়। তাদের মাঝে বিভিন্ন ধরনের পুরুষালি বৈশিষ্ট্যের বিকাশ ঘটে।
এই সময়ে যেহেতু সন্তানদের মাঝে শারীরিক শক্তি ও কর্মচঞ্চলতা বৃদ্ধি পায়, এজন্য তাদের দরকার শারীরিক বিকাশের জন্য পুষ্টিকর খাদ্য, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্য মানসিক পুষ্টি।
শুধু সন্তানদের শারীরিক পরিবর্তনের দিকে লক্ষ রাখলেই হবে না; বরং এই পরিবর্তনগুলোর সাথে তারা যেন সহজভাবে মানিয়ে নিতে পারে, সেজন্যও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পিতা-মাতা উচিতও সন্তানদের সঙ্গে বয়ঃসন্ধিকালের গুরুত্বপূর্ণ দিকসমূহ নিয়ে যথাসম্ভব খোলামেলাভাবে আলোচনা করা। এর মধ্যে ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী ঋতুস্রাব ও স্বপ্নদোষের পর পবিত্রতা অর্জন,
শরীরে অতিরিক্ত চুল পরিষ্কারসহ বিভিন্ন ইসলামিক আদব-ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই সকল ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা অপরিহার্য। তবে কোনো ধরনের ইতস্ততবোধের যেন সন্তানদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলি নিয়ে আলোচনা থেকে বিরত না রাখে।
স্বয়ং কুরআনে এই সকল স্পর্শকাতর বিষয়ে শালীনভাবে আলোচনা করা হয়েছে। যৌন ও যৌনতা বিষয়ক আলোচনা যেন কোনো ট্যাবু হিসেবে গণ্য করা না হয়; বরং ইসলামিক উপায়ে যথাসম্ভব শালীনভাবে এই সকল বিষয়ে আলোচনা করতে হবে। যদি এসব ব্যাপারে কিশোর সন্তানদের সঙ্গে আলোচনা করা না হয়, তাহলে তারা এই বিষয়ে অন্য কোনো নিকটস্থ থেকে তা শিখে নেবে, যা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্য ক্ষতিকর। তবে এই সকল বিষয়ে সাবলীল আলোচনার ক্ষেত্রে সন্তান ও অভিভাবকদের মাঝে ভারসাম্যপূর্ণ ও গভীর সম্পর্ক অপরিহার্য।
বয়ঃসন্ধিকাল এমন একটি সময়, যখন থেকে শরীয়াহর বিধানাবলি পালন করাও অপরিহার্য হয়। অনাবশ্যকীয়, ইসলামিক নিয়মানুযায়ী ছেলেমেয়েরা এই বয়সে নিজেদেরকে জন্য দায়িত্বশীল পুরুষ ও নারী হিসেবে বিবেচিত হয়; যদিও তাদের এ হলো কিশোর। এই ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মাঝে মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে একটি উন্নত ও নৈতিক সমাজ গঠন অপরিহার্য, যা শিষ্টাচারের সীমা অতিক্রম করে না।
বিপরীত লিঙ্গের মানুষদের সাথে সম্পর্কের ব্যাপারে ইসলামের বিস্তারিত ও মৌক্তিক বিধান রয়েছে। পবিত্র কুরআনের সুরা নিসার ১০ নং আয়াতে মুহাররামদের কথা উল্লেখ রয়েছে, যাদের বিবাহ করা নিষিদ্ধ। যখন কোনো মুসলিম যুবক-যুবতীর জনসম্মুখে একত্রিত হয়, যখন অবশ্যই আল্লাহর হাজির- নাজির জন সেজে নিজেদের পোশাক ও আচরণের দিকে লক্ষ রাখতে হবে।
অনুভূতিগত পরিবর্তন (Emotional Changes) : অনুভূতিগত পরিবর্তন কিশোরদের মাঝে প্রাকৃতিকভাবেই লজ্জাশীলতা ও বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি করে। শরীরে মধ্যে হরমোনজনিত ভিন্নতার ফলে তাদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মানসিক পরিবর্তন দেখা দেয়। যেহেতু শারীরিক পরিবর্তনে কিশোরের কোনো ভূমিকা নেই, তাই এই ধরনের আকস্মিক পরিবর্তনে তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। এই সময় চারপাশের লোকজন তাদের ভিন্ন চোখে মূল্যায়ন করে বিধায় তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও অযৌক্তিক ভাব সৃষ্টি হতে পারে।
তারা বুঝতে পারে না – তারা এখনও ছোটো নাকি বড়ো হয়ে গেছে? অথবা তারা জীবনের কোন্ পর্যায়ে উপনীত? এ বিষয়টি বুঝতে বুঝতে তাদের অনেক দিন লাগে। সচেতন অভিভাবক ও বড়োরা বাস্তব পৃথিবীর সাথে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ওপর অধিক চাপ প্রয়োগ করে না; বরং তারা যাতে নিজের মতো করে নতুন পৃথিবীর সাথে মানিয়ে নিতে পারে, সেজন্য যথেষ্ট সময় ও সুযোগ করে দেয়।
সামাজিক পরিবর্তন (Social Changes) : কিশোররা বুঝতে পারে, তারা এখন পর্যন্ত অভিভাবকদের ওপর নির্ভরশীল। তাই তারা নিজের পায়ে দাঁড়াতে বা স্বনির্ভর হতে একটা তাড়না অনুভব করে। আর এটা করতে গিয়ে তারা এমন পন্থা অবলম্বন করে, যা পারিবারিক নিয়ম-শৃঙ্খলার সাথে সাংঘর্ষিক। যেমন: অনেক সময় পারিবারিক কার্যক্রমে তারা বিরক্তিকর মনে করে, ছোটো ভাই-বোন ও বড়োদের সাথে অসংযতামূলক আচরণ করে ইত্যাদি। এ ছাড়াও তারা প্রাপ্তবয়স্কদের বই-ম্যাগাজিন, গান শোনা ও টেলিভিশন প্রোগ্রামের প্রতি অতিমাত্রায় আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে, যা পিতা-মাতার নিকট অপছন্দনীয়। মাঝে মধ্যে দেরি করে ঘরে ফিরতে পারে, অভিভাবক ও পারিবারিক সদস্যদের সাথে মেলামেশায় অনাবশ্য প্রকাশ করতে পারে, দামি পোশাক-পরিচ্ছেদসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র কেনার জন্য অভিভাবকদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারে ইত্যাদি।
নিশ্চিতভাবে কিছু অভিভাবকের নিকট এই সকল আচরণ অগ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে, কিন্তু কিশোরদের সত্যি সত্যিই ব্যাপক হিসহিম খেতে হয় বাইরের ও ঘরের পরিবেশের সাথে সমন্বয় করতে। কারণ, তারা বাইরের জগতে বন্ধুত্বহীনের চালচলনে এবং মিডিয়ায় প্রদর্শিত বিষয়াবলির মধ্যে একরকম কালচার লক্ষ করে, আর ঘরে তাদের থেকে অন্য ধরনের কালচার প্রত্যাশা করা হয়। এক্ষেত্রে তাদেরকে আস্তে আস্তে পর্যায়ক্রমে বোঝাতে হবে এবং জীবনের আসল উদ্দেশ্য তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে।
সন্তান ও অভিভাবকদের মাঝে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক নির্ভর করে অভিভাবকদের ব্যক্তিত্ব এবং কিশোর সন্তানেরা পেছনে তারা কতটুক কার্যকর সময় ব্যয় করে তার ওপর। ঐ ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থাই সর্বোত্তম পন্থা; অতি কঠোরতা নয়, আবার অতি শিথিলতাও নয়। অর্থাৎ অভিভাবক সন্তানদের সহপাঠী নয়, আবার বসও নয়। অভিভাবকদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ব্রতসুলভ আচরণের মাধ্যমে সন্তানদের আত্মজ্ঞান হওয়া। সবকিছু সামনে তাদের সামনে এগিয়ে নেওয়ার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানো; যদিও তা অত্যন্ত কঠিন।
পিতা-মাতার উচিত সন্তানদের আচার-আচরণে সীমা-পরিসীমা নির্ধারণ করা। ইসলাম তাদের কাছে কী চায় এবং কেন চায়, সে ব্যাপারে সম্যক অবগত করা। সন্তানদের সঠিক পথ প্রদর্শন করা এবং তাদের সীমারেখা কেন দরকার, এর কারণ প্রজ্ঞার সাথে বর্ণনা করা। সন্তানদের কখনো যেন অনুভব করতে না পারে, পিতা-মাতার দ্বারা তারা উপেক্ষিত হচ্ছে অথবা অসংযমূলক আচরণ করলেও তাদের ছাড় দেওয়া হচ্ছে। যখন তারা পরিবার, সমাজ ও গুরুজনদের মধ্যে নিজের ভূমিকার ব্যাপারটি বুঝতে পারবে, তখনই কেবল নিজেদের একজন দায়িত্ববান নাগরিক হিসেবে ভাবতে শিখবে। একই সঙ্গে নিজ সম্প্রদায় ও সমাজে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করতে ও গুরুত্ব দেবে।

📘 মুসলিম প্যারেন্টিং > 📄 অন্যান্য বিষয়

📄 অন্যান্য বিষয়


কিশোর বয়সের বিভিন্ন পরিবর্তন নতুন চ্যালেঞ্জের অবতারণা করে। এ সময় বিভিন্ন ধরনের ভয় ও সংশয় পারিবারিক সম্পর্কে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে। আত্মসচেতন ও সংবেদনশীল পিতা-মাতা এগুলোর সাথে খুব দ্রুতই মানিয়ে নেয়। তাঁরা এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করে কিশোরদের উদ্দীপনা সঠিক কাজে লাগানোর জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। এর জন্য সন্তানদের গতিবিধির ওপর সজাগ দৃষ্টি রাখে এবং সঠিক সময়ে সঠিক পদ্ধতিতে পরামর্শ প্রদান করে।
যৌনতা : বয়ঃসন্ধিকালের প্রভাবে কিশোর-কিশোরীরা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি ব্যাপকভাবে আগ্রহী হয়। এটি এমন এক সময়, যখন কিশোররা বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি চরমভাবে আসক্তি হয় এবং বিপুল আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে। নিজের আবেগ ও প্রবৃত্তির কারণে অনেক কিছু তাদের কাছে লোভনীয় মনে হয়; বিশেষ করে যখন চারপাশের সমাজ ছেলে অথবা মেয়ে বন্ধু থাকাকে অথবা অবৈধ যৌন সম্পর্ককে স্বাভাবিক মনে করে।
এই সমাজে বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা এবং এর ফলস্বরূপ অবৈধ সন্তান জন্ম দেওয়াকে খুবই স্বাভাবিক পন্থার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। সেইসঙ্গে বিপরীত লিঙ্গ থেকে পৃথকভাবে চলাফেরাকে বিবেচনা করা হচ্ছে পশ্চাদগামিতা ও নিপিড়নমূলক আচরণ হিসেবে।
নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার ওপর নির্মিত সমাজব্যবস্থা তরুণদের শক্তি-সামর্থ্যকে সুষ্ঠিনীল ও অর্থপূর্ণ উপায়ে ব্যবহার করা হয়। নারী-পুরুষের মেলামেশার ব্যাপারে
ইসলামের রয়েছে সুনির্দিষ্ট শিষ্টাচার। মুসলিম পুরুষ ও নারীদের বলা হয়েছে আচার-আচরণে বিনয়ী হতে, দৃষ্টিকে অবনত রাখতে এবং বিপরীত লিঙ্গকে আকর্ষণ করে না এমন পোশাক পরিধান করতে। (সূরা নূর : ৩০-৩১)
ইসলাম দাম্পত্য জীবনকে যথেষ্টভাবে কাজে লাগাতে এবং পরিবার গঠনে যত শুভ বিষয় করতে উপদেশ দেয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো— ইসলামে নিজেদের যৌনশক্তিকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের কাজে ব্যবহার করার নির্দেশ দেয়। চারিত্রিক নির্মূলতা অর্জনেও এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গভীর বিশ্বাস, নিয়মানুবর্তিতা, সম্মানজনক মেলামেশা ও মজবুত পারিবারিক সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
পর্দা ও শালীনতা : যে সমাজে নারীদের যৌন আবেদনময়ীরূপে প্রদর্শন করা হয়, সেখানে পর্দাকে নিশ্চিতভাবে একটি পশ্চাৎপদ বিষয় মনে করা হয়। ফলে অনেক মানুষ শালীন পোশাককে অত্যাচার-নিপীড়নের প্রতীক হিসেবে মনে করে। তাদের কাছে পর্দা বা হিজাব হচ্ছে একত্ববাদের প্রতিকল্পতা, যা নারীদের আবদ্ধ করে রাখে এবং তাদের পুরুষশাসিত পৃথিবীতে দাসী হিসেবে বিবেচনা করে।
ইসলামে হিজাব কেন গুরুত্বপূর্ণ? এই প্রশ্নের উত্তর খুবই সহজ। হিজাবের নির্দেশনা সর্বশক্তিমান আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে; যিনি সবচেয়ে ভালো জানেন মানবিক মর্যাদা কোথায় নিহিত রয়েছে। তাঁর সকল নির্দেশনার পেছনে অত্যন্ত যৌক্তিক কারণ রয়েছে, যা সমগ্র মানবজাতির জন্য কল্যাণজনক। নারীরা সুহিষ্ণুতভাবে শারীরিক সৌন্দর্যপ্রেমী, কোমল ও ভদ্র প্রকৃতির হয়। অন্যদিকে পুরুষরা হয় প্রচন্ড যৌনলিপ্ত। এভাবেই সৃষ্টি করা হয়েছে। হিজাব নারীদেরকে পুরুষের অশ্লীল চিন্তা ও কুদৃষ্টি থেকে রক্ষা করে। একই সঙ্গে পুরুষদেরও সাহায্য করে নারীদের সৌন্দর্য মোক্ষগন্ত হওয়া থেকে বিরত থাকতে। হিজাব প্রত্যেক মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেয় তার মেধা ও চরিত্রের ওপর ভিত্তি করে; শারীরিক সৌন্দর্যের ওপর ভিত্তি করে নয়।
হিজাব নারীকে সমাজের এমন উচ্চ শিখরে পৌঁছে দেয়, যেখানে সে বুঝতে পারে—মানুষ হিসেবে পৃথিবীতে সে আল্লাহর একজন প্রতিনিধি, কন্যা হিসেবে পিতার জন্য সে রহমত, স্ত্রী হিসেবে সে স্বামীর দীনের অর্ধেক এবং মাতা হিসেবে সন্তানদের নিকট সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারিণী; যার পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত।
ইসলামকে একটি কল্যাণজনক সমাজ গঠনে নারী-পুরুষের ভূমিকা একে অন্যের পরিপূরক। তবে প্রত্যেকই নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী আল্লাহর নিকট দায়বদ্ধ। দুঃখজনকভাবে অনেক মুসলিম সমাজে নারীদেরকে এমনভাবে অবমানিত হয়েছে, যার সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই! এটার কারণ হলো— জীবনের সব ক্ষেত্রে অজ্ঞতা ও অবক্ষয়। এটা ইসলামের নির্দেশনার বাইরে সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দেওয়ার ফল।
পোশাক অবশ্যই হিজাবের একটি অপরিহার্য উপাদান, কিন্তু এটি ফরজ করার পেছনের কারণ ও হিকমাহ আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শরীর ও চুল এক টুকরা কাপড় দিয়ে ঢাকা আর হিজাব পরিধান করা এক জিনিস নয়। বাহ্যিক পবিত্রতা ও শালীনতার প্রতীক হিজাব যখন অভ্যন্তরীণ উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্য পান করা হয়, তখনই কেবল হিজাব একজন নারীকে সামাজিক ও আধ্যাত্মিকভাবে মর্যাদার উন্নত শিখরে পৌঁছে দেয়। নিচে কয়েকজনের মতামত তুলে ধরা হলো, যারা হিজাবের প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করেছেন।
‘এই পৃথিবীতে নারীদের জন্য অত্যন্ত চমৎকার পোশাক হলো হিজাব। এই কুদৃষ্টিপূর্ণ বিশ্বে হিজাব একজন নারীকে নিরাপত্তা প্রদান করে।’ (একজন তরুণ ধর্মভীরু মুসলিম)
‘অনেক অমুসলিম নারী ভাবতে পারে, হিজাব নারীদের আবদ্ধ করার জন্য অন্যায্যমূলক চাপিয়ে দেওয়া একধরনের পোশাক—যা তাদের পুরুষদের নিকট আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করে। কিন্তু যারা হিজাব পালন করে, তারা এর মধ্যে স্বাধীনতাহীনতা ছাড়া আর কিছুই পায়নি।’ (একজন ধর্মভীরু মুসলিম)
‘এটি অধীনতার সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা এটি পালন করি। কারণ, এতটুকুই আমাদের স্বচ্ছন্দ্য বোধ হয়। আমরা নিজেদের যৌন বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করাকে প্রত্যাখ্যান করি। সুন্দর চেহারার পরিবর্তে ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রের ভিত্তিতে আমাদের মূল্যায়ন করুন। আমরা পুরুষদের সামনে নিজেদের আকর্ষণীয়রূপে উপস্থাপন চেষ্টা করি না। পুরুষ আমাদের পদযুগল পছন্দ করুক কিংবা অফিসে আমাদের সুন্দর দেখাক—এই আশায় আমরা চাকরির নামে নিজেদের বিক্রি করি না।’ (মুসলিম নারী)
নিচে একটি কবিতার উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরা হলো, যেটি হিজাবের পেছনের প্রজ্ঞা তুলে ধরে—
(হতাশার বন্ধ) ইমা : (একজন উত্তরআধুনিক নারী) 'তুমি একজন বুদ্ধিমান মহিলা হে আয়িশা, তুমি কেন তোমার চুলের ওপর এগুলো পরো? নিজেকে পুরুষ জাতির অধীন করে, এক হাজার বন্ধ বানিয়ে এটি খুলে ফেলো আমার বোন তোমার আবরণকে উন্মুক্ত করো। চারদিকের বিষয়গুলোকে অন্ধভাবে অনুসরণ করো না; পৃথিবীকে তোমার স্বাধীনতাপ্রাণ কথা জানিয়ে দাও।'
আয়িশা : (বিবেকবান এক মুসলিম মেয়ে) 'হে আমার প্রিয় বোন ইমা! তুমি কেন এভাবে বিশ্রী পোশাক পরো? তোমার কোমর পেঁচিয়ে খাঁটো জামা পরে থাকো এটি কি আসলেই তুমি? আমরা এখন বসেছি, আমি দেখেছি যে, তুমি এটি তরুণের বেঁধে রেখেছ তুমি কি লজ্জাবোধ করো না? পুরুষদের লোভলুপ দৃষ্টিকে তুমি কি ভয় করো না? এরা পুরুষজাতি, হে আমার প্রিয়! যারা ফ্যাশনকে নিয়ন্ত্রণ করে। পুরুষদের যৌনতাকে উস্কে করে নিজেকে মুক্ত করো, হে আমার বোন ইমা! অশ্লীলতার বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসো, আজ থেকে হিজাব পালন করো; সখী আমার, ইসলামের পোশাক পরো। হে প্রিয়! আমি তোমার কথাগুলোই বলছি! তোমার আবরণকে উন্মুক্ত করো, অন্ধভাবে দুনিয়াকে অনুসরণ করো না; বিশ্বকে তোমার স্বাধীনতাপ্রাণ কথা জানিয়ে দাও।'
নিঃসন্দেহে একজন মুসলিম তরুণীর জন্য হিজাব পালন করা চ্যালেঞ্জের বিষয়, যেখানে তাদের তথাকথিত সুশীল ধারার সংস্কৃতিকে অনুসরণ করতে হয়। চাপ দেওয়া হয় নিজেদের চেহারার সৌন্দর্যকে প্রকাশ করতে, যাতে মানুষের প্রবৃত্তিকে কাজে লাগিয়ে কেতা আকর্ষণ করা যায়। বিশেষ করে পুরুষের সামনে তাদের উপস্থাপন করা হয় চরম বেনামাল সাজসজ্জায়, আঁটোসাঁটো পোশাক পরিয়ে। এই সব কালচারে তারা মিশে যায় পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই স্রোতের অনুকূলে চলা খুবই সহজ, কিন্তু স্রোতের প্রতিকূল সাঁতার কাটতে ব্যাপক হিম্মতের প্রয়োজন।
পিতা-মাতার, বিশেষত মায়েদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো নিজেদের উপমা হিসেবে উপস্থাপনের মাধ্যমে কন্যাদের হিজাবের গুরুত্ব শিক্ষা দেওয়া; এটা তাদের চারিত্রিক পবিত্রতা, আত্মমর্যাদা রক্ষা, ক্ষমতায়ন ও মুসলিম সত্তার পরিচায়ক।
যারা হিজাব পছন্দ করে না, তাদের দ্বারা হিজাব পালনকারীরা নেতিবাচক আক্রমণের মুখোমুখি হতে পারে। এক্ষেত্রে পিতা-মাতা ও উত্তম বন্ধু-বান্ধবের সমর্থন ও সাহচর্য খুবই প্রয়োজন। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হিজাব পালনকারী নারী এবং সামাজিক চাপে হিজাব ত্যাগকারী নারীর মধ্যে পরিষ্কার পার্থক্য তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে।
দাড়ি: দাড়ি রাখা হলো নবি-রাসুলগণের সুন্নাহ, যা পালন করা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষদের ওপর ওয়াজিব; কাও ও মতে মুস্তাহাব। রাসুল ﷺ বলেন—
‘তোমরা গোঁফ ছোটো করো এবং দাড়ি ছেড়ে দাও।' সহিহ মুসলিম
দাড়ি পুরুষত্বের প্রতীক। প্রাচীন সভ্যতায় এটিকে সমাজের কর্তৃত্বশালীদের প্রতীক হিসেবে ধরা হতো। সমাজের নেতৃত্বস্থানীয় ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা দাড়ি রাখত। আধুনিক যুগে ক্লিন শেভ বা ফ্যাশনের জন্য মুখ ভর্তি পরিমাণ দাড়ি রাখাকে আকর্ষণীয় স্টাইল হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু মূল বিষয় হলো—মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ মহানব মুহাম্মাদ ﷺ দাড়ি রেখেছেন এবং তাঁর উম্মতদেরও দাড়ি রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং অভিভাবকদের, বিশেষত পিতার অন্যতম দায়িত্ব হলো—দাড়ি রাখার ক্ষেত্রে নিজেদের উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা। সন্তানদের বোঝাতে হবে, রাসুল ﷺ-এর এই সুন্নাহর প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা অবশ্য কর্তব্য।
বন্ধুত্ব ও সাহচর্য: উত্তম বন্ধু নির্বাচনে গুরুত্ব চরিত্র গঠনের অন্যতম উপাদান হলো উত্তম সাহচর্য। উত্তম বন্ধু বাছাই করার ক্ষেত্রে ইসলাম বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। (সূরা আল ফুরকান : ২৭-৩০)
প্রকৃত বন্ধু খুঁজে বের করা সহজ নয়। পিতা-মাতার কর্তব্য হলো কিশোর সন্তানদের সাহচর্যের ব্যাপারে নজর রাখা এবং প্রয়োজনে যথোপযুক্ত সঙ্গী খুঁজতে সহায়তা করা। সন্তানদেরকে একই ধর্ম, গোত্র কিংবা ভাষভাষী মানুষের সাথেই বন্ধুত্ব করতে হবে—ব্যাপারটা এমন নয়। ইসলামে গোত্র-ভাষার কোনো সীমারেখা নেই, তবে গুরুত্বপূর্ণ হলো—উন্নত ও নৈতিক চরিত্রবান বন্ধু খুঁজে বের করা।
এক্ষেত্রে কিন্তু মুসলিম পণ্ডিতদের অভিমত হলো—অমুসলিমদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। এর সপক্ষে দলিল হিসেবে তারা কুরআনের এই আয়াত উদ্ধৃত করেন—
‘হে মুমিনগণ! তোমরা অবিশ্বাসীদের আওলিয়া বা বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না!' সূরা আলে ইমরান : ২৮
মূলত প্রত্যেক মানুষেরই বিভিন্ন ধরনের বন্ধু থাকে। যেমন—ঘনিষ্ঠ বন্ধু, উত্তম বন্ধু, সাধারণ বন্ধু, পরিচিত বন্ধু ইত্যাদি। সহকর্মীরাও এর অন্তর্ভুক্ত। ঘনিষ্ঠ বন্ধু তারা, যাদের সঙ্গে একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়াবলি আলোচনা করা যায়। এই ঘনিষ্ঠ বন্ধু একই প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও ধর্মের হওয়া উচিত। এটাই ইসলামের নির্দেশনা।
প্রত্যেকের জীবনেই বন্ধুর প্রয়োজন। কিন্তু তরুণপরা যেহেতু চারপাশের সংস্কৃতি ও সামাজিক পারিপার্শ্বিকতার দ্বারা প্রভাবিত হয়, তাই অসৎ বন্ধু তাদের জীবনকে ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে যায়। পিতা-মাতার কর্তব্য হলো—বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সাথে পরামর্শ করে ছোটো থেকেই সন্তানদের এসব সমস্যা সমাধান এগিয়ে আসা। যদি মনে হয় সন্তানরা খারাপ ছেলেদের সাথে মিশে মদদে জড়িয়ে পড়ছে, তাহলে সন্তানদের অসুস্থ সঙ্গ থেকে দূরে রাখতে পিতা-মাতাকে অবশ্যই কঠোর হতে হবে।
সকলের সাথে সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি মুসলিম নারী-পুরুষ ও ছেলেমেয়েদের উচিতও যথাসম্ভব বিপরীত লিঙ্গের সাথে ঘনিষ্ঠ মেলামেশা এবং অন্তরঙ্গ আলাপচারিতা থেকে দূরে থাকা। পাবলিক প্লেসে একত্রিত হলে তাদের উচিতও ইসলাম নির্দেশিত শিষ্টাচার অবলম্বন করা। গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের ঘোষণাও ইসলামে কঠোর নিষেধ করা হয়েছে। এর সম্ভাব্য কারণ হলো—
অনাকাঙ্ক্ষিত সম্পর্কের পথ বন্ধ করা। নারী-পুরুষের একান্ত সময় কাটানো একসময় বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ককে দিকে ধাবিত করে। তবে সামাজিক বাস্তবতা ও একাডেমিক কারণে শালীনতা বজায় রেখে ছেলেমেয়েদের জনসম্মুখে সাক্ষাৎ করতে পারে।
বিদ্যালয় ও ক্যারিয়ার: ছেলেমেয়েরা যখন বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছায়, তখন তাদের অধিকাংশই মাধ্যমিক পর্যায়ে অধ্যয়ন করে। এটি তাদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের শুরু। এই সময়ে সন্তানদের জন্য উপযুক্ত বিদ্যালয় বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অভিভাবকদেরকে দেউয়ানায় পড়ে যান এবং এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে তাদের অনেক সময় ব্যয় হয়।
পিতা-মাতার কর্তব্য হলো—নিজেদের সামর্থ্যানুযায়ী সন্তানদের জন্য উন্নত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাছাই করা। আশেপাশে এলাকার তুলনামূলক কম দূরত্বে অবস্থিত সামর্থ্যের মধ্যে ভালো মানের সমৃদ্ধ ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনেক অভিভাবকদের প্রথম পছন্দ। যে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান, শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা রক্ষা এবং ধর্মাবলম্বী ও ইসলামি দুরাচারী যথেষ্ট পরিমাণ বিশ্বাসযোগ্যতা নেই, অভিভাবকদের উচিতও সেগুলো এড়িয়ে চলা।
বাহ্যিকৃত বিদ্যালয় অবশ্যই এমন একটি স্থান ও পরিবেশে অবস্থিত হতে হবে, যা সন্তানদের একটি সফল এবং উপযুক্ত ক্যারিয়ার অর্জনে উৎসাহিত করে। কারণবশত কোনো অভিভাবক যদি সন্তানদের পড়াশোনায় সাহায্য করতে অপারগ হয়, এই ক্ষেত্রে একটি আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব অত্যধিক।
একজন তরুণ ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে যে সিদ্ধান্ত নেয়, তা তার পরবর্তী জীবনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। যে সকল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিম তরুণদের শুধু বৈষয়িক সক্ষমতা ও সম্মানের দিকে লক্ষ রাখলেই হবে না; বরং তাদের উচিতও এমন ক্যারিয়ার বাছাই করা, যা তাদের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে হালাল উপার্জন সাহায্যও করবে। সমাজকে কিছু দেওয়া, সমাজের উপকারের জন্য কিছু করা এবং এক সফল পরকালীন জীবন প্রাপ্তির জন্য চেষ্টা করার দিকে সব আগ্রহের নজর দেওয়া উচিত। মুসলমানদের ক্ষেত্রে দীর্ঘকালীন ক্যারিয়ার কিংবা সঙ্গতিপূর্ণ অর্থায়ারী চাকার হিসেবে অ্যালকোহল, মাদক, পর্ণোগ্রাফি কিংবা সুদের সাথে সম্পর্কিত বিষয়ের সাথে সংযুক্ত হওয়া নিষিদ্ধ। এগুলো সরাসরি হারাম কার্য সম্পাদন করতে উৎসাহিত করে। অর্থাৎ উপায়ে, ঘুস গ্রহণ, জুয়া খেলা, প্রতারণা করা কিংবা জমাতে অর্থের সুদ গ্রহণের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করাও হারাম।
রাসুল ﷺ তাঁর উম্মতের জন্য দুনিয়ার ভয় করেননি; বরং পার্থিব সম্পদের ব্যাপারে ভয় করেছেন। এই জন্য যুবকেরা যেন বৈষয়িক লালসায় লালয়িতও মোহগ্রস্ত না হয়, সেদিকে নজর রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিম যুবকদের উচিতও সমাজ কর্তৃক প্রদত্ত কোনো আর্থিক সাহায্য কিংবা অনুদানের ওপর নির্ভরশীল না হওয়া। তাদের উচিতও এগুলো থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকা, যতক্ষণ না তারা অতি প্রয়োজনের সম্মুখীন হয়ে পড়ে। । সে উপার্জনে উপার্জন, বিনিয়োগ ও ব্যয় একজন প্রকৃত মুসলিম হিসেবে জীবন পরিচালনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আর্থিক বিষয় : অতিমাত্রায় স্বাধীনতাকারণে ছেলেমেয়েদের অল্প বয়সেই অর্থ উপার্জনের বিষয়মালে চলে আসে। কিশোররা কি অর্থ উপার্জন করবে? করলে কোন বয়সে? তারা কি নিজেদের ব্যয় বহন করবে? এই সকল প্রশ্নের উত্তর কেবল পরিবারের তাদের অর্থনৈতিক অবস্থায় মাথায় রাখেই দিতে পারবে। একটি হতদরিদ্র পরিবারের জীবনধারপের ন্যূনতম ব্যয় নির্বাহের জন্য কিশোর সন্তানদের অর্থ উপার্জনের দিকে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না; যদিও পরিবারকে সুন্দরভাবে চলার জন্য সহায়তা করা সর্বদা কর্তব্য। তবে পরিস্থিতি যাইহোক, বৈষয়িক কিংবা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কিশোরদের শিক্ষা অর্জনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা উচিতও নয়। অনেক অর্থ ও মুর্ত অভিভাবক রয়েছে, যারা অতি তাড়াতাড়িতে অর্থ উপার্জনের লক্ষে সন্তানদের ক্যারিয়ার নষ্ট করে। এর মাধ্যমে তারা মূলত নিজেদের জীবনও নষ্ট, সমাজের ভবিষ্যৎও ধ্বংস করে।
তরুণদের উচিতও অর্থও গুরুত্ব বোঝা এবং তা যথাযথভাবে খরচ করতে শেখা। তরুণদের দায়িত্বরবণ করে তুলতে এবং আর্থিক গুরুত্বও বোঝাতে স্বাভাবিক ছুটি বা গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে পার্ট-টাইম কাজ করা ভালো ফলাফল বয়ে আণতে পারে। এটা তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও আর্থিক অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করে। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, এটি যেন কোনোভাবেই তাদের শিক্ষা অর্জনে ব্যাঘাত সৃষ্টি না করে এবং স্বল্ব বাস্তবায়নে বাধা না হয় দাঁড়ায়।

📘 মুসলিম প্যারেন্টিং > 📄 ব্যক্তিগত দুর্বলতার ব্যাপারে সচেতনতা

📄 ব্যক্তিগত দুর্বলতার ব্যাপারে সচেতনতা


সন্তানরা যখন কিশোর বয়সে পদার্পণ করে, তখন তারা অভিভাবকদের সাথে সময় কাটানোর পরিবর্তে টেলিভিশন, কম্পিউটার, মোবাইল অথবা বন্ধু-বান্ধবের সাথে সময় কাটাতেও অধিক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এই সকল ক্ষেত্রে পিতা-মাতা
কিংবা অন্য কোনো দায়িত্বশীল অভিভাবক পক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে কিশোররা অপরিণত হোবলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আধুনিক সমাজ স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে—এমন অনেক আচরণ ইসলামি জীবনধারার সাথে সামঞ্জস্যশীল নয়। যে সকল অভিভাবক সন্তানদের কিশোর বয়সে পরিচর্যত অবহেলা প্রদর্শন করে কিংবা যথাযথভাবে পূর্ব প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়, তারা কিশোর সন্তানদের নিয়োেক এক বা একাধিক সমস্যায় নিষ্পতি হতে দেখবে।
অহংকারীতা : কিশোর বয়সে শিশুরা সাধারণত দুটি বিপরীতমুখী চরিত্রের অধিকারী হয়: একটি তাদের বহুমুখী চরিত্র, অপরটি অন্তর্মুখী। অর্থাৎ এই বয়সের শারীরিক ও অন্যান্য পরিবর্তনের কারণে তাদের মধ্যে একধরনের অহংবক্তা সৃষ্টি করতে পারে। টেলিভিশন, কম্পিউটার কিংবা অন্যান্য প্রযুক্তিগত বিষয়াবলি দ্বারা অতিমাত্রায় প্রভাবিত হওয়ার ফলে তারা পরিবারের সাথে সময় কাটানো এবং সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকতে পারে। যে সকল তরুণের কোনো সহোদর কিংবা কাছের বন্ধু নেই, তারা নিঃসঙ্গতায় ভোগে। অভিভাবকদের অদক্ষতা কিংবা উদাসীনতা এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। সন্তানরা যদি পরিবার ও সমাজের সাথে সম্পর্ক রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তাহলে তাদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যা দানা বাঁধে এবং তারা নানান খারাপ অভ্যাস ও সামাজিক রোগের শিকার হয়।
অ ভদ্রতা ও অসাধাচরণ : অদ্রু কথা ও খারাপ ভাষা পরিবারের সদস্যদের মধ্যেকার সম্পর্ক দুর্বল করে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত বাড়িয়ে দেয়। এজন্য সন্তানদের মধ্যে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। অপ্রয়োজনীয় কিংবা মন্দ কথা বলার চেয়ে চুপ থাকাটাই উত্তম। কারণ, এটা পরবর্তী সময়ে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু বই আণতে পারে। ছন্দাতা, সহমর্মিতা, উত্তম বনবৃত্তি ও নয়সম্পূর্ণ পরিবেশে একজন মানুষের স্বাভাবিক বিকাশ ঘটতে পারে। অপ্রাকৃতিক রাগ, অসাধাচরণ, ক্রোধ ও হতাশ্যপূর্ণ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কিশোর অপ্রতিভা ও ক্ষতির মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। যে সকল পিতা-মাতা নিজেদের মধ্যে কথা বলার চেয়ে বাড়াবাড়ি ব্যবহার করেন এবং জটিল মুহূর্তেও সন্তানদের সাথে কুরুচিপূর্ণ ব্যবহার পরিহার করেন, তারা সন্তানদের মধ্যেও এই আচরণ প্রভাব দেখতে পান। সন্তানদের মাঝে যদি বদমেজাজে ও অসাধাচরণে বৃদ্ধি ঘটে, তাহলে দ্রুততা ও সতর্কতার সাথে এগুলোকে শান্ত হাতে দমন করতে হবে। সন্তানদের আচার-আচরণ শিক্ষা দেওয়া এবং আদর্শ প্রদর্শনের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই রাগান্বিত হওয়া যাবে না।
অরচিতকর স্টাইল ও ফ্যাশন : বর্তমান সময়ে অরচিতকর ফ্যাশন ও স্টাইলের অন্ধ অনুসরণ খুবই সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ধরনের উন্মাদনার পেছনের কারণ কী?
আত্মমর্যাদাবোধ ও স্বল্পবোধ প্রত্যেক মানুষের সমৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম, যা জীবনকে উপভোগ করতে তোলে। অনেকে জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক, শরীরে বিভিন্ন জায়গায় ফুটো করা, ট্যাটু ব্যবহার করে কিংবা অদ্ভুত চুলার স্টাইলের মাধ্যমে অন্যের সামনে নিজেকে জাহির করতে চায়। এই সমস্ত চলাফেরার মাধ্যমে তারা চায় বিপরীত লিঙ্গকেও আকৃষ্ট করতে। অনেকে এগুলোর মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ, আত্মপরিচয় অর্জন কিংবা সমাজের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চায়।
বিষয়টিদের আত্মসম্মানবোধ, পরিচয়বোধ ও জীবন এর অর্থ নির্ধারিত হয় তাদের বিশ্বাস, আল্লাহর সম্পর্ক জ্ঞান এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের প্রচেষ্টা ও ওপর ভিত্তি করে। ইসলামে পোশাক, নৈতিকতা ও আচার-আচরণের নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে— যা মুসলিমদের জীবনকে করে সৌন্দর্যমণ্ডিত। এ সকল বিধান পালনের মাধ্যমে একজন মুসলিম সন্তোষজনক উপায়ে মর্যাদা ও আভিজাত্যের সাথে নিজের জীবন পরিচালনা করতে পারে।
তরুণ-তরুণীরা সাধারণত বুঝতে পারে না, অরচিতকর ফ্যাশন অনুসরণের পোশাক পরিধান এর এর মাধ্যমে বিপরীত লিঙ্গকে আকৃষ্ট করার আকাঙ্ক্ষা খুবই ক্ষণস্থায়ী। এর ফলে শালীনতা ও আত্মমর্যাদার বিপর্যয় ঘটে। আর এতে অতিমাত্রায় অর্থ উপার্জনকারী ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিগুলো কোনো যায়-আসে না। মুসলিম অভিভাবকগণকে এই ব্যাপারে অবশ্যই সচেতন হতে হবে।
মিথ্যাবাদিতা ও প্রতারণা : সত্য কথা বিপদ ডেকে আনতে পারে, এই ভয়ে অনেক মানুষ মিথ্যা বলে। একটি কিশোরের চোখে পৃথিবীটা ভিন্ন ধরনের। তারা বিভিন্ন ব্যাপারে কল্পনা করতে, স্বপ্ন দেখতে কিংবা দৃষ্টিভঙ্গির করতে পারে। এই ব্যাপারে অন্যদের বলতে সংকোচ বোধ করে। কিশোররা যেহেতু পরিবর্তনের সময়ের মধ্য দিয়ে যায়, সেহেতু তাদের মধ্যে কোনো কিছু গোপন করা, মিথ্যা কথা বলা কিংবা প্রতারণা করার মতো বিভিন্ন নেতিবাচক অভ্যাসের বিকাশ হতে পারে। এগুলোর অনেক কারণ রয়েছে, যা নিচে উল্লেখ করা হলো—
* মজা করা, খেলার ছলে কিংবা কাউকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য।
* নিজেদের ভালো মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করা।
* পিতা-মাতা থেকে কোনো কিছু আদায় করা কিংবা তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করা।
* সমস্যা এড়িয়ে চলা কিংবা কারো রাগ থেকে রক্ষা পাওয়া।
* নির্মোহ সত্যের মুখোমুখি হওয়া থেকে বিরত থাকা।
* নিজেদের ভেতর জেগে উঠা উদ্ভট কল্পনাকে জিইয়ে রাখা।
* প্রতারণার মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস জিইয়ে রাখার চেষ্টা করা, যেহেতু তারা ব্যর্থতাকে বরণ করতে পারে না।
* নিজেদের মন্দ আচার-আচরণের পরিণতি ভোগ থেকে পার পাওয়া।
* অন্যের কাছে নিজেকে গ্রহণযোগ্যা ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা।
* ভালো পুরস্কার অর্জন করা ইত্যাদি।
সমস্যা মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে এবং অভিভাবকদের অবশ্যই খেয়াল রাখা জরুরি, এগুলো তাদের ব্যক্তিগত আচরণের প্রভাব কি না। এমন হলে সমস্যা আরও প্রকট হয়ে উঠবে। স্বচ্ছ ও স্বাস্থ্যকর পারিবারিক পরিবেশে মিথ্যা ও প্রতারণার কোনো সুযোগ থাকে না। মিথ্যাকে দ্রুততা ও সচেতনতার সাথে মোকাবিলা করতে হবে এবং সন্তানদের শিক্ষা দিতে হবে—এটি এক মারাত্মক মানবিক বিপর্যয়, যা ইসলামে চরমভাবে নিষিদ্ধ। মিথ্যা সকল পাপের মূল এবং মুনাফিকের সবচেয়ে বড়ো আলামত।
‘মুনাফিকের চিহ্ন তিনটি—
১. কথা বললে মিথ্যা বলে
২. শপথ করলে ভঙ্গ করে
৩. কোনো কিছুর আমানত দিলে আমানতের খেয়ানত করে।’
সহিহ বুখারি
অবসাদতা ও বিদ্রোহী মনোভাব : প্রায় ক্ষেত্রেই কিশোররা নিজের ভেতরের হতাশা ও ক্রোধকে স্পষ্ট করে বলতে পারে না। কথা বলার সময় তারা অন্য কারও কথায় কর্ণপাত করতে চায় না। ফলে তাদের রাগের মাধ্যমে অবসাদতা ও বিদ্রোহী আচরণের প্রকাশ পায়। এটি সহজেই বোধগম্য, যখন পিতা-মাতা সন্তানদের মাঝে বিভিন্ন ধরনের আচরণগত সমস্যা দেখতে পান, তখন স্বাভাবিকভাবে অনেক চিন্তিত হয়ে পড়েন। তবে এই সকল ক্ষেত্রে আমাদের চিন্তাশীলতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এই ধরনের আচরণের নিয়ামক ও কারণ কী? বাসার পরিবেশ কিংবা পিতা-মাতার আচরণ কি এই সমস্যা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে? এই ধরনের আচরণে বড়ো অভিভাবকদের কী করা উচিত? এ সকল প্রশ্নের উত্তর জানা একজন অভিভাবকের কর্তব্য।
আমাদের অবশ্যই আদর্শের ক্ষেত্রে সাবধান থাকতে হবে এবং স্মরণ রাখতে হবে, আল্লাহ পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তির আচরণ সহ্য করছেন এবং তাদের প্রতি প্রতিনিয়ত ঘৃণা বর্ষণ করেছেন। যে ধরনের অন্যায়-ই করুক না কেন, সন্তানদের সাথে এমন রূঢ় আচরণ করা যাবে না, যা সন্তান ও অভিভাবকের মধ্যকার সম্পর্ক বিনষ্ট করে কিংবা তাদের মাঝে বিদ্রোহী মনোভাব জন্মাতো করে। অভিভাবকদের মাঝে সহিষ্ণুতা, রাগ প্রশমন ও নিয়ন্ত্রণের যোগ্যতা অবশ্যই থাকতে হবে। সন্তানদের সাথে সব সময় খোলামেলা আলোচনা ও যোগাযোগ রক্ষা করা জরুরি।
মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যা : নিজের ক্ষতিসাধন সমাজের অন্যতম প্রধান সমস্যা। Mental Health Foundation (MHF)-এর গবেষণা অনুযায়ী—১১ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণদের প্রতি ১৫ জনের একজন আত্মহত্যা বা নিজের ক্ষতিসাধন করে। এটি একটি সংকটজনক ব্যাপার। এর ওপর যদিও অনেক গবেষণা হয়েছে, কিন্তু সমাজের অনেকেই এ ব্যাপারে কিছুই জানে না। বেঁচে থাকার আকুতি এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা মানুষের স্বভাবজাত প্রকৃতি। তাই যখন কেউ এই স্বভাবজাত প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, তখন অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়—আত্মহননের জন্য মানসিক ও আর্থ-সামাজিক কারণ রয়েছে। এই কারণগুলোর জন্য মানুষ নিজের জীবনকে অর্থহীন মনে করে এবং নিজের ক্ষতিসাধন করে।
শেষবের কোনো দুঃসহ স্মৃতি যেমন: শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন ইত্যাদি পাশাপাশি নিজে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করে একজন মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে পারে—
* অবহেলার শিকার হওয়া
* ভালোবাসার মানুষের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়া
* ধমকি বা নির্যাতনের শিকার হওয়া
* পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া
নিজের ক্ষতিসাধন করা বা নিজেকে আহত করার অনেক উপায় রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত উপায় হলো—শরীরকে কোনো অস্ত্র কাটা অথবা পোড়ানো। অন্যান্য উপায়ের মধ্যে আছে অতিরিক্ত ওষুধ গ্রহণ, চল উপড়ে ফেলা, চামড়ার ক্ষতিসাধন এবং শক্ত কিছুর সাথে নিজ আত্মাকে আঘাত করা ইত্যাদি। অনেক তরুণ আবার একেক সময় এ পদ্ধতি অবলম্বন করে।
কিশোররা জীবনের এই মুহূর্তে যদি যথাযথ সমর্থন কিংবা সহানুভূতি মানসিক সহযোগিতা না পায়, তাহলে তারা আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে, যা তাদের মধ্যে রাগ ও হতাশার সৃষ্টি করে। এর ফলে তারা নিজের ক্ষতিসাধন করে এবং নিজেকে দোষ দিতে থাকে। যেকোনো কারণেই হোক, নিজের ক্ষতিসাধন ইসলামি ভাবধারার বিপরীত। আল্লাহ পাপের মাধ্যমে মানুষের পরীক্ষা নেন এবং বিপদে ধৈর্যধারণকারীদের জন্য বিশাল পুরস্কার ধার্য করেন। (সুরা বাকারা : ১৫৫-১৫৬)
ধৈর্যশীলতা আল্লাহ প্রতি অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস থেকে, যা ইসলামের যথাযথ জ্ঞান ও উপলব্ধির মাধ্যমে তৈরি হয়। এর ফলে ব্যক্তি আল্লাহর যেকোনো সিদ্ধান্তকে নিজের জন্য কল্যাণজনক মনে করে। যদি মুসলিম পিতা-মাতা সন্তানদের আদর-যত্ন ও ভালোবাসার মাধ্যমে লালন-পালন করে, তাহলে ইনশাআল্লাহ, নিজের ক্ষতি করার বিষয়টি কোনোভাবেই তাদের মাঝে আসবে না। সন্তানদের কঠিন মুহূর্ত ও হতাশাজনক অবস্থা মোকাবিলায় অভিভাবকদের দায়িত্বভার জরুরি। এই সময়ে তাদের জন্য সর্বোচ্চ সহনশীলতা হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।
খাদ্য গ্রহণে অস্বাভাবিকতা : খাদ্য গ্রহণে অস্বাভাবিকতা হলো—খাওয়া-খাওয়ার সাথে অস্বাভাবিক সম্পর্ক। ওজন কমানোর লক্ষ্যে এটা করলে শরীর ও মন উভয়ের ওপরই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ Disorder দুভাবে হয়ে থাকে : একটি Anorexia Nervosa এবং অপরটি Bulimia। Anorexia Nervosa এমন একটি অবস্থা, যখন কোনো ব্যক্তি চিকন হওয়ায় ভয় পাওয়া সত্ত্বেও খাবার গ্রহণ করেন না বা খুবই অল্প খান। তারা অতিরিক্ত ব্যায়াম করে এবং শরীরকে বমি করার চেষ্টা করে। যারা অতিরিক্ত খায়— যেকোনো ধরনের খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করা তারা মোটা হয়ে থাকে। ফলে তারা নিয়মিত খাবার গ্রহণ থেকে মাত্রাতিরিক্তভাবে বিরত থাকে। Anorexia-তে অভ্যস্ত হওয়ার অস্বাভাবিকতাকে চিকিৎসকরা দেখান। Bulimia এমন এক অবস্থা, যখন কোনো ব্যক্তি প্রচুর খাদ্য গ্রহণ করতে চায়। কিন্তু বিশ্বাস করে, খাদ্য গ্রহণ শরীরের ওজন বাড়িয়ে দেয় এবং অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি তাদের শারীরিক সৌন্দর্য নষ্ট করে। ফলে তারা অতিরিক্ত খাবার খাওয়া সত্ত্বেও নিজেদের চিকন করার জন্য বিভিন্ন ধরনের ক্ষতির মেডিসিন গ্রহণ করে থাকে। এই সকল অভ্যাস তাদের স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটায়। Anorexia সাধারণ মধ্যবয়সি কিশোর-কিশোরীদের মাঝে দেখা যায় এবং Bulimia-এর কিছু পরেই শুরু হয়। এই দুটি সমস্যা সাধারণত ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00